Tuesday, March 19, 2019

আবার পাহাড়

প্রেম বোঝা যায় বিরহে বলেছিলাম না? তা যেমন সত্যি, তেমনি জড়িয়ে মড়িয়ে থাকলে ভালোবাসা জন্মায় এও সত্যি। দূরে আছি পাহাড়ের থেকে কতদিন? প্রায় এক বছর হতে চলল মনে হয়। তাও কয়েকদিনের কাছাকাছি থাকাই তো ছিল কেবল, কিন্তু সত্যিকারের দূরে তো নেই আসলে। ভালোবাসা শিকড় মেলে, সেই শিকড়টা তো পাহাড়ে গিয়েই বসিইয়ে , ছড়াতে দিয়েছিলাম। তাই পাহাড় না দেখলে কষ্ট হয় কিন্তু এটাও জানা থাকে আছে তো....

পাহাড়ে বারবার আমি অসময়ে যাই। ইচ্ছে করে যাই এমন না আসলে অত গুছিয়ে নিজের সাথে ঘুরতে যেতে ভালো লাগেনা। ফলে, যে সময়ে রডোডেনড্রনের আগুন জ্বলে আমি পাহাড়ে থাকিনা, যে সময় পরিবেশ উপযুক্ত থাকে সক্কলে টিকিট কেটে ফেলে আমি এদিক সেদিক ঘুরঘুর করে ভাবি, একবার ঠিক সময়ে যাব। টুকটাক ঘোরাঘুরি করার ফলে জানি, শহরে চাঁদ ঠিক প্রকাশ পায়না। তাই দোল পূর্নিমা না পেলেও একদশী দ্বাদশীর চাঁদও আলো ছড়াতে ভালোই পারে যদি তুমি দেখার সুযোগ পাও।

সান্দাকফু যেতে অন্তত গোটা পাঁচেক দিন লাগেই। আমার মধ্যবিত্ত জীবন প্রেমে অত দিন দেয় কই! ফলে পাহাড়ে হাঁটবো এই ইচ্ছে টুকু পূরন করতে টংলু টুকুই ঘুরে আসি। সেবার টংলু যেতে গিয়েই ভার্সে চলে গেছিলাম, পেন্ডিং আছে অনেকদিনকার। ফের সুমিতদাকে জ্বালাতন, কোন রুট দিয়ে যাব কোনটা দিয়ে ফিরবো, কতক্ষন লাগবে মোটামুটি। একটা দিনই ছুটি খালি, সোমবার, মানে সোমবারেই বিকেলের মধ্যে শিলিগুড়ি নামতে হবে। মোটামুটি যা বোঝা গেল, টংলু থেকে মানেভঞ্জন তিন সাড়ে তিন ঘন্টায় নেমে আসা যায়। কিন্তু এ তো এক্সপার্ট ট্রেকারের মত, আমি তো সে অর্থে ট্রেকার নই। ধুস যা হবে দেখা যাবে....

সুতরাং দুদিন আগে টিকিট দেখতে বসে দেখা গেল.... কী আবার অফকোর্স ওয়েটিং। জেনারেলে যাওয়া যায়....বাসের টিকিট আছে কি? আরিব্বাস আছে তো। চলো ফের। অফিস থেকে ফেরার পথে মনে পড়ে, একটা রুকস্যাক তো কিনতে হত। পাওয়ার ব্যাংকও তো নেই। যাকগে যাক। এই ব্যাকপ্যাকেই হয়ে যাবে।

শিলিগুড়িতে নেমে চা বিস্কুট খেয়ে গাড়ি খুঁজছি। শেয়ারে যাব অবশ্যই। সুখিয়াপোখরির গাড়ি মেলে, তবে এইখানে সব দার্জিলিং এর গাড়ি। দার্জিলিং মোড় অব্দি না গিয়ে আর, এখান থেকেই ঘুম অব্দি চলে যাই, ফের না হয় ওখান থেকে সুখিয়ার গাড়ি ধরে নেব। শেয়ার গাড়ির মজা বা সাজা যাই বলো না কেন, বেশ হরেক কিসিমের লোক মেলে। আমার পাশে যে তিনটে ছেলে তাদের দুজন হল গিয়ে স্টুডেন্ট। শৌখিন। হুঁ হুঁ বাবা ফেলুদা আম্মো তো পড়েছি খানিক নাকি? হাতে ওয়ান প্লাস, আঙুরের প্লাস্টিক, শেয়ার করার আধিক্য, পাহাড় দেখেই খচাৎ খচাৎ ছবি...দার্জিলিং প্রথমবার, কলেজ পড়ুয়া শিওর। আর এক জন গায়ে সস্তার চকচকে কোট, হাতে উল্কি, রোঁয়া ওঠা ফুটপাথের ব্যাগ, বিরক্ত মুখ চোখ, ঢুলতে ঢুলতে সারা রাস্তা.....দার্জিলিং এ কোনো হোটেলে কিংবা দোকানে কাজ করে। নাহ আমি জিজ্ঞেস করিনি কিছুই, ও আমার ভাল্লাগেনা,কাউকে দেখা মাত্রই কোথায় থাকো, কী করো নিয়ে প্রশ্ন করা। কিন্তু বসে বসে আন্দাজ করতে দোষ নাই। বলতে পারো স্টিরিওটাইপ আন্দাজ, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেলে বলেই না স্টিরিওটাইপ আন্দাজ করা হয়ে থাকে!

পিছনের মহিলা পুজো দিতে চায়, একটা নারকেল তার দরকার। পাহাড়ের শেয়ারের গাড়ি বড়ই এডজাস্টেবল হয়। সামনে ড্রাইভার সহ চারজন বসে যায় দরকার পড়লে, যে কোনো গাড়িতে। সে অভিজ্ঞতা পড়ে বলছিখন। যার যেমন দরকার সেখানে দাঁড়াতে পারে। ফলে এনার নারকেলের জন্য বার চারেক হল্ট হল, বিভিন্ন দোকানে। কার্শিয়াং, সোনাদা আর দু জায়গায়। সামনে দুজন বুড়ো মানুষ। বুড়ো মানুষ বলাটা মনে হয় পলিটিক্যালি কারেক্ট হল না। যাকগে এ আমার হাবিজাবি, আমি তো সত্যিই গেঁয়ো আনপড়....। 
হ্যাঁ কি বলছিলাম যেন, সামনের দুই বুড়ো মানুষ, বকম বকম করছিল নেপালি ভাষায় ড্রাইভারের সাথে, বুঝছিলাম না কিছুই। হঠাৎ করে, আমায় বলে সুখিয়া যাবে? ট্রেক করতে বুঝি? ওই যে ওই পাহাড়টা সুখিয়া। বোঝো! আঙুলের তাক বরারবর পাঁচ ছয়খানা পাহাড়, কোনটা সুখিয়া?

ঘুমে নেমে জ্যাকেট গলাচ্ছি, দেখি একা দেখেই তাক করেছে, সুখিয়া? একশো দেবে? না দেবো না বলে, একটা প্রায় চলন্ত গাড়িতে ঝপ করে উঠে পড়েছি। এ রুটের গাড়ি, সুখিয়া নামিয়ে দেবে। আচ্ছা আমার কি খিদে পাচ্ছে একটু? একটা পকেটে খচমচ করছিল চকলেট, চেপ্টে গেছে, ঠান্ডা কিনা তাই গলে গিয়েও ফের র‍্যাপারের গায়ে জমে গেছে। এখানে আমায় কেউ চেনে না, আমিও কাউকে চিনিনা, আর এই গাড়িতে কালচার এর ধ্বজাধারী কেউ নেই, সব আমার মতোই অশিক্ষিত, আনকালচার্ড, লোকজন সুতরাং বেশ আরাম করে জিভ দিয়ে চেটে চেটে চকলেটের র‍্যাপার খানা খাওয়া গেল। খেতে খেতেই সুখিয়ার চেকপোস্ট এ দেখি সিট তুলে তুলে কী যেন সব দেখলো।

সুখিয়া থেকে ধোত্রের ডিরেক্ট যেতে গেলে রিম্বিকের গাড়িতে উঠতে হবে, দার্জিলিং থেকে আসে। খুবই কম কম আসে। অনেক্ষন দাঁড়িয়ে চা কেক টেক খেয়েও গাড়ি আসছেই না যখন ভাবছি একবার আলতো করে মানেভঞ্জন এর গাড়ি গুলোকে জিজ্ঞেস করবো ধোত্রে অব্দি কত নেবে বুক করলে, সেই সময়েই একজন বলল (তার আগে মেলা মাথা খেয়েছি লোকজনের গাড়ি কই গাড়ি কই বলে), ওই তো তোমার গাড়ি।

ও বাবা যেই না গাড়ি এসে থেমেছে দেখি পিল পিল করে চারজন লোক ছুটে এলো। দুজন স্থানীয়, দুজন ট্যুরিস্ট। এবং আশ্চর্য হয়ে দেখলাম তারা সকলেই ফিট করে গেল আমি হাবার মত বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। ড্রাইভারদাদাকেই বললাম গোঁয়ারের মত, আমাকেও নিতেই হবে, ইয়ার্কি নাকি, আমি সেই কক্ষন থেকে দাঁড়িয়ে আছি! 
-তুমিও যাবে? আচ্ছা বসো সামনে। দেখছি, খেয়ে আসি কেমন?

সামনে আরো দুজন ছিল। আমি গিয়ারের একদিকে এক ঠ্যাঙ আরেকদিকে আরেক ঠ্যাং রেখে বসেছি। একটু ভয়েই, গীয়ার ফস করে ইয়েতে মেরে দেবে না তো? সুখিয়া হল বাজার এলাকা। মাঝের চারজন লোক গেছে বাজার করতে, ড্রাইভার গেছে খেতে। গাড়িতে বাকিরা ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে, শুধু বাঙালী ট্যুরিস্ট বাদে। খানিকবাদে ড্রাইভার এলো, বাজারুরা তখনো আসেনি। আরো খানিক বাদে, গাড়ি ম ম করা কেক বিস্কুটের গন্ধ নিয়ে বাকিরাও এল।

মানেভঞ্জন এর কাছে এসে আমায় নামিয়ে দিল। আমি অবাক! অ্যাঁ! যাব কী করে? কাঁউমাউ করে বললাম, এখান থেকে তো কিছুই পাবো না! সে হেসে হেসে বলল, "আরে বাবা এখানে এরা তিনজন সামনে এলাউ করে না, এগিয়ে এসো আছি আমি"। টুকটুক করে হেঁটে, গাড়ি, পারমিট চত্বর পার হওয়া গেল। এখান থেকেই সান্দাকফু ট্রেক শুরু করে বেশীরভাগ লোকে। গাড়ি, পারমিট, গাইড সব এখান থেকেই। মানেভঞ্জন নামটা কেমন অদ্ভুত না? কার মান এখানে ভঞ্জন করেছিল কে, কে জানে!

ধোত্রে আরো সতেরো কিলোমিটার। এ রাস্তায় গাড়ি বেশী চলে না। নিস্তব্ধ রাস্তায়, নেপালী গান আর বুড়ো বোলেরো চলতে লাগল। খানিক বাদে ফের থেমে গেল।
-উতরিয়ে।

আরে ফের কী হল? এবার গেছে গাড়ির ক্লাচের তার কেটে। গদি পেতে শুয়ে পড়ে সারানো হল। এখোনো দশ কিলোমিটার বাকি৷ ধোত্রে হল একটা পাহাড়ি গ্রাম। ছোট্ট, শান্ত। ইচ্ছেগাঁও বা সিলারির মত হাইপড না তাই এখনো ফাঁকাই। বেশীরভাগ ট্রেকাররাই এসে থাকে। খুব কম এমনি ট্যুরিস্ট। এখন বাজে দুটো। সুমিতদাই একজনের নাম্বার দিয়েছিল, তার বাড়িতেই আগে গেলাম, সে নেই, তার ছেলে বলল বাবা না এলে কিছু বলা যাবে না। সে তার বন্ধুকে দিয়ে পাঠালো শেরপা নিবাসে। মন্দ না কিন্তু কিরম কিরম যেন। আচ্ছা আজ সোজা টংলু চলে যাব? ওই ছেলেটা তো বলছিল ঘন্টা দেড়েক লাগবে। ওর ঘন্টা দেড়েক মানে আমার যদি আড়াইও লাগে...দুটো বাজে...সন্ধ্যে হয়ে যাবে....থাকগে। আমি তো কোথাও পৌঁছতে আসিনি। শেষ তক পদ্ম দিদির বাড়িতেই থানা গাড়লাম। একা বলে আর স্টুডেন্ট বলে (ওই আর কি, ঝাড়ি মারলে কিসে পড়ো শুনি যখন হোটেলে স্টুডেন্ট নয় কেন), খানিক ছাড় টার দিয়ে থাকতে খেতে দিল।

খেয়ে উঠে ফের বেরিয়ে পড়েছি। জঙ্গলের দিকটায় যেতে গিয়ে দেখি একটা ছোট পুকুর মত, পাশে একটা লোমওয়ালা গরু জাবর কাটছে। আজ বেশী হাঁটবোনা। কাল টংলু ছয়, ওখান থেকে টুম্লিং দুই ব্যাক করে টংলু ফের দুই, মানে দশ এগারো কিলোমিটার হাঁটা আছে। একটু উঁচুতে ভিউ পয়েন্ট। যদিও এখন কিছুই দেখা যায় না, কিন্তু সকালে নাকি চমৎকার কাঞ্চনজঙ্ঘা সহ স্নোক্যাপ মাউন্টেইন দেখা যায়। ভিউ পয়েন্টের কাছে আরো চারটে ছেলে ছিল। চারজনেই ফোনে ট্রাই করছে, একটু নেটওয়ার্ক পেয়েছে কিনা। গলা নিচু, একটু সাইড হয়ে কিংবা সামনে দাঁড়িয়েই, জোরে জোরে কথা বলা দেখেই ওপারের লোক কারা আছে বোঝা যায়। ফরেস্টের রশিদদা ছিল ওখানে। শিলিগুড়ির ছেলে। টংলুর রাস্তাটা জিজ্ঞেস করে নেমে এসেছি ওখান থেকে ফের। এত লোক ভাল্লাগেনা। এদিক সেদিক চলতে চলতে গ্রামটার মধ্যে ঢুকে গেছি। এক মহিলা রোদে উল বুনছে এক মনে, বাঁহাতে গরু, ছাগল, মুরগির ঘর। চাল বাছছে একজন। রোদ কমে আসছে ক্রমে। রাজন বলে একজনের সাথে আলাপ হল, রান্না করছিল, বীফ কারি। তার গোল্লা মত ছেলেটাকে নিয়ে তার বউ দাঁড়িয়েছিল। গোল্লাটা একবার আমার কোলে এসি এক হাতে আমার দাড়ি আরেক হাতে চশমা খামচেছে। রাজনের ক্ষেতিবাড়ি আছে, টুকটাক মূলো, আলু, বিট, গাজর ফলায়, আর গাইডের কাজ করে৷ 
-চায়ে পিলো ভাই থোড়া, কুছ নেহি তকলিফ হোগা।

সহজ জীবনে সহজ সুর থাকে। বেশী কিছু চাহিদা নেই, তাই সহজে পথের আলাপে বাড়ি ডেকে বসতে দেওয়া যায়। সত্যি বলতে আমাদের গ্রামেও আমি দেখেছি ছোটবেলায় বাড়িতে কেউ এলে আগে বসানো হত। জল মিষ্টি দেওয়া হত। ভিখারী এলেও দুপুরে খালি পেটে যেত না। অনাহুত কেউ ছিল না কোনোদিন। কবে থেকে সন্দেহের বিষ ছড়িয়ে গেল, কবে থেকে আমাদের দৃষ্টিসীমা ছোট হয়ে গেল, আমরা দরজাটুকু একটু ফাঁক করে জিনিস নিই খালি...দেওয়ার পালা ঘুচেছে কবেই। তাই মনে হয় পাবার জিনিস কিনেই মেলে। দাম হীন জিনিসের অধিকার আমরা হারিয়ে ফেলেছি কোন ফাঁকে।

ক্রমে অন্ধকার নেমে আসে। এক দুটো হোমস্টের আলো ক্রমে নিভে যায়। বাকি গ্রাম আগেই অন্ধকার। পদ্মদিদি আমাদের খাইয়ে নিজে খেতে যায়।এই ছাদটা বড় ভালো, পিছনেই স্নোক্যাপ মাউন্টেইন দেখতে পাবো কাল ভিউ ক্লিয়ার থাকলে। রাত বাড়তে হাওয়াও বেড়েছে বেশ। ঠান্ডা টাও। বেশী রাত অব্দি ছাদে থাকা যাবেনা। কিন্তু কী অপরূপ লাগছে। বিকেলে মেঘলা গ্রামটাকে যেমন বিষন্ন লাগছিল, এখন তেমনই মায়াবী লাগছে। আকাশে তারা ফুটেছে অনেক, হাওয়াটা থেমে গেছে। চাঁদের আলোয় জঙ্গল, গ্রাম সব যেন অবাক এক জনপদ হয়ে গেছে। এখানে যেন আর থাকা মানুষের সীমার বাইরে। এক্ষুনি জঙ্গল পাহাড় জেগে উঠবে। যারে মানুষ না থাকে তাই জন্যেই কী এত হাই উঠছে? জানি জানি এতটা জার্নি, রাতে ভালো না ঘুম হওয়ার কথাই বলবে....কিন্তু সত্যিটা কী তা কে জানে.....









