Monday, April 30, 2018

হঠাৎ বৃষ্টি

দিনের বেলায় সন্ধে নেমে এসেছে, কড়ক্কড়াত করে বাজ। ওই ওই ঝড় উঠলো, ফলওয়ালা বিশে ছুটে দড়ি এনে বাঁধতে গেলো, ওই একটা কাদের জামা উড়ে গেলো। দরজার পাল্লা গুলো দড়াম করে পড়ছে, মায়ের রান্নাঘরে আলো...একটা পায়রা উড়তে গিয়ে ভেবলে গেছে, তারপর এক দৌড়ে আমাদের বাড়ির কার্নিশে। ছেলেটা ছটফট করে ওঠে, এই ঝড়, অন্ধকার বৃষ্টিতে তো ও বাড়িতে থাকতে পারে না। 
" মা তোমার শশা, টমেটো কিছু এনে দিতে হবে? দাও না এনে দিচ্ছি।"
- ভিজতে যাবি বলে না? না আমার কিচ্ছু লাগবে না,তুই চানে যা। অফিস যেতে হবে না? মাছের ডিম ভেজেছি খেয়ে চান করতে যা। 
- আমি এক্ষুনি চলে আসবো তো, এক্ষুনি আসছি দাঁড়াও না।
বোতাম না আটকানো জামা গলিয়ে জুতো পরে সে, ছেলেটার মা দরজায় দাঁড়িয়ে বলতে থাকে এতো বাজ পরছে এ সময় কেউ বাড়ির বাইরে যায়? কথা বললে শোনে না....

বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি। রাস্তাঘাট ফাঁকা, দোকানগুলোয় শাটার নামিয়ে লোকে বৃষ্টি থামার প্রতীক্ষায়। ফুলওয়ালির ফুল গুলো ঝড়ে জলে রাস্তায় অঞ্জলি হয়ে পড়ে আছে, সব্জিওলার ট্রলিভ্যানে একা একা ভিজছে কুমড়ো, পটল, লালশাক। তুমুল হাওয়ায়, ঠান্ডা বৃষ্টির ঝাপটায় ফাঁকা রাস্তা ধরে ছেলেটা সটান হেঁটে যায়, সকলের অবাক চোখ, ঝোড়ো হাওয়ার দাপট উড়িয়ে। দূর থেকে রেডিওয় যাও পাখির মিউজিকটা বাজছে তখন.....

একটা ফুল গাছের ট্রলি একা একা ভিজছে, গাছ বিক্রেতা মাথা বাঁচাতে ব্যস্ত দূরে। গন্ধরাজ গাছের পাতায় মুখ নামিয়ে কী যেন বলে ছেলেটা....ফের এগিয়ে যায়। কে যেন ধমকে বলে, 'এই ছেলে বাড়ি যা, বাজ পড়ছে এত, কেউ বাইরে ঘোরে?'
ছেলেটার আপাদমস্তক ভেজা, চশমার কাচ ঝাপ্সা, হঠাৎ একটা গাড়ির হর্ণে চমক ভাঙে, ফিরতি পথ ধরে......অনেকদূর এসে গেছে, অফিস যেতে হবে তো......

বাড়ি ফিরতে এক জোড়া উদ্বিগ্ন মুখ দরজা খুলে দেয়, "যা যা আগে চান করে নে ভালো করে, ফের জ্বর বাধাবি......"
এই জন্যই ছেলেটার পালানো হয় না আর।

Tuesday, April 24, 2018

এই যে হেথায় ...

আচ্ছা এটা টিপিক্যাল ন্যাকা গপ্পো। এবার কথা হলো প্রেম টেম তেমন চলে না। তাও চেষ্টা করলুম। 
*******************************
"কী হয়েছে এখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে?"

হুটার লাগানো গাড়ি থেকে খাকি পোশাকের লোকটা হাঁক দেয়।

কিচ্ছু না স্যার, দেখুন, না হলুদ ফুল দিয়ে প্রপোজ করেছি বলে হ্যাঁ বলছে না। তখন থেকে হাঁটু মুড়ে বসে থেকে থেকে বাত হয়ে গেলো হাঁটুতে। পুরো রাস্তায় তো খালি হলুদ আর বেগুনী ফুলের গাছ বলুন,লাল ফুল পাবো কোত্থেকে?

এ্যাঁ!! ইয়ার্কি মারছো? কই দেখি গাড়ির কাগজ দেখি।
"গাড়ির কাগজ সব ক্লিন আছে স্যার, নো পার্কিং কেস দেবো না আইপিসি টু নাইন্টি ফোর?"

- গাড়ির কাগজ সব ঠিক পাবেন স্যার।মুশকিল তো ফুল নিয়ে। নিয়ে যান আমায় থানাতেই নিয়ে যান, তবে স্যার বলে দিচ্ছি আমিও কেস করবো, ওই মেয়েটাই তো ল পাশ করেছে, রাস্তার পাশে একটা লাল ফুলের গাছ নেই!!

ইয়ার্কি হচ্ছে হ্যাঁ ইয়ার্কি মারছো? দেবো পাবলিক অবসিনিটি কেস? 
- লাল হলুদ বরাবর বদেদের রঙ আমিও জানি স্যার। এ মেয়েকে কে বোঝাবে? বল্লুম ওরে চাট্টি সবুজ পাতা দিচ্ছি আমার মেরুন গাড়ি মানিয়ে যাবে। তা ফস করে বলে দিলো ছাগল জানেন? ওই জন্যই নাকি সবুজ পাতার দিকে ঝোঁক!

- ম্যাডাম এদিকে আসুন তো, আপনার বাড়িতেও খবর দিতে হবে। আর একে তো ছাড়া যাবেই না। পুলিশের সাথে ইয়ার্কি মারার ফল বুঝবে। বেশী রস হয়েছে না, তিনটে ডান্ডা খেলে বুঝে যাবে।

- স্যার মারবেন ফাইন কিন্তু ইয়ে বাড়ির লোক ডাকতে গেলে তো আমায় জেল থেকে বেরিয়ে ওকে নিতে আসতে হবে! মানে উনি আমার বাড়িতেই আগামীকাল থেকে থাকছেন কিনা। 
- মানে? সোজাসুজি কথা বল, থাবড়া মেরে সিধে করে দেবো।

- আহা আজ আমদের বিয়ে কিনা। আসলে বছর দুই আগে এনাকে এখানেই প্রপোজ করেছিলাম কিনা, আর সেবারেও হলুদ দিয়েই, ওই লালের অভাবেই আর কি, না নানা বিজেপি না দুবছর আগে বিজেপি কই। তা ইনি বললেন বিয়েটা হবার আগেও যদি লাল ফুল দিয়ে প্রপোজ করে দিই ক্ষমাঘেন্না করে দেবেন আরকি। কত কষ্ট করে আজ বাড়ি ভর্তি লোকের মাঝে বেরিয়েছি স্যার...তা কপাল দেখুন লাল ফুলের বদলে লাল বাতি চলে এলো।

-- বিয়ে!! স্ট্রেঞ্জ!!! বিয়ের দিন আপনারা এসব করছেন!! মিথ্যে কথা বলার জায়গা পাননা?

- মিথ্যে কেন হবে এই দেখুন, স্যান্ডো গেঞ্জি এতো নতুন হয়? আর এই গলায় চেন আমি পরবো হ্যাঁ? আর ওই ওকে দেখুন না এ রকম চেড়ী মার্কা সাজ বিয়ের জন্য ছাড়া কেউ সাজে? বিশ্বাস না হলে রিসেপশনে ইনভাইট করছি আপনাকে আর ম্যাডাম যদি বরযাত্রী বাড়াতে রাজি হন রাতেই চলুন না। মেনু ফাটাফাটি স্যার, নো বিরিয়ানি চাঁপ, পাতুরি, মালাইকারি, ইলিশ যাতা ব্যাপার। হোক নাকি?

- যান যান। অন ডিউটি আছি। আর এসব করবেননা। বিয়ে করতে যান।

-যাচ্ছি স্যার পাঁচটা মিনিট। ওই মেয়ে এবার হ্যাঁ বলবি কি??

- না বলে উপায় কি, গাধা কোথাকার। একটা লাল ফুল দিতে পারিস না এসেছিস বিয়ে করতে। সারাজীবন তুইই মশারি টাঙাবি এর শাস্তিতে।

Saturday, April 21, 2018

উড়োচিঠি (চার কিংবা পাঁচ)

কেমন আছো? অনেকদিন গ্যাপ দিলাম না? আমি জানি তুমি আমার চিঠির অপেক্ষায় থাকো, আমার চিঠি ডাকবাক্সে পড়ুক না পড়ুক ঠিক পাও তুমি। মন ভালো নেই বুঝলে, সে অবশ্য আমার পুরোনো রোগ। চারপাশের লোকজন থেকে পালানোর সময় হয়ে গেছে মনে হয়। জানোই তো আমার কিছু সয় না, বেশী মায়া বেশী ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ফোর্সড সন্ন্যাসী আর কি। যাকগে এবারের চিঠি ইজ নো মোর ঘ্যানঘেনে। বৈশাখের তীব্র রোদে পুড়িয়ে দিক সমস্ত পুরোনো মনখারাপ।

জানো সেদিন একটা গলি দিয়ে হাঁটছিলাম। যেমন হাঁটি এ গলি সে গলি হঠাৎ দেখি একটা বাড়ি, আম গাছ কাঁঠাল গাছ আর এক চিলতে বাগান সহ, কেমন করে কে জানে এই গিজগিজে ভীড়ের শহরে টিকে আছে। আর আশ্চর্য কি জানো ওই বাড়ির ছাদে দেখি মাদুর পেতে দু চারজন রয়েছে! অবাক না? এখনো বুঝি লোকে গরমকালের সন্ধ্যেবেলা ছাদে গিয়ে তারা দেখে?

বাড়িটার পাশ দিয়ে আসতে আসতেই ডাল পিঁয়াজভাজার গন্ধ পাচ্ছিলাম। গন্ধ বড় অদ্ভুত জিনিস। অমনি আমি সেই ছোটবেলার গরমের রাত্তির, সন্ধ্যেগুলোয় পৌঁছে যাচ্ছিলাম। হ্যারিকেনের আলো, বিকেলবেলায় গা ধুয়ে এসে মা এর গান গাইতে বসা, কিংবা দিদিভাইদের বাড়িতে অ্যানুয়ালের পরের ছুটিতে গল্পের বই পড়া, তাসের রঙ মেলানো। নাহ ট্রাম্প করতে শেখার বয়স তখন হয়নি আর বড় হয়েও শেখা হয়নি সে জিনিস।

গরমকালের দুপুর গুলো কেমন নিঝুম হয় জানো তো? আমি দুপুরবেলাতেও দোতলার ঘরে যেতে পারতাম না, ভয় পেতাম, ভীতু ছিলাম তখনো এখনকার মতোই কিনা।

গরমকালের ছুটি তো আর হয়না, বড় হয়ে গেছি পেল্লায়, এপ্রিল মে এর গরমে স্লিপার ট্রেনে চড়ে লম্বা জার্নি না করতে পারার মতো বুড়োও বটে। কী দ্রুত বদলে যায় না দৃশ্যপট আর সঙ্গে আমরা? তোমার আমার সব গল্প কথা কেমন অলীক মনে হয়। আচ্ছা টাইম মেশিন কিংবা ওয়ার্মহোলে করে ওই জোনে চললে কি এখনো দেখা যাবে আমাদের? 
কী এলোমেলো বকছি তাই না? তা কোন চিঠিটাই বা গুছিয়ে লিখে উঠতে পারলাম, বলতে পারলামই বা কই গুছিয়ে কিছু কোনো কিছু তোমায়। পরের জন্মে খুব সাহসী হবো বুঝলে, আর শীর্ষেন্দুর গল্পের দুবলা লোক না সন্তুর মতো পারদর্শী কেউ হবো। সোজাসুজি তাকিয়ে দাবী জানাবো, উত্তরের....

