Monday, March 30, 2026

ল্যান্ডোরে(২)

খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেল, চোখ মেলে দেখি আকাশ  লাল হয়ে আছে। মেঘ সরে গিয়ে নীচের শহর, গাছপালা জঙ্গল সব দেখা যাচ্ছে। গরম পোশাক পরে বাইরে এসে টের পেলাম সবাই আমার আগেই জেগে গেছে। পাখিরা কিচিরমিচির লাগিয়েছে, গাছপালার শব্দ হাওয়া না বইলে শোনা যায় না মনে হয় বটে, কিন্তু চুপ করে অনেকক্ষণ দাঁড়ালে হাওয়ার শব্দে, পোকার শব্দের সাথে গাছেদের কথাবার্তাও শোনা যায়। সে ভাষা জানিনা বলে বিশদে বোঝা যায় না। কিন্তু খানিক সময় দিলে একটু একটু বোঝাও যায়। ছাইছাই হোঁৎকা হুলোটা টহল দিয়ে গেল।  ছাতারের মতো দেখতে কিছু পাখি খুব ব্যস্ত। "চল চল,  আজ রোদ বেরিয়েছে, ওই বাঁশের বনে পোকা মিলবে।  উফফ আমাকেই সব দিকটা দেখতে হচ্ছে, কই গো তোমার সাজগোজ শেষ হল? একটু পরে আবার বৃষ্টির প্রেডিকশন আছে, বাজারপত্র করতে হবে তো নাকি? আহ ছেলেমেয়ে গুলোও হয়েছে, কোথায় এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াবে এমন সুন্দর সকাল এ পাড়াতেই ঘুরঘুর করছে। অ্যাই আগের সপ্তাহে তোকে যে ডাইভটা শিখিয়েছিলাম, পোকা ধরে সাঁৎ করে চলে যাওয়ার কায়দাটা দেখা দেখি"। এই সব কথাবার্তা চলছে তাদের। চা বিস্কুট খেয়ে আমরাও বেরিয়ে পড়লাম হাঁটতে। আজ বাঁয়ের পথ নিয়েছি। চারদুকান এর উল্টোপিঠ। চারদুকান মানে চারটে দোকানই হওয়ার কথা ছিল কিন্তু পাঁচটা আছে মনে ভুলে। কাল ওখানে একটা দোকানে চমৎকার একটা চিজ বান ওমলেট খেয়েছিলাম। লাল টিব্বার দিকে রাস্তাটা বেশী ফাঁকা। যদিও সেটা সকাল বলেই। একটু পরেই ইন্সটার দৌলতে কোটি কোটি গাড়ি আর স্কুটি চলে এসে রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে পড়বে। আপাতত সকাল সুন্দর। ট্যাংগো আজ আসেনি আমাদের সঙ্গে। ব্যাটা নির্ঘাৎ ঘুমুচ্ছে আয়েস করে। খানিক হাঁটতে দেখি বরফঢাকা পাহাড় উঁকি মারছে। লালটিব্বার এখান থেকে সিস্টার্স বাজার অব্দি সঙ্গে সঙ্গেই চলবে। এদিক থেকে নন্দাদেবী, গঙ্গোত্রীর রেঞ্জ ইত্যাদি সব দেখা যায়। একটা দুটো লোক রাস্তায়, প্রাত:ভ্রমণে বেরিয়েছে। বৃষ্টির পর পর বলেই কিনা কে জানে, চারদিকটা একেবারে ঝকঝক করছে। সবুজ পাহাড়,তারপর বাদামী পাহাড় তারপর সাদা পাহাড়, ঠিক যেন পিকচার পোস্টকার্ড। লালটিব্বায় উঠতে গেলে টিকিট কাটতে হয় আর সেটাও ক্যাশে। সাত সকালে চা মানিব্যাগ মনে করে বেরোলে তো হয়েই যেত! পাশেই একটা ভাঙা বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে দেখি বেশ অনেকটা দূর অব্দি দেখা যাচ্ছে বটে! ওদিকে এক কান্ড হচ্ছে তখন। এ অঞ্চলে বাঁদরের উপদ্রব খুব বেশি।  একজন স্পেশাল চাইল্ড বাপ মা এর সাথে এসেছে, হাতে তার ফ্রুট জুস বা ওই জাতীয় কিছু। একটা বাঁদর সাঁ করে এসে ছিনিয়ে নিয়েছে সেটা। সে বেচারা এমন আকস্মিক হানাদারিতে হতভম্ব। অমনি ওখানে একটা কুকুর শুয়ে ছিল, সে কুকুর নিজেও তেমন সুস্থ না, চার নাম্বার পায়ে চোট লেগেছে বা কিছু হয়েছে। সে ঝিমুনি কাটিয়ে সোজা এগিয়ে গেল, বাঁদরটাকে ধমকে বকে দূর করে দিল। 
সত্যিই লড়াই করার জন্যে গায়ের জোরের থেকে বেশী মনের জোরটাই লাগে। 