(ক্রমশ..)

Monday, March 11, 2019

আলাপ

- আচ্ছা শুনুন। আপনিই আসবেন বলেছিলেন তো?

- আমায় কি মিথ্যেবাদী মনে হয়!

- উহ লংকার চপ মনে হয়।এত ঝাল কেন! 

- কি!??

- না না আপনাকে না।  এই যে নরেনের দোকান থেকে দুটাকার মুড়ি আর চপ কিনেছিলাম কিনা।

- ও আপনিই চপশিল্পের ব্র‍্যান্ড এম্বাসাডর!  ওই জন্যেই এরকম ড্রামের মত চেহারা! 

- দেখুন প্রথম দিনেই এরকম ড্রাম টাম বলে অপমান করাটা কি ভালো হচ্ছে?

- ও আচ্ছা পরের দিন অপমান করব বলছেন?

- আহ কি মুশকিল ভুঁড়ির কথা আসছেই বা কেন। প্রথম দিন ডেট এ গিয়ে এসব কথা বলা ঠিক না! 

- ডেট? দেখা করা মানেই কিছু ডেট না। তাছাড়া হামহাম করে এক ঠোঙা মুড়ি চপ খেতে খেতে হাজির হওয়া লোকের সাথে ডেটিং করতে চাইও না।

- আচ্ছা আচ্ছা আপনাকে কি আর অফার করতাম না। এই তো নিন না।

- আপনি কি পাগল! ফার্স্ট ডেটে এসে লংকার চপ মুড়ি অফার করছেন! নবান্নে তো আপনাকেই দরকার, বাইরে কেন?

- যাক আপনি স্বীকার করছেন এটা ডেটই?

- আপনি খুবই পাজি লোক মশাই। 

- সে অবশ্য অস্বীকার করা যায় না। আচ্ছা দুধ চা না লিকার? 

- মানে? এত কিপ্টে নাকি আপনি যে একটা কফিশপেও যাবেন না!!

- তা না তবে ইয়ে মনের ভুলে ঝগড়া করতে করতে আপনি দেখুন লংকার চপ আএ মুড়ি খাচ্ছেন আমার থেকে, এর সাথে কফি ভাল্লাগবে?

- অ্যাঁ! ও হ্যাঁ তাই তো! কিন্তু আপনি আমায় ঝগ্রুটে বললেন নাকি? 

- না না তাই কি বলি! আচ্ছা শুনুন আপনার মা লুচি বানাতে পারে তো?

- কেন!!

- না মানে,  যেদিন আপনার বাবাকে বিয়ের কথা বলতে যাব....

- কি!! আপনি আমার বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবেন!! আমার বাবাকে! আমার বাবা প্রথমত, আপনার মত চরিত্রহীন না,  আমার মা ছাড়া অন্য কারোর দিকে নজর নেই। দ্বিতীয়ত,  আমার বাবা স্ট্রেট, তৃতীয়ত  আপনি গে যদি আমার সাথে ডেটে এলেন কেন?

- ওরেবাবা। আরে না না,  বিয়ের কথা মানে আপনাকে বিয়ে করার কথাই বলতে যাব আপনার বাবাকে।

- মানে!! গাছে না উঠতেই এক কাঁদি! চপ মুড়ি খেয়েছি আর ভাঁড়ে চা খেয়েছি আপনার সাথে বলেই কী ভাবছেন আপনার প্রেমে পড়ে গেছি!

- আহা রাগ করো কেন। আজকেই তো বলতে যাবনা। কদিন আরেকটু ঘোরাঘুরি করে নিই।

- আরে তুমি আমায় তুমি বলছ কেন! অদ্ভুত তো।

- ইয়ে তুমিও তো তাই বললে। 

- ও হ্যাঁ।  উহ খুবই জ্বালাও হে তুমি! 

- আচ্ছা ওই জন্যেই আগে থেকে বলে দিচ্ছিলাম,  বলছি লুচি আমি সাদা ধপধপে ফুলকো খাই হ্যাঁ? 

- ওহ এলেন লাটসাহেব রে।

- না না লাটসাহেবরা এসব সুখাদ্য খায়না।  যাক যা বলছিলাম। সাথে বেগুন ভাজার ঝামেলায় যেও না বুঝলে, কারন আমি আবার বেগুনের বোঁটার দিকটা খাই খালি। 

-তুমি মেফিস্টোফিলিস! উরুক্কু বাঘ। গন্ডার। তুমি ভেবেই নিয়েছ আমার সাথে বিয়েটা ঠিক আর সমানে খাওয়ার কথা বলে চলেছ।

- আচ্ছা আচ্ছা ক্যাপ্টেগিরি পরে হবে। দেখো, বিয়ে কেন করে লোকে খাওয়ার জন্যেই কিনা? এই তোমার বাড়ি যাব কথা বলতে, তারপর আবার মা বাবার সাথে যাব, তোমার বাড়ি থেকে আসবে, আইবুড়ো ভাত,বিয়ে বৌভাত....উফফ

- পেটুক কোথাকার। ইয়ে শোনো তোমার মেনু ঠিক করা আছে?

- না না চলো  চলো ফিশফ্রাই খেতে খেতে ঠিক করি। আর বলছি শোনোনা, লুচি আমি একটু ভালো খাই হ্যাঁ, মানে স্রেফ চারটে লুচি ধরানো বাড়িতে আমি ভাইফোঁটা নিতেও যাইনা....মানে...

-উফফ...রাক্ষস কোথাকার, বলে দেবো এক ধামা লুচি করতে সেদিন। 

-ইয়ে তারমানে ফাইনাল? 

-- হ্যাঁ আমার যেমন কপাল...চলো এবার মেনুটা করেই ফেলি।

Thursday, February 28, 2019

দিনকাল

দিনকাল খুবই খারাপ যাচ্ছে। হাজারটা চিন্তার মাঝে একটা কাচের বয়ামের গজা নিয়ে আনমনে খাচ্ছি, একটা বাইক এসে প্রায় গুঁজে দেয় আর কি! খাবি খেয়ে হাত থেকে সাধের গজা গেল মাটিতে...টাকা মাটি হতে পারে ডিমনিটাইজেশনে টাকা বদলাতে ভুললে, গজায় মাটি লাগলে দিনটাই মাটি হয়!

যে ঝালমুড়িওলার থেকে খাই, সে ছেলেটা এক মনে দাদ চুলকাচ্ছে দেখলাম...ওই হাত দিয়েই আবার পিঁয়াজ শশা মেশাবে...থাক গে যাক আমি চা খাই বরং। ও বিশু, একটা খুব কড়া কফি...
-দাদা আজ তো কফি করিনি।

নাহ এ দুনিয়ায় বেঁচে থেকেই বা কি লাভ...উদাস মনে তাই এক ভাঁড় চা আর কাচের বয়ামের সাদা পাতা জড়ানো প্যাটিস,  ভিতরে সুজি আর কিসের যেন পুর দেওয়া, ছোটবেলায় খাওয়া বিলকুল মানা ছিল, সেই জিনিস খাচ্ছি। এক জীবনে থুড়ি এক দিনে আর কিই বা বাকি আছে খারাপ হবার, কাকে ঠুকরে দেবে হয়তো কিংবা কুকুরে তাড়া করবে...করুক গে যাক...

এমন সময়...না কাক বা কুকুর না,  আরো সাংঘাতিক বিপর্যয়! এক সাথে চার জন ম্যানেজারের দল বিশুর দোকানেই চা খেতে এসেছে...এহে আরেকটু আগে দেখলেই বাপীদার দোকানে চলে যেতাম...গাড়িটার পিছনে লুকোবো?  অ্যাঁ কি বললেন? এরকম কেন করছি? আরে এক্ষুনি, ক্লায়েন্ট, ক্লাউড, হাবিজাবি বকতে হবে... এই শোকের দিনে অন্তত না প্লিজ....
"কিরে, কি খবর?"
হয়ে গেল! 

দিনের শেষ আওয়াজ খাওয়াটা বাকি ছিল...হাবিজাবি বকতে বকতে বলে, কিরে বিয়েবাড়ি নেই? 
-না ওই জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে আছে।
- তা তোর বিয়ে হয়ে গেছে?
- না -_- 
- হবে না?

অ্যাঁ এটা একটা কথা? হবে না আবার কি!  তোমার মেয়ের সাথে আলাপ করব হ্যাঁ? 😡

Monday, February 18, 2019

একদিন হঠাৎ

একটা কাজ ছিল আজ। জরুরী খুবই। তা বেরোনোর আগে,শীত ফুরোনোর রবিবারের সকালে পাতলা চাদরে পা ঢুকিয়ে, সব্যর আশ্চর্য ভ্রমন পড়ছিলাম। সান্দাকফুর রাস্তায় হাঁটছে তারা,  জলে ভিজছে, জ্যোৎস্না মাখছে, হাঁটছে হাঁটছে....আমার সব গোলমাল হয়ে গেল। বই নামিয়ে চানে ছুটলাম....চেয়ারে রাখা জামা জিন্স গলিয়ে হনহন করে গ্যারাজে। ততক্ষনে আমি জানি আমার আর ওই জরুরী কাজ করার উপায় নেই, আমায় বেরোতেই হবে। আলতো শীতের এই রোদ উপেক্ষা করে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে আমার রবিবার কাটতে পারবে না।

সাড়ে এগারোটা কোথাও যাওয়ার জন্যে বেশ দেরী। রোদ চড়া,  বেলাও অনেক। কোথায় যাব মাথায় আয়াছে না, মালঞ্চর রাস্তা ধরেই যাই। যদ্দুর যাওয়া যাবে যাব। ডেস্টিনেশন জেনে আর কবেই বা আমার কোন চলাটা হয়েছে। ঠিকাছে, চালাও পান্সি....

এই কিছুদিন আগেই শীতের শুরুতে এসেছিলাম যখন এ রাস্তাটা অন্যরকম ছিল। অনেক কটা গাছেই পাতা নেই আর এখন, পলাশ, সজনে ফুলে ছেয়ে আছে।  সজনে ফুল এক অদ্ভুত কম্বিনেশন দেয়। সাদাটে ফুলগুলো সবুজ গাছে যেন আলো জ্বালিয়ে রাখে। বাঁ পাশে খাল সংস্কার হচ্ছে মনে হয়, পাঁক তুলছে। উহ বেজায় গন্ধ। ডান দিকের জমিগুলোয় সর্ষেফুল আর নেই...ন্যাড়া জমি পড়ে আছে শুয়ে। 

বাবুরহাট বলে একটা জায়গার নাম শুনেছিলাম। দেখা যাক কেমন হয়! ভালো না লাগলে ব্যাক করবো। মীনাখাঁ থেকে বাবুরহাট সাত কিলোমিটা মত। সুতরাং চাপ নাই খারাপ লাগলেও চট করে চলে আসা যাবে ফের। তাছাড়া এমনিতেও জানিনা কোথায় যাব! মেন রাস্তার থেকে সরু খানিক, দুপাশে জমিতে ধান বুনছে।  এসময় ধান কেন? শীতের শেষে এ সময় ধান রুইতে হয় নাকি? আলু উঠে যায় তারপর কি হয় যেন চৈত্রের ফসল? মনে পড়ে না....চাট্টি হাবিজাবি জঞ্জালে মাথা ভরা, নিজের জমির হিসাব নাই....ফসল এর খবর রাখিনা ভাত জুটে যায়! 

স্যালোর জলে চান করছে কটা ছেলে।  দেখে আমারও ভারী সাধ হল অমন করে হুড়ুম হুড়ুম করে চান করবার। এহ একটা গামছাও যদি আনতাম! গাড়িটা সাইড করে আল ধরে ধরে হাঁটছি, ধান জমির মাঝে মাঝে শশা ক্ষেতও আছে। একটা ফিঙে তারে বসে দোল খাচ্ছে। কোথা থেকে উদাসী কোকিলের ডাক ভেসে আসছে একটা।  সব ঋতুর আলাদা আলাদা গন্ধ,  রঙ থাকে। হ্যাঁ আমাদের এই ঘোলাটে আকাশেও থাকে, আমি বুঝতে পারি। মানে শুধু তাপমাত্রা বা ফুল দিয়ে না, সবটা দিয়ে। গরমের দুপুরের রঙটা প্রায় এরকমই হবে খালি ধরো এক্সপোজারটা আরেকটু বেশী হবে, তুলিতে আরেকপোঁচ নির্জনতা আর উদাসী কুবো পাখীর ডাক শোনা যাবে। জমির কাছে এলেই এমন ভালোলাগে আমার। অবশ্য আমার অনেক কিছুতেই ভালো লাগে, আমার নীল আকাশ দেখলে ভালো লাগে, জল দেখলে ভালোলাগে, পাহাড়ে পাইন বনে হেঁটে যেতে ভালো লাগে, রোদ উঠলে ভালো লাগে, চমৎকার গান শুনলে ভালো লাগে, পছন্দের খানা মিললে ভালো লাগে....খারাপ লাগার লিস্টিও কম না যদিও তবে এমন ঝকঝকে দুপুরে খারাপ জিনিস কে মনে রাখে! 

