Sunday, September 30, 2018

হারিয়ে গিয়ে...

 সেদিন আনমনে হাঁটছিলাম। কলেজ স্ট্রীট যাবো বলে বেরিয়েছি, সীতারাম ঘোষ লেন থেকে ঢোকার পর  কোনদিকে যাচ্ছি খেয়াল না করেই হাঁটছিলাম। রাস্তাগুলো এখানে পরে সারানো হয়েছে, উঁচু হয়েছে আর বাড়িগুলো নীচু হয়ে গেছে। আচ্ছা এইরকম ঝুপসি জানলার একতলার ঘরগুলোয় কারা থাকে? আলো ঢোকে? আরিব্বাস কি চমৎকার একটা বারান্দা, এহে ভেঙে পড়বো পড়বো হয়ে গেছে তো। কেউ সারায় না মনে হয়। 

দুপুর খুব এখন। ঝাঁ ঝাঁ করছে রোদ্দুর। লোকজন তেমন নেই রাস্তায়, একটা দুটো ছোট ট্রাক যাচ্ছিলো জিনিসপত্র নিয়ে,  তাদেরও আর দেখা যাচ্ছে না কই। 
এ গলি ও গলি ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখি রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি, এ গলিটা আমি চিনিনা। মানে চিনি হয়তো কিন্তু অচেনা লাগছে খুব। এই রাস্তার ধারে এতো ফাঁক ফাঁকা জায়গা ছিলো বুঝি? বাড়ি গুলোও অতটা পুরোনো না। একটা কাক ডাকছিলো কাছে কোথায়, জল তেষ্টা পেয়েছিল হয়তো, কই সেটাকেও তো আর দেখতে পাচ্ছিনা। একটা নেড়ি কুকুরও নেই কোত্থাও। কোথায় যেন কাঁসি ঘন্টার আওয়াজ। আমার ভারী জল তেষ্টা পেয়েছে। রাস্তায় এর ওর কাছে দরজা ধাক্কিয়ে জল আজ থেকে পনেরো বছর আগে খেতাম ঠিকই, তবে এরকম এখন আর করি না। হঠাৎ করে হোঁচট খেয়েছি জোর। হাঁটুর কাছটা গেলো মনে হয়।

"ওই তো,  ওই তো ছোটকত্তা ফিরেছে।" 

একটা বাড়িতে পুরোনো দিনের পোশাক পরা কিছু লোক। আমি কাউকে চিনতে পারছি না এদের, একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে আছি, অবশ্য এরাও আমায় নিয়ে ব্যস্ত না তেমন, একটা ছোট ছেলেকে নিয়েই ব্যস্ত। ওই লোকটা মনে হয় ওর বাবা, গম্ভীর মুখ খুব। আর ওই পিরান পরা বয়স্ক কিন্তু শক্ত চেহারার লোকটা মনে হয় ওর ঠাকুর্দা। ওই খেঁটো ধুতি পরা লোকটা... উমম চাকর মনে হয়। আরো সব লোকজন। আরে পুজোর মন্ডপ দেখছি। দুর্গা পুজো এসময়? এখন তো বৈশাখ মাস! এরা এতো পুরোনো দিনের জামা পরে, ওই দিকে কিছু মহিলা দাঁড়িয়ে, এক মাথা ঘোমটা টানা। কিরকম গোলমাল লাগছে। সিনেমার শ্যুটিং হচ্ছে নাকি? 

"যাও গিয়ে কাপড়চোপড় বদলে নাও। এক্ষুনি খ্যামের পুজো শুরু হলো বলে। মা এর জন্যেই আজ কোনো বিপদ আপদ ঘটেনি। যাও। " 

বাপরে কি দাপট। এরা কারা? এদের বাড়িতে এরকম ঢুকে  গেছি চোর টোর ভেবে না মারধর করে! কিন্তু পুজো কেন এসময়? শ্যুটিংই হবে, কিন্তু ক্যামেরা ট্যামেরা কিছু নেই কেন? কিছু বুঝতে পারছিনা। এহে হাঁটুটা কেটে গেছে অনেকখানি! একটু তুলো পেলে ভালো হতো। ভালো ব্যাথা করছে তো হাঁটতে গেলে। একটু বসে যাই এই সিঁড়ির কোনায় একটু। 

"তুমি কে?"

রিনরিনে গলায় কেউ জিজ্ঞেস করে উঠলো। তাকিয়ে দেখি সেই ছেলেটা। আমি তড়িঘড়ি বলতে গেলাম,  'আমি চলে যাচ্ছি, তোমাদের শ্যুটিং এ ঢুকে পড়েছিলাম মনে হয়, আমি দুঃখিত, আসলে পা টা একটু কেটে গেছে কিনা।'

ছেলেটা একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো দেখি। এর পরনেও ধুতি। পুরোনোদিনের কোনো গল্পের শ্যুট হচ্ছে মনে হয়। 

"আমি তোমার কথা ভালো বুঝতে পারছিনা, তুমি বরং এসো আমার সাথে। এদিক দিয়ে এসো, নাহলে কেউ দেখে ফেললে মুশকিল হবে"। 

কী মুশকিল, কেন মুশকিল কিছু বুঝলাম না। কোনো বিপজ্জনক কিছু চলছে নাকি? কিন্তু এই ভরদুপুর বেলা,  কোলকাতা শহরে, কলেজ স্ট্রীট চত্বরে আমায় কেউ বিপদে ফেলবেই বা কেন! বাচ্ছাও না, বড়লোকও না। পুরোনো একটা টিশার্ট আর জিন্স,  ওয়ালেটে একশোটা টাকা কিডন্যাপ করতে চাইলেও করবে না কেউ কারন ঘেমে নেয়ে গা থেকে যা খুশবাই ছাড়ছে আমিই চমকে চমকে উঠছি। যাক এতো ভেবে কি করবো আর যাই বরং এর সাথে। 

ছেলেটার পিছন পিছন তিনতলায় এলাম। উত্তর কোলকাতার পুরোনো বাড়ির খড়খড়ি লাগানো জানলা দরজা। এরকম জানলা আমার ভারী ভাল্লাগে।

" তুমি কে? এটা কিরকম পোষাক? তোমার হাতে এইটা কি?"

কিরকম পোষাক মানে? ছেলেটা কি অপ্রকৃতিস্থ?  গোলমাল লাগছে। নিকুচি করেছে হাঁটুর ব্যাথার। বেরোই এখান থেকে। মোবাইলটা চেক করতে গিয়ে দেখলাম সুইচড অফ হয়ে আছে, অন হচ্ছে না।পড়ে গেছিলাম যখন তখনই গেছে মনে হয়।

"আরে তোমার পা অনেকটা কেটে গেছে দেখছি, দাঁড়াও আমি ছাদ থেকে গাঁদা পাতা নিয়ে আসছি। 

গাঁদা পাতা!! এ কে! মানে ডেটল জাতীয় কিছু নেই?  ডেকে বললাম, 'এই শোনো, তোমার কাছে ডেটল জাতীয় কিছু নেই?'

" ডেটল কি?"

বারো তেরো বছরের ছেলে ডেটল জানে না! না আগে ব্যাপারটা ক্লিয়ার করা দরকার। ওদিকে সে গাঁদা পাতা আনতে গেছে।  তিনতলার একদিকটা ছাদ।  আমি ছাদে গিয়ে পুরো ঘেঁটে গেলাম। আশপাশটা যা দেখছি আর যাই হোক ২০১৮ সালের কোলকাতা শহর না। কিরকম একটা সন্দেহ হলো।

'এই এদিকে এসো জলদি, আজ কত তারিখ? '

কথাবার্তায় যা বুঝলাম আমার তো আক্কেল গুড়ুম!   বৈশাখের ঝাঁঝালো রোদ, পরিশ্রান্ত, হোঁচট ঠিক কিসে কী হয়েছে আমি জানিনা, কিন্তু আমি সম্ভবত কোনো ওয়ার্ম হোলে পড়ে গেছিলাম। আমি  ২০১৮ সালের বদলে ১৯৩৩ সালের শরৎকালে পৌঁছে গেছি! এদের কাউকে আমি চিনি না, এরা আমার কোনো রিলেটিভ না কিন্তু প্রকৃতির কোন রহস্যে আমি আর আমার চেনা জগতে নেই! ভয় পেলাম, ফিরবো কি করে? আমি যদি এক হাজার বার ওই কাজ গুলো ফের করিও আবার আমার জায়গায় ফিরতেও পারি নাও পারি। না ফেরার সম্ভাবনাই বেশী কারন ওয়ার্ম হোলের মুখটা বন্ধ হয়ে গেছে এতোক্ষনে।

দরদর করে ঘামছিলাম, আমার মুখ চোখ দেখে বুঝি ছেলেটা কিছু আন্দাজ করেছিলো। এর মধ্যে সে আমায় যত্ন করে গাঁদা পাতা এনে লাগিয়ে দিয়েছে। ছেলেটার মুখটা ভারী মায়াবী, চোখ দুটো কেমন যেন এইখানে নেই অন্য কোথাও। ক্রমে আলাপ জমে গেলো। ভালো নাম বলল,  দুলাল, এমনিতে খোকা, ছোটকত্তা এইসব বলেই ডাকে। একমাত্র ছেলে না হলেও, এ বাড়ির ছোট ছেলে বলে কথা।  তবে ওর নাকি এসব ভালো লাগেনা। এইটুকু বয়স কিন্তু বেশ ঝরঝরে পরিনত কথাবার্তা।  বন্ধু বান্ধব নেই বিশেষ। এক তো বড়লোক বাড়ির ছেলে, পড়ে গেলে কেউ তুলে ধরে অবস্থা,  তায় ও নিজেও একটু অন্তর্মুখী। পড়াশোনা করে নানান জিনিস নিয়ে, গাছেদের সাথে ভালো রকম আলাপ আছে। আর একটা জিনিস পারে বলল। খুব ফিসফিস করে, পাছে কেউ শুনে ফেলে এমন ভাবে। 

"আমি না বাঁশীতে সুর তুলতে পারি।" 

'আরে বাহ এতো দারুন ব্যাপার। কিন্তু কত্তা এ জিনিস লুকোনোর কি? এতো খুব ভালো ব্যাপার। ' 

আমার মনের আশংকা অস্থিরতা সরিয়ে রেখেই বললাম। চিন্তা করে তো কিছু করতে পারবো না।  বরং যে পরিস্থিতিতে এসে পড়েছি সেটাই জানা যাক! এক নিমেষে আমার জগত বদলে যাবার আগে অব্দি তো জানতাম না, কত কি প্ল্যান করে রেখেছিলাম, প্যারামাউন্টে সরবত খেয়ে আড্ডা মেরে বাড়ি ফিরবো আজ জলদি। মা কী যেন বানাচ্ছে বলছিলো....

"তুমি জানোনা,  আমাদের তো সবাই ব্যবসা করে। আমাদের তাই শিখতে হয়, আমি তো ব্যবসা করতে  চাইনা নতুনদাদা, আমি বাঁশী বাজাতে চাই। আমি অনেক দূরে একটা নদীর ধারে বাঁশী বাজিয়ে মেঘ নামাতে চাই, পাহাড়ে উঠে গান গেয়ে গাছেদের শোনাতে চাই, জাহাজে চড়ে নাম না জানা দেশে যেতে চাই। এরা আমায় খুব ভালোবাসে আমি জানি কিন্তু আমি যে এখানে থাকতে পারবোনা। আমাকে যেতেই হবে জানো, আমি স্বপ্ন দেখি নৌকায় শুয়ে শুয়ে আমি ভেসে চলেছি, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে। আমি চলে যাই তাই মাঝে মাঝেই। ধরা পড়ে যাই। আরেকটু বড় হলে আমি আর ধরা পড়বো না দেখো। " 

আমি আমার কথা বললাম। আমারও ভালো লাগত না বাড়িতে থাকতে। কিন্তু যেই টের পেয়েছি আর হয়তো কোনোদিন মাকে দেখতে পাবো না, নিজের বই গুলোয় হাত দিতে পারবোনা, বাবার বকুনি খাবো না...আমার মন কেমন করছে। আশ্চর্যজনক ভাবে আমার লজ্জা লাগছিলোনা ওইটুকু ছেলের কাছে এরকম অকপট স্বীকারে। যেন আমি জানি, ও তামাশা করবে না। কিন্তু এখানে তো থাকা হবে না আমার। বললাম সে কথা। সে ছেলে তৎক্ষনাৎ বলল, আমিও যাবো তোমার সাথে চলো।  

আরে না, ধরা পড়লে কী হবে? তাছাড়া আমি কি করবো কোথায় যাবো কিছুই জানিনা। এ সময়টা আমি চিনিনা। এরকম ভাবে হয়নাকি? সেও শুনবে না, তার বক্তব্য আমি তো যেতামই যাবোই। তোমার সাথে নাও না। আমার তো বন্ধু নেই কেউ। পিছনের খিড়কি দরজা দিয়ে চলে যাবো, এখন অষ্টমীর আরতি হবে সবাই ব্যস্ত। কেউ টের পাবে না। চলো না।

তারপর? তারপর সত্যি সত্যি খিড়কির দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পুজোর ঢাকের আওয়াজ, শহরের কোলাহল ফেলে দুজন অসমবয়সী বন্ধু, অচেনা জগতে চলল। হাওড়া স্টেশন একেবারেই অন্যরকম। একটা ট্রেনে চড়ে বসেছি দুজন। ওদের বাড়ি থেকে আসার সময়েই আমার পোশাক বদলে নিয়েছি,  তাই কেউ তাকাচ্ছেনা তেমন। দু ভাই যেন বেরিয়েছে। সকালে তখন একটু একটু আলো ফুটছে, আমরা একটা স্টেশনে নেমে পড়েছি। লোকজন খুব কম বলে মনে হচ্ছে আমার। না বাঁধানো প্ল্যাটফর্ম।  দূরে একটা পাহাড় দেখা যাচ্ছে। আমরা এমনি হাঁটা শুরু করেছি। খিদে পেয়েছে। কিন্তু আমি বা দুলাল কেউইই কিছু করতে পারিনা। বেশ খানিকক্ষণ হাঁটার পর আর যখন পারছি না, একটা গ্রামে এক বাড়িতে একটু জল চাইলাম। বেলা প্রায় দশটা হবে, মুখ দেখে কিছু মনে হলো কিনা কে জানে! প্রশ্ন করল এক গাদা, আমরাও বানিয়ে বানিয়ে, আত্মীয়রা বাবা মা মারা যাবার পর তাড়িয়ে দিয়েছে ইত্যাদি গল্প বলে দিলাম। জল এর সাথে একটু মুড়ি আর বাতাসা পাওয়া গেলো। গপগপ করে খেয়ে ফের পা চালালাম।

অনেক অনেকটা হাঁটার পর একটা নদী দেখে তার পাশে পৌঁছে দুজনেই থেবড়ে বসে পড়েছি। খানিক জিরিয়ে নিচ্ছি চোখ বুজে। অনেক্ষন বিশ্রাম নেবার পর, দুলাল বাঁশী বের করে ফুঁ দিলো। আহা বড় ভালো বাজায় ছেলেটা এ বয়সেই। মন থেকে ক্লান্তি মুছে যায়, খিদে ভুলে যাওয়া যায়।

সত্যি তো ভোলা যায় না। খিদে পেয়েছে যখন বেশ খানিক, দেখি ক্যাপ্টেন চলো যাওয়া যাক,  কিছু খাবারের জোগাড় তো করতে হবে নাকি? পয়সা এখনো কিছু আছে, দুলালেরই টাকা, নিয়ে এসেছিল, টিকিট কেটেও ছিলো কিছু। কিন্তু এই জনহীন মাঠে দোকানই বা কোথায় খাবারই বা কোথায়! 