আমরা এগিয়ে চলতে চলতে দেখি পাহাড়ের গায়ে মিশে একটা ভারী সুন্দর বাড়ি দাঁড়িয়ে। জঙ্গল পাহাড়ের সাথে একেবারে মানানসই।  কোথাও উচ্চকিত বড়লোকি নেই আবার কোথাও অভাবী ভঙ্গীও নেই। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদের আলপনা মাখা সে রাস্তায় সে বাড়িটা এক পরিচিত বাঙালীর। সে বাড়ি পার করে একটু এগোলেই সমাধিক্ষেত্র।  কতদিনের পুরোনো সময় শুয়ে আছে পাথর মাটির তলায়। বেশীরভাগই পৃথিবীতে মিলে গেছে ফের। ডি ডের দিন ডাকাডাকি করলে উঠে আসবে হয়তো মৃতদেহ থেকে জন্ম নেওয়া হাজার হাজার নতুন কীটপতঙ্গ,  গাছের শেকড়।  কোথাও কোনো আওয়াজ নেই। সকালবেলা বলে গাড়ি বাইকও নেই। শান্ত এই পাহাড়ের বুকে শুয়ে থাকাটা মন্দ নয় মোটেও। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে গাছের আওয়াজ কানে পৌঁছয়, পোকামাকড়ের ডাকও পৌঁছয়৷ আশ্চর্যজনক ভাবে আমি গাছেদের গন্ধ পাইনি এখানে। অথচ না পাওয়ার কারণ নেই।নাকটা একেবারেই গেছে মনে হয়। হাঁটতে হাঁটতে কেলগ চার্চের কাছে পৌঁছে দেখি কোন বেচারার সাধের কেক থাবা মেরে কেড়ে নিয়েছে বাঁদরের দল।
 বাড়ি ফিরে ফের বেরিয়েছি। এতক্ষনে চারদুকানে ভীড় শুরু হয়ে গেছে। আমরা হেঁটে হেঁটে মুসৌরি যাব। কিছু বিশেষ কোথাও যাওয়ার প্ল্যান নেই। জর্জ এভারেস্ট পিক এর হাইকটা করার ইচ্ছে আছে এই অব্দিই। আর হ্যাঁ গাঢ়ওয়ালি থালি খেতে হবে। রাস্কিন বন্ডের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার পথে থমকে দাঁড়িয়ে আন্দাজ করি, বৃদ্ধ লেখক কোন ভাবনায় ডুবে আছেন নিজের মনে হয়ত। রাস্তায় ইতিমধ্যে গাড়ি বেড়ে গেছে। উইকেন্ড "মানাতে" পরপর গাড়ি, স্কুটির মেলা। ল্যান্ডোরে এত ভীড় হয় ইন্সটায় ছবি দেবার জন্যে, কিন্তু ল্যান্ডোর তেমন জায়গা নয়৷ এখানে পায়ে হেঁটে ঘুরতে হয় বা বসতে হয় প্রাচীন গাছের সামনে নিশ্চুপে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বেয়ে নেমে ক্লক টাওয়ার এর আগে একেবারে কী বলি, মাখামাখি অবস্থা।  হেঁটে অব্দি গলার জো নেই এমন হাল। এরই মাঝে দেখি একটা বেশ প্রাচীন খাবারের দোকান। গুড়ের চা খাওয়া গেল পেতলের পাত্রে। তারপরেই অপরজনের চোখে পড়ে উলটো দিকের দোকানে লেখা দেড়শ বছরের কাছাকাছি বালগোপাল মিষ্টি বিক্রি করে। এবার কথা হল আমি মিষ্টি ভালোবাসি বটে, তবে অবাঙালি মিষ্টি তেমন না। পাহাড়ী মিষ্টির দোকান গুলো বেশীর ভাগই আজেবাজে মিষ্টিই মেলে। রাবড়ি যে দোকানে বিক্রি হয় সেটা আলাদা ব্যপার। তাও একবার তো ঢুঁ মারতেই হয়। খানিকটা কড়াপাকের মিল্ককেকের মতো খেতে ব্যপারটা। তবে এর উপরে হোমিওপ্যাথির মিষ্টি গুলি গুলো দেওয়া থাকে। আমরা অবশ্য বিনা গুলির ভার্শনটাই খেলাম। প্রথমে একটা, তারপর দুটো, তিনটে...শেষে আড়াইশো মতো প্যাক করে নেওয়া হল৷ দোকানদারের ব্যবহার ভারী ভালো। মিষ্টি জল খেয়ে দাম দিতে গিয়ে দেখি আরে কিছু মিষ্টি এমনিই খাইয়েছেন! বলছিই তো, রাস্তায় বেরোলে ভালোবাসা এমনিই জড়িয়ে মড়িয়ে ধরে চারদিক থেকে এই ঘেন্না ছড়ানো সোশ্যাল মিডিয়াটাই অলীক মনে হয়।


