Wednesday, October 9, 2019

পুজোর চালচিত্র

পুজো এলেই আমার বেজায় ভালো লাগে। হ্যাঁ হ্যাঁ ভীড় হ্যানাত্যানা কিচ্ছু আমায় কাত মাত করতে পারে না। সাধকদের সব রকম অভ্যেস আছে।ভৈরবের ভৈরবী থাকে, সাধকদের সাধিকা, অবধূতের মাতাজি....নইলে আবার সিদ্ধিলাভ মুশকিল কিনা। তাই ভীড়ে ভালো করে দৃষ্টিসঞ্চালন করে দেখছিলাম উপযুক্ত কাউকে কিনা। দূর দূর তক কুছু নাই মশাই, কোলকাতা যেন ভেজ থালির মতই খাঁ খাঁ করছে! 

অগত্যা মন দিয়ে ঠাকুর দেখাই স্থির করতে গিয়ে দেখি অসম্ভব। মোবাইলে তাগ করে সহস্র ফটোগ্রাফার! একজনকে বললাম,  "আরে দাদা আপনার হাতে তো ছবি কথা বলে!! হেব্বি তুলেছেন, একবার ওই এঙ্গেল থেকে দেখুন তো। আলোটা দারুণ ক্যাপচার করেছেন।" ব্যাস নিমেষে ঠাকুরের সামনেটা হালকা হয়ে গেল, ফটোগ্রাফারের দল "ওই" দিকটা চলে গেল। 


যাহঃ শালা! কাত্তিক গনেশ এরা এমন ট্যাবলেট সাইজ কেন? আর এবারে কি সিংহ পাতা ফেলেছে? সব কটা মন্ডপেই ঘোড়া দিয়ে কাজ চালাচ্ছে? ঘোড়া আবার হিংস্র ঘোড়া, ঘ্যাঁক করে দাঁত বের করে অসুরের হাত খাচ্ছে। ঘাসের বদলে মাস? ভেগানগুলোর চোখে এ দৃশ্য পড়লে মরেই যেত। 


সারা শহর টহল দিয়ে মহারাজের পা যখন বিদ্রোহ করছে,  ভীড় পেরিয়ে নদীর ঘাটে বসতে এসেছি। চার দিকটা তূলনামূলক ভাবে শান্ত এখানে। লোকজন তেমন নেই, একটা একা বোকা লোক নদীর ধারে চুপটি করে বসে ওইপাড়ের আলো দেখছে, এপাড়ের ভীড় হুল্লোড় পার হয়ে। আর ওই কোনায় একজোড়া ছেলে মেয়ে হাতে হাত দিয়ে আলো মেখে দাঁড়িয়ে। খানিক বসে থেকে ফিরতি পথে দেখি, একটা খুব খেঁচুটে মুখের গোঁফালো লোক আইস্ক্রীম কিনে দিচ্ছে একটা নাকে সর্দি মাথায় উকুনে ভরা বাচ্ছাকে। ট্রাফিক ছাড়তেই বাঁধ ভাঙা ভীড়ে বয়স্ক বাবার হাত ধরে তার মেয়ে নিয়ে যাচ্ছে।


আমার বন্ধুরা ভারী বিরক্ত হয় এই মেট্রোর সাড়ে ন লাখ মানুষের ভীড়ে, রাস্তায় জ্যামে, এত মানুষের ঠাকুর দেখবার জন্য রাস্তায় নামায়...কিন্তু এই যে এত ভালো ভালো দৃশ্য এগুলো পুজো না এলে কেইই বা দিত! 


ভালো হোক,  আনন্দে কাটুক সবার পুজো।



*******★**************★*****************



"কিরে এখনো কতদূরে?"


ফোনের ওপারে বাবার উত্তেজিত গলা। রওনা দিতে দেরী হয়েছে বিস্তর। ইচ্ছে করেই খানিকটা। যা হয়, বাবার উত্তেজনা বোঝার ক্ষমতা ছেলের থাকেনা। উলটে বিরক্ত হয়ে বলি, "আসছি তো অমন করছ কেন?" 


এবারে  আমাদের পুজো কোনোমতে হচ্ছে।মানে ঢাক, কাঁসর সবই আছে কিন্তু সে ঢাকে যতটুকু কাঠি না পড়লেই নয় ততটুকুই পড়ছে। হবার কথাই ছিল না, ধনাদার বউ মারা গেল পুজোর মুখেই,ভুল চিকিৎসায়। যে ডাক্তার অপারেশন করেছিল সে ডাক্তার মন দিয়ে ব্লাড রিপোর্ট দেখেনি, আরো অনেক অপারেশনের তাড়া, লোভ।পিজিতে শেষ কদিন যিনি দেখেছিলেন তিনি খুবই চেষ্টা করেছিলেন যদিও। বাড়ি অব্দি পৌঁছতে অনেকবার থামতে হয়। লোকুদার দোকান, কুমোরপাড়ায় কে একজন যেন, আমি চিনিনা, আমায় চেনে এমন কত জনের সাথে, কুশল মঙ্গল সেরে পৌঁছতে হয়। বাড়ি পৌঁছলে অসময়েও মা জ্যেঠিমা মিলে গরম লুচি ভেজে দেয়। 


সকালে ঘুম ভাঙে দূরে রথতলায় ক্লাবের পুজোর মাইকের আওয়াজে। চন্ডীপাঠ হচ্ছে। আচ্ছা ওরাও তো মাইকটুকু বন্ধই রাখতে পারতো। নাহ তা মনে হয় হবার না! ক্লাবের পুজোয় তো কাল নাকি "ডান্স নাইট" ও হয়েছে। লোকে মদ খেয়ে তাতে পয়সাও দিয়েছে। আমি হয়ত এ যুগের সাথে ফিট করিনা, আমার মনে হয় একটা সামগ্রিক অবক্ষয় আমাদের সবাইকে গ্রাস করছে। একটা ভিডিও দেখেছিলাম, বাচ্ছা ছেলে একটা দাঁড়িয়ে দেখছে এরকমই এক "ডান্স নাইট",  অশ্লীল ভঙ্গীতে নাচছে একটা মেয়ে। এইই একশো বছর টিকে গেলে সংস্কৃতি বলে গৃহীত হবে হয়ত! সকালে চন্ডীপাঠ রাতে সর্বসমক্ষে শরীরী আবেদন পূর্ণ নাচ।


এবারে মাছ ধরা নেই, চা খেয়ে ঘুম ভাঙা চোখে হাঁটা দিয়েছি। বড় সবুজ চারদিক। কিছুদিন আগে বন্যা হয়েছিল। রাস্তার ধারে মাঝে মাঝে ভেঙে গেছে। কোনদিকে যাচ্ছি কে জানে! লক্ষ্মীর আঁচলের মত ধানের মাঠ, পটলের বরজ, অসময়ের শিম। পিতৃস্মৃতি, মাতৃস্মৃতি মন্দির বানানোর চল আছে খুব এখানে। মন্দির মানে সিমেন্টের চ্যাটালো উঁচু একটা বেদীর মত। তার একদিকে ভস্মাবশেষ রেখে উঁচু করা, মাথায় তুলসীগাছ পোঁতা থাকে। বৈশাখ মাসে জল দেবার রীতি আছে। ভালো নিয়মটা কিন্তু বেশ। একটা সিমেন্টে বাঁধানো বসার জায়গা রইল, বৈশাখ মাসে চারদিক যখন ফেটেফুটে যাবে, নিয়ম এর চক্করে হলেও তুলসী গাছ একটু জল পাবে। আসলে কিছু নিয়ম মন্দ থাকেনা, সময়ের সাথে সাথে শুধু রীতি গুলো মনে রেখে কজ টা ভুলেই চিত্তির হয়।  এই যে অশৌচ চলছে আমাদের,  নিরামিষ খেতে হয়, নতুন কিছু পরতে নেই ইত্যাদি এ তো স্রেফ শোকের আবহে  হুল্লোড় হয়না সেটাই বলা। কিন্তু যদি হুল্লোড় হয় আর এই নিয়মগুলো মানা হয় তাহলে আর মেনে কি লাভ! 



কোথায় যেন এসেগেছি, এ জায়গাটা বেশ তো। কেমন ছায়া ছায়া মাখা। রোদ থেকে গাছের ছায়ায় গেলে একটা ঠান্ডা ভাব বুকে আসে।  তেমন আরাম পাখার হাওয়া বা এসিতে হয়না। মানসিক ব্যপার কিনা জানিনা, তবে আমি তো তফাৎ টের পাই দিব্যি! একটা কাঠঠোকরা ঠক ঠক করে কাঠে ঠোঁট ঠুকছে। একটা ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছ তেঁতুল ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুকুর পাড়ে। এহে এটা তো কারোর বাড়ির পথ। এখান থেকে আর কোথাও পৌঁছনো যায়না।




"মা এসেছে?" রাস্তায় একজন জিজ্ঞেস করে আমায়। আমি জবাব দিই, সে কেমন আছে জিজ্ঞেস করি, সে নাকি মায়ের খুব বন্ধু, গুছুতদিদি বললেই হবে। আবার হাঁটা দিই, অন্য রাস্তা, চিনিনা এ পাড়াটাও। কিছুই চিনিনা আমি, কেমন অন্ধ কালা ভাবে জীবন কাটিয়ে দিলাম সব থাকতেও! আলপথ ধরে হাঁটছি, দুটো চারটে ফড়িং উড়ে বেড়াচ্ছে, আশ্বিনের রোদের তাত খুব, এখন মোটে সাড়ে নটা তাতেই তেজ দেখো। মাঠের মাঝে একটা কাদের বাড়ি, একটা বউ পিছন ফিরে বসে কী যেন করছে আর বরটা খালি গায়ে প্যান্ট পরে বসে আছে পাশে। একতলা পাকা বাড়ি, উঁচু জানলা, রঙ করা হয়নি এখনো, হবেও না মনে হয়। আলটা একটু চওড়া মত রাস্তায় পরিনত হয়, দুধারে পার্থেনিয়ামের ঝাড়, আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে পেরিয়ে যাই, এলার্জি আছে আমার। রাস্তাটা গোঁত খেয়ে একটা পুকুরের পাশ দিয়ে চলেছে, একটা মুদীর দোকানে আলগা ভীড়। তেমন কিছু বিরাট দোকান না, গ্রামের মধ্যে অল্প জিনিস নিয়ে বানানো দোকান, ধারেই চলে যা বেশীরভাগ সময়।  মাচা বেঁধে কতকগুলো জোয়ানলোক তাস খেলছে। খেলা খুব জমে উঠেছে মনে হয়, খুব উত্তেজিত সব, রঙের টেক্কা থাকতে বিবি দিল কেন বলে, রাস্তার ধারে পুকুরে দুজন বউ চান করছে আর দুটো ন্যাংটা ছেলে খেলছে। একটা লোক আর বউ মিলে জরির কাজ করছে, এখানে পুজো নেই। এ পাড়াটা গরীব না বড়লোক জানিনা, তবে সব কটাই পাকা বাড়ি কিন্তু সব কটাই খুব ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে। আলো ঢোকে না, মাঝের রাস্তাটাও একটা সরু গলির মত, দুটো মানুষ পাশাপাশি চলতে পারে। একদিকে কটা ছাগল বাঁধা পরপর। একটা আবার বোকাপাঁঠা, ওইপাশের দাওয়ায় একটা বাচ্ছা মেয়ে শিউলির মালা গাঁথছে, কিন্তু পাঁঠার গায়ের দুর্গন্ধই বেশী। টিউওয়েল থেকে জল পাম্প করছে একজন মাঝবয়সী বউ। সামনে আর যাওয়া যায় কিনা জিজ্ঞেস করতে, আমি কোথায় যাব খোঁজ নিয়ে বলল, 'এদিক দিয়ে তো বাবা যাওয়া যাবে না, কাদা আছে, ওই দিক দিয়েই যাও"। অ্যাই বলু একে রাস্তা দেখিয়ে দে না।

বলু নামের লোকটা একটা হাতজাল নিয়ে আগে আগে যাচ্ছে কোথায়, আমায় আয় বলে ডেকে নিল। ওবাবা সামনে যে বিস্তর কাদা! বলুর ভ্রুক্ষেপ নেই, "জুতো হাতে চলে আয়"।  নাহ আমি উল্টোবাগেই যাই।



এদিকটায় কখনো আসিনি, কেমন ঝোপঝাড় ভর্তি। তুলসীমঞ্চ, ঠাকুর বেদী, বড় বড় মাছের হাঁড়ি, এটা জেলেপাড়া মনে হয়। চারটে ছাতারে পাখি ছ্যা ছ্যা করতে করতে উড়ে গেল, একটা লোক জমিতে সার দিচ্ছে। দূর থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে, একটা এই মোটা জারুল গাছ দাঁড়িয়ে আছে হাত মেলে।কুকরু কুকরু করে একটা কি যেন পাখি ডাকছে। একটা গাছের নীচে অনেক্ষন বসে থেকে বুকের মধ্যে অনেকটা ঠান্ডা ছায়া ভরে নিলাম। গাছের সাথে কতদিন পর বসা হল! 