ভালো থেকো।

Monday, April 16, 2018

নতুন বছর পুরোনো গল্প...

ভালোবাসা কথাটা ক্রমে অলীক হয়ে যাবে হয়তো। কিন্তু আমি তো ভালোবাসাতেই বিশ্বাস রাখি বেশী। চারদিকের এই খারাপ ঘটনা, এই ভয়াবহতা সত্যেও আমি এখনো মানুষে বিশ্বাস করি এখনো বিশ্বাস শব্দে বিশ্বাস রাখি। হতে পারে আমি বোকা, আকাট কিংবা উটপাখি কিন্তু খারাপ জিনিস বেশী বইতে নেই, তাতে খারাপের ওজন বেড়ে যায়। নতুন বছরে আমি সেই পুরোনো ভালোবাসার গল্পই বলবো ফের।

কোলকাতা শহরেই ভালোবাসা এদিক সেদিক এতো থাকে, পায়ে হেঁটে না ঘুরলে ধরা যায় না ঠিক। মেডিকেলের সামনে একটা কুকুরকে জড়িয়ে ধরে একটা ভিখারি মেয়ে খুব করে বকে দিচ্ছে দেখি, কেন ও আগের দিন খেতে আসেনি, তাই জন্যই তো অন্য কুকুরে এসে খেয়ে গেলো। আর কুকুরটা খুব আরাম করে সে আদুরে বকুনি খাচ্ছে ^_^ । না মশাই কুকুর আমি ভালোবাসিনা, বরং খারাপই বাসি, ব্যাটারা আমায় দেখলেই ধাওয়া করে কিনা, কিন্তু দূর থেকে দেখতে মন্দ লাগে না বটে, আর এ তো দুই সঙ্গীর আদর আহ্লাদ, তা কি খারাপ লাগতে পারে?

চাঁদনির মেট্রো পেরিয়েই ফুটপাতে একটা মশারি টাঙিয়ে একটা ছোট্ট পুচকে শুয়ে আছে দেখি, আর তাকে ঘিরে পাহারা দিচ্ছে তার দুই বীর বাহাদুর দাদা, খালি গায়ে, নেংটি পরে। দু দাদার ছোটটার নাক দিয়ে সর্দি বেরোচ্ছে এদিকে, প্যান্টুলও কিঞ্চিৎ ঢিলে, দুই খানা মাত্র হাত, কোনটাকে সামলায়, দাদার কাছ থেকে গাড়িটাও কব্জা করতে হবে, কী করে যে কি হয়! কিন্তু দু মক্কেলের চোখের জোর কম নাকি, এক সমুদ্দুর ভালোবাসা নিয়ে ভাইকে পাহারা দিচ্ছে, একটা মাছির সাহস থাকে বসে দেখুক দিকি! 
এই ফুটপাতে থাকা, বাচ্ছা কাচ্ছা সংসারও আমার ভয়ানক অপছন্দ মশাই তাই বলে তো আর এদের ভালোবাসাটা উপেক্ষা করা যায়না নাকি?

আমি এসেছিলাম চাঁদনিতে একটা কাজে। আমার ভালোবাসা, চিনি ছড়ানো মালাইতে। মালাই খেয়ে হাঁটতেই হয়, না হলে পেটের মধ্যে মালাই এর প্রমোটারি রাজ শুরু হয়ে যেতে পারে। তা হাঁটছি হাঁটছি, দেখি আমার সামনে দুই মক্কেল চলেছে। দুই তরুণ তরুণী। বয়স মশাই ইয়ে কিঞ্চিৎ বেশীই, মানে ঠিক কাঠফাঠা রোদে ঘুরে প্রেম করার বয়সী না আর কি। ম্যালা প্যাচাল পেড়ে লাভ নাই মশাই ওই কাঠফাটা রোদে হেঁটে যাওয়া প্রেম আমি পঁচিশ-আঠাশের পর দেখিনি বেশী। যাই হোক, সরু ফুটপাথ, পিছন পিছন চলেছি, যথারীতি নির্লজ্জ ছেলেটা দেখি টুক করে মেয়েটা চুমু খেয়ে নিলো সেই ভীড় রাস্তাতেই, আর মেয়েটা কি যেন বলল মাথা নিচু করে, না দেখতে পেলেও আমি জানি পেল্লায় লজ্জা পেয়েছে সে। আমি মুচকি মুচকি হাসছি, হঠাৎ ছেলেটা হা হা করে আশপাশের সবাইকে সচকিত করে হেসে উঠলো, কানে এলো বলছে, সত্যি বল, এই বয়সে বাড়িতে লুকিয়ে, অফিস কেটে দুজন প্রেম করছি কোনো মানে হয়! পরকীয়া করলেও না হয় বোঝা যেত!
আজকের রোদটা চড়া উঠেছিলো খুব, গরমও ফাটিয়ে পড়েছিলো, দেখ না দেখ ওদের কথায় একটু কমে গেলো না গরমটা?

চাঁদনিতে আমার কাজ হয়নি আজ, আবার যেতে হবে, ভালোই হবে, মালাই খাওয়া যাবে আর, চারদিকের অবিশ্বাস আর ঘেন্নার মধ্যে আমার বুড়ো শহরে একটু হাওয়া বাতাস পাওয়া যাবে না হয়। ^_^

নতুন বছরে ভালোবাসায় কাটুক সবার। ভালো হোক।

Wednesday, April 11, 2018

কোলকাতায়...

রোজকার রাস্তা ধরে মাঝে মাঝে আমি যখন অন্যভাবে আসি যাই, হাঁ করে গিলতে গিলতে আসি চারদিক। আমার বন্ধুরা বলে এ শহরে আর হবার কিছুই নেই, বাকি শহরগুলোয় অন্তত কাজ আছে, এখানে সে টুকুও নেই। মিথ্যে না হয়তো, কাজ থাকলে কি আর ওই যে চারদিক খাঁ খাঁ করা মাঠে একটা মাত্র গাছের তলায় আরাম করে লোক দুটো শুয়ে থাকতে পারে এই বেলা দশটায়! কিন্তু আমি আসলে এ শহরের উপযুক্তইই, ওরকমই আধ খ্যাঁচরা, অসফল, হেরো ছেলে। শীর্ষেন্দুর গল্পের চরিত্রের মতো। তাই জন্যই হয়তো কোলকাতা আমার খারাপ লাগে না, বিগড়ে যাওয়া ওয়ার্ক কালচার, ধোঁয়ায় ঢাকা আকাশ, ঘেমো আবহাওয়া সব যেন আমায় কিছুই করতে পারেনা।

আমি দেখি কেমন একলা গাছে একটা সারস বসে আরাম করছে, মন্দিরতলার চাতালে গামছা বিছিয়ে শুয়ে আছে চারপাঁচজন, ফাঁকা রাস্তায় বর বউ মিলে খেলনাপাতির মতো দোকান সাজিয়েছে আর একটা বুড়ো মানুষ একমনে কাগজ পড়ছে সামনে বসে। সামনের মোড় পেরোলে গরম পিচ গলিয়ে মাথায় ফেট্টি বেঁধে কাজ করছে একজন। গোলাপী, লাল ফুল গুলো ঝরে গেছে, বসন্ত শেষ, গরমের পাল্লা শুরু হয়ে গেছে।

অফিসে ঢোকার পর সামনের রাস্তা দিয়েই সবাই যায়, পিছনের দিকে একটা রাস্তা আছেছে, একটু ঘুরে, কিন্তু ছায়া ছায়া। বোকাগুলো দু পা ঘুরে গেলে গাছেদের মধ্যে দিয়ে যাওয়া যায় জানেই না, বোকার মতো রোদ থেকে বাঁচতে হনহন করে চলে যায়। এই দিকে গাছ গুলো দিব্যি হাসিখুশি, একটা মালি খালি জল দেয় মাঝে মাঝে, আর রোগা রোগা গাছ গুলো মাথা দুলিয়ে হাসে।

এই গরমের আঁচে পুড়তে থাকা শহরেও এতো ভালোলাগা ছড়িয়ে থাকে আনাচে কানাচে...যেমন ওই সেদিন মেট্রোয় হাসি হাসি মুখে অনুযোগ করা ছেলেটা, "বড্ড খাটাস জানিস", কিংবা একরত্তি ছেলেটাকে সামলাতে হিমশিম দেখে মেয়েটাকে সামনের অচেনা ছেলেটা জায়গা ছেড়ে দেয়।

গরমকালের উষ্ণতা আর এই শহর দুইই আমার মতো ডিফেক্টিভ শাড়ি সেলে পাওয়ার মতো মহারাজদের জন্য...সফল যারা হতে চায় না তাদের জন্য। ^_^

Sunday, April 8, 2018

মাঠাংবুরুর গল্প

মাঠাংবুরু ইজ ব্যাক এগেইন ^_^
(ইয়ে পুরোটা না একটুই)
**********************
"শোনো হে মাটি থেকে আকাশ যেমনই দেখাক, ও ভারী শুকনো আর স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা"।
- শুকনো আবার স্যাঁতসেঁতে একসাথে!! দ্যাখ ব্যাটা পিঁপড়ে কাজ করে করে আলা হয়ে যাচ্ছি আর তুই আবোলতাবোল বকা শুরু করেছিস? এখন যা দেখি,কাজ কাম করতে দে, ঘুমোতে দে।
- ওরে ব্যাটা মানুষ, আমার গল্প বাজারে ছেড়ে খুব তো পিঠ চাপড়ানি খেয়েছিস হ্যাঁ, অম্নি ভাও বেড়ে গেলো না?
উপরের কথা গুলো আমার সাথে মহারাজের। আমি রে বাবা আমি, মাঠাংবুরু। মানুষ হলেও মহারাজ আমার বন্ধু মানুষ হয়ে পড়েছে, তাই আসি আমি এখানে প্রায়ই, আড্ডা মারতে। ওর থেকেই শুনলাম আমার গল্প শুনতে চেয়েছে কেউ কেউ। 
আমি তো বাউণ্ডুলে পিঁপড়ে, আমি এদিক সেদিক করেই বেড়াই, আমায় পিঁপড়ে সমাজে আর নেবে না হয়ত, কারণ আমি নিয়ম ভাঙা কাজ করি। কি করবো আমার খালি খাবার খোঁজার কাজ ভাল্লাগেনা আর। ফুলের পাপড়িতে বসে দোল খেতে খেতে সেদিন যখন একটা বড় গোল্লা বৃষ্টি এসে পড়লো আর আমি হড়কে পড়লাম আমার মনে হলো কোত্থেকে আসে ওই জল, দেখে আসা যায় না?
যেমন ভাবা তেমন কাজ। মাঠাংবুরু বেরিয়ে পড়লো। আমার তো তাড়া নেই কিছু, পৌঁছবার না ফেরার না, তাই ঘুটুংটিং ঘুটুংটুং করে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম প্রথমে বাতাসার দোকানে। বাতাসা আজকাল ভালো স্বাদ হচ্ছে না হে, একটু চেটে দেখি কোন বজ্জাত পিঁপড়ে আগেই চেটে গেছে! যাকগে যাক, একটু রাবড়ি খেয়েই রওনা দেবো। মন মেজাজ ভালো নেই বিশেষ, পাশের বাড়ির আমার হতে পারতো পিঁপড়েনী ওপাড়ার লম্বুকোটং কে নিয়ে নৌকা চড়ে ঘুরতে গেছে।

রাবড়ি খেতে হয় খুব সাবধানে, আমাদের পিঁপড়েদের জীবন খুবই বিপদসংকুল। এই ধরোনা কেন রাবড়ি এমন ভালো জিনিস কিন্তু আনমনে একটু বেশী ভালোবেসে ডুব দিতে গেলেই চিত্তির। আমাদের দলপতি কুরুণ্ডিয়া খুবই কর্মপটু, আমাদের শুরু থেকেই শিখিয়ে দিয়েছে তাই আমাদের দলের কেউই বেশী লোভ করতে গিয়ে ডুবে যায়নি কখনো তা রাবড়ি হোক কি গুড়, পাশের দলে গেছিলো শুনেছি। আমি অবশ্য তখন খুব ছোট।