ফের এই স্কুটিকে ডজ করে ঐ গাড়ির ফাঁক গলে পিকচার প্যালেস অব্দি পৌঁছে লাইব্রেরি বাজারের দিকে হাঁটছি। আবার আটকে গেলাম। একটা দোকানে কী ভীড় কী ভীড়। লোকে লাইন দিয়ে সিঙারা, রাবড়ি গরম জিলিপি খাচ্ছে৷ রাবড়ি জিলিপিকে উপেক্ষা করে চলে যাওয়া যায় না। দোকানটা ছোট্ট একফালি। ফুরসত পাচ্ছে না দোকানি তিনজন। রসো রসো,  দিচ্ছি রে বাবা দিচ্ছি। এই তো ভাই তোমাকেই দেব। নানান ভাবে বুঝিয়ে  না বুঝিয়ে চলছে দোকানিদারি।
আজ আমাদের খাদ্যদিবসই বলা যায়। আরো খানিক এগিয়ে কেলসাং এ ঢুঁ মারা গেল। সেখানে আবার লাইন পরেছে। লাইনে দাঁড়িয়ে এক হাসিখুশী মোটাসোটা ভদ্রমহিলার সাথে আলাপ হয়ে গেল। এখানেই থাকেন। ছুটির দিনে সপরিবারে ঘুরতে বেরিয়েছেন। আমাদের অবশ্যই করে কটা দোকানের নাম বলে বললেন যেতে। এই দোকানটার পাশেই সেই বিখ্যাত দোকান যেখানে রাস্কিন বন্ড প্রতি শনিবার আসেন সুস্থ থাকলে। মুসৌরির মল রোড সিমলার মতো সুন্দর না হলেও হাঁটতে মন্দ লাগে না। লোকজন,  অদ্ভুত নামের হোটেল, যত্রতত্র সর্বত্র বিরাজমান রীল ক্রিয়েটর সব কিছু মিলিয়ে হাঁটি। পাহাড়ের ঢালে তখনো দিব্যি রোদ, বৃষ্টির প্রেডিকশন উড়িয়ে দিয়ে। চার্চের চাতালে একটা মা কুকুর আর একটা এইটুকু ক্রীম রঙের কুকুর। জিভ দিয়ে সামান্য আওয়াজ করতেই সে তুড়ুক করে চলে এসেই মনে হয়েছে, "এখন তো দুপুরবেলা, মা বলেছে দুপুরবেলা ঘুমোতে আর  অচেনা লোকেদের কাছে না যেতে।" মনে পড়তেই, সঙ্গে সঙ্গে মা কুকুরের দিকে তাকালো। মা হল যাকে বলে কড়া মা। একবার চোখ তুলে তাকিয়ে ফের ঝিমোতে গেল। কিন্তু ওই তাকানোতেই ছানাটার হয়ে গেছে। পাঁইপাঁই করে ছুটে ফিরে গেছে। "ওরে বাবা মা খুব বকবে। আচ্ছা একবারও কি যাওয়া যাবে না। থাকগে, বলেও লাভ হবে না। মা কিছুতেই পারমিশন দেবেই না। ওই যে আমার বিছানা,  আমি বাবা ঘুমোই "। মন খারাপ করে শুয়ে পড়লে কী হবে, মোটেও ঘুমোয়নি, একবার করে দেখছে আমাদের ফের মাথা নামিয়ে নিচ্ছে।
  জিতের দোকানে গাঢ়ওয়ালি থালি আসে। রাগির রুটি, ঢেঁকি ছাঁটা চালের ভাত, দেশী ঘি পাহাড়ি ডালের বড়া, পাহাড়ি রাজমা, স্থানীয় শাক, ছাঁস, জিঙ্গোলার (মিলেট জাতীয় কিছু)  পায়েস স্বাস্থ্যকর ব্যপার স্যপার। এইবার আমাদের যাবার কথা যেখানে সেটা এখান থেকে পাঁচ কিলমিটার কিলোমিটার দূর। এতটা হেঁটে আর হাঁটা যাবে না। এদিকে আমায় স্কুটি ভাড়া নিতে দিচ্ছে না। ভরসা নেই!  হায়রে, একসময় এ শর্মা, পালসারে করে কাঁহা কাঁহা মুলুক ঘুরে বেড়াত। একদিনেই তো সে পোক্ত হয়নি,  বেশ মনে আছে প্রথম প্রথম টলমল করতে করতে চালাতাম। মাকে নিয়ে যেবার প্রথম চালাই, তখনও হাত পাকেনি তেমন...যাই হোক, "তুমি আর কোথায় পেলে সেই আমাকে"।  স্কুটি না নিলে উপায় হল গাড়ি। গাড়ির দাম স্বভাবতই বেশী কিন্তু সমস্যা হল এই সব খাওয়া আর দাঁড়ানোতে বিকেল গড়িয়ে এসেছে। হাইক করতে একটু সময় নিয়ে যাওয়াই ভালো। সুতরাং কাল যাব খন। 