Sunday, October 6, 2019

পুজো শুরুর আগে

প্রত্যেকবার পুজো আসে আর আমার সেই ছেলেটার কথা মনে পড়ে যায়। ধুতি পরে হনহন করে চলেছে, একটু আগে ঝামেলা করে এসেছে ছেলের দলের সাথে, একটু পরে পদ্মদিদির কাছে ধরা পড়বে, পালিয়ে গিয়ে সারাদিন অভুক্ত থেকে হঠাৎ করে মিলবে পংক্তিভোজন কিংবা যাত্রাদেখা।

হুট করে কাকার হাতে ধরা পড়ে হতাশায় ডুবে গিয়ে সে যখন গরম কাঁচাগোল্লা চিবোয় মসমস শব্দে আমার মন খারাপ হতে থাকে। সেই ছেলেটার সাথেই আমার শিশির ধোয়া শরৎকালের ভোর দেখা হয় এই বৃষ্টিতে মাখামাখি একটাও গাছ, মাঠ,  ঘাস না থাকা শহরে।

সেদিন একটা কাজে ব্যারাকপুর যাচ্ছিলাম। ডানলপ পার হবার অনেক্ষন পর দুপাশের চেহারা  বদলে যায় অল্প অল্প করে। চোখ পড়ে যায় একটা ভাঙা বাড়ির বটগাছে। পাঁচিল ঘেরা অনেকটা জায়গা নিয়ে ছিল বাড়িটা। এখন আর কেউ থাকেনা,  আর কদিন পরেই তিনদিক খোলা ফ্ল্যাটের বিজ্ঞাপন উঠে যাবে। কারা থাকতো এ বাড়িতে? সেই সর্দার ছেলেটার মত পলানে ছেলে ছিল নাকি? বাড়িদের মন খারাপ হয়? এওরকম একটা বাড়ি দেখেছিলাম,  গড়িয়াহাটের কাছে। ঝকঝকে সব বাড়ির মাঝে,  বন্ধ হয়ে ছাদ ঝুলে যাওয়া একটা বাড়ি। এক পা এক পা করে ঢুকেছিলাম আমি, মাকড়সার জাল, পাতার স্তুপ পেরিয়ে। আবছা অন্ধকারে দেখা যায় দেওয়ালের একটা জায়গায় আলমারী জাতীয় কিছু ছিল বলে কেমিন ফ্যাকাসে, দু চারটে বাজে অদরকারী জিনিস....এ বাড়িতে দুর্গাঠাকুর আসবে না।

সেই সর্দারের গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই ছেলেটা তো ঘরে ফিরতেই চায়নি, তবু পুজোর সময় সেই ভুল করে ফিরে যাওয়া ছেলেটার গল্পই মনে পড়ে। আর এই বাড়িটা দেখেও মন কেমন করে, ভুল করে বা ঠিক করে ছেড়ে গেছে সবাই। প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে বেশ ভোম্বল সর্দার পুজোয় ধরা পড়ে যাবে না, আর এই ভাঙা বাড়ি গুলো ছেলে মেয়ে সব্বাই ফিরে আসবে, হই হই করে আড্ডা হবে, ছুটোছুটি করে খেলতে গিয়ে ছোটদের মধ্যে একজন ব্যথা পাবে,কান্নাকাটি হুলুস্থুল।
প্যারালাল ওয়ার্ল্ড পুজোয় অন্তত সবার পুজো ইচ্ছেপূরনে কাটুক।

Wednesday, September 18, 2019

বিশ্বকর্মা

বিশ্বকর্মা তো অত খাতির পাওয়া ঠাকুর না, নতুন জামা জুতো, সারারাত আলো কিচ্ছু না। রিকশাওয়ালাদের নতুন গেঞ্জি পরে তদারকি করা ঠাকুর, মেশিন আর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ঠাকুর।  রাস্তায় বেরোতেই দেখি সব গাড়ি, রিকশা, অটো ঝকঝক তকতক করছে৷ কেউ কলাগাছ বেঁধে কেউবা ফুলমালা,  কেউ চকমকে কাগজ দিয়ে সাজিয়েছে নিজেদের গাড়ি৷ আমাদের গ্রামের বাড়িতে একটা চালকল আছে, মানে বড়সরো না, গ্রামের লোকজনই খোরাকির ধান ভাঙাতে আসে। সেখানেও আজ পুজো হয়, আর কদিন বাদেই পুজো এলো বলে। আকাশে একটাও ঘুড়ি নেই দেখলাম, হয়ত উড়বে পরে কখনো। কিংবা উড়বেই না, নিউ জেনারেশন মেঘেরা ঘুড়ি পছন্দ করেনা হয়ত।

আমার দুঃখিনী গাড়িটা ধুলো ময়লা পরাই আছে। আমি ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাসী না,  তাই আমার অবিশ্বাসের মূল্য চুকিয়ে আমার গাড়ি ম্লান মুখে চারদিক দেখতে দেখতে যায়। আচ্ছা আচ্ছা মন খারাপ করিসনি, এই সপ্তাহেই ঝাঁ চকচকে করে তুলবো খুব করে। অফিসে বেসমেন্টে মেশিন আছে যেখানে ওখানে বিশ্বকর্মা পুজো হয় প্রতিবছরেই। আলপনা আঁকা, সাজানো পুজো পুজো গন্ধওয়ালা বেসমেনড়ে খিচুড়ি আর আলুরদম খাওয়াচ্ছে। আমার এই সব জায়গায় আসলেই খুব ইচ্ছে করে কোর সেক্টরে চাকরি করতে। প্ল্যান্টে কাজ করতাম বেশ, ফ্যাক্টরির মধ্যে সাইকেল চালিয়ে দুপুরে খেতে আসতাম। রাতে ঝুপ করে রাত নামতো, সকাল হত তাড়াতাড়ি। 

বিশ্বকর্মা মনে হয় সেই ছেলেটার মত, আনস্মার্ট, ইংরাজিতে অদক্ষ, কিন্তু কাজটা জানে খুব। ঝলমলে শহরে তেমন পাত্তা পায়নি, কাউকে জানাতেই পারেনি সে কতটা পারে,তারপর নিজেও ভুলে গেছে সে কতটা পারতো....

Friday, September 13, 2019

ফিরতি পথে

কাল সকাল নটায় আপিস গেছি আর ফিরেছি ভোর চারটেয়। ভোর রাতের কোলকাতা যে কীইই মায়াবী কি আর বলব। রাস্তাঘাট কোনো সময়েই একদম ফাঁকা হয়না, কিছু গাড়ি কিছু বাইক থাকেই ঠিক, কিন্তু জেগে থাকা লোক প্রায় নেই হয়ে যায়, কুকুরগুলো অবদি মরার মত ঘুমোয়।

  আমার কাজ মিটে গেল পৌনে তিনটের দিকে, এমন রাতজাগা রাত তো খুব বেশী আসে না। তাই বাকিরা বেরিয়ে গেল, আমি হাঁটা লাগালাম খানিক, রাতে প্রজেক্টের পহায় ম্যালা খাওয়া হয়ে গেছে।খেতে গিয়ে দেখি কিই ভীড় কিই ভীড়। বুধবারের রাতে এত লোক সেক্টর ফাইভের রেস্তোরাঁয় ভাবা যায় না। হরেক কিসিমের লোক,  দল বাঁধা ছেলে, হুইস্কি আর তন্দুরি নিয়ে, বিয়ারের বোতল সামনে দুই কপোত কপোতি। তো সেই সব খাওয়া হজমও হবে।ওইদিকে এক একটা পাতলা অন্ধকার, মেঘ দেখা যায় আকাশে, কলসেন্টারের সামনে খালি এক মেয়ে সিগারেট ফুঁকছে। এ পাড়ায় নেড়ির প্রকোপ নেই, দু তিনটে যা আছে তারা রাতের বেলা বাঘ হয়ে যায় না। হাঁটতে হাঁটতে গোদরেজ বিল্ডিং এর পাশ দিয়ে ভেড়ির দিকে আগিয়েছি। 

এদিকে আলো কম, ঘুটঘুটে না হলেও বেশ ভালোই অন্ধকার। ইচ্ছে করছিল খুব, পাশের আলের রাস্তা ধরে যাই। সাধক মানুষ হলেও অঘোরী তো না,  মানুষের ইয়েতে অন্ধকারে পা পড়লে আনন্দ হবে না ভেবে এ যাত্রা ক্ষান্ত দেওয়া গেল। 

ঘুম চটকে গেছে, আচ্ছা এমনিই কোলকাতা পাক খেলে কেমন হয়? বাহন যখন আছেই? শুনশান রাস্তায় জলের পাইপ সারানোর কাজ হচ্ছে, কোথাও কোথাও রাস্তা সারাবার কাজও। সিগন্যাল গুলোও রাতের বেলা বেশ এক্টিভ হয়ে গেছে, সেই বিচ্ছু বাচ্ছা গুলো হয়না? দিনে ঘুমায় রাতে এনার্জেটিক হয়ে যায়? অমনি। সারাদিন তিন মিনিট লাগে যে কাজ করতে এখন দেখি দশ সেকেন্ডে হচ্ছে। 

কোলকাতায় বড় আলো মশাই। এত আলোয় খালি দেখা যায়,  মশারী টাঙিয়ে ফুটপাথে আরামে ঘুমোচ্ছে কেউ, এই তিনটেতেই রাস্তায় রিকশা বিয়ে বেরিয়েছে কেউ কেউ৷ ভিক্টোরিয়ার পরীটাকে দেখে আসলেও হয়, একা একা কেমন দাঁড়িয়ে আছে? নাকি ঘুরছে? নাকি সুযোগ পেয়ে মাঝরাত্তিরে  উড়ে গেছে, বন্ধুরা তো জ্যোৎস্না ছাড়া আসেওনা, গল্প করার খেলা করার লোক নেই। জ্যোৎস্না ছাড়া পরীদের পৃথিবীতে আসা বারন, কিন্তু কোলকাতার কালো পরী একদিন বেভুলে চলে এসেছিল। ঠিক বেভুলে না,  ভালোবেসেই, কাকে সেইই জানে,  কেন ভালোবেসেছিল সেটা অবশ্য সেও জানে না সবাইয়েএ মতই। না তাদের মেলেনি অবশ্য, কিন্তু তার আর ফেরার রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেছিল। নিজেরও খানিক অভিমান ছিল, আর ছিল অনেকটা গোপন ভালোবাসা,  নিজেও জানত না সে কথা। ভালোবাসা অভিমান হয়ে জমাট বেঁধে নিজেকে ভিক্টোরিয়ার পাথরে আটকে দিল। যাব নাকি তাকেই দেখতে এই অন্ধকারে? কালো পরীর চোখ দিয়ে জল পড়ে হয়ত এমন রাতে....থাকগে যে জল মোছাতে পারিনা সে জলের সাক্ষী না থাকাই ভালো।

কাঁকুরগাছি, ধর্মতলা হয়ে গিরীশপার্ক দিয়ে ফিরে ফের রাজারহাট নিউটাউন এসেছি। এলোমেলো পাক খাচ্ছি খালি, আমার তো কোথাও যাবার নেই....

