Monday, March 30, 2026

ল্যান্ডোরে(২)

খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেল, চোখ মেলে দেখি আকাশ  লাল হয়ে আছে। মেঘ সরে গিয়ে নীচের শহর, গাছপালা জঙ্গল সব দেখা যাচ্ছে। গরম পোশাক পরে বাইরে এসে টের পেলাম সবাই আমার আগেই জেগে গেছে। পাখিরা কিচিরমিচির লাগিয়েছে, গাছপালার শব্দ হাওয়া না বইলে শোনা যায় না মনে হয় বটে, কিন্তু চুপ করে অনেকক্ষণ দাঁড়ালে হাওয়ার শব্দে, পোকার শব্দের সাথে গাছেদের কথাবার্তাও শোনা যায়। সে ভাষা জানিনা বলে বিশদে বোঝা যায় না। কিন্তু খানিক সময় দিলে একটু একটু বোঝাও যায়। ছাইছাই হোঁৎকা হুলোটা টহল দিয়ে গেল।  ছাতারের মতো দেখতে কিছু পাখি খুব ব্যস্ত। "চল চল,  আজ রোদ বেরিয়েছে, ওই বাঁশের বনে পোকা মিলবে।  উফফ আমাকেই সব দিকটা দেখতে হচ্ছে, কই গো তোমার সাজগোজ শেষ হল? একটু পরে আবার বৃষ্টির প্রেডিকশন আছে, বাজারপত্র করতে হবে তো নাকি? আহ ছেলেমেয়ে গুলোও হয়েছে, কোথায় এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াবে এমন সুন্দর সকাল এ পাড়াতেই ঘুরঘুর করছে। অ্যাই আগের সপ্তাহে তোকে যে ডাইভটা শিখিয়েছিলাম, পোকা ধরে সাঁৎ করে চলে যাওয়ার কায়দাটা দেখা দেখি"। এই সব কথাবার্তা চলছে তাদের। চা বিস্কুট খেয়ে আমরাও বেরিয়ে পড়লাম হাঁটতে। আজ বাঁয়ের পথ নিয়েছি। চারদুকান এর উল্টোপিঠ। চারদুকান মানে চারটে দোকানই হওয়ার কথা ছিল কিন্তু পাঁচটা আছে মনে ভুলে। কাল ওখানে একটা দোকানে চমৎকার একটা চিজ বান ওমলেট খেয়েছিলাম। লাল টিব্বার দিকে রাস্তাটা বেশী ফাঁকা। যদিও সেটা সকাল বলেই। একটু পরেই ইন্সটার দৌলতে কোটি কোটি গাড়ি আর স্কুটি চলে এসে রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে পড়বে। আপাতত সকাল সুন্দর। ট্যাংগো আজ আসেনি আমাদের সঙ্গে। ব্যাটা নির্ঘাৎ ঘুমুচ্ছে আয়েস করে। খানিক হাঁটতে দেখি বরফঢাকা পাহাড় উঁকি মারছে। লালটিব্বার এখান থেকে সিস্টার্স বাজার অব্দি সঙ্গে সঙ্গেই চলবে। এদিক থেকে নন্দাদেবী, গঙ্গোত্রীর রেঞ্জ ইত্যাদি সব দেখা যায়। একটা দুটো লোক রাস্তায়, প্রাত:ভ্রমণে বেরিয়েছে। বৃষ্টির পর পর বলেই কিনা কে জানে, চারদিকটা একেবারে ঝকঝক করছে। সবুজ পাহাড়,তারপর বাদামী পাহাড় তারপর সাদা পাহাড়, ঠিক যেন পিকচার পোস্টকার্ড। লালটিব্বায় উঠতে গেলে টিকিট কাটতে হয় আর সেটাও ক্যাশে। সাত সকালে চা মানিব্যাগ মনে করে বেরোলে তো হয়েই যেত! পাশেই একটা ভাঙা বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে দেখি বেশ অনেকটা দূর অব্দি দেখা যাচ্ছে বটে! ওদিকে এক কান্ড হচ্ছে তখন। এ অঞ্চলে বাঁদরের উপদ্রব খুব বেশি।  একজন স্পেশাল চাইল্ড বাপ মা এর সাথে এসেছে, হাতে তার ফ্রুট জুস বা ওই জাতীয় কিছু। একটা বাঁদর সাঁ করে এসে ছিনিয়ে নিয়েছে সেটা। সে বেচারা এমন আকস্মিক হানাদারিতে হতভম্ব। অমনি ওখানে একটা কুকুর শুয়ে ছিল, সে কুকুর নিজেও তেমন সুস্থ না, চার নাম্বার পায়ে চোট লেগেছে বা কিছু হয়েছে। সে ঝিমুনি কাটিয়ে সোজা এগিয়ে গেল, বাঁদরটাকে ধমকে বকে দূর করে দিল। 
সত্যিই লড়াই করার জন্যে গায়ের জোরের থেকে বেশী মনের জোরটাই লাগে। 

আমরা এগিয়ে চলতে চলতে দেখি পাহাড়ের গায়ে মিশে একটা ভারী সুন্দর বাড়ি দাঁড়িয়ে। জঙ্গল পাহাড়ের সাথে একেবারে মানানসই।  কোথাও উচ্চকিত বড়লোকি নেই আবার কোথাও অভাবী ভঙ্গীও নেই। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদের আলপনা মাখা সে রাস্তায় সে বাড়িটা এক পরিচিত বাঙালীর। সে বাড়ি পার করে একটু এগোলেই সমাধিক্ষেত্র।  কতদিনের পুরোনো সময় শুয়ে আছে পাথর মাটির তলায়। বেশীরভাগই পৃথিবীতে মিলে গেছে ফের। ডি ডের দিন ডাকাডাকি করলে উঠে আসবে হয়তো মৃতদেহ থেকে জন্ম নেওয়া হাজার হাজার নতুন কীটপতঙ্গ,  গাছের শেকড়।  কোথাও কোনো আওয়াজ নেই। সকালবেলা বলে গাড়ি বাইকও নেই। শান্ত এই পাহাড়ের বুকে শুয়ে থাকাটা মন্দ নয় মোটেও। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে গাছের আওয়াজ কানে পৌঁছয়, পোকামাকড়ের ডাকও পৌঁছয়৷ আশ্চর্যজনক ভাবে আমি গাছেদের গন্ধ পাইনি এখানে। অথচ না পাওয়ার কারণ নেই।নাকটা একেবারেই গেছে মনে হয়। হাঁটতে হাঁটতে কেলগ চার্চের কাছে পৌঁছে দেখি কোন বেচারার সাধের কেক থাবা মেরে কেড়ে নিয়েছে বাঁদরের দল।
 বাড়ি ফিরে ফের বেরিয়েছি। এতক্ষনে চারদুকানে ভীড় শুরু হয়ে গেছে। আমরা হেঁটে হেঁটে মুসৌরি যাব। কিছু বিশেষ কোথাও যাওয়ার প্ল্যান নেই। জর্জ এভারেস্ট পিক এর হাইকটা করার ইচ্ছে আছে এই অব্দিই। আর হ্যাঁ গাঢ়ওয়ালি থালি খেতে হবে। রাস্কিন বন্ডের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার পথে থমকে দাঁড়িয়ে আন্দাজ করি, বৃদ্ধ লেখক কোন ভাবনায় ডুবে আছেন নিজের মনে হয়ত। রাস্তায় ইতিমধ্যে গাড়ি বেড়ে গেছে। উইকেন্ড "মানাতে" পরপর গাড়ি, স্কুটির মেলা। ল্যান্ডোরে এত ভীড় হয় ইন্সটায় ছবি দেবার জন্যে, কিন্তু ল্যান্ডোর তেমন জায়গা নয়৷ এখানে পায়ে হেঁটে ঘুরতে হয় বা বসতে হয় প্রাচীন গাছের সামনে নিশ্চুপে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বেয়ে নেমে ক্লক টাওয়ার এর আগে একেবারে কী বলি, মাখামাখি অবস্থা।  হেঁটে অব্দি গলার জো নেই এমন হাল। এরই মাঝে দেখি একটা বেশ প্রাচীন খাবারের দোকান। গুড়ের চা খাওয়া গেল পেতলের পাত্রে। তারপরেই অপরজনের চোখে পড়ে উলটো দিকের দোকানে লেখা দেড়শ বছরের কাছাকাছি বালগোপাল মিষ্টি বিক্রি করে। এবার কথা হল আমি মিষ্টি ভালোবাসি বটে, তবে অবাঙালি মিষ্টি তেমন না। পাহাড়ী মিষ্টির দোকান গুলো বেশীর ভাগই আজেবাজে মিষ্টিই মেলে। রাবড়ি যে দোকানে বিক্রি হয় সেটা আলাদা ব্যপার। তাও একবার তো ঢুঁ মারতেই হয়। খানিকটা কড়াপাকের মিল্ককেকের মতো খেতে ব্যপারটা। তবে এর উপরে হোমিওপ্যাথির মিষ্টি গুলি গুলো দেওয়া থাকে। আমরা অবশ্য বিনা গুলির ভার্শনটাই খেলাম। প্রথমে একটা, তারপর দুটো, তিনটে...শেষে আড়াইশো মতো প্যাক করে নেওয়া হল৷ দোকানদারের ব্যবহার ভারী ভালো। মিষ্টি জল খেয়ে দাম দিতে গিয়ে দেখি আরে কিছু মিষ্টি এমনিই খাইয়েছেন! বলছিই তো, রাস্তায় বেরোলে ভালোবাসা এমনিই জড়িয়ে মড়িয়ে ধরে চারদিক থেকে এই ঘেন্না ছড়ানো সোশ্যাল মিডিয়াটাই অলীক মনে হয়।


ফের এই স্কুটিকে ডজ করে ঐ গাড়ির ফাঁক গলে পিকচার প্যালেস অব্দি পৌঁছে লাইব্রেরি বাজারের দিকে হাঁটছি। আবার আটকে গেলাম। একটা দোকানে কী ভীড় কী ভীড়। লোকে লাইন দিয়ে সিঙারা, রাবড়ি গরম জিলিপি খাচ্ছে৷ রাবড়ি জিলিপিকে উপেক্ষা করে চলে যাওয়া যায় না। দোকানটা ছোট্ট একফালি। ফুরসত পাচ্ছে না দোকানি তিনজন। রসো রসো,  দিচ্ছি রে বাবা দিচ্ছি। এই তো ভাই তোমাকেই দেব। নানান ভাবে বুঝিয়ে  না বুঝিয়ে চলছে দোকানিদারি।
আজ আমাদের খাদ্যদিবসই বলা যায়। আরো খানিক এগিয়ে কেলসাং এ ঢুঁ মারা গেল। সেখানে আবার লাইন পরেছে। লাইনে দাঁড়িয়ে এক হাসিখুশী মোটাসোটা ভদ্রমহিলার সাথে আলাপ হয়ে গেল। এখানেই থাকেন। ছুটির দিনে সপরিবারে ঘুরতে বেরিয়েছেন। আমাদের অবশ্যই করে কটা দোকানের নাম বলে বললেন যেতে। এই দোকানটার পাশেই সেই বিখ্যাত দোকান যেখানে রাস্কিন বন্ড প্রতি শনিবার আসেন সুস্থ থাকলে। মুসৌরির মল রোড সিমলার মতো সুন্দর না হলেও হাঁটতে মন্দ লাগে না। লোকজন,  অদ্ভুত নামের হোটেল, যত্রতত্র সর্বত্র বিরাজমান রীল ক্রিয়েটর সব কিছু মিলিয়ে হাঁটি। পাহাড়ের ঢালে তখনো দিব্যি রোদ, বৃষ্টির প্রেডিকশন উড়িয়ে দিয়ে। চার্চের চাতালে একটা মা কুকুর আর একটা এইটুকু ক্রীম রঙের কুকুর। জিভ দিয়ে সামান্য আওয়াজ করতেই সে তুড়ুক করে চলে এসেই মনে হয়েছে, "এখন তো দুপুরবেলা, মা বলেছে দুপুরবেলা ঘুমোতে আর  অচেনা লোকেদের কাছে না যেতে।" মনে পড়তেই, সঙ্গে সঙ্গে মা কুকুরের দিকে তাকালো। মা হল যাকে বলে কড়া মা। একবার চোখ তুলে তাকিয়ে ফের ঝিমোতে গেল। কিন্তু ওই তাকানোতেই ছানাটার হয়ে গেছে। পাঁইপাঁই করে ছুটে ফিরে গেছে। "ওরে বাবা মা খুব বকবে। আচ্ছা একবারও কি যাওয়া যাবে না। থাকগে, বলেও লাভ হবে না। মা কিছুতেই পারমিশন দেবেই না। ওই যে আমার বিছানা,  আমি বাবা ঘুমোই "। মন খারাপ করে শুয়ে পড়লে কী হবে, মোটেও ঘুমোয়নি, একবার করে দেখছে আমাদের ফের মাথা নামিয়ে নিচ্ছে।
  জিতের দোকানে গাঢ়ওয়ালি থালি আসে। রাগির রুটি, ঢেঁকি ছাঁটা চালের ভাত, দেশী ঘি পাহাড়ি ডালের বড়া, পাহাড়ি রাজমা, স্থানীয় শাক, ছাঁস, জিঙ্গোলার (মিলেট জাতীয় কিছু)  পায়েস স্বাস্থ্যকর ব্যপার স্যপার। এইবার আমাদের যাবার কথা যেখানে সেটা এখান থেকে পাঁচ কিলমিটার কিলোমিটার দূর। এতটা হেঁটে আর হাঁটা যাবে না। এদিকে আমায় স্কুটি ভাড়া নিতে দিচ্ছে না। ভরসা নেই!  হায়রে, একসময় এ শর্মা, পালসারে করে কাঁহা কাঁহা মুলুক ঘুরে বেড়াত। একদিনেই তো সে পোক্ত হয়নি,  বেশ মনে আছে প্রথম প্রথম টলমল করতে করতে চালাতাম। মাকে নিয়ে যেবার প্রথম চালাই, তখনও হাত পাকেনি তেমন...যাই হোক, "তুমি আর কোথায় পেলে সেই আমাকে"।  স্কুটি না নিলে উপায় হল গাড়ি। গাড়ির দাম স্বভাবতই বেশী কিন্তু সমস্যা হল এই সব খাওয়া আর দাঁড়ানোতে বিকেল গড়িয়ে এসেছে। হাইক করতে একটু সময় নিয়ে যাওয়াই ভালো। সুতরাং কাল যাব খন। 