একটা শশা তোলার ইচ্ছে হচ্ছিল খুব। কিন্তু কেউ তো নেই, না বলে ঋকানন্দর নিতে বাধে, আমাদের গ্রামে আমি জমিতে গেলে কেউ না  কেউ এমনিই দিত, "একটা  খা না শশা, ভালো রে"।  কিন্তু 'রাখতে যদি আপন ঘরে বিশ্ব ঘরে পেতাম না ঠাঁই '।   সুতরাং গা ঝেড়ে উঠে পড়া গেল। বাবুর হাটে খান দুই রিসর্ট আছে। একটায় আঁ আঁ আঁ আঁখ মারে হচ্ছে উদ্দাম বেগে  আরেকটায় একটা ছোট পুলে জাঙ্গিয়া পরা একদল মুশকো লোক জলকেলি করছে।  কিছু লোক বিয়ারের বোতল হাতে বসে চিকেন পকোড়া সাঁটাচ্ছে। আমি যেন বুক করব এরকম একটা ভাব নিয়ে মালিকের সাথে কথা টথা বলে চা পেয়ে গেলাম এক কাপ। এমন হুল্লোড়ে  দোষ নেই কিছু তবে আমার এমন হুল্লোড়ে আরাম নাই৷ তাড়াতাড়ি ওখান থেকে বেরিয়ে ফের মীনাখাঁ এসে মালঞ্চ। আর একটু এগোলে একদিকে ধামাখালি, আরেকদিকে বাসন্তি,ক্যানিং ঝড়খালি।  চিকেন পকোড়ার গন্ধে খিদে খিদে পাচ্ছিল। রবিবারের দুপুরে মালঞ্চ বাজার ফাঁকাই। একটা লোক গরম গরম কাঠি ভাজা করছে, পেয়ারা জামরুম নিয়ে বসে একজন। হাবিজাবি মিষ্টির ঠেলা নিয়ে একজন। কাঠিভাজা খেতে খেতে মিষ্টির ঠেলার সামনে গেছি। আজ তো আমার দিন, সারাদিন উল্টোপাল্টা অখাদ্য খাবো।
 " কাকা ওই গোল গোল খাজা গুলো কত করে? একটা দাও তো।" 
আরে হেব্বি খেতে তো। রসে টুপটুপে, পুরীর লম্বাটে খাজাগুলোকে দশ গোল দেবে। জিলিপিও আছে, গুড়কাঠিও আছে, নিকুতি এরা যাকে খেজুর বলছে, আর মালপো। কোনটা খাই? উমম গুড়কাঠিই খাব। 
-কাকা আরেকটা খাজা আর একশো গুড়কাঠি দাও দেখি৷ 

খেতে খেতেই গল্প হয়। তার বাড়ি কোথায় আমার বাড়ি কোথায়। আমার বাড়িতে কে আছে,  এ মিষ্টি কে বানায়....আমার চলার রাস্তায়, গাঁয়ে, হাটে বাজারে পথের আলাপ ছড়িয়ে আছে এমন কত। আগের বার ধামাখালী গেছিলাম, এবার বাসন্তীর দিকে যাই। ক্যানিং গেলে নদী কাছে পাব, ঝড়খালি তো দূর হবে, অন্যদিন আসবো খন, এই ভেবে মাতলা দেখতে চলা শুরু ফের। ক্যানিং এ ব্রিজ হয়ে গেছে, ফেরী নৌকা চলে না,  নদীতে জলও নেই। মন ভরল কই! এক লোক বুদ্ধি দিল, চারটে বাজে, ঝড়খালি চলে যাও, আসতে যেতে দু ঘন্টা লাগবে। 

আসতে যেতে দু ঘন্টা মানে রাত হবে ফিরতে। বুদ্ধিমান লোক হলে কখনোই যেত না। কিন্তু আমার যে চলাতেই আনন্দ, এক্সট্রা চল্লিশ বিয়াল্লিশ কিলোমিটার মানে আশী পঁচাশী কিলোমিটার  তো, টেনে দেব খন। কিন্তু এদিকের রাস্তা তো হাইওয়ে না, আর রাস্তাও বেশ প্যাঁচালো, ফেরার সময় অন্ধকারে তো স্পীড তুলতে পারবো না সেসব খেয়াল করিনি। মাথায় যদি পোকা নড়ে তাহলে আর উপায় কি। সাঁই সাঁই রাস্তা, গোল গোল  টার্ণ, হাপুসহুপুস করে ঝড়খালি পৌঁছলাম যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। এই একটা দৃশ্য কত শতবার দেখেও পুরোনো হয়না। জলের মধ্যে রঙ তুলি ধুয়ে নিয়ে সূর্য বাড়ি ফিরলো আমিও এক কাপ চা খেয়ে আড়মোড়া ভেঙে ফিরতি পথ ধরলাম। ব্যাঘ্রপ্রকল্প দেখা হল না, বন্ধ হয়ে গেছে। অবশ্য দেখবার তাড়া নিয়ে আসিওনি। অনেক লোক সুন্দরবন ঘুরে ফিরছে। আমি আলগোছে একবার বোট ভাড়া কিরকম খোঁজ নিয়ে নিলাম,  বলা যায় না হয়ত কোনদিন শখ হবে রাতে আর না ফিরে থেকেই গেলাম! 

এ রাস্তায় স্ট্রীট লাইট নেই, হুশহাস গাড়ির আলো খালি। বাসন্তী হাইওয়ে উঠে গাড়ির স্পীড বাড়িয়েছি এমন সময় হঠাৎ দেখি চাঁদ উঠে গেছে অনেক্ষন। আজ বুঝি ত্রয়োদশী,  চারদিকে ভেড়ির জল চাঁদের আলোয় চকচক করছে। গাড়ি সাইড করে আলো নিভিয়ে বাইরে এলাম।  আমি জানি এসব অঞ্চল সেফ না মোটেও। খুন, রাহাজানি লেগেই থাকে। কিন্তু এ চারিদিকে আদিগন্ত ভেড়ির মাঝে ফাঁকা রাস্তায় চাঁদের আলোয় সে এমন দৃশ্যপট তৈরী হয়েছে তাকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। সে দৃশ্যের বর্ণনা করতে পারি এমন সাধ্য আমার নেই, এ সৌন্দর্যের আনন্দ প্রকাশ করতে পারি তেমন ভাষাও নেই। চাঁদের আলোর নেশা বড় তীব্র,  যে একবার সেই নেশায় বুঁদ হয়েছে তার আর কিছু নেশা লাগে না, মদ না গাঁজা না,  রাজনীতি না, যশ না কিচ্ছু না। 

ফিরতে ইচ্ছে করে না তবু ফিরতেই হয়। এক বুক চাঁদের আলো নিয়ে ফের চলা শুরু।  সায়েন্স সিটির কাছাকাছি তখন, চারদিক ধোঁয়াশায়, মিটমিটে আলোয় আরেক ছবি তৈরী হয়েছে। মাঠের উপর জমাট ধোঁয়াশা, চারদিক শুনশান।  আরেকবার থামতেই হল। চাঁদের আলোয় ভেড়ির জল একরকম আর এই ধোঁয়াশা মাখা মাঠ আরেকরকম। নিস্তব্ধ ভুতুড়ে। ভুতুড়েই কারন এ তো সত্যিই অতীত।  আর একটু পরেই আলো জ্বলা শহরে ঢুকে যাব,  এ সব অলীক ছবি হয়ে থাকবে খালি। তারপর একদিন ঘোর ভেঙে যাবে,  এই সব আলো, হিসেব নিকেশ আসলে বেকার জিনিস, ওই ধোঁয়াশা মাখা ঝুপ্সি মাঠ, সাদা সাদা ফুলের আলো জ্বলা সজনে গাছ, চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া ভেড়ির জল, টুপ করে ডুবে যাওয়া সূর্য,  ঘেমো কপাল গলার গামছায় মুছে কাগজে মুড়ে দেওয়া খাবার.....এসবই আসলে সত্যি টের পেয়ে আবার বেরিয়ে পড়তে হবে একদিন।


Thursday, February 14, 2019

ব্যাঙ আর প্রজাপতি

ভ্যালেন্টাইন্স ডে বলে মনেও পড়েনা আজকাল, বয়স হয়েছে কিনা৷ তবে ফেসবুক খুললে মনে পড়ে যায়। তা প্রেমের উচ্ছাস করছে অল্পবয়সী ছেলে মেয়ে গুলো মন্দ কি। প্রেমের দিন  উপলক্ষে একটা প্রেমের গল্প হোক নাকি?

গল্পটা আসলে একটা ব্যাঙের আর একটা প্রজাপতির। অসম প্রেম। আজকেই একটা ছবি দেখলাম নেটে, সে দেখেই লেখা।

**********************************************

গাছের ডালে বসেছিল সে চুপটি করে। মন ভালো নেই তার।না হয় সে মোটাসোটা থলথলে, গায়ে বড় বড় আব, না হয় তা গলায় গান খেলেনা, না হয় বদমেজাজী বলেই জানে সবাই তাই বলেই অমন করে বলে দেবে সকলের সামনে? 

আজ এখানে উৎসবের দিন ছিল। এখানে মানে এই চত্বরে। বেশী কেউ থাকে না এখানে, কয়েকঘর  সোনা ব্যাঙ, একটা কোলা ব্যাঙ, কিছু প্রজাপতি, কিছু বট, অশ্বত্থ, পেঁপে, পেয়ারা, একটা পিঁপড়েদের ডেরা,  কিছু মৌমাছি, আর কিছু চড়াই, শালিখ, ফিঙে, দোয়েল, মাছরাঙা। ব্যাস। আগে আরো অনেকে মিলে থাকতো। সেবার আকাশ থেকে জ্বালা ধরা  বৃষ্টি নামলো, কত ঘাস গাছ, প্রাণী মরে গেলো। মানুষ গুলো এসে আরো গাছ কমিয়ে দিল, নোংরা ফেলে ডোবাটা ভরিয়ে ফেলল, ব্যাস যারা ছিল তারাও কমে গেল।  এখন খালি ওরাই আছে। 

সেদিন ওরা এক হয়ে উইকেন্ড পার্টি করছিল। সারা সপ্তাহ কাজ থাকে ওদের সবারই খুব, এই মধু জোগাড় করো কি এই পোকা ধরোরে। উইকেন্ড পার্টি মানে আড্ডা খাওয়া গান বাজনা এই আর কি। টুকটাক মনের কথা বলে কেউ কেউ। এই যেমন দেখোনা,  মিষ্টি হাসি নিয়ে ফিঙেটা কেমন দোয়েলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে গান শুনছে। দুজনের দুজনকে ভালো লেগেছে বোঝাই যায়। এক ভাঁড় মধু নিয়ে ওদের আড্ডা এগোক আমরা বরং চারদিক ঘুরে দেখি। আকাশটা আজ ঝকঝকে নীল।  ওদের এই জমায়েতটা সকালেই হয়ে থাকে৷ অশ্বত্থ একটা ডাল নাড়িয়ে তাল দিচ্ছে।  মাথা নেড়ে গান গাইছে পেঁপে গাছটা। চারদিকে খুশী খুশী হাওয়া। 

ভাবছ বুঝি তাহলে প্রথমে কার কথা দিয়ে শুরু করেছি? সে কথায় আসছি। তাড়ার কি? ছুটির দিন, দিব্যি আরাম আরাম গন্ধ চারদিকে। কোনের বাড়ির সোনালী ব্যাঙ পরিবারের একটা মেয়ে আছে। ভারী সুন্দর গানের গলা, দেখতেও তেমনই মিষ্টি। আর নামটাও ভারী  চমৎকার, টুরিং। কিন্তু হলে কি হয় সে মেয়ে বড়ই খামখেয়ালী,  এই ভালো মনে আছে তো তোমায় নিয়ে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে গেলো এই মেজাজ খারাপ তো তোমায় ধাক্কা দিয়ে জলে ফেলে দিল। 

বলছিলাম না ও পাড়ায় এক মাত্র একটা কোলা ব্যাং থাকে? তাকে দেখতে যেমন খারাপ, মেজাজও তার তেমন খারাপ আর নামটা? সেও ততটাই খারাপ, অন্তত তার তো তাই মনে হয়। কালো কোলা থপথপে আবওয়ালা সেই ব্যাং এর নাম  বুরুৎ। শুরুতে এই বুরুৎ এর কথাই বলছিলাম। 

কোনো একদিন এরকম  একআনন্দ খুশীর দিনেই টুরিং কে দেখে মন মজে যায় বুরুৎ এর। টুরিং তখন একটা কচুপাতায় চড়ে দোল খাচ্ছিল আর গান গাইছিল। সেই গানের সুরে হাওয়ায়,  পুকুরের জলে আর বুরুৎ এর মনে লেগেছিল কাঁপন। বুরুৎ  গুটি গুটি এগিয়ে গেছিল গানের দিকে। তারপর? তারপর আবার কি যেমন হয়, টুরিং আর বুরুৎকে প্রায়ই এদিক সেদিক একসাথে দেখা যায়। পাতার প্লেটে পোকা রেখে দুজন দুদিক থেকে খায়, টুরিং গান পাঠায় বুরুৎ শোনে। বুরুৎ চিঠি লেখে গাছের ছালে, টুরিং লজ্জা পায়। বুড়ো বট খুশী হয়ে হয়ে ঘাড় নাড়ে। 

সব ঠিক চলতে চলতেই হঠাৎ করে বাধলো গোলমাল। কাটা গেলো আরো একটা বট, মারা পড়লো আরো অনেক কটা পাখি, পোকাদের চলাফেরার জায়গা গেল কমে। ফলে ওদের পাড়ায় এলো খাবারের কষ্ট। কাজ নেই, সারাদিন বসে বসে একটা পোকাও মেলেনা, সাপ্তাহিক আড্ডা তেমন জমে না আর। কজনই বা আছে পড়ে।  অসময়ে ভালোবাসা টিকতে গেলে যে জোর লাগে তা মনে হয় ছিল না বুরুৎ আর টুরিং এর গল্পে। ফলে হল কি, পোকা না পেয়ে পেয়ে দুজনেই বিরক্ত হয়ে গলা ফুলিয়ে ফুলিয়ে খালি ঝগড়া করে গেল। করতে করতে বিরক্ত হয়ে একদিন দুজনেই অন্য জায়গায় চলে গেল পোকার খোঁজে। 

তারপর অনেক শীত বসন্ত বর্ষা  পার হয়ে ক্রমে ক্রমে জায়গাটায় একটা দুটো নতুন গাছ দেখা গেল, একদুটো নতুন পোকার দেখা মিলল, নতুন দু চারটে পাখিও দেখা গেল, দেখা গেল নতুন নতুন ব্যাঙাচি, ডোবায় নতুন পদ্মফুল, তাতে পদ্মমধু। আবার এক দুই করে মৌমাছি, বোলতা, প্রজাপতি স, মাছরাঙারা আড্ডা জমাতে শুরু করলো। মেজাজ ভালো হল টুরিং এর। মজলিশে এলো সোনালী ব্যাঙেদের পরিবার। খালি সবাই ভুলে গেলো বুরুৎ এর কথা। বুরুৎকে তো আলাদা করে মনে রাখারও কিছু নেই কারন বুরুৎ তো কিছুই পারে না তেমন, না পারে গাইতে না পারে বাজাতে বা পারে মজলিশ জমিয়ে তুলতে। তাছাড়া ও পাড়ায় কোলাব্যাঙ আর একটাও ছিল না, তাই মনেও পড়েনি কারো।

বুরুৎ তো এমনিতেই বদমেজাজী।  তার মেজাজ গেল আরও খারাপ হয়ে। মন খারাপটা রাগে বদলে গিয়ে চেঁচামেচি করতে লাগল ওখানে গিয়ে৷ চারদিকে কেউ কেউ বলল, ওরে থাম থাম, ভুলে গেছি তো কি হয়েছে। এখানে তো আমরা সবাই বন্ধু চলে আয় তো। তাতেও বুরুৎ এর মেজাজ ঠিক হয়না। টুরিং এর কাছে গিয়ে সে বলল, "তুমি তো আমায় ডাকতে পারতে?"
টুরিং তার সোনালী রঙের থ্যাবড়া নাকের ফুটোটা বাঁকিয়ে বলল, উফ ফের তুমি! তোমায় কত খারাপ দেখতে তুমি জানো? তুমি কেমন বদ্মেজাজি জানো? তাছাড়া তোমার কোনো নিজের ছাতাও নেই তবে তোমায় আমি ডাকবো কেন? 
বুরুৎ এর রাগটা মন খারাপে ফিরে গেছে তখন। মুখটা নামিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, "তবে আগে ডাকতে কেন?" 
-অত বলতে পারিনে বাপু। তুমি এখন যাও দেখি,  এদিকে মজলিশ ভণ্ডুল হবে আমার তোমার জন্যে। ওই দেখো মাছরাঙা কেমন ম্যাজিক দেখাচ্ছে।

তারপরেই বুরুৎ গাছের ডালে বসেছিল মন খারাপ করে। তা সত্যি বলতে মন খারাপ হয়েছে ঠিকই কিন্তু ভুলও তো কিছু বলেনি। তোমারই বা অমন হুড়মুড় করার কি ছিল। ভুলে গেছে ডাকতে যখন মনে করিয়ে দাও।  এ তো আর মানুষ না তুমি যে ডাকতে ভুলে গেছে বলে সে নিয়ে দক্ষযজ্ঞ করবে!  তাও এমন আনন্দের দিনে কেউ একজনেও মন খারাপ করলে খারাপ লাগে বৈকি। হোক না সে বদমেজাজি৷ 

মন খারাপ করে বসে ছিল বলেই বুরুৎ খেয়াল করেনি একটা পোকা তার নাকের ফুটোর মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেল। হঠাৎ চমক ভাঙলো, খিলখিল করে একটা হাসি শুনে। কে হাসে? 
একটা হলুদ শাড়ি পরা প্রজাপতি। 
বুরুৎ হেঁড়ে গলায় হাঁক দিয়ে বলল, "এইয়ো কী ব্যাপার? হাসছ কেন?"

-হাসবোনা? ব্যাঙের নাকের ভিতর দিয়ে পোকা ঘুরে চলে যায় আর ব্যাঙ ছেতরে পড়ে থাকে এ দৃশ্য দেখেও হাসবোনা? খ্যা খ্যা খ্যা।

-অ্যাই মেয়ে ফের? দেবো থাবা মেরে বুঝবে। নেহাৎ আমার মন ভালো নেই তাই নাহলে না...