Sunday, September 8, 2019

ভুটের বন্ধু

একটা কেন্নো গুটিগুটি এগোচ্ছে, বারান্দা পেরিয়ে মেঝেতে ঢুকে পড়ল। আমি দেখছি আর একটু পরেই এটা ঘরে ঢুকে পড়বে, আর আমি মাকে বলব। তার আগে না, বললেই হুড়োহুড়ি পড়ে যাবে। বৃষ্টির জন্যে ঘরের মধ্যে মেলে রাখা কাপড় জামা, সবাই হাঁকপাঁক করবে,  আমি সেই ফাঁকে ঝাঁটার কাঠি দিয়ে কেন্নোটার গায়ে ধরব,গোল্লা পাকিয়ে যাবে, আমি ছুঁড়ে ফেলে দিতে যাব। সেই সুযোগে, নৌকাটাও ভাসিয়ে দিয়ে আসবো। এরা খালি পড়া পড়া করে। আমার পড়তে ভালো লাগে না। আমি কিছু বুঝতে পারিনা ফিজিক্স এর অংক, আমি গ্রামার এ ঠেক খাই। আমি পড়াশোনায় খারাপ, তাই সারাদিন বকুনি খাই। নৌকাটা ভাসাতে পারলেই হবে, ওই নৌকা ঠেক খাবে এদিক সেদিক, তারপর ভাসতে ভাসতে ঠিক পৌঁছে যাবে কোনো এক অজানা দেশে। আমি জানি এসব হয়না কিছু, আমি তো আর ছোট নেই যে জানব না এসব! কিন্তু আমার তাও ভাবতে ভালো লাগে,  একটা প্যারালাল ওয়ার্ল্ড কি আর নেই, যেখানে ফিজিক্স নেই, আইয়াইটি নেই, বাবার কলিগের ছেলের ভালো মার্কস নেই।

যা ভেবেছিলাম,  ধুন্ধুমার লেগেছে। আমি এক পা দু পা করে বাইরে। আমাদের আবাসনটায় আমাদের বাড়িটা সবার শেষে, আমাদের বাড়ির পাশেই ভ্যাট, তারপর কুকুর গুলো থাকে, গেট পেরোলে ফুটপাথের লোকগুলো। আজ বৃষ্টিতে আর বেরোয়নি কুকুরগুলো, কেয়ারটেকারের ঘরের পাসে গুটিয়ে শুয়ে আছে, আমি পেরিয়ে যাই। এখানে কোথাও পুকুর নেই, আমার মামারবাড়ির ওখানে আছে। কত পুকুর, এরকম বৃষ্টির দিনে মামার বাড়ির ছাদ থেকে জল সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে লাল রোয়াকে এসে নকশা করে যায়।বৃষ্টি সমানে হয়েই চলেছে, ভিজে যাচ্ছি আমি, জানি বাড়ি ফিরলেই বকুনি খাব, আমার জন্যে কত কষ্ট করে সব তারপরেও আমার মন নেই পড়ায় এসব বলে। বড় হলে আমি ঠিক করেছি এদের থেকে পালিয়ে চলে যাব, আমি ও পাড়ার তাপস,গুড্ডু ওদের মত সোনা রূপোর দোকানে কাজ করব। বড়লোক হওয়া যাবে না  হয়ত কিন্তু বড়লোক হলেই বা কি এমন চতুর্বর্গ হবে! ওই তো বাবার বন্ধুরা, সব খালি বলে সুগার কোলেস্টেরল এই খাব না সে খাব না। ফুহঃ।  সেদিন বিয়েবাড়িতে আমি দশটা মিষ্টি খাচ্ছি দেখে বিশুকাকুর ন্যাকা মেয়েটা তো প্রায় মুচ্ছোই যায় আর কি! তারচেয়ে পয়সা জমিয়ে আমি নতুন নতুন দেশে যাব, সেখানে কিছু মিছু করে পয়সা জমিয়ে আবার নতুন দেশে। খালি বড় হওয়ার যা অপেক্ষা৷ 

সেদিন কি মারটাই না মারলো,  কী না পড়ার বই এর বদলে মোবাইলে গোপাল ভাঁড় দেখছিলাম। কী এমন ক্ষতি হয় তাতে? বাড়ি থেকে পালাবো ভেবেছি, বইবের ব্যাগে একটা জামা,  পাঁচশো টাকা আর দুটো বিস্কুটের প্যাকেট। ব্যাস আর কি চাই! আজ সারাদিন ধরে মায়ের সব কাজ করে দিয়েছি, অনলাইনে মাসকাবারি অর্ডার দেওয়া, বাবার মোবাইলটা সারিয়ে দেওয়া, সব। চুপচাপ পড়তেও বসেছি।বিকেলেই বেরিয়ে যাব কিনা তাই ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। ফিরব যখন সবার জন্যে এত এত গিফট নিয়ে আসব। নতুন নতুন দেশ দেখতে হলে এখনই বেরিয়ে যাওয়া উচিত। 

সুতরাং, ভুটে বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে।কোলকাতার রাস্তায় বৃষ্টিতে মজার থেকে সাজাই বেশী, তবে তাও ভুটের বৃষ্টিতে ভিজতে দিব্যি লাগে। নোংরা জল ছিটিয়ে ছপছপ করতে করতে সে চলল। আরে এদিকের রাস্তাটা তো আমি অর্থাৎ শ্রীল শ্রীযুক্ত ভুটের আসাই হয়নি। অবশ্য স্কুল টিউশন আর বাড়ি ছাড়া কোথাইই বা যাই। না এখানে সত্যি কথাই লিখি, মাঝে মাঝে ইস্কুলের ক্লাস পালিয়ে সুইমিংপুলের পাড়ে গিয়েও বসি।  সুইমিংপুলের নামটা আর বললাম না, বাড়ি ফেরার পর আর যাওয়া যাবে না শেষে! 

নোংরা জল গায়ে লাগলে বাবা মা খুব চেঁচায়, এখন যা লাগছে দেখলে অজ্ঞানই হয়ে যেত হয়ত। আমি শুনেছি, বাবা অনেক বড় চাকরি করে, যদিও কক্ষনো বলেনা, কিন্তু আমি তো আর গাধা না রে বাবা, আমার জামা, জুতো, আমাদের ফ্ল্যাট দেখলেই আমি বুঝি। পড়াশোনা করলে আমিও নাকি এমন হতে পারব, কিন্তু বাবা তো আরামে থাকে না। রোজ রাতে অফিসের কল থাকে, ট্যুরে যায়,  সেখানে নাকি ঘুরতেও অয়ায়না,  খালি মিটিং করে। তাই জন্যেই তো আমি ঠিক করেছি, আমি গ্লোব ট্রটার হব। সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবো। এমনিতেও পড়াশোনা আমার মাথায় ঢোকেনা, এইই ভালো।

"কেবল পেটে বড় ভুখ না খেলে নাই কোনো সুখ...",  খিদে পেয়েছে।  তা সত্যি বলতে খিদে আমার বেশ ভালই পায়, যখন তখন পায়। একটা বিস্কুটের প্যাকেট তো কখন উড়ে গেছে। কিছু মিছু কাজ দেবে না কেউ? চলতে চলতে কত কিই না দেখা যায়। খিদে না পেলে আরো মন দিয়ে দেখতাম অবশ্য। দেশ ছাড়ার উপায়টা কঠিন। আমার ভূগোল বই খুবই খারাপ লাগে কিন্তু গুগল ম্যাপ বেশ লাগে। তাতে এটা ওটা সার্চ করে যা দেখলাম, ভুটান বা নেপাল যাওয়া যেতে পারে সহজে। ট্রেনে জেনারেলে উঠে পড়লেই হল। বাকিটা তো অ্যাডভেঞ্চারে।
খিদেয় পেট চুঁইচুঁই। হাঁটতে হাঁটতে কোথায় এসেগেছি বুঝতে পারছিনা। মোবাইল থাকলে লোকেশন ট্র‍্যাক করা যেত। অবশ্য লোকেশন ট্র‍্যাক করেই বা কি হবে।  আমি যে হাওড়া বা শিয়ালদার কোনো ট্রেনে চেপে বসিনি, আমি তো এমনিই ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছি এদিকে। বাবা আসলে ঠিকই বলে, আমার কোনো ফোকাস নেই। 

" অ্যাই ওঠো, এখানে ঘুমোচ্ছ কে তুমি?"
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কার যেন ডাকে ঘুম ভাঙলো! অ্যাঁ আশেপাশে তো কই কিছু নেই! এ জায়গাটাও একটু অন্যরকম লাগছে কেন? 
"কে তুমি? তোমার নাম কি? "
ভূত নাকি রে বাবা? চঙমঙ করে চারদিক চেয়ে দেখি একটা নেংটি ইঁদুর খালি দুপায়ে ভর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে।  এইই কথা বলছে নাকি? 
আমি ভারী অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি মানুষের মত কথা বলতে পারো?" 
ইঁদুরটা ভারী অবাক হয়ে বলল, " সে আবার কি! মানুষের মত হবে কেন! আমি আমার মতই কথা বলছি তো!" 
অবাক হয়ে খেয়াল করে দেখি, সত্যিই তাই! আমি ইঁদুরের কিচমিচ বুঝতে পারছি!! ধুস এরকম হয় নাকি! আমি নির্ঘাত স্বপ্ন দেখছি, এক্ষুনি বাবা কান ধরে পড়তে বসিয়ে দেবে। আবার পড়াশোনার কথা মনে পড়তেই মন খারাপ হয়ে গেল। এবার নাইন হয়ে গেল, এরপরেই নাকি ঠিক হয়ে যায় আমি বড় হয়ে বিদেশে এইইই বড় চাকরি করব না এখানে চা এর দোকান দেব! 
ওদিকে ইঁদুরটা দেখি কি সব কিচমিচ করছে, কান পাততে দেখি বলছে, "তোমার বুঝি খিদে পেয়েছে? মুখটা এমন শুকনো কেন?"

যেই না বলা খিদের কথা, অমনি পেটটা খিদেদে গুড়গুড় করে উঠলো।  আমি তাও খুব গম্ভীর মুখেই বললাম, "না খিদে পায়নি আমার। কিন্তু আমি কিছু বুঝতে পারছিনা, তোমার কথা আমি বুঝতে পারছিই বা কি করে?"
সত্যি বলতে আমার ভয় করছে, কিন্তু নাইনে পড়া ছেলের ভয় পাওয়াটা দেখানো যায়না। ইঁদুরটা মনে হয় বুঝে ফেলেছে আমার ভয় পাওয়াটা, এক্ষুনি খিল্লি করবে ঠিক। আশ্চর্যের ব্যপার ইঁদুরটা খিল্লি করলো না, খুব নরম গলায় বলল, "দেখো তুমি আশ্চর্য হয়েছ খুব আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু কেন হয়েছ আশ্চর্য আমি জানিনা, আমরা তো সবাই সবার কথা বুঝতে পারি, এটাই তো স্বাভাবিক ব্যপার। আর তোমার খিদে পেয়েছে এও আমি টের পাচ্ছি তো, কেমন ম্লান হয়ে গেছে তোমার মুখটা, সুখ দুঃখ সবই টের পাওয়া যায় তো।  তোমার বাড়ি কোথায়? চলো আগে কিছু খাওয়া যাক। "
আমি অবাক হয়েছি এতই,  আমার আর ভয় করছে না। আমি নিজেও বুঝতে পারছি কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে। যদি এটা স্বপ্নও হয়,  এটা ভয়ের স্বপ্ন না, তবে চলুক যেমন চলছে।

সুতরাং ইঁদুরের সাথে চলা শুরু হল আমার। গল্প করতে করতে বন্ধুত্বও হয়ে গেল। ওর নাম লটপট। লটপট নামটা এমন মজার নাম ভারী ভালো লেগে গেল। একটা সিং থাকলেই এর সাথে কেমন,  হাতে লাঠি,  লাঠির আগায় পুঁটলি নিয়ে চলা ইঁদুরের ছবি মনে আসে। ওকে বলতে ওও হেসে ফেলল। কথায় কথায় যা বুঝলাম কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে যা বোঝা যাচ্ছে না, তবে সম্ভবত এ জায়গাটা আমার চেনা পৃথিবী না। প্যারালাল ওয়ার্ল্ড মনে হয়। এখানে সবাই সবার কথা শোনে বুঝতে পারে। 

-হ্যাঁরে লটপট, খেতে কোথায় নিয়ে চলেছিস? আমার কাছে মোটে পাঁচশো টাকা আছে।

- অ্যাঁ টাকা? টাকা কি? ও  দিয়ে কী হবে?

- বলিস কি!  টাকা জানিস না? ওরে মানুষদের তো টাকা দিয়েই সব রে। টাকা না থাকলে কিচ্ছু হবে না। খাওয়া, পরা, থাকা, বেড়ানো কিচ্ছু না।

- সে কিরে! এরকম কখনো শুনিনি তো! আমাদের এখানেও তো মানুষ আছে। টাকা হয়না তো তাদের! আমাদের এখানে ভালো কাজ গোনা হয়। ধর,  তোর খিদে পেয়েছে, খাবার নেই।  এবার তোকে কেউ খাওয়ালো। সেটার পয়েন্ট হল, সেই পয়েন্ট দিয়ে তুই তোর পছন্দের কিছু করতে পারবি। আবার তোকে তো রোজ রোজ এমনি খাওয়ালে তোর লাভ হবে না কারন তোর আত্মিক উন্নতি হচ্ছেনা। হ্যাঁ তুই যদি বিজ্ঞানী,  বা শিল্পী হতিস যা গাছ লাগানো লোক তাহলে তোকে তোর খাবার চিন্তা করার দরকার হত না। গাছেরাই তোকে খাওয়াতো। তাহলে,  তোকে রোজ খাওয়ালে কিন্তু পয়েন্ট বাড়বে না, বরং তোকে যদি এমন কিছু কাজে নেওয়া গেল যাতে তোর নিজের  আত্মিক উন্নতি হবে বা বাকিদের তাহলে পয়েন্ট অনেক বেশী। তাছাড়াও আরো জটিল ব্যাপার আছে। 

- পয়েন্ট ট্র‍্যাক করে কে? নাহলে তো যে কেউ মিথ্যে বলতে পারে?