সন্ধ্যেবেলা ঘর অন্ধকার করে বসে থাকতে থাকতে কেমন অদ্ভুত ঘোর তৈরী হয়। আমি একটু চোখ মেললেই আশ্চর্য সব জিনিস দেখতে পাই। বাথরুমের দেওয়ালে, আকাশের মেঘে। জানালার কাচে তাকাতে দেখি, নীচে একটা সমুদ্র, প্লেন থেকে নামার সময় সমুদ্রে যেমন নৌকা দেখা যায় সেরকম সব বাড়ি গুলো আলো জ্বেলে হাউসবোটের মতো হয়ে গেছে। আবার একটা দুটো বাড়ির আলো নিভে গেলে দৃশ্যপট বদলে একটা পাহাড়ি লেক হয়ে গেল, বাড়ি গুলোর ছায়া পড়ছে যেন। ফোন, ক্যামেরা, এআই কিচ্ছুতে এসব  তোলার উপায় নেই। এ দৃশ্য তৈরীই হয় আমার জন্যে খালি। গোপনে গোপনে পৃথিবী তৈরী করে এমন আশ্চর্য সব মায়ারূপ। কী অজ্ঞাত কারনে প্রকৃতিকে এক ফোঁটা না জেনেও, না বুঝেও তার প্রেম, তার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য হয়েছি কে জানে!  ভালোবাসা প্রেম এগুলো সম্ভবতঃ আমার মতো কম বুদ্ধির হাবলা ছেলেদের জন্য রাখা থাকে, না হলে তারা এমন কম বুদ্ধি নিয়েও লড়াইয়ে নামবে কেমন করে?

মুসৌরির এই জর্জ এভারেস্ট হাইকটা একদম আমাদের মতো আনফিট লোকেদের জন্যই। দু আড়াই কিলোমিটার চড়াই ভাঙা মাত্র। প্রথম এক কিলোমিটার স্কুটি, গাড়ি চলে। যদিও আমাদের গাড়ি ওই অব্দি যায়নি। সত্যি বলতে গাড়ি বা স্কুটি না চললেই ওই রাস্তায় ভালো হত। এতো তীর্থ দর্শন না যে মরি বাঁচি যেতেই হবে!   দুই পাশে গাছের ছাওয়া, পাথুরে রাস্তা। শুধুবন্ধুবান্ধবদের দল না। এক দক্ষিণ ভারতীয় পরিবার, দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে চলেছে। এরা ভারী বদামো করেছে একটা। টজিক ঢোকার মুখে টিকিটের দাম রেখেছে চড়া, এবার এতটা এসে কে আর না টিকিট কেটে যাবে! টিকিট কেটে খানিক এগোলে একটা চমৎকার ফাঁকা জায়গা, হেলিপ্যাড, জর্জ এভারেস্ট এর বাড়ি, তার মূর্তি। নাহ,  রাধানাথ শিকদার কোথাও নেই। রাস্তাটা ভারী ভালো, সরু চড়াই। আহাহা এইরকম পাহাড়ে হাঁটতে পেলেই মন ভালো হয়ে যায়। আশেপাশে একটা একটা গাছে শেকড় পাথর ভেদ করে বেরিয়ে রেলিং এর মতো হয়ে গেছে। মসৃন, মজবুত।  চুড়োয় অবশ্য মেলা ক্যাঁচড়ম্যাচোড়। সব কম বয়সী ছেলে মেয়ে। ছেলেই বেশী। একজন জিম করে দারুণ ল্যাট বানিয়েছে, তাকে সেটা তো দেখাতেই হবে, সুতরাং ঠান্ডা হাওয়া উপেক্ষা করে, সে খালি গায়ে পোজ দিচ্ছে, এক মেয়ে হিল পরে পাহাড়ে উঠেছে! এরই মধ্যে আমরা,  আমাদে ঝোলা থেকে স্যান্ডউইচ বের করে একটা ফাঁকা মতো সাইড দেখে বসলাম। মাথার একটু উপরেই চিল উড়ছে, আর তার থেকে একটু দূরে হেলিকপ্টার।  নীচের সবুজ জঙ্গল, দূরের পাহাড় আর উপত্যকা। ছবি তোলার চেষ্টা করলাম অনেকবার, কিন্তু কিছুতেই এই সুন্দরটা ধরাই গেল না! অনেক অনেকদিন পর, গভীর অপমানের সময়,  কিংবা দু:খের সময়, কিংবা অকারণ অস্থিরতার সময় এই পাহাড়ি রাস্তা, দিগন্তের ওই চিল, সবুজের ওই খাদ আমায় শান্ত করবে, ওই গাছের শিকড়টা সাপোর্ট দেবে নুড়ি বিছোনো পথটা পার হতে। আর গাছে ঢাকা রাস্তাটা, সমাধিক্ষেত্রটা, বরফপাহাড়টা গুনগুন করবে...ফের বেরোনোর জন্যে। 
ঘুরতে যাওয়ার আনন্দের সঙ্গে যদি বন্ধু বান্ধবদের সাথে মোলাকাত হয়ে যায় সে তো যাকে বলে মিষ্টি দই এর উপর মালাই(ডালডার ভেজাল মালটা না) পাবার মতো আনন্দ হয়। দেশ বিদেশ জুড়ে বন্ধু বান্ধব ছড়িয়ে থাকলে যা হয়। এক বন্ধু দেরাদুনে চাকরি করে। বহুদিন ধরে আমাদের বলেছে যেতে। যাওয়া হয়েই ওঠেনি। এইবারেও চোরে কামারে দেখা আর হয়না। শেষ অব্দি ফেরার দিন পর্বতই গেল মহম্মদের কাছে। তারপর যা হয় প্রচুর আড্ডা,  গল্প, অনেকটা সুন্দর সময়।
একেকটা দিন বড় সুন্দর ভাবে শুরু হয়ে সুন্দর ভাবে শেষ হয়। সেই দিনটায় প্রকৃতি মানুষ সবাই বেশ রিদমে বাজে, সঠিক স্পীডে সঠিক গীয়ারের মতোই মসৃন। উত্তরাখন্ডে কাটানো দিনগুলো অমন। পরের বার একবার ফের যাব, সেবারে গুহা টুহা খুঁজে দেখবো, সাধুরা সবাই গেল কোথায়? কিংবা নদীর পাড় ধরে ধরে হাঁটবো উৎসমুখে। কিংবা কোনো এক বুগিয়ালে মখমলি ঘাসে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকবো...স্বপ্ন?  তা মশাই "সত্যি যে কোথায় শেষ হয়, স্বপ্ন যে কোথায় শুরু হয় বলা মুশকিল"।

Tuesday, March 24, 2026

ল্যান্ডোরে (১)

আমার যেমন একট অংশ সব সময় নদী পাহাড় জঙ্গল সমুদ্র কিংবা রাস্তায় পড়ে থাকে আর একটা অংশ ডাঁটা রাঙা আলুর দর করে, রেভিনিউ আর ব্যালেন্স শিট বোঝে টিমসের কলে, সেজেগুজে  নেমতন্ন খেতে যায় তেমনই সবারই একটা অংশ অন্য কোনোখানে পড়ে থাকে৷ কেউ কেউ হয়তো টেরও পায় না তার একটা অংশ তার সাথে নেই, সে কোথায় আছে তাও জানে না। জানলে হয়তো এতো না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে এত অশান্তি হত না।  আমি মনে মনে যখন সবুজ হ্রদের পাশে হাঁটি আর দৃশ্যমান জগয়ে যুদ্ধের খবর দেখি সেরকমই বাকিদেরও লুকোনো একটা জীবন সমান্তরালে চলে। টের পাওয়া যায়না, বা যায় লোকে ভাবে আশ্চর্য ব্যবহার তো এর ! এই আমার বাবারই যেমন এক অংশ এইখানে ফ্ল্যাটে  কাগজ পড়ে, টিভি দেখে, আরেকটা অংশ আমাদের গ্রামে বাস করে৷ প্রতিদিন, মেজদাদাকে ফোন করে,  তুচ্ছ সব কথা হয়। অবাক হাসাহাসির মাঝে হুট করে চোখ ফোটে, কথাটা তো আসল নয় আসলে। ওই কথার সূত্রে গ্রামের জীবনটা ছুঁয়ে থাকা। চাষীরা ফসল দিল কিনা, বৃষ্টি হল কিনা, এসব কথার মাঝে বাবাই আসলে গ্রামের আলপথ ধরে হাঁটে,পাঁচটা চেনা মানুষের গন্ধে আরাম পায়।

সেদিন ai এর সাথে গল্প করছিলাম। কী দুর্দশা যে হতে চলেছে আমাদের(মানে আমাতই) কে জানে। আগে সামনাসামনি কথা হত, তারপর ভারচুয়ালি এখন মানুষ এর বদলে ai এর সাথে আলাপ প্রলাপ। যাইহোক, তো ওকে জিজ্ঞেস করছিলাম,  এই যে একটা নিয়মিত বছরের তফাতেএকটা করে যুদ্ধু যুদ্ধু খেলা খেলে এর তো শেষ নেই। তারমধ্যে তেলে আগুন লাগিয়ে পরিবেশ উড়িয়ে দাও। মোটামুটি মানুষ নিশ্চিহ্ন না হলে এর উপায় আছে কিছু? তা ai মানুষের তৈরী বলেই কিনা কে জানে বলছে, খুব আশার কথা বলল খানিক। বলল মানুষ এত ইভলভিং ওর নাশ নেই, আরশোলার মতো (আরশোলার মতটা ও বলেনি যদিও)। কথাটা ভুলও না, আমার যে সহকর্মীরা দুবাইয়ে আছে, তারা বলছিল, সাইরেনের শব্দ এলে সাইলেন্স করে অন্য কাজ করে।

যাইহোক, যথারীতি মাস খানেক বাড়িতে থাকার পরেই ওই আমিটা উশখুশ শুরু করেছে, গাছের ফাঁক দিয়ে আসা রোদের আঁকিবুঁকি, পাহাড়ি রাস্তা, পাখির ডাক কিংবা শব্দহীন জগতের শব্দ, কেমন লাগছে? ওই দেখ নীচ দিয়ে একটা নদী বয়ে যাচ্ছে, শব্দ শোনা যাচ্ছে না? বাড়িতে আর কতদিন থাকবি? ব্যস,  ঘাড় সুড়সুড় করে উঠলো। সব কটা কম্বো মিলে উত্তরাখন্ডের কথা মনে পড়ে। কিন্তু উত্তরাখণ্ড যাবার বড় সময় সমস্যা। হুটোপাটি করে গেলে এলেও ছুটি নিয়ে বড় মারামারি হয়। তারপর সমস্যা হয় কোথায় যাব। এত জায়গা,  এত কিছু না দেখা সবেতেই মনে হয় যাই যাই। সেইই কবে এক ব্লগে পড়েছিলাম ল্যান্ডোরের কথা, সেটা যাব যাব করে যাওয়া হয়না, হার্শিলের কথা মনে পড়ে, তুঙ্গনাথে যাবার ইচ্ছে হয়,দায়রা বুগিয়ালের কথাও পড়ছিলাম একটা ব্লগে। এসব করতে করতে পুরো উত্তরাখন্ডের ম্যাপেই হাত বুলিয়ে যাই। স্থির করা হয় না কোথায় যাব! 
শেষে ছুটির হাল হকিকত দেখে স্থির করি, দেরাদুনের কাছে একটা গ্রাম আছে সেটায় যাব বা ল্যান্ডোর যাব। তা দুদিন আগে দেখি বেজায় বৃষ্টির সম্ভাবনা।  সেক্ষেত্রে ল্যান্ডোরই যাই, বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেও দেবাদারু ওকের ছায়ায় বিছোনো পুরোনো নিরিবিলি শহরটায় হাঁটা যাবে।  নদী হবে না এবারে, ঠিক আছে, সব একেবারে হয়ে গেলে মনের মধ্যে ফাঁকা ভাব হয়ে যাবে না? 