- না হলে কি? সত্যি মারতে? বাচ্ছা মেয়েকে মারবে বলে ভয় দেখাও, কেমন বীরব্যাঙ বোঝাই যাচ্ছে!

- বাচ্ছা! কে তুমি? তুমি হলে ধানী লংকা একটা। যাওনা যাও ওদিকে তো মজলিশ হচ্ছে, এখানে কেন।

- সে আমি যেখানে খুশীই যেতে পারি। কিন্তু তুমি এমন ছ্যাতরাব্যাতরা হয়ে শুয়ে কেন?

- এমনি।

-বেশ তাহলে এমনি এমনি চলো দেখি মজলিশে। 

-না না আমি যাব না৷ তুমি যাও।

- কেন তোমার পেট খারাপ হয়েছে বুঝি?

- সে আবার কি! পেট খারাপ হবে কেন। আশ্চর্য মেয়ে তো!

- তুমিও কম আশ্চর্য নাকি! আমায় তো কই বললে না এই হলুদ শাড়ি পরে আমায় কেমন লাগছে? মা এর থেকে চেয়ে নিয়ে পরেছি।

- আজব তো! আমি বলতে যাবই বা কেন! তোমার ইচ্ছে হয়েছে পরেছ, যাও মজলিশে অনেকে কম্পলিমেন্ট দেবে।

ও কি মন খারাপ করে বসে পড়লে কেন!

- আমায় নিশ্চয়ই বাজে লাগছে। 

- না না খুবই মিষ্টি লাগছে তো!

- সে তো এখন আমায় ভোলাতে বলছ। না হলে এতক্ষন তো খারাপ বলছিলে।

- খারাপ আবার কখন বললাম। উফফ মেয়েটা পাগল করে দেবে তো। আমি মরছি আমার জ্বালায়! 

হলুদ শাড়ি পরা প্রজাপতিটা দৌড়ে গিয়ে ব্যাঙের কাছে গিয়ে বলল, "কই দেখি দেখি, কোথায়, দাঁড়াও আমার কাছে ভালো একটা ফুলের রেনু আছে লাগালেই সেরে যাবে। "

- আরে কী আশ্চর্য!  সত্যিকারের পোড় নাকি! এ অন্য পোড়া, তুমি বুঝবে না।

- বোঝাও।

- না। 

- না বোঝালে তোমার নাকে কিন্তু পরাগ গুঁজে দেব।

- আহ মহা ঝামেলা তো! সে অনেক বড় গল্প।

- হ্যাঁ আমি কি ছোট করতে বলেছি নাকি। তুমি যা ক্যাবলা নির্ঘাত তাহলে ঘেঁটে ফেলবে সব।

- কী আমি ক্যাবলা! যাও আমি কিছুই বলব না আর।

- আচ্ছা আচ্ছা  রাগ করেনা.....

.......কথায় কথায় রাত নামে কখন।  বাড়ি ফিরতে দেরী হয়ে যায় তাদের। পরদিন সকালে বুরুৎ দেখে তার মন খারাপটা চলে গেছে, বুকের মধ্যে কেমন যেন উচাটন ভাব। এই যাঃ কাল তো মেয়েটার নাম জানা হয়নি তবে? আর কি দেখা হবে না? দুরুদুরু বুকে ব্যাঙ চলে যায় কালকের সেই গাছের ডালে। কই কেউ নেই। বেলা গড়ায়, মৌমাছির গুনগুন,  পাখিদের হুল্লোড় সব শোনা যায়, কিন্তু সেই হলুদ শাড়ি পরা প্রজাপতি কোথায়? দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে, বুরুৎ কিছুই খায়নি সারক্ষন।  পেটের মধ্যে গুড়্গুড় আওয়াজ হচ্ছে।  মনের মধ্যে একশো মন ভারী বস্তা যেন! এমন সময় কানের মধ্যে কে যেন সুড়সুড়ি দিল।

"কে রে?" 

তাকিয়ে দেখে কালকের সেই মেয়েটা। আজকে একটা সোনালী আর সবুজ বুটিদার শাড়ি পরেছে।  দেখেই তো বুরুৎ এর উলটানো জিভ সোজা হয়ে যায় প্রায়! 

-এতক্ষণ আসোনি যে?

- বা রে তুমি তো বলোনি আমার জন্যে অপেক্ষা করবে। আমি তো এমনিই এলাম।

- না বললে জানতে নেই? 

- না নেই।তোমার নাম কি?

-বুরুৎ। তোমার?

- পুপাকি। তোমার নামটা ভারী মিষ্টি। তুমিও ভারী ভালো।

বুরুৎ তো অবাক। ওকে আবার ভালো বলছে! ওর নামটা ভালো বলছে! এ কেমন মেয়ে। আচ্ছা পাগলি তো। 

বুরুৎ হঠাৎ বলে, " একটা কথা বলব "?

-হুঁ।

-আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম সেই সকাল থেকে...কালকে পরশু রোজ রোজ অপেক্ষা করবো...

- হিহিহি। তাহলে কাজ করবে কখন?

- তাহলে তুমি আমার সাথে চলো। অপেক্ষা না করিয়ে।

- চিনিনা জানিনা যাব কেন? কোথায় রাখবে আমায়?

- উমম...চিনে না হয় নেবে। আর আপাতত এই যে মাথায় বসো আরাম করে আমি তাহলে গল্প করতে করতে চলে যাওয়া যাবে। 

-কোথায় যাবে?

-চলোই না,  যদ্দুর যাওয়া যায় একসাথে।

.....তারপর দেখা যায় কালো থপথপে ব্যাঙ মুখে হাজার ওয়াটের আলো জ্বালিয়ে মাথায় করে একটা প্রজাপতি নিয়ে পথ চলেছে।

Saturday, February 9, 2019

সরস্বতী পুজোয়

"আরে আমি তো দু বছর দুবাইতে বিল্ডিং এর কাজ করেছি। তারপর এই খানে। "
- ফিরলে কেন? এখানে মাইনে তো আর দুবাই এর মতো হবে না।
- মাইনে বাড়াচ্ছিলো না, তারপর আরো সমস্যা...

পাড়ার ওষুধের দোকানের ছেলেটার সাথে কথা হচ্ছিল। হাসীখুশী ছেলেটা আমায় ব্যথা না দিয়ে ইঞ্জেকশন দিয়ে দেয়। আজ দোকান ফাঁকা গল্প করছিলাম তাই। গল্প করতে করতেই খেয়াল করছিলাম, ছেলেটা যা কথাই বলছে তাতে কিন্তু অভিযোগ নেই, হতাশা নেই। দিব্যি হাসিমুখে বলছিল তার ঠিকাদার কেমন নিয়ে গেছিলো এক কাজে লাগিয়েছিল অন্য কাজে, পাসপোর্ট জমা রেখে দিয়েছিল কিনা তাই সুযোগ থাকতেও অন্য জায়গায় চাকরি করা হল না। বোকা সোকা মানুষ বোঝাই যায়। পাসপোর্ট জমা রাখাটাই তো ঠিক না, কে বলবে! কত শত শ্রমিক ওই ভাবে বন্ডেড লেবার হয়ে কাজ করে৷ আর এই হাসিমুখে, তুড়ি মেরে সব, বাঁচাটাই এদের মূলধন হয়ত, না হলে এমন ঝকঝকে হাসিমুখে বাঁচে কেমন করে? কেমন করে দু হাজার টাকায় নিজের খরচা চালিয়ে সব বাড়িতে পাঠিয়েও ফের সে জায়গায় যেতে চায়!

"এখানে মাইনে কম পাই, জমে না কিছু, তাই ভাবছিলাম আবার চলে যাব কিনা। এখানে থাকলে মেয়েটাকে দেখতে পাই রোজ, এটাতেই সব মেকাপ হয়ে যায় বুঝলে। ওখানে থাকতে তো মেয়েকে দেখতেই পাইনি দু বচ্ছর। "

কার সুখ যে কিসে লুকিয়ে থাকে। ছেলেটার দোলাচল বুঝি৷ টাকার টান, অপত্যের টান.....এ দড়ি টানাটানি সব জায়গায়তেই ভায়া। মুখে বলি, হ্যাঁ হ্যাঁ দেখো যেখানে ভালো লাগবে। তার বেশী বলার অধিকার তো আমার নেই। আমি ওর জীবন জানিনা, ওর ভালো থাকা খারাপ থাকা জানিনা, ওর সুখ অসুখ না বুঝে পরামর্শ দেবার আমি কে!

সুখের মতই সত্যি জিনিসটাও বড়ই গোলমেলে৷ ধরা যাক বিদেশী কেউ, যে কোলকাতাকে বোঝেইনি, বলল, কোলকাতায় কোনো সুস্থ মানুষ বাস করে নাকি! এতো ধোঁয়া, অসভ্যতা, কাজ নেই, পরিষ্কার জল নেই, গিজগিজে মানুষ.... এখানে যারা থাকে তারা সবাই খুব খারাপ থাকতে বাধ্য। কথাটা খানিক ঠিক কিন্তু খানিক ভুল। এতো লোক খারাপ থাকলে এমন ঝকঝকে হাসতে পারে?

তার থেকেই সাইকেল নিয়ে মিষ্টি কিনতে যাচ্ছি। কতদিন পর সাইকেল চড়লাম, লগবগ করতে করতে প্যাডেল ঘোরাচ্ছি। এ সাইকেলে আবার বেল নেই, ও কাকা সাইড করে সাইড করে....লগবগ করতে করতেই ব্যালেন্স হয়ে যায়। জ্যাম কাটিয়ে একটা গলিতে ঢুকলাম, অনেএএক দিন আগে কিশোরবেলায় ঘুরতাম এ গলিতে, লুকিয়ে সিগারেট খাবার জন্যে। একবার উত্তেজনায় পিছনের পকেটে রেখে দিয়েই টিউশন ক্লাসে চলে গেছিলাম। কেমিস্ট্রি টিউশন ছিলো মাটিতে বসে, এক টাকাটা পঁচিশ পয়সার ফ্লেক দুমড়ে যাওয়ায় সেকিইই দুঃখ।

এখন এ গলিটা বদলে গেছে, বিস্তর ফ্ল্যাট উঠে গেছে। তাও এখানে বাতাস এখনো একটু পাতলা...একটু ভীতু। 
সরস্বতী পুজোয় রাস্তা জুড়ে জ্যান্ত সরস্বতী ঘুরে বেড়াচ্ছে। কালো শাড়ী পরা এক সরস্বতী ফোনের ওপারে বিশেষ কাউকে বলছে, "গাধাটা, মা এর গলা আমার গলা চিনিস না! "

কাকে হেগে একেবারে যাতা করেছে গাড়িটায়। কন্সটিপেশনের রুগী কাক। শক্ত ইঁট হয়ে গেছে। ভেজা লাল কাপড় দিয়ে ঘষছি, গাড়িটাকে বিড়বিড় করে বলছি, "আমি নিজেও তো খানিক গোছানো খানিক অগোছালো বল, মানিয়ে গুছিয়ে নে একটু। দুবছর এর উপর ঘর করছিস, না হয় কদিন পরিষ্কার করিনি অমন উদাস হয়ে যাবার কি! তাই জন্যেই তো কাল কাপড় বাঁধা ডাকাতনী তোকে আঁচড় কেটে বেড়িয়ে গেল। দুঃখ হয় তো বল?"

"ও ভাই, আমার গাড়িটা ধুয়ে দিবি? কত নিবি?"

আমার উস্কো খুস্কো চুল, বিড়বিড় বকা, গাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে ছাদ সাফ করা দেখে আমায় গাড়ি ধোয়ার ছেলেটা ভেবেছে নির্ঘাত! এহ ডিমোশন হলো। আগে মোটর মেকানিক ভাবত। অবশ্য দোষ দেওয়া যায়না। কারন আমায় দেখতে অমনই লাগে....কিন্তু দুঃখ তাতে না, দুঃখ হল পাশ দিয়ে তখনই একটা বেশ মানে বেশ ভালো আর কি, তরুণী যাচ্ছিলেন, যাকে আমি গাড়ি ধোয়ার ফাঁকে একটু ওই আর কি যাকে বলে তাকাচ্ছিলাম। কে যাচ্ছে না যাচ্ছে খোঁজ রাখা দরকার কিনা!

সবই মায়া হে...যাক যা গেছে তা যাক। বিকেলে আজ রাস্তা ফাঁকাই। সরস্বতী পুজো আজ না কাল? যেদিনই হোক আজ দিনটা সব মিলিয়ে মন্দ না, ওই যে একটা গাছে পলাশ ধরেছে, একজন সার্জেন্ট হাত দেখিয়ে গাড়ির স্রোত থামিয়ে দুটো বাচ্ছাকে রাস্তা পার করে দিচ্ছে, একটা পাঞ্জাবী পরা আর একটা হলুদ শাড়ি পরা। এইসব সুখ গুলো লুকিয়ে থাকে বলেই আমার এই শহর ছেড়ে পালানো হয়না, ওই ওষুধ দোকানে ছেলেটার মত যে ঠিকাদারের বন্ডেড লেবার হয়ে বেশী মাইনের চাকরির মায়া কাটিয়ে রয়ে যায়, মেয়েটাকে বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুমোতে যাবে বলে।

Wednesday, January 2, 2019

নতুন বছরের প্রথম দিনে

বচ্ছরকার প্রথম দিন বলে আপিস ফাঁকা। অফিসের গলিটায় রাস্তার কাজ চলছে, একটা তাঁবুতে ছোট ছানা ঘুমোচ্ছে, মাথায় গামছা বেঁধে পিচ ঢালছে একজন, আর ঝাঁটপাট দিয়ে সাফ করছে একজন। বিশুর দোকানে ভীড় নেই তেমন আজ, স্যান্ডউইচওয়ালাও ফাঁকাই বসে। চারদিক ছুটি ছুটি আবহাওয়া।

আপিসে আজ একটা গোটা টেবিল নিয়ে আরাম করে লাঞ্চ করতে পেয়েছি। সল্টলেকের কয়েকটা বাড়িতে নতুন বছর আসেনি মনে হয়। রোজ যে বুড়োটাকে দেখি, বারান্দায় বসে উদাস চোখে রাস্তা দেখে, আজও তেমনই বসে। মন্দিরের সামনে লম্বা লাইন পড়েছে। চিকেন চাপ এর দোকানদার এক মনে ঝোলটা নেড়ে দিচ্ছে।(চাঁব লিখেও মুছে দিলাম, নিজেই সইতে পারছিলাম না। ওদিকে মুছে কথাটা লিখে ভাবছি আগামী দিনে লিখেও কেটে দিলাম কথাটা রিপ্লেস হয়ে যাবে, অবসোলেট টেকনোলজি)।

আমার পুরোনো ম্যানেজার ফোন করেছিল খানিক আগে। নিউ ইয়ার উইশ এর ছলে জানালো, নিজের হাইটাইম কেরিয়ারে মন না দিয়ে, অনসাইট অপারচুনিটি ছেড়ে খুবই ভুল করছি। আমি খালি আমার দিক থেকে হ্যাঁ বললেই ইবি ওয়ানে গ্রিন কার্ড এর ইনিশিয়েশন সে দেখে নেবে।
যে রাস্তা নিজের ইচ্ছেয় ছেড়ে এসেছি তা নিয়ে আপশোষ আমার হয়না , তাও উন্নতির গল্প শুনে টলে গেল নাকি ঋকানন্দ? 'হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিকই বলেছ। আমি দেখছি। তা অমুকদা আজ কি করলে বলো নিউ ইয়ারে?' 
'ঘরে একটা পেঁপে ছিলো, তাই বানালাম। আর আমার তো অ্যাবসোলুট আছেই। আবার কি!' 
মনে মনে এক পাক ঘুরে বললাম, কাকা, মা আজ কড়াইশুঁটির কচুরি করেছে! মুখে অবশ্য বললাম, আরে জিও, আর কি চাই! ভদ্রলোক একা থাকেন অনেকবছর, বউ এখানে, বচ্ছরকার দিনে মনে কষ্ট দিয়ে কি লাভ!