- তা পারে না। এখানে ট্র‍্যাক হয় অটোমেটিক্যালি। মানে তুই জন্মালি যখন, কোনো গাছের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। গাছেরা তো খুব প্রাচীন বিচক্ষণ,  তাদের একটা পদ্ধতি আছে তারা ওই ছোট বয়সেই সবার মধ্যে ভালোবাসা, আর মায়া তৈরী করে দেয় শিকড় দিয়ে। ব্যাস ও হলেই হল, বাকিটা এমনিই হয়ে যায়।

- মানে এই যে আমি কিচ্ছু পারিনা, ফিজিক্স, কেমিষ্ট্রি, ইতিহাস, ভূগোল আমাকেও এখানে কেউ দুচ্ছাই করবে না? আমি যদি গাছ লাগাই, গাছের রক্ষণাবেক্ষণ করি, হাওয়ায় গান ভাসাই আমার পয়েন্ট হবে, আমায় সবাই ভালোবাসবে আর ভালো বলবে? 

- আরি বাপ্রে গাছেদের স্থান সবার উপরে এখানে।  আর হাওয়ায় গান ভাসালে  তো হয়েই গেল। তুই তাহলে সবার ভালোবাসা পাবি। 

- আর যে এসব কিচ্ছু করেনা, অন্যের জিনিস কেড়ে নেয়,জুলুম করে সে? তাকে কি মেরে ফেলা হয়?

- এখানে অমন সহসা কেউ করে না বুঝলি। তাও কারোর যদি ভালোবাসার তার কেটে যায়,  অমন হয়ে যায়, তাকে আমরা জঙ্গলে একা একা ছেড়ে দিই।

- বাঘে খেয়ে নেয় বুঝি তাকে?

- না না, সে আবার কি!  বাঘ অমন মানুষ খায়না। বাঘেদের তো আলাদা খাবার আছে। জঙ্গলে থেকে থেকে ওর মধ্যে আবার ভালোবাসা ফিরে আসে। শিকড় লেগে যায় মনে।

অবাক হচ্ছিলাম, তাও বড় ভালো লাগছিল সব।  আহা কিই ভালো কিই ভালো। এখানেই থেকে গেলে হয়। লটপট আর ভুটে মিলে পৌঁছলাম এক জায়গায়। মিষ্টি এখানেও সব একইরকম পাওয়া যায়। আসলেই তো একই জায়গা খালি অন্য ডাইমেনশনে। দুজনে মিলে খুব খানিক কালাকাঁদ, সরপুরিয়া,  সরভাজা, কেশর রসমালাই,  রাবড়ি খেয়ে চললাম আবার। মনে ফূর্তি থাকলে আমি গান গাই মন্দ না, একটা নদীর ধারে, সবুজ মাঠের উপর আধশোয়া হয়ে গান গাইছি, লটপট বাজনা বাজাচ্ছে, ওই দেখো একটা হনুমান, ল্যাজ ঝুলিয়ে আরাম করে বসে শুনছে। আরো চারটে ছেলে মেয়েও জুটেছে দেখছি। গান টান গেয়ে শেষ হতে না হতেই এক পশলা বৃষ্টি এসে গেল। কাদায় মাটিতে মাখামাখি হয়ে খুব খেলাও হল। কাদা মাটি মেখে হুড়োহুড়ি করতে এত ভালো লাগে? জানাই ছিল না তো! 

দিন কেটে যায়  খেলে,হুল্লোড়ে, আনন্দে। আমি চমৎকার রাঁধতে শিখেছি। বন্ধুদের খাওয়াই, গল্প করি। গান গাই। আমি নাকি খুব ভালো।  এমন করে কেউ কখনো বলেনি আগে। আহা আমাদের পৃথিবীটাও এমন হত যদি। পৃথিবী বলতেই মনে পড়ে গেল, মা এর কথা। অমনি আমার মন খারাপ করতে লাগলো খুব। বৃষ্টি ভালো লাগে না, গান ভালো লাগে না, নদীতে ঝাঁপাই জুড়তে ভালো লাগেনা। খালি কান্না পায়। 
আমার বন্ধুরা ডেকে ডেকে সাড়া পায়না। শেষে একদিন লটপট টেনে নিয়ে গেল বুড়ো বটের কাছে। বটদাদা আমায় আদর করে ডেকে নিল ঝুরির মাঝে।

- মাকে মনে পড়ছে? 

- হুঁ।

- এখানে আত আলো,  এত গান তাও ভালো লাগছে না?

- না আমি বাড়ি যাব।

- আচ্ছা বেশ। তুই এত ভালো তোর মন খারাপ হলে আমাদের সবার কষ্ট হয় তো। তোকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি। কখনো যদি খুব কষ্ট হয় অস্থির লাগে আমায় বলিস নিয়ে আসবো। 

- তোমায় বলব কি করে? ওখানে তো তোমাদের দেখাই যায়না! 

- দেখার দরকার নেই তো। আয়, তোকে শিখিয়ে দিচ্ছি। 

বটদাদা শিখিয়ে দিয়েছে আমায়। আসার আগে বন্ধুদের জন্যে কষ্ট হচ্ছিল খুবই, তবে আনন্দও হচ্ছিল, মাকে দেখবো বলে। বটদাদাই আমায় পৌঁছে দিল কেমন করে যেন।  যেইখানে বসেছিলাম সেই খানে।  কতদিন কেটে গেছে এর মাঝে কে জানে। আমি এ কদিনেই অনেক বড় হয়ে গেছি। আমি জানি আমি কী পারি। আমি আনন্দে থাকতে জানি এখন থেকে। গাছেদের সাথে কথা বলা শিখে গেছি,  দুঃখ হলেই বলে দিতে পারি তাদের। পালাবোনা আর। এরাই আসলে বাঁচতে জানেনা। আমি জানি, আমি বড় হলে নদীর পাড়ে একটা ঘর বানাবো, গাছে ঘেরা। আমার মত আরো অনেক হেরে যাওয়া দুঃখী অপদার্থ ভুটেকে শিখিয়ে দেব। ওই দুনিয়া থেকে লটপট বেড়াতে আসলে তাকে দেখাবো তার বন্ধু তাকে ভোলেনি, তার জন্যে জায়গা বানিয়ে দিয়েছে এখানে।

Sunday, August 4, 2019

লালচাঁদের বন্ধু

ফ্রেন্ডশিপ ডে তে একটা গল্প রইল বন্ধুদের জন্যে

********************


সে অনেকদিন আগের কথা না। এখনকারই কথা।  একটা বাতিল হওয়া মোবাইলের গল্প। বাতিল তো হয়ে গেছিল, কারন সে তেমন নতুন মডেলের না।  সে টুজি মোবাইল, নেটের স্পীড কম স্বাভাবিক তাকে দিয়ে আর হবে না। আমরা ভাবি বটে মোবাইলের আবার আলাদা করে প্রাণ কি। জড় পদার্থের প্রাণ নেই এতো ছোটবেলার স্কুল বইতেই থাকে! কিন্তু সে সবের বাইরে বেরোলেই দেখা যায় এই যে আমাদের চারপাশে বই, জিনস, গেঞ্জি, কফিমগ, মোবাইল এ সব কিছুর প্রাণ আছে। আমাদের র‍্যাডারে ধরা পড়ে না। সে এক অন্য দুনিয়া। আমি জানলাম কেমন করে? র‍্যাডারের কিছু গন্ডগোল হয়ে থাকবে, অন্য ফ্রিকোয়েন্সি সেট করে ফেলেছিল।

তো সেবার সেই বাতিল মোবাইল,  ধরা যাক তার নাম লালচাঁদ। লালচাঁদ  তো মনের দুঃখে ধূলো মেখে শুয়েছিল পুরোনো বাতিল জিনিস রাখার তাকে। সে আর কি করে,  সুস্থ সবল মোবাইল স্রেফ নতুন জিনিস পারেনা বলে তাকে কেউ আর পাত্তা দিচ্ছে না, নতুন মোবাইলদের থেকে শুনতে পারে সে কত কিছু। কত রকম খবর, কত আশ্চর্য দৃশ্য সবই দেখে, নিজেদের মধ্যে গোপনে আদান প্রদানও হয় নানান রকম জিনিসের। লালচাঁদ শুয়ে শুয়ে বিরক্ত হয়ে গেল। এরকম ভাবে হয়না। সে যখন কাজে যেত, সে দেখেছিল পূর্নিমার চাঁদে হিমালয়ের চূড়ো, সে দেখেছিল বর্ষায় উথালপাথাল  নদী, ঝরনা, জোয়ারের উচ্ছ্বাসে থাকা সমুদ্র, সে ভেবেছিল একদিন সামনাসামনি দেখবে এসব কিন্তু কোথা থেকে কি হয়ে গেল দেখো!  এত সব শখ অপূর্ণ রেখেই মরে যাবে নাকি একদিন ওই সাদা মোবাইল ক্যানুর মত? 

সুতরাং লালচাঁদ একদিন রাতে গুটগুট করে বারান্দায় এলো।  নিঝুম রাত। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে খানিক আগেই। রাস্তায় আলো গুলো গম্ভীর মুখে পাহারা দিচ্ছে। ওরা খুব একটা আলাপী না, কথাও বলেনা নিজেদের মধ্যে। দু চারটে গাছ মাথা ঝাঁকিয়ে নিচ্ছে মাঝে মাঝে,  জল ঝাড়াও হচ্ছে গানের তালও হচ্ছে। গাছেরা দিব্যি আছে বাপু, ভাবে লালচাঁদ, মারো কাটো পাত্তাও দেবেনা। নিজেদের মত করে বাঁচবে, জ্ঞান নেবে কিন্তু অযথা দিতে যাবেনা, আশ্রয় দেবে, আর বর্ষার রাতে সবাই ঘুমোলে জলসা বসিয়ে দেবে গানের, আড্ডার। লালচাঁদ ভাবে, সে একটা চেষ্টা করবেই করবে। হয়ত মরে যাবে, সে এখনও তো মরেই আছে প্রায়। 

"আরে আরে করো কি, ঝাঁপ দেবে নাকি!"

চমকে তাকায় লালচাঁদ, এত রাতে কে! ঝিম ধরা রাস্তা শুয়ে আছে খালি। ঘরের ভিতর মানুষগুলো ঘুমোচ্ছে।এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে ইলেকট্রিক তারে বসে ঝিমোনো একটা কাক।  ডানা ঝাপটে তাকেই বলছে। লালচাঁদ গম্ভীর মুখে বলে,  'দেখি কি করি। তুমি এসময় জেগে?' 

-আর বাপু বোলোনা। মানুষগুলোর জ্বালায় নিশ্চিন্দি ঘুম কি আর আছে হে। সারা রাত গাড়ি চলে, আর কুকুরগুলোর কাজ তো জানোই হাউমাউ করে চেঁচানো আর সারা পাড়া মাত করা। ঘুমের আর থাকে কি! 

- হুঁ সে সত্যি বটে। আমি যখন কাজ করতাম, মানুষগুলোর হয়ে, তখন তো নেটের এত বেশী রমরমা ছিল না, তাতেই মাঝে মাঝে রাতে কাজ করতে হত আমায়। আর এখন তো দেখি, যারা কাজ করে তাদের রাত দিন বলে কিছু নেই। চব্বিশঘন্টায় দশ এগারো ঘন্টা খালি বিশ্রাম। তা তারা সব ইয়ং জেনারেশন মোবাইল, স্মার্ট, ক্যারিয়ারিস্টিক, তারা ভাবছে তাদের ছাড়া মানুষ বুঝি অচল। তারা গেলে অন্য কিছু আসতে একদিন লাগবে মানুষের আর এই এক্সট্রা খেটে আসলে তাদেরই শক্তিক্ষয়, জীবনক্ষয় হচ্ছে সে আর বোঝে না। যাক,  বেশী বলব না এ নিয়ে ভাববে হিংসে করে বলছি। হাজার হোক আমি তো বেকার অচল। 

- আরে তুমি দেখি বেজায় মুষড়ে পড়েছ। একথা ঠিক তোমার কথাগুলো অসফলের অজুহাত ভাববে সবাই, তাই না বলে ভালো করেছ কিন্তু তাই বলেই তুমি বেকার অচল হবে কেন? দেখো দেখি কেমন চমৎকার গান ধরেছে ওই কোনার নিমগাছ, কেমন ঝিম ধরা রাত দেখো এসব মনের মধ্যে অনুভব করতে পারছ যখন অচল হবে কেন তুমি?