সন্ধ্যেবেলা ঘর অন্ধকার করে বসে থাকতে থাকতে কেমন অদ্ভুত ঘোর তৈরী হয়। আমি একটু চোখ মেললেই আশ্চর্য সব জিনিস দেখতে পাই। বাথরুমের দেওয়ালে, আকাশের মেঘে। জানালার কাচে তাকাতে দেখি, নীচে একটা সমুদ্র, প্লেন থেকে নামার সময় সমুদ্রে যেমন নৌকা দেখা যায় সেরকম সব বাড়ি গুলো আলো জ্বেলে হাউসবোটের মতো হয়ে গেছে। আবার একটা দুটো বাড়ির আলো নিভে গেলে দৃশ্যপট বদলে একটা পাহাড়ি লেক হয়ে গেল, বাড়ি গুলোর ছায়া পড়ছে যেন। ফোন, ক্যামেরা, এআই কিচ্ছুতে এসব  তোলার উপায় নেই। এ দৃশ্য তৈরীই হয় আমার জন্যে খালি। গোপনে গোপনে পৃথিবী তৈরী করে এমন আশ্চর্য সব মায়ারূপ। কী অজ্ঞাত কারনে প্রকৃতিকে এক ফোঁটা না জেনেও, না বুঝেও তার প্রেম, তার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য হয়েছি কে জানে!  ভালোবাসা প্রেম এগুলো সম্ভবতঃ আমার মতো কম বুদ্ধির হাবলা ছেলেদের জন্য রাখা থাকে, না হলে তারা এমন কম বুদ্ধি নিয়েও লড়াইয়ে নামবে কেমন করে?