গ্রামের দিকে শরৎকালের রাতে হিম পড়া শুরু হয়ে যায়। ছোট ছেলেটাকে হিমে ভিজতে দেওয়া যায়না। অন্ধকার নামার আগেই লোকালয়ে পৌঁছতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে একটা গ্রামে পৌঁছনো গেলো। একজনের মুখেই জানা গেলো, নবমীর রাতে যাত্রা বসেছে বারোয়ারি তলায়। সবাই সেখানেই চলেছে। একটু জল পাওয়া যাবে কোথাও? খাবার তো চাইতে পারিনা দুজনের কেউই। যে লোকটা যাত্রার খবর দিচ্ছিল,  সেইই বলল পুজোর মন্ডপে গেলেই জল মিলবে, তবে তার আগে যে কোনো বাড়িতে চাইলেই হবে, ওর বাড়ি এখানে নয়, গ্রামের অন্যদিকে। 

পা চালিয়ে পৌঁঁছনো গেলো। সন্ধ্যারতির প্রসাদ দিচ্ছিলো, মুড়কি, বাতাসা আর নাড়ু। পেটে খানিক শান্তি হতে দুজনে যাত্রার আসরের দিকে চললাম। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে, আমাদের দুজনের কারোরই এতো পরিশ্রম করার অভ্যেস নেই। যাত্রা শুরু হতে বিস্তর দেরী। ঘুম তাড়াতে দুলাল বাঁশীতে ফুঁ দিলো, টুকটাক সুর তুলছে। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে একজন আমাদের সামনে এলো।

  - এই ছোঁড়া তুই বাঁশী বাজাস?

দুলাল ভয়ে ভয়ে আমার দিকে তাকালো। আমি বললাম কেন বলুন তো? 

  - আপনি কে? 
  - ওর দাদা। 
  - আপনাদের তো এ তল্লাটে দেখেছি বলে মনে হয়না। 
  - না আমরা এ গ্রামের না।
  - অ। শুনুন মশাই। আপনার ভাইটিকে দেখতে বেশ, বাঁশিও বাজাতে পারে টুকটাক দেখছি। যাত্রাদলে দিয়ে দিন। মাসে পাঁচটাকা করে পাবে, খাওয়া, বছরে একজোড়া ধুতি।
  - না না ও যাবেনা।  
  - ভেবে দেখুন। এ গ্রামের জমিদারের সাথে আমার চেনা আছে, ঝামেলার কিচ্ছু নেই।

ঝামেলার যে কিছু একটা আছে আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে। আমি তাড়াতাড়ি,  আচ্ছা দাদা ভেবে জানাচ্ছি, বলে তড়িঘড়ি উঠে পড়লাম। দুলালও চটপট উঠে পড়েছে। আমরা যাত্রার আসর থেকে, স্টেশন কোন দিকে জেনে হাঁটা দিয়েছি। 


স্টেশন এ গ্রাম থেকে মাইল পাঁচেকের দূরত্বে। কিছু করার নেই, লোকটার হাসি আমার ভালো লাগেনি। এখানে জোরজুলুম করলে কিছুই করতে পারবো না। দুলালও দেখলাম টের পেয়েছে, বলল, "আমি পারবো নতুন দাদা। চলো"।  অন্ধকারে হোঁচট খেতে খেতে, রাস্তা ভুল করে,  হাঁটাহাঁটি খুবই বিপজ্জনক।  তাও আবার যে রাস্তা চিনিই না। তাই আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম যাত্রার আসর থেকে দূরের কোনো ঘরের রোয়াকে যদি আজ রাত টুকু কাটানো যায় চেষ্টা করা যাক। দু তিনটে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলো, চার নম্বর বাড়িটা একটু সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়ি। সে বাড়িতে গিয়েই আগে সে বাড়ির কর্ত্রীকে দেখতে পেয়ে সাস্টাঙ্গে প্রনাম করে বললাম, 'মা আজ রাত টুকু দু ভাইকে থাকার অনুমতি দিন, আমরা কুটুম বাড়ি যেতে গিয়ে রাস্তা হারিয়েছি। স্টেশন যাবো, কিন্তু এ রাতে আর যাওয়া যায় না। তাছাড়া ভাইটা আমার আর হাঁটতেও পারছেনা'। 

সেকি কথা! বচ্ছরকার দিন! নিশ্চয়ই বাবারা। তোমার ভাই এর বয়সী আমার নাতি আছে, তাদের আসার কথা ছিলো, আসতে পারেনি। থাকো তোমরা। বছরকার দিনে দুটো মুখে দাও। কাল সকালে যেও।
গরম ভাত, ঘি, বেগুনভাজা, ডাল, তরকারি, মাংস,  এতো কিছু জুটবে আমরা নিজেরাও ভাবিনি। দুজন চোখাচোখি করে নিলাম,  খেয়ে হাত মুখ ধুয়েই  বাড়ির কর্তা প্রশ্নের ঝাঁপি খুলে বসলেন। আসলে আগেই চেয়েছিলেন, বাড়ির গিন্নীর আপত্তিতে করতে পারেননি। কোথায় বাড়ি, কুটুমবাড়ি কোথায়, আসার পথে যে সব স্টেশন চোখে পড়েছিলো তাদের একটার নাম বলেও ওনার সন্দেহ খুব একটা গেলো না। কাদের বাড়ি, কি নাম। আমি দেখলাম বেশী প্রশ্ন মানেই বিপদ। তাছাড়া দুলাল অত ভালো বানিয়ে বলতেও পারেনা। কিছু গোলমাল বেঁফাস বললেই মুশকিল। তাড়াতাড়ি গিন্নিমার দিকে তাকিয়ে বললাম, বড় ক্লান্ত লাগছে আসলে অনেকটা হাঁটা হয়েছে কিনা।

ব্যাস ও কথাতেই কাজ হলো। বউ এর কটমট চোখের সামনে কোন কালে কেইই বা টিকেছে। সকাল সকাল উঠেই বিদায় নিয়েছি। বেশীক্ষণ থাকা মানেই ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।  আমার কথা শুনলে তো পাগল বলবে। দুলালকে অল্প আধটু বলেছি। ওর কাঁচা মন,  তাই অত অবিশ্বাস করেনি। স্টেশনে গিয়ে জানলাম ট্রেন আসছেই। ট্রেনে ফাঁকা। দশমীর দিন এ সময় আর কে ট্রেনে থাকবে! দুলালকে বললাম,  'এবারে তোকে দিয়ে আসি বুঝলি, আরেকটু তৈরী হয়ে বেরোতে হবে, নিজের মতো থাকতে গেলে আগে নিজেকে তৈরী করতে হয়। তুই আমি কেউইই তেমন তৈরী না।তবে আমার তো থাকার উপায় নেই। তোকে পৌঁছে দিয়ে আমায় খুঁজতে বেরোতে হবে, যদি আমি বাড়ির পথ খুঁজে পাই।'

দুলালের চোখ ছলছল। তর্ক ও করতে পারে না। আমায় ওর বাঁশীটা দিয়ে বলল, "এটা রাখো তুমি নতুনদাদা। আবার আসবে তো?"
 ওর বাড়ির কাছে আসতেই, সোরগোল পড়ে গেলো। 
"ছোটকত্তা ফিরেছে "। 
" একটা লোক সাথে,  অ্যাই কে আছিস একে ধর,  এ তো মেজকত্তার কামড়জামা। চোর ব্যাটা, ছেলে ধরা, আমাদের ছোটকত্তাকে ভুলিয়ে নে গেছিলো, মার ব্যাটাকে"। 

কে যেন আমায় খুব জোর একটা মারলো মাথায়, চোখে অন্ধকার দেখছি, তেষ্টা পাচ্ছে খুব, মুখ থুবড়ে পড়ছি....পড়ছি...

"কী হয়েছে ভাই? মৃগী না গাঁজা? 

চারদিকে ছোটখাটো জটলা, বিকেলের রোদ পড়েছে ভাঙা বাড়িটার গায়ে।
চারদিকের নোংরায়, কোলাহলে বুঝলাম আমি ফিরে এসেছি আবার আমার চেনা শহরে। তবে কি সব স্বপ্ন ছিলো? 

তাকিয়ে দেখি আমার পরনে, ধাক্কাপাড় ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি আর একটা আড়বাঁশী।

Thursday, September 27, 2018

বাদলা দিনে মনে পড়ে ...

"বাদলা দিনে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান, বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এলো বান"।
বৃষ্টি বাদলার দিন হলেই আমার তিন চারটে র‍্যান্ডম কবিতা গল্প মনে পড়ে যায়। একই বয়সের না, আলাদা সময়কার। কালো করে আকাশ, সিঁড়ির বন্ধ জানলা বেয়ে জল এসে দালান থৈ থৈ। আমার কাগজের নৌকা ডুবে গেছে সেইই কখন, লেবু গাছের গোড়ায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে৷ আমি নীচের ঘরে আবছা অন্ধকারে, 'কবে বিষ্টি পড়েছিলো, বান সে এলো কোথা', ভাবতাম, কল্পনায় যেন দেখতাম অন্ধকার আলো নিভু নিভু ঘরের দৃশ্য।

আরেকটা গল্প মনে পড়ে যায়, ক্ষীরের পুতুলে, সেই দুয়োরাণী বাঁদর ছেলেকে ঘুম পাড়ায়, বাইরে তখন খুব ঝড় জল।

আরেকটা গল্প ছিল ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায় এর মনে হয়। কয়েকজন বন্ধু বিকেলে জড়ো হতো ক্লাবে, চা মুড়ি চপ খেতো, এরকম একদিন বৃষ্টি বাদলার দিনে যারা জড়ো হয় তারা সব মানুষ না!

তিনটে বিসদৃশ জিনিস মনে পড়ে কেন কে জানে! সাথে এলোমেলো করে বৃষ্টির দিনের ছবি, সে ছবিতে কেন্নোর দালানে উঠে আসা আছে, অফিস যাবার নাম করে বেরিয়ে ইচ্ছে করে ভিজে বাড়ি চলে আসা আছে, তুমুল বৃষ্টিতে ঝাপসা কাচে বাইক চালানো আছে, একটা বাচ্ছা ছেলের ভিজে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরে আসা আর তার মা এর গামছা দিয়ে মুছিয়ে দেবার পর প্রথমবার আদা দিয়ে সত্যিকারের চা খাওয়া আছে।

বৃষ্টি মানে ভূতের গল্প এই জন্যই কি? ভূত মানেই তো অতীত, ছেঁড়া খোঁড়া ঝলমলে হিংস্র নরম অতীত।

*******************************************************************************

একা একা সময় কাটাতে স্টুলিশ খেলছিলাম। হঠাৎ আলো কমে এলো, হুড়োহুড়ি করে একরাশ মেঘ ছুটে এলো কোথা থেকে। দিনদুপুরে রাতদুপুর হয়ে গেলো। জানলা খুলে হাঁ করে দেখছিলাম চারপাশ ফাঁকা হয়ে গেলো, ফলওয়ালা তার ঠ্যালাগাড়ি ফেলে পালিয়েছে, রাস্তায় একটাও লোক নেই আর। সাদা হয়ে বৃষ্টি পড়ছে আর একটাও লোক নেই....এমন অপচয় বড় কষ্ট দেয়।

আমার নীচে নামা বারন, অবশ্য বারন না হলে আমি এতোক্ষন একটা কাচের ঘেরার মধ্যে বসে স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। জানলা দিয়ে ঝাপ্টা আসছে, আমার চুল, বিছানা বালিশ ভিজে যাচ্ছে, বাবাই বকবে এক্ষুনি। 
হঠাৎ করেই এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়ায় গোলমাল হয়ে যায়, একটা একানে ছেলে টিউশন শেষে হাঁটা লাগিয়েছে, এখানে তার বন্ধু বান্ধব নেই তেমন। অবশ্য কোথায়ই বা ছিলো। বাসের ভাড়া বাঁচিয়ে সিগারেট কিনবে, নতুন শখ, খালের ধারে ভাঙা পাঁচিলে তার দেশলাই লুকোনো আছে, ব্যাগে রাখলে ধরা পড়ে যাবে।

হঠাৎ বৃষ্টি নেমে আসে। একা একা হাঁটা দেখেই সঙ্গী হয় বোধহয়। ছেলেটার ছাতা নেই, ব্যাগে পরীক্ষার খাতা, সে পরীক্ষায় সে সব চেয়ে কম পেয়েছে। মন খারাপে, একলায় মাখামাখি ব্যাগে বৃষ্টি ঢুকে দেখে। মেঘ নেমে এসে উড়িয়ে দেয় সব। তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে ভীতু হাতে সিগারেট ধরায়, ভয়ের চোখে দেখে আশেপাশে কেউ আছে কিনা!

রাতের বেলায়, সব থেমে যাবার পর টেবিল ল্যাম্পের আলোয় নদী আঁকে সে খাতায়। আঁকতে সে পারে না মোটেও একটাই আঁকা জানে, একটা নদী, নদীর ধারে ঝাঁকড়া গাছ, দূরে একটা বাড়ি, কয়েকটা পাখি আর সূর্য। আঁকতে আঁকতে কখন যেন নদী, গাছ সব তার মধ্যে ঢুকে যায়। পরীক্ষার কম নাম্বার, একলা কোচিং কিচ্ছু যেন আর ছুঁতে পারে না তাকে।

".....জানলাটা খোলা, দরজা হাট করা, সব ভিজে গেলো, আবার শরীর খারাপ না বাধালেই না?"

যাই।

Tuesday, September 25, 2018

শরত তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি

চেকাপের জন্য রাস্তায় বেরিয়ে কি আহ্লাদ যে হলো কী আর বলি। শরতের রোদে ধোয়া আকাশ, প্যান্ডেলের বাঁশ বাঁধা চলছে। রাস্তায় হরেক কিসিমের লোক। জুতো জামা পরে আপিস যাচ্ছে কেউ তো কেউ সাইকেল নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে।  এসিটা অফ করে জানলার কাচ নামিয়ে দিতে বলব? বাইরের হাওয়া খেতে ইচ্ছে করছে বেজায়। আচ্ছা থাকগে বললে যদি না করে দেয় দুঃখ হবে, আজ বেশ ঝলমলে দিন আজ দুঃখ পাওয়া যাবে না। 

ভিয়াইপির ধারে বড় বড় গাছ গুলোয় কি করেছে কে জানে পাতা টাতা ঝরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেমন মনমরা হয়ে। এমন পুজো পুজো দিনে কারো মন খারাপ হলে ভাল্লাগেনা, ওর পাতা গজিয়ে যাক প্লিজ। আরে এই গাছটায় কচি কচি সবুজ দেখা যাচ্ছে না? হ্যাঁ হ্যাঁ। আরে আরে এই গাছটায় তো অনেক সবুজ পাতা জন্মেছে, "প্রাণ আছে এখনো প্রাণ আছে"।  মন ভালো দিন। 

এইরে গাড়িটা বেমক্কা ঘোরাচ্ছে কেন? যাকগে আমার কি, আমার বরং ভালো। বেশী বেশী ঘোরা যাবে। হাঁ করে করে বাইরের দিকে চেয়ে চেয়ে গাছ দেখছি,  ফ্লাইওভার থেকে একটা বাড়ির মাথায় লেখা উচ্চ বিদ্যালয় লেখা দেখছি, আরিব্বাস ওই বাড়িটার ছাদে কত্ত গাছ লাগিয়েছে। একটা গন্ধরাজ ফুলের গাছ লাগাবো বাড়িতে। 

ডাক্তার আসেনি, মাকে বললাম এই পাশের দোকানে চা খেয়ে আসছি একটু। একটা চা দেবেন দাদা? বলে, যেই গোল নোনতা বিস্কুট নিতে গেছি, 'আমায় বলো কি চাই, হাত দিচ্ছো কেন'!  আমি কি চোর নাকি! খাবোই না শালা তোর দোকানে। বললাম, ও তাই, আচ্ছা থ্যাংক ইউ আমার লাগবে না চা। 

রেগে গিয়ে গটমট করে হেঁটে এগিয়েছি। নাহ, রাগ করে মেজাজ খারাও করা যাবে না। আরে এই মিষ্টির দোকানটায় ঢুঁ মারি তো। আরিব্বাস রে পোস্তকদম্ব মানে বহরমপুরের রসকদম্ব।  
আমদই দেখছি,  বাহ বাহ। মা দইবড়া ভালোবাসে, কালাকাঁদটা ভালো মনে হচ্ছে। বাহ বেশ উজ্জ্বল আবিষ্কার হলো তো আজ। 

মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে দেখি আকাশে একটা লাল ঘুড়ি উড়ছে, বেশী উঁচুতে ওড়েনি তখনো৷ এখনো ল্যাতপ্যাত করছে কিন্তু ওড়াচ্ছে যে ছানাটা তার মুখের ভাব বলেই দিচ্ছে আজ আকাশে নীল লাল সব রঙের ছবিই আঁকা হবে। 

আজ রঙের মেলার দিন। আজ তো হবেই। 😊😊

Friday, September 21, 2018

মানভৌতিক

সেদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেছে। সারদিন শুয়ে বসে কাটাই বলেই হয়তো রাত নিরবচ্ছিন্ন ঘুম হয় না।  মশারির জট থেকে বেরিয়ে টয়লেট ঘুরে এসে জল খেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়েছি। মন টন ভয়ানক খারাপ,  কাল বাড়িতে এক গাদা লোক আসবে কিন্তু আমার কি তাতে আমার তো সে সব্বার আগে পেঁপে ভাতে কুমড়ো ভাতে,  চিকেন স্টু। অবশ্য একটা সুবিধে আছে, শরীর খারাপ বলে ইচ্ছে না হলেই বকবক করতে হবে না। 

একা একা সাতপাঁচ ভাবছি,  দেখি এসির জলে একটা কাগজের নৌকায় বসে একটা এক আঙুলে ভূত আমায় ডাকছে, "কী হলো হে? মাঝ রাত্তিরে এমন ছলছল নয়নে ব্যাগড়া দিচ্ছো কেন হে?" 