- আরে ভায়া ওইটেই তো কথা। আমি দুনিয়া দেখতে চাই। কাজের সময় কত দেখেছি ছবি, এবার নিজের চোখে সামনে থেকে দেখতে চাই। আমি আকাশের নীল ঘুড়ির সাথে উড়তে তো পারব না কিন্তু খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে সেই ঘুড়ির লড়াই দেখতে চাই, ঝরণার জলে চান করতে পারব না কিন্তু বর্ষায় কেমন ঝপাং করে পড়ে একরাশ জল, নদীতে তাই দেখতে চাই। সেটাই ভাবছিলাম তো এখানে দাঁড়িয়ে, যে যাব কিভাবে।

- ওহ এই কথা! শোনো ভায়া আমার নিজেরও আর ভালো লাগে না এখানে। এত নোংরা খুঁজে খাবার জোগাড় করতে করতে কেমন যেন ওইটাই আমার পরিচয় হয়ে গেছে, কিন্তু আমি তো পাখি বলো। আমি উড়াল দিতে চাই, ঘাসের ফাঁকে পোকা ধরতে চাই, গরুর পিঠে বসে খুনসুটি করতে চাই। আমিও ভাবছিলাম পালাবো বুঝলে।

- তোমার তো সুবিধে,  তুমি উড়ে চলে যেতে পারবে যেখান খুশি। আমার তো তেমন সুবিধে নেই, তাই ভাবছিলাম কেমন করে যাই।

- না বাপু অত সোজাও না যত ভাবছ। আমাদের সমাজ আছে না, তারা অন্যরকম হওয়া পছন্দ করে না। আমায় পকলাতে হবে। জানি পালাবার পর ছিছিক্কার পড়ে যাবে। তাছাড়া টান অনেক কিছুর হে, কাটানো মুশকিল হয়।

-তা মিথ্যে বলব না আমারও কি মনে হচ্ছে না কাজ কাম না করে বেশ আছি তো। শুধু শুধু চাপ নিয়ে আর লাভ কি! তবে ওই আর কদিন বাঁচবোকে জানে, যদ্দিন পারি ঘুরেই নিই।  যা হবে দেখা যাবে।

- তবে চলো।

-  অ্যাঁ তুমিও যাবে বুঝি?  কিন্তু তুমি তো উড়েই চলে যাবে।  আমি যাব কেমন করে? 

- শোনো এক কাজ করি, সেদিন একটা মালা মত জোগাড় করেছিলাম। ওটা তোমার জামায় আটকে দিই, তারপর গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ব।

- সে তো খুবই ভালো প্রস্তাব আমার জন্যে,  কিন্তু তোমার বড় কষ্ট হবে।  তুমি এতটা পথ বইবে আমায়.....

- আরে এত ভাবলে চলে? থামবো না হয় একবারের জায়গায় দুবার। আমাদের তাড়া কি? আর শোনো বন্ধুদের জন্যে এটুকু তো করাই যায় নাকি? তুমি আমায় গান শুনিয়ো, গল্প বোলো ওড়ার কষ্ট দূর হয়ে যাবে।

- আহা বড় আনন্দ পেলাম রে ভাই। তোমার নাম কি? আমি লালচাঁদ।

- আমি?  সে একটা কিছু ছিল ছোটবেলায়, এখন আমি খালি এপম্লয়ি নাম্বার ৩৫৭১৮৬৩।

- অ্যাঁ সে আবার কি?

- সে আছে,  পরে বলব খন। ওসব বাদ দাও।  ধরে নাও আমার নাম লালচাঁদের বন্ধু।

- সে তো বটেই।  তবে আমি কি নিজেকে বলব লালচাঁদের বন্ধুর বন্ধু?  

- হাহাহা আচ্ছা বেশ  আমার নাম দিলাম পলানে। পালাচ্ছি কিনা? কি বলো অ্যাঁ? এবার চলো নইলে ভোর হয়ে যাবে সব চৌপাট হবে।

- হ্যাঁ হ্যাঁ আর শোনো না আমার জন্যে মালাটালা নিতে হবে না। আমার চার্জারটা আছে না ওটার দুমুখ আমার জামায় কায়দা করে আটকে দাও তো। মাঝে মাঝে খাবার দরকার হবে, খুব কম কিন্তু হবে।

- সে আর বেশী কথা কি। এসব আমি পারি ভালো। 

তারপর তারা দুজন পালালো। অদ্ভুত অসম দুই বন্ধু, একটা কাক, তেমন দক্ষ না কাজে, আর একটা মোবাইল যে আজকের দিনে প্রায় অচল, এবং অপদার্থ।  তারা একটু যায় অনেক বিশ্রাম নেই। চলতে চলতে কত লোকের বারান্দা, ঘর, কত পাহাড়, নদী ঝরনা দেখলো। কত লড়াই দেখে মুচকি হাসলো। কতবার রাগারাগি হল নিজেদের মধ্যে। কিন্তু নিজেদের মধ্যে বিচ্ছেদ হল না। কারন ওরা জানতো বন্ধু ছাড়া এমন দুনিয়া দেখা তাদের হত না,  কিংবা আনন্দও হত না হয় একা একা দেখে। 

মাঝে মাঝে হুট করে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলে দেখতে পেতেও পারো একটা কাক আর তার গলায় একটা মোবাইল  ঝুলিয়ে চলেছে।

Friday, July 19, 2019

নদীর পাড়ে

শান্ত আশ্রমের মত বাড়িটা পেরিয়েই নদী দেখা যায়। নদীর এখন ভাটার সময়, মস্ত চড়া।  দেখে ভাববে বুঝি এ আবার কি নদী, খালি কাদাই সার। ওহ এ তো আবার নদী না, নদ। নদী নামটা কেমন ভালো নদ কথাটা কেমন যেন। আবার নদ-নদী বললে খারাপ লাগেনা।  সে যাই হোক, এখন নাম ধাম ভুলে তাকাও, নদীই মনে হবে যেন। অনেক পথ পাড়ি দেওয়া,  সংসারের তাপে ক্লান্ত হলে কি হবে, চওড়া পাড় দেখেই বুঝবে এ বয়েছে অনেক, যৌবনে অনেক নতুন পথ পাড়ি দিয়ে এখানে পৌঁছেছে। তারপর নদীর পাশে বসলেই ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শে তোমার মন শান্ত হলে দেখবে পলিমাটি জলেই গামছা পরে ছেলের দল কেমন লুটোপুটি করছে। তুমি কাদা ভুলে নেমে যাবে জলে, কাদায় পা গেঁথে যাবে তারপর,  স্রোতের মুখে সে কাদা সাফও হয়ে যাবে। ফের উঠে আসবে  যখন গোড়ালি অব্দি পলিমাটি মাখা হয়ে বড় আরাম হবে। কতদিন পর তুমি মাটি ছুঁলে বলোতো? পলিমাটি আর এমনি কাদার স্পর্শে যে তফাৎ তাতো ভুলেই গেছিলে। কাদা পরিষ্কার করার ছলে হাতে মাখবে সেই কাদা। বসে থাকবে থুম হয়ে যতক্ষন না তোমার চোখের সামনে হুড়মুড় করে জল বাড়া শুরু হবে। যেন এক ঝাঁক ছোট ছেলে, ইস্কুলের ছুটি পড়তেই হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসেছে। তোমার পা ছুঁয়ে যাবে জল। তুমি তাকিয়ে দেখবে জোয়ারের জলের সাথে সাথে সারি বেঁধে নৌকা ভেসে যাচ্ছে কোথায়। ছোটবেলার মত করে গুনতে গিয়ে খেয়াল করবে তোমার প্যান্ট ভিজে গেছে, তুমি নিজেই নিজেকে বাহানা দেবে, ইচ্ছে করে তো আর না।

তারপর... তারপর আবার কি? একটা নদী বুকের মধ্যে নিয়ে ফিরবে....


Thursday, July 11, 2019

বুড়ো শহরটায়

বাড়িটার নাম ছিল ড্রিমল্যান্ড। দোতলা,  বারান্দাওয়ালা বাড়ি। যেমন হত আগেকার দিনে, বারান্দাটা টালির ছাওয়া। যখনকার বাড়ি এখানে তেমন লোক ছিল না মনে হয়, বাড়ির গায়েই হয়ত সব্জিওয়ালারা বসে যায়নি, কিংবা মুরগির ঝুড়িটা লাগানো থাকতোনা। এখন অবস্থা বদলেছে, ড্রিম আর নেই, ডিম হয়ে গেছে। ডিমল্যান্ড। পথচলতি কেউ তাকিয়ে দেখেও না হয়ত। কারা থাকে ওখানে এখন কে জানে! 

কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে সারাদিনে। ধর্মতলা থেকে ময়দানের পাশ দিয়ে ইডেন গার্ডেন হয়ে বাবুঘাটের রাস্তাটা বড় প্রিয় আমার। মনুষ্য-বর্জ্যের  গন্ধ ছাপিয়েও এক এক জায়গায় বৃষ্টি ভেজা বুনো গন্ধ নাকে ঝাপ্টা মারে। কোলকাতা শহরে এ বড় কম। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে দেখি বাবুঘাটের গোল্লাটায় আটকে গেছে, দু পা এগোয়, একটা বাস আসে ফের দু পা পিছোয় আর তাতে তাদের হাসাহাসি বাড়ে। প্রেমে থাকলে ছোটখাটো অসুবিধে মনে হয় ইগ্নোর মোডে চলে যায়। ওই যে,  বেঞ্চের সামনে গোড়ালি ডোবা জলকে কাটিয়ে দুজন জমিয়ে প্রেম করছে। বাফ্রে ডেডিকেশনের হদ্দমুদ্দ যাকে বলে। একটা লোক ডানহাতে গোলাপি লেডিস ব্যাগ বাঁ হাতে ছেলের হাত ধর হেঁটে যাচ্ছে, একদল ছেলে মেয়ে সেলফি তুলছে লঞ্চ আর মেঘলা আকাশ নিয়ে। আরে আরে ওইখানে কি হচ্ছে! একজন ন্যাড়া সাহেবকে পাকড়ে কজন মিলে সেল্ফি তুলছে!! বড় লজ্জা লাগে, কেন এমন করে দেশের মাথা নিচু করে দেয়? একটু পরে দেখি সাহেব তড়িঘড়ি করে চলে যাচ্ছে,  পাছে ফের কেউ পাকড়ে ধরে। 

তবে যাই বলো, বর্ষার এই মেঘ ধোয়া বিকেলগুলো বড় সুন্দর হয়। গঙ্গার ধারটা সুন্দর করে দিয়ে বড় ভালো হয়েছে। দূরে দূরে ভেসে থালা হাত নৌকা গুলো ডাক দেয়। সন্ধ্যে নেমে আসা কোলকাতায় একটা তেরপলের নীচে কাঠের উনুনে ভাত বসিয়েছে একজন মাঝি। কাছেই জোয়ার আসা গঙ্গায় তার হ্যারিকেন ঝোলা নৌকা দুলছে। মাঝি এখন রাঁধুনিও বটে। বড় খুঁতখুঁতে রাঁধুনি দেখি, শিলনোড়ায় রসুন থেঁতো করে ঢাকনা খুলে কেটে রাখা পেঁয়াজের পাশে যত্ন করে তুলে রাখে, ফের চাপা দেয়। জানান দিল, মাছ ধরা হয়েছে আজ। কোনদিন মাঝির অতিথি হয়ে যাব ঠিক। জোর করেই। এসব বলছি কিন্তু জানি হবে না, আমি কোনোদিনই অমন মুখ ফুটে চাইতে পারবো না, কোনোদিন পারিনি বলে কত পাওনা জোটেনি আগে,  পরেও জুটবেনা সেও জানি। 

অন্ধকার ছায়া ছায়া রাস্তাটা পার হলেই ব্যস্ত এসপ্ল্যানেড, দুম করে প্রেক্ষাপট বদলে গেলে কেমন ঘুম ভেঙে যাওয়া অনুভূতি হয়। দেখি এক বয়স্ক দম্পতি ফুচকাওয়ালার সামনে। ফুচকার জল বুড়ির গায়ে পড়ে, বুড়ো যত্ন করে রুমাল দিয়ে মুছিয়ে দেয়। এ শহরের খারাপ টুকু তো সবাই জানে, বড় শিল্প নেই, কাজের মন নেই, আলসে, অভদ্র, কিন্তু তাও এইযে ভালোবাসার গল্প গুলো বাঁচিয়ে রেখেছে সে খবর জানে কজনা। অবশ্য প্রেম ভালোবাসা এ গতিময় যুগে বাহুল্য বটে। কিন্তু আমি তো ওই ভালোবাসার ভরসাতেই বেঁচে থাকি, বুড়োটে ক্ষয়াটে শহরটার মতই......