রাবড়িতে মুখ ডুবিয়ে চুকচুক করে খেয়ে ফের রওনা দিলাম। কি করে বৃষ্টির খবর আনা যায় কে বলে দেবে আমায়? ওই জলের গোলা কে বৃষ্টি বলে মানুষেরা আমি শুনেছি। আমার গল্প তোমাদের ভাষাতেই বলবো, তোমাদেরকে বলছি যখন। মাটির উপর দিয়ে চলেছি, কত রোদের পথ পার হলাম খেয়াল রাখিনি, আসলে বৃষ্টির খবর আনতে যাচ্ছিলাম বটে কিন্তু রাস্তায় যে গাছ পাহাড় নদী দেখছি তাদের সাথে গল্প করছি আর ভুলে যাচ্ছি সব। 
মানুষদের কত কী লাগে বাপ্স রে! মস্ত একখানা গুবড়ে পোকা টাইপ কিসে একটা যেন করে এক ঝাঁক মানুষ কোথায় যাচ্ছে যেন, রাস্তায় এ ওকে ধাক্কা দিয়ে চলেছে সব, মাঝে মাঝে ওই বড় পোকার মতোর জিনিস গুলো ধাক্কা দিচ্ছে হুশ হুশ করে কি যেন বলছে। আমরা পিঁপড়েরা বাপু অমন হুড়োতাড়া করিনা। কাউকে ধাক্কা দেবোই বা কেন, সবাইই তো চিনির দানা নেবে।

হাঁটতে হাঁটতে একটা লাল চোখো গিরগিটির সাথে দেখা হলো। লাল চোখ দেখে ভয় পাবার কিছু নেই, ও খুবই লাজুক, অচেনা কাউকে দেখলেই রঙ বদলে বদলে মিশে যায় যাতে ওকে আর কেউ না দেখে, কেউ না জানে। অনেক্ষণ চলেছি তো খুব তেষ্টা পেয়েছিলো, খিদেও, তাই একটা ফুলের মধ্যে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙতে দেখি একটা নদীর ধারে শুয়ে আছে, একটা নীল মাছ এসে এসে আমার ফুলটার গায়ে নাক দিয়ে ঢুঁসো মেরে যাচ্ছে। আসলে হয়েছিলো কি আমি ঘুমিয়ে পড়ার পর নীল পাখি এসে ওই ফুলে মধু খেতে গেছে তারপর, ফুলটা পড়েছে জলে, ভাসতে ভাসতে এসে হাজির হয়েছি এখানে।

নীল মাছ খুবই ভালো ছেলে, আমার মতোই। আমি ভালো এ কথাটা মহারাজ না লিখলে পরের বার কোনো গল্পই আর বলব না বলে দিলাম। যাই হোক নীল মাছকে বললাম কি করে বৃষ্টি হয়? কোত্থেকে আসে? ও ভালো বলতে পারলো না, তবে আমায় পাহাড়-নদীর গল্প শোনালো।

তো সেবার সারা পাহাড়পুরে শোরগোল পড়ে গেলো। ঘটনা হলো যে যেমন তার মতোন কাউকে ভালোবাসাই দস্তুর। তাইই হয়ে এসেছে এতদিন। তা সেবার একটা নদী প্রেমে পড়ে গেলো একটা পাহাড়ের। পাহাড় স্থির, অচঞ্চল তাই সে ইউজুয়ালি ভালোবাসে গাছেদের কিংবা পাখিদের, যারা হয় ওর বুকেই রয়ে যায় অথবা ঘর বাঁধে। তা আমাদের গল্পে তো এ হলো গিয়ে গোলমেলে পাহাড়। সে মেঘ মাখে গায়ে, বৃষ্টিতে ভেজে, গাছের ছায়ায় শান্ত হয়, পাখিদের গান শোনে আর ভালোবাসে নদীকে। মানে যাকে বলে, একেবারে অ্যাঙ্গেলের হদ্দমুদ্দ, ত্রিকোণ টিকোন তো বাচ্ছা।ভালোবাসায় মানুষের একার অধিকার না!

তো সুর্য একটু গম্ভীর লোক, নিজের কাজের বাইরে অত হিসেব রাখে না, সময় করে আলো জ্বালায়, সময় করে কাজ শেষে পালায়। কোথায় পালায় আমি জানিনা মশাই, কেউই জানেনা। অন্য কোনো ব্রহ্মান্ডে আলো জ্বালাতে যায় কিনা, নাকি সূর্যের বেশ ত্যাগ করে জ্যোৎস্না মাখে সেসব আমার জানা নেই। মেঘ, বৃষ্টি, হাওয়া, মাটি, গাছ কেউই জানেনা। পাহাড়টা ছিলো একবগগা টাইপ, কিরম যেন একটা রুক্ষ ভাব, মাঝে সাঝে হেসে উঠে গল্প করতো বটে হাওয়া কিংবা গাছেদের সাথে কিন্তু হুট করেই ফের চুপ। তখন ছানা পাখিটা অব্দি কিচিরমিচির করতে ভয় পেতো, মা পাখির বুকের মধ্যে ঢুকে যেত চুপটি করে। বাবা পাখি মা পাখি আর ছানা চারটে পাখি, ওরা থাকতো সটান খাড়া গাছটা আছে না? ওরই একটা ছোট্ট কোটরে, কতবার বরফে ঝড়ে ওদের ঘর ভেঙেছে, তবু অদ্ভুত মায়ায় ওরা ছেড়ে যায়নি। আর ছিলো একটা হাসিখুশী ফ্যাকাশে গোলাপী রঙের ফুলের গাছ। হেসে হেসে গল্প করতো সবার সাথে, কিন্তু খুব বেশী পাত্তা পেতো না। আর ছিলো ঝাঁকালো মাথার একটা ফলের গাছ, কী ফল কে জানে পাখিরা খুব খেতো আর তাই খুব পপুলার ছিলো। হেব্বি আড্ডাবাজ, মাথা টাথা ঝাঁকিয়ে পাখিদের গল্প বলতো, পাহাড়ের সাথে ফুক্কুড়ি করতো, মোদ্দা কথা জমিয়ে রাখতো সারা পাড়া।

তো এমনই এক দিনে সেবার মুষলধারে বৃষ্টি আর ঝড়, পাহাড় পাড়া লন্ডভন্ড, পাখিদের অতদিনের ঘর দোর ভেঙে গেলো, ছোট যে নদীটা বইতো তিরতির করে সে এতো জল টল সামলাতে না পেরে ভাসিয়ে দিলো আশেপাশের সব নুড়ি পাথর, যে লাল নীল মাছগুলো খেলে বেড়াতো তাদেরও কোথায় ভাসিয়ে দিলো। অমন ঝাঁকড়ামাকড়া গাছটা দুড়ুম করে পড়ে গেলো, পাহাড়টাও হয়ে গেলো ক্ষতবিক্ষত। সে এক হন্ডুরাস ব্যাপার যকে বলে। তারপর একদিন প্রলয় ট্রলয় থামলে দেখা গেলো পাহাড় পাড়া ঘেঁটে ঘ। পাহাড়ের চুড়োয় এক খাবলা মেঘ আটকে আছে, গাছের ডালে পাখির পালক লেগে, ঝাঁকড়া গাছ টাকলা হয়ে গেছে, নদীটা আর স্বচ্ছতোয়া নেই, গাছের পাতায়, পাথরে বালিয়ে ঘোলাটে, সূর্য্যটা চমৎকার উঠেছে বটে কিন্তু হাওয়াটা দিচ্ছে ভারী মন কেমন করে করে। গোলাপী, হলুদ ফুল গুলো ঝরে পড়ে আছে ইতস্তত। ঝরনা টরনা গুলো ঝোরা হয়ে বইছে আর পাহাড়টা হয়ে গেছে ন্যাড়া, খোবলা খোবলা।

তা মশাই দুক্ষু টুক্ষু নিয়ে পড়ে থাকা মানুষের স্বভাব, এদের না। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে? কোই পরোয়া নেহি, তাই ফের ওই লণ্ডভণ্ড পাড়াতেই ফের পাখিদের জমায়েত শুরু হয়, শেকড়ে শেকড়ে চুমু টুমু খেয়ে গাছ গুলো হয়ে ওঠে ফুরফুরে, হাওয়ার সাথে ফুক্কুড়ি করে, মেঘটা ফের ডানা মেলে, পাহাড়টা আবার গান গায়, নদীটা আবার শান্ত হয়ে বইতে থাকে। এরকমই কোনো এক রাতে বা সকালেই গন্ডগোলটা হয়ে যায়। হয়েছিলো কি একটা মাছ আটকে গেছিলো কি করে যেন পাহাড়ের খাঁজে, তা বেজায় ছটফট করছিলো এক আঁজলা জলে। তা মাছেদের তো পলক থাকে না তাই কাঁদতেও পাচ্ছে না, তাছাড়া কান্নাকাটি করতে গেলে একটু আধার লাগে। আধার বুঝলে না? আরে জলে কাঁদলে তফাৎ হবে কি করে? কান্না আলাদা করবে কি করে? ওদিকে হয়েছে কি মাছগিন্নী তো সকাল থেকে অস্থির হচ্ছে, কত্তা বাজার করে আনবে চাট্টি প্ল্যাঙ্কটন ছানাপোনা মিলে ভোজ হবে, তারপর সবাই মিলে যাবে আউটিং এ। তা কোথায় কি। কত্তা আর আসেন না। মাচগ কত্তা সংসারী মাছ, দুম করে পালিয়ে সমুদ্দুরে চলে গেছে এমনও হতে পারে না, তাহলে? বিপদ আপদ বলতে তো এখানে কিছু নেই, বড় মাছ নেই, হাঙর নেই গেলো কই তবে? গিন্নী মাছ খুব করে পাখনা টাখনা নেড়ে নদীকে জানালো। নদী এদের যকে বলে ল্যান্ডলেডি, এদের খেয়াল রাখতেই হয় না হলে নদীতে আর কেউ থাকবে না। গেলো সে স্রোতের উলটো দিকে খোঁজ নিয়ে নিয়ে পাহাড়ের সেই ফোকরে। গিয়ে দেখে মাছ কত্তার যায় যায় অবস্থা। নদী তো রেগে পারলে সুনামী হয়ে যায়। খুব করে পাহাড়এর কান টান মুলে দেবে ভেবে খামচি মেরে এক খাবলা পাথর ধরেছে। তো খুব খানিক ঝগড়াঝাঁটি আমার মাছ তোর কি, আমার খোপরে এসেছে আমি কী করবো করে উস্তুম খুস্তুম লড়ল দুজন। তারপর? তারপর মাছ পেলো ছাড়া আর নদী গেলো আটকে। পাহাড়ের বুকেই আটকে তো গেলো, দুজনের ডেটিং চলল খুব, এ কাঁদলে ও থামায় ও বকলে এ চা করে আনে, যেমন হয় আর কি।

এদিকে নদীরতো আটকে থাকলে চলে না, নদীর ধারের গাছ গুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, মাছ গুলো রোগা হয়ে যাচ্চে, নুড়ি পাথরের ধার নাই আর। আর সত্যি বলতে নদীটারও বোরিং লাগা শুরু হয়েছে, তার তো এক জায়গায় থাকতে ভালো লাগার কথাও না, ওদিকে পাহাড়ও এতো গতিময় জিনিস ধরে রাখতে পারছে না। সুতরাং তারা বিচ্ছেদ খুঁজে নিলো, এখনকার ছেলেমেয়েদের মতোই মিউচুয়াল ব্রেকাপ, দেখো পোষাচ্ছে না আমাদের ঠিক, চলবে না বুঝলে? বলে নদী গেলো ফিরে আপন পথে, পাহাড়ও শ্বাস ফেলে বাঁচলো।