মুসৌরির এই জর্জ এভারেস্ট হাইকটা একদম আমাদের মতো আনফিট লোকেদের জন্যই। দু আড়াই কিলোমিটার চড়াই ভাঙা মাত্র। প্রথম এক কিলোমিটার স্কুটি, গাড়ি চলে। যদিও আমাদের গাড়ি ওই অব্দি যায়নি। সত্যি বলতে গাড়ি বা স্কুটি না চললেই ওই রাস্তায় ভালো হত। এতো তীর্থ দর্শন না যে মরি বাঁচি যেতেই হবে!   দুই পাশে গাছের ছাওয়া, পাথুরে রাস্তা। শুধুবন্ধুবান্ধবদের দল না। এক দক্ষিণ ভারতীয় পরিবার, দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে চলেছে। এরা ভারী বদামো করেছে একটা। টজিক ঢোকার মুখে টিকিটের দাম রেখেছে চড়া, এবার এতটা এসে কে আর না টিকিট কেটে যাবে! টিকিট কেটে খানিক এগোলে একটা চমৎকার ফাঁকা জায়গা, হেলিপ্যাড, জর্জ এভারেস্ট এর বাড়ি, তার মূর্তি। নাহ,  রাধানাথ শিকদার কোথাও নেই। রাস্তাটা ভারী ভালো, সরু চড়াই। আহাহা এইরকম পাহাড়ে হাঁটতে পেলেই মন ভালো হয়ে যায়। আশেপাশে একটা একটা গাছে শেকড় পাথর ভেদ করে বেরিয়ে রেলিং এর মতো হয়ে গেছে। মসৃন, মজবুত।  চুড়োয় অবশ্য মেলা ক্যাঁচড়ম্যাচোড়। সব কম বয়সী ছেলে মেয়ে। ছেলেই বেশী। একজন জিম করে দারুণ ল্যাট বানিয়েছে, তাকে সেটা তো দেখাতেই হবে, সুতরাং ঠান্ডা হাওয়া উপেক্ষা করে, সে খালি গায়ে পোজ দিচ্ছে, এক মেয়ে হিল পরে পাহাড়ে উঠেছে! এরই মধ্যে আমরা,  আমাদে ঝোলা থেকে স্যান্ডউইচ বের করে একটা ফাঁকা মতো সাইড দেখে বসলাম। মাথার একটু উপরেই চিল উড়ছে, আর তার থেকে একটু দূরে হেলিকপ্টার।  নীচের সবুজ জঙ্গল, দূরের পাহাড় আর উপত্যকা। ছবি তোলার চেষ্টা করলাম অনেকবার, কিন্তু কিছুতেই এই সুন্দরটা ধরাই গেল না! অনেক অনেকদিন পর, গভীর অপমানের সময়,  কিংবা দু:খের সময়, কিংবা অকারণ অস্থিরতার সময় এই পাহাড়ি রাস্তা, দিগন্তের ওই চিল, সবুজের ওই খাদ আমায় শান্ত করবে, ওই গাছের শিকড়টা সাপোর্ট দেবে নুড়ি বিছোনো পথটা পার হতে। আর গাছে ঢাকা রাস্তাটা, সমাধিক্ষেত্রটা, বরফপাহাড়টা গুনগুন করবে...ফের বেরোনোর জন্যে। 
ঘুরতে যাওয়ার আনন্দের সঙ্গে যদি বন্ধু বান্ধবদের সাথে মোলাকাত হয়ে যায় সে তো যাকে বলে মিষ্টি দই এর উপর মালাই(ডালডার ভেজাল মালটা না) পাবার মতো আনন্দ হয়। দেশ বিদেশ জুড়ে বন্ধু বান্ধব ছড়িয়ে থাকলে যা হয়। এক বন্ধু দেরাদুনে চাকরি করে। বহুদিন ধরে আমাদের বলেছে যেতে। যাওয়া হয়েই ওঠেনি। এইবারেও চোরে কামারে দেখা আর হয়না। শেষ অব্দি ফেরার দিন পর্বতই গেল মহম্মদের কাছে। তারপর যা হয় প্রচুর আড্ডা,  গল্প, অনেকটা সুন্দর সময়।
একেকটা দিন বড় সুন্দর ভাবে শুরু হয়ে সুন্দর ভাবে শেষ হয়। সেই দিনটায় প্রকৃতি মানুষ সবাই বেশ রিদমে বাজে, সঠিক স্পীডে সঠিক গীয়ারের মতোই মসৃন। উত্তরাখন্ডে কাটানো দিনগুলো অমন। পরের বার একবার ফের যাব, সেবারে গুহা টুহা খুঁজে দেখবো, সাধুরা সবাই গেল কোথায়? কিংবা নদীর পাড় ধরে ধরে হাঁটবো উৎসমুখে। কিংবা কোনো এক বুগিয়ালে মখমলি ঘাসে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকবো...স্বপ্ন?  তা মশাই "সত্যি যে কোথায় শেষ হয়, স্বপ্ন যে কোথায় শুরু হয় বলা মুশকিল"।

Tuesday, March 24, 2026

ল্যান্ডোরে (১)

আমার যেমন একট অংশ সব সময় নদী পাহাড় জঙ্গল সমুদ্র কিংবা রাস্তায় পড়ে থাকে আর একটা অংশ ডাঁটা রাঙা আলুর দর করে, রেভিনিউ আর ব্যালেন্স শিট বোঝে টিমসের কলে, সেজেগুজে  নেমতন্ন খেতে যায় তেমনই সবারই একটা অংশ অন্য কোনোখানে পড়ে থাকে৷ কেউ কেউ হয়তো টেরও পায় না তার একটা অংশ তার সাথে নেই, সে কোথায় আছে তাও জানে না। জানলে হয়তো এতো না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে এত অশান্তি হত না।  আমি মনে মনে যখন সবুজ হ্রদের পাশে হাঁটি আর দৃশ্যমান জগয়ে যুদ্ধের খবর দেখি সেরকমই বাকিদেরও লুকোনো একটা জীবন সমান্তরালে চলে। টের পাওয়া যায়না, বা যায় লোকে ভাবে আশ্চর্য ব্যবহার তো এর ! এই আমার বাবারই যেমন এক অংশ এইখানে ফ্ল্যাটে  কাগজ পড়ে, টিভি দেখে, আরেকটা অংশ আমাদের গ্রামে বাস করে৷ প্রতিদিন, মেজদাদাকে ফোন করে,  তুচ্ছ সব কথা হয়। অবাক হাসাহাসির মাঝে হুট করে চোখ ফোটে, কথাটা তো আসল নয় আসলে। ওই কথার সূত্রে গ্রামের জীবনটা ছুঁয়ে থাকা। চাষীরা ফসল দিল কিনা, বৃষ্টি হল কিনা, এসব কথার মাঝে বাবাই আসলে গ্রামের আলপথ ধরে হাঁটে,পাঁচটা চেনা মানুষের গন্ধে আরাম পায়।