ভারী রাগ ধরে গেলো। ও আবার কি আমার ঘর আমার বারান্দা,  চুপ চাপ দাঁড়িয়ে আছি ফস করে আমারই এসির জলে নৌকা বাওয়া ভূতে আমায় চোখ রাঙাবে! কলিকাল কি শেষের পথে নাকি? 

বললুম, 'তোমার তাতে কি হে? আর ব্যাগরা দিচ্ছি মানে? আমি কি গান গাইছি নাকি?'
  - মন খারাপ তো করছ। আমাদের ভূতেদের এসব নেগেটিভ চিন্তা ভারী ক্ষতিকর। আর ও আবার কি একজন ভদ্রমহিলাকে এরকম ভাবে বলতে লজ্জা করে না হ্যাঁ? ভূত বলে কি মহিলা নই!
  - 
 মহিলা! এ মহিলা? এ কুচো একটা ভূত তার আবার মহিলা না পুরুষ কে বুঝবে বাওয়া! সে কথাই বললাম। ওব্বাবা এক আঙুলে হলে কি তেজ কম না। অবশ্য স্বাভাবিক মহিলা ভূত আমার বোঝা উচিতই ছিলো। 

"কুচো ভূত আবার কি? লজ্জা করে না?  শোনো আমি তোমারই বয়সী বুঝেছ? আমি আসলে আসলে, বামন বলতে পারো। আমাদের ভূত সমাজে যেমন হওয়া উচিত মেয়েদের, কুচকুচে কালো, বা ফ্যাটফ্যাটে ফর্সা, ভয় পাওয়ানো মুখ, এই আলিশান চেহারা কিছুই আমার না। বয়স বেড়েছে এদিকে চেহারা ঠিক ছোটই রয়ে গেছে। তাই আমি একা একাই থাকি। অবশ্য আমার তাতে অসুবিধে হয়না, মানুষদের ঘরবাড়িতে এই আলোর শহরেও অনেক ছায়া ছায়া জায়গা খুঁজে নিয়েছি ,  ফলে রোজ রোজ নতুন জায়গা থাকার জন্যে আমার। তাছাড়া কুকুর বেড়ালে আর ভয় খায়না আমায় বেশ রাতের বেলা আড্ডা মেরে কাটে। "

শুনে মনটা খারাপ হলো একটু। আমিও তেমন লম্বা চওড়া সা-জোয়ান চেহারার না, খেলতে পারিনা, গাইতে পারিনা, পড়াশোনায় দড় না, আমারও তেমন বন্ধু নাই।  আমিও নিজের মতোই ঘুরে ঘুরে বেরাই। বাপী, লাল্টু, চাঁদুরা খেলেতে গেলে দুধ ভাত করে দেয়। আমার মন খারাপ করে। 

  - আহা মন খারাপ কোরোনা, ভূতেদের গল্প বলো বরং। আমারও তেমন বন্ধু নেই, তুমি বন্ধু হয়ে যাও। 
  - ভূতেদের গল্প আর কি। তোমাদের মতোই সব,  একটু আলো একটু কালো এইসব দিয়ে তৈরী। এই তো আজ রাতেই জলসা বসবে বটতলায়।  যাবে নাকি? 
  - আমি? আমি কী করে যাবো? আমার বাড়ি থেকে বেরোনো মানা তো।  তাছাড়া এই রাতে বাড়ি থেকে বেরোনো যায় নাকি!
  - ওহ তুমি বুঝি খুব ভালো ছেলে? মানে দুধুভাতু ছেলে?
  - দুধুভাতু আবার কি! মেরে তোমার পেত্নীগিরি ঘুচিয়ে দেবো। একটা কথা বলতে জানে না এসেছে আবার। শোনো তোমায় না পাত্তা দেয়না কেউ তোমার স্বভাবে বুঝেছ? 
  -  নখ দাঁত বেরিয়ে গেলো তো অমনি? অবশ্য আমারও ভুল তোমার দুর্বল জায়গায় আমিই আগে খোঁচা মেরেছি। সরি হ্যাঁ। ঠিকই বলেছ হয়তো, আমার দোষেই কেউ বন্ধু নেই আমার। আচ্ছা আমি যাই এখন। ভালো থেকো। 
  - আরে সরি সরি।  দুঃখ পেওনা। আমারও এই স্বভাব জানো ফস করে রেগে যাই। ওরম চলে যাওয়া কি হে। তুমি  শাঁকচুন্নি ফ্রেন্ড বলে কথা, বন্ধুদের উপর রাগ করলে চলে!
  - আচ্ছা রাগ করলাম না যাও। ভুল আমারও ছিল। তোমার সাথে কথা বলে ভারী ভাল্লেগছে। যা বলছিলাম, যাবে ভূতেদের জলসায়? না না বাড়ির গেট খুলতে হবেনা। তুমি খালি আমার হাতটা ধরো আমি নিয়ে যাবো। ভয় পাবে না কিন্তু।
  - ইয়ে ভূতেদের গা নাকি ভারী ঠান্ডা হয় শুনেছি। আমার আবার শীতে ভারী সমস্যা হয়। 
  - আরে এইটা একটা কথা নাকি! তুমিও যেমন। ওরা তো সব মরা ভূত। আমি তো জ্যান্তো শাঁকচুন্নি। আমার হাত ধরে দেখো, অমন ভুতুড়ে না। 
  - আরে তাই তো! 

তারপর আমি টুংলুর মানে ওর নতুন বন্ধু হওয়া শাঁকচুন্নির হাত ধরে আকাশে সাঁই করে উড়ে গেলাম। কয়েক মুহূর্ত অবশ্য তারপর একটা প্রকান্ড আর্ধেক তৈরী হয়ে পড়ে থাকা বাড়ি যাকে অট্টালিকাই বলা যায় তার কাছে এনে ফেললো। এ জায়গাটা চিনি মনে হচ্ছে না? বলতে গেলাম টুংলুকে, বলল হুঁ সবই এদিক সেদিক করেই নেওয়া তো৷ অত চেনা খুঁজতে যেওনা, তা দেখছো তাইই দেখো। 

আসর তখন জমে উঠেছে। গীটার হাতে খুলি নাচিয়ে গান গাইছে এক ছোকরা ভূত।ওই দেখো ওইযে হ্যান্ডু ছেলেটা গান গাইছে খুলি নাচিয়ে, খুব ঝাড়ি মারি বুঝলে।
আহাহা কি তার রূপ! চোখটা হাতে নিয়ে লাফাচ্ছে একবার, খুলিটা খুলে নিয়ে পাক খেয়ে নিলো! একেই নাকি পছন্দ! ভুতুড়ে পছন্দ কি আর এমনি বলে! 
-তা একে এতো পছন্দ যখন সাহস করে প্রোপোজ করলেই পারতে। 
  - পাগল নাকি! ঝাড়ি মারতে পছন্দ মানেই প্রপোজ করার মতো নাকি। ভারী ক্যাবলা হে তুমি যাই বলো।
  আমি কথা বাড়ালুম না। এখানে ঝগড়া করে তারপর এখানেই ফেলে পালালেই চিত্তির। ভুতুড়ে আসর মন্দ না কিন্তু। বেশ অনেক ক্ষন গান বাজনা শুনে, টংলু বলল চলো কিছু খাওয়া যাক। প্রথমবার আমাদের পাড়ায় এলে। আমি একটু ভয় পাচ্ছিলাম, কি না কি খেতে দেবে। ভূতেদের ডেলকেশি হয়তো থাবা থাবা শুঁটকি, সে জিনিস দিলেই কেস।  বললাম, না না,  চলো বরং এবার ফেরা যাক নাকি?
টংলু বলল, তোমার শরীর খারাপ লাগছে নাকি? 
আমি তাড়াতাড়ি জানালাম,  যে সেরকম কোনো ব্যাপারই না।
  - তাহলে আর কি চল। খেয়ে একটু ভেড়ির ধারে ঘুরে ফেরা যবে খন। 

ভয়ে ভয়ে একটা আর্ধেক শেষ হওয়া বাড়ির ন্যাড়া ছাতে বসলাম। চারিদিকটা জ্যোৎস্নায় অদ্ভুত মায়াময় লাগছে। এতো উঁচু থেকে সবটা দেখা যাচ্ছে আবছায়ায়,  একটা প্রায় অপরিচিত শাঁকচুন্নির পাশে ন্যাড়া ছাতে বসে আছি খেয়াল থাকে না। মন কেমন করে। যেন কোন আদিন কাল  থেকে সবাই এরকম রাত জাগে, ওই যে রাতচরা পাখিটা কি বলে গেলো তা যেন গাছটা শুনতে পেলো বুঝতে পেল। চমক ভাঙলো টংলুর ডাকে। "এই যে মহারাজ, এই নাও।" আরে! এ যে তন্দুরি। ভাগাড়ের নাকি? টংলু যেন আমার মনের কথা শুনতে পেয়েই বলল," আরে ঘাবড়িওনা, তোমাদের মতো ভাগাড়ের সন্ধানে ঘুরিনা। তোমরা যখন বর্তমানে বসে ভবিষ্যৎ ভাবো বর্তমানটা তো মরে যায় তখন আমরা সেইখান থেকে যা মন চায় তুলে নিই। সে যাক তুমি এতো ভেবোনা, খাও। "

আরাম করে তন্দুরি খাওয়া গেলো দুজনে। শুঁটকি ওদের ডেলিকেশিই বটে তবে আমি থাকায় আর ওটা বের করেনি। ভাগ্যিস! তন্দুরি খেয়ে একটা দুই  বেখাপ্পা মানুষ আর ভূত মিলে ভেড়ির হাওয়া খেয়ে ,  চাঁদের আলো মেখে ফের আস্তানায় ফিরে গেলো।

তারপর? তারপর আবার কি হে! দুজন বেঠিক মানুষ-ভূতের দারুন বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। তারা আড্ডা মারে, বই গান এক্সচেঞ্জ করে, ঘুরে বেড়ায়। ওহো তোমরা বুঝি সেই প্রেম আর বিয়েতে আটকে গেছো? তারা পেল্লায় বন্ধু হয়েছে এটুকু জেনেই আমি খুশ, মানুষ ছেলে আর শাঁকচুন্নি ভূতে বাকি গল্পটা কেমন করে এগোবে তা আমি জানিনা বাপু, ছেলে মেয়ে মিলে বন্ধুত্ব তো হেব্বি হয় দেখলুম। বাকি অত রংমিলান্তি খুঁজোনা বাপু।

Sunday, September 16, 2018

অলীক চিঠি



লীলা মজুমদার ক্ষমা করে দেবেন আশা করি।

*************************************
প্রিয় পানু,

এ চিঠিটা পড়েই গিলে নিস। চারিদিকে গুপ্তচর গিজগিজ করছে। এক্ষুনি জেনে যাবে সব। শোন আমি একটা জিনিস আবিষ্কার করেছি, কাউকে বলিনি এখনো। কাউকে মানে আবার ভাবিস না গরুর কথা বলছি। হ্যা হ্যা হ্যা। সেদিন এর কথা মনে আছে তোর? বোঁচা কেমন বোকা বনেছিলো কাউ নিয়ে। যাকগে সেসব। 

বুঝলি সেদিন মাঝ্রাতে চারদিক সব চুপচাপ, ভোঁওওও আওয়াজ করা মোটরবাইক, বিটলে কুকুর গুলো ভৌ ভৌ কিচ্ছু নেই। চৌকিদারের লাঠির আওয়াজটাও না। আমার ঘুম ভেঙে গেলো। এই শরীর খারাপের জন্য জানিসই তো বাড়িতে স্বাধীনতা বলে কিচ্ছু নেই, মশারীর মতোন খারাপ জিনিস টাঙিয়ে দিয়ে যায় রোজ। শুধু কি তাই, বিকেলে ছানা দুপুরে পেঁপে আর কুমড়ো রাতে চিকেন স্টু....দিন খুব খারাপ যাচ্ছে ভাই। একটু সেরে উঠলেই একটা কাবাবের দোকান দেখে রেখেছি। খেতে যাবো হ্যাঁ? আর আর অ্যামাজনে একটা রিমোট কন্ট্রোল কার দেখেছি, একদম ফেরারি, ওটা কিনবো ভেবেছি, জন্মদিনে আরো কিছু পয়সা জমিয়ে একটা রিমোট কন্ট্রোল্ড হেলিকপ্টারও কিনবো। তারপর এরকম মাঝরাতে বারান্দা থেকে হেলিকপ্টার নামাবো কেমন? 