আমার গাড়িতে হস্তশিল্প মেলা থেকে কেনা একতারাটা রয়ে গেছিল, গ্যারাজ থেকে বাড়ি অব্দি বাজাতে বাজাতে ফিরছি। একটা ছেলে, ফর্মাল পরে, গায়ে চেন খোলা জ্যাকেট, পিঠে ব্যাগ, হাতে একতারা নিয়ে বেসুরে বং বং করে বাজাতে বাজাতে রাস্তা দিয়ে চলেছে এ দৃশ্য সচরাচর দেখা যায়না। মহিলারা ভ্রু কুঁচকে, অল্পবয়সী মেয়েরা 'ক্রেজি!' চোখে, প্রৌঢ়রা বিরক্ত নিয়ে, আর ছোট ছেলেটা ঈর্ষান্বিত চোখে তাকিয়ে দেখছিল।

আমার একতারায় সুর লাগবে কিনা জানিনা, এরকম আধ ছটাক কর্পোরেট হয়েই কাটবে বছরটা এটাই বোধহয় জানান দিয়ে শুরু করলো...তাই হোক....

শুভ নববর্ষ।

Tuesday, December 25, 2018

এদিক সেদিক

বারবিকিউতে পয়সা তোলার জন্য মনের জোরে পেটকে বস্তার মত করে গিলেছি। ভিখিরিপনা বলতে পারেন, কিন্তু মহারাজদের ওইরকমই নিয়ম। মাঝে এলিয়ে পড়েছিলাম, নাভিশ্বাস উঠে গেছে ভেবে ওয়েটাররা সাবান জল এনেদিল, আহা হাত ধোবার জন্য না, খেয়ে বমি করার জন্য। তা বমি করে খেলেও হয় ভাবতে ভাবতেই আরো খানিক খেয়ে নিয়েছি। পাশের টেবিলে লোক বদল হল, আমি আর উঠিনা...শেষে কিরকম কড়া চোখে দেখতে লাগলো যখন আমায় ওয়েটাররা, আর আমারও ভুঁড়ি যখন থুতনি বেয়ে এসে টেবিলে পড়ব পড়ব হলো আমিও উঠে পড়লাম।

যাই হোক এত খেয়ে কোনোরকমে গড়িয়ে গড়িয়ে নিয়ারেস্ট কোথায় বিনা পয়সায় গা এলানো যায় দেখলাম। তা ময়দানটাই বেস্ট এ আর বলার কি! কিন্তু ময়দানে ঢোকার আগে দেখি একটা দরজা হাফ খোলা, বড়লোকদের বাগানওলা বাড়ির মত। আমি ভুঁড়ি নিয়ে ঢুকবো কিনা ভাবছি, আটকে গেলে টানাটানিতে লাগবে খুব। দোনোমনা করে ঢুকিই গেলুম। আরিব্বাপ্রে একটা সাজানো গোছানো পার্ক তো! মাঠে ঘুমোলে মেরে তাড়াবে নাকি?

এখানে লোকে প্রেম করতে আসে। একা শুলে মারবে এমন না নিশ্চয়ই? ভারী নিঃঝুম দুপুর এখন চারদিক। শীতের হাওয়ার টান আছে শীত নেই। আলতো রোদে পাঁচিলের ঘুপচিতে একটা কুকুর ঘুমুচ্ছে দিব্যি আরামে। ওইদিকে কতকগুলো মালী বাগান সাজাচ্ছে। নানান দিকে নানান রকম প্রেম, ওই যে কোলেকোলে প্রেম, মানে প্রেমিকাকে কোলে তুলে নিয়েছে আর কি। আর ওই যে দন্ডায়মান হয়ে গাছে ঠেস দিয়ে, স্ট্যান্ডিং প্রেম...আচ্ছা এদের পায়ে ব্যথা করে না?

সিপাহি আগে....ফরোয়ার্ড মার্চ... মানে মুখোমুখি ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়ে ফরোয়ার্ড ব্লক আর পিছন্দিকে হেলে গেছে দুজনেই, ব্যাকোয়ার্ড স্ট্রেচ....প্রেম করলে ব্যয়াম জানা জরুরি দেখছি রীতিমতো!

নানারকম দেখতে দেখতে ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। মালী এসে তাড়া দিলো, হেই ওঠো ওঠো, এটা ঘুমাবার জায়গা নাকি! লেহ্! যাকগে এমনিতেও বেলা পড়ে গেছে এরপর ঘুমোলে কানে ঠান্ডা ঢুকে যাবে। ফের রাস্তায়, হরেক কিসিমের মানুষ দিয়ে কোলকাতার বিকেলবেলা ঠাসা। একটা ট্যাক্সিওয়ালা উদাস মুখে বসে আছে। আচ্ছা অ্যাম্বাসেডর এর ডিকিতে কি নির্লিপ্ত বস্তা থাকে? সব ট্যাক্সিওয়ালা গুলোই কেমন সন্ন্যাসী ভাব নিয়ে বসে থাকে, কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই!

ঘুরতে ঘুরতে শহরে অন্যদিকটা চলে এসেছি। এখানটা ঠিক শহর না, শহরতলি। অন্ধকার নেমে আসতে ঠান্ডাও নেমে এসেছে খানিক এদিকটায়। ধোঁয়াশা আর অন্ধকারের আলোয়ান গায়ে মেখে চায়ের দোকানে দিব্যি আড্ডা বসেছে। 
"নারদ কে ছিলো জানো?"
- তুমি বলো না? 
- আগে বলো জানো কিনা। কই রে নবা, চা টা কই....

ওদিকে সব্জির বাজার জমে উঠেছে," মটরশুঁটি সত্তর টাকা? কদিন হয়নে রে তোর?"

সবজি বাজার পার করলে বুড়োটে মিষ্টির দোকান, দানাদার, রসগোল্লা আর পান্তুয়ার গামলা নিয়ে টিমটিম করে দাঁড়িয়ে। দোকানের মানানসই ভাঙা বেঞ্চ, ঘোলাটে চশমা পরা বুড়ো। পাশেই তেলেভাজার দোকান জমজমাট। দুটো বউ খুব করে ধনেপাতার বড়া ভাজছে। লোকটা হাতে হাতে চা দিচ্ছে।

রাত নামছে,কুয়াশায় মাখামাখি হিম লাগা রাত। আচ্ছা এই রকম রাতে কোলকাতার রাস্তায় পার্কে গাছেদের যে মিটিং বসে তাতে মিটিং মিনিটস বানাতে হয়? এক দুটো গাড়ি চলে যাবার আগের মুহুর্তে যে রসিকতা হয়েছিলো, গাড়ি যাবার সময় মিউট করে রেখে ফের চালু হয়?

গাছগুলো যেন বুঝতে পারে আমার বক্তব্য, মিচকি হাসলো কি?পা চালাই....

Monday, December 24, 2018

মাধুকরী

একপাশে ছোট ছোট বাড়ির মাথা দিয়ে দেখা যাচ্ছে খোপ খোপ আল দিয়ে আলাদা করা মাঠ, জায়গায় জায়গায় ধান কাটা হয়ে গেছে, আর একদিকে কাদা মাটির চড় নিয়ে বয়ে চলা রায়মঙ্গল। তার বুকে একটা দুটো নৌকা কখনো কখনো।

এরকম একটা জায়গার ছবিই দেখছিলাম কবে যেন, কোন সময় জানিনা কিন্তু এই নদীর ধার এই গ্রামের ধারের রাস্তা, এই আলসে দুপুরে ছোট পুকুরে জাল টানার শব্দ এ আমি চিনি, প্রিমনিশন কিনা জানিনা কিন্তু আমাকে এখানে আসতেই হত। রবিবারের শীতের মেঘলা দিন, হিসেব কষা লোকের জন্য আদর্শ ল্যাদ রবিবার। বাজার করা স্কিপ করে দাও, খিচুড়ি খাও শীতের ফুলকপি দিয়ে আর গায়ে কম্বল চাপিয়ে একঘুম। কিন্তু ঋকানন্দের যে ঘরে সয় না, বুকের মধ্যে ছটফট নদীর সাথে থাকতেই হবে, বেরোতেই হবে। তাই এই বেরিয়ে পড়া। কোথায় যাচ্ছি সঠিক জেনে বেরোইনি, সায়েন্স সিটির পাশের রাস্তা ধরে টাকি থেকে ফিরেছিলাম যেদিন সেদিনই ঠিক করেছিলাম, ওই গাছ পালা ছাওয়া চমৎকার রাস্তাটা ধরে আরো অনেক খানি আমায় যেতে হবে। নদীর কাছে।

রাস্তাটা সত্যিই বড় ভালো, মসৃন পিচ, দুইধারে গাছের পাঁচিল। একদিক দিয়ে একটা খাল বইছে, খালের ওদিকে কলাবাগান। এগোতে এগোতে ক্রমে রাস্তার দুধার বদলায়। ফুলকপি, সর্ষেবোনা চাষের ক্ষেত, পেরিয়ে এখন খালি ভেড়ির জল। একটা লোক সাদা পাউডার এর মত কী যেন ছড়াচ্ছে জলে। ওদিকের ভেড়িতে একটা লোক নৌকা ঠেলছে নিজে জলে দাঁড়িয়ে। আমার এইরকম হুটহাট বেরোনোয় গন্তব্যর থেকে রাস্তা জরুরী থাকে। এই বিস্তীর্ণ আকাশ, বিস্তীর্ণ জলাভূমির মাঝখান দিয়ে কালো চকচকে রাস্তা ধরে ছুটে চলায় যেমন আনন্দ হয়, তেমনই হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়তেই যেন আনন্দ। আমার তো সব সময়েই তাই। ছুটতে ছুটতে ছুটতে যখন ফিনিশিং লাইনের মুখে আমার আর খেলতে ভালোলাগেনা, ইচ্ছে করে আমার স্বপ্নের সেই জায়গাটা, একটা বটগাছের কোলে, নদীর ধারে আমার আস্তানায় বসে থাকবো। জানি ও আমার সইবে না বেশীক্ষন। নিস্তরঙ্গ একটানা জীবন ভালোলাগলে রবিবারের সকালে রাস্তায় থাকতাম না।

কোথা থেকে কোথায় চলে গেছি। আসলে এ সেই অর্থে ভ্রমণ কাহিনী তো না। চলার গল্প। বাইরে বেশ ঠান্ডা আছে। কোলকাতা ফেলে এসেছি বোঝা যায়। রাস্তায় নানান রকম ফেস্টুন টাঙানো আছে। কেউ একজন জনপ্রতিনিধি আসবেন, তার জন্যে। নানান রকম অঞ্চল থেকে নানান রকম লোক তাকে স্বাগত জানায়;আড়ি পদবীর একজন, কাইজার নামের একজন। আচ্ছা কাইজার কী জানে তার নামের মানে? আর আড়ি বেশ ছোটবেলায় বলত, আমি আড়ি আর তার বান্ধবী বলত আমি ভাব?

এ জায়গার নাম গুলোও বেশ। ঘুষাঘাটা। কবে কারা ঘুষোঘুষি করেছিল কে জানে! মীনাখাঁ। নেমে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে মীনা খাঁ কে ছিলেন? কী করতেন? সামনে একটা মোটর ভ্যানে এক মিঁয়া চলেছেন তার কালো কাপড়ে মোড়া বিবিকে নিয়ে। ভারী যত্ন করে মাঝে মাঝে কাপড়ের তলা থেকে খাবার নিয়ে বাচ্ছাকে আর বাচ্ছার বাপকে কি যেন দিচ্ছে। আমি পাশ কাটিয়ে যাই। এলাহী মালিক লেখা বাসকে পিছনে ফেলে।

পথের সাথী বলে সরাইখানা টাইপ হয়েছে আজকাল। হিসি করতে গেছি সেখানে, দেখি থাকার জন্য বিস্তারিত নির্দেশিকা। " আমরা ভদ্র দম্পতিদের থাকতে দিই" থেকে "ম্যারেজ সার্টিফিকেট থাকা জরুরী", " একলা মহিলার প্রতি শালীন ব্যবহার করবেন"। বাপ্রে সরাইখানা না নীতিশাস্ত্রমালা। ওখানে যিনি পয়সা নিচ্ছিলেন, সেই দিদিকে জিজ্ঞেস করলাম নদী কোথায়? ধামাখালিতে? 
- হ্যাঁ। কেন? নদী খুঁজছ কেন?
- এমনিই...নদী দেখবো।
- ও। আসলে অনেকে মনে দুঃখ নিয়ে নদীতে যায়,তাই, খুঁজছ কেন জানতে চাইছি।

বোঝো! আবার! আচ্ছা আমায় দেখলে কি সুইসাইডাল মনে হয়? নাকি একা একা ঘুরে বেরাই বলেই? যাকগে। তাকে আস্বস্ত করে বেরোলাম ফের। ধামাখালীর আগে রাস্তা এখনো তৈরী হচ্ছে৷ রাস্তা বানানো দেখতেও আমার ভারী ভাল্লাগে। কিন্তু এখন তো নদী দেখবো আগে। 
ধামাখালী জায়গাটা ছোট্ট গঞ্জ মতন জায়গা। গঞ্জ শব্দটা এখন আর ব্যবহার হয়না। কিন্তু ছোটবেলা থেকে বইতে যত গঞ্জ পড়ে যেমন কল্পনা করেছি এটা তেমন জায়গা। বাস গুলো সব এসে এসে এখানেই থেমে যায়। একটা গেস্ট হাউজ আছে পর্যটন বিভাগের। তার বাগানে দুটো নধর কুকুরছানা একটা রুমাল নিয়ে খানিক উস্তুম খুস্তুম লড়াই করে নিলো। শেষ অব্দি যেমন সব বোকারা করে, রুমাল ফেলে নিজেরা লড়াই করা শুরু করলো।



এখান থেকে ফেরী করে করে এ ঘাট সে ঘাট, সে গাঁ, করা যায়। তিন টাকা টিকিট কাটতে গিয়ে টিকিটবাবুর মাথা খেয়ে নিয়েছি। কোথায় যায়? সন্দেশখালী? আর? বড় তোষপুর, ছোট তোষপুর। আমি প্রথমে বড় তোষপুরকে পরিতোষপুর শুনেছি। ভাবছি অবাক হয়ে, পরিতোষ বলে একটা লোক হয়ত এখানে বসতি গড়েছিলো। তোষপুরের লোকেরা ভারী খুশিতে থাকে? আগেকার হাতে টানা নৌকাগুলোতে মোটর লাগিয়ে নেওয়া নৌকা। সে নৌকায় সবাই ওঠে, সাইকেল, মোটর সাইকেল, শিশু, বুড়ো, বাদামওলা, ছোলামাখা ওলা। রায়মঙ্গলে কামট থাকার গল্প পড়েছি কত্ত। কামটে এসে কুচ করে হাত পা কেটে নিয়ে যায় কেউ টেরও পায়না। জায়গাটা লাল হয়ে যায় খালি। আমি হাত দিলাম জলে, কই কামট? বাচ্ছা, মানে একেবারে দুধের বাচ্ছা, তাদেরকে বুকে নিয়েই নৌকার সরু দেওয়ালে বসেছে, প্রাণে ভয় নেই এদের দেখি। অবশ্য এ অঞ্চলে ভয় থাকলে বাঁচাও যাবে না।

সন্দেশখালীতে অফিস কাছারি আছে শুনেছি, তাই ওখানে নামার মানেই নেই। লাস্ট স্টপ ছোট তোষপুর ওখানেই নামা যাক। ঘাটের কাছে একটা মিষ্টির দোকান, আর এক দুটো দোকান আছে ব্যাস। ধামাখালিতে হোটেল মোটেল ছিল। নদীর পাশেই বাঁধ, তার দুধারে কয়েকঘর করে করে লোক। আসল গ্রাম হুইই ওই দিকে। ভ্যান যায়। আমি হাঁটা দিই নদীকে পাশে রেখে। অভাবী মানুষদের বাস এখানে কিন্তু গরীব না, মানে বোঝাতে পারলাম না না? ধরো পাকা বাড়ি নেই, কিন্তু পেটে ভাত নেই বা মনে শান্তি নেই এমন গরীব না। । দিব্যি রোদে বসে কেউ উকুন বাছছে, কেউ রোদ পিঠ করে খেতে বসেছে। এক বাড়ি থেকে রেডিওর বা টিভির আওয়াজ আসছে। প্রায় প্রতি ঘরেই গরু বা ছাগল বা শুয়োর পোষা আছে৷ একটা ছাগল ছানার আবার আমায় ভারী পছন্দ করে ফেলেছে। আরে এ তো আমার সাথে সাথেই আসছে, আরে কতদূর যাবি রে? হারিয়ে যাবি তো! আমি কিন্তু ফিরবো না এ পথে। আমি থমকালে সেও থমকায়, আমি চললে সেও।ওরে বাবা সামনে একটা বড় মোরগমশাই যে! 'ও মানুষ দাদা তুমি থামলে কেন, চলো না। আমায় যদি ঠুকরে দেয়!'
আচ্ছা আচ্ছা চল যাচ্ছি। মোরগ, বড় শুয়োর সব পার হয়ে অনেকটা রাস্তা আসার পর, যখন ছাগল ছানাটা বুঝেছে এ পাড়া তার একেবারেই পরিচিত না, বেজায় ভয় পেয়েছে। ম্যা ম্যা ব্যা ব্যা করে সে কীই কান্না। ' ও মা তুমি কোথায় গেলে? আমি তো হারিইয়েই গেছি, আমায় নিতে এসো না'। 
ভারী মুশকিল হলো তো! ওই তো আরো কটা ভেড়া আর ছাগল চড়ছে, ওদের সাথে ভিড়ে গেছে। যাক! না হলে এর জন্যেই আমায় ফিরতে হত!