কিন্তু দুনিয়াদারি কি আর এতো সোজা রে ভাই। এই যে আমি মাঠাংবুরু, চিনির দানা খুঁজে বেরানো কাজ যার, বেরিয়েছিলাম বৃষ্টির খোঁজ নিতে, এখন নীল মাছেদের থেকে শুনছি পাহাড় নদীর কথা! তো যাই হোক, হলো কি কিছুদিন তো দুজনেই খুব ফূর্তি হলো, নিজের নিজের জীবনে ফিরে। পাহাড় করলো ফের মেঘ, বৃষ্টি, গাছ, পাখিদের সাথে ফ্লার্টিং আর নদীও গাছ, হাওয়া, পাখিদের সাথে। কিন্তু অনেক অনেক দিন চলার পর পাহাড় দেখে পাঁজর খানা কেমন যেন খালি খালি ঠেকে, কী যেন নাই কী যেন নাই। নদীও যেন চলতে গিয়ে ক্লান্ত বোধ করে, সামনেই সমুদ্দুর যেন তার বিশাল বুক নিয়ে ডাকছে আশ্রয় দিতে। নদী আর পারে না, সমুদ্রেই মিশে যায়। তাও অনেক অনেক গভীরে যেখানে সমুদ্রে মধ্যেও এক টুকরো নদী থাকে, সেই খানে নদী অপেক্ষা করে থাকে, একটা পাথুরে রুক্ষ পাহাড়ের।

হাওয়া ছিল এদের দুজনেরই বুজুম ফ্রেন্ড যারে বলে। তা ও খুবই মুচকি মুচকি হেসে আগাগোড়া দেখে গেছে, এবার যখন বুঝলো সময় হয়েছে, পাহাড়কে নিয়ে চলল। একটু একটু করে। পুরো পাহাড় কি আর এক সাথে নিয়ে যাওয়া যায় নাকি, হাওয়া তো আর হনুমান না রে বাবা। তাছাড়া, একই ফর্মে থাকলে তো আবার গন্ডগোল হবে, তোমাকে কিছু পেতে গেলে তার জন্য প্রস্তুত তো হতেই হবে নাকি? এই যে আমি বাউণ্ডুলে মাঠাংবুরু হয়েছি তার জন্য যে আমায় পিঁপড়ে সমাজ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে(মনে হয়), কেউ ভালো চোখে দেখে না আমায় পিঁপড়েদের মধ্যে, এও তো প্রস্তুতিই নাকি? ঘরের টান না কাটলে কি বাইরে বেরোনো যায়?

তাই হাওয়া আস্তে আস্তে ক্ষওয়াতে লাগলো পাহাড়কে, কষ্ট হলো দুজনেরই, কিন্তু আর যে কোনো উপায় নেই! একটু একটু করে হাওয়া সেই ধুলো পাহাড় নিয়ে গিয়ে জমা করলো সমুদ্রের বুকে, অনেক গভীরে।

তারপর একদিন এলো যখন পাহাড় ফের জেগে উঠলো, আগের মতো তার কিছুই নেই প্রায়। একটু খানি মাথা বের করে সে আকাশ দেখে, হাওয়ায় শ্বাস নেয়, পাখিদের গল্প শোনে। আর তার গলা অব্দি জড়িয়ে থাকে সেই নদীটার জল। তোমরা বলবে অত বড় সমুদ্রে সেই নদীটার জল আলাদা হলো কী করে? তা তোমরা মানুষ কিনা এসব বুঝবে না, সব নদী আলাদা হয় হে, মিশে গিয়েও আলাদাই থাকে বুঝলে। যাকগে, আর সেই পাহাড় নদীতে ছোট ছোট লাল নীল মাছ ঘুরে ঘুরে খেলে, লাল হলুদ নীল প্রবাল তাদের বুকে আরাম করে।

নীল মাছের গল্প শেষ হলো, আমি বললাম আমায় ওই পাহাড়ে নিয়ে যাবে? পাতার ভেলায় আমি ঠিক পৌঁছে যাবো, ওরা যদি আমায় মেঘের কাছে পৌঁছে দেয়? 
নীল মাছ রাজী হলো। কিন্তু তারপরের গল্পটা পরে বলব আবার, মহারাজ আমার শুঁড় ধরে টেনেছে মশাই, আমি রেগে গেছি হুহ।

Sunday, April 1, 2018

রবিবার

পান বিড়ির দোকানের বিহারিটার গুমটির নীচের ফোকরে মেয়েটা আর বউটা থাকে, আর উপরে ও। মেয়েটা আগে দোকানের সামনের ড্রেনে হিসি করতো, তারপর একদিন দেখা গেলো টলমল করে নাকে সর্দি আর চোখে জ্যাবড়া কাজল পরে বাবার দোকানে উঠে এসেছে আর এটা সেটায়য় হাত দিচ্ছে। ক্রমে সন্ধ্যেবেলায় বই দেখা গেলো গুমটির নীচের তলায়, বউএর ঘোমটা একটু দূরে হটলো, দোকানের রেডিওটা একই ভাবে পুরোনো নতুন গান শোনায়....

রবিবারের সকাল আর নেই বেলা হয়ে গেছে, মাছওলার হাঁড়িতে এক দুটো মাছ মরে পড়ে আছে, নীল ডুমো মাছি উড়ছে লালচে হয়ে যাওয়া চিংড়ি গুলোয়।মাংসের দোকানে লম্বা লাইন, আনন্দ পালক ছাড়াচ্ছে আর ফাঁকে ফাঁকে চায়ে চুমুক। বাজারের পাশ দিয়ে চলে গেলে একটা গলি পড়ে, কিসের যেন একটা কারখানা আছে, ঘট ঘটাং করে আওয়াজ হয় সারাদিন, পাশেই একটা সদ্য রঙ করা বাড়ি থেকে নাটকের আওয়াজ ভেসে আসছে। একটা মেয়ে অনুযোগ করছে কী যেন আর ছেলেটা গম্ভীর হয়ে কী সব বলছে, এখনো রবিবারের সকালে নাটক হয় আর বাড়িতে এমন গমগম করে সে নাটক চলে?
দুটো বিড়াল ছানা বাড়িটার গেটের গ্রিলে খেলে বেড়াচ্ছে, আমি দিন কতক আগেও দেখেছি এসে এ বাড়িতে আওয়াজ ছিলো না, প্রাণ ছিলো না তেমন, বিড়াল ছানা দুটো ঠিক টের পেয়েছে বাড়িটা জেগে উঠেছে ঘুম ভেঙে।

একেকদিন হয় বড় তীব্র বড় অস্থির। সব কিছু ভেঙে চুরে ফেলে দিয়ে এগিয়ে যেতে ইচ্ছে করে পিছুটানহীন হয়ে। ছেলেটার ফতুয়ার বোতাম খোলা, পদক্ষেপ এলোমেলো, যেন রাস্তায় কী আছে তার জানার দরকার নেই, কোথায় যাচ্ছে বাজারে না এটিএমে খোঁজ রাখার ফুরসত নেই।
-ফুলগাছ আছেএএএ.....
ভ্যানে করে গাছ নিয়ে বুড়ো লোকটা হাঁক দিয়ে যায়। সম্মোহিতের মতো ছেলেটা এগিয়ে যায়, গাছের পাতায় আলতো হাত দেয়।

তারপর দেখা যায়, উদভ্রান্ত ভাব সরে গিয়ে স্বপ্ন স্বপ্ন চোখে শ্যাওলা পরা একটা বেলফুলের টব বুকের মধ্যে নিয়ে ছেলেটা বাড়ি ফিরছে। বাজার থেকে তার কী কী নেওয়ার ছিলো ভুলে গেছে সে, তার বাড়ির লোকে জানে সে ভেটকি মাছ আনতে গিয়ে ফুল গাছ এনে ফেলে সে এমন। বাড়িতে ঢুকে বারান্দায় আগের বেল ফুলের গাছটায় নতুনটাকে ছুঁইয়ে দিয়ে বলে এই দেখ তুই একা না আরেক জন আছে, কদিন খেয়াল রাখতে পারবো জানিনা...তুই তোর মতো করে ফুল ফোটাস.....

Friday, March 30, 2018

পথের প্রান্তে ওই সুদূর গাঁয়ে...

 প্রজেক্টের চাপে চেপ্টে যাচ্ছি অবস্থা, রোজ সাড়ে দশটায় অফিস ঢুকছি আর রাতে ফিরে শুতে যাচ্ছি দুটোর পর, শনিবারেও অফিস আছে কিন্তু ওই 'খেয়াল পোকা যখন আমার মাথায় নড়ে চড়ে, আমার তাসের ঘরের বসতি এ ওমনি ভেঙে পড়ে'.....মার্চ মাসে রেটিং ব্যান্ড এর তোয়াক্কা না করেই ম্যানেজারের সাথে বাওয়াল করে বেরিয়ে গেছি।
অনেকদিন পর ড্রাইভারের বদলে খালাসী, বড় উঁচু নন এসি গাড়িতে মজা হলো হাওয়া খুব লাগবে কিন্তু বিরক্ত করবে না। পানাগড় অব্দি রাস্তার দুপাশ চোখ জুড়ানো,দূরে দূরে খেজুর গাছ, একটা মেঠো রাস্তায় হঠাৎ কুঁড়েঘর, সবুজ ধানের ক্ষেতে জল সেঁচা চলছে, একটা গরুর পিঠে বক বসে আরাম করছে...হু হু করে ছিটকে আসছে হাওয়া, পিছনের সিটের কথাবার্তা।

রুক্ষ পাথর ছড়ানো ছিটোনো টিলার থেকে একটু উঁচু এই পাহাড় গুলো বড় ভালো লাগে। জঙ্গল আছে, গাছ পালা ছাওয়া রাস্তা তবুও মোলায়েম না বলেই রুক্ষতা এসে যায়। শাল, মহুয়া, হরতুকি আরো কি কি যেন গাছের জঙ্গল। পলাশ আছে তবে পাহাড়টায় না, পাহাড়ের কোলে। দুপুরের রোদে সবাই জিরিয়ে নিচ্ছে, ড্যামের জলে চান সারছে কেউ কেউ। এ রোদে টইটই করতে হলে ভালো ছিট দরকার। দলের বাকিরা ঘুমোতে গেলো, দৈ আরো সরেস ও নাকি এসব ছোট পাহাড়ে এনার্জি ইনভেস্ট করে না! আমি আর সৌরভ পাহাড়টায় ওঠা শুরু করলাম। বড়ন্তি পাহাড় একেবারেই অকৌলিন। তেমন তেমন পাহাড় চড়িয়েদের কাছে, একে পাহাড় বললে হয়তো মেরেই দেবে। কিন্তু আমাদের কাছে এইই কম না, রাস্তা নেই, কারণ পাহাড় চূড়ায় কিছু নেই, বড় বড় পাথর টপকে টপকে যাচ্ছি, কাঁটা গাছও আছে অনেক, একটা মাছি সমানে ভোঁ ভোঁ করে তার প্রতিবাদ জানিয়ে চলেছে, "কেন হে দু পেয়ের দল এদিকে কি, বিরক্ত কোরোনা বাপু ইত্যাদি বলে"।

বাতাসে গরমকালের গন্ধ। গরমকালের গন্ধ মানে রোদের তাতে চারদিকটা শুকনো হাওয়া দেবে, ঝিম ধরা দুপুরে দূরের থেকে ঘু ঘু ডাকবে, পাগলা কোকিলটা ডেকেই যাবে ডেকেই যাবে....আর মন টন কেমন একটা এলোমেলো হয়ে যাবে। এইখানে গাছে উই ধরেছে খুব। এদিক ওদিক উইএর গর্ত না সাপের জানিনা। একটা গিরগিটি লাল লাল মাতাল চোখে টহলে বেরিয়েছে। একটা পাথরে ঝুলে ঝুলে মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স করছে দেখি ব্যাটা, গা টা পাথর রঙের।