আরে আসল কথাটাই বলিনি দেখছি। একটা ছোট ভূতের ছানা ধরার প্ল্যানে আছি, একবার ধরতে পারলেই হেলিকপ্টার টায় ঢুকিয়ে দেবো। সেদিন রাতে ঘুম ভাঙলো তো তারপর বারানাদায় গিয়ে ওই ভূতের ছানাটাকে দেখলুম। এক আঙুলের মতো সাইজ,  দেখি ব্যাটা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে আমার বারান্দা থেকে। তার আগে অব্দি আমার মন খুব খারাপ ছিল, এবারে আমার জামা কিনতে যাওয়া হবে না, পুজোয় চিকেন রোল খাওয়া হবে কিনা কে জানে, ঘুরতেও যেতে পারবো না কতদিন কিন্তু ভূতের ছানাটার কসরত দেখেই প্ল্যান করে ফেলেছি বুঝলি। একে রোজ ছায়ার লোভ দেখিয়ে দেখিয়ে বশ করে ফেলবো। তারপর পুষতে পারলেই, তোর কাছে পাঠাবো বুঝলি।  সেই সবুজ পাথরটা পরিষ্কার করে রাখিস, ওইখানে বসে বাকি প্ল্যান করবো। 

ভূতের ছানাটা ছায়া ছাড়া আর কি খেলে তাড়াতাড়ি বশ হবে বলিস তো৷ পুরোনো ক্যাপ বন্দুকের ধোঁয়া দেবো? আর একটু খানি ডাল্ডার  টিনে রাখলে কি ভালো থাকবে? বিশদে আলোচনা সামনাসামনি হবে।  কাউকে বিশ্বাস নেই, ভূতের ছানাটা খুব বেশী কথা বলছে না  তাই বুঝতে পারছিনা বাঙালী না বিলেতি। বিলেতি হলে আবার মুশকিল।

বিঃদ্রঃ -  চিঠি লেখার পর একটা আপডেট আছে,  ভূতের ছানাটা লায়ন ক্যাপ শুনে চকচকে চোখে দেখছিলো।

ভালো থাকিস, আর এ চিঠি পরেই গিলে নিস কিন্তু। শিগগিরই দেখা হবে। 

- গুপী

Saturday, September 15, 2018

হাসপাতালের পর

"হেলদি" লাইফ ফলো করায় আজকাল আমার শরীরের ভিতরকার যন্ত্র গুলো চমকে চমকে যাচ্ছে, মানে এটা কিই হচ্ছে!! সাড়ে দশটার মধ্যে ঘুম! সকাল ছটায় ওঠা! এইরকম থাবা থাবা পেঁপে কুমড়োর ইনপুট! চোখ তো কাল মুচ্ছো যাচ্ছিলো, রাবড়ির ভাঁড়ে হাত না দিয়ে সন্দেশের প্যাকেটে হাত!! হাত রীতিমতো বিদ্রোহ করছিলো, বেঁকে বেঁকে যাচ্ছিলো যা হোক তাকে ম্যানেজ করা যায় শেষ তক। এরকম নানান বিস্ময় দেখে দেখে তারা নানান ভাভে জানাচ্ছে সে যাক, ঘটনা হলো এই সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যাওয়ায় সকালটা দেখা হচ্ছে বেশ। মন্দ না কেমন যেন নতুন নতুন ব্যাপার।

জানলার পর্দা গুলো সরালেই সকালের নরম রোদ লুটোপুটি খেয়ে যায়। আমি আবার মোবাইলে সেই রোদ ধরে এদিক সেদিক ছুঁড়ে দিই। কাগজওলাদাদা হাঁক দিয়ে যায়, জয়দেবের সব্জীর  ট্রাক এসে নামিয়ে নামিয়ে যায়, বেগুন, কুমড়ো, পটল, শাকের আঁটি। কুমড়োর খানিক কাটা, দেখে নিয়েছে ভিতরটা, ট্রাকের ছেলেটা একটা দুটো বেগুন পটল নিজের জন্য রেখে রেখে দিচ্ছে। আরিব্বাস পটলের বস্তাটা কিই ভারী, ছেলেটা হেঁইয়ো করে নামালো। 

বিহারী জুতো সারাই লোকটা ফুটপাথে যেখানে বসে, তার সামনেটা ঝাঁটপাট দিয়ে নিলো। দুধের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে, রাস্তা ফাঁকা এখনো।  স্কুলের বাস, একটা শাড়ি পরা টিফিন এর ব্যাগ নেওয়া মহিলা, বেকারির গাড়িটা...

মাছওয়ালা বটির ফালিটা হাতে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে লাগিয়ে দেবে। আকাশটা এখনো নীল হয়নি, সকালের ঘোলাটে ভাবই রয়েছে কিন্তু চারদিকটা বেশ জেগে জেগে উঠছে বোঝা যায়। 

সকাল সকাল মনটা একটা চমৎকার গল্প পড়ে বেশ ফুরফুরে হয়ে আছে কিনা তাই এতো আজেবাজে বকলাম। বইটা আমার এক ফেসবুকের বন্ধুই দিয়েছে। আমার শরীর খারাপ শুনে, মহম্মদ জাফর ইকবাল এর ব্ল্যাকহোলের বাচ্ছা। কোনো সোশ্যাল এক্টিভিস্ট না, বদমায়েশী করে সাধু বলা নিজেকে যা কিছু নিয়ে বকবক করা একটা না দেখা লোককে এই যে এতো লোক ভালোবাসে এর তো কোনো কারন নেই না? আসলে কি জানো, লোকে ভালোবাসতেই চায়, ভালোটাই চারদিকে আমরা মাঝে মাঝে ওই খারাপটুকুর ধোঁয়া এলেই সব ঝুট হ্যায় বলে দিই বটে, তা মোটেও সত্যি না। 

ধোঁয়াটা কেটে গেলে দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়ে গেলেই দেখো "আলোয় আলো আকাশ, আকাশ আলোয় ভরা..."

Wednesday, September 12, 2018

হাসপাতালে হরেকরকম (পার্ট টু)

হাসপাতাল থেকে জানালো যেন আমি চলে যাই, ওদের অদ্ভুত ব্যাপার, আগে থেকে কেবিন বুক করা যায় না, বলে রেখেছিলাম তাও যে না হলে যাবোই না,  তাতে নেহাত দয়া পরবশ হয়ে বলেছিল যে আচ্ছা আচ্ছা আপনাকে সকালে জানাবো খন, আপনি চলে আসবেন।
ব্যাগে চার্জার, হেডফোন, সাদাকাক(আহ বই, সত্যিকারের কাক নিয়ে ঘুরবো?) , তারাপদ রায় এইসব নিয়ে বেশ একটা ভ্রমন মুডে বেরিয়েছি। বাইরে বলছিনা কাউকে, বেশ ক্যাজ ভাই ক্যাজ ভাব নিচ্ছি কিন্তু মনের মধ্যে বেশ একটা খারাপ খারাপ খালি খালি ভাব কি আর হচ্ছে না? ডাক্তারও তো মানুষ, অপারেশন করতে গিয়ে গন্ডগোল হয়ে গেলো, আমাদেরই কি হয়না? uat তে হুল্লাট চলছে কোড প্রোডাকশনে ঝুলে গেলো, কিংবা তার জুনিয়র কে যদি কাজ শেখাতে গিয়ে বলল কই কর দেখি ব্যাটা এটা, আমি একটু বিড়ি খেয়ে আসছি, ইন দ্য মিন টাইম সে ছড়িয়ে ছত্রাকার!  এহে মুন্নার কচুরি, জিলিপিটা আর খাওয়া হবে না, তালের বড়াও খাওয়া হবেনা, বড় ভালোবেসে সেজ জেঠিমা পাঠায় আমার জন্য। আচ্ছা আমি মনে হয় খুবই পেটুক, মরে যাবার সম্ভাবনায় জাগতিক সব কিছুর বদলে খালি খাবারের কথাই বা মনে পড়ছে কেন?  

শরতের আকাশ, ফুরফুরে মেঘ নীল আকাশ এনাস্থেসিয়ার ডোজের কম বেশী নিয়ে বাসে বসে আছি। সুস্থ মানুষ হেঁটে হেঁটে বাসে করে নার্সিংহোম গিয়ে ভর্তি হবে, এতে আমার তেমন অবাক লাগছেনা কিন্তু নার্সিংহোম এর লোকেদের বেশ অবাক লেগেছে দেখছি। জলের বোতল, সাবান শ্যাম্পু, চিরুনী ইত্যাদির খাম দিয়ে হোটেলে ভর্তি হওয়া গেলো। হোটেলের মতোই সিস্টেম, নটা টু নটা। আমার কেবিনটার পাশেই ঘর বাড়ি, মাথার দিক থেকে আকাশ কম দেখা যায়। গাধা আছে তো,  ওদিকটা মাথা করলে পারতো, চ্যানেলটাও তাহলে বাঁহাতে করা যেত অনায়াসে।  যাকগে, আজ তো কিছুই নাই, একটা অল্পবয়সী মহিলা ডাক্তার কেস হিস্ট্রি নিতে এলো। ঝাড়ি মারার মতো ভালো বেশ। আমার ডাক্তার আরো খানিক বাদে আসবে। মা বাবাই বন্ধু বান্ধব মিলে আড্ডা মেরে কাটলো তো ভালোই সন্ধ্যে তক। 

দুজন অল্প বয়সী নার্স আছে একজন দেখতে ভালো বেশী ফলত গম্ভীর আর একজন তেমন ভালো না কিন্তু বেশ হাসীখুশী। এছাড়া জেলারের মতো দেখতে একজন নার্সদিদি আছেন, বুড়ি মাসী গোটা তিন, দিন পাঁচেকের পরিচিতি হয়ে যায়। সকালে চ্যানেল করতে হাসিখুশি নার্স যার নাম মমতা( আমার কুনো দোষ নাই) এলো, নরম মাটি পেয়ে দাবী জানালাম বাঁ হাতে করে দাও চ্যানেল, ডান হাতটা নাড়াতে না পারলে ভারী অসুবিধে কিন্তু। সেই ঠান্ডা ঠান্ডা ঘর,  ডাক্তার এসে দেখে গেছে, এই ডাক্তারকে আমার পছন্দ হয়েছিল। ইয়ে আমি আবার ডাক্তার চুজ করি বন্ধু বান্ধবদের থেকে খবর নিয়ে, মানে ওই রেটিং বলতে পারেন, তা সে তো সব পেশাতেই রেটিং আছে না হলে উপায় কি জানার। আর একটা ব্যাপার সেটা রেটিং যদি একটু কমও হয় আমার ওই পছন্দ হওয়ার ব্যপারটা ম্যাটার করে। হাসিখুশি হবে, আমি দু চারটে বোকা প্রশ্ন করলে সময় শেষ আসুন ভঙ্গী করবে না, দরকারে ফোন করলে অন্তত এখন ব্যস্ত আছি রে অমুক সময়ে ফোন করিস বলার সময়টুকু থাকবে এ না হলে আমি ভারী অস্বস্তি বোধ করি। 

দুটো ডানা গোঁজা হয়ে গেলো, ইসিজি মিটার চালু হলো মনে হয়, এইবার দেবে প্যাঁক.....উঠুন উঠুন প্রভু.....জলের নীচে বন্ধ দরজায় ডাকাডাকি শুনে ঘুম ভাঙে, সেই গুপি বাঘা ফিরে এলোতে যেমন হিপনোটাইজ এর (নকল) পর ওরা গান গাইছিলো, 'আ আ আজ আজ আজ থেকে, আজ থেকে.......' ওভাবে ম্যা ম্যা করতে করতে জ্ঞান ফেরা, কেঁপে কেঁপে ওঠা আগেরবারের মতোই সব....বড় ব্যথা।


তারপর দিন রাত আধা ঘুমে আধা জাগরনে কাটে, জ্বর কমে না বাড়ে জানা যায়না, মাথার মধ্যে দপদপ করে ঘুম হয়, হয়না। ঘুমের মধ্যে দেখি আমি এক উপকূলে, একজন লোকআগেকার দিনের পোশাক পরা, তার সমুদ্রের ধারের বাসভূমিতে,  আমার কি যেন জিনিস আছে তার কাছে আনতে গেছিলাম দিতে যাবার আগের মুহূর্তে কী যেন হলো বাজ পরার মতো সব সাদা কালো হয়ে গেলো। কারা যেন বসে বসে বড় পিপে ঘুরিয়ে কি পানীয় কাচ্ছে তারাই বলল বসে থাকো হয়তো আবার সব জাগবে। 

বসে থাকার সময় মাথার ব্যাথা বেড়ে যায়, আমি স্বপ্নের মধ্যেই টের পাই আমার বসে থাকলে চলবে না। কি হয় আমি জানিনা একটা ওয়ার্ম হোলে না কাদার গর্তে পড়ে যাই.....হাঁচোরপাঁচোর করে উঠতে দেখি এ এক নতুন দেশ। কারা যেন ন্যাড়া মাথায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছে....আমি যাবার আগেই মাথার যন্ত্রনা তীব্র হয় আমি উঠে পড়ি।

আরেকদিন, জানলার পর্দা ফাঁক করে দেখি ফুরফুরে রোদ বেরিয়েছে।  একটা কাক ঠোঁটে করে গ্লাস নিয়ে চলেছে। কাকেরা বুঝি গ্লাসে করে জল খায়? নাকি হুইস্কি?  একটা পায়রা তারে বসে অস্থির ভাবে ইতিউতি চাইছে,  যেন ওয়াইফাই এর সমস্যা দেখা গেছে খুব চিন্তিত। একটা বুড়ি সকালবেলায় ছাদে এসে কল খুলে কি যেন করে....বেশী কিছু দেখাই যায়না, আমার ঘুমও পায়না, মাথা ব্যাথাও কমেনা। 

এ কদিন নীলুমাসীকে জ্বালানো হয়েছে খুব, একদিন আমার বন্ধু বলেছে মাসী তোমার হাতে ভালো চ্যানেল করা যাবে, হেব্বি খচে গেছে। রোজ জ্বর আসে, না হয় কিছু না কিছু হয় সারবোই না নাকি আর? হ্যাঁ ইয়ার্কি হোতা হ্যায়? তারপর একদিন সকালে ডাক্তার এসে বলল কেমন আছিস বলতো? ব্যাথার কথা আর বলে লাভ নেই, বললাম ভালো আছি। সে মশাই এমন ভাবে হাঁফ ছাড়লো কী বলি! ভাবলো বোধহয় এ মক্কেল আমার হাতে ভবনদীর কূল পার হলে কপালে বিস্তর দুঃখ ছিল। হয়তো রাতে এসে বলবে, "নক নক, আচ্ছা পেটকামড়ানোটা কি স্কেলিটনে হওয়ার কথা?" "আমার খুলিটা খুব যন্ত্রণা করছে "। কিংবা ভূতেদের জ্বর হওয়া নিয়ে দেড় পাতা বকে গেলো! 