একটা বেনে বৌ শিরীষ গাছের ডালে বসে টুকটুক করে ডেকেই পালালো। ওই দূরে একটা নৌকা যাচ্ছে কোথায় যেন। নিজেদের পুকুরে জাল ফেলছে দাড়িওয়ালা একজন। আর তাকে ঘিরে কয়েকজন। শীতের দুপুর গড়িয়ে চলেছে। ধানের গাদায় শুয়ে আরাম করে ঘুমোচ্ছে একজন। ফুরুত করে দুটো ছোট্ট পাখি লাফালাফি করছে। তিনটে রাজহাঁস পুকুরে নেমে আরাম করে স্নান সারছে। স্নান সেরে ফিট বাবু হয়ে ডানা ঝেড়ে, টুকটুক করে হেঁটে ফিরছেন ওই যে। ভারী রাজকীয় ভঙ্গী কিন্তু। বাঁদিকে মা মুরগীটা তার ছানা গুলোকে নিয়ে দানা খুঁটছে। চারদিকে বড় শান্তির ছবি। আমার খিদে পাচ্ছে, অনেক্ষণ হাঁটছি কিনা। আচ্ছা এ রাস্তা ধরে পৌঁছয় কোথায়?

আরো অনেকখানি হাঁটলে আতাপুরের ঘাট পড়বে, একজনকে জিজ্ঞেস করে জানা গেলো। আতাপুরের ভূত বলে একটা গল্প ছিলো না? ওই ঘাট থেকে নৌকা মিললেও মিলতে পারে ধামাখলী ফেরার। না পেলে? দেখা যাবে খন। আতাপুরের ঘাট দেখতে ইচ্ছে করছে। একটা ছোট্ট ম্যানগ্রোভের জঙ্গল, পার হয়ে হাঁটছি হনহন। নৌকায় রঙ করছে এক বুড়ো, আর তার ছেলে। টায়ার নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে আসছে একটা ছেলে, আমি হাত বাড়িয়েছি যেই অমনি ভুরু কুঁচকে টায়ার খানা সরিয়ে দে দৌড়। একটা ছাগলকে ভড়কি দিলাম, ব্যা ব্যা আওয়াজ করে। দুটো হাঁস পাখায় মুখ গুঁজে গেঁড়িঘুম দিচ্ছে। ওইতো একটা দোকান মত। ওটাই আতাপুরের ঘাট মনে হয়।

ঘাটে একটা নৌকায় মাল উঠছে। শেষ নৌকা চলে গেছে, আর ধামাখালী যাবার নৌকা পাবো না। তাহলে? যে ভ্যান থেকে মাল নামছিলো তারাই নিয়ে গেলো, ভাড়া নিয়ে, ধুচনোখালী না কী যেন নামের একটা জায়গায়। ওখান থেকে ফের ভ্যান, এবার গ্রামের মধ্যে দিয়ে, পিচের রাস্তা ধরে। দু ধারে সাজানো গাছ, ঝকঝকে রাস্তা। এহ বৃষ্টি এল এক দু ফোঁটা, ঠান্ডা হাওয়া, শীতের বেলা পড়ে গেছে।

খিদে পেয়েছে। কী খাই? তুষখালির বাজারে, মিষ্টির দোকান থেকে সিঙারা, বোঁদে আর তার পাশের দোকান থেকে চানাচুর কিনে ঠোঙায় হাত দিয়ে দিয়ে সব কিছু দিয়ে মুড়ি। নদীর পাড়ে বসে বসে৷ এক দুটো নৌকা এলো, গেলো। আতাপুরের ওদিকের গ্রাম গুলোয় যাওয়া হলো না, আজ থাকতে হত তাহলে। এহ কবে এমন হবে, ফেরার কথা না ভেবে গ্রামের পর গ্রাম, নদীর পর নদী পার হয়ে হয়ে যাব।

অনেক ক্ষন পর অন্ধকার হবার মুখে নৌকায় উঠে ফিরতি পথ নিয়েগি। যদি বলো কী দেখার আছে? আমি তো এক কথায় উত্তর দিতে পারবো না। কিছুই নেই হয়তো। যদি জিজ্ঞেস করো কেন বেরোই এমন, তারও উত্তর জানা নেই। কিন্তু ওই নদী পাশে নিয়ে শীতের দুপুরের গ্রামটা, ছোট্ট ছাগল ছানাটা, ঝোপের পাশে মৌতাত করে সিগারেট খাওয়া ছেলেটা, তুষখালির বাজারে আমার সিঙারা চানাচুর বোঁদে মুড়ি দিয়ে লাঞ্চ করাটা আমার পাথেয়। সবার পথ এক না, সবার পাথেয়ও এক না। তাই আমি বলতে পারবো না, ঠিক কী আছে, ওই মরা রোদের গ্রামটায়....রাস্তাটায়..আমার পাথেয় টুকু রাখা আছে খালি এই জানি।









Wednesday, December 19, 2018

হারানে

হারিয়ে ফেলাটাও আর্ট মশাই। মানে প্রথমে সেটা থাকে বদভ্যাস,পরে সেটা দীর্ঘদিন মজুত হলে হয়ে যায় অভ্যাস, আরো দীর্ঘদিন হলে হয়ে গেলো সংস্কৃতি, ঐতিহ্য.... সেটাকে নিপুন দক্ষতায়,অন্যকারো না করতে পারার লেভেলে এক্সিকিউট করে গেলে হয়ে গেলো শিল্প। তা হারানো ব্যাপারটাকে আমি বদভ্যাস থেকে, নিত্যদিনের সঙ্গী অভ্যাস করে ফেলেছিলাম সেই ইস্কুলে থাকতেই। রোজই কিছু না কিছু করে খাতা, সিলেবাস, পেন ইত্যাদি হারানোর অভ্যাস হয়ে গেছিলো নিত্যসঙ্গী। ক্রমে কিশোর বয়স এলো, বই খুলে অমুকের চিরকুটের মানে, শিরিনের ওড়না, পিয়ালীর চোখ চেপে ধরা.... ইত্যাদি ভাবতে গিয়ে আর পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র দেখে বারবার ব্লাডার খালি করতে গিয়ে সময় হারানো ব্যাপারটা আমার নিজস্ব সংস্কৃতি হিসেবেই বইতে হলো।
আলাদা মেজাজ আলাদা ধরন, ইউনিটি ইন ডাইভারসিটি...সুতরাং আমি হারানে, সময় হারানোর পর আমি বন্ধু হারানোর পর্যায় উত্তীয় হয়েছি...কারোর সাথে বদমেজাজের কারনে তো কারোর সাথে কথা হারিয়ে, হারিয়ে ফেলা। ঐতিহ্য মেনেই আমি হারানো গুলোকে হজম করছিলাম। নতুনের ধাক্কায় তো পুরোনো ঐতিহ্য হারাতে দেওয়া যায়না!
ক্রমে দেখলাম, হারানোয় আমার সাথে অনেকেই পাল্লা দিচ্ছে! অবাক ব্যাপার প্রকৃতিও! নীল রঙ হারিয়ে গেলো আকাশ থেকে, ধোঁয়াটে রঙে অভ্যেস হল, পাখির ডাকে বৈচিত্র্য হারালো, কাক রইলো। বর্ষাকালে কেঁচো হারালো, জমা কালো জল রইলো....হারাতে হারাতে, রোজ তিনি আমার সাথে পাল্লা দিয়ে ব্যাপারটা শিল্পের পর্যায় নিয়ে যাচ্ছেন। দুম করে সেদিন শুনি একটা আস্ত নদীই হারিয়ে ফেলেছে। তা ভালো তার নদী সে মেরে ফেলবে না ফুঁসে উঠে সব ভাসিয়ে দেবে তার ব্যাপার। কিন্তু এ লড়াইতে আমি তো মশাই কুটির শিল্প হয়ে যাচ্ছি হ্যাঁ। তো সেদিন একটা আমগাছের সাথে কথা হচ্ছিলো, কথা মানে কি আর মানুষের ভাষায় নাকি! আমি বলে যাই বলে যাই আর সে বাচ্ছাদের কথা শুনছে ভঙ্গীতে শুনে যায়। তা সে করতেই পারে; বয়সে, দেখায়, জ্ঞানে, সবেতেই বড় সে। আমি বলছিলাম হারানোর গল্প আমার। সবই হারায় আমার, আমার যত্ন নেই বলে না কিছু সয় না আমার? সে দেখাচ্ছিলো, যার হারাচ্ছে তার তো হারাচ্ছেই কিন্তু যে হারিয়ে যাচ্ছে তারও কি কম যাচ্ছে নাকি? এই যে মানুষগুলো হারিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে....দাঁড়াও দাঁড়াও, হারিয়ে যাচ্ছে মানে? সে আবার কি? গিজগিজ করছে মানুষ, থিকথিক করছে মানুষ আর তুমি বলছ হারিয়ে যাচ্ছে?
কথা হচ্ছে সব মনে মনেই, কারন গাছেরা তো টেলিপ্যাথি বোঝে, ওদের চিৎকৃত ভাষার দরকার হয়না। আমার চেঁচামেচিতে, গাছটা হাসলো...হারাচ্ছেই তো, একটা করে গাছ৷ নদী হারাচ্ছে মানে মানুষও তো টিকে থাকার অধিকার হারাচ্ছে। তাছাড়া, তোমার মনে হয়না, মানুষ ক্রমে নিজের সাথে কথা বলতে পারা হারাচ্ছে, রঙ বেরঙ মন হারিয়ে রোবট হচ্ছে?
লস কার হচ্ছে হে হ্যাঁ?
ঠিকই তো....কিন্তু যন্ত্রণাটা, যার হারালো তার? এই দেখোনা, ছোট থেকে সময় হারিয়ে হারিয়ে এখন তো আর মাত্রাও বুঝি না। তোমাদের যে হারাচ্ছে সব যন্ত্রণা হয়না?
উঁহু, আমরা অত সহজে বিচলিত হইনা। হারালে হারাবে, থাকলে থাকবে....হারাই হারাই ভয়ে যে ওই দূরে ছেলেটা কেমন নদীতে সাঁতরে মাছ ধরছে স্রোতের বিরুদ্ধে গিয়ে সেটা মিস করে যাচ্ছ তো? হুঁ যত্ন করলে খানিক থাকে বটে জিনিস...কিন্তু অত যত্নে যাকে রাখতে হয় তাকে হারিয়ে ফেলাই ভালো বুঝলে? চিন্তাহীন, ভারহীন হয়ে দিব্যি লাগবে....
গাছ ব্যাটা তো বলেই খালাস....আমার হিসেবী মন, খালি আঁক কষে কত টাকা হারিয়ে গেছে, কত মানুষ হারিয়ে গেছে, কত সময় হারিয়ে গেছে....আমি হারানো শিল্পপতি হিসেবে বিজ্ঞাপন দিচ্ছি এমন একটা স্বপ্নও দেখে ফেললাম। এমন সময় ভারী ক্যাচোর ম্যাচোর করে এক দঙ্গল পাখি মাথার উপর দিয়ে গেল....আচ্ছা এরকমই একবার কবে যেন হয়েছিলো না? এরকমই শীতের দুপুরের এক ঝাঁক পাখি উড়তে দেখেছিলাম না? একই ফ্রেম মনে হচ্ছে, জলের ধারে...দুপুরে....সে কোন জন্মে না এজন্মে কে জানে?
হারায় যা তাই কী তবে ফিরে ফিরে আসে?

Friday, December 7, 2018

সাংসারিক

তুমি কী বলে দশটা মিষ্টি খেলে? হ্যাঁ এত বয়স হলো কান্ডজ্ঞান হলো না? কালকেও একটা প্যান্ট বাতিল করেছে, ছত্রিশ কোমর আর হয়না। বলি একটু লজ্জা নেই গো তোমার?

- ওরকম চেঁচাচ্ছ কেন! অত গুলো মিষ্টি বানিয়েছিলে কেন যদি না খাবো?

- বানিয়েছি বলে কপকপ করে সব খাবে হ্যাঁ!

-বেশ করেছি! আর তোমার জন্যেই আমার ভুঁড়ি বাড়ছে, ভুঁড়ি নিয়ে তোমার ইভা ব্রাউন মা যদি ফের বলে না, দেখো একবার।

- হুহ আমারই তো দোষ সবসময়।

- হ্যাঁ হ্যাঁ তোরই দোষ রে ফ্রিজের ঠান্ডা মাছ। তুই না বানালেই খেতাম না।

- কিইই!! আমি ফ্রিজের ঠান্ডা মাছ? মচ্চিমুলো করে খাওয়াচ্ছি কিনা বাবুর তেল বেড়েছে কত। আমি ফ্রিজের ঠান্ডা মাছ হলে তুমি লাউসেদ্ধ।

- লাউসেদ্ধ? লাউসেদ্ধ বললে আমায়! তুমি, তুমি হলে চানাচুরের পচা বাদাম, ফ্রিজে রাখা রসগোল্লা।

- অ তাই তো?

- হ্যাঁ তাই!! শোনো এ শর্মা কথা গেলে না বুঝেছ?

- ভেবে বলো কিন্তু, আবারও বলছি। ফ্রিজের ঠান্ডা মাছ, রসগোল্লা, পচা বাদাম সব আমিই তো?

- হ্যাঁ হ্যাঁ তুমিইই।

- আমার মা ইভা ব্রাউন? বাবা হিটলার?

- হ্যাঁ। যেরকম ভাবে বিয়ের সময় বাগড়া দিয়েছিল তাতে অন্য কিছু হতেই পারে না।

- বেশ, শুনে রাখো, রাতে কড়াইশুঁটির কচুরি আর আলুরদম করব ভেবেছিলাম, তা আমি, মা বাবা খাবো তুমি মুড়ি খেয়ে ভুঁড়ি রক্ষা কোরো আর হ্যাঁ বাইরের ঘরে নিজের বালিশ কাঁথা নিয়ে চলে যেও।

- মা বাবা মানে!!! তোমার বাবা মা আসছেন নাকি! হ্যাঁ! আর বাইরের ঘরে শোবো মানে কি! আমার নিজের বালিশে না শুলে হয়না।

- থাক! তোমার আর হার্ট অ্যাটাকের দরকার নেই। মা বাবা মানে তোমার মা বাবার কথাই হচ্ছে৷ আর বালিশ দিয়ে দেব বলেছি তো, খুব অসুবিধে হলে বোলো আমি না হয় ওঘরে মা এর কাছে গিয়ে শোবো...

- আহ সব ব্যাপারে অত জলদি ডিসিশন নাও কেন গিন্নী। আমি তো খালি বলছিলাম, অত মিষ্টি খাওয়া ঠিক হলো না, রাতে ইয়ে চারটে কচুরি দিও? কেমন? আর মা বাবা কে রাতে বিরক্ত করার কি...এই দেখো, নতুন থ্রিলার কিনেছিলাম, রাতে পড়বে না?

- তাহলে ওই ফ্রিজের ঠান্ডা...

- না না ওসব আবার তুমি হতে পারো..আমিই তো ওসব। তুমি তো কড়াইশুঁটির কচুর আলুরদম...কই দেখি...

-থাক হয়েছে...বুড়ো বয়সে লাজ শরম কিছু নেই!

- বুড়ো!! ইয়ে গিন্নী প্রমান চাই বুঝি...

- মরণ!