পাহাড় যারা চড়ে, পথ যারা ভালোবাসে তারা জানে গন্তব্য জরুরী খুব জরুরী কিন্তু পথের মজাটাই আসল। অন্তত আমি তাই বুঝি, ওই পাহাড় চড়বই টার্গেট নিয়ে ছুটে ছুটে চলে যাবার থেকে এই যে মাঝ পথে বসে বসে জঙ্গলের নিস্তব্ধতা বুকের মধ্যে পুরে নিচ্ছি এইটাই চেয়েছি আমি বরাবর। আমার এই ঘর ছেড়ে পালাবার নেশা, ঘর না বাঁধার নেশা এ সব কোনো এক গরমকালের দুপুরই ঢুকিয়ে দিয়েছিলো বুকের মাঝে, সেই থেকেই আর ঘরে মন টেকে না।

বসে থেকে থেকে ঘুম এসে যাচ্ছিলো, এমন গাছের নীচে, পাথরের উপর আরাম করে ঘুমাবার জো নেই, শোয়ার মতো উপযুক্ত নয় পাথরগুলো। খানিকক্ষণ বসে থেকে ফের মচমচ শব্দ তুলে নেমে এলাম, বাঁধের ওদিকে একটা রাস্তা চলে গেছে কোথায় যেন। কাল আসার পথে দামোদরের ধারে নেমেছিলাম।ভুল করেই আঘাটায় নেমে গেছিলাম। শ্মশানঘাট আসলে। নদীর ধারে ইতস্তত প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া জামা কাপড়, নদীর জলে পাড়ের কাছেই আর্ধেক গল্পেই ফুরয়ে যাওয়া ভাঙা চুড়ি, ভাঙা মালসা। মন খারাপ হয়না, সে হয়তো দলবল মিলে গেছি বলেই, কিন্তু মনটা ভারী কেমন একরকম হয়ে যায়। লাল এই চুড়িখানা হয়তো কোনো একদিন ভাতের হাঁড়ির সামনে বসে গুনগুন করে অপেক্ষা করতো, আজ শান্ত হয়ে জলের নীচে শুয়ে, মন খারাপ করে চুড়ির?

বাঁধের ওই পার থেকে সুর্যাস্ত ভালো দেখা যায় নাকি, আমরা ওই দিকে হাঁটা দিলাম, রোদের তেজ কমেছে একটু। স্থানীয় একজন আধবুড়ি মহিলা, মাথায় গোবর সারের ঝাঁকা নিয়ে হনহন করে যাচ্ছে। আমার যেমন স্বভাব, গিয়ে আলাপ শুরু করেছি। কোথায় যাচ্ছে, কতদূরে ওর বাড়ি, ক্ষেতে যে সবজি ফলিয়েছ তা পাখিতে খেয়ে নেয় কিনা এইসব। সেও আমায় জিজ্ঞেস করে, কোথায় বাড়ি কোথায় উঠেছি। কথার পিঠেই জিজ্ঞেস করে, আমাদের ওদিকে "দমে" পাখি কিনা। দমে কথাটা কতরকম প্রয়োগ রে বাবা, দমে রান্না বসানো, দম থাকা, আচ্ছা দমদম মানে কি খুব করে দম দেওয়া জায়গা?

ওদিকে পাশের কয়লা খাদান থেকে নিয়ে আসা কয়লার বস্তা নিয়ে আসা লোকগুলো স্নান করতে নেমেছে বাঁধের জলে। সাইকেলগুলো দাঁড় করিয়ে রেখে দিয়েছে। বিকেল বেলার ঠান্ডা আরামের হাওয়া মেখে মেখে উদোম গায়ে খুব সাবান মেখে মেখে চান করছে। ভারী হিংসে হয় দেখলে, শহুরে আমি কোনোদিন এরকম আড়ালহীন হয়ে, নিঃসঙ্কোচ হয়ে চান করতে পারবো বলে মনে হয় না। এরপর নিশ্চয়ই এরা চান বাড়িতে যাবে নাকি চোলাই মদের দোকানে, এদের মধ্যে বাঁশী বাজিয়ে কেউ আছে কি?

এ জায়গাটা আজকাল লোকজনের আনাগোনা বেড়ে গেছে, একটু দূরে তফাতে বসেছিলাম। এই জায়গাটায় লোক নামেনা জলে, তাই পাথরগুলো শ্যাওলা জমে মখমলের চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছে। চুপ করে পা ডুবিয়ে বসে আছি, তিরতির করে জল কাঁপছে, কলকে ফুলের গাছটা জল ছুঁয়ে শুয়ে আরাম করছে। এহ আমি রাজা হলে এখানে ঠিক একখান হাওয়ামহল বানাতাম। আমার সবচেয়ে প্রিয় সাদা আর কালো ঘোড়ার মধ্যে একেকবার একেক ঘোড়া নিতাম। মন যখন বেশ উড়িয়ে ফুরিয়ে দেবার মতো টগবগে তখন কালো ঘোড়া খানা নিতাম আর যখন উদাস হয়ে বাঁশী বাজাতে ইচ্ছে করতো রাজবেশ ছেড়ে তখন সাদা ঘোড়া ছুটিয়ে চলে আসতাম। তারপর একদিন ঘোড়া না থামিয়ে চলে যেতাম অচেনা কোনো জায়গায়, রাজার সাজ ফেলে বেশ একটা অচেনা জায়গায়।

অনেক অনেক্ষন পর, লোকজনওলা জায়গাটায় গিয়ে দেখি,সৌরভ মনে সুখে ছবি তুলে বেড়াচ্ছে আর চারদিকে কাচ্চা বাচ্চা মিলিয়ে সরগরম হয়ে গেছে জায়গাটা। বেজায় আইস্ক্রীম খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। পকেটে ওয়ালেট নেই, ফোন, ক্যামেরাও নেই যে বন্দক রেখে আইস্ক্রীম খাবো। সৌরভের কাছেও নাই, সুতরাং ফের বাঁধের জলে পা ডুবিয়ে ছোট ছোট মাছ গুলোকে পায়ে ঠুকরোতে দেওয়া গেলো। আস্তে আস্তে সূর্য্য লাল টুকটুকে হয়ে গেলো আর টুপ করে ডুবে গেলো, আর তেনার পিছনে দুখানা মেঘ আড়াল পেয়েই পরস্পরকে চুমু টুমু খেয়ে একেবারে একককার করে দিলো।

দলের বাকিরা আসার পর যা হয়, ঠাট্টাতামাশা করতে করতে, অন্ধকার নেমে এলো। দলবেঁধে বাঁধের পারে হাঁটতে শুরু করেছি। ওদিকে একফালি চাঁদ উঠেছে আকাশে, তারা ফুটতে শুরু করেছে, বাঁধের জলে ঠান্ডা হয়ে হাওয়াটাও রুক্ষতা হারিয়ে ফেলেছে বেশ। আমি দলছুট হয়ে এগিয়ে গেছি খানিক, পিছনের হাসাহাসির টুকরো, দূর থেকে ভেসে আসা মাইকের আওয়াজ, সব জড়িয়ে মড়িয়ে একটা অবয়ব তৈরী হয়েছে। সাইকেলে চলে যাওয়া লোক, সোলার আলোর আবছায়া, ঝিঁঝির ডাক সব যেন সে অবয়বের অংশ।

ফিরতি পথে সৌরভ রিমা অমিতা আমি একসাথে, গান,আড্ডা, ইয়ার্কি সবই হচ্ছে কিন্তু তবু যেন আমি কিছু ছুঁতে পারছি না, এ সব থেকে আলাদা হয়ে পাহাড়খানা চুপটি করে দাঁড়িতে আছে, ওই খানে মনে হচ্ছে যাই। ছায়া ছায়া পাহাড়, চাঁদের আলো ওইখানটা অন্য ডাইমেনশন মনে হচ্ছে যেন কারা কথা বলে চলেছে ফিসফিসিয়ে আমরা গেলেই চুপ করে যায় তারা।
জনা সাতেক ছেলে মেয়ে একসাথে হলে যা হয় আর কি, তারমধ্যে ওরা সবাই বহুদিনের পুরোনো বন্ধু, খুব আড্ডা খুব ফুক্কুড়ি হচ্ছে। দ্বৈপায়ন আসর জমিয়ে দিতে পারে মোটামুটি। আমার অভ্যেসেই আমি একলা হয়ে যাই ফের, সন্ধ্যেবেলার চাঁদের আলো বুকের মধ্যে ঢুকে গেছে, এ বিশালের সামনে কিরম পালাই পালি মন করে। ছাদে গিয়ে দেখি দিব্যি চমৎকার হাওয়া দিচ্ছে, আকাশে তারা ফুটে গেছে, সামনে পাহাড়টা অন্ধকারে গম্ভীর ভাবে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে যেন। দীর্ঘদিন আগে কলোরাডোতে থাকতে এরকম রাত বিরেতে আমি সৌরভদা শাওন মিলে হাইক করতে যেতাম। দূরে ডেনভার শহরের আলো দেখা যেত, আর কমলা রঙের চাঁদ ভাসিয়ে দিতো। রঞ্জনপ্রসাদ গাইছেন, "পথের প্রান্তে ওই সুদূর গাঁয়ে যেথা ভ্রমর থমকে থাকে নদীর ছায়....মোর পথ চেয়ে আজও সেই মেয়ে বুঝি স্বপ্নজাল বোনে গান গেয়ে"। মেয়েটা কতদিন ধরে সন্ধ্যেবেলা আলো জ্বালিয়ে অপেক্ষা করেছে রাতে একসাথে বসে দুটো খাবে, গল্প শোনাবে খুব ছেলেটা মনগড়া বীরত্বের কিংবা সত্যিকারের। হয়তো ওই যে বাঁধের গায়ে যে গ্রামটা আছে ওখানেই, কয়লা খাদানে কাজ করতে যাওয়া ছেলেটার জন্য বসে আছে। আচ্ছা আকশে ওই তারাটা কি ধ্রুবতারা? আমার নিজেকে ভারী অন্ধ মনে হয়, গাছ চিনিনা, পাখি চিনিনা, তারা চিনিনা।

একটু পরেই হইহই করে সবাই চলে এলো, 'এই ছেলেটা কি রে, এখানে চলে এসেছিস আমরা ভাবছি কোথায় গেলি'। গান আড্ডা চলতে থাকে....পাহাড়টা কাল চড়তে হবে।
মেয়েগুলো পাশের ঘরে আমরা চারজন একটা ঘরে। দ্বৈপায়ন আর দেবরাজ দুপুরে ঘুমিয়ে নিয়েছে, সুতরাং মাথায় তাদের পোকা নড়েছে। আলো টালো নিভিয়ে মেয়েদের ঘরে জানলায় টোকা মেরে পালিয়ে আসছে। এরা সব কটা কলেজের বন্ধু, আমার কলেজের বন্ধুরা মিলেও এরকম হুল্লোড় করতুম। আর অদ্ভুত কপাল মেয়ে তিনটের, তিনজনেই বেজায় ভীতু, ভূতের ভয়ে অমিতা তো এমনই চেঁচিয়েছে ম্যানেজার এসে হাজির!!