তাই.....ফিরেই এলাম আর কি।

Wednesday, August 29, 2018

কপ্টুম্যাক

একটা কথা, কেউ বাই চান্স যদি পড়েন এ গল্প এ ব্লগে, খারাপ ভালো মন্তব্য করলে বাধিত হই। অন্তত বুঝতে পারা যায় ব্লগটা মৃত কিনা। 

************************************

মাঠাংবুরু ঘুরতে গেছে, লায়েক হয়েছে কিনা, পাত্তা দেয়না আজকাল। কি করে জানলাম? ওর বন্ধুদের কাছ থেকেই খবর পাই মশাই।

#কপ্টুম্যাক
********************************************

ভুটুটুটুটু...একটানা আওয়াজ হয়ে যায়, পাইলিং না কি করছে কে জানে! সিমেন্ট বালি সিমেন্ট বালি, বস্তা সাজিয়ে রেখেছে, ঠিক তারপাশেই পাইপে করে করে জল বেরিয়ে ছোট্ট একটা ডোবা হয়েছে। এখন ডোবা লাগছে তার আগের অংশটা খাল....ছোটবেলায় এটাই মস্ত পুকুর হতো। তার আগে খানিক নদী।
ভারী ইচ্ছে করছে ওই সিমেন্ট বালি দিয়ে তৈরী চৌকো সিংহাসনে উঠতে। ওঠা যায় না, বড় হয়ে গেছি কিনা! ট্রাক ড্রাইভারের পরেই আমার পছন্দ ছিলো রাজমিস্ত্রি হবার। সিমেন্টে বালি মিশিয়ে মিশিয়ে খপাৎ খপাৎ করে ওই চ্যাটালো মস্ত থালায় দিতাম, তার আগে গোল করে সিমেন্ট বালি দিয়ে ঘিরে জল দেওয়া হবে, তারপর চারদিক থেকে সিমেন্ট বালি জলে দিতে দিতে জল ফুরিয়ে যাবে, আমাদের খাল বিল গুলো যেমন বুজে যাচ্ছে। আচ্ছা বিল বলে কেন? বিল আমি দেখিনি কখনো, ডোবা মানে ছোট পুকুর, পুকুর তো পুকুর, তারপর দিঘী, তারপর হ্রদ তারপর সমুদ্দুর। 

তারপর তো সিমেন্ট তৈরী হয়ে গেলো, ইঁট বসিয়ে বসিয়ে সিমেন্ট দিয়ে জুড়ে দেবো। বাঁকা মিস্ত্রী ইঁট বসিয়ে কাজ করতো আর বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে কথা বলত, "কিরে লোকে, এবার কি চাষ দিলি? "
লোকে মানে লোকু বা লখাই বলতো , "আর চাষ, বৃষ্টি নাই দেখেছ? এবার আশ্বিন মাসে ঢালবে, আর সে সময়েই  দেখবে জল ছাড়বে।"

বাঁকা মিস্ত্রীর নাম বাঁকা কেন কে জানে? বাঁকা বাড়ি বানালে সবাই ডাকে কেন? আর ও নিজেও তো বাঁকা না? তাহলে? আমি হাফপ্যান্ট আর চকচকে গেঞ্জি পরে বাঁকার নোংরা স্যান্ডো আর লুঙ্গির পাশ ঘেঁসে দাঁড়িয়ে জুলজুল করে দেখতাম যদি আমায় একটু দেয় সিমেন্ট মারতে দেওয়ালে,  থ্যাপাৎ থ্যাপাৎ করে। বলতে পারতাম না, লজ্জা লাগতো পাছে না বলে দেয়। 

আমার সেই থেকে বড় শখ, রাজমিস্ত্রী হবার। থ্যাপ থ্যাপ করে সিমেন্ট লেপবো ভাড়া বেঁধে। আমি লোভীর মতো বারান্দায় দাঁড়াই,  সামনে ঝিলের পাশে শোঁ শোঁ করে গাড়ি চলে যায়, ঝিলের উপর শরৎ এর নীল আকাশে মেঘ ওড়াওড়ি করে। কাজ আছে, কল আছে এক্ষুনি চলে যেতে হবে তবু আমি দেখি কেমন করে বিল্ডিং উঠছে। 

সেদিন দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একটা গম্ভীর ফড়িং এলো, ঠিক আমার পাশেই এসে বসেছে খানিক। মন টন খারাপ লাগছিলো, এমনিই, সেই কাজ আপিস,  বাড়ি ভাল্লাগেনা আমার পালাই পালাই মনে হয়। তেমন সময়েই ফড়িংটা এলো। ওই টুকুন ফড়িং তার আবার লম্বা একটা দাড়ি! আমি পাত্তাও দিইনি। কেনই বা দেবো! একটা ফড়িং বই তো না, ওব্বাবা দেখি ফড়িংটা ফস করে আমার সাথে কথা বলে উঠলো, "কিহে মন খারাপ নাকি? "
আমি তো হাঁ!!
ভাবলাম নির্ঘাত ভুল শুনছি! মোবাইলটা চেক করলাম একবার।
  - সারাদিন মোবাইলে কি দেখো বলতো? নট এট অল ইন্টারেস্টিং ম্যান, নট এট অল। তার চেয়ে আমি গান গাইছি কেমন শোনো,
  টিঁয়াও ছুউউ কিঁয়াও খুউউ আরে ঢিকচ্যাক চ্যাক ঢিকচ্যাক চ্যাক, 
ওওওও গুরুক করে তামাক খেয়ে উড়ছো বটে খুব,আর জলের নীচে পানকৌড়ি দিচ্ছে কেমন ডুব, ওওওওও।

আমি অবাক হওয়া সেই মাঠাংবুরুর পর থেকে ছেড়েই দিয়েছি, তাও খানিক অবাক হয়েছি তো বটেই। তবে তার চেয়েও বেশী রাগ ধরেছে, বলা নেই কওয়া নেই, সেদিন ফড়িং, সে অমন গান শোনাবে কেন? তাও মানে মাথা হীন গান, তাও আবার ঠ্যাং নাচিয়ে! ইয়ার্কি পায়া হ্যায়?

  - চোওঅঅপ।  এলেন!  বলি এরকম যখন তখন গান গাইলেই হলো হ্যাঁ? আর এটা গান? ছোঃ!  আমার গান শুনে দেখো বরং, তোমায় তালিম দিতে পারি বটে, যদিও এখন আপিসে গাইবো না।

  - তুমি? তুমি গান গাইবে? খ্যা খ্যা খ্যা। ওহে তোমার গান শুনলে মনে হয় গরু ডাকছে, সেকথা সকলেই জানে। তুমি আর হাসিও না।
  - ফড়িংরা গানের কি বোঝে হে। বকম বকম খালি। যাকগে আমি কাজ করতে গেলাম। দুপুরে লাঞ্চ আওয়ারে গেলে বাকি কথা হবে।
  - বেশ একটা পোকা কালেক্ট করে নিই এসময়ে।

লাঞ্চ করে আসার পর সে ফের এলো, তারও লাঞ্চ শেষ। আচ্ছা ওর কথা ওর মুখেই শোনো -

তোমরা আমায় পাগল বলতে পারো, খামোখা কাজ নেই কিছু নেই এমন চমৎকার দুপুরে,  মানুষদের আশেপাশে ঘোরার কোনো মানেই নেই। আসলে মাঠাংবুরু আমার বন্ধু কিনা, সে গেছে দুনিয়া দেখতে, যাবার সময় এই মহারাজের কথাও বলে গেছে। দেখলাম ছেলেটা একা একা মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে, ভাবলাম যাই চারটে কথা বলে আসি। মানুষ আসলে ভালো না মোটেও, আমার গ্রামের কিনটো, তার বাবাকে তো কচুর রস খাইয়ে একটা মোটা মানুষেই মেরেছিলো। তাও মাঠাংবুরু বলল যখন, মনে হয় এ ছেলেটা অত বদ হবে না। মাঠাংবুরুর থেকেই তো আমি মানুষের ভাষা শিখলাম। ও আমার নাম বলিনি বুঝি? আমি  কপ্টুম্যাক। হেব্বি না নামটা? আসলে এ নাম খানা আমি নিজেই রেখেছি। বেশ একটা ট্যাঙ্গো ট্যাঙ্গো ভাব আসে না নামটা শুনলে? ট্যাঙ্গো কি জানো না? মহা বোকাটে তো তোমরা!! আরে ট্যাঙ্গো একটা ফূর্তির ব্যাপার। 

যাকগে,  যা বলছিলাম, আমি এখানে থাকিনা, শহরে তেমন পোকা টোকা মেলে না কিনা।  আমি এখান থেকে অনেএএক দূরে একটা নদীর ধারে থাকি। আমাদের গ্রামটা একটু দূরেই, আমি একাই থাকি, নদীর ধারে ঘাসের উপর শুয়ে দোল খাই, আর পোকা ধরি। মানে ইয়ে পুরোপুরি একা থাকি না,  আমার গিন্নীও থাকেন আর কি, সাথে। তবে রোজ রোজ না,  পাগল নাকি মশাই রোজ থাকলেই চিত্তির। এই যে একটু হালকা খুউব সামান্য একটা ভুঁড়ি হয়েছে, এ নিয়ে রোজ গঞ্জনা মশাই, কেন মর্ণিং ওয়াকে যাইনা, এতো বয়স হলো সঠিক পোকা কেন ধরে আনিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে বউটোম্যাক মানে আমার বউ, সে কিছুদিন মানুষের আশেপাশে থেকেছিলো কিনা, ওতেই গন্ডগোল হয়েছে। যাই হোক আজকাল তাই পোকা ধরার অছিলায়, এদিক সেদিক চলে যাই। আমি আসলে একটু আলসে ফূর্তিবাজ ফড়িং। মাঠাংবুরুর মতো দুনিয়া দেখার শখ আমার নেই বাবা। কিইই দরকার পাহাড়ে উঠে কষ্ট করে, ছবি দেখে নে না বাবা। আর সত্যি বলতে কি আমাদের তাল গাছের মাথায় উঠলেই বা কম কি পাহাড়?  তা যা বলছিলাম, এদিক সেদিক বেরোই, তারপর একটু ভালো পাতা দেখে ঘুমিয়ে পড়ি। পোকা টোকা কিছু না কিছু জুটেই যায়। পেট ভরা থাকলেই ট্যাঙ্গো নাচি, তারপর মন কেমন করলে বাড়ি ফিরে যাই। সোজা তো। বউটোম্যাকও কদিন না দেখে মন খারাপ করে, পোকা গুলোকে কষিয়ে রাঁধে,  তারপর হাল্কা মধু খেয়ে  কার্টুন দেখতে বসে যাই। আহা তোমাদের মতো নকল না,  সত্যিকারের সব। আচ্ছা এক দুটো বলি, সেদিন দেখি একটা হুলো মন দিয়ে মাটিতে কি যেন দেখছে। পিছন থেকে  বাদামী কুকুরটা,যেটা সব চেয়ে বিটলে, সারাক্ষন চোখ বুজে শুয়ে থাকে আর নিরীহ কেউ দেখলেই  ঘেউ ঘেউ করে তাড়া দেয় আর যে তারা ভয় খায় অমনি খ্যাক খ্যাক করে হাসে  সেইটে দেখি পা টিপে টিপে বিড়ালটার পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বিড়ালটা যেই চমকে উঠে দু পা পিছিয়েছে অমনি ঘেউ ঘেউ করে তাড়া করেছে, তারপর তো হেব্বি রেস হয়ে গেলো।

তা এসব দেখে আরামেই দিন কাটাই। বেশী দৌড়ঝাঁপ ভাল্লাগেনা যাই বলো।  মহারাজের সাথে আলাপ হয়ে ভালোই হলো, আমায় বলেছে ওর একটা মস্ত পোকা আছে, যেটা কিনা দূর থেকে ও আকাশে ওঠাতে পারে আবার নামাতে পারে, অনেকটা আমার মতোই দেখতে। ওইটাতে একদিন বসিয়ে দেবে। একটু ভয় পাচ্ছি বটে, আমার আবার অত সাহস নেই, কিন্তু আমার মতো জিনিস যার আবার প্রাণ নেই,  কথা বলতে পারেনা, তেমন জিনিস এর  পিঠে চড়ার ইচ্ছেও হচ্ছে মন্দ না। সে দেখা যাবে, তেমন বুঝলে উড়ে যাবো।  

কপ্টুম্যাক এর সাথে আমার আবার দেখা হবে,  ওকে আমার রিমোট কন্ট্রোল্ড হেলিকপ্টার টাতে চড়াবো। দেখি ব্যাটার কেমন লাগে। পাশের লোকগুলোর কাজ শেষ আজকের মতো, আমিও যাই বাজে কাজ গুলো সেরে নিই। কপ্টুম্যাক যদি ভয় না পায় হেলিপ্টারে চড়ে, তাহলে ওকে দিয়ে ওই বড় বিল্ডিংটা আছে না? যাতে কেউ থাকেনা? ওখানে খোঁজ নিতে পাঠাবো। ওখানে নাকি একটা ভূত এসে থাকছে। আহারে বেচারা, একা একা আছে হয়তো, নিয়ে নেবো ওটাকেও আমাদের দলে। তারপর? কিই জানি তারপর কী হবে। গল্প শোনাবো খন।

Monday, August 27, 2018

ভুতুড়ে আলাপ


ভারী মুশকিলে পড়া গেছে। এক হাতে ইলিশ মাছ এক হাতে কফির কাপ, ওদিকে চশমাটা চুলকাচ্ছে। চশমাটা আসলে গত পঞ্চাশ বছর ধরে পরতে পরতে ওটাতেও চুলকায় আজকাল, সেই মানুষের চাকরি ছাড়া ইস্তক চলছে। না না ভূত না দিব্যি বর্তমানে আছি, কফি, কাবাব সব খাচ্ছি ভূত আবার কি? তাছাড়া ভূতেদের আমি ভয় পাই মশাই, ফস করে এই গা ছমছমে রাতে ভূত টুত বললে ভাল্লাগেনা বলে দিচ্ছি আগেই। 
উফফ, ভারী চুল্কুচ্ছে তো, "হেই ম্যাডাম একটু শুনবেন? আরে হ্যাঁ হ্যাঁ আপনাকেই বলছি, আপনার চেহারার ফাঁক দিয়ে তো আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না যে আর কাউকে বলব"।
- কী বললেন? লজ্জা করে না আপনার? এরকমভাবে,  অপরিচিত মহিলাকে মোটা বলে ডাকেন? ছিঃ ছিঃ, এই কি আপনাদের কর্ম সংস্কৃতি,  থুড়ি ডাক সংস্কৃতি?
- ধোর বাবা। ডাক হাঁক ছাড়ুন দিকি, চশমাটা একটু চুলকে দিন আগে তারপর ডাকের মাংস খাইয়ে দেবো। তাছাড়া ইয়ে মোটা বলিনি, আর কেউ নেই সেটাই বলছিলাম।
- দুঃখিত মশাই।  পারলাম না। আমি, "মানুষ চাকরি" করার সময় অব্দি আমার কান চুলকানোর বাডস ছিল, মানুষের কাজ আজকাল করিনা। তাছাড়া আমার বয়স কম, সবে চল্লিশ বছর মানুষ হয়ে নেই, এখন আমার কাজ করা মানা। 
এহ কচি খুকি এলেন আমার রে। চল্লিশ বছরের বুড়ি নাবালিকা হয়ে হাওয়া খেতে বেরিয়েছে। বিড়বিড় করলাম আমি। অস্বস্তিটা বেড়েই চলেছে আর ইনি এদিকে ইয়ে শুরু করেছেন। মহা যন্ত্রনা হলো। এই হতো আমার গিন্নী, বললেই,  " উফফ, বড় জ্বালাও জানো", বলে টলে ঠিক চুল্কে দিতো। কোথায়  আছে কে জানে, একা একা বেশ ভালোই আছি, যখন ইচ্ছে যা ইচ্ছে করছি, কোনো দায় দায়িত্ব নেই, একথা সত্যি যেমন এইসব দরকারে বেজায় মুশকিল হয় এও সত্যি, যাকে তাকে বলতে ভাল্লাগেনা মোটেও। তাছাড়া, এখন গিয়ে মাছ ভাজতে হবে,  গিন্নী থাকলে একটু ঘ্যানঘ্যান করলে ভেজেও দিতো। নাহ কাল দেখি খুঁজে দেখবো,  এদ্দিনে মানুষ হয়ে নেই আশা করি, বছর দশেকের  ছোটই তো ছিলো। 

-কি বিড়বিড় করছেন হ্যাঁ? গালাগালি করছেন নাকি? দেখুন আমি কিন্তু ভিডিও করে ভাইরাল করে দিতে পারি। বুড়ো বলে পার পাবেন না।
এহ যন্ত্রনা তো, হোঁৎকা বুড়িটা জ্বালালে তো। এই ভিডিও ভাইরালের মানুষটা এখনো খুলিতে ধরে রেখেছে দেখছি। এ বয়সে এতো উৎপাত সওয়া যায় না। দেখি মিষ্টি কথায় তুষ্ট করি।