Wednesday, July 10, 2019

একদিন হাসপাতালে

সার সার বেড পাতা। সার সার জানলা। তবুও হাওয়া আসছেনা মোটেও। প্রায় সবারই পরণে লুঙ্গি। বুকের খাঁচা ছোট হয়ে যাওয়া বুড়ো কোনো বেডে, কোনো বেডে পেট প্রায় মিশে যাওয়া জোয়ান ছেলে, কোনো বেডে এই গরমে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে থাকা লোক। শহরের হাসপাতাল নয় কিনা, তাই ভীড় লাগামহীন না।

সকাল বেলা থেকে দুপুর অব্দি ডাক্তার, নার্স, বাড়ির লোক, নতুন টেস্ট, নতুন রুগীর ভীড় বেশী। দুপুরে নীচ থেকে খাবার আনে যে যার থালায়। খাবার পর শুনশান হয় খানিক। একটা অল্পবয়সী ছেলের বাড়ির অনেক লোক এসেছে, মা,  মাসী, আরো কারা যেন, একজন হাতপাখার বাতাস দিচ্ছে, একজন পেটে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। জানলার পাশ থেকে দুটো বেড পর একটা লোকের মাথায় শিরা ওঠা শাঁখা পরা একটা হাত পরম মমতায় বুলিয়ে দিচ্ছে।

পাশের ঘরটা ফাঁকা।  সারি সারি বেড পাতা কিন্তু রুগী থাকার সিস্টেম নেই। আসলে হাসপাতালটায় কাজ হচ্ছে। মাথায় গামছা বেঁধে, যে রোদে হাসপাতালের গেট পার হয়ে জলের জায়গা অব্দি  যাওয়া যায় না সেই রোদের মধ্যেই, দেওয়ালে  রঙের তুলি বোলাচ্ছে কার্ণিশে দাঁড়িয়ে একজন আর বাঁশে দাঁড়িয়ে একজন। গেটে ঢোকার মুখে মালাই বরফ  বিক্রী করছিল, বারোটার রোদে মাথায় গামছা আর সাইকেলের ক্যারিয়ারে টিনের বরফের বাক্সে লেবু নুন দেওয়া বরফ। পাঁচ টাকায় একটা পিতলের হাতা দিয়ে প্লাস্টিকের গ্লাসে তুলে দেওয়া বরফ।
ফাঁকা ঘরটায় অনেকে শুয়ে আছে। রুগীর বাড়ির রাত জাগা লোক। ছেলেই বেশী। যে বউ গুলো বরের সাথে রয়েছে তারা তো রুগীর খাটেই একটু জায়গা করে শুয়ে পড়েছে। আর যে মায়েরা এসেছে বড় ছেলের সাথে তারা মাটিতে বেড পেতে শুয়েছে। ক্রমে দু চারটে পাখির ডাক ছাড়া বাইরের মিস্ত্রীরা ছাড়া সবাই চুপ করে যায়, ঝিম ধরা দুপুর নামে। একটা বিড়াল এসে উঁকি মেরে দেখে যায় ডাস্টবিনে কিছু আছে নাকি। এক পা দুই পা পুরো মাথা নেমে যায় ভাতের খোঁজে.....

ফাঁকা ঘরটায় দুটো ছেলে, একজন গল্প শোনায়, বিদেশে কেমন সেক্স ফ্রি তার। সে দেখেছে এক্সভিডিওতে এরকমই হাসপাতালে গেলেই রুগীর বাড়ির লোককে, "ম্যাসেজ" করে দেয়, তারপর সুযোগ পেলে....ইঙ্গিত করে হাতের মুদ্রায়। সে দেশে নাকি বর বউ বলে কিছু না, একটা ঘরে চোখ বেঁধে সবাই ল্যাংটা হয়ে যায়, "তারপর তোর বউ আমার...."..... শুনে যাই হুঁ হাঁ করে, এক্সভিডিও সত্যি, ইউটিউব সত্যি, হোয়াটসঅ্যাপে গুজব বন্ধ করবেন? সত্যি বলতে ছেলেগুলো নিজের বিশ্বাসে অদ্ভুত সরলতায় বলে যায় এসব।জানি জানি আপনি কি বলবেন,  হাসপাতালে এসব কথা বলে এরা কারা, কিংবা এরা প্রত্যেকে পোটেনশিয়াল রেপিস্ট এই তো? অত সাদা কালো মানুষ হয় না কত্তা। বন্ধুর বাবার জন্যে রাত জাগা যায়,  দুপুর রোদে স্ট্রেচার নিয়ে ছুটোছুটি করা যায়, কিন্তু সে কারনে মন খারাপ করা যৌবনের ধর্ম না যে! আর রেপিস্ট? মানুষ দেখেননি আপনি তবে। আরেকটু দেখেই নিন না কত্তা, অত সহজে নাই বা দাগালেন৷

হঠাৎ  করে একটা শোরগোল ওঠে। একটা লোক,বেশ শক্ত পোক্ত সা-জোয়ান চেহারা, মাথায় কিছু গোলমাল হয়ে গিয়েছে। বাইরের বারান্দাতেই পেচ্ছাপ করতে চায়। প্যান্টের চেন খুলে, বের করে দাঁড়িয়ে পড়েছে, তার বউটা তাকে অনুনয় করছে,  চলো না গো চলোও না গো বলে সে " ধোর বাঁড়া সর তুই বলে" ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে। বউটা অসহায় ভঙ্গীতে কেঁদে ফেলেছে।এ ঘর থেকে ওই ছেলেটা ছুটে গিয়ে লোকটাকে, "কাকা এস এসো" বলে টেনে নিয়ে এগোচ্ছে, আমরা বাকিরাও হাত লাগাচ্ছি....বাথরুম অব্দি পৌঁছে দিয়ে দেখি লোকটার ছেলে এসে পৌঁছেছ্ব, হয়ত নীচে ওষুধ আনতে গেছিল সে ফাঁকে এই অবস্থা।

ক্রমে বিকেলের রাউন্ডের সময় হয়ে আসে।
নার্স হাঁক পাড়ে, অনুপ মাজি, অনুপ মাজির বাড়ির লোক কে আছে? য
এ পাশ থেকে ফর্সা রোগা বউটা ছুটে যায়....
"শেখ সাহাবুদ্দিন..."
নাম ধরে ধরে ওষুধ দেয় নার্স, কারোর স্যালাইন বদলে দেয়, কাউকে ইঞ্জেকশন। ডাক্তার আসে। অল্পবয়সী ছেলে।  কাল থেকে একে দেখছি, শান্ত মুখে সবার ওষুধ লিখছে, টেস্টের রিপোর্ট দেখছে। রেফার করার হলে রেফার করছে। একটা মাথা ফাটিয়ে গুন্ডার দল এসেছিল, তাদেরও ওষুধ দিল চুপচাপ। ক্যাপ্টেন কুল।

বিকেল গড়ায়....বড় কম্পাউন্ডটায় শিরীষ,  কদম, শিমূল গাছের ছায়া পড়ে। ভিজিটিং আওয়ার শেষের ঘন্টা পড়ে। যদিও এরকম গ্রাম গঞ্জে অত সময় মানে না কেউইই। মাঠের কাজ শেষ করে যে আসবে তার কি সময় মেপে আসা যায়! সেই মাথা খারাপ রুগীটাকে রেফার করেছে, বউটা শক্ত করে লোকটার হাত ধরে অ্যাম্বুলেন্সের দিকে এগোয়। লোকটা শিশুর মত টলমল করে,  বিস্ময় মাখা চোখে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে এগোয়, তার কিছুতেই কিছু এসে যায় না, ওই দূরে রাস্তাটার দিকে নজর তার, ছাড়া পেলেই চলে যাবে যেন। বউ, ছেলে, সব গোলমাল হয়ে যাবার পর কীসের দর্শন পেয়েছে সে কে জানে!

Sunday, July 7, 2019

রথের দিনে

"না চাহিতে মোরে যা করেছ দান আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ....."

বিক্রম সিং গাইছেন। নিজের আত্মার মধ্যে সব কটা শব্দ ঢুকিয়ে গাইছেন, প্রতিটা শব্দ বিশ্বাস করলে এমন উজাড় করে গাওয়া যায় বোধহয়....তবে কেন এমন হুট করে চলে গেছিলেন? 
লম্বা সিগন্যাল। সিটে শরীর ছেড়ে দিয়েছি...."এ যে তব দয়া জানি জানি হায়, নিতে চাও বলে ফেরাও আমায়...গানের মধ্যেকার বিষাদ আমার ক্লান্ত শরীরকে আরাম দেয়।
এদিকে রথ ওদিকে ফোর্থ জুলাই, অফিস ফাঁকা জলদি। আকাশের রঙ দেখতে পাওয়া সময়ে বেরোতে পারলে বড় ফূর্তি হয়। সাদাটে থেকে গোলাপি হয়ে সোনালী হয়ে লাল হয়ে কালো....গাড়ি চালাতে চালাতে হাঁ করে তাকানো যায়না বেশী, পিছনের গাড়ি তাড়া দেয়। এই রাস্তাটা বড় সুন্দর। এইই বড় বড় গাছ, দেবদারু, নিম এর ফাঁকে স্বর্ণচাঁপা উঁকি দেয়। চাঁপা গাছ কে চিনিয়েছিল?  স্কুলবাড়ির মাঠে একটা ছিল সেই দেখেই শেখা মনে হয়। আহ বড় সুন্দর গন্ধ হয়। অত দিন শুঁকিনা। আজ বিশ্বরূপ বলছিল, ওর এক জুনিয়র নাকি হারিয়ে গেছে। এমনিই একদিন দুম করে,  কিন্নরে নাকি লাস্ট ট্র‍্যাক করতে পেরেছিল....হারিয়ে যাওয়া এত সহজ বুঝি? হারিয়ে গেলে বেশ হয়। হুট করে নেই হয়ে গেলাম একদিন।

 রথের জন্যেই রাস্তা বন্ধ, জ্যাম কাটিয়ে অন্য রাস্তা ধরতে হয়। এ রাস্তা আমি চিনিনা, অচেনা রাস্তায় গেলে কেমন মনে হয়না? আমি হাঁ করা ছেলে,  হাঁ করে এদিক সেদিক তাকাতে যাই, আমার রাস্তা বেড়ে যায়। 

এদিকে মনে হয় রথ আসতে পারেনি,  অন্ধকার ছায়া ছায়া স্ট্রীট লাইট, একটা লোক হেলমেট হাতে হেঁটে যাচ্ছে। নির্ঘাত বাইক খারাপ হয়ে গেছে। রাস্তা চেনার অছিলায় জিজ্ঞেস করি....ডাক দিই আপনি যাবেন আমার সাথে? 

রাজারহাটে অফিস, ডেলিভারির কাজ করেন। আজ তাড়াতাড়ি বেরিয়েছিলেন মেয়েকে রথের মেলায় নিয়ে যাবেন। 
"আর ভাই কপালে না থাকলে যা হয়।"
বিমর্ষ শোনায় গলা। আমার মা বাবাই রথের মেলায় গেছে, ফোন করেছিল, গাছ আনবে আর জিলিপি আনবে আমার জন্যে। এর মেয়েটার বুঝি পাঁপড়ভাজা হবে না আজ তাও হয় নাকি? অ্যান্টি মর্ফি'স ল তে আমার রাস্তা এদিকে হয়ে গেল। 

ভদ্রলোক নেমে যাবার আগে আলো আলো মুখে আসি ভাই বলে গেলেন। আমাদের দেশে ধন্যবাদ দিতে হয় না, হাসি দিয়েই সব হয়ে যায়। আমার মন  ভালো হয়ে গেছে আবার, একটু আগের বিষাদ কেটে যাচ্ছে, জ্যামটাও পেরিয়ে গেছি।

আহা উৎসব সবার হোক....

Friday, June 28, 2019

হারিয়ে গেল যারা

পিন্টুকাকুর দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।
এর দোকান ও নিয়ে সে বিক্রী করে দেবে এরকম কিসব গোলমাল হয়েছিল নাকি। সঠিক জানিনা। খালি একদিন থেকে দেখি দোকান বন্ধ। পিন্টু কাকু একটু তোতলা, স্যান্ডো গেঞ্জি পরে দোকানে বসে থাকতো। খুবই খারাপ খারাপ সব মিষ্টি থাকত দোকানে। তাও আমি যেতাম,  নিকুতি, বোঁদে কিনতাম। সকালে অফিস যাবার সময় হোক কি হরিনঘাটার মাংস কেনার সময় হোক, হেসে হেসে জিজ্ঞেস করতো আমি ভালো আছি কিনা।
ডিরেকশন দিতে হলেও পিন্টুকাকুর দোকানের নাম বলেই দেওয়া।
মানুষ মনে হয় সব চেয়ে নিষ্ঠুর জাত। পিন্টু কাকু কি খাচ্ছে, কেমন আছে কি জানি! এসব বেফালতু ইমোশনের দাম হয় না। রোজ খাচ্ছি অফিস যাচ্ছি হুট করে একদিন থেকে নেই হয়ে গেলেও কারো কিচ্ছু যায় আসে না। পিন্টু কাকু মরে যায়নি কিন্তু, তাও আমি বাজারে দেখিনা, জল ভরতে দেখিনা রাস্তার কলে, টাইমকলের জলে চান করতেও দেখিনা। দুম করে কারোর খোঁজে বাড়ি চলে যাব সেও পারিনা, কিন্তু রাস্তায় নামলেই চঙমঙ করি, পৈতে জড়ানো গোলগাল লোকটাকে। কিভাবে চলছে পিন্টুকাকুর?