সৌরভটা আবার নাক ডাকে ছন্দে। মানে একবার খানিক পেল্লায় জোরে হচ্ছে, আমি ভাবছি আচ্ছা এটাতেই অভ্যস্ত হয়ে যাই,শালা একটু পরে দেখি থেমে গেছে, আবার খানিক পর আবার শুরু! বাঁদরটার নাকে পাথর আটকে শুলেও হয়!
সকালটা ভারী সুন্দর এখানে, পলাশ ফুলের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের কোলে সকাল, একটা মোষের গাড়ি যাচ্ছে, মহুয়া ফল কুড়োতে গেছে লোকটা। আমার সেই কবে থেকে লালটেম হবার সাধ, মোষের পিঠে চড়ে নদীর ধারে ঘুরে বেড়াবো, শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখতে দেখতে বাঁশী বাজাবো....বাঁশী আমি বাজাতে পারিনা, গান গাইলে ভূমিকম্প থেকে সুনামী সব হয়, তাও মোষের গাড়ি দেখে রোজ ট্যাগ ঝুলিয়ে চৌখুপীতে স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে থাকা লোকটা আর পারলো না, ধড়াচুড়ো ছেড়ে ছোট ছেলের মতো হাপ্প্যানুল আর গেঞ্জি পরে মোষের পিঠে চড়ে বসলো।

মোষটা খুবই প্রতিবাদ জানালো লেজ ঝাপ্টা দিয়ে, 'এভাবে হয়না মশাই, দুম করে পিঠে উঠে বসলে যে? ইয়ার্কি পায়া? আমার পিঠ চুল্কায় না নাকি'? তার প্রতিবাদকে মেনে নিয়ে নেমে এলাম, থাক বাবা, এক্ষুনি পিঠ ঝাঁকিয়ে ফেলে দিলেই চিত্তির।ওদিকে রোদও চড়া হয়ে যাচ্ছে।পাহাড়ে যাবো, রিমা আর সৌরভ সঙ্গী হলো। 
পাহাড়ের এদিকটায় রাস্তা একেবারেই নেই, পাথর টপকাতে ভারী আরাম লাগে, সকালবেলায় পাখির কিচিরমিচির এ পাহাড়টা সরগরম। আস্তে ধীরে করে উঠতে উঠতে মাঝ পথে গিয়ে সৌরভ হাল ছেড়ে দিলো, যা ভাই তোরা, আর হবে না। রিমার জুতোটা একটু গোলমেলে, পাথর চড়ার উপযুক্ত না ঠিক, তা পাথর তো কেউই জুতোয় ডিঙোয়না, ইচ্ছের উপরেই সব। সুতরাং ওঠাই সাব্যস্ত হলো। একেকজায়গায় পাথরগুলো এমন খাড়াই মনে হচ্ছে হবে না, কাছে গেলে অবশ্য ঠিক ডিঙোনোর রাস্তা মিলে যাচ্ছে। আমাদের সব রাস্তাই আসলে তাই, দূর থেকে মনে হয় এ বুঝি আর পারবো না, কাছে গেলে এক দু পা করে কিরকম করে যেন ঠিক হয়ে যায়।

প্রতিটা ধাপ পেরিয়ে ভাবছি আর উঠবোনা, জাস্ট পরের ধাপ টুকু, আসলে এ এক নেশার মতো, উপরে ওঠার নেশা চূড়ায় পৌঁছনোর নেশা বড় তীব্র। তাছাড়া হাইক করতে আলাদা একটা আনন্দ হয় ও ঠিক বোঝানো যাবে না, ফাঁদ সরিয়ে কাঁটা গাছে ঠোকর খেয়ে, ধুলো মেখে, পা স্লিপ করে এগিয়ে যেতে যেতে পাখির ডাক, গাছের ছায়া জড়িয়ে রাখে। 
উঠেই পড়লাম শেষতক। পাহাড়টার এই দিকের ঢালটা একটু বেশী রুক্ষ গম্ভীর, ওই দিকটা বেশী সবুজ। আরে তাই এতো চেনা লাগছিলো, পাহাড়টা আসলে আমার মতোই। নীচ থেকে স্পীকারের আওয়াজ আসছে। বিরক্ত করছে। এরা কেন বোঝে না, এরকম দমাদ্দম করে গান চালালে পাহাড়, আকাশ, হাওয়া, পাখি কেউ আর কথা বলে না!!

নীচে নেমে এসেছি, একটা বুড়ি লগা দিয়ে বটপাতা পাড়ছে ছাগলকে দেবে বলে। আমি হাত লাগিয়ে দিলাম, প্রথমে আমায় দেখে কনফিডেন্স পাচ্ছিলো না কিন্তু তারপর একটা ছোট ডাল সমেত ভেঙে দিতে ভরসা পেলো। আমাকে মহুয়া গাছ চিনিয়ে দিলো, হরতুকি গাছও। একটু এগিয়ে গেছি অমনি দেখি হরতুকি গাছটা মাথা নেড়ে একটা হরতুকি গিফট করলো। আমি চাইনি সত্যি কিন্তু ভালোবাসা অগ্রাহ্য করতে এ শর্মা পারেন কই,ঝুলি ভরে মাধুকরী করে দিন কাটে, গাছ, মানুষ সব্বার ভালোবাসা নিয়ে পথ চলি। পকেট আমার বোঝাই হয়ে যায়, ভালোবাসতে শিখলে একদিন সব ফিরিয়ে দেবো খন,ততদিন অব্দি নিয়ে যাই,ফেলে ছড়িয়ে চলতে থাকি...

মাইথনে ভাণ্ডারী পাহাড় বলে একটা এরম ছোট টিলা গোছের পাহাড় আছে যার উপর একটা শিবমন্দির আছে। উপর থেকে নীচের ড্যামটা চমৎকার। পুরোহিত লোকটা সকালে এসে পুজো করে রেঁধে বেড়ে খায় আবার বিকেলে নেমে যায়। আমায় এমন একটা কাজ দিলে আমি পারতাম না মনে হয়। একা লাগার থেকেও বেশী, বোরিং লাগতো। অবশ্য আমি নাস্তিক তাই হয়তো মনে হচ্ছে, এই যদি এ পাহাড়ে কেউ না উঠতো, পুজোর ছলে বিরক্ত করতে, পথ ভুলে দু একজন ছাড়া, নীচে কোল ঘেঁষে এক নদী থাকতো শুয়ে, তাহলে হয়তো আমি থেকে যেতাম কিছুদিন। 
একটু আগে আমরা দল বেঁধে নৌকো চড়ে ছোট্ট চড়াটায় গেছিলাম ড্যামের মধ্যে, সেখানে সকলে মিলে আড্ডা হইহই খিল্লি সব করেছি, সেও মন্দ না, আবার একা একা মুখ বাড়িতে গাড়ি থেকে ফাঁকা হাইওয়ে দেখাও মন্দ না আরকি। গাড়িতে সকলে মিলে ফুক্কুড়ি করা এর ওর ঠ্যাং টানা, করতে করতে দেখি বর্ধমানের কাছে ঝড় এলো। রাস্তায় ঝড় দেখা এক অদ্ভুত জিনিস, একটু একটু করে মেঘ জমে দুম করে অন্ধকার, তারপর ধুলোর ঝড়, ক্রমে সব কিছু উড়িয়ে দেবার নেশা থামলে স্যারেন্ডার করে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। গাড়ির কাচ ঝাপসা হয়ে আসে ক্রমে, অন্ধকারের বুক চিড়ে করক্কড়াৎ বিদ্যুৎ এর ঝলকানি, কিছুই প্রায় দেখতে পাচ্ছি না কিন্তু গাড়ি থামাবার উপায় নেই, শো মাস্ট গো অন না হলেই অন্য কেউ না দেখতে পায়ে মেরে দিয়ে যাবে, সুতরাং চলতে থাকো। বাকিরা ভয় পাবে বলে বলছিনা কিছু, কিন্তু নিজে গাড়ি চালাই বলেই জানি এও মুহূর্ত টা কতটা চাপের, কিন্তু নির্মলদা দক্ষ চালক, সে এমনিতে ফুক্কুড়ি করে, "আমার আঙুল হাতে কাঁধে তুমি লেগে আছো" চললে বলে যা গিয়ে হাত ধুয়ে আয় কিন্তু রাস্তা থেকে এক বারও চোখ ফেরায় না।
আমার বড় ভালো লাগছে, কি জানি কেন যে কোনো বিপজ্জনকের নেশা দিনে দিনে পেয়ে বসছে। রুদ্ররূপ প্রকৃতি দেখতে মজা লাগে বেশ, এই সগর্জন রোষ একটু পর সব শান্ত যেন কিছুই হয়নি।

তারপর আর কি সব পথের শেষে সেই ঘর, হিসেব, অফিস, একদিন কি আসবেই না আর ফিরবো না ঘর, হাজার খেলানাবাটির লোভেও?

তদ্দিনের জন্য এরকম পালাই পালাই খেলাই চলুক....

Thursday, February 22, 2018

গুটুল আর বিল্বপত্রের অভিযান

মাঠাংবুরুর মন ভালো নেই, গল্প শুনতে গেছিলাম, রাবড়ির ভাঁড় নিয়ে, রাবড়িটা চুকচুক খেয়ে খ্যাঁকম্যাক করে উঠলো। মন ভালো না থাকলেই ব্যাটা এমন খিটখিটে হয়ে যায়। তাই আর ঘাঁটালাম না, কি জানি হয়তো কাজ করেনি বলে হোমরা চোমরা পিঁপড়েদের থেকে ঝাড় খেয়েছে কিংবা হয়তো পিঁপড়েনি পাত্তা দেয়নি....জানিনা, মন ভালো হলে, যদি গল্প শোনায় শোনাবো আবার। তবতককে লিয়ে বিল্বপত্র কে মনে আছে তো আর গুটুলকে? মনে না থাকলেও সমস্যা নেই, লিংক পেলে দিয়ে দেবো কমেন্টে। তার একটা গল্প দিলাম

****************************
বিল্বপত্র আর গুটুলের বন্ধুত্ব বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে গুটুলকে সাঁই করে বিরাট লম্বা কোনো বিল্ডিংএর টঙে উঠিয়ে নিয়ে যায় বিল্বপত্র। কার্নিশে আরাম করে বসে গুটুলের আনা আইস্ক্রীম খায় দুজনে। এমনিতে গুটুল খুবই ভীতু, এত বড় বাড়ির ছাদের কার্ণিশে বসা তো তো দূর ভাবতে গেলেই সে অজ্ঞান হয়ে যাবে, নেহাত ভুতুড়ে শক্তি ছিলো তাই। ওদিকে ভূতেরা আবার এই সব কাবাব, তন্দুরি এসবের স্বাদ জানে না, লুচি সন্দেশ যৎসামান্য জানে, আইস্ক্রীম জানেনা আবার। জানবে কি করে ভূত হয়, কিছু মরে বা দুজন ভূতের বিয়ে হয়ে বাচ্ছা হয়ে। তা কাবাব তো মুরগি ইত্যাদি মরেই হয়, তারা তাই আর ভূত হয়না, সোজা কাবাব জন্ম নেয়। তা দুজন বসে বসে খুব খানিক সুখ দুঃখের কথা হয়, বাড়িতে তো সব সময় পড়াশোনা করতে বলা, না খেলা ইত্যাদি তো আছেই। আজকাল গুটুলকে ভূত বলে আর বিল্বপত্র কে মানুষ বললে ওরা রেগে যাচ্ছেনা তাই ওদের বাবা মা দের রাগ বেড়ে যাচ্ছে। একথা কে না জানে, কাউকে রাগানোর সহজ উপায় তার রাগের কথায় রাগ না করা। মারামারিও হয় মাঝে মাঝে, ভূত ভালো না মানুষ সে নিয়ে। কিন্তু সে নেহাতি মাঝে মাঝে, ঝগড়া হয় মারামারি হয় আবার ফের দুজন গলায়গলায় হয়ে খেলে গল্প করে নানান রকম জিনিস নিয়ে পরীক্ষা করে। এই যেমন মশাদের শীত করে কিনা এটা তো খুবই দরকারী প্রশ্ন।