- আরে না না ম্যাডাম। আপনাকে গালাগালি করতে পারি। আপনার এতো মিষ্টি ব্যবহার, এতো মিষ্টি হাসি। জানি আপনার অল্প বয়স তাও,  মানে এই চশমাটা একটু চুলকে দেন যদি।
- আচ্ছা আচ্ছা হয়েছে। কই দেখি। এহেহে কিই ময়লা ম্যাগো! আপনি বুঝি চান করেন না? 
-না না,  ওটা আপনার চোখের ভুল, ওটা রঙটাই অমন, বয়স হয়েছে কিনা তাই ভুল দেখছেন হয়তো।
-বয়স হয়েছে মানে!!
-আহা না না মানে বলছি আমার চশমার বয়স হয়েছে কিনা।
-চশমারই বা কি এমন বয়স হয়েছে শুনি, মরে যাবার আগে আমার সাথেই তো গিয়ে বানালে, বউবাজার ঘুরে ঘুরে হয়রান করিয়ে দিয়েছিলে। একটা ফিশফ্রাই ঘুষ দিয়েছিলে খালি। 
-অ্যাঁ!! মানে ইয়ে তুতুমি, তুমি গিন্নী হ্যাঁ?
-তো কি ভেবেছিলে? সুন্দরী মেয়ে দেখে ছক করে বেড়াবে, একে ওকে দিয়ে চশমা চুলকিয়ে নেবে আমি টেরটি পাবো না? খুব ফূর্তি হয়েছে,এই রাত দুপুরে কফি খাচ্ছো যে? ভুঁড়িটার দিকে খেয়াল আছে? বাড়ি চলো পার্কে বসে ঝাড়ি মারা বের করছি।
-ইয়ে মানে এসব যন্ত্রণা তুমি ছাড়া আর কেইই বা করবে কিন্তু ইয়ে তোমায় এমন দেখতে হয়ে গেলো কি করে? মানে ওজনে একই আছো মনে হচ্ছে কিন্তু ইয়ে মুখ তো একই রয়ে যায় যারা এ মুলুকে আসে?তাছাড়া এদ্দিন ছিলে কোথায়? 
- রয়ে যায়, আমারও আছে। তোমায় ওয়াচ করবো বলে ফেসিয়ালের মুখোশটা পরেই চলে এসেছি। এই দেখো। আমিও একটু ঘুরে ফুরে এলাম, তোমার কাছে এলেই তো এইটা করে দাও ওইখানে চলো এই সেই করে জ্বালিয়ে মারবে। 
-ভালোই করেছো ইয়ে না মানে আমি তো খুবই মিস করছিলাম।  আহাহা, গিন্নী কিই আনন্দ যে হলো রে। ম্মুউউয়ায়াহ। ইলিশটা পোলাওই করো আজ তবে হ্যাঁ? আর তোমার সিগ্নেচার কাবাব? প্লিইজ?
-হুহ আদিখ্যেতা যত। এতোক্ষণ তো চিনতেও পারোনি, পরনারী দিয়ে চশমা চুলকাচ্ছো। তাছাড়া মোটা আরো কি কি সব বলছিলে।
- আহাহা, রেগে গেলেই তুমি লজিকে গোলমাল করে ফেলো। একই সাথে ছক আর মোটা বলা হয়? 
-তুমি যা হারামীর হাট হতেই পারে। হুহ।
-আচ্ছা আচ্ছা কদ্দিন পর দেখা বলোতো। অমন রাগ করলে চলে। চলো চলো আমি হেব্বি কফি বানানো শিখেছি,চলো এদ্দিন কি কি করলে তার  গল্প শুনি, তার আগে কই এদিকে এসো দেখি এদিকে।

Sunday, August 19, 2018

গোল্লাছুট


কিছু না কিছু সকলেই পারে৷ কেউ ভালো গান গায়, কেউ আঁকে,  কেউ বাজায়, আমি কিছুই পারিনা এসব তাই আমি খালি মানুষ বানাই। মানুষ বানানো বুঝলে না? আচ্ছা বলছি, আমরা হলাম গিয়ে এক রকম প্রাণী,  যাদের খেলনা বাটি হলো গিয়ে এই পৃথিবীর মতো নানান গোলক। আমাদের জোনটার জন্য পৃথিবী বরাদ্দ হয়েছে। মূল ডিজাইনটা অনেক আগেই ঠিক হয়ে গেছিলো, এখন যা চলছে ওই ডিজাইনের উপর বেস করেই এনহ্যান্সমেন্ট বলতে পারো। আসলে একেবারে বসে তো থাকা যায় না, এবার তুমি কি করছ না করছ তোমার রিসোর্স নিয়ে তা রিপোর্ট করতে হয়। এবার তোমায় দিয়ে যদি কোনো প্রফিটই না হয় মানে তোমার জোন থেকে তাহলে তোমাদের হটিয়ে দেওয়া হবে। প্রফিট বলতে তোমাদের টাকা পয়সা ভেবো না আবার। প্রফিট মানে ধরো পৃথিবীতে একটা সুর সৃষ্টি হলো, সেই সুর ঝরনার জলে মিশলে নীল সাদা পাথর তৈরী হয়, তারপর ধরো জঙ্গলের গন্ধের সাথে মায়ের আঁচলের গন্ধ মিক্স করে যে আরাম তৈরী হলো, কিংবা নীল ঝকঝকে আকাশের বুকে যদি একটা পদ্মপাতায় বসে পিঁপড়ে আর মাছে গল্প করে তাহলে সেই রঙ দিয়ে রামধনু মেরামত করা যায়, এইসব গুলোই প্রফিট। এরকম নানান জিনিস আছে, কিন্তু কিছুই না হলে তাহলে আর পৃথিবী পোষা কেন!

আমাদের জোনে সবাইই যে আমার মতো কিছু পারে না তা নয়, আমিই খালি এরকম হয়েছি। অনেকে মানুষ বানায় আবার সুন্দর করে আঁকে। কেউ কেউ গাছ বানায় আবার মানুষও বানায় এরকম।  যেহেতু আমি খালি মানুষ বানাই, আমার হাতে বেশ খানিক সময় থাকে। মানুষ বানাই মানেই যে সে যা কাজ কর্ম করবে তা বলে দিইনা, তাহলে ব্যাপারটা ভারী বোরিং হয়ে যাবে বলেই আমাদের তরফ থেকে এটা করতে অস্বীকার করা হয়েছিলো। সেও অনেক আগেকার গল্প, যাই হোক। আমি মানুষ বানাই আর দেখি। আসলে আমার তেমন বন্ধু বান্ধবও নেই,  সেই ছোটবেলা থেকেই। আমায় দেখতে একটু অন্যরকম কিনা। কিরকম? তোমাদের বললে ঠিক বুঝবে না, আসলে আমরা কেমন সেটাই তো তোমাদের বোঝানো যাবে না, তাহলে অন্যরকমটাই বা কেমন করে বোঝাই! 

আচ্ছা চেষ্টা করছি। এই যে আমাদের খেলনাটা, মানে পৃথিবীটা, আহাহা চটো কেন, তোমরা আমাদের দেখতে পাও না কিনা তাই ভাবো এ তোমাদের, আমরাও যেমন খেলতে খেলতে ভাবি এ আমাদের, আসলে কারোরই না। আসলে এই ধরো আমাদের প্রত্যেককে তো একরকম দেখতে না,  আমাদের সবার নানান রকম জিনিস তোমরা দেখতে পাও কিন্তু। লেজ, শিং,  ক্ষুর, দাঁত, হাত, পা, চোখ, জিভ, নাক, স্বর, ভাব সব সব কিছু আমাদের কারোর না কারোর আছে, এবার আমাদের মধ্যে যখন কেউ কিছু তৈরী করে করে সে তার একটা বৈশিষ্ট্য ঢুকিয়ে দেয়। ধরো না কেন এই লেজ, ব্যাপারটা খুবই কমন কিনা তাই দেখবে তোমাদের আশেপাশে যারা আছে তাদের লেজ আছে বেশীরভাগেরই।  এবার আমায় দেখতে একেবারেই আলাদা, মানে আমার লেজ শিং ক্ষুর ইত্যাদি কিছুই নেই। তাছাড়া আমি আগেই বলেছি, আমার বিপদ সেন্স করার ক্ষমতা থেকে গান বাজনা করার ক্ষমতা কিছুই নেই। তাই আমি দেখি বেশী, নিজের মনে।

মানুষ হয়েও গেছে অনেক। আর মানুষ না ছাড়লেও হবে, কিন্তু সব মানুষ তো আমরা তৈরী করি না, কিছু কিছু মানুষ আবার মানুষ নিজেরাও তৈরী করে। ফলে ব্যাপারটা ক্রমেই হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ গোল্লাটার প্রজেক্ট হয়তো আমরা আর কিছুদিনের মধ্যেই নষ্ট করে দেবো। খুব কিছু পাওয়া যাচ্ছে না এখান থেকে, খালি মানুষ গুলো দিনরাত কাটাকাটি মারামারি করছে, তেমন ভালো কিছু তৈরী হচ্ছে না, মানুষ বাদে বাকি প্রাণীগুলোও ঠিক নিজেদের গ্রুম করতে পারলো না, মেলে ধরতে পারলো না। এইযে পিঁপড়ে এদের এতো বুদ্ধি দেওয়া হলো,  বৃষ্টি ঝড় সেন্স করতে পারার ব্যাটারা চিনির দানা খুঁজেই গেলো। 

এসব নিয়ে আমরা খুব বেশী ভাবি তা না, করুক যা ইচ্ছে, ইচ্ছে থাকলে পৃথিবীটা বাঁচিয়ে নেবে সবাই মিলে না হলে মরে যাবে এই তো কথা! আমাদের অনেক অন্য জায়গা আছে, সেখানে ফের নতুন করে সব শুরু হবে। হ্যাঁ কোনো প্রজেক্ট এর সাপোর্ট বন্ধ হয়ে গেলে খানিক কর্মশূন্যতা তৈরী হয় বটে, উপরের কর্তাদের কিছু চাপও হয় কিন্তু আমাদের রিসোর্স অনেক, আমরা জানি কিভাবে ফের রিইনভেন্সটমেন্ট করে নিতে হয়। তাই আমরা কেউ চাপ নিই না। খালি আমি,  আমি তো ওদের মতো হইনি, ফলে এই হেরো লোকগুলোর উপর আমার আলতো একটা মায়াও আছে, বোকাগুলোর উপর রাগ যেমন আছে তার সাথেই। 

তোমরা যখন একটা বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাও অন্য শহরে, কেমন মায়া মায়া চোখে দেখো না সব? এটাও আসলে ইনহেরিটেন্স,অল্প করে মায়া ব্যাপারটাও দিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। তোমাদের এ গল্প শোনাচ্ছি কেন? আমার মনে হয় তোমরা যারা এ গল্প পড়ছ তারা হয়তো একটু আলাদা, পড়াশোনা বা খেলাধূলো বা গান বাজনা এসব কোনো কিছুতে সেভাবে দাগ কাটোনি কখনোই, খারাপ কাজও খুব বেশী করতে পারোনি যেমন ভালো কাজও করোনি। তোমরা আসলে আমার তৈরী মানুষ, সবাই না, যারা এসব কিছুর মানে খুঁজে পাওনা, কোনো জায়গাতেই থাকো না যেন তারা।  বাকিরাতো এ গল্প শুনতে পাবে না। তোমাদের মন খারাপ হয় না? এমনি এমনি মন খারাপ? জানি তো আমারও হয়। কী করবে তখন? আমি জানিনা। বরং তোমাদের বলি আমি সারাদিন কেমন সব লোক দেখি। 

ওই দেখো বাইকে করে দুটো লোক যাচ্ছে। একটা গুঁফো লোক যে চালাচ্ছে বাইক আর একটা দেড়ো লোক যে বাইকের পিছনে। কেমন নিস্পন্দ মুখ দেখো, এ নির্ঘাত নিজের কাজের জায়গায় খুব ভালো, আপিসের পর আড্ডা মারে, বাড়ি এসে বারমুডা কিংবা পাজামা পরে খালি গায়ে টিভি দেখতে বসে, মাঝে মাঝে বগল চুলকে নেয়, তারপর রাত বাড়লে এক থালা ভাত খেয়ে সিগারেট খেয়ে ঘুম যায়।
আচ্ছা ওই লোকটা দেখো, ফর্সা, ট্রিম করা দাড়ি, ব্রান্ডেড চশমা, গেঞ্জি, ফোন। এরও কেমন নিস্পন্দ মুখ। এও ওই রকমই করে, গান শুনতে শুনতে আপিস যায়, আপিসে কাজ করে তামাশা করে, শুক্রবারে বাইরে রেস্তোরাঁয় যায়, রাতে ল্যাপটপ কিংবা ফোনে থাকে খানিক তারপর ঘুম যায়।

বোরিং মনে হচ্ছে? তা তো হবেই এরা সব কটাই বোরিং, আচ্ছা চলো তোমায় একটু দূরে নিয়ে যাই। কোথায় যাবে? পাহাড় না সমুদ্র? সমুদ্র? তা বেশ, ওখানে লোক বেশী পাবে  বটে। ওই দেখো,  দুজন লোক তাদের বউ মেয়ে নিয়ে এসেছে। দুটো পাপড়িচাট কিনে শেয়ার করছে, লোকটার আরেকটু খেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু বউটা খাবে বলে কম কম করে খাচ্ছে দেখছি। আবার বউটা কম কম খেয়ে মেয়েটাকে আর অন্য বউটাকে একটু দিচ্ছে, সে আবার একটু খেয়ে পাশের জনকে.......বড় মায়া হে বড় মায়া। 

আচ্ছা শামুক দেখবে? ওই দেখো, একটা শামুকের পিঠে একটা পিঁপড়ে চড়ে কেমন গল্প করছে। আমি ওদের নাম জানি, ওদের গল্প ওরা নিজেরাই এসে বলে যাবে খন। এদিকটা বড় ভীড়,  চলো একটা গান ভেসে আসছে ওই দিকে বালিয়াড়ির ওদিকটা থেকে। আমি গাইতে পারিনা বটে কিন্তু শুনতে ভালোবাসি বেজায়। তোমরা শুনতে পাচ্ছোনা না? স্বাভাবিক, জোরে জোরে তো গাইছে না কেউ। হাওয়ার সুর, ঝাউগাছের বাজনা সমুদ্রে ভোকাল...লিরিক্স? ওই যে মাছ গুলো ঘাইমারছে, আর লাল কাঁকড়া গুলো হুটোপুটি করতে করতে কি সব বলছে শোনো.... 
ওই দেখো একটা মেয়ে একটা পাখির ছানাকে কোলে করে তুলে নিয়ে গেল, ওইই দেখো বুড়ো মাঝি ভালোবেসে ছেলেটাকে কাঁকড়া দিচ্ছে একটা বেশী.....

তোমাদের উচ্ছন্নে যেতে আরো কিছু বাকি আছে মনে হয়। তোমাদের গোলকের এখনো কিছুদিন আয়ু আছে দেখছি।

Tuesday, August 14, 2018

সেই গল্পটা.….

এই ছবিটার গল্প আছে একটা।  
সে অনেকদিন আগের কথা। গাছ গুলো বলেছিলো তারা হবে প্রহরী। সমুদ্র যেন তাদের টপকে এগোতে না পারে। তারা হবে সীমানা। 

শুকনো ডাঙা আর ভেজা মাটির মাঝে মধ্যস্থতা করতো তারা, সার দিয়ে দিয়ে। কিন্তু ওই যা হয়, দীর্ঘদিন পাশে থাকতে থাকতে সব কঠিনও ক্রমে নরম হয়ে যায়। সমুদ্রের সাথে রোজ ছোঁয়াছুঁয়ি হতে হতে গাছটা যেন বুঝতে শুরু করে দিলো সমুদ্রকে। আর সমুদ্রও সারা দুনিয়ার ঢেউ এর গল্প এনে দিতো গাছটাকে। গাছটা বলতো ওপারের শুকনো ডাঙার গল্প, আকাশের পাখিদের গল্প, মেঘেদের গল্প অবশ্য দুজনেই জানত। 

গাছটা আরো বলত শিকড়ের গল্প। সমুদ্র এই একটা জিনিস একেবারেই বুঝতনা। সে অতল বোঝে, সে ভাঙচুর বোঝে, সে ডুব বোঝে কিন্তু আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকা? কেন? সমুদ্র বলত তুমি চলো আমার সাথে,  দেখবে কত অজানা দেশ, দেখবে কেমন গভীর জলের স্তব্ধতা, ঝড়ের হাওয়া উন্মাদ নাচ, উথালপাথাল আনন্দ, এখানে এই শুনশান জায়গায় কেন পড়ে আছো? কিই বা আছে এখানে? গরু, মানুষের আবর্জনা আর কখন আমি গল্প শোনাবো সেই অপেক্ষা!