বাপীদার দোকানটাও হাত বদল হয়ে গেছে। অন্য একজন লোক আর তার বউ চালায়। দিব্যি ভালোমানুষ দুজনেই, ভারী যত্ন করে চা দেয়, প্লাস্টিকের টুলে বসতে দেয়, সে তুলনায় বাপীদা ছিল নির্লিপ্ত ধরনের মানুষ। হাসতো না, কথা বলত না। বিশু না থাকলেই বাপীদার দোকানে যাই। বিশু আবার মাসের টাকা তুলে ফেল্লেই ডুব দেয় টুক করে৷ তাই বাপীদার দোকানে যেতেই হয়। তাছাড়া ডাবল ডিমের অমলেট বিশু করে না। বিশু হল যোগী টাইপ, ভালো পাতার লিকার চা, দুধ চা,  কফি ব্যাস। এই করে যা হবে হবে, দুদিন ছুটি পেলে বেড়াতে যাওয়া যাবে। নতুন লোকটার নাম জানিনা এখনো, জিজ্ঞেস করা হয়নি। ভারী আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করছিল, "দাদা লিকার চা ভালো হয়নি? " তবু আমার বাপীদার কথা মনে পড়ে। কোথায় গেল?  শরীর খারাপ হল? নতুন দোকান?

জিমে বিজয় বলে একটা ছেলে আসতো, ট্রেনার। আজকাল আর আসেনা। বোকাটে মত দেখতে, সেইই উত্তরপাড়া থেকে রোজ আসতো। একটা গোলাপী জামা, ঢলঢলে আদ্যিকালের প্লিট দেওয়া প্যান্ট, সস্তার জুতো। এসে জুতো খুলে বোকাটে ভীতু হেসে বলত সেই সকাল  সাতটায় বেরোই আর রাত এগারোটায় ঢুকি, জুতো খোলার সুযোগ হয় না।  এখানে একটু খুলছি। "দাদা ভালো প্যাক্টিশ হচ্ছে? হবে হবে, নিয়ম করে করো"। চেহারা বানিয়ে বগল উঁচু করে উল্কি এঁকে ঘোরা আমার জন্যে না, তবে বসে থেকে থেকে ঘাড় পিঠ জবাব দিচ্ছিলো তাই যাওয়া।  ছেলেটা আমার ফাঁকিবাজি " প্র‍্যাক্টিশে"ও উৎসাহ দিত। জামা প্যান্ট বদলাবার জায়গায় তাড়াহুড়ো করে ঠান্ডা পরোটা আর ঘুগনি খেত, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাদা ফিনফিনে প্লাস্টিক থেকে। কি জানি এখন কোথায় জুতো খুলে আরাম দেয় পা গুলোকে!

সেদিন পোলার বেয়ারের ভিডিওটা দেখছিলাম, না খেতে পাওয়া রোগাটে শ্বেত ভল্লুকটা না। ছানা ভাই বোন মিলে সিল মাছ শিকার শেখার ভিডিওটা। ভাইটা পড়ায় ফাঁকি দিয়ে স্নো বল বানাচ্ছে, আর বোনটা যথারীতি ভালো মেয়ে, মায়ের ঠ্যাঙ আঁকড়ে সিল মাছের অপেক্ষা করছে। তারপর দুম করে ভাই শ্বেত ভল্লুককে চমকে দিয়ে সিল বাবাজি টুকি মেরেছে। ভাই তো কুপোকাত, তা দিন দুপুরে অমন ইয়ার্কির নামে ঠাট্টা ভাল্লাগেনা মশাই। তারপর তো শুনলাম এরাও হারিয়ে গেছে। হয়তো একশো মাইল দূরে গিয়ে টের পেয়েছে তার পায়ের তলার বরফ সরে গেছে।

দুর্বল সবাই হারিয়ে যাবে এইই নিয়ম....কিন্তু সবল মানেই জিতে যাবে এমনও না। সবলেরও দুর্বলতা আছে,  সেই ফাঁক দিয়ে কালনাগিনী জায়গা পেয়ে যায় ঠিক....চিন্তা করিনা আমি,  যা রবার সেটাই রবে। কত বলশালীই তো ইঁট পাথর হয়ে পড়ে রইলো স্রেফ.... খালি ওই পায়ের নীচের বরফ চলে যাওয়া বাচ্ছা সমেত মা, আর পিন্টু কাকু হয়ত না খেয়ে আছে এই ভাবনা বড় উত্যক্ত করে। জল শেষ হয়ে যাচ্ছে,  হোটেল বন্ধ করে দিচ্ছে ভালোবাসার অপরাধে এসবের মত বড় কিছু না হয়তো পিন্টুকাকু....তাও.....

Saturday, June 22, 2019

ভাবনারা

দৈনন্দিন শব্দ গুলো পরপর ভেসে আসছে, প্রেশার কুকারের হিস হিস... ফিইইইইউস, অটো সজোরে ট্যাঁ....রিকশার প্যাঁকো প্যাঁক।সকালের শব্দ। বিকেলবেলার শব্দ আলাদা। বিকেলবেলা অব্দি এখানে থাকবোনা যদিও। একটা কাচ ঘেরা জায়গায় বসে খুদকুঁড়ো জোটাবার চেষ্টা চলবে। এবার বর্ষা নামবে মনে হয়। পিঁপড়ে গুলো ডিম নিয়ে খুব খানিক ছোটছুটি করছে যেরকম তাতেই বোধ হচ্ছে। আচ্ছা পিঁপড়েরা বৃষ্টি হলে সন্ধ্যেবেলা তেলেভাজা মুড়ি খেতে খেতে ভূতের গল্প করে খুব? 
"ও বট্ঠাকুদ্দা, তোমার হুল ধরে একবার একটা পেত্নি কেমন টান মেরেছিল সে গল্পটা বলবে না?"

তখন পিঁপড়েসর্দার পাক ধরা হুলে তা দিয়ে জমিয়ে বলবে গল্পটা। আমাদের যেমন কিছু কমন ভূতের গল্প আছে, জামাই মাছ নিয়ে যাচ্ছে, মাছে দিল টান, কিংবা সিঁড়ি দিয়ে চলে গেল ঠান্ডা এক ঝলক হাওয়া যেন, এরকম পিঁপড়েদেরও কিছু থাকবে, কেকের দোকানে বেরোনোর মুহুর্তে একটা গরম হল্কা শুঁড়ের উপর ছুঁয়ে গেল, শাটার আটকে গেল মিষ্টি শেষ। কিন্তু এমন হবার কথা না, একটু আগেই তো থরে থরে মিষ্টি ছিল....

বর্ষায় নদীতে নৌকা করে ঘুরতে মজা খুব। বেশ একটা বজরা কিনবো নিজের, মাসের পর মাস ঘুরে ঘুরে বেড়াবো ফেরার কথা ভুলে। জলের মধ্যে ডুব দিলেই সেই কোন একটা পাতালরাজত্ব, রাজকন্যা ঘুমিয়ে থাকে। আচ্ছা ওই দেশেতে ইন্টারনেট আছে? লোডশেডিং হয়? নাকি পোকা টোকা দিয়ে আলোর ব্যবস্থা হয় আর হাঙরের মুখ দিয়ে পাঠানো হয় খবর? পাখি দেখলে হেব্বি অবাক সবাই, আরে দেখো এটা কি? জলের তলায় পাখি একটা সেনসেশনাল ব্যপার। নীল মাছ গুলো হলুদ কোরালের কাছে ঝাড়ি মারে আর পাত্তা না পেলে ভাবে দাঁড়াও না একটু বড় পাখনা হলেই কেমন সাঁ করে কত্তদূর চলে যাব আর ফিরবোই না। নিজের পাড়ায় নিজের থালায় বসে বুড়ো সমুদ্র ঘোড়া ভাবে যা যা, কিন্তু এই যে নাতি পুঁতি নিয়ে গুষ্ঠিসুখ করছি শেষবয়সে এর মজা পেতে তো ফিরতেই হবে। ওদিকে রাজকন্যা ঘুমিয়েই থাকে, তার সোনা কাঠি বদলে দেবার রূপকথারা কবেই মরে হেজে গেছে।

একদিন টানা বৃষ্টিতে মাঠে যাব ধান রুইতে, বাড়ির সবাই মানা করবে, তোর রোগা শরীর, তোর যাবার কি দরকার বলে বকবে, কিন্তু তবুও এক ফাঁকে পালাবো, যেমন পালাই। টুপটুপ জলে কাদা কাদা মাঠে পা গেঁথে যাবে, নিজের হাতে গাছ লাগাবার মজাই আলাদা। আর সে গাছ যদি বেঁচে যায়, ফল দেয় তবে বড় মুশকিল, অমনি মায়া জন্মে যাবে। সেই কোন একজন মুনি ছিল মনে আছে? সব ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে শেষে একটা ছাগল না কার জন্যে মায়ায় আটকে পড়ে গেছিল, পরের জন্মে তাই জড়ভরত হল, সেই সন্ন্যাসীর মত কেস হবে। তারচেয়ে ব্যাসদেবের মত নিরাসক্ত হাপ গেরস্ত টাইপ হওয়া ভালো, সমস্যা এড়ালোনা, ফেস করলো, দিয়ে চলে গেল।

জ্বর হলে আবোলতাবোল ভাবনা আসে। আবোলতাবোল স্বপ্নও।একটা বাড়ির স্বপ্ন দেখছিলাম যেখানে গেলে আর হুঁশ জ্ঞান থাকে না, বাইরের খারাপ ভালো কিছুই মনে পরে না, বাড়ির বাইরে যাবার ইচ্ছে করে না....তারপর বেরিয়ে আসলে কোনোভাবে, দেখা যায় ওখানে কিছু ছিলোই না। আমার স্বপ্নেও পালানো হয় না বাস্তবেও না।

Wednesday, May 29, 2019

ফটোগ্রাফ

-মা এই ফ্রক পরে মেয়েটা তুমি?

মা মিটিমিটি হাসে।

- আরিব্বাস বেলবটম সানগ্লাস পরে হেব্বি কেত দিয়েছ তো? ও মা, এই হাঁস আর বকের ছবিটা কেন?

-আরে ওটা আমার প্রথম তোলা ছবি। তোর বাবাই শেখাচ্ছিল।

-হি হি এই গাব্দা বাচ্ছাটা কে মা?

- আরে ওটা তো পাপু।

-আর এই এতগুলো বাচ্ছা এরা কারা?

- এই দেখ এটা হল মাধু, ওটা ববি, এই কোনে নিমি, ওই পিছনে ওটা মিতি....

- মা এটা মেজমামা না? আর এটা কে? বাবুদা?

-না না বাবু কেন এটা তো তুই চিনবি না আমার জ্যাঠামশাই এর দিকে, রাঙাদার ছেলে।

- এহে এটা নষ্ট হয়ে গেছে একে বারে, এটা তোমাদের বিয়ের ছবি?

- হ্যাঁ। তা কতদিনের পুরোনো সব ছবি।

- মা, বাবাইকে তো হেব্বি দেখতে ছিল অল্পবয়সে। উরিন্না আবার কায়দার গোঁফ। তোমাকেই বরং এ ছবিটায় কেমন রুগ্ন মত লাগছে।
মা এটা কোথায়? আমাদের পুরোনো বাড়ির ছাদ? চারপাশটা কেমন অন্যরকম লাগছে। 
আরিব্বাস এটায় তোমাদের দুজনকে দারুন লাগছে তো।

মা লাজুক হাসে সমর্থনের ভঙ্গীতে।

একের পর এক বিবর্ণ, সাদা কালো ছবি দেখি।কত সব চেনা অচেনা লোক, কত অজানা ফ্রেম, নিস্পাপ হাসি, লাজুক হাসাহাসি, অনাড়ম্বর শুরুয়াদ.....কত লোক আর বেঁচেই নেই, কত লোক জানেও না তাদের কোনো বিশেষ মুহুর্ত কোন খানে রয়ে গেছে। ধূলো সরিয়ে বিবর্ণ ছেঁড়া অ্যালবামের ফাঁক দিয়ে কতকালের সব কথা শোনা যায়।কাদের ছাদ, কোন কলতলা, কোন ধানের ক্ষেত, প্রথম একসাথে চলা...কত কি।

কার কোন অ্যালবামে আমার কোন ফটোগ্রাফ হতে গেল কে জানে, তাকে আমি চিনি হয়তো কিংবা চিনিনা....এ ছবিতে রিটেক হবে না, পজিশন নেবার সুযোগ হবে না হুট করে রয়ে যাব। খেলার মত করে ছবি তুলতে তুলতে রয়ে যাওয়া কোনো ছবি দেখতে চিনবে কিংবা চিনবে না...