বিল্বপত্রদের পাড়ায় খুব একটা মশা ভূত নেই। ওরা মশাভূতদের আলাদা একটা জায়গা করে দিয়েছে আর সেখানে একটা জায়ান্ট স্ক্রীনে সব সময় কার্টুন চলে, এক্স বক্স আছে গেমস এর জন্য। আর খাবার দাবার হিসেবে রক্তের বদলে কচুপাতার রস এর ব্যাবস্থা করা আছে। কার্টুন আর গেমসে ডুবে থাকায় মশা ভূতেরা খেয়ালই করেনা কচুপাতার রস খাচ্ছে না রক্ত। ফলে ভূতেদের মশার বিনবিন সইতে হয়না। কিন্তু গুটুল কে করতে হয় আর বেঁচে থাকা অবস্থায় মশা গুলো অমন ভদ্র মোটেও না, কচুপাতার রস ছুঁয়েও দেখবে না। যাই হোক তা সেদিন তারা দেখতে চাইছিলো মশার শীত করে কিনা। তা পরীক্ষা করতে গেলে একটু আশেপাশে বাবা মা দাদা দিদিদের সাহায্য লাগে। গুটুলের বাড়ির লোক এসব যুগান্তকারী জিনিস তো বুঝবেই না উলটে বিল্বপত্রকে দেখতে না পেয়ে ভাব্বে গুটুল বেশি কার্টুন দেখে দেখে হয়ত পাগল হয়ে গেছে। ধরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে নয়ত অংক করতে বসিয়ে দেবে। তাই সেদিন রাত্তিরে সবাই ঘুমানোর পর একটা আইস কিউব বের করে গ্লাসে নিয়ে, কয়েলের ধোঁয়ার নেতিয়ে পরা সন্ধ্যেবেলা ধরে রাখা মশাটাকে যেটাকে সে না মেরে রেখে দিয়েছিলো সে মশাটার সাথে রাখলো। দেখা যাক সর্দি লাগে কিনা, হাঁচি হয় কিনা। তা সাথে সাথে তো হবে না এদিকে বরফ হলে জল হয়ে গেলে মশা আবার জলে ডুবে মরবে। উপায়? গ্লাসের উপর একটা ছাঁকনিতে আইস কিউব আর তার পাশে একটা কাগজের টুকরোয় মশাটা রেখে দিলো। আইস কিউবে শোয়ালে এম্নিই মরে যাবে, মর্গ এ এভাবেই মানুষ কে রাখে গুটুল দেখেছে টিভিতে। তা এই সব ব্যবস্থা করে গ্লাসটা খাটের তলায় রেখে দিয়েছিলো। বিল্বপত্রকে বলা ছিলো খেয়াল রাখতে। তা রাতে কোনো ঝামেলা হয়নি, মশাটা খুব বেশী জ্বালায়ওনি। সক্কালবেলা গৌরীমাসী ঘর মুছতে গিয়ে নিজেই না দেখে সব উল্টালো, গ্লাস ভাঙলো উলটে এমন চেঁচামেচি করলো যেন সব দোষ গুটুলের। গুটুলের নাকি যত আজেবাজে দিকে বুদ্দি, ও নাকি বড় হয়ে গরু হবে, নাহলে চা এর দোকানের বয় হবে। হবে তো হবে গরু হওয়া কি এমন খারাপ, ঘাস খেতে খারাপ অবশ্য কিন্তু পড়াশোনা করতে হয়না কেমন, বকুনি দেয় না কেউ। আর চায়ের দোকানের বয় হলে তো সবচে ভালো, যত ইচ্ছে চা খাওয়া যাবে, মা তো ওকে খালি এক ফোঁটা চা দেয় তাও এক কাপ দুধের মধ্যে। সেদিন বিকেলে খেলতে যাচ্ছি বলে বেরিয়ে একটা গাছের ডালে শুয়ে শুয়ে বিল্বপত্রের সাথে এই সব দুঃখের কথাই হচ্ছিলো। 'নাহঃ এ পরাধীন জীবন আর ভাল্লাগেনা, চল বিল্বপত্র পালিয়ে যাই যাবি? '

তা বিল্বপত্রও খুব ভালো নেই, ভূতের মতো ভূত হতে হবে সারাক্ষণ এ নিয়ে শুনতে শুনতে ও বিরক্ত। কি হবে ভালো ভূত হয়ে? মানুষদের মধ্যে লড়াই লাগাতে হবে, নইলে ভুল বিশ্বাস চালিয়ে দিতে হবে এই তো? সব মানুষ কি খারাপ? যদি লড়াই এ তার বন্ধু গুটুলও মারা যায়? না না সে খুব খারাপ হবে, মরে গেলেই তো আর ভূত হবেই এমন নিশ্চয়তা নেই, তাছাড়া ওদের অঞ্চলেই আসবে তারও মানে নেই। হতেই পারে গুটুল মরে গিয়ে কোন দূর পাহাড়ের নীল ঘাসফুল হলো তাহলে সে কার সাথে খেলবে কার সাথে গল্প করবে কার থেকে গল্প শুনবে। না না লড়াই ভালো না, সে ভালো ভূত হতে চায়না।
বিল্বপত্র এসব ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলো। 
'কিরে যাবিনা' - গুটুলের কথায় চমক ভাঙলো। 'হ্যাঁ রে যাবো, চল চলেই যাই। কোথায় যাওয়া যায় বলত? আমার ইচ্ছে বেশ মানস সরোবর যাবো, নীল জল আছে শুনেছি, যাবি'?
'মানস সরোবর? কোথায় সেটা? তিব্বতে হলে সোজা আমি বইতে পড়েছি, রাণাঘাট তারপরেই তিব্বত। চল কালকেই যাই।'
ব্যাস যাই মানে যাই। নেবার মতো অনেক জিনিস আছে বটে কিন্তু সব নিয়ে তো আর পালানো যায় না, তাই গুটুল একটা কাগজ কাটার ছুরি, জলের বোতল, আর জমানো একশো টাকা নিয়ে বেরিয়ে পরলো। বিল্বপত্র মানুষ এর মতো সেজে থাকে যাতে বেশী কথা না ওঠে। আসলে অদৃশ্য হওয়া অবস্থায় গুটুলের সাথে গল্প করলে আবার লোকের মাথা খারাপ হবার জোগার হবে কিনা। সত্যি বলতে কি গুটুলের একটু একটু মন খারাপ করছিলো মায়ের জন্য কিন্তু নাহ এই ভাবে সে আর থাকবে না। ঘুরে বেরিয়েই দিন কাটাবে। বিল্বপত্র ভাবছিলো তাকে না দেখে বাকি ভূতেদের কি অবস্থা হবে। আসলে ভূতেরা ভারী নিয়মনিষ্ঠ হয়, খুব নিয়ম মেনে চলে বলেই মাঝে মাঝে কোনো কোনো মানুষ এর সাথে ভূতেদের গোলমাল হয়ে যায়। তাই কাউকে কিছু না বলে এরকম নেই হয়ে যাওয়াটা ভূত সমাজে আলোড়ন ফেলবে। ভেবেই বিল্বপত্রের হাসি পাচ্ছিলো। 
-হ্যাঁ রে কোন ট্রেনে উঠবো? নাকি হেঁটে হেঁটেই যাবো? 
- চল না ওই যে ঝিলটা দেখেছিলাম না সেই যে রে সেবার তোকে নিয়ে গেলাম বট গাছের ডালে, মনে পড়েছে? ওই ঝিলের ধারে যাই চল। ওখানে বটগাছকাকাকে জিজ্ঞেস করে দেখা যাবে। কিছু জানে কিনা।
দুজন হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলো। গুটুলের এর মধ্যেই খিদে পেয়ে গেছে। 
- হ্যাঁ রে এই পুকুর থেকে একটা মাছ ধরতে পারবি না তুই?
- না রে ধরতে পারবো না, তবে তুই ধরলে আমি গ্রিল্ড ফিশ বানাবার ব্যাবস্থা করে দিতে পারি। 
- কেন ভূতেদের মাছ ধরা মানা? 
আহা তা না, কিন্তু জানিসই তো ভূতেরা খালি মাছ ভূতই ধরতে পারে, তুই কি আর মাছ ভূত খাবি? উদাস মুখে একটা কলকে ফুলের মধু খেতে খেতে বলল বিল্বপত্র।
'হ্যাঁ হ্যাঁ তোর যত্ত বাহানা, আসলে ঘেঁচুর মাথা পারিস তুই।' খিদেতে গুটুলের মেজাজ ভয়ানক খারাপ হয়ে গেছে তখন। লড়াই এবার লাগলো প্রায়। কিন্তু বিল্বপত্র খুবই ঠান্ডা খুলির ভূত। এদ্দিনের বন্ধুত্ব তো, ও জানে গুটুল একটু পরে নিজেই সরি বলবে শুধুশুধু রাগমাগ করার জন্য। সত্যিই বিল্বপত্র কিই বা করতে পারে, ভূতেরা যদি নিজেদের ইচ্ছেমতো জ্যান্ত মানুষ, প্রাণী, জিনিস ভূত সমাজে আনতে পারতো তাহলে তো ওর গুটুলের সাথে বন্ধুত্ব হবার সেই ঘটনাটাই ঘটতো না।

গুটুল আরো খানিক রাগ করে চেঁচিয়ে নিলো। আসলে খিদে পেলে ও আর কিচ্ছু ভাবতে পারেনা, বাড়ি থেকে চলে আসাটাও মনে হচ্ছে ভুলই করেছে। শেষে খানিক থুম হয়ে বসে একটু জল টল খেয়ে মাথা ঠান্ডা হলো। 
-অ্যাইই বিল্বপত্র, সরি রে আসলে খিদে পেয়েছিলো কিনা খুব। প্লিজ রাগ করিসনা ভাই, আচ্ছা, তোকে আমার রিমোট কন্ট্রোল্ড হেলিকপ্টারটা দিয়ে দেবো। 
-নাহ আমার চাইনা, তুই নে তোর হেলিকপ্টার, আর চল ফিরে যাই, তুই তোর বাড়ি আমি আমার।
-রাগ করিস না রে আর, সত্যিই খুব খিদে পেয়েছে।
-হুঁ আমারো কি আর পায়নি, তাই বলেই তো আর আমি অমন করিনি।
-ভুল হয়ে গেছে ভাই, আর রাগ করিস না। জিজ্ঞেস করনা রে বটকাকাকে কিভাবে যাবো সেসব। 
-হুঁ, জিজ্ঞেস করে নিই দাঁড়া। ও বটকাকা, আমরা মানস সরোবর যাবো। ওখানে নীল পদ্ম ফোটে, সাদা সাদা হাঁস চড়ে বেড়ায়, কস্তুরী হরিণের গন্ধ ভেসে আসে, আমরা ওখানে যাবো। আমাদের এখানে কেউ ভালোবাসেনা, কেউ বোঝে না, ও বটদাদা আমাদের রাস্তাটা বলে দেবে প্লিজ? এই যে আমার বন্ধু গুটুল, ও গুগল করে দেখতে গেছিলো কিন্তু সে ভারী ভজঘট ব্যাপার তুমি সোজা রাস্তা বলে দাও না বটদাদা।

খুব খানিক থম মেরে রইলো চারদিক প্রথমে। তারপর বট হাওয়া হয়ে ওদের দুজনের গায়ে মাথায় বুলিয়ে গেলো, বলল 'যাওয়া তো অনেক ভাবেই যায়,চলতে শুরু করলেই পথ তৈরী হয়ে যায়। বিল্বপত্র ভেসে ভেসেই যেতে পারিস, কিন্তু তাহলে গুটুল যেতে পারবে না, আর দুজন একসাথে যেতে গেলে সহজে যেতে পারবিনা।' 
গুটুল বিল্বপত্র একসাথে বলে উঠলো না বটদাদা আমরা একসাথে যেতে চাই। তা সে যত কষ্ট হোক। 
ফের বটের ঠান্ডা পরশ ভেসে এলো। 'বেশ, তাহলে শোন কঠিন পথ চলতে যাওয়ার আগে নিজেদের তৈরী হতে হতে হয়। এই ধর আমি এতদিন ধরে রয়েছি তা কি এমনি? এই যে আমার শিকড় এতো দূর ছড়িয়ে গেছে এরাই আমায় ধরে রেখেছে। কিন্তু শিকড়টা তো ছড়াতে হয়েছে নাকি? এখন তোদের নিজেদের মধ্যে, পরিবারের মধ্যে শিকড় ছড়ানোর সময়, প্রস্তুতির সময়। নীল পদ্ম, কস্তুরির গন্ধ, সাদা হাঁস, সব তোলা থাকবে। তাছাড়া কি জানিস তো তোদের দেখতে না পেয়ে তোদের বাপ মা এরও কষ্ট হচ্ছে কিন্তু। বড়রা তো বোকা হয় জানিসই, এম্নিতে তোদের অমন করলে কি হবে তোদের না দেখে অস্থির হয়ে পড়েছে এদিকে। তোরা ফিরলে মার খাবি হয়ত কিন্তু এই দেখ আমি দেখাচ্ছি কিরকম কান্নাকাটি করছে সব। 
বটের গায়ে ছবি ফুটে উঠলো, গুটুলের বাবার উদভ্রান্তের মতো অবস্থা, মা এর চোখ কেঁদে কেঁদে ফুলে গেছে। বিল্বপথের বাবার চকচকে সাদা মাথায় কালো কালো চুলের ছাপ দেখা যাচ্ছে, ওর মা এর চোখের লালচে ভাবটা কমে গেছে একদিনে কেমন ফ্যাকাসে মার্কা দেখতে হয়েছে বদলে। দুজনেরই বুকের মধ্যে পাক দিলো। বাড়িতে ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে এক্ষুনি। বটগাছ মুচকি হেসে ছবি বন্ধ করে বলল, যা বললাম মনে রাখিস। ফিরে মার খেলেই এদের বোকামিটা টের পাবি, যারা ভালোবাসাই বোঝাতে পারেনা তাদের উপর রাগ করে আর কি করবি, যা আমি তোদের খেয়াল রাখবো। তোদের মানস সরোবারের ব্যবস্থা ঠিক হবে।