গাছটা হাসতো। তা যে হবার নয়, সমুদ্রের ছটফটানিতে, অস্থির ঢেউ ছোঁড়ায়, আর তারপরেও ফিরে ফিরে আসা দেখে মিটমিটিয়ে হাসতো সে। তারপর একদিন সমুদ্র হলো বড় অবুঝ, সে উপড়ে নিয়ে যাবে গাছকে, দেখাবে সারা দুনিয়া, এতো কিছু দেখে, জয় করে গাছ নির্ঘাত বুঝবে কিই বোকামিই না করেছে এতোদিন। গাছ সমুদ্রের কথা শুনে ফের হাসে,  বলে বেশতো, কাল এসো সকালে।

সকালে আলো ফোটে, কিচিরমিচির করে পাখিদের কাজকর্ম শুরু হয়, হন্তদন্ত হয়ে সমুদ্র আসে, আজ সে গাছকে রাজী করিয়েছে, নিয়ে যাবে। এসে দেখে সোজা সটান গাছটা,  সোজা হয়েই অপেক্ষা করছে কিন্তু চুপ করে শুয়ে। মুখে তার হাসিটা তখনও লেগে। সমুদ্র ডাকে খুব ওঠো,  কথা বলো, এভাবে নিয়ে যেতে তো আসিনি আমি। সমুদ্রের কান্নায় বাতাসে নোনা হাওয়ার ঝড় বয়, তবুও গাছ আর ওঠে না।

সেই থেকে সমুদ্র এসে রোজ দেখে যায় তার প্রিয় গাছকে, ফিসফিসিয়ে বলে রোজ,  তোমায় নিয়ে যাবো একদিন, এভাবেই নিয়ে যাবো দেখো, তারপর দেখবো কেমন করে আমার সাথে কথা না বলে থাকো। তোমার আমি দুনিয়া দেখাবো, দেখবে   নীল মাছেরা যখন তোমার পিঠে চড়ে লাফাবে, তুমি আবার জেগে উঠবে। তোমার শিকড় তো আমি বুঝেছি গাছ,  সেই শিকড়েতো ভালোবাসাই আসল,  তবে আমার ভালোবাসায় নতুন শিকড় গজাবে না কেন? নতুন করে,  নতুন ভাবে?  

গাছ চুপ করে শুয়েই থাকে, সোজা সটান।  আর সমুদ্রটা রোজ বলেই যায়।


Wednesday, August 8, 2018

হিজিবিজি আঁকিবুঁকি


তো যা বলছিলাম, আমার আবার একটু নদী, জল এসব প্রীতি একটু বেশীই। বহুদিন আগে গাল্ফেরেনের সাথে টাকি গেছিলাম, সে নিয়ে বিস্তর ফ্যাচফ্যাচও করেছিলাম, ইয়ে মানে লিখেছিলাম। এক জ্ঞানী লোক বলেছেন, গাল্ফেনের সাথে ঘোরা জায়গা গুলো বউ এর সাথে ঘুরে দেখলে অভিজ্ঞতা বাড়ে। গত সপ্তায় গাদিয়ারা আর তার আগের সপ্তাহে কোলাঘাট, বোম্বে রোড ধরে খুবই স্মুদ যাওয়া হয়েছিলো কিন্তু আবার বম্বে রোড না ধরে অন্য কোনো রাস্তায় যেতে মন করছিলো। তাই সে জ্ঞানী মানুষের পরামর্শ মনে রেখে, ফের টাকি।

ভেবেছিলাম, আজকাল রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে চুরুট খান যখন, নিশ্চিত ভাবে রাস্তা গুলো বেশ মাখন এর মতোই হবে। তবে আমার ভাবাটাই ভুল ছিলো, মাখনে কি ভালো করে দাঁড়ানো যায়? অমসৃন তলা না হলে হবে? পিছলে যাবে না চাকা? তাই বারাসাত পেরোতে না পেরোতেই দেখি গাড়িটা বেশ দুলকি চালে চলছে। আহা একই সাথে গাড়িও চড়ছি নৌকাতেও যাচ্ছি এ কি কম নাকি! গান চালালাম তাড়াতাড়ি, এ মুহূর্ত টার মানাসই, 'সাগরে উথালপাথাল বুকেও এই নৌকা চলে'।

সেই বাণে বাণে অন্ধকার দেখতো কুরুক্ষেত্রে সবাই, মনে আছে? খানিকপর আমিও দেখলাম, ইয়ে বাণে বাণে না, ধুলোয় ধুলোয়। তোমার ওই ধূলায় আমি ছিলেম, না কি যেন গান আছে না? কাচ তোলা বলে আমি ধুলো খাচ্ছিনা, কিন্তু উইন্ডস্ক্রীনটা বেশ রঙ বদলে গেছে।এরপর হলো বৃষ্টি শুরু, তেড়েই হলো। আমিও আর গর্ত গুলো একেবারেই বুঝতে অপারগ হয়ে নেচে নেচে চললাম। এরপর একবার থেমে দেখি বাহ বাহ, তেনার চ্যায়্রা ছবি বেশ খোলতাই হয়েছে। কাদার আঁচল দিয়ে গা মাথা ঢেকে চলেছেন।

তবে রাস্তায় চলার মজা হলো, খানিক জীবনের মতো, যখন একেবারেই হাল ছেড়ে দেওয়া গেলো, আর কিছুই পাবার নেই, আশা করার নেই তখন বেশ চমক মেলে। এই যেমন দেখছি রাস্তাটা বদলে আস্ত পিচের রাস্তা হয়ে গেলো, ওই দেখ না দেখ কেমন দুধারে মস্ত মস্ত গাছের ছায়া দিয়ে দিয়ে জুড়ে রেখেছে। জুড়ে থাকাই দরকার বড়, চোখ তুলে তাকাও একবার। ছায়া ছায়া রাস্তা শেষ কিন্তু রাস্তা এখনো গোটাই, ওই দেখো কেমন মাঠ পুকুর এক হয়ে গেছে সব, সারি সারি পাট শুকুচ্ছে রাস্তার দুপাশে, প্যাঁকাটি শুকোতে দিয়েছে।

রাস্তার দুধারে কত নতুন নতুন বাজার, জমকালো সব নামের জায়গা। মিষ্টির দোকান গুলো এসব গাঁ গঞ্জ জায়গায় যেমন হয় তেমনই, সার সার রসগোল্লা আর পান্তুয়া আর দানাদার। ভোঁ ভোঁ মৌমাছি। মিষ্টি গুলোর চেহারা এক্কেবারে আশপাশের সাথে মানানসই, তেমন ভালো দেখতে হয়তো না, খেতেও গরীব মতোই । ইছামতীর কাছে পৌঁছতে চাই এবার। বেলা আড়াইটা বাজে, সেই কখন বেরিয়েছি!

আগেরবারের মতোই এবারেও দেখি সেই একগাদা লোক, বলে মিনি সুন্দরবন গোলপাতা জঙ্গল, ভূমিকন্যার শ্যুটিং, হ্যানাত্যানা যেতে। দুশো আড়াইশো ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কোত্থাও যাবো না। কিংবা যেতেও পারি, এতো ঠিক করে তো আসিনি। আপাতত একটু চরে বেড়াই নিজের মতো। নদীর ধার দিয়ে খাবার জায়গা, ফেরিঘাট পার হবার পর খানিক হাঁটলে একটা মাচা বাঁধা দেখলাম। নিকুচি করেছে কোথাও যাওয়া, মাচায় লম্বা হয়ে নদীর হাওয়া খাওয়ার থেকে আর কিছু আমি চাইনা মোটেও। ওই দূরে ওপারের গাছগুলো বাংলাদেশের। আচ্ছা বাংলাদেশের গাছেদের সাথে ভারতের গাছেদের কথা হয়? ওদের তো টেলিপ্যাথিতে কথা, শিকড় দিয়ে দিয়ে, পাখি দিয়ে দিয়ে, কি বলে? "কিরে ব্যাটা আজ পাসপোর্ট ছাড়া কথা বলিস? হাহাহা, মানুষ গুলো পারেও বল? হ্যাঁ, এদ্দিন ধরে আমাদের দেখে তাও কিছু শেখে না রে উজবুক গুলো? এতো এতো ছানা পোনা তো মাছেদেরও হয়না, সে বুদ্ধি নেই, তারা কাঁটাতার দিয়ে সমাধান খুঁজবেনা তো কি?"

নদীর ধারে মানুষ আসে বোঝাই যায়, একগাদা নোংরা প্লাস্টিক, থার্মোকল ফেলা! সাড়ে চারটে বাজে, দেখি কিছু খাওয়া যাক, নাকি? নদীর ধারে একটা হোটেলে দেখি লেখা, ছাদে বসে খাবারের সুব্যবস্থা আছে। কিন্তু তাদের আবার খাবার নেই। বলল আচ্ছা ওই পাশের দোকান থেকে কিনে উপরে গিয়ে খাও না হয়। বেশ বেশ। আমার তো শীত গ্রীষ্ম বর্ষা ডিম পাঁউরুটি ভরসা। ডিম পাঁউরুটি নিয়ে ছাদে গিয়ে দেখি মোটাসোটা এক হুলো মনে আনন্দে মাছের কাঁটাকুটো খাচ্ছে। ওদিকে নদীর বুকে মেঘ করেছে কালো হয়ে, ওইই দূরে বাংলাদেশে ভেড়ী দেখা যাচ্ছে। নদীতে ইতস্ততঃ মাছ ধরার নৌকা। ঝিরঝিরে হাওয়া দিচ্ছে। সমস্তটা যেন একটা হাতে আঁকা ছবি। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় কাঁপতে থাকা জলে ভাসা নৌকা, কালো মেঘ, হাওয়ার টানে ভেসে আসা কোনো চিৎকার সবটা যেন এই পুরোটা কমপ্লিট করছে, একটুও বেচাল নেই, আবার কোনো একটা না থাকলেও কিচ্ছু অসম্পূর্ণ হবে না! এই আমি আছি এখানে রেলিঙে হেলান দিয়ে, এটাও যেন এই ছবিটার অংশ আবার না থাকলেও ক্ষতি নেই। বোঝাতে পারলাম মনে হয়। এ আমার হিজিবিজি ভাবনা।

অনেক্ষণ পর নীচে নেমে গাড়িতে উঠেছি, তিনি এলেন, টপটপ করে করে বড় বড় ফোঁটায়। একটু পরেই অঝোরে। ফেরার রাস্তায় দেখি মালঞ্চ হয়ে কোলকাতা যাবার দিক নির্দেশ। বেশ তো যাওয়া যাক না। নতুন রাস্তা দেখতেই তো বেরোনো। এই রাস্তাটা সত্যিই ভালো, খুব বৃষ্টি তাই কাচ নামানো যাচ্ছেনা, কিন্তু ঝাপ্সা কাচে দিব্যি দেখাশোনা যায়। ওই যে দুধারে আদিগন্ত ভেড়ী। আরে একটা ভেড়ীর মাঝখানে একটা একলা গাছ কেমন দাঁড়িয়ে দেখ, আরেকটু এগোতে দেখি একটা আধভাঙা নৌকা শুয়ে। এই রাস্তাটাও বেশ ভালো, গাছগাছালিও বিস্তর। একটা মোড়ে দেখি খুব করে চপ, বেগুনি ফুলুরি, পিঁয়াজি ভাজছে। ঝমঝম করে বৃষ্টিতে চারধার শুনশান প্রায়। মাথায় ছিট থাকলে যা হয়। গাড়িটা সাইড করে, ওই ঝমঝমে বৃষ্টিতে হেঁটে হেঁটে চুপ্পুস ভিজে মুড়ি কিনতে গেছি। চুল বেয়ে জল নামছে, এহেহে চশমাটা গাড়িতে রেখে আসা উচিত ছিলো। 
- কাকা দু টাকার মুড়ি দুটো পিঁয়াজি, দুটো আলুরচপ দাও দেখি, আর দুটাকার ছোলা সেদ্ধ হ্যাঁ? 
কাকা গজগজ করে, 'কি সব ছেলেপুলে আজকালকার, এরকম ভিজে কেউ আসে, তাও খাওয়া দেখো! আমাদের ছেলেরা এর তিনগুন খাবে বুঝলি, সব খালি কল্লামি করা, বৃষ্টিতে ভেজার নকশা খালি।'

কিই বা বলি সত্যিই তো এ আমাদের শখের খাওয়া, আমাদের গ্রামের বাড়িতে জমি চাষ করতে আসতো যারা তারা মুড়ি খেতো এক একজন একটা ইয়াব্বড় গামলা ভর্তি করে, থাবা দিয়ে দিয়ে খেতো। চা এর দোকানে কত সময় দেখেছি, এক কাঁসি মুড়ি নিয়ে এক হাতা ঘুগ্নি আর জল দিয়ে মেখে খেতে। যাকগে শখ আহ্লাদও থাকার দরকার বটে, না হলে জীবন বড় গোদা হয়ে যায়।সে কারোর জমিতে চাষ করেও হতে পারে কারোর শেয়ার মার্কেট কিংবা প্রমোশনের গোলোকধাঁধাতেও হতে পারে। শখ জরুরি হ্যায়।

ভেজা গেঞ্জি পরে এসিতে বসলে বাড়ি পৌঁছবার আগেই মরে যাবো, তাই খালি গায়ে বসে স্টিয়ারিং ধরেছি, ব্যাস আমি এখন আমার সেই স্বপ্নের ট্রাক ড্রাইভার। সুতরাং সমস্ত জল জমার উপর দিয়ে দিয়ে ইচ্ছে করে অ্যাক্সিলারেট করে ঝরনা বানাচ্ছি, দুধারের বাইক, গাড়ি সব ভিজিয়ে ভিজিয়ে। হ্যাঁ এবার বলতেই পারো, 'ও আবার কি! এ তো অসভ্যতা। অমন কেউ করে! তোমায় করলে কেমন লাগতো?' ইয়ে খুবই খারাপ লাগতো বটে। খিস্তিও করতাম, কিন্তু ইয়ে আশেপাশে লোককে ভেজাইনি সত্যি বলছি। মাক্কালি। আহ অত কূটতর্ক করার কি নাস্তিক তো কি? তুমি তো মানো তবে?

মালঞ্চ বলে জায়গাটার নাম যেমন সুন্দর তেমন ওর একটা নদী আছে। কি নাম নদীর কে জানে! বাসন্তী হাইওয়েতে উঠেছি যখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। বৃষ্টি থেমে গেছে। কোলাব্যাঙের কটরকটর, ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। অদ্ভুত লাগছে। আজ রবিবার বলেই না বৃষ্টির দিন বলেই কে জানে গাড়িও খুব কম। এক জায়গায় পাশের দিকে খানিক জায়গা আছে দেখে দাঁড় করিয়ে আলো টালো সব নিভিয়ে দিয়েছি। বিপজ্জনক কাজ অবশ্যই। কিন্তু ওই পোকা নড়া কেস!

এমন অন্ধকার বহুদিন ফিল করিনি, সে অন্ধকার যেন ধাক্কা মারা যায় এমন জমাট। ব্যাঙের ডাক, ঝিঁঝিঁর আওয়াজ যেন আরো তীব্র। সে অন্ধকার যেন কথা বলে উঠবে এক্ষুনি। আমি শুনতে পাচ্ছিনা খালি, শুনতে আমি কিছুই পাইনা, গাছ, ব্যাঙ, ঝিঁঝিঁ, নদী, ভেড়ি আকাশ, এই অন্ধকার, এই আলো, এমনকি আমার গাড়িটাও কত কি বলে নিজেদের মধ্যে। আমি কিচ্ছু শুনতে পাইনা, বুঝতে পাইনা, খালি দেখে যাই, ছুঁতে চেষ্টা করি নিজের মতো করে.....