Sunday, May 19, 2019

ভোট আর জ্যোতিষী

সকালে একজন ফেসবুকে বলল ভোট দিতে গেলে নাকি কচুরি জিলিপি, দুপুরে বিরিয়ানি এসব খাওয়াচ্ছে।  তড়িঘড়ি দাঁত মেজে রেডি হয়ে ভোট দিতে গিয়ে দেখি কোথায় কি সব ফক্কা। দুটো মেশিন খারাপ তাই ইয়া লম্বা লাইন পড়েছে। যদিও আমায় দেখেই,  'আইয়ে মহারাজ আপ ইধারসে যাইয়ে। এই হট যা মহারাজকো পেহলে যানে দে' এসব বলছিল কিন্তু আমি তো এত লোকের কষ্ট নিজের মধ্যে ধারন করতেই মর্ত্যে এসেছি।  আমি কি আগে যেতে পারি? তাই চট করে ছদ্মবেশ ধরে নিলাম। আরে সাধক মানুষ এটুকু পারবো না৷ তারপর লাইন মেন্টেন করে ভোট দিয়ে,  দই চিঁড়ে মুড়কি কলা আম দিয়ে মেখে খেয়ে এক গ্লাস তরমুজের সরবত খেয়ে আরাম করে বারান্দায় গিয়ে দেখি একটা লম্বা চওড়া কাক একটা কুকুরের পিঠে বসে যাত্রা করেছে।  রাস্তাঘাট ফাঁকা।মংসের দোকানে, কচুরির  দোকানে লম্বা লাইন। এমন শান্ত দিন তো খুব বেশী দেখা যায় না,  তাই কালকের ঘটনাটা বলে একটু নিদ যাই৷ 

হয়েছেকি কাল আমার দুজন গাল্ফেনের সাথে পর পর অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। এটা একটু রিস্কি মনে হচ্ছে যাদের তাদের বলি মহারাজের কাছে দীক্ষা নিয়ে নিতে পারো, সব ভয় কেটে যাবে। 

তো প্রথম গাল্ফেনের সাথে জাকারিয়াতে যাওয়া হল। আইবাপ্রে কীইই ভীড় কীইইই ভীড়। দুধারে লাচ্চা সেমুই, বাখরখানি থেকে হরেকরকম পাঁউরুটির দোকান, জামাকাপড়, সাজের জিনিস পেরিয়ে ধোঁয়া দেখা গেল।  ধোঁয়া মানেই কাবাব। ইয়া লম্বা লাইন দিয়ে ওজন করে মশলা মাখা মাংস   নিয়ে ফের বিল দিয়ে রান্না করা মাংস নিতে হয়। রাস্তার উপরেই চেয়ার পাতা,  আরাম করে খাও। হাঁড়ি করে হালিম বিকোচ্ছে খুব। কিন্তু এই গরমে বিফ হালিম সাধুর পেটে সইবে না। পরে হভে বলে স্কিপ করে এগিয়ে আরো নানান কিসিমের কাবাব এদিক ওদিক থেকে খেয়ে দেখি লোকে লাইন দিয়ে ম্যাঙ্গো শেক খাচ্ছে৷ 

ইগ্নোরন্স ইজ ব্লিস কথাটা কত খাঁটি তক্ষুনি বুঝলাম জানেন।যদি না জানতাম এগুলো মর্গের বরফ আমিও আরাম করে এক গেলাস খেতাম কিনা?  বিশ্বাস চলে গেলে মানুষের আর কি থাকে হ্যাঁ? সুতরাং ওসব না খেয়ে ঝুরি আইস্ক্রীম খাওয়া গেল। ঝুরি আইস্ক্রীম হল একটা পেল্লায় বরফের চাঙর ঘোরানোর কল থেকে ছুরি কেটে কেটে  দেওয়া আইস্ক্রীম। এই বরফ মর্গ থেকে আসে কিনা এখনো জানিনা ভাগ্যিস।

তো এসব করে ক্লান্ত হয়ে গেছিলাম। পরের গাল্ফেনের সাথে মিটের তখনো খানিক বাকি তাই তাকে নিয়ে কলেজ স্কোয়ারে বসেছি। ফস করে আমার হাত ধরে একজন লোক বলে বয়স কত? 

-কেন?

- প্রশ্ন করেছি জবাব দেবে। কেন এসব প্রশ্ন করবে না। 

এই বলে আমার হাত ধরে দেখি মন দিয়ে উল্টেপাল্টে দেখছে। কোনো গাল্ফেনও এত মন দিয়ে আমার হাত ধরেনি তক্ষুনি শিওর হয়ে গেলাম ব্যাটা জ্যোতিষী নির্ঘাত। বেশ বেশ। গাল্ফেনকে বললাম," তুই যা, তোর আবার দেরী হয়ে যাচ্ছে। আমি কল করে নেব।" সে উঠতে যাবে,  জ্যোতিষী আবার বলে,  "দাঁড়াও তোমার হাতটা দেখি"।  

-ওর বাড়িতে চাপ আছে একটু তাড়াতাড়ি হ্যাঁ?

- আহ তুমি থামো। যা জিজ্ঞেস করলাম উত্তর দাও। বয়স কত? তুমি জেনে রাখবে তোমার ভাগ্য তোমার হাত দেখেছি। সবার হাত আমি দেখিনা। 

বদ বুদ্ধি আমার নেই মোটেও। নিরীহ গলায় বললাম,  পঁচিশ(আসলের থেকে ছ বছর কম)।

- হুঁ। কি করো? 

খুউউব করুন গলায় বললাম, " কিচ্ছু না,  পড়াশোনা করে চাকরি খুঁজছি। " 

-হুম।  কই দেখি তোমার হাতটা, তোমার বয়স? একই বয়সী? বাড়িতে সমস্যা হচ্ছে না? তুমি তো খুব রাগী দেখছি। থালা বাসন ভাঙার অভ্যেস আছে দেখছি। পড়াশোনাও তো আর করো না।  তা একে বিয়ে করতে রাজী হচ্ছ না কেন?

প্রসঙ্গতঃ এই গাল্ফেনটি খুবই শান্ত শিষ্ট, পড়াশোনাও প্রচুর, বিয়েও ঠিক হয়ে গেছে (আমার কপাল!)। আমি খুব কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, হ্যাঁ আসলে আমি চাকরি করিনা তো তাই....
বলল হ্যাঁ তোমার হাতে তো চাকরির যোগ নেই। হয়ে যাবে। একে বিয়ে করো৷ আর হ্যাঁ তোমার যেমন মাথা ঠান্ডা অমনই থেকো, এইই তোমার স্ত্রী জানবে তা যতই রাগ করুক। 

ততক্ষনে  আমার ওই গাল্ফেন উঠে চলে গেছে তার  তাড়া ছিল। পরের গাল্ফেনের আসার সময় হয়ে গেছে। তাকে এখানে আসতে লিখে, জ্যোতিষী কাকাকে বললাম, " তাহলে এইই? খুব রাগী কিনা..."

- তুমি খেয়াল করে দেখেছ কি আর কোনো মেয়ের সাথে তোমার ভাব সাব হয় না,  কথা হয় না। কেন জানো? শুধু এই মেয়ের সাথেএ তোমার বন্ধুত্ব হল। আমি বলছি....শোনো কুড়ি টাকা দাও আর ওর হাতে একটা মুক্তো দিও।

বলতে বলতে পরের গাল্ফেন হাজির। সে আবার আমার কলিগও। এসেই সে হুড়মুড় করে, " আরে একটা মিটিং রেখেছে আজ রাতে,  তোকেও কলে জয়েন করতে হবে। চল চল প্যারামাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে।" তখনো আমার হাত কাকার হাতে...সেদিকে তাকিয়ে,  "তোর ওরিয়েন্টেশন বদলে গেল কবে!" 

- না ইনি বলছিলেন আমার চাকরি হবে না আর আমার আর "ইয়েই" আমার স্ত্রী।  কি করি বলতো।
কাকা এর হাতটাও একবার?.....

কাকা ভীষন রেগে বিড়ি ধরিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। 

কী ভুলটা বলেছিলাম হ্যাঁ? -_-

Monday, May 6, 2019

শাটলে

মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, হাতে একটা প্লাস্টিক, একটা জলের বোতল, জানলার ধারটা চেয়েছিল কুন্ঠিত হয়ে, মাথা ঘোরে।

এমনিতেই যেদিন গাড়ি বের করতে পারিনা, শাটলে হাঁটু, কনুই, বগলের চাপে মেজাজ খিটকেল থাকে। জানলার ধার পেলে কে ছাড়ে! একটু হাওয়া অন্তত আসবে খোলা অংশটা দিয়ে। এই লোহার বাক্স গুলো ঠিক মানুষের জন্যে বানানো না মনে হয়, অত সেফটি ফিচার টিচার নেই। আরাম তো দূর কি বাত। ঠাসাঠাসি করে মাঝের অংশে তিন তিন ছয়, সামনে দুই, পিছনে চার। সামনে দুই আবার দুরকম, ইঞ্জিনের উপর আসন পাতা উঁচুতে বসা একজন আরেকজন ভালোভাবে বসা, এগুলো একটু পুরোনো। আরেকরকম হল, ছোট্ট দেড় জনের জায়গায় দুজনকে বসতে হয়, এর ঘাম ও মেখে, এগুলো একটু নতুন।
মাঝের জায়গাটায় যদি স্বাস্থবান পুরুষ বসে তো সেই একই ঘামতে মিলিল ঘাম কেস। আর যদি স্বাস্থবতী মহিলা বসেন তো চিত্তির আরো বাড়ে। তাঁকে "টাচ" না করে মোবাইলে খুটুরখাটুর বা বাইরে তাকানো। ফলে জানলার ধার পেলে কে ছাড়ে আর!

লোকটাকে ভালো করে দেখলাম একবার। সস্তার সিন্থেটিক গেঞ্জি, হাতের রঙ লাগানো নখে ময়লা, রোদে লালচে হয়ে যাওয়া চুল,গালে এদিকাসেদিক ভালোভাবে না ওঠা খোঁচা দাড়ি,বসে যাওয়া চোখ। ধান্দাবাজ অফিস পার্টি না আমার মত। দেখে অসুস্থ মনে হয়।হাতের প্লাস্টিক দেখে মনে হচ্ছে তো রিপোর্ট.... টাটা মেডিকেল যাবে কি?
লিখতে এতক্ষন লাগলো, কিন্তু দেখতে আর ভাবনা মাথায় আসতে কয়েক সেকেন্ড। জানলার ধার ছেড়ে মাঝে বসলাম। কানে গান হাতে ফেসবুক...লোকটাকে দেখছি। অবাক চোখে গলা বাড়িয়ে বাইরেটা দেখছে। এ পাড়ায় তেমন আসেনা নির্ঘাত। জানলা পেলেও তো মোবাইল চোখ কেড়ে নেয়, এমন করে আর কজন বাইরেটা দেখে! স্বস্তি বোধ করছিলাম, জানলা আজ ভালো সহযাত্রী পেয়েছে। লোকটা যেন গিলে নিচ্ছিল বাইরের সব টুকু, ছাতু মাখা খাওয়া বুড়ো, ঝকঝকে ফুলে সাজানো রাস্তা, স্কুল ব্যাগ কাঁদে ছাত্র, ভোঁ বাইক হাঁকানো ছেলেটা, সব সব.....

আরেসের কাছে এসে জড়ানো গলা কি যেন বলল সামনের ছেলেটাকে, ছেলেটা কায়দা করে শ্রাগ করলো। কেমন ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে আমার দিকে তাকালো দেখি....
-কোথায় যাবেন?
-নারকেল বাগান কখন আসবে?
জড়ানো গলা ভালো বোঝা যায়না। আহারে অসুস্থ লোকটা মনে হয়। বললাম যে আমারা নারকেল বাগান অনেক্ষন ছেড়ে এসেছি। লোকটা কেমন হতবাক গলায় বিড়বিড় করলো, "কিন্তু আমি যে নামিয়ে দিয়ে বলেছিলাম"।

তারপর স্ক্রীন ভাঙা একটা সস্তার এন্ড্রয়েড থেকে কাকে যেন ফোন করে জিজ্ঞেস করলো। এবার বলে সিরিঞ্জবাগান/শীরিষবাগান। ভালো বুঝলাম না। ততক্ষনে আমার নামার জায়গা এসে গেছে। শাটলওয়ালা, খুব বিরক্ত নিয়ে বলল, " মনে করিয়ে দেবে তো। আমার অত খেয়াল থাকে?"
লোকটা খাবি খাওয়া মত করে বলল, "এখানেই নেমে যাব? " শাটলওলা আমার ফেরত দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে ততক্ষনে।

আমার জানা হল না, এই ভয়ানক রোদে লোকটা কেমন করে ফিরতি পথ পাড়ি দিলো...আজকাল তো ছায়া নেই তেমন আর.... কি জানি ছায়া পেল না বোতলের জলটুকু ভরসায় পাড়ি দিল।