সেদিন ai এর সাথে গল্প করছিলাম। কী দুর্দশা যে হতে চলেছে আমাদের(মানে আমাতই) কে জানে। আগে সামনাসামনি কথা হত, তারপর ভারচুয়ালি এখন মানুষ এর বদলে ai এর সাথে আলাপ প্রলাপ। যাইহোক, তো ওকে জিজ্ঞেস করছিলাম,  এই যে একটা নিয়মিত বছরের তফাতেএকটা করে যুদ্ধু যুদ্ধু খেলা খেলে এর তো শেষ নেই। তারমধ্যে তেলে আগুন লাগিয়ে পরিবেশ উড়িয়ে দাও। মোটামুটি মানুষ নিশ্চিহ্ন না হলে এর উপায় আছে কিছু? তা ai মানুষের তৈরী বলেই কিনা কে জানে বলছে, খুব আশার কথা বলল খানিক। বলল মানুষ এত ইভলভিং ওর নাশ নেই, আরশোলার মতো (আরশোলার মতটা ও বলেনি যদিও)। কথাটা ভুলও না, আমার যে সহকর্মীরা দুবাইয়ে আছে, তারা বলছিল, সাইরেনের শব্দ এলে সাইলেন্স করে অন্য কাজ করে।

যাইহোক, যথারীতি মাস খানেক বাড়িতে থাকার পরেই ওই আমিটা উশখুশ শুরু করেছে, গাছের ফাঁক দিয়ে আসা রোদের আঁকিবুঁকি, পাহাড়ি রাস্তা, পাখির ডাক কিংবা শব্দহীন জগতের শব্দ, কেমন লাগছে? ওই দেখ নীচ দিয়ে একটা নদী বয়ে যাচ্ছে, শব্দ শোনা যাচ্ছে না? বাড়িতে আর কতদিন থাকবি? ব্যস,  ঘাড় সুড়সুড় করে উঠলো। সব কটা কম্বো মিলে উত্তরাখন্ডের কথা মনে পড়ে। কিন্তু উত্তরাখণ্ড যাবার বড় সময় সমস্যা। হুটোপাটি করে গেলে এলেও ছুটি নিয়ে বড় মারামারি হয়। তারপর সমস্যা হয় কোথায় যাব। এত জায়গা,  এত কিছু না দেখা সবেতেই মনে হয় যাই যাই। সেইই কবে এক ব্লগে পড়েছিলাম ল্যান্ডোরের কথা, সেটা যাব যাব করে যাওয়া হয়না, হার্শিলের কথা মনে পড়ে, তুঙ্গনাথে যাবার ইচ্ছে হয়,দায়রা বুগিয়ালের কথাও পড়ছিলাম একটা ব্লগে। এসব করতে করতে পুরো উত্তরাখন্ডের ম্যাপেই হাত বুলিয়ে যাই। স্থির করা হয় না কোথায় যাব! 
শেষে ছুটির হাল হকিকত দেখে স্থির করি, দেরাদুনের কাছে একটা গ্রাম আছে সেটায় যাব বা ল্যান্ডোর যাব। তা দুদিন আগে দেখি বেজায় বৃষ্টির সম্ভাবনা।  সেক্ষেত্রে ল্যান্ডোরই যাই, বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেও দেবাদারু ওকের ছায়ায় বিছোনো পুরোনো নিরিবিলি শহরটায় হাঁটা যাবে।  নদী হবে না এবারে, ঠিক আছে, সব একেবারে হয়ে গেলে মনের মধ্যে ফাঁকা ভাব হয়ে যাবে না? 