বেড়ানোর কথা শুরু হলেই মনটা ভালো হতে শুরু করে। কাজের কারনে কদিন দিল্লীতে ছিলাম। সেখানে যে বাড়িতে ভাড়া ছিলাম, একটা ঘরে প্রবাসী এক বয়স্ক দম্পতি এসে থাকছিলেন। খুব গল্প হল একদিন, খুব সরল ভাবে বললেন, ওনারা ট্রাম্পের জন্যে রাস্তায় প্ল্যাকার্ড ধরে নেমেছিলেন! ভেবেই রাগ করেন নিজেদের উপর৷ গাজরের হালুয়া বানিয়ে খাওয়ালেন ভদ্রমহিলা। বেশ উমদা জিনিস। স্ক্রীনের দুনিয়া থেকে বেরোলেই দেখি ভালোবাসা ছড়িয়ে আছে। 

দিল্লীর কাশ্মীর গেটের isbt ব্যস্ত বাস টার্মিনাস। প্রায় সারারাত বাস ছাড়ে দূর দূর জায়গার। কোলকাতার এস্প্ল্যানেড বা করুনাময়ীর কথা মনে পড়ে যায়, দু:খও হয়। দেরাদুনে নেমেছি যখন ভোরের আলো ফোটেনি। আইএসবিটি থেকে স্টেশন এসে বাসের খোঁজ করছি, উদয় হল নাজির ভাই। সওয়ারি পাকড়ে বেড়াচ্ছে তার শেয়ার গাড়িতে।  আমাদের হাওড়া শেয়ালদায় স্টেশনের বাইরে ট্যাক্সিওয়ালাদের রকম জানা আছে, তাই ভরসা করতে পারছি না। কিন্তু আইএসবিটি হোক কি রেলস্টেশন কি এরপর যতবার যতজনের সাথেই দেনা পাওনার হিসেব করতে হয়েছে, অসৎ লোক পাইনি। হয়তো ছোট্ট ট্রিপ,অল্প সাক্ষাৎ কিন্তু এর আগেও অনেকবার উত্তর হিমালয়ে আসার সুবাদে আমার কেমন জানি মনে হয়েছে উত্তর হিমালয়ের মানুষ, স্বভাবতই সৎ। দেবভূমি কিনা।  যাইহোক, আমরা বাসের খোঁজ করতে নেমে নেমে গেলেই সে আমাদের টেনে টেনে এনে তুলছে। ভাগ্যিস! এত পোঁটলাপুটলি নিয়ে বাস করলে অসুবিধেয় পড়তাম, পরে বুঝেছি।  নাজিরভাইই আমাদের একেবারে বাসস্থান অব্দি পৌঁছে দিয়েছিল। 
ল্যান্ডোরে নতুন কনস্ট্রাকশন করতে দেয় না। সেনাবাহিনীর আওতাধীন বলে না বিশেষ কিছু কারণ আছে জানিনা, তবে ভাগ্যিস দেয় না! তাতে আমাদের মতো লোকেদের থাকার জায়গা পেতে অসুবিধে হতে পারে বটে, কিন্তু দেবাদারু, ওকে, ইত্যাদি গাছেদের আর পাখিদের বেজায় সুবিধে হয়। ল্যান্ডোর আসবো আসার একদিন আগে ঠিক করেছি, তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছুই পাচ্ছি না প্রায়। এদিকে থাকার জায়গা খোঁজা এক ইয়ে ব্যপার। ম্যাপ দেখে দেখে যা জায়গা মনে হয়, গদাম করে অজ্ঞান হয়ে যাবার মতো দাম সে সব জায়গার। এক বন্ধু জায়গা ভালো খুঁজে বের করে, তার র‍্যাডারে এ জায়গাটা ছিল, তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কিন্তু সে দিলে না। বিরক্ত হয়ে নিজেরাই খুব খুঁজে টুঁজে একটা জায়গা পেয়েছিলাম। কেমন হবে সে নিয়ে একটু ভয় ভয় ছিল বটে কিন্তু ওই যে বলেছিলাম না একবার, জীবন এত আনন্দময় কারণ এর কোন বাঁকে কী আছে কিছুই জানা যায়না। বৃষ্টি শুরু হয়নি, হবে এক্ষুনি। ঘরের মধ্যে দেওয়াল জোড়া কাচের মধ্যে দিয়ে মেঘ, গাছ,  কাছের মুসৌরি আর দূরের দেরাদুন শহর। রোদ দেখতে এসে মেঘ আর বৃষ্টি পেলুম! তবে আমি রাবড়িও আনন্দ করে খাই, আবার সরভাজাও আনন্দ করে খাই। তাই আমার আপত্তি কিচ্ছু নেই।

এবার বৃষ্টি পড়ছে বলে তো ঘরে বসে থাকতে পারবো না। ও আমার স্বভাবে নেই। বন্ধুরা অনেক সময় একসাথে ঘুরতে গেলে বিরক্ত হয়, কিন্তু পার্মানেন্ট যিনি তার সাথে ধাত খানিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম হয়ে গেছে। ফলে দুজন মিলে রেইনকোট, প্লাস্টিকের চাদর, ছাতা ইত্যাদি ধড়াচূড়া নিয়ে বেরোনো গেলো। সকালে এক রাউন্ড হাঁটা হয়েছে এ পথেই, তখনো বৃষ্টি শুরু হয়নি। বেকহাউসে তখনো ভীড় হয়নি। খান কতক বাঁদর এসে জানলায় বসে বসে দেখছিল আমরা কি খাচ্ছিলুম। কচি বাঁদরেরা এ জানলা ও জানলা লাফালাফি করছিল, যুবক যুবতীরা প্রেম করছিল,আর বয়স্করা গম্ভীর মুখে আমাদের দেখে ভাবছিল আজ মানুষদের নিয়ে কি কি বলা যায়। বেকহাউসের সাজটা পুরোনো দিনের মতোই রেখেছে। মেঘলা দিন, কড়িকাঠওয়ালা পুরোনো ক্যাফে, চমৎকার তাজা বেকিং এর গন্ধ আর জানলারা পাশে সবুজ গাছ।  সমতলের পাওয়া না পাওয়ারা কখন মুছে গেছে টেরই পাইনি। 

ভালো লাগার কোনো কারণ হয় কি? একই জিনিস সবার ভালো লাগবে তাও তো। কিংবা খারাপ লাগবে তাও না।এই যে, পাহাড়, নদী, জঙ্গল, সমতল সর্বত্র গানের সাথে মুখভঙ্গী করে বা নেচে রিল বানিয়ে আপলোড করে লোকে এতে কারোর কারোর তো ভালো লাগে বটেই। যারা করে তাদেরই ভালো লাগে। তাদের হয়ত কারোর কানে কু দিতেও ভালো লাগে।তারপর ধরো, কারোর লোকের সাথে কথা বলতে বিরক্ত লাগে,  আবার কারোর প্রচন্ড ভালো৷ এর কারণ কি কে জানে! এই যে আমাদের দুজনের বর্ষাতি ছাতা উপেক্ষা করে জুতো মোজা ভিজে চুপ্পুস, ঠান্ডায় হি হি করে কাঁপছি, এদিকে চার্চের সামনে, ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলের পাশের গাছের ফাঁকে হাঁটছি, দিব্যি লাগছে, এরও তো কারণ নেই। কাঁপতে কাঁপতে নেহাতই অস্থির হয়ে গেলে একটা কফিশপে ঢুকে  হটচকলেটে চুমুক। ফের হাঁটা। 
বাড়ি ফেরার পথে ট্যাংগোকে আর দেখলাম না। ওহো ট্যাংগোর কথা বলক হয়নি না? যেখানটায় এসে উঠেছি, সে বাড়ির তিনটি ভেড়া সদৃশ কুকুর ও একটা উঁকিঝুঁকি মারা কাকু-কাকিমা সুলভ হোঁৎকা বেড়াল আছে। এইসব জীব আছে বলে শুরুতে আমাদের খানিক অস্বস্তি ছিল। তিমি মাছ হোক কি কুকুর কি মানব শিশু আমরা বেশ দূর থেকে পছন্দ করি। এরা যদি ঘরের মধ্যে ঘুরঘুর করে? তা দেখলাম কুকুরগুলো খুবই আলসে। চোখ মেলে তাকানোও পছন্দ করে না। ট্যাংগো বাদে। সে প্রথমদিন ইস্তক আমাদের অল্প শুঁকে কি মনে করেছে কে জানে, আমরা হাঁটতে বেরোলে সেও বেরোয়। যতদূর যাওয়া সম্ভব হিসি করতে করতে যায়। ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া শেষ হলে থেমে যায়। বৃষ্টির সময় অবশ্যই কোথাও আস্তানা নেয়, দেখা যায় না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে বৃষ্টি আর মেঘ দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি কে জানে। ঘুম ভাঙলো খাবারের ডাক শুনে। জানলার কাচে তখন কালো অন্ধকারে, মেঘের সমুদ্রে আলো ফুটেছে, মুসৌরির। 

Sunday, October 26, 2025

হেমন্তের পাহাড়ে

এই শীত পড়ব পড়ব মুখটা অন্যরকম। পালাই পালাই আমার সারা বছরই লেগে থাকে, গরমের খাঁ খাঁ দুপুর হোক, বসন্তের উদাস হাওয়া হোক, শীতের আমেজ হোক কি বর্ষার ঘ্যানঘ্যান। এই যে সারাক্ষণ অস্থিরতা এ হয়তো মানসিক রোগ, কিন্তু অন্ধের দেশে কানা দশা আমার তাহলে। সব সুস্থ লোকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তা হেঁটে, গালাগালি করে,  থুতু ফেলে ঘুষ দিয়ে সুস্থ থাকলে,  এ অস্থিরতার মানসিক রোগী হয়েই বাঁচি। তো যা বলছিলাম, হেমন্তের সময়টা আরো আলাদা, পালাই পালাই এর সাথে নস্টালজিয়া এসে থাবা মারে। নস্টালজিয়া আমি নিজে যদিও খুব পছন্দ করি না। যা গেছে তাইই ভালো এ আমাদের স্বভাব, বরং আমি বর্তমানেই বেশী থাকি। কিন্তু হেমন্তের যে শীত আসছে হাওয়া, এ আমায় এলোমেলো করে দেয়। পুজো শেষ..কালীপুজো তারপরেই ভাইফোঁটা। আগে বেশ অপেক্ষা ছিল এ সময়টার। কিন্তু সন্ন্যাসী সাধকদের বোধহয় ওসব থাকতে নেই, তাই ভাইফোঁটা আসে তাদের আবার চলে যায়। গতবছর এই সময়টা কিন্নরে ছিলাম। ফিরে এসেছিলাম ভাইফোঁটার দিনই, দাদা (আমার দিদি, যাকে ছোটবেলায় জিভের লিমিটেশনের জন্যে দাদা বলতাম) চলে এসেছে, একগাদা রান্না করে। এবারে দাদা পালিয়ে গেলো কতদূর...
তবে, পালানো তো সোজা না, ডালের বড়া নরম না হলে মনে পড়ে আহা দাদা বানালে ভারী তুলতুলে হত, বাসের নাম দেখলে মনে হবে এই বাসের অপেক্ষার দিন আর দরকার নেই, এফ এমে বিজ্ঞাপন দেবে ভাইফোঁটার উপহার কিনুন...চ্যানেল বদলে দিলেও পালানো যায় না।

হেমন্তকালে বিদেশে ফল কালার দেখতে ছুটোছুটি পড়ে। দেখার মতোই জিনিস। এদেশেও পাতা ঝরে, রঙের তেমন জৌলুস নেই বলে চোখে পড়ে না। শীতের আগে পালালাম, হিমালয়ের কোলে। শেয়ার গাড়ি করে যাচ্ছি। ট্যুরিস্ট নেওয়া শেয়ার গাড়ি না, গ্রামের লোকেদের সার্ভিস গাড়ি। নির্দিষ্ট সময় যায় আসে গ্রাম থেকে শহরে। সে বেশ মজার গাড়ি, গ্রামের এক মুড়ো থেকে আরেক মুড়োয় কোনো জিনিস গেল, কিংবা জিনিস্পত্র নিয়ে এক গ্রাম থেকে মাঝ শহরের কোনো দোকানে। গাড়ি চলতে চলতে হাত নাড়ে বুড়ো বুড়ি, তরুনী, পরিচিতের হাসি। দিব্যি লাগে দেখতে। আমার তাড়া নেই। কোনো দশ বিশ পয়েন্টস দেখতে বেরোইনি রাস্তায়, মানুষ, গাছ, পাখি,  পাহাড় এসব দেখতেই বেরিয়েছি। পাখি মানে আবার বার্ডার ভাবার দরকার নেই। বার্ডাররা খুব নাঁক উঁচু, কমন পাখিদের ওদের মনে ধরে না। ক্যামেরার লেন্স তাগ করে না তাদের। আমি তো বুলবুলি থেকে সবুজ রঙে কাজল পরা ছোট্ট পাখি সব হাঁ করে দেখি। একেকটা পাখি কেমন ছোট! ফার্ণের ডালেও দোল খায়! এক জায়গায় অবশ্য থাকা হয় না আমার, প্রায় রোজই একেকটা নতুন গ্রাম, নতুন মানুষ। ব্যাকপ্যাকার ট্রাভেলার হওয়ার সুবিধে হল, প্যাকিং এ সময়ও যায় না। 

এক গ্রামের এক বাড়িতে আছি সে রাতে। জঙ্গলে মধ্যেই একটা পাহাড়ের মাথায় বাড়িটা। সামনে ফাঁকা, কাঞ্চনজঙ্ঘার পুরো রেঞ্জটাই  সকালে দেখা যায়, বেলায় জঙ্গলের রাস্তা ধরে হাঁটি, চারপাশে ঘরবাড়ি নেই তেমন। অনেকটা নীচে একটা দুটো ফার্ম স্টে, বা হোমস্টে।  একটা দুটো গ্রামের বাড়ি, দোকান। আপাতত জঙ্গুলে হাওয়া,  পোকার ডাক, পাখির ডাক আর নিজেদের জুতোর আওয়াজ ছাড়া আওয়াজ নেই। ওহো না দূর থেকে ছোট্ট জলপ্রপাতটার আওয়াজ আসছে বটে। রাস্তা বলতে যা আছে তা বিশেষ সুবিধের না। পাথুরে গাছহীন অংশ বলা যায় বড়জোর। এদিক সেদিক থেকে ছ্যট ছোট ঝর্ণা গুলো মাঝে মাঝেই রাস্তার উপর দিয়ে বইছে। তাদের আলাদা জায়গা করে দেওয়া আছে বটে, এক পাশ দিয়ে যাবার জন্যে, কিন্তু কিছু জলের স্বভাব ছক ভাঙার, তারা রাস্তা দিয়ে বয়ে তারপর খাদে পড়বে৷ প্রপাতটার কাছ অব্দি পৌঁছতে অনেকটা পাহাড় নামতে হয় বটে, কিন্তু পৌঁছলে একরাশ গুঁড়ো গুঁড়ো জলকণা সারা শরীর জুড়িয়েও দেয়।


যেখানে আছি আজ, সেটা পাহাড়ে উপর জঙ্গলের গায়ে। একদিকে পাইনের জঙ্গল, আরেকদিকে চোখ মেললে কাঞ্চনজঙ্ঘা, সিনোলচু ইত্যাদি পাহাড়চুড়ো,  আরেকদিকে অন্য পাহাড়। বেশ কিছুটা দূরে দূরে, ছড়ানো ছিটানো, গোটা পাঁচেক কাঠের কটেজ। লগ হাট প্যাটার্ণের ঘর গুলোর ভিতরে পরিচ্ছন পর্দা দিয়ে ঢাকা খান পাঁচেক জানালা, কাচের, সেখানে চোখ রাখলেও দিব্যি আকাশ, গাছ, পাহাড় । আপাতত শুধু আমরা দুজনই একটা কটেজে আছি, বাকি সব ফাঁকা। সামনের বারান্দায় বসলে চোখে পড়বে শায়িত বুদ্ধের প্রতিমূর্তির মতো হিমালয়ের পুরো রেঞ্জটা। বুদ্ধের পা শেষ হবার পরের কিছু পাহাড়ের চূড়াও দেখা যায়। প্রতিটা চুড়ারই নাম আছে, পড়েছি, আবার ভুলেও গেছি। শেষ সূর্যের আলোয় মেঘ, বরফ রাঙিয়ে দেওয়ার সময় চূড়ার নাম নিয়ে আর কে ভাবে! ডানদিকের পাহাড়ে মেঘের ছায়া পড়ে গাছপালার উপর। মাঝে মাঝে দূর থেকে শিশুদের খেলার আওয়াজ, কিংবা অন্য কোনো জায়গা থেকে গানের আওয়াজ ক্ষীন ভাবে ভেসে আসে। 
সন্ধ্যে নামলে পাহাড়ে একটা দুটো করে আলো ফুটে ওঠে। তারপর হঠাৎ করে লোডশেডিং।  পরিস্থিতিটা বেশ মন্দ না। এতখানি চত্বরে স্রেফ আমরা দুজন। অনেকটা দূরে রান্নাঘরের কাছে, কেয়ারটেকারের ঘরে,  স্ত্রী পুত্র সহ কেয়ারটেকার ছেলেটি আছে বটে, তবে শ্রবণ ও দৃষ্টিসীমার বেশ বাইরে। ওহো এই ভরা অমাবস্যায় দৃষ্টিসীমার বাইরে  সবই আসলে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাইরে বেরোতে চমক লাগে, আকাশে অজস্র তারায় দীপাবলি পালিত হচ্ছে যেন। চারদিক অন্ধকার বলে দেখতে আরো সুবিধে হচ্ছে। চোখ সইতে দেখি আকাশগঙ্গার একটা অংশ। খুব স্পষ্ট না, লাদাখের মতো, কিন্তু ভালো করে তাকিয়ে দেখলে বোঝা যায় বটে। এরকম একটা অবাস্তব অলৌকের মধ্যে দাঁড়ালে কেমন যেন লাগে। চারদিক অন্ধকার পাহাড়, সামনে সাদা কটেজের পিছনেই দুটো পাইন গাছ, এক আকাশ তারা আর আকাশগঙ্গার যাত্রাপথের নীচে দাঁড়িয়ে আছি দুজন। এ অনন্ত সম্ভারের নীচে দাঁড়িয়ে আলোর উদযাপনের দিনই বটে৷

আরেকদিন, সেদিন অন্য একটা গ্রামে। আর কোনো ট্যুরিস্ট সে গ্রামে সেদিন ছিল না। চেয়ারে বসে সামনে তাকিয়ে শায়িত বুদ্ধ দেখো, বুদ্ধের পা ছাড়িয়ে অন্য একটা বরফ চূড়ো, সেটা কোন চুড়ো সেটা নিয়ে ভাবো, এই তোমার কাজ৷  ছাগলের ম্যা ম্যা ছাড়া আর আওয়াজ নেই কোনো। হাওয়ার আওয়াজ আছে, মাঝে মধ্যে জঙ্গুলে পোকা ওই অব্দি৷ পাহাড়ের এদিকটায় আগে আসিনি, এদিকের গাছ পালা গুলো একটু অন্যরকম। পাহাড়ের ঢাল গুলো খানিক চওড়া, চাষ বাস হয়েছে। সেদিন ছিল দেওয়ালীর পরের দিন, দুপুরের দিকে এক অন্ধ ভদ্রলোক, তার দুই নাতিকে নিয়ে এদের বাড়ি সৌভাগ্যের গান শোনাতে এসেছিল। তোমাদের ক্ষেতি বাড়ি, তোমাদের হোমস্টে,  এই পরিবার ইত্যাদি সবার যশ বৃদ্ধি হোক। একটা কাঁসার থালায় চাল, স্কোয়াশ আর একশো টাকা ধরে দিলেন, এ পরিবারের সব চেয়ে বয়স্কা,  যাকে ঠাকুমা বলে ডাকছি। দুপুরে আমাদের সাথে গল্প করছিলেন, কেমন তার দূর দেশ (দার্জিলিং এর কাছে) থেকে বিয়ে হয়েছে এইখানে। তখনকার দিনে,  অনেকটা বড় বিপত্নীক  এক লোকের ঘর করতে এসেছিলেন তিনি। গল্প শোনাচ্ছিলেন তাঁর নাতির, তাঁর রাজহাঁসের। 

শহর ছেড়ে বেরিয়ে এসব গাছ, অকিঞ্চিকর বিষয়ের গল্প, পাহাড়ি ঝর্ণা, অকুলীন পাখি, গাছ আমার অস্থিরতা কমিয়ে দেয়। কখনো হাঁটি, কখনো চুপ করে বসে নিস্তব্ধতা শুনি...বুকের মধ্যে হেমন্তের বিষন্নতা কমে যায়। শান্ত হয়ে যায় সব। জলের উপর পাতলা সরের মতোই বরফ যেন সে পালানে জলের স্রোতে সাময়িক স্থিতি দেয়। আমি শহরে ফিরি, নীল আকাশ ঘোলা হয়ে যায়,বরফের স্তর গলা শুরু হয়ে যায়....

Wednesday, August 13, 2025

ইওরোপে কটাদিন (ভিয়েনায় আর প্রাগে)

আজকেই অস্ট্রিয়ার শেষ দিন। আজ বিকেলে ট্রেন ধরে চলে যাব প্রাগ। সকালে ময়ূরাক্ষীর কিছু কাজ ছিল। সেসব সেরে, ঝটপট ব্রেকফাস্ট সেরে আর চমৎকার একটা কফি শেষ করে তিন মূর্তি বেরোলাম। মৌসুমীর অফিস আছে। সুদীপ ছুটি নিয়েছে আমাদের জন্যে৷ আজ বেশী দূরে কোথাও না, কাছেই প্রাটারে যাব। সে এক মস্ত পার্ক। পার্ক মানে, নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের দ্বিগুন প্রায়। একদিকে প্রচুর এন্টারটেইনমেন্ট এর জিনিস, অন্য দিকে প্রচুর সবুজ। সবুজ মানে সে প্রায় হারিয়ে যাবার মতো ঘন জঙ্গল। মাঝে মাঝে ঘোড়ার গাড়ি চলছে মস্ত মস্ত গাছপালার ফাঁকে। ঘোড়াও চলে, লোকে ছুটছে, হাঁটছে। আবার কোথাও কোথাও জঙ্গল এত ঘন, হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা  (মানে বাঘ ভালুক না খেলেও গাদা হাঁটতে হবে সঠিক রাস্তায় আসতে, কিংবা পোকামাকড় তো রইলোই)।  নিজেদের মতো হাঁটছি, গল্প করছি, থামছি। এক সময় নদীর ধারে চলে এলাম। দানিয়ূব এখানে সরু, কিন্তু বড় সুন্দর। নীল আকাশ, তার রঙে দানিয়ুবও নীল। দূরে একটা উইন্ডমিল, নদীর আরেক পারে একটা প্যাগোডা। পার ধরে সবুজ ঘাস, একটা দুটো বোটহাউস। নদীর ঘাটে বসে আছি তিনজনে। দেখ দেখ কী তিনটে রাজহাঁস নদীতে। ও বাবা এদিকে আসছে তো। বেশ হাসিহাসি মুখে বসে আছি তাকিয়ে। রাজহাঁস দেখতে ভারী সুন্দর তো বটেই, আর যেমন সাবলীল ভঙ্গীতে সাঁতার কাটে দেখলেও ভাল্লাগে। আরে এদিকেই আসছে দেখছি। ও বাবা এ যে এসে একেবারে চমকাচ্ছে,,তেড়ে এলো যে। ভঙ্গীটা 'এইয়ো আমার ঘাটে তোরা কে রে বসে!?" পাঁই পাঁই করে উঠে পালাতে হল!! ইওরোপে গিয়ে রেসিজম এর শিকার হলাম রাজহাঁসের থেকে! এ দু:খ রাখি কোথায়! অপমানিত রাজ্যপাল হয়ে উঠে চলে আসি।







 মনের দু:খ ভুলতে মদ কতটা কাজ করে জানিনা, খাবার দাবার খুব করে৷   ঘাসে থেবড়ে বসি, ঝোলা থেকে বেরোয় আমাদের সামান্য আয়োজন। কলা পাঁউরুটি এটা সেটায় আমাদের পিকনিক হয়। আনন্দ আসলে মানসিক স্থিতি, তার সাথে আমরা বহু জিনিস জড়িয়ে ফেলি, খালি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস বাদে, প্রকৃতি। একই লোক, পাহাড়ের বাঁকে, সমুদ্রের ধারে বালিতে, ঘাসের সবুজে যেমন মানসিক অবস্থায় থাকবে, সে কি হর্ন, কংক্রিটের জঙ্গলে একইরকম ভালো থাকবে! থাকা সম্ভব!  


বিকেল হয়, আমাদের ভিয়েনা ছাড়ার সময় চলে আসে।  মৌসুমীও জলদি চলে এসেছে অফিস থেকে। সুদীপ মৌসুমীদের কাছে বেশ কাটলো।বিদায় ব্যপারটা সর্বদাই একটু চিনচিনে হয়..
বাসের খাবার উল্টোদিকের টার্কিশ দোকান থেকে প্যাক করিয়ে নিয়েছি৷ সুদীপ সি অফ করতে বাস স্ট্যান্ড অব্দি এলো।  বাস স্ট্যান্ড নামেই, কেতা তো সেইই টাইপ। ঢুকলে মনে হবে,  এয়ারপোর্টে ঢুকছি।পশ্চিমা দেশ গুলো এসব ব্যপারে এতটা এগিয়ে গেছে, খালি মনে দু:খ হয়, ইসস আমাদের দেশেও এসব করাই যেত,  টাকাও ছিল.....যাকগে। ভিয়েনা থেকে বাসে চলেছি প্রাগ। বিদেশে এই সস্তার বাসগুলোই বাঁচিয়ে রেখেছে বলা যায়। এর আগেরবার, লন্ডন থেকে এডিনব্রা যেতেও এই বাস ভরসা ছিল, ময়ূরাক্ষী বুদাপেস্ট থেকে ব্রাতিস্লাভা গেল সেও এও বাসেই। আবার আমরা প্রাগ থেকে বুদাপেস্টও যাব। দিব্যি আরামদায়ক, সস্তার বাস। সময়জ্ঞান চমৎকার। একটা দেশ থেকে আরেকটা দেশে যাওয়া ইওরোপে এতই মসৃন, দেশের গন্ডী আছে বলেই মনে হয়না। একটা টোলবুথও না পেরিয়ে, স্রেফ ম্যাপ থেকে বুঝলাম, অস্ট্রিয়া থেকে চেক রিপাবলিক ঢুকেছি। চেক বললেই,  ছোটবেলায় বইতে পড়া, চেকশ্লোভাকিয়া মনে হয় খালি। কিন্তু চেক আর শ্লোভাকিয়া আলাদা হয়ে হয়ে গেছে বেশ অনেকদিন হল। এদের ভাষায় হ্যাপ্পিলি ডিভোর্সড। কোনো রক্তাক্ষয়ী সংগ্রাম না, বিবাদ না, স্রেফ "তুমিও ভালো, আমিও ভালো,  তবে আলাদা থাকা আরো ভালো" টাইপ।  বাস থেকে যতটুকু দেখা যায় তাতে দেশটা কিঞ্চিৎ গরীব বলে বোধ হয়,।  মানে অস্ট্রিয়ার আর চেকের বাড়ি ঘরের তফাৎ বেশ চোখে পড়ে। রঙ অনেক মলিন, কিছু তো পলেস্তারা খসে পড়েছে। বাড়ি গুলো দেখেও মনে হয় বেশ পুরোনো, আর একটু কমদামীই। মাঝখানে এক জায়গায় বাস থেমেছিল খাবার রেস্ট এসবের জন্যে। সে রেস্তোরাঁটা বেশ ঝকঝকে, ড্রাইভার সাহেব আর তার খালাসি খুবখানিক মাংস, ঝোল, সবজি নিয়ে বসলেন দেখলাম। আমরা আমাদের দুড়ুম মানে ওই টার্কিশ রোল খেয়ে নিয়েছি আগেই। অন্ধকার নেমে আসছে দ্রুত, ঠান্ডাও পড়ছে। দিনের এই সময়টা মনে হয় সূর্য যেন পাঁই পাঁই করে ছোটে। সারাদিনের কাজের পর বাড়ি ফেরার তাড়া। 



প্রাগে নামলাম তখন দশটা। শেষের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ঘুম না ভাঙলে হয়তো ডিপোয় চলে যেতাম। কেউ তো ডেকে দেয় না এখানে, "প্রাগ পএসে গেছে উঠে পড়ুন" বলে। নেমে ভারী ভালো অভিজ্ঞতা হল। আমাদের কার্ডটা  ট্যাপ এনাবল করা নেই, টিকিট কাটার মেশিন এদিকে ট্যাপ ছাড়া নেয় না। ক্যাশ একমাত্র চেক করুণা নেয়। আমাদের কাছে আছে ইউরো। টিকিট অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে আমার ফোনের টাচ কাজ করছে না বলে ট্যাপ এনাবল করতে পারছিনা। এমন অবস্থায়, দুটি ছেলে মেয়ে নিজে থেকে এগিয়ে এসে নানান ভাবে চেষ্টা করল, যাতে কার্ডটা কাজ করে। শেষে বলল, এক কাজ করো বাসে করে যাও, ওখানে অপশন থাকে ট্যাপ এনাবল কার্ড না হলেও টিকিট কাটার। এমনকি নিজের থেকে টিকিট কেটে দেবেও বলছিল। আমরা স্বাভাবিক ভাবেই খুবই বিব্রত,  না না,  আমরা দেখছি বললাম। তারপরেও অনেক চেষ্টা করেও হচ্ছেনা, আরেকজন ভদ্রমহিলা, মেশিনে করে সাফাই করছিলেন, স্টেশন চত্বরটা। ও হ্যাঁ স্টেশনটা মারাত্মক। মানে বিশাল একটা বহুতল বিল্ডিং, বিভিন্ন দিকের মেট্রো ছাড়ছে, দোকান পাতি আছে এ ইওরোপের সব জায়গাতেই, তবে এটা বেশ দেখতে।যাওহোক, ভদ্রমহিলা আমাদের দেখে বুঝেছেন কিছু একটা গোলমালে পড়েছি, এবং আমরা স্থানীয় না। নিজে থেকে থেমে বুঝলেন সমস্যা। ইংরেজি  ভাষা বোঝেন না, আমরাও চেক ভাষা জানিনা। আকারে ইঙ্গিতেই হল কথা। তারপর আরেকপাক ঘুরে এসে, নিজে কয়েন দিয়ে দিয়ে আমাদের তিরিশ মিনিটের টিকিট কেটে দিলেন দুটো।
আমি নিজে এ কাজ করতাম কিনা জানিনা। হয়তো গরীব দেশ, মানে প্রতিবেশী অস্ট্রিয়া বা জার্মানির তুলনায়, মনটা গরীব না। বড় ভালো লাগলো অজানা ভাষার এক দেশে নেমে এমন আপ্যায়ন পেয়ে। 
ট্রেন থেকে নেমে তো খুব কনফিউজড,  কোন দিকে গেলে যে বাস স্ট্যান্ড পাবো কে জানে! বাস ধরে আমাদের হস্টেলে যেতে হবে। কিঞ্চিৎ দূর আছে। রাত হলেও বাস চলে, তাই সেই চিন্তা নেই,  তাও রাতও অনেকটা হয়েছে।  গুগল ম্যাপে যা দেখাচ্ছে তা খুবই একটা সরু গলিপথ, অন্ধকার মতো। এমনিই ইওরোপীয়ান শহর গুলো রাতের বেলা ভুতুম মতো হয়ে যায়। রাস্তা ফাঁকা, দোকানপাট ঝাঁপ ফেলে দেয়। তায় প্রাগের এই অংশটা খুবই ফাঁকা ফাঁকা, কিছ্য মাতাল হেঁটে যাচ্ছে। নতুন দেশে, ভাষা বুঝি না দুই উজবুক এদিক ওদিক দেখতে দেখতে শেষে এক মাতালকেই জিজ্ঞেস করলাম, ভাই এই বাস স্ট্যান্ডটা কোথায়? মাতাল হলেও তালে ঠিক আছে। সঠিকই বলে দিল। কিন্তু ময়ূরাক্ষী মানবে কেন, আমি মাতালকে রাস্তা জিজ্ঞেস করেছি কেন সে নিয়ে খুব ইয়ে করল। যাকগে, গুগল ম্যাপ আর মাতাল মিলে যে সরু মতো রাস্তা দেখাচ্ছে তাতেই যাই। অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে বড় রাস্তার কাছে আরেকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ও দাদা এই বাস স্ট্যান্ডটা কোথায়? সেও ওখানেই যাবে, আমাদের প্রায় সঙ্গে করেই নিয়ে গেল। বাস একটু কমে এসেছে রাত হয়েছে মেলা। যদিও বাস স্ট্যান্ডে অনেক লক দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের হস্টেলের লোকেশনে বাস থেকে নেমেছি, টিমটিমে হলুদ আলো জ্বলা বাস স্টপ। নিজেদের মধ্যে কথা বলছি, কোন দিক দিয়ে হস্টেলটা ইত্যাদি।  একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা  তিনিও বাস থেকে নামলেন, এগিয়ে এসে বললেন, হ্যাঁ এটাই রাস্তা, ওইদিক দিয়ে যাও। আমি এমনিতেও গুগল ম্যাপের থেকে মানুষের কথায় বেশী নিশ্চিত হই, মালপত্র নিয়ে এগোই। ও বাবা দু কদম যেতে না যেতেই, আরেক ভদ্রলোক আমাদের ম্যাপ দেখতে দেখে,  প্রায় পৌঁছেই দিলেন হস্টেল অব্দি। প্রাগের লোকেরা বড় ভালো। প্রাগ প্রথম দিনেই হৃদয় জিতে নিয়েছে। এত রাতেও দলে দলে অল্পবয়সী ছেলে পুলেরা চলেছে রাস্তা দিয়ে ওই হস্টেলের দিকেই।  হস্টেলের লাউঞ্জেও প্রচুর লোক। এই হস্টেলটা বাচ্ছা নিয়েও থাকা যায়। সই সাবুদ করে এগোতে যাব, বলে কিনা ওহে চাদর দিয়ে যবে না? অ্যাঁ? হস্টেল মানে একেবারে চাদর পেতে নেওয়া হস্টেল! এবার কি মশারিও টাঙাতে বলবে নাকি রে বাবা! সকালে হয়তো ঘন্টাবাজার সাথে উঠে প্রেয়ার করে পড়তেও বসতে বলবে! নাহ সেসব নয়, দেখে চাদর, সুটকেস, লটবহর নিয়ে চললাম নিজেদের ঘরের দিকে...

Thursday, July 31, 2025

ইওরোপে কটাদিন(সালজবার্গ)

সলজবার্গের ট্রেন ছিল অনেকটা সকালে। ঝটপট তৈরী হয়ে বেরিয়ে পড়লাম দুজন। গুগল ম্যাপ কেন জানি একটু ঘোল খাওয়ায় মাঝে মাঝে। তাড়াহুড়ো করে স্টেশনে ঢুকে প্ল্যাটফর্মে যেতে গিয়ে সে এক ঝামেলা। তা আমরা দুজন একটু হাবা মতো বলে মেনে নিয়েছি, তাই এইসব আমাদের সঙ্গী হবেই সেও জানা। তাও মনে তো দু:খ হয়ই, "এত ছড়ু কেন আমরা"। সেই সব নিয়েই সলজবার্গে পৌঁছলাম৷ সলজবার্গে ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন থেকে কার্ড কেনার সময়, সেন্টারের মেয়েটিই বলল, খরচ কম করতে চাইলে সালজবার্গ কার্ড কিনে নাও আর তারপর বাসে করে লেক সাইডে যাও আলাদা করে। তাতে খরচ কম হবে তোমাদের। তাই করা হল।শুরু হল আমাদের দৌড়াদৌড়ি। আজ দিনটাই আছি খালি। আমাদের ইচ্ছে আছে মোজার্টের বাড়ি, সলজবার্গ দুর্গ টুর্গ দেখে চলে যাব শহরের বাইরে। সলজবার্গ মানে সাউন্ড অফ মিউজিক এর দেশ। পাহাড় লেক ঘেরা সেসব জায়গা ঘুরে শহরে ফিরে রাতের ট্রেন ধরব। হাতে সময় কম বলে মিউজিয়ামে হালকা ঢুঁ মেরেই বেরিয়ে আসব ইচ্ছে ছিল। ও বাবা এখানকার মিউজিয়ামের লোকেরা ভারী ভালোবাসে নিজেদের কাজকর্ম৷ "আরে এটা দেখবে না, সেকি! অন্তত ওইটুকুটা দেখো।" এরকম বলে বলে প্রায় পুরো মিউজিয়ামই ঘুরে ফেললাম।

 মিউজিয়ামটা হেব্বি বানিয়ে রেখেছে। লাল কার্পেট পাতা, এই চওড়া সিঁড়ি। যেন অস্কার নিতে চলে পিঠে বোঁচকা নিয়ে। বড় এত আন্তরিক ভাবে ভালোবেসে দেখাচ্ছিল, আমাদেরও সত্যি বলতে ভালোই লাগছিল৷ মিউজিয়ামটা একদম শহরের মাঝে, ছিল কোনো রাজার বাড়ি। ছাদে বসে কেরম প্রেমসে পাহাড় দেখতে দেখতে চা খেত!! ওহোহো, রাজা হলেই ভালো হত রে। অবশ্য খুব কথা বলত চারপাশ থেকে লোকে, আর রাজ্যের হাবিজাবি শুনে যেতে হত। বেস্ট হত রাজার সেই ছেলে যার সিংহাসন পাওয়ার আশা নেই, কিন্তু খাতিরদারি ষোলো আনা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে,  পাশের ঘরে যাই, এখান থেকে চ্যাপেলটার চমৎকার একটা ব্যালকনি ভিউ পাওয়া যায়। এদের কী যেন একটা প্যারাডাইস লস্ট শো চলছে, সেটায় যাবার ইচ্ছে ছিল না তেমন কারণ আমরা দুজনেই আঁকায় যাকে বলে পিকাসোর প্রেত। আমি না দেখে গরু ছাগল আঁকলে এমন বিকট জন্তু হয়, বাচ্ছারা তো ছাড়, বড়রাই আঁতকে ওঠে। তাছাড়া সময়েও কম। কিন্তু ওই,  কর্মচারীদের ঠেলায় ঢুকেই পড়েছি। বেশ চমৎকার সব ছবি। ন্যাংটো অ্যাডাম ইভ আপেল খেয়ে ফস করে পৃথিবীতে এসে জামা কাপড় পড়ে ফেলার থেকেও আশ্চর্য হলুম, ওদের ওরকম জনহীন পৃথিবীতে মসৃন লাল সিল্ক দিল কে? 


মিউজিয়াম ঘুরে, পাহাড়ে চড়ে কেল্লা দেখতে চলেছি। সেই পাহাড়ে চড়ার ট্রেন বা ট্রাম। দুর্গের পুরোটা ট্রেন ওঠায় না, খানিক বাদেই স্বর্গের সিঁড়ির মতো অনন্ত সিঁড়ি বাইতে হয়। হোমলেসদের যেমন পিঠেই সংসার থাকে, আমাদের দুজনের পিঠেও সেরকম মস্ত ঝোলা থাকে সারাক্ষণ।  তাতে ওষুধের বোঁচকা (যা দেখলে লোকে ভাববে এরা বেঁচে আছে কেন? কিন্তু খুবই দরকারি জিনিস। এ জিনিসটা বাদ দেওয়া যায় না),  জলের বোতল, ছাতা আর গাধার মতো অজস্র সোয়েটার ভরা৷ কেন কে জানে অত সোয়েটার ভরার আগে একবার আবহাওয়া কিরকম হতে পারে দেখিনি! ওহো কে জানে কেন কি, ওই যে ছড়ু তাই।  জিভ বার করে হাঁফাতে হাঁফাতে চুড়োয় উঠলাম। উঁচু থেকে শহরটা দেখতে বেশ লাগছে, ছোট শহর। শহরের মধ্যে দিয়েই সলজ নদী বয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা ব্রিজ এপাড় ওপাড়ের জন্য। সকালে যখন ট্রেন স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়েছি, বাস স্ট্যান্ডে এদিক ওদিক খুঁজছি,  কেমন করে ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার যাব, এক আফগান আমাদের দেখে এগিয়ে এসে সাহায্য করলো। কোন জায়গায় দাঁড়ালে বাস পাবো দেখিয়ে দিয়ে গেল। এইটা আমি আগেও খেয়াল করেছি, বিদেশে এলে, পাকিস্তান বলো আফগানিস্তান বলো, একই জায়গার লোক বলেই ভাবে। ঝগড়াঝাঁটি করার জন্যে দেশটা এতোই দূর, দেশের লোক তখন গন্ডী মানে না৷ 




হাঁটতে হাঁটতে গেলুম মোজার্টের বাড়ি।  মানে জন্মস্থান আর কি৷ ভদ্রলোক খুব ঘুরতেন তো! তেমনই খরুচে লোক দেখছি! ধার করে করে আলা হয়ে গেছিল একেবারে! আরিব্বাস এইটাই সেই পিয়ানো, যাতে বসে আশ্চর্য সব সুর তৈরী করতেন! অবশ্য পিয়ানো দিয়ে কী হবে আর, মাথাই হল আসল। আমি এই পিয়ানোয় বসলে সুর বেরোবে বটে, তবে গাধার সুর। 

সলজবার্গের আসল মজা হল তার লেক,পাহাড়৷ সময় কম তাই বলেই একটু সে স্বাদ চেখে দেখবো না তাই কি হয়। সুতরাং সওয়ার হলাম বাসে। এই বাসটা শহর থেকে বাইরে যায়৷ খেয়াল হল এক ফোঁটা জলও নেই সঙ্গে। যে ভদ্রমহিলা বাস চালাচ্ছিলেন, তাকে কাঁচুমাচু করে বললাম রাস্তায় কোথায় জল পাবো? বাসে পাওয়ার উপায় আছে? আফ্রিকান বংশদ্ভূত সে মহিলা তো ভারী দু:খী হলেন শুনে, হাঁকপাঁক করলেন, "আমার কাছে একদম জল নেই আজ, তোমায় দিতাম তাহলে, আমাদের তো এর মাঝে কোথাও এমন দাঁড়াবে না যে জল কেনার সময় পাবে। তবে আমরা যেখানে পৌঁছবো সেখানেই গ্যাস স্টেশনে পাবে। আমি খুবই দুঃখিত, কিন্তু সত্যিই আমার কাছে জল নেই। "  অগত্যা, আর কি করা। এদিকে চারপাশের চেহারা বদলে গেছে। বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ,  তার পারে পাহাড়। মাঝে মাঝে এক দুটো বাড়ি। তেষ্টা পেয়েছে, জল নেই সে নিয়ে দু:খ পেয়ে বসে থাকলেও তেষ্টা কমবে না, উলটে চারপাশের এমন মনোরম দৃশ্যও ধরতে পাবো না। কষ্টের কথা ভুলে চেয়ে রইলাম বাইরে। বাস থেকে নেমে এগিয়ে চললাম লেকের দিকে। পাহাড় দিয়ে ঘেরা মন্ডসি লেকের সামনে তখন প্রচুর লোক। ছুটির দিন পেয়ে সকলেই চলে এসেছে। লেকের ধারে গাছের ছায়ায় বসে আছে প্রচুর বাচ্চা আর প্রচুর খাবারদাবার সমেত টার্কিশ পরিবার, কোথাও আছে বুড়ো দম্পতি। টুকটুক করে হেঁটে চলেছে অতি বৃদ্ধ আর প্যারামবুলেটরে করে দাঁত না গজানো শিশু। খাবার দাবারের দোকানে ভীড়, বেশির ভাগই লাইন দিয়েছে আইসক্রিমের জন্যে। আমরাও দিলাম। অনেক অনেকক্ষণ সেই জল, গাছ, ঘাস আর প্রাণের মাঝে রইলাম। 






ফেরার বাসে উঠে টের পেলাম খিদে পেয়েছে বেশ। ভালো কিন্তু সস্তা খাবার দোকান মানেই তুর্কদেশীয় খাবার। একটা জায়গা আছে, শহরের মধ্যেই কিন্তু ট্যুরিস্ট প্লেস থেকে দূরে, অনেকগুলো দোকান। আমাদের কার্ড আছে তাই সমস্যা নেই। বাস বদলে বদলে চললাম সে জায়গায়। তারপর দোকান বেছেবুছে বসে পড়া গেল, কাবাব প্ল্যাটার নিয়ে। এটা আমাদের দেশের চৌকো চৌকো কাবাবের মতো না। সোওয়ারমা থেকে অনেকখানি মাংস নেওয়া হয়, আর প্রচুর স্যালাড, ওদের একটা মিক্সড সস ইত্যাদি সাথে পাঁউরুটি বা ভাত।  

 বিকেলের আলো এখনো শেষ হয়নি, আমাদের সালজবুর্গ কার্ডে একটা ক্রুজের কথা আছে, কিন্তু গুগলে দেখাচ্ছে বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা তো হতাশ, এ বাবা, আগেই যাওয়াই যেত। ঠিক আছে তাও যাওয়াই যাক না ওখানে। এমনিও আমরা নদীর ধারেই যেতামই। গিয়ে দেখি, লাস্ট ক্রুজ বাকি তখনো। তাড়াতাড়ি গিয়ে টিকিট কালেক্ট করা হল। কাউন্টারের ভদ্রলোক বারবার জানালেন, আজ জল কম আছে তাই আধঘন্টা কম ক্রুজ হবে। তারপর যখন ক্রুজে উঠলাম তখনো ক্যাপ্টেন (বেশ দেখতে ছিল ভদ্রমহিলাকে) বারবার দু:খ প্রকাশ করে জানালেন, নদীতে জল কমে যায় বিকেলের দিকে, আজ বেশীই কমে গেছে, নাব্যতা কম তাই আমরা বেশীদূর গেলে আটকে যাব। আমাদের দেশের সাথে তুলনা করে ফেলছি বারবার, কিন্তু তাও মনে পড়েই যায় চট করে, বিভিন্ন ট্যুরিস্ট প্লেসে,  এরকম নৌকা ইত্যাদি নিলে, কেমন গা জোয়ারি চলে। এক ঘন্টা মানে কোনো সময়েই এক ঘন্টা করায় না, সেটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে! দুর্নীতি বিষয়টা আসলে,  যতক্ষণ নিজেকে এফেক্ট না করে আমরা মনে করি যা করছি সব জাস্টিফায়েড। আমাদের দেশে এ রোগ যাওয়া শক্ত আছে। 
ক্রুজে করে বেশ চারপাশ দেখতে দেখতে চলেছি, কনে দেখা আলো পড়েছে দুপাশে, পাথরের বাড়ি, প্যালেস, গাছ সব সোনার হয়ে গেছে। দ্রষ্টব্য তো হরেক, তার বৃত্তান্তও ক্যাপ্টেন বলছেন, আমি শুনছি বটে তার ভাঙা ভাঙা সালজবার্গ এর ইংরেজি, কিন্তু আসলে চেয়ে আছি চারপাশের এই অদ্ভুত সুন্দরে৷ নামার আগে ভদ্রমহিলা আমাদের ক্রুজটা দুপার পাক খাওয়ালেন জলে, সে বেশ মজার। নদীর ধারে, ব্রিজের উপর ভায়োলিন বাজাচ্ছে একজন, সেই সোনা ঝরা আলোয় সুরের মূর্ছনায় চারপাশটা অদ্ভুত মায়াবী হয়ে গেছে। ব্রিজের উপর তালা ঝুলিয়ে নিজেদের সম্পর্ককে স্বায়ীত্ব দিতে চেয়েছে কতজনায়। তারা আজও বেঁচে আছে কিনা কে জানে! কিংবা তাদের সম্পর্ক হয়ত অন্য কারোর সাথে, কিংবা তালার জোরেই তাদের সম্পর্কও জুড়ে আছে জানিনা, খালি তালাগুলো রয়ে গেছে তাদেরভসেই মুহুর্তগুলোর স্মৃতি নিয়ে। সম্পর্ক থাক বা থাক, মুহুর্তটা তো আর মিথ্যে ছিল না। চিরস্থায়ী কিইই বা হয় এই ব্রহ্মান্ডে! 










পাথরের সিংহের মুখ থেকে জল ভরছিলাম আমরা। খুব সরু হয়ে পড়ছিল, হয়তো আমাদের মতো গরীব ট্যুরিস্ট ছাড়া তেমন কেউ আর আসে না। তা আমাদের পাশেই দুটি মেয়ে বসেছিল, রাস্তা দিয়ে গাড়ি করে যাওয়ার সময়, দুটি ছেলে মেয়ে দুটোকে দেখে ওদের ডায়লেক্টে জার্মান ভাষায় কিছু বলল, সম্ভবতঃ কিছু প্রস্তাব। মেয়ে দুটি হাসতে হাসতে জবাব দিল, যে মেয়েটির তুলনায় ছেলেটি বেশীই বুড়ো। তাতে ছেলেটিও হেসেই চলে গেল। অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়ায় পুরোটা হল। একজন প্রস্তাব দিল, অন্যজন সে প্রস্তাবে অরাজী হল,  সেটুকু সম্মান দিয়ে প্রস্তাবকারী চলে গেল। এমনটাই হওয়া উচিত ছিল না কি সর্বত্র?  ঘোমটায়, বোরখায়, কোরানে পুরানে ব্যপারটা আমরা এত জটিল করে ফেলেছি কেন!? 

ফিরতি পথে সুদীপদের সাথে ট্রেনে মোলাকাত হল। একসাথে চললাম ফিরে। বাড়ি ফিরে চাট্টি ভাতে ভাত খেয়ে শুয়ে পড়া হবে ঠিক হয়েছে। কিন্তু বলছিলাম না এই ছেলে মেয়ে দুটো খুবই ভদ্রলোক।  বলেছিলাম একবার কথায় কথায়, স্নিটজেল আরেকবার খেলে হত তা সুদীপ দেখি সব মনে রেখেছে। অত রাতেও সে  আমাদের স্নিটজেল ধরে দিয়েছে পাতে। পৃথিবীতে এত ভালোবাসায় যত্নে বেঁচে থাকি সেসব মনে না রেখে স্রেফ অভিযোগেই দিন কাটিয়ে দিই। এই রাতে নরম উষ্ণ বিছানা, পছন্দের গরম খাবার,বন্ধুদের ঘিরে থাকা আর , কর্মঠ সুস্থ শরীর...এর পরেও জীবনকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারা যায় কি?

Sunday, June 22, 2025

ইওরোপে কটাদিন(ইন্সব্রুক)

 দোতলা ট্রেন সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জন্যে৷  মুখোমুখি চারখানা সিট খুঁজে নিয়ে বসি চারজনে। একটু গুছিয়ে বসেই চা পান আর পুর ভরা পাঁউরুটি সেবন। ভিয়েনা থেকে সলজবার্গ হয়ে ইন্সব্রুকে যায়  ট্রেনটা। আমাদের গন্তব্য ইন্সব্রুক।  সালজবার্গও যাব ফিরতি পথে। তবে কেবল আমি আর ময়ূরাক্ষী।  বাকি দুজনের আরাম করে সলজবার্গ ঘোরা। আমাদের মতো হুড়োহুড়ি করে সালজবার্গ কেউই ঘোরে না, সালজবার্গ সেরকম জায়গাই নয়। অন্তত চার-পাঁচদিন থাকো, নদীর ধারে হাঁটো, হাইক করো, হ্রদের পাশে শুয়ে থাকো।  যাইহোক, আপাতত ইন্সব্রুকের কথা বলি। সে এক ভারী সুন্দর জায়গা। আল্পসের কোলে, আর এই ভিয়েনা থেকে সালজবার্গ হয়ে ইন্সব্রুকের রাস্তাটাও বড় সুন্দর। মাঝে কিছুটা সময় ট্রেনটা জার্মানি দিয়েও যাবে। মাইলের পর মাইল ফসলের ক্ষেত, সুন্দর সুন্দর বাড়ি। ক্রমে দিগন্তব্যাপী ফসলের ক্ষেতের বদলে পাহাড় দেখা গেল, পাহাড়ের কোলেই ক্ষেত। সালজ নদী পেরিয়ে গেলাম। ট্রেন অনেকটাই খালি এখন। ইস্ট ইওরোপ অনেকটাই চলে বিশ্বাসের উপর। মানুষ ইচ্ছে করে অসততা করবে এ বোধহয় এরা ভাবে না। তাই, ট্রামে বাসে কোথাও টিকিট চেকার থাকে না। একমাত্র মেট্রোয় মাঝে মাঝে চেকিং হয় আর হয় এইসব দূরপাল্লার ট্রেনে। একজন মহিলা চেকার অনেক্ষন আগেই আমাদের টিকিট দেখে নিয়েছেন। মাঝে মাঝে স্টেশনে থামলে একেকবার এসে দেখে যাচ্ছেন, নতুন কেউ এলো কিনা। 




স্টেশনে নেমে, একটা ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার দেখছিলাম। এটা প্রাইভেট ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার।  তেমন ভালো না। বলে ইন্সব্রুক কার্ড নিলে এখন থেকেই শুরু হবে। এরকম হয় না। এখানে প্রতিটা শহরের এরকম কার্ড পাওয়া যায়। তাতে করে সুবিধে হয়, দর্শনীয় স্থান বেশীর ভাগ এই কার্ডেই দেখা হয়ে যায়। শহরের মধ্যে বাস ট্রামও এই কার্ড দিয়েই হয়ে যায়। পরে দেখা যাবে খন ভেবে রওনা দিলাম৷ একটা বিএনবি বুক করা আছে আমাদের। স্টেশন থেকে বিএনবি যাওয়ার রাস্তায় একটা নদী পরে৷ ইনস নদী না, ওরই কোনো শাখা হবে। তার পাশ দিয়ে দিয়ে রাস্তা। একটা পার্ক। সেই পার্কে বিস্তর শরীর চর্চা করার জিনিস আছে। এদেশে সুস্থ থাকতে গেলে কসরত করার দরকার পরে না খুব। শরীর চর্চা করার অফুরন্ত জায়গা,পছন্দ না হলে সাইকেল চালাও, দৌড়ও, হাঁটো। গরমের সময়ে ঘরে কেউ বসে থাকেও না।  চারিদিকে দৌড়বীর,  সাইক্লিস্ট এর পাশ দিয়ে দিয়ে চললাম। এই বিএনবিটার ঢোকার পদ্ধতি হল, লিফটের  একটা কোড দিলে লিফট খুলবে, তারপর তোমার ফ্লোর দাও। ঘরে ঢোকার আর একটা কোড! রান্নাঘরে ঢুকতে গ্রিলড মাছের গন্ধে চনমন করে উঠলো প্রাণ। দুজন তরুণ তুর্কী মস্ত একটা মাছ গ্রিল করে 'মৎস্য মারিব খাইব সুখে' ভঙ্গীতে বসেছে। আমরা রেডি টু ইট খাবার কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। চিকেন বাটার মশালা আর ভাত। কিন্তু তাজা মাছ ভাজার গন্ধের কাছে সে আর কি আর মন মানে৷ খাওয়া দাওয়া সেরে আমরা বেরোলাম ইন্সব্রুক টহল দিতে। প্রথমেই যাব ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার।  ইন্সব্রুক কার্ড কিনে নেব। কাল সারাদিন ঘুরব ইন্সব্রুক চারজন।পরশু সক্কাল সক্কাল ট্রেন ধরে আমি আর ময়ূরাক্ষী যাব সলজবার্গ। সুদীপ মৌসুমী আরেকটু ঘুরবে ইন্সব্রুকে। রাতে একই ট্রেনে ফিরব ভিয়েনা। এখানের ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার গুলো ভারী ভালো হয়। আমাদের যত বক্তব্য শান্ত হয়ে শুনে, সব বুঝিয়ে দিল চমৎকার।  টাকা পয়সা মিটিয়ে চললাম নদীর দিকে। রাস্তাতেই একটা চমৎকার চার্চ, ভিতরে ঢুকে দেখি কেউ নেই। খুবই সুন্দর কাজ চারপাশে। আমাদের দেশে যেমন গঙ্গাজল কেনা যায় ওরাও দেখি জর্ডনের জল কেনার জন্যে পোস্টার দিয়েছে। ধর্ম ব্যবসায়ীদের এই ব্যপারটা বেশ। বেসিক প্রফিটের জায়গায় বেশ মিলমিশ। নীচে কার যেন একটা সমাধি আছে৷ চার্চ,ক্যাথিড্রাল, চ্যাপেলের কিছু তফাৎ আছে, আমাদের দেশে আমরা সবই চার্চ বলি, সে হিসেবে চার্চই বলছি। তো চার্চে ঢুকলে আমার কেমন ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনা ঘরে মতো লাগে৷ সেইরকমই ভাবগম্ভীর একটা ব্যপার, উঁচু উঁচু সিলিং, লম্বা টানা বেঞ্চ। খানিক বসে থেকে, চললুম নদীর ধারে। নদীটার উলটো পাড়ে, ইন্সব্রুকের আইকনিক ছবির বাড়ি গুলো সারিবেঁধে দাঁড়িয়ে। তার ওপাশে পাহাড়। নদীর ধার ধরে হেঁটে গেলে ইউনিভার্সিটি। ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিটা কী যে চমৎকার কী বলি! কাচের দেওয়াল, বই থেকে চোখ তুললেই নদী পাহাড়। শীতে বরফে সাদা হয়ে যায় চারধার আর গ্রীষ্মে সবুজ। নদীর ধারে পাতা একটা বেঞ্চে বসে, ফ্লাস্ক থেকে বের করে চা খাই, পকেট থেকে বিস্কুট বেরোয়। শহর জুড়ে হেঁটে বেড়াই, কখনো দুটো আইস্ক্রীম কিনে ভাগ করে খাই। খিদে পেলে টার্কিশ দোকানে যাই,কাবাব বক্স নিই, নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ভাগ করে খাই।   অনেক অনেক্ষণ পর অন্ধকার নামার মুখে যখন আলো জ্বলে ওঠে চারপাশ, ফেরার সময় হয়ে যায় তবুও দাঁড়িয়ে থাকি ঠায়। অন্ধকার হবার আগে আকাশের রঙটা আশ্চর্য রকম অন্য হয়ে যায়, সে রঙীন লিখে বোঝানো যায় না। দাঁড়িয়ে দেখছি নদীর অন্য পাড়ে একটা দুটো করে আলো জ্বলছে, মুহূর্তটা ধরে রাখতে নিজেদের একটা খারাপ সেল্ফি তুলছি, এমন সময় একজন ভদ্রমহিলা ছবি তুলছিলেন, বললেন তোমাদের একটা ছবি তুলে দিই? দিলেন, তারপর একটু কথাও হল। চীনা অরিজিন, আমেরিকান। এখন অবসর নিয়ে দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ান আর ছবি তোলেন। বেশ ফূর্তির জীবন।








ফিরতি পথে একটা রেস্তোরাঁর পাশ দিয়ে আসছি, দেখি নারী পুরুষ মিলে চমৎকার নাচ গান হচ্ছে। চমৎকার সালসা নাচছে। গিন্নি জানেন খানিক নাচ, আমার নাচ মানে ভাসান ডান্স। বাকি দুই মক্কেল  জানেননা বলেই দাবী করেন, তবে ছুপা রুস্তম আছেন। দূর থেকেই তাই দাঁড়িয়ে দেখা হল। এত এনার্জেটিক, এত প্রানোচ্ছল বড় ভালো লাগছিল। আমরা ক্লান্ত, আমাদের গিয়ে খিচুড়ি রাঁধতে হবে, আমাদের কাল সকালে উঠে বেরোতে হিবে এসব ভুলে গিয়েই হাঁ করে তাকিয়েছিলাম অনেক্ষণ। খিচুড়ি তো বানানো হবে, ব্যাগে করে চাল ডাল আলু ফুলকপি সব এসেছিল, কিন্তু খিদে পেয়ে গেছে যে? এক রাউন্ড চা হয়ে যাক নাকি? খিচুড়ি ডিমসেদ্ধ বসিয়ে,  চা, মুড়ি সমেত বসা গেল রান্নাঘরে। সুদীপের গান শোনা পেন্ডিং আছে বহুদিন,  অন্য সময় কান কট কট করছে, পা ব্যথা এসব বলে কাটায়, দুই জন মহিলার সঙ্গে পেরে ওঠেনি সেদিন। সুদীপ দিয়ে শুরু হল, তারপর অন্তাক্ষরীতে চলে গেলাম। সেদিন মজলিশ যা জমেছিল না! আরো বহুক্ষণ চলতে পারতো, তবে খিচুড়ির গন্ধে ফের খিদে চনমন করে ওঠায় থামতেই হল বেয়াক্কেলের মতো। 


ইন্সব্রুক টপে নাকি পেল্লায় ঠান্ডা। আল্পসে উঠছি বলে কথা, ইন্সব্রুকের জন্য গাদাগাদা সোয়েটার নিয়ে গেছিলাম। ইন্সব্রুকে বেশ গরম। টিশার্ট পরে ঘোরার বদলে শার্ট আর ব্যাগে সোয়েটার নিয়ে বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে আমরা ইন্সব্রুক ঘুরেছি।খানিক হাবা মতো আছি বটে। সকাল সকাল চা ম্যাগি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ইওরোপে(ইউএসেও) সকাল তাড়াতাড়িই হয়। লোকজন বাড়ি থেকে বেরিয়ে,  কফি, পাঁউরুটি কিনে অফিস যায় সকাল সকাল। আমাদের মতো রাত দশটা অব্দি কল করতে হয় না, তাই তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। আমরাও আমাদের সারাদিনের খাবার মতো স্টাফড পাঁউরুটি, কলা, জুস, সিডার এসব তুলে নিলাম। ইন্সব্রুকের পাহাড়চূড়ায় পৌঁছতে গেলে একটা ট্রেন নিতে হয়। ইন্সব্রুক কার্ডেই ইনক্লুডেড সব, তাই আলাদা টিকিট কাটার প্রয়োজন নেই। ট্রেন মানে আমাদের মতো অনেক কামরা ওয়ালা ট্রেন না, ট্রামের মতো তিনটে কামরা আছে, খাড়াই উঠতে পারে। বসার জায়গা অল্প।দাঁড়িয়ে যেতেই ভালো লাগে বেশী। ট্রাম বলাই ভালো হবে দেখছি একে৷ ট্রামে করে পাহাড়ের মাঝের একটা জায়গায় নামা হল। এর পরে আর ট্রাম চড়বে না। কেবল কার, মানে ওই বন্ধ রোপওয়ে আর কি।  যে জায়গায় নামলাম সেখান থেকে পুরো ইন্সব্রুক শহরটা দেখা যায়। দূরবীনে চোখ রেখে চেনা যায় শহরের বিখ্যাত জায়গা গুলো। পাহাড় এখন হাতের নাগালে প্রায়। বসে বসে ছবি তুললে মনে হবে কাকা পাহাড়ের কোলে চড়েছি, আর খোকার ছবি তুলেছে কেউ। বরফ গলে গেছে বেশীরভাগ, অল্প আধটু আছে, উপর থেকে নীচে তাকালে সবুজে সবুজ আর উপর দিকটা রুক্ষ। 





কেবল কারে বেজায় ভীড়। তারমধ্যেই কাচের দেওয়াল দিয়ে দেখি  নীচে তাকিয়ে কয়েকজন পাগল সাইকেলে করে পাহাড় বাইছে, স্ফূর্তির অভাব কিছু আছে বলে মনে হয়না এই পরিশ্রমেও। অনেকে হাইক করছে। কেউ কেউ নীচে গাছের নীচে বসে বসে বই পড়ছে বা খাওয়া দাওয়া। উজ্জ্বল দিন।  রোপওয়ে পৌঁছে দেবার পর, অল্প পাহাড় বাইতে হয় একদম চুড়োটায় উঠতে গেলে। এখান থেকে কয়েকজন প্যারাগ্লাইডিং করার চেষ্টায় আছে।  পাহাড়ের খাঁজে বসে সবে আমাদের খাবারের ঝোলা হাতড়ে বের করেছি জিনিস্পত্র, বেশ কটা সাহসী পাখি এসে হাজির। পারলে গায়ে মাথায় উঠে বসে।  






উপর থেকে নেমে আসার পথে একটা চিড়িয়াখানা পড়ে। অ্যালপাইন জু। আমাদের টায়ার্ডনেসের জন্যে হোক, ম্যাপ বুঝতে না পারার জন্যে হোক অত ভালো কিছু দেখা গেল না, কিছু দেখা হল। এরা ব্যাটারা ভেড়া, গরু, রামছাগল সব রেখেছে চিড়িয়াখানায়। গন্ধে আকুল হয়ে যাবে ওই জায়গাটা পেরোতে। তাও ম্যাডাম গরু বলে কথা, তামাম ভারতবর্ষের মসীহা হয়ে খড় চিবুচ্ছে, তার দর্শন তো করতেই হয়! একটা গাছের পাশে একটা কবর, জন্তু জানোয়ার কছু নেই বোঝাই যাচ্ছে।  কিন্তু জায়গাটা বড় ভালো। বড় বড় গাছের ছায়া, লোকজন নেই।  আমাদের লাঞ্চের আদর্শ জায়গা বলা যায়। পানাহার এর পর্ব শেষ করে বোঁচকা বেঁধে ফেরার ট্রেন ধরতে প্ল্যাটফর্মে এলাম। এদের দেশে লোক কম, তাই হয়তো জীবনের দাম বেশী। প্ল্যাটফর্ম আর ট্রেনের মধ্যেকার ফাঁকটা ট্রেন এসে দাঁড়ালে স্বয়ংক্রিয় ভাবে একটা লোহার পাটাতন এসে ঢেকে যায়৷ দরজা বন্ধ হয়ে গেলে আবার সে নিজে থেকে গুটিয়ে যায়৷ শহরে এসে আমরা খানিক এদিক সেদিক ঘুরলাম।প্রথমে অ্যামব্রেস কাসলে একটা ঢুঁ মারা হল। শহর থেকে একটু তফাতে এই কাসলটা। কম কম বাস যায়। স্টপেজ এলে আমাদের ট্যুরিস্ট বুঝে যাত্রীরাই ইঙ্গিত করে নামিয়ে দিল। হরেক রকম মস্ত মস্ত গাছ, পুকুর, মাঠ দিয়ে ঘেরা বেশ কাসল। বেজায় রোদ বলে একট বেঞ্চে জিরিয়ে নিচ্ছি, ঝিম ধরে আসে প্রায়, এমন সময় ক্যাঁ ক্যঁ করে কর্কশ ডাকে তাকিয়ে দেখি এক জোড়া ময়ূর। এ তাদেরই বাড়ি, সুতরাং ভয়ডর নেই। খুঁটে খুঁটে পোকা টোকা খাচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে। এমন চমৎকার দেখতে একটা প্রাণীর এমন কর্কশ ডাক ভাবা যায় না! অবশ্য না যাবারও কিছু নেই। যা বাইরে সুন্দর তাইই অন্তরে সুন্দর হলে আর এত যুদ্ধ হয়  চারপাশে! অনেকদিন আগে সম্ভবতঃ অটোমান রাজত্বের সময়, এক সৈনিক ছিল, নাম গ্রেগর বাচি, সে তার ডান চোখে বর্শার আঘাত পেয়েছিল। বা বলা ভালো তার ডানচোখ হয়ে খুলি ফুঁড়ে একট বর্শা ঢুকে গিয়েছিল এবং আশ্চর্যজনক ভাবে তারপরেও সে বেঁচে গিয়েছিল। একটা স্কাল্পচার বানানো আছে তার খুলি আর ওই বর্শার টুকরোর কাসলের ভিতরে। আরো হরেক জিনিস আছে এক্সোটিক বলে অংশটায়।  তার মধ্যে হাতির দাঁতের অতি সুক্ষ সব কাজ, ড্রাকুলা নামে খ্যাত তৃতীয় ভ্লাদের ছবি ইত্যাদি। একটা ছবি বেশ অবাক করায়,  কিংবা অবাক না হবারই কথা, রাজাকে উপহার দেওয়া হয়েছে একজন বিকলাঙ্গ মানুষ। এক্সটিক বটে! বর্ম, অস্ত্রের যেমন সম্ভার থাকে তা তো আছেই, তার মধ্যে এক প্রকার বর্ম অবাক দেখে আমি তো যাকে বলে এক গাল মাছি! হাত পা বুক মাথা নাক সব সুরক্ষিত,  এদিকে আসল দুর্বল জায়গাটিই ফাঁকা! তাই বলি গালিয়থ কী করে ডেভিডের একটা গুলতির আঘাতেই ঘায়েল, টাকে উঠে যাওয়া ব্যপার! 


ওখান থেকে একটা লেকের ধারে যাওয়া হল। সেও শহর থেকে খানিক দূরে। লেকের পাশে এক আইস্ক্রীমের দোকানে লম্বা লাইন পড়ে গেছে। এখানে ছেলে বুড়ো সব্বাই আইস্ক্রীম খেতে বেজায় ভালোবাসে। আর খেতেও হয় চমৎকার।  হরেকরকমেকরকম ফ্লেভার, তার থেকে একটা পছন্দ করো। আমরাও করলাম। আইস্ক্রীম খেয়ে লেকের ধারে বসে,  শুয়ে রইলাম বহুক্ষণ। মাঝে মুড়ি খাওয়া হল, কলা খাওয়া হল।  লেকের নীচটা পাথুরে মতো, জলে নামতে গেলে পায়ে বেধে। তাতে কি কারোর ভ্রুক্ষেপ আছে! সব ছেলে মেয়ে দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে ঝপাং! কেউ শুয়ে রোদে ট্যান হচ্ছে, কেউ বই পড়ছে। গ্রীষ্মকাল যে হাজির তা বোঝা যায় বটে। দুটো জিনিস চোখে পড়ে, আব্রু নিয়ে এদের এত মাতামাতি নেই, বহু ছেলে-মেয়েই সামান্য আড়ালে গিয়ে বা না গিয়ে ভিজে পোশাক বদলে নিচ্ছে। আমাদের গঙ্গার ঘাটে যেমন করে চান করে উঠে, প্রায় তেমনই। কেউ তাকিয়ে দেখছেও না। আর পাবলিক টয়লেট গুলোও অতি পরিষ্কার। সন্ধ্যে নামার  মুখে ফেরার পথ ধরলাম।


ইন্স নদীর ধারে ফিরে ইতস্তত: ঘুরছি।একটা ভারতীয় দল ট্যুর এজেন্সির সাথে এসেছে দেখছি, ওই হয় না এজেন্সি গুলোর "লেজার টাইম",  সেরকম কিছু হবে, দলের বেশীরভাগ লোক লোকজন পার্কে বসে জিরুচ্ছে। হাঁটার অভ্যেস না থাকলে বিদেশে অসুবিধে আছে ঘোরার এ কথা সত্যি। হ্যাঁ, বাস-ট্রাম সবই খুব আছে, কিন্তু ঘুরতে গেলে হাঁটা ছাড়া উপায় নেই কিন্তু। তাছাড়া বাস ট্রাম সর্বদা নির্দিষ্ট জায়গায় থামে, সারা রাস্তাটাউ আমার স্টপ না কিংবা নির্দিষ্ট জায়গাতেই খাবার পাওয়া যায়, সারা রাস্তাটাই আমার রেস্তোরাঁ না। ঘুরতে ঘুরতে শেষ বিকেলে একটা গীর্জায় ঢুকেছি, সে সময় তাদের প্রার্থনা চলছিল। কল্পনা করতে আমি ভালোবাসি। কত সময় তুচ্ছ তালা চাবি নিজেদের মধ্যে কী কথা বলতে পারে  জাতীয় কল্পনা কিংবা পিঁপড়েদের মানুষ সম্পর্কে ধারণা আমি কল্পনা করে থাকি। কিন্তু কেউ বসে বা দাঁড়িয়ে চাট্টি ফলমূল কিংবা নকুলদানা কিংবা পাঁউরুটি কিংবা খেজুরের লোভে পাঁচটা বাজে আবদার কি কান্নাকাটি সইবে এটা আমার মতো কল্পপ্রাণ লোকও ভাবতে পারে না। তবে তা আমি মন্দির মসজিদ গীর্জা গুরুদ্বোয়ারা কোত্থাও প্রকাশ করিনা। পেটের কথা চেপে রাখলে যদি মিষ্টি টিষ্টি পাওয়া যায় মন্দ কি! তাছাড়া সত্যি বলতে নির্জন চার্চে, মন্দিরে, মসজিদে বসে থাকতে আমার ভালোই লাগে, বিশেষ করে গ্রীষ্মের দিনে। আর ভালো লাগে, গান। ভগবানের উদ্দেশ্যে হওয়া বেশীর ভাগ গানের সুরই আমার বেশ লাগে। তো যে গীর্জায় যখন গেছি, তাদের প্রার্থণা চলছে। অনেকে মিলে বসে, গীটারে গান ধরেছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলাম অনেক্ষণ।  তারপর বেরিয়ে নদীর ধারে। ইন্সব্রুকে এই আমাদের শেষ রাত। যতক্ষণ পারি চেটে পুটে নিই।