Wednesday, November 28, 2018

পথে পথে

একদম অন্ধকার হবার পর পরেই চাঁদ ওঠে না, একটা দুটো তারা ঘুম ভেঙে আড়মোড়া মেলে। টর্চ আছে পকেটে, কিন্তু অন্ধকার গায়ে মেখে হাঁটতে দিব্যি লাগছে। শীত পড়তে শুরু করেছে, বাংলায় এটা কোন সময়? অঘ্রাণ না? হাড় কাঁপানো ঠান্ডা কিছু না, তবে ঠান্ডা আছে। সাপের ভয় নেই, আর মহারাজদের চোর ডাকাতের ভয় থাকার কথাও না, তবে আর টর্চ কী হবে!

হনহন করে হাঁটছিলাম, যেখানে আছি সেই আলো শেষ হলেই অন্ধকার ঘুটঘুটে। অন্ধকারটা চোখে সইলেই আর ঘুটঘুটে থাকেনা, আকাশে একটা আলো থাকেই। সেই আলোতে গাছপালা গুলো বড় অন্যরকম লাগে, বাঁ পাশে একটা জলা, সকালেই দেখেছিলাম। ডান পাশে কী কে জানে! খানিক হেঁটে দেখি একটা পাড়ায় পৌঁছে গেছি। ডান বাম দুদিকে রাস্তা, একদিক ধরে এগোচ্ছি হনহন করে, টুকরো টাকরা কথা কানে আসছে, হিন্দি না, বাংলাই, ডায়ালেক্ট অন্য। সীমান্তবর্তী এই জায়গার লোকগুলো এখনো শহুরে ধুলোয় ঢাকা পড়েনি। তেষ্টা পেয়েছে বেশ, ও কাকা টিউবওয়েল আছে কাছাকাছি?

হুই উদিকে বাঁয়ে আছে, বেসসি না দু কদম দূরে। হুঁ। জল খেয়ে একটু এগিয়েছি, এদিকটা বাড়িগুলোর পিছন দিক, গরু দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে, একটা মুদির দোকান টিমটিমে আলো জ্বলা, সেখানে শাকপাতা থেকে চিপ্স সবই মেলে। মুদির দোকান পেরোলেই একটা মাঠ, মাঠের ওপাশে গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে লাল চাঁদ উঠছে তখন। এরপর আস্তে আস্তে সাদা হবে, মাথার উপর উঠবে।

হাতে বেলুন নিয়ে লোকজন ফিরছে, এদের আজ রাস মেলা আছে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে পৌঁছে দেখি, মেলা না ঠিক, রাস মন্দিরকে ঘিরে কিছু মাটির মূর্তি বানিয়েছে, অল্প স্বল্প আলো দিয়ে সাজিয়েছে, বাচ্ছা, মেয়ে, পুরুষ সব হামলে পড়ে তাইই দেখছে আনন্দ করে৷ মন্দিরে সংকীর্তন চলছে, খোল করতাল বাজিয়ে, ইস্কনের মন্দিরের মত লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে না। আমার ভক্তি নেই, ঘুরে ঘুরে আলগোছে দেখছি। এহে মোবাইলটা আছে বটে কিন্তু ওয়ালেট তো নাই, কিছুই খেতে পাবো না তো তাহলে! ঠিক আছে এমনিতেও কিছু নেই মনে হয়। ওই দিকে কিসের জটলা হচ্ছে? উঁকি মেরে দেখতে গিয়েই হাতে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের কাপে পায়েস ধরিয়ে দিলো। চারিদিকে অজস্র খালি কাপ পড়ে আছে এই জন্যেই বুঝি?

পায়েসের কাপ নিয়ে মুশকিলে পড়লাম। আমি খেতে ভালোবাসি, কিন্তু আমি তো হিমু কিংবা নীললোহিত না, ঋকানন্দের সারাদিন না খেলেও চলে কিন্তু ভালোবাসার খাবার খারাপ স্বাদের আমার সয় না। আমার অনেক কিছুই সয় না, সে আলাদা কথা কিন্তু এই পায়েস নিয়ে এখন আমি কী করি? অভিজ্ঞতা থেকে জানি, গরীব মানুষেরা পায়েস যেটা বানায় সে বেশ খারাপ হয়। চাল সেদ্ধ করে পরে দুধ মেশায়। তাও মুখে দিয়ে দেখলাম, হুঁ, খারাপ। এবার? ফেলে দিলেই হয় কিন্তু এতো লোক আহ্লাদ করে করে আগ্রহ নিয়ে যা খাচ্ছে তা ছুঁড়ে ফেলতে পারি এমন জোরও নেই।

আরো খানিক এদিক সেদিক ঘুরে, দেখি একটা কুকুর। যাক একেবারে ফেলা গেলো না। ভীড়টা পেরিয়ে ফিরতি পথ ধরেছি। বাঁধানো রাস্তাটা পার হলেই একা গাছটা দিয়ে চাঁদের আলো নেমেছে। পূর্ণিমার আলোয় জায়গাটা ঝকঝক করছে। খানিকটা গেলেই নদী। শীতকালের নদী, পাথর বেশী জল কম। কিচ্ছু না থাকলেও যেমন জীবন আবার দুহাত ভরা থাকলেও জীবন;তেমনই জল থাকলেও নদী কম থাকলেও নদী...জল একেবারে শুকিয়ে না গেলেই হলো। অবশ্য মরা নদী অত খারাপ না যতটা নোংরায় খাল হয়ে যাওয়া নদী খারাপ।

কুয়াশা নেমেছে রাত বাড়তে, সাদা নদীর চর, এক পৃথিবী চাঁদের আলো। আশেপাশের গাছ গুলো সতর্ক ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে, একটু পরেই পরী নামবে এখানে। সে পরীদের সাথে দেখা হলে মুশকিল, আর ঘোর কাটবে না, ঘুরে ঘুরে মরতে হবে সারা জীবন। কোত্থাও তিষ্ঠানো যাবে না। পরীদের ধরে ফেললে আরো মুশকিল, ধরলেই তারা মানুষ হয়ে একশো হাজার বছর আটকে যাবে। না আমি পরী ধরতে চাইনা, এমন মায়াময় রাতে, নদীর ধারে বন পাহাড়ের উপর যার থাকার কথা, টিউবলাইটের আলোয় ল্যাপটপ দেখবে সে এ আমি ভাবতে পারিনা। আমার হাত ঝলসে যাবে আমার চোখ অন্ধ হয়ে যাবে।

চাঁদের আলোয় নেশা হয়, ঝিম ধরা নেশা, এইরকম খোলা প্রান্তে, নদীর ধারে দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের আওয়াজে, গাছেদের চোখের দৃষ্টিতে সে নেশা বড় তীব্র হয়। মনে হয় সব ফেলে এক্ষুনি বেরিয়ে যাই। আর ফেরার কী দরকার....

কিন্তু আমার সে জীবনও সইবে না আমি জানি, আমায় ফিরে ফিরে আসতে হবে আবার যেতে হবে.....

Tuesday, November 20, 2018

একদিন বেলায়

এদিকটা কেউ আসেনা। ভাঙা জিনিসপত্র পড়ে থেকে থেকে ঘাস বেড়ে উঠেছে এলোমেলো। কদম গাছের ডালে একটা পাখি বাসা বেধেছে, পার্থেনিয়ামের ঝাঁকে প্রজাপতি উড়ছে দিব্যি। আচ্ছা প্রজাপতিদের শ্বাসকষ্ট হয়না, এলার্জি হয়না? এই হলুদ প্রজাপতি গুলোর টাইগার প্রিন্ট ছাপ, লাল সুতোর বিড়ি না কি যেন নাম। যাকগে আমার কি! দুটো সারস লম্বা লম্বা ঠ্যাং ফেলে ভাবছে আজ কাবাব খাবো না কাচের বয়ামের কেক খাবো?

রোদের তেজ আছে, আবার নেইও। মানে ফেসবুকের মতন আলগা সম্পর্কে থাকলে গায়ে লাগে না তেমন কিন্তু একটু বেশীক্ষন থাকলে গা চিড়বিড় করে। দুটো কাঠবিড়ালী ব্যস্ত ভঙ্গীতে বাদাম না কী যেন খাচ্ছে, কদম গাছের ডাল থেকে টুপ করে একটা কদম পড়লো। কদম বর্ষাকালের ফুল না? 
অথচ নোংরা নেই তেমন, সাধারনত পিছন দিক গুলোয় যা হয়েই থাকে। আমার একটু ভীড় এড়ানো দিকগুলোয় হেঁটে বেড়াতে দিব্যি লাগে, ঝুম হয়ে বসে থাকলেও মন্দ না। দূরে ফ্লাইওভার দিয়ে বাস গাড়ি সাঁই সাঁই বেরিয়ে যাচ্ছে....এমন সময় সে এলো।

খুব ভয়ানক বুড়ো একজন। মনে হয় দু কদম হেঁটে তিন কদম পা দিলেই মরে যাবে এক্ষুনি। খক খক করে কাশছে, মাঝে মাঝে থুতু ফেলছে। এ কেন এলো এখানে! আমার একার রাজত্বে দখলদারী! চলে যাবে ভেবে সরে এসে বসলাম। গেলো না। ভালো করে তাকিয়ে দেখি লোকটার সারা গায়ের মাকড়সার ঝুলের মতো কুয়াশা। নভেম্বরের রোদ সে কুয়াশা ভেদ করতে পারে না যেন। থুতু, বুড়ো, কুয়াশা কিছুই ভাল্লাগেনা আমার, আমি সরে এসে বসি।

তাতে লাভ কিছুই হয়না দেখি। কুয়াশাটা দিব্যি ডালপালা লাভ করেছে পাশের ছাতিম গাছটা জড়িয়ে, ধোঁয়ার মত করে। কুয়াশার সাথে কথা বলা মুশকিল, তায় সে যদি আবার জ্যান্ত কুয়াশা হয়। আমি তবু যেতে পারছি না এখান থেকে। ওইদিকে একটা চা এর দোকান আছে, তার পাশে একটা ছানা নেড়ি কুকুর এসে উঁকি মারছে কুয়াশার পাশ দিয়ে।

বুড়ো মাথা নীচু করে চা এর ভাঁড়ে বিস্কুট ডুবোচ্ছে, লাঠি আঁকাবাঁকা, পাশে শোয়ানো। পুরো জায়গাটার পাশ থেকে একফালি রোদ উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছে কী ব্যাপার। দু হাত দিয়ে দিয়ে কুয়াশা সরিয়ে ভাবছে একটু চা এ চুমুক দেবে কিনা। কিন্তু এন্ট্রি পাচ্ছে না মোটেও।

এদিকে কুয়াশায় মাখামাখি হয়ে ঘাস গুলো, গাছগুলো বিরক্ত করছে আমায় বেজায়। রোদের এন্ট্রি নেই যেখানে, ঋকানন্দও নেই সেখানে। কিন্তু জ্যান্ত কুয়াশা তো সোজা জিনিস না, সে এতোক্ষনে বেশ স্বাস্থ্য বানিয়েছে। বুড়ো আরো যেন বুড়ো হয়ে গেছে। পাঁচিল এর শেষ সীমায় একটা বন্ধ ঘর আছে, বুড়োর পাশটাতেই। ব্যাটা কুয়াশাটা বুড়োর দাড়ি, ঝোলা, বন্ধ ঘর পেয়ে মাথা নেড়ে গান গাইছে আবার। ধুত্তোর ছাই ওদিকে আবার ছানা কুকুরটা তাকাচ্ছে দেখো! কুকুর আমি মোট্টে ভালোবাসিনা। তায় আমার এমন সাধের জায়গায়। কিন্তু অমন খিদে খিদে, দাওনা চোখে, ছোট কুকুর ছানাও মোটে ভালোনা।

একিরে বাবা! এ ব্যাটা তো খেতেও পারেনা। ওই দেখো, ওর মা টা তো সব খেয়েই নিলো। আর বোকাটা গুঁড়ো গুলো খাচ্ছে। মা কুকুরটার পেটে মনে হয় এক কুয়ো সমান খিদে। যা তুইই খা।
আরে রোদটার একটু গায়ে গত্তি লেগেছে , বুড়োটার জামা থেকে কুয়াশা গলে চাএর ভাঁড়ে পড়ছে....

Sunday, November 18, 2018

গুঁড়ো গুঁড়ো রঙ

সারি সারি একইরকম মুখ দেখতে বাকিদের কিরকম লাগে আমি জানিনা, আমার ভারী খারাপ লাগে। এই কারনে, আমি শাটলে যেতে খারাপবাসি, দুপুরে একা খেতে চাই৷ কিন্তু এমন কপাল, বেশীরভাগ দিনই আমার পাশের কিংবা সামনের চেয়ার গুলো আমার চেনা কারোর চোখে পড়ে যায়। চেনা মানে রোজই, "তুমি কোথায় থাকো" টাইপ চেনা, আরো সরেস হয় ম্যানেজার সুলভ কাউকে দেখলে! তাদের এড়িয়ে অন্য জায়গা বসাও মুশকিল আবার তাদের সাথে বসাও.... কত কাঁহা তক, শেয়ার বাজার, ক্লাউড, ডিজিটাল মার্কেট, ইত্যাদির আলোচনা শোনা যায়! 
শাটলে উঠলেও দেখি, অভিব্যক্তিহীন কতকগুলো অবয়ব, চোখ বোঝা,কানে হেডফোন বা হাতের মোবাইলে চোখ! অথবা, কিচ্ছু না করে কেমন উৎসাহহীন চোখে তাকিয়ে, কিছুই চোখে পড়ছে না তাদের বোঝাই যায়, তা সে চোখ যতই বাইরের দিকে মেলে থাক। আমি মানছি রোজ রোজ অফসে ইন্টারেস্টিং কিছুই থাকে না, উৎসাহ নিয়ে আমি নিজেও অফিস যাই না। কিন্তু অফিসের বাইরের সময়টাও যে অফিসের জন্যই বয়ে যাচ্ছে!
যাকগে তার সময় তার চোখ তার জিভ...আমি এত পরিপাটি ভীড়ে ক্লান্ত হয়ে একা একা চা খেতে গেছি সেদিন, বিশুর দোকানে এ সময়টা একটু ফাঁকা। বিস্কুট ডিস্ট্রিবিউটর ছেলেটা খোঁজ নিয়ে যাচ্ছে দোকানে দোকানে, বৌদির দোকানে এসে ফলওয়ালার নামে নালিশ করছে কচুরির দোকানের লোকটা। একইরকম লোক সেই, পাঁচিলের এপাড়ে আর ওপাড়ে, শুনতে চাইনা তাও কত কথা কানে এসেই যায়, এতো আনইন্টারেস্টিং, মনেও থাকে না। ক্লান্ত হয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছি, হুট করে দেখি আমার বুক পকেটে কী একটা পড়লো!

শিরীষ গাছটা থেকে, একটা হলুদ রঙের ফুল, পাতা টাতা ঝরিয়ে, সে ব্যাটা এখন সন্ন্যাসী হচ্ছে, তারই মাঝে একটা হলুদ ছোট্ট ফুল, আমায় দিয়েছে, গিফট। বেশ কাকা বেশ, থ্যাংক ইউ। আমি যত্ন করে বুক পকেটটা সামলে আপিস ঢুকলাম ফের।

মেট্রোয় বসে আছি ঠ্যাঙ মেলে। তেমন ভীড় নেই, দুপুরের মেট্রো। এক সার অর্ধমৃত লোক বসে, হেডফোন গুঁজে, ফোনের দিকে তাকিয়ে, চোখ মেলে কিন্তু মরা মাছের চোখের মত তাকিয়ে...এরই মাঝে দেখি একটা মোটামুটি মলিন জামা পরা, একটা দাঁত নেই, বিস্মিত চোখে মেট্রোর স্টপেজ লেখা আলো জ্বলা বোর্ডটা দেখছে। প্রতিটা সবুজ থেকে নীল হয়ে লাল এর জার্ণিটা দেখছে আর খুশীতে একশো আলো জ্বলে উঠছে চোখে, ছেলেকে ডেকেও দেখালো একবার। ছেলে দেখলো বটে, তেমন আনন্দ পেলো না, কারনটাও বুঝিয়ে গেলো, হ্যাঁ এরকমই তো হবে! 
বাবা একটু অপ্রতিভ হলো বটে, কিন্তু বিস্ময়টা গেল না। দেখতে দেখতে আমার স্টপেজ এসে গেল। আগের দিনের গেঞ্জিটাই পরেছিলাম। পাশ দিয়ে যাবার সময়, বিস্ময় না মরে যাওয়া একটা লোককে ভাবলাম আমার কালকের গিফটটা দিয়ে যাই, পকেটে হাত দিয়ে দেখি সে গিপ্ট কখন পড়ে গেছে কোথায়!