বেড়ানোর কথা শুরু হলেই মনটা ভালো হতে শুরু করে। কাজের কারনে কদিন দিল্লীতে ছিলাম। সেখানে যে বাড়িতে ভাড়া ছিলাম, একটা ঘরে প্রবাসী এক বয়স্ক দম্পতি এসে থাকছিলেন। খুব গল্প হল একদিন, খুব সরল ভাবে বললেন, ওনারা ট্রাম্পের জন্যে রাস্তায় প্ল্যাকার্ড ধরে নেমেছিলেন! ভেবেই রাগ করেন নিজেদের উপর৷ গাজরের হালুয়া বানিয়ে খাওয়ালেন ভদ্রমহিলা। বেশ উমদা জিনিস। স্ক্রীনের দুনিয়া থেকে বেরোলেই দেখি ভালোবাসা ছড়িয়ে আছে। 

দিল্লীর কাশ্মীর গেটের isbt ব্যস্ত বাস টার্মিনাস। প্রায় সারারাত বাস ছাড়ে দূর দূর জায়গার। কোলকাতার এস্প্ল্যানেড বা করুনাময়ীর কথা মনে পড়ে যায়, দু:খও হয়। দেরাদুনে নেমেছি যখন ভোরের আলো ফোটেনি। আইএসবিটি থেকে স্টেশন এসে বাসের খোঁজ করছি, উদয় হল নাজির ভাই। সওয়ারি পাকড়ে বেড়াচ্ছে তার শেয়ার গাড়িতে।  আমাদের হাওড়া শেয়ালদায় স্টেশনের বাইরে ট্যাক্সিওয়ালাদের রকম জানা আছে, তাই ভরসা করতে পারছি না। কিন্তু আইএসবিটি হোক কি রেলস্টেশন কি এরপর যতবার যতজনের সাথেই দেনা পাওনার হিসেব করতে হয়েছে, অসৎ লোক পাইনি। হয়তো ছোট্ট ট্রিপ,অল্প সাক্ষাৎ কিন্তু এর আগেও অনেকবার উত্তর হিমালয়ে আসার সুবাদে আমার কেমন জানি মনে হয়েছে উত্তর হিমালয়ের মানুষ, স্বভাবতই সৎ। দেবভূমি কিনা।  যাইহোক, আমরা বাসের খোঁজ করতে নেমে নেমে গেলেই সে আমাদের টেনে টেনে এনে তুলছে। ভাগ্যিস! এত পোঁটলাপুটলি নিয়ে বাস করলে অসুবিধেয় পড়তাম, পরে বুঝেছি।  নাজিরভাইই আমাদের একেবারে বাসস্থান অব্দি পৌঁছে দিয়েছিল। 
ল্যান্ডোরে নতুন কনস্ট্রাকশন করতে দেয় না। সেনাবাহিনীর আওতাধীন বলে না বিশেষ কিছু কারণ আছে জানিনা, তবে ভাগ্যিস দেয় না! তাতে আমাদের মতো লোকেদের থাকার জায়গা পেতে অসুবিধে হতে পারে বটে, কিন্তু দেবাদারু, ওকে, ইত্যাদি গাছেদের আর পাখিদের বেজায় সুবিধে হয়। ল্যান্ডোর আসবো আসার একদিন আগে ঠিক করেছি, তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছুই পাচ্ছি না প্রায়। এদিকে থাকার জায়গা খোঁজা এক ইয়ে ব্যপার। ম্যাপ দেখে দেখে যা জায়গা মনে হয়, গদাম করে অজ্ঞান হয়ে যাবার মতো দাম সে সব জায়গার। এক বন্ধু জায়গা ভালো খুঁজে বের করে, তার র‍্যাডারে এ জায়গাটা ছিল, তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কিন্তু সে দিলে না। বিরক্ত হয়ে নিজেরাই খুব খুঁজে টুঁজে একটা জায়গা পেয়েছিলাম। কেমন হবে সে নিয়ে একটু ভয় ভয় ছিল বটে কিন্তু ওই যে বলেছিলাম না একবার, জীবন এত আনন্দময় কারণ এর কোন বাঁকে কী আছে কিছুই জানা যায়না। বৃষ্টি শুরু হয়নি, হবে এক্ষুনি। ঘরের মধ্যে দেওয়াল জোড়া কাচের মধ্যে দিয়ে মেঘ, গাছ,  কাছের মুসৌরি আর দূরের দেরাদুন শহর। রোদ দেখতে এসে মেঘ আর বৃষ্টি পেলুম! তবে আমি রাবড়িও আনন্দ করে খাই, আবার সরভাজাও আনন্দ করে খাই। তাই আমার আপত্তি কিচ্ছু নেই।