বট কি করে খেয়াল রাখবে তা আর গুটুল জিজ্ঞেস করেনি, ওকে বিল্বপত্র এসব আগেই বলে দিয়েছে, গাছেদের সুপার নেটওয়ার্ক এর কথা। আশেপাশের গাছেরা রিলে করে খবর নিয়ে খবর পাঠাবে। বাড়ির দিকে পা চালালো দ্রুত দুজনে। গুটুলের বাড়ির কাছাকাছি এসে বিল্বপত্র নিজের বাড়ির দিকে গেলো।
ফিরে অবশ্য খুব মার খায়নি, অল্পই বলা যায় সে গুটুল বা বিল্বপত্র কেউই পাত্তা দেয়নি। ওরা বুকের মধ্যে খানিক জায়গা করে নীল পদ্মের গাছ বসিয়েছে, মানস সরোবর যাবার আগে অব্দি ওগুলো ওদের সাথে থাকবে, শিকড় গজিয়ে শক্তপোক্ত হয়েই যাবে ওরা একদিন। যাবেই।

Friday, February 16, 2018

একদিন দলবেঁধে কজনে মিলে

ঠান্ডা পাথরটায় চিৎ হয়ে শুয়েছিলাম। পাহাড়ের নীচের স্পিকারের আওয়াজ এখানে পৌঁছয়না। পাখির ডাক, হাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। শাল একটু গম্ভীর গাছ তাই বেশী কথা বলে না এ জঙ্গল। শুশুনিয়া পাহাড়ের চড়াই খুব বেশী হয়তো না, ফিট লোকেদের কাছে, কিন্তু অনভ্যস্ত শরীর ঘামে ভেজা, পাথরের ঠান্ডাতে, গাছের হাওয়ায় ভালো লাগা ছড়াচ্ছে শরীর জুড়ে।



শুশুনিয়া এতো কাছে তবু যাওয়া হয়নি এতোদিনেও। সুতরাং চল যাওয়া যাক। দল তৈরী হলো এরকম, আমি আমার এক বন্ধু, আমার বন্ধুর এক বন্ধু, বন্ধুর বন্ধুর বন্ধু। বসুধৈব কুটুম্বকম। কে কার পূর্বপরিচিত তার দিয়ে কাজ কি, সাত পা এক সাথে হাঁটলেই তো বন্ধু হয়ে যায় সেখানে একসাথে এতোটা রাস্তা যাবো। অবশ্য সত্যি বলতে আমি এতো কিছু ভাবিইনি, এই বন্ধুর বন্ধু দলটায় এক মাত্র একজনই মেয়ে যাচ্ছে, তার একটু ইয়ে ভাব তো হবেই স্বাভাবিক। আর আমাদের দেশে দুজন ছেলে মেয়ে, প্রেমিক প্রেমিকা ছাড়া অন্য কোনো সম্পর্ক হতে পারে এমন ভাবতেই হোঁচট খায় যেখানে সেখানে তিন তিন খানা ছেলে ও একখানা মেয়ে, তায় আবার সে কারোর প্রেমিকা না স্রেফ বন্ধু। যাক সে সব বাধা অতিক্রম করে আমরা চার জন প্ল্যান করা শুরু করলাম।



বেড়ানো দুরকম হয়, হুট করে আর প্ল্যান করে। আমি দুরকমই ভালোবাসি যদি না আমায় কিছু দায়িত্ব নিয়ে কাজ কম্মো করতে হয়। মানে হোটেল বুক, হ্যানা ত্যানা। তা সৌভাগ্য ক্রমে দলে দু দুখানা দায়িত্ববান ও দায়িত্ববতী পাওয়া গেছে। অমিতা হোটেল বুক করেছে প্রিন্ট আউট নিয়েছে, জলের বোতল নিয়েছে(দুটো নিয়েছে, আমি যথারীতি নিইনি), কেক বিস্কুট নিয়েছে, এমনকি সকালে চান অব্দি করে বেরিয়েছে। ওদিকে আমাদের সৌরভও কম যায় না, হ্যান্ডস্যানিটাইজার থেকে ফ্লাস্কে কফি সব নিয়েছে। আমি ড্রাইভার, তাই গাড়ীতে তেল ভরা আর হাওয়া চেক করার কাজটা করেছি। সাতটায় শুরু করার কথা, তা শুরুতেই বাবু শ্রীল শ্রীযুক্ত অমিতেশ দেরী করলেন। চা বিস্কুট খাওয়া হয়ে গেলো দু রাউন্ড রাস্তায় দাঁড়িয়ে, তারপর উনি গার্ল্ফ্রেন্ড কাঁধে মানে ইয়ে ওনার ডিএসএলার কাঁধে এলেন।



আমি পথে বিশ্বাসী, গন্তব্য তো আছেই কিন্তু যে পথ দিয়ে চললাম তাকে উপেক্ষা করে না। আর গাড়ি চালাতেও ভালোবাসি। ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে আমার বাহন আড়মোড়া ভেঙে ছুটছে, স্পীড বাড়ছে কমছে, সামনে ট্রাক, দুধারে গাছ কাটিয়ে এগোচ্ছে, রাস্তা পুরো মাখন। শক্তিগড়ের ল্যাংচা নাকি ভয়ানক খারাপ আসলে, মানে কোয়ালিটিতে, বাসী মাল দেয় ইত্যাদি কিন্তু তাও আমরা নিজের মুখে ঝাল থুড়ি মিষ্টি খেতেই পছন্দ করি কিনা তাই শক্তিগড়ে জমিয়ে খেলাম। সত্যি বলতে কি আমাদের ভালোই লেগেছে।



ইয়ুথ হস্টেলে গাড়ি রেখে, ঝটাপট প্ল্যান করে নেওয়া গেলো। রুমে ঢোকার দরকার নেই, খেয়ে সোজা পাহাড়ে ওঠা যাবে। আমি খেয়ে পাহাড় চড়ার থেকে বিছানা বালিশে ধ্যান করতে পছন্দ করবো বেশী জানি তাই স্রেফ মাছ ভাজার উপর রইলাম। আলুপোস্তটা ব্যাপক করেছিলো তাও খাইনি। বাকি তিনটে আমার কথা শুনলো না, 'যা যা তুই খেতে পারিস না তাই অমন করছিস।' আচ্ছারে ব্যাটা, বেশ বুঝবি। দুধারে সারা বছরের মেলা বসেছে। খাজা, জিলিপি, আলুর চপ, চা, পাথর খোদাই করে তৈরী জিনিস হরেকমাল। এসব কাটিয়ে এগোতেই, দেখি ভাঙাচোরা খাড়াই রাস্তা উঠে গেছে পাহাড়ে। ধুলো খুব। সেই খাড়াই খানিক ভাঙার পরেই, অমিতা আর অমিতেশ হাত তুলে দিলো। যা ভাই তোরা যা আমরা এখানেই পাহাড় এর ফিল নিই।







সৌরভ আর আমি হুহুমনা হুহুমনা করে চল্লুম। রাস্তায় দেখি একটা শুঁড়িপথ জঙ্গলে ঢুকে গেছে, নীচে পাহাড়ের স্পিকারের আওয়াজ, লোকজনের ক্যালোরব্যালোর এড়িয়ে আমরা জঙ্গল এর শান্ত চাইছিলাম, তাই অমোঘ আকর্ষনে দুজনে মূল রাস্তা ছেড়ে এগিয়ে গেলাম। বেশীদূর যেতে হলো না, যে পাখির ডাক এতোক্ষণ শুনিনি সেই পাখির আওয়াজ (খুব কম তাও আছে )। খানিক্ষন চুপ করে বসে থেকে আবার মূল রাস্তায় ফিরে পাহাড় চড়া, খাড়া   পাহাড়, আনফিট শরীর, রোদে ঘেমে, লেবু জল খেয়ে খেয়ে যখন বড়চূড়াটা পৌঁছলাম সে অদ্ভুত ভালোলাগা।চিৎপাত হয়ে শুয়ে শুয়ে যখন মন শরীর দুইই চাঙ্গা হয়ে গেলো আমরা রোদপড়া বিকেলে নামতে লাগলাম। এদিকে খুব বেশী লোক আসেনি, ছোট চূড়াটা অব্দিই লোকে পৌঁছেছে। তাই রাস্তাঘাট ফাঁকা। আশেপাশে প্রচুর বিন বানানো আছে তাও লোকে রাস্তায় প্লাস্টিক, প্যাকেট ফেলে গেছে। আমাদের স্বভাব! ভালো রাখবোনা আমাদের চারপাশ! হলুদ আলোয় চারপাশটা ভারী বড় সুন্দর লাগছে। এই আলোকে বলে কনে দেখা আলো, আচ্ছা গাছেরা কনে দেখা আলোয় কনে গাছ দেখে? ওদের হয়তো, প্রপোজ করতে গেলে হাওয়া দিয়ে ভাসিয়ে দিতে হয়। ও ছোট শাল গাছ তুমি আমার গাছিনী হবে?






অন্ধকার দেখতে হলে গ্রামে আসতে হয়। ইয়ুথ হস্টেলের বাইরের রাস্তায় চা খেতে বেরিয়ে দেখি চারজনের টর্চ জ্বেলেও খুব বেশী কিছু চোখে পড়ছে না। দুপাশে শালের জঙ্গল, অন্ধকার রাস্তা, চারটে ছেলে মেয়ে অন্ধকার ভেঙ্গে হাহাহিহি করতে করতে চলেছে। শালগাছেদের সাথে ভাব জমেনি তেমন, তাই তারা আমাদের ফাজলামিতে আমোদ পাচ্ছিলো না বিরক্ত হচ্ছিলো বুঝিনি। অন্ধকার রাস্তায় আমরা অবশ্য এসব দর্শন না আমরা চলেছিলাম একে অন্যের ঠ্যাং টানতে টানতে।


ইয়ুথ হস্টেলের বাথরুম বর্ষার কলেজস্ট্রীট। বাথ্রুমে কেউ গেলো মানে সে জলমগ্ন হয়ে পড়ে। একটা কম্বল চাপা দিয়ে শুতে শুতে অমিতেশের আপশোষ শোনা গেলো, এহ একটা ক্রেট তুলে আনা উচিৎ ছিলো মাইরি। সকালে গীজার দেখি কাজ করছে না, সুতরাং ডিওই ভরসা। এই জানুয়ারিরর ঠান্ডায় পুরুলিয়ার হেদুয়া বাথ্রুমে স্নান করার কোনো ইচ্ছে নেই। অমিতাকে না বললেই হলো, কাঁইকিচির লাগাবে, বনমানুষ ইত্যাদি বলে।



সকালগুলো ভারী সুন্দর হয় কিন্তু এসব দিকে। শীতের রোদ মাখা নরম পাকের