আরো অজস্র উপহারের মত এ উপহারটাও হারিয়ে গেছে কখন। হলুদ ফুলটায় কী লেখা ছিলো কে জানে, আর জানার কোনো উপায়ও রইলো না! 
ময়দানে তখন সূর্য ডুবছে, একটা একটা বুড়ো গাছ হাঁ করে দেখছে, প্রেমিক প্রেমিকাদের উত্যক্ত করা চা ওলা কেমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এদিক থেকে ওদিকে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, যত্রতত্র পাপড়ি চাট খেয়ে ময়দানটাকে ডাস্টবিন বানানো লোকজন কেমন ময়দানের ঘাস গুলো থেকে দূরে চলে যাচ্ছে একটু একটু করে।

তার মধ্যেই একটা বুড়ো গাছ হাঁ করে সূর্য ডুবে যাওয়া দেখছিলো, কেমন করে মানুষগুলো আবছা হয়ে আসছে, গাছে গাছে পাখিগুলো সন্ধ্যেবেলার আসর বসাতে শুরু করছে....
আমার হাতের মুঠো থেকে মেট্রোয় পাওয়া বিস্ময়টা বুড়োর মুখে ঢেলে দিলাম। আমার কাছে থাকলে ফের হারিয়ে যাবে হয়ত, তার আগেই বুড়ো র কাছে জমা থাক। যদি কেউ আসে কোনোদিন নিতে...কিংবা একদিন রাতে হয়তো শ্বাস ছাড়ার সাথে উড়িয়ে দেবে, আর পরদিন কোলকাতার সবার মধ্যে রেনুর মতো বিস্ময় গুঁড়ো মিশে মিশে যাবে....


Thursday, November 1, 2018

সাপব্যাঙ গল্প


"কই একটু চা দেখি, চা খেয়ে ছেলেটার জন্যে একটা ইঁদুর ধরে আনি।"

  - পারবো না যাও তো। সারাদিন খেটে খেটে আমার খোলস ছেড়ে গেলো এই গরমকালেই। সারাদিন জ্বালাতন। এই চা দাও রে, এই ব্যাঙের রোস্ট করে দাও রে, এই একটু পোকা ভাজা দাও রে। কেন যে মরতে তোমায় বিয়ে করেছিলাম, জীবনটা শেষ হয়ে গেলো!

 ত্রিভঙ্গ বাবু, ওনার স্ত্রী আঁকাচোরা দেবী আর ওনাদের ছেলে ক্রিসক্রশ, ছোট্ট সাপ পরিবার, একসাথে একটা নরম গরম গর্তে থাকেন। শান্ত নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। সকালে একটু চা বিস্কুট খেয়ে খোকা কুশুকে পোকা ধরা,  নেতিয়ে পড়ে থাকা, গাছ বাওয়া,  ছোটা এসব শেখান। বেশী না ওই অল্প আধটু। তারপর বেরোন পোকা ব্যাঙ বা ইঁদুর ধরতে। বলতে নেই, আঁকাচোরা দেবীর রান্নার হাত থুড়ি লেজ ভালো বড়। আজকাল ওনার একটু ভুঁড়ি মতো হয়েছে।

মাথার উপরের খড়ম ছাপটা একটু চুলকে নিয়ে কালো লেজে ঠেস দিয়ে বসে ত্রিভঙ্গ বাবু বললেন," আহা রাগ করছ কেন।থাক থাক,  আচ্ছা কই আমার বাজারের থলেটা দাও। কই রে কুশু, আজ কি পোকা খাবি? "
রান্নাঘর থেকে আঁকাচোরা বেরিয়ে এলো, "কবে এমন হয়েছে যে চা পাওনি, অত কেত নেওয়ার কি হ্যাঁ, চা বসিয়েছি, চা খেয়ে বাজার যাও।"

চা খেয়ে ত্রিভঙ্গ,  ছেলেকে নিয়ে বেরোলো। গরমকালটাই যা ফূর্তির কাল, ছেলেকে নিয়ে আজ সাঁতার কাটতে যাবে। আঁকাচোরাও আসবে খানিক পরে। ছেলেটা হয়েছে অন্যরকম,  ওর বয়সী সব সাপ যখন পাখির ডিম জোগাড় করে আনে ও তখন লেজ বাজিয়ে গান গায়। ত্রিভঙ্গর সমস্যা হলো, ছেলেকে ও বেজায় ভালোবাসে। এতোদিনে অন্য সাপ হলে গর্ত থেকে দূর করে দিতো, কিন্তু কুশু মানুষের রক্ত দিয়ে নেশা করেনা, পাখির ডিমের খোলা পুড়িয়ে নেশাও নেই, খালি নিজের মনে থাকে বলেই দূর করা যায়!

ত্রিভঙ্গরা যেখানে থাকে আশেপাশে সাপ নেই তেমন, বিপদে আপদে ডাক্তার বদ্যির দরকার হলে তারা তিন গাছের ছায়া পেরিয়ে যায়। ওখানে একটা ভাঙা বাড়িতে বদ্যি সাপ থাকে। আশেপাশে আরো অনেকেই থাকে। বেশ পশ এলাকা, শুকনো খটখটে। আসলে ত্রিভঙ্গ নিজেও একটু অন্যরকম, তাই হয়তো পশ এলাকায় আস্তানা মেলেনি।তবে ত্রিভঙ্গ নিজের মতো করে ভালোই আছে। রবিবার করে ভালো পাখির ডিম কিংবা ব্যাঙ পেলে আর নদীতে সাঁতার কাটতে পেলে খারাপ থাকারও কারন নেই খুব কিছু। সাধারণত জলের সাপদের একটু নীচু চোখেই দেখা হয়। কিন্তু ত্রিভঙ্গের এসবে খুব কিছু এসে যায় না, আঁকাচোরারও না। আঁকাচোরাও ভারী ভালো মেয়ে,   বাদলার দিনে গর্তে জল ঢুকে গেলো, কি কোনোদিন  পিঁপড়ে অব্দি মিলল না,  ত্রিভঙ্গকে ও উত্যক্ত করেনা। নেই তো কী আর করা যাবে,  এরকমই মনোভাব।

সেদিন জলে খানিক দাপাদাপি করে পাথরের উপর শুয়ে জল শুকোচ্ছে তিনজনে। কে বেশী লেজ দিয়ে দাপিয়েছে সে নিয়ে খানিক হাসি তামাশাও হচ্ছে। তারপর ত্রিভঙ্গ আর আঁকাচোরা গেছে জঙ্গলে একটু ঘুরতে। এটা শুধু ওদের নিজেদের সময় কিনা,  কুশুকে নিয়ে যায় না সাথে, আর কুশুও বোকা মানুষের বাচ্ছা না যে চ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদবে সব জায়গায় বাপ মা এর সাথে যাবে বলে!

শুয়ে শুয়ে একটা নতুন সুর ধরার চেষ্টা করছে কুশু, গাছের সাথে হাওয়ার কথা বলার শব্দটা যদি সুরে ধরা যায়, তার সাথে নদীর মিউজিক এরেঞ্জমেন্ট করলে জমে যাবে না ব্যাপারটা? কুশুর গলায় সুর টুর নেই তেমন, তাই একা একা থাকলেই সে গান গায়। এই করেই তার বন্ধু বান্ধবও কম। একে মূল শহরের থেকে দূরে থাকে, তায় রোগাটে ছোটখাটো চেহারা, তায় আসর জমাতে পারেনা বন্ধু হবে কেমন করে? বন্ধু তো হয় খেলার মাঠে না হলে শিকার করতে গিয়ে রাস্তায়। পাখির ডিম বা ইঁদুর সে বেশীর ভাগ সময়পারে না ধরতে, ছড়িয়ে লাট করে ফেলে, লজ্জায় সে বাকিদের থেকে আড়ালে শিকার করার চেষ্টা করে। আর নিজেকে সঙ্গ দিতে গান শোনায়। গান গাইতে তার ভালো লাগে এদিকে সুর নেই বলে তার ধারনা। যদিও সে ধারনা ভুল। গান বাজনা সে ভালোই করে।

গান গাইতে গাইতে খেয়াল ছিলোনা আশেপাশে কি হচ্ছে,হটাৎ দেখে, পাশের পাথরেই একটা কালোকোলা ব্যাঙ যে!!ব্যাঙটাও ভারী ভ্যাবলা তো! দেখছিস পাশে সাপ বসে আছে, তুই কি বলে তার গান শুনতে এসেছিস!! শুধু তাই না, আস্পদ্দা দেখো একবার, ব্যাঙটা সাপের দিকে তাকিয়ে বলে কিনা, "আহা থামলে কেন, সুরটা তো প্রায় ধরে ফেলেইছিলে, আরেকটু হলেও বোঝা যেত গাছেদের গান!

কুশু হতভম্ব হয়ে বলল," হ্যাঁ আসলে ওই মনটা একটু সরে গেলো, ব্যাস সুরটাও পাশ কাটিয়ে গেলো। কিন্তু তুমি মানে তোমার ভয় করছে না? "

-ভয় করবে কেন হে খোকা!! তোমার থেকে বয়সে বড় কিনা আমি অত তোমার মতো ভয় পাই না।  এই তো কাল রাতে হিসি পেলো, একাই একাই কাজ সেরে এলাম। তুমি নির্ঘাত এখনো, মাকে ডেকে নিয়ে যাও? খ্যা খ্যা গ্যাঙোর গ্যাঙা গ্যাঙ।

- আহ থামো তুমি। আমি মোটেও মাকে ডাকিনা। আমি রাতে উঠিইনা। এই তো মা বাবা  মিলে জঙ্গলে গেছে, আমি কি ভয় পাচ্ছি?

- হুঁ তা অবশ্য পাওনি বটে।

-তবে? ভয় পাচ্ছোনা কেন এই কারনেই জিজ্ঞেস করছি, তুমি ব্যাঙ আমি সাপ, কপ করে খেয়ে নিলে কি করবে হ্যাঁ?

- ওহো! এই জন্যে! দূর! ওতে ভয় পাবার কি! তুমি খেতে এলে আমিও ফাইট দেবো! তারপর না হয় মরেই যাবো। এতো ভেবে লাভ আছে নাকি! আজই তো একটা পোকা খেতে গিয়ে একটা বিষ মাকড়সার কামড় খাচ্ছিলাম প্রায়, আরেকটু হলেই প্যারালাইসিস  হয়ে যেত। তাহলে আর ভয় করে কি করবো হে, তার চেয়ে বরং ফূর্তিতে কাটাই যটা দিন পাই।
তা মারবে নাকি?  হবে নাকি ফাইট?

- ইয়ে না মানে আমার আর তোমায় মারতে ইচ্ছে করছে না। বলছি চলো এক কাপ কফি খাওয়া যাক নাকি?

-আরে! বলো কি নন্দলাল! বন্ধু মিলে গেলো সুরের সাথে? এ যে বড় ভালো ব্যাপার হলো।  তোমার মনটা বেশ তো। চলো, আমিই খাওয়াবো কফি, তা নাম কি তোমার?

- আমার নাম ক্রিসক্রশ, ডাক নাম কুশু। তোমার নাম কি? তুমিও গান গাও মনে হচ্ছে। কফি খেতে খেতে একটা গান শোনাও না?

- আমার ভাই একটাই নাম, ভালো নাম ডাক নাম সব একটা। ঘাপুস। হবে হবে, গান তো হবেই।

তারপর তারা দু মক্কেলে কফি খেয়ে আড্ডা দিয়ে গান গেয়ে,  যখন আইস্ক্রীম খাচ্ছে,  কুশু দেখে ওর বাপ মা ফিরছে। ওদিকে অন্ধকার নামলো বলে। কুশু মহা বিপদে পড়েছে, ঘাপুসকে কোথায় লুকোবে? পালিয়ে গিয়েও লাভ হবে না, ঘাপুসের থাকাটা ওরা টের পেয়েছে তো বটেই।

"বুঝলি ঘাপুস, পালিয়ে না গিয়ে,  চল ফেস করি, আমার বন্ধুকে আমি মরতে দেবো না। তাছাড়া বাবা মা ভালো, ঠিক বুঝবে।"

ত্রিভঙ্গ আর আঁকাচোরা এসে পড়েছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে একবার ঘুপুসকে দেখেই, আক্রমণ করতে উদ্যত হলো। কুশু তাড়াতাড়ি আড়াল করে দাঁড়িয়ে বলল, "বাবা, প্লিজ ওকে মেরো না। ও আমার বন্ধু। ঘুপুস নাম ওর। দারুন ভালো গান গায়।"

ত্রিভঙ্গবাবু তো অবাক! "বন্ধু!! সে আবার কি কথা! খাদ্য খাদক কখনো বন্ধু হয় নাকি! "

- তা হয়না। কিন্তু  ঘাপুস তো আমার খাদ্য না৷

-ঘুপুস না হোক, ওর বাপ মা ভাই বেরাদর তারা তো আমাদের খাদ্য?

 -বেশ,আমি আজ থেকে ব্যাঙ খাওয়া ছেড়ে দিলাম।

- আরে সে কি কথা! প্রোটিন পাবি কোত্থেকে তাহলে? গায়ে জোর হবে কি করে? খাবি কি?

- সে না হয় আমি পোকা খেয়ে চালাবো। আর ইয়ে বাবা,  আমি ভাবছি,  ধান আর ডাল চাষ করবো। ভাত ডাল খেলেই গায়ে জোর হবে, কার্বস, প্রোটিন দুইই পাবো।

শুনে তো আঁকাচোরা আর ত্রিভঙ্গ মুচ্ছো যায় প্রায়!  আঁকাচোরা গালে লেজ দিয়ে অবাক হয়ে বলে, "ওরে,  সে তো মানুষের কাজ!  কোনোদিন শুনেছিস সাপে চাষ করে? বেকার অত খাটবি যদি আনন্দ করবি কখন? "

কুশু বলে, "কেউ করেনি তো কি? আমরা করি। তাছাড়া আমরা কি জমাব নাকি, একটু করে চাষ করে খেয়ে নেবো ব্যাস।তারপর তো শীতকাল চলেই আসবে। আর একদম কিছু না হলে, ইঁদুরকে বলবো, ওকে খাবোনা বদলে চাল ডাল দিক। ব্যাস।"
ঘাপুস এতোক্ষন চুপ ছিলো, এবার সে বলল, খারাপ আইডিয়া না কিন্তু কাকু, চলো ট্রাই নিয়ে দেখাই যাক না? কি বলো? না পোষালে তো আমি রইলামই,  খেয়ে নিও।

ত্রিভঙ্গ গম্ভীর হয়ে বলল, " থাক,  ছেলের বন্ধুকে খাবো এমন উচ্ছন্নেও যাই নি আমরা।রাত হচ্ছে, চলো সব ঘরে যাই, তুমি যাও বাড়ি আজ। কাল বাকি কথা হবে।"

ঘাপুস গ্যাঙোর গ্যাঙা করে হেসে বলে, "ও কাকু, বাড়ি থেকে তো চলে এসেছি। আমি এখন বড় হয়েছি কিনা,  তাই দেশভ্রমণে বেরিয়েছিলাম, এমন সময় কুশুর সাথে দেখা।"

আঁকাচোরা এগিয়ে এসে বললেন, "উদ্ধার করেছ, এই টুকু বয়স বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন! চল ঘরে চল। রাতে পোকা টোকা যা আছে খেয়ে উদ্ধার করো।

অন্ধকার নেমে এসেছে ততক্ষনে। নদীর জলে সূর্যের লাল আভাটা মিলিয়ে গেছে। এক ঝাঁক পাখি সারাদিনের কথা বার্তা সারছে গাছে। কে কোথায় কী দেখেছে, কী খেয়েছে এসব।মাছেদের দল ঘুমাবার জন্য বিছানা খুঁজছে শ্যাওলার ফাঁকে।চারজনের দলটা গর্তে ফিরে গেলো।

ত্রিভঙ্গ বাবুরও এখন চাষবাসে মন হয়েছ।