এবার বৃষ্টি পড়ছে বলে তো ঘরে বসে থাকতে পারবো না। ও আমার স্বভাবে নেই। বন্ধুরা অনেক সময় একসাথে ঘুরতে গেলে বিরক্ত হয়, কিন্তু পার্মানেন্ট যিনি তার সাথে ধাত খানিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম হয়ে গেছে। ফলে দুজন মিলে রেইনকোট, প্লাস্টিকের চাদর, ছাতা ইত্যাদি ধড়াচূড়া নিয়ে বেরোনো গেলো। সকালে এক রাউন্ড হাঁটা হয়েছে এ পথেই, তখনো বৃষ্টি শুরু হয়নি। বেকহাউসে তখনো ভীড় হয়নি। খান কতক বাঁদর এসে জানলায় বসে বসে দেখছিল আমরা কি খাচ্ছিলুম। কচি বাঁদরেরা এ জানলা ও জানলা লাফালাফি করছিল, যুবক যুবতীরা প্রেম করছিল,আর বয়স্করা গম্ভীর মুখে আমাদের দেখে ভাবছিল আজ মানুষদের নিয়ে কি কি বলা যায়। বেকহাউসের সাজটা পুরোনো দিনের মতোই রেখেছে। মেঘলা দিন, কড়িকাঠওয়ালা পুরোনো ক্যাফে, চমৎকার তাজা বেকিং এর গন্ধ আর জানলারা পাশে সবুজ গাছ।  সমতলের পাওয়া না পাওয়ারা কখন মুছে গেছে টেরই পাইনি। 

ভালো লাগার কোনো কারণ হয় কি? একই জিনিস সবার ভালো লাগবে তাও তো। কিংবা খারাপ লাগবে তাও না।এই যে, পাহাড়, নদী, জঙ্গল, সমতল সর্বত্র গানের সাথে মুখভঙ্গী করে বা নেচে রিল বানিয়ে আপলোড করে লোকে এতে কারোর কারোর তো ভালো লাগে বটেই। যারা করে তাদেরই ভালো লাগে। তাদের হয়ত কারোর কানে কু দিতেও ভালো লাগে।তারপর ধরো, কারোর লোকের সাথে কথা বলতে বিরক্ত লাগে,  আবার কারোর প্রচন্ড ভালো৷ এর কারণ কি কে জানে! এই যে আমাদের দুজনের বর্ষাতি ছাতা উপেক্ষা করে জুতো মোজা ভিজে চুপ্পুস, ঠান্ডায় হি হি করে কাঁপছি, এদিকে চার্চের সামনে, ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলের পাশের গাছের ফাঁকে হাঁটছি, দিব্যি লাগছে, এরও তো কারণ নেই। কাঁপতে কাঁপতে নেহাতই অস্থির হয়ে গেলে একটা কফিশপে ঢুকে  হটচকলেটে চুমুক। ফের হাঁটা। 
বাড়ি ফেরার পথে ট্যাংগোকে আর দেখলাম না। ওহো ট্যাংগোর কথা বলক হয়নি না? যেখানটায় এসে উঠেছি, সে বাড়ির তিনটি ভেড়া সদৃশ কুকুর ও একটা উঁকিঝুঁকি মারা কাকু-কাকিমা সুলভ হোঁৎকা বেড়াল আছে। এইসব জীব আছে বলে শুরুতে আমাদের খানিক অস্বস্তি ছিল। তিমি মাছ হোক কি কুকুর কি মানব শিশু আমরা বেশ দূর থেকে পছন্দ করি। এরা যদি ঘরের মধ্যে ঘুরঘুর করে? তা দেখলাম কুকুরগুলো খুবই আলসে। চোখ মেলে তাকানোও পছন্দ করে না। ট্যাংগো বাদে। সে প্রথমদিন ইস্তক আমাদের অল্প শুঁকে কি মনে করেছে কে জানে, আমরা হাঁটতে বেরোলে সেও বেরোয়। যতদূর যাওয়া সম্ভব হিসি করতে করতে যায়। ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া শেষ হলে থেমে যায়। বৃষ্টির সময় অবশ্যই কোথাও আস্তানা নেয়, দেখা যায় না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে বৃষ্টি আর মেঘ দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি কে জানে। ঘুম ভাঙলো খাবারের ডাক শুনে। জানলার কাচে তখন কালো অন্ধকারে, মেঘের সমুদ্রে আলো ফুটেছে, মুসৌরির।