যদ্দিন না এ ভাষা বুঝি আমার নিস্তার নাই...বারবার বেরোতে হবে।


Saturday, July 28, 2018

বিরিয়ানির ডিম ও প্রেম

- ওটা কী এমন পাঠালি যে মেসেজ ডিলিট করতে হলো?
- আহা, ওটা ভুল করে ব্ল্যাংক রেকর্ড হয়ে গেছিলো তাই।
- বাজে কথা বোলিসনা। কিছুই না যদি ডিলিট করলি কেন?
- কি মুশকিল! খামোখা ফোনে জায়গা খাবে তাই।
- কত জায়গা খেত ব্ল্যাংক রেকর্ড হলে? 
- ধোর বাবা। কথা না বল্লেও সাইজ তো থাকে নাকি?
- তোর ফোনে এতো জায়গার অভাবই বা কেন? 
- পানু রাখি? খুশ?
- বিয়ে করে নে। রিসোর্স ইউটিলাইজেশন কর বরং।
- বেশ তো করা যাক। করবি নাকি বিয়ে?
- অ্যা!! এইটা তোর প্রপোজ ছিলো?
- ইয়ে হ্যাঁ মানে সেই কলেজে পড়ার সময় থেকেই তোকে পছন্দ আসলে বলতে পারছিলাম না। 
- মানেটা কি হ্যাঁ!! আমার জন্য ছেলে দেখা হচ্ছে, আমি তাদের, তারা আমায়, অপছন্দ করছে, এদ্দিন তো বিয়েও হয়ে যেতে পারতো নাকি?
- তা সারাক্ষন অমন ভয় দেখালে আর ভরসা পাই কি করে। তাছাড় তোর মাও বেশ ইয়ে যাকে বলে ওই আর কি, থাক হতে পারে শাশুড়ি কিনা কিছু বলছি না।
- জুতো খুলে পিটবো শালা। তা এখন হঠাৎ সাহস গজালো কি করে শুনি?
- লাস্ট বারের ছেলেটা তোকে বেশ মুগ্ধ নয়নে দেখছিলো, তোর ছড়া পাঠটা গান বলে ভুল করলো, তা রিস্ক নিয়ে নিলাম আর কি 
- ওরে অলম্বুষ এর পরেও আশা করছিস তোকে আমি হ্যাঁ বলব? আমার গানটা ছড়া পাঠ? 
- তা না করতে পারিস। তবে আমার লজ্জা ভয় দূর হয়ে গেছে কিনা, যে ছেলেই তোকে পছন্দ করবে তার কাছেই ভাঙচি মেসেজ যাবে, এই মেয়েটি খুবই ভালো, খালি আবেগঘন মুহূর্তে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা।
- হতভাগা! মিথ্যে কথা বলে ভাঙচি দিবি? 
- ওরে মিথ্যে কেন হবে বল। তোর ওজন সত্তর, তাও বিরিয়ানি পেলে দেড় প্লেট মেরে দিস, সুগার আছে তাও সরভাজা, জিলিপি পেলে হিতাহিত ভুলে যাস। এগুলো নাকি তোর আবগে, তাহলে আমি ভুলটা কি বললাম?
- ওজন সত্তর না আশী বোঝাবো রে বিটলে, বিয়েটা হতে দে।
- ইয়ে এডাল্ট কথাটার মানে তো তুই হ্যাঁ বলছিস নাকি রে?
- হ্যাঁ রে কুট্টিমদারু এডাল্ট গল্প না হরর গল্প বোঝাবো, বিয়েটা করছি সে কারনেই।
- এ কারনেই করনা, করছিস তো ব্যাস। ইয়ে শোন তোর বাবাকে গিয়ে না হয় বলব আমি, কিন্তু ওই ভদ্রমহিলাকে তুইই বলিস। হয়তো গেলাম বলতে, বিয়ে নিয়ে তুলনামূলক প্রবন্ধ লিখতে বসিয়ে দিলেন। 
- শোন, আমার মা তোকে আট বছর ধরে দেখছে, তুই কি জিনিস জানে। প্রবন্ধ দিলে হয়তো দুপুরে বিরিয়ানি খেতে চাইবি পারিশ্রমিক হিসেবে। বাজে না বকে, নিজের বাড়িতে আজ বল আর কাল আমার বাড়িতে আয়।ঝামেলা মিটিয়ে নেওয়া যাক, তোর বদামি ঘোচাচ্ছি দাঁড়া না।
- ইয়ে কালকের মেনুটা কি? মানে সেই বুঝে যেতাম আর কি। আসলে কাল ওই সুরভীদের বাড়িতে ইলিশ বিরিয়ানি হচ্ছে শুনলাম কিনা...
- আবার!! আবার তুই খচরামো শুরু করেছিস? 
- আহা মানে জেনে নিলে ভালো না? বিদেশী দুর্গে হানা দেওয়ার আগে সব জেনেশুনে এগোনোই উচিত না কি?
- উফফ। কাল মাটন বিরিয়ানিই বানাবো, খুশ? এবার এসে বলে যা, আমারই সব জোটে!
- হ্যাঁ হ্যাঁ, আর শোন কালকের স্পেশাল ত্যাগ, তোকে আমার থেকে বিরিয়ানির ডিমটা দিয়ে দেবো।
- হুঁ এইবার একটা প্রপার কারন পাওয়া গেলো, বাবাকে বলার, তাহলে ওই কথাই রইলো হ্যাঁ, বিয়ের মন্ত্র এরকম হবে কেমিন, 
'যদিদং বিরিয়ানির ডিম মম....'

Sunday, July 22, 2018

ভুটে আর ছোটকা

চল ভুটে আজ তোকে ডুব সাঁতার শেখাবো।
- সত্যি বলছ ছোটকা? 
- হ্যাঁ রে। চল না। যা ছোটবৌদির থেকে গামছা চেয়ে নিয়ে আয়। 
- কিন্তু ছোটকা আমার যে দম থাকে না, সবাই যে বলে আমি নাকি ল্যালা। ফুটবলে, ক্রিকেটে কোথাও আমায় নেয়না।
- নেয়না তো নেয়না। সাঁতার কাটা শেখাবো তোকে আজ, তারপর নিয়ে যাবো আমতলা হয়ে দক্ষিনবাড়ির মাঠে। গাছ চেনাবো, গাছেদের সাথে কথা বলা শিখিয়ে দেবো। তখন কে পরোয়া করে কে দলে নিলো না নিলো। 
- আমার যে খেলতে ইচ্ছে করে ছোটকা। কাদা মেখে, বৃষ্টিতে ভিজে খেলে পুকুরে সবার সাথে ঝাঁপাতে ইচ্ছে করে যে। 
- জানিস ভুটে তোর বয়সে, আমি ভারী দুবলা ছিলাম, তোর মতোই বা তোর চেয়েও বেশী। আসলে দুর্বল শুধু শরীরে না মনেও ছিলাম। একদিন বসে আছি জানারডাঙা পুকুরের ঘাটে। শুনশান দুপুর, কেউ কোথাও নেই। আমি খুব মন খারাপ করে বসেছিলাম, আমার পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হয়না, খেলতে পারিনা, ভয় পাই, কুইজ এর উত্তর মুখস্থ থাকে না, কিছুই পারিনা তাই বাড়িতে বাইরে কেউ কোথাও আমায় পোঁছে না। 
একটা কাগজের নৌকা বানিয়ে আলতো করে জলে ছেড়েছি। কাগজ দিয়ে বাকিরা কত কি পারে, আমি খালি নৌকা আর এরোপ্লেন বানাতে পারি।নৌকাটা ছেড়ে ফিস্ফিস করে নিজের মনেই বলেছি, "এই আমার পাল তোলা জাহাজ, রাজকন্যা ঘুমিয়ে আছে অনেক অনেক নীচে, নৌকাটা গিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দেবে"।

একটা পেন্সিল আর একটা পেন রেখেছিলাম, আমার সোনার কাঠি আর রূপোর কাঠি। তারপর পুকুরপাড়ে বসেই জানিস পৌঁছে গেলাম সাত সমুদ্দুর পাড়,ডাইনী বুড়ির সাথে লড়াই হলো। যত যা রূপকথা পড়েছিলাম, সব কটা তো বীর রাজপুত্র, আমি তো বীর ছিলাম না তাও আমার রূপকথায় আমি আমাকে জিতিয়ে দিলাম, একটা ভীতু দুর্বল ছেলেই কেমন করে যেন সব বাধা কাটিয়ে জিতে গেলো। সেদিন বুঝলি ভুটে, সেদিনই আমি জেনে গেছিলাম, আমার জন্য অন্য পৃথিবী আছে, সেদিন থেকে দুপুরে চিলছাত, ভাঙা তোরঙ্গ, নির্জন পুকুরপাড়ে আমি নিজের সাথে দেখা করতাম।

আমাদের সবার আলাদা আলাদা গল্প আছে জায়গা আছে, এ বিরাট পৃথিবীটা এরকম ল্যালা ছেলেদেরও, খালি তোকে খুঁজে নিতে হবে। চল ওঠ। সাঁতার শেখাবো, আমি তো চলে গেলাম তাই দেখা হলো না, দেখিস তো পুকুরের নীচে কোনো জাদুকরী তারের বাজনা পাস কিনা, সেই বাজনাটা শুনলেই সবার ঘুম ভেঙে যাবে।

- অমন বাজনা আছে ছোটকা? পুকুরের নীচে?
- কোথায় আছে কে জানে! খুঁজতে খুঁজতে হয়তো হীরের পাহাড় পেয়ে গেলি! 
- আমি গামছাটা নিয়ে আসি হ্যাঁ? তোমায় একটা জিনিস দেখাবো, আমি গামছা দিয়ে ঘুষোমাছ ধরতে পারি।
- আরিব্বাস! তাহলে! আমি ওসব পারিনা আবার। খামোখা মন খারাপ করছিলি দেখ। চল আজ পুকুরে রোদ ধরে আসি। 
- সে আবার কি ছোটকা?
- দেখিসনি একেকদিন রামধনু কেমন পুকুরের মাথাতেই ওঠে? জানিস তো রামধনুতে চেপে মেঘে চড়া যায়? আমি বহুবার চেষ্টা করেছি ধরতে বুঝলি, খালি পিছলে পালায়৷ চল দেখি দুজন মিলে পারি কিনা। না পেলে ডুব সাঁতার প্র‍্যাক্টিস হবে আর পেলে রাজা হয়ে যাবো! 
- পেয়ে গেলে বাড়ি ফিরবো না ছোটকা? 
- আরে দূর পাগলা, বাড়ি তো ফিরতেই হবে রে, রামধনুটার সিঁড়ি বেয়ে উঠে গল্প কুড়িয়ে নেমে আসতে হয় তো। না হলেই চিত্তির। তাছাড়া দুপুরে কচি পাঁঠার ঝোল , তাকেও তো উপেক্ষা করা যায়না। চল চল, না গেলে তো আর ফেরা যাবেনা।

Wednesday, July 18, 2018

দিনের শেষে

ওইইই গুড্ডু, গুড্ডুউউউ জামাটা ভিতরে তুলে "রাখ, দক্ষিণ দিকে খুব মেঘ করেছে।"
মেঘ সত্যিই করেছে বটে, দুপুর বেলায় সন্ধ্যে বেলা নেমে এসেছে। বুড়ো কত্তা নরেন গোয়ালাকে দি গাই দোয়াচ্ছে। "তাড়াতাড়ি টান রে শালা, বিষ্টি এলো বলে"।

এবারে জৈষ্ঠ্য মাস মল মাস পড়েছিলো, কালীপুজো পিছিয়ে পিছিয়ে আষাঢ়ের রথে। গাছপালা ঘেরা ঝিমোনো ঘাট-ভাঙা পুকুর পেরিয়ে বুড়ো বাড়িটায় এক পশলা উৎসবের রঙ। উৎসব মানে ছড়িয়ে পড়া আনাচকানাচ থেকে ছেলেপুলের দলের বাড়ি আসা, কোন কালে বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েগুলোর একে অপরের মুখ দেখা। অনেক আলোকবর্ষ পেরিয়ে খুড়তুতো ভাই বোন একসাথে ফের উপোস করা। ছোটকাকিমা চা করে কখনো উপোসী ছেলে মেয়েগুলোর জন্য সেজ জ্যেঠিমা হয়তো ডাব কেটে দেয় অসুস্থ শরীরে।

অচেনা তুতো ছেলে মেয়ে গুলো ঠাকুরতলায় ভীড় করে, কারিগর এক মনে তুলি বুলোয়, এক এক আঁচরে কেমন মাটির তাল থেকে প্রনম্য কেউ হয়ে যায়। 
- কোন ক্লাসে পড়িস তুই?
- ফাইভ। তুই?
- সিক্স।আমি তোর থেকে বড়।.....
আলাপ বাড়ে, খেলা বাড়ে। ওদিক মেঘ গুলো দিয়েও কোন কারিগর যেন মূর্তি গড়ে। ওই দেখ না দেখ মাথা চাড়া দেয় ড্রাগন, কারিগরের পছন্দ হয়না। এমন আদিগন্ত মাঠ, সবুজ সবুজ আবহ, ড্রাগন হয়ে যায় ক্ষুদে এক ছাগলছানা। তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাফাতে যেতেই বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। 
বর্ষায় পুকুরে মাছেদের ঘাই মারা ছাপিয়ে এক ঝাঁক কিশোরীর উচ্ছ্বাস, সাঁতার, চুলের পরিচর্চা অকারণ হাসি। 
" রিল্টু কবে এলি? একটা নারকেল নাড়ু খাবি? ওই তিস্তা তোর মামাকে একটা নাড়ু দে দেখি"।
"ও ছোট, মাছগুলো কোথায় রাখবো?"
"মৌ তোর বাবা কই রে?"
"ও সেজমা ছাদে যে জামাকাপড় মেলা আছে তোমাদের, বৃষ্টি আসছে।"
ছিটকে ছিটকে যায় হাঁকডাক, ভালোবাসা আর বুড়ো ঝিমিয়ে পড়া বাড়িটার আড়মোড়া ভাঙে একটু একটু করে। সেইইই কবেকার বর্ষাকাল মনে পড়ে তার, যখন গমগম করতো এ বাড়ি। নীচের কোনো ঘরে যখন বউদের ব্যস্ততা হতো, উপরের কোনো ঘরে ফুলদিদি, খুকুদিদি, মেজদাদা, ছোড়দাদা,বড়দাদা এসব ডাক শোনা যেত।

গাছ ভরা তাল ধুপ ধুপ করে পড়ে এ উৎসবে সামিল হতে যায় যেন, কিন্তু কেউ যায়না ছুটে তাল কুড়োবার জন্য। গাছটা ঘাবড়ে যায়, ইতিউতি চায়, তাল কুড়োতে লোক নেই কেন? তার কি তবে ভুল হচ্ছে? বাড়িটায় তো লোকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। 
- ও বড়দা, ও বড়দা, তোমার তো খুব ব্যস্ততার দিন গো, কই এদিকে কেউ আসছে না কেন?
- আহা সব পুজোয় এসেছে রে। তুই কি ভাবলি ফের সব থাকতে এসেছে!
- আসেনি? ও।
চুপ করে যায় সে, হাওয়ায় হাওয়ায় শ্বাস বইয়ে দেয়, কেউ থাকবে না, ফল লাগবে না কারো....

তবুও সে তারমতো আরো সব গাছগুলো অপেক্ষায় থাকবে, ফল ফলিয়েই যাবে যদ্দিন না বুড়ো হয়....কেউ যদি আসে মন খারাপ করে, ফিরিয়ে দেবে নাকি! গাছেদের অমন স্বভাব-ধর্ম না। তাছাড়া ওরা জানে, ফিরতে একদিন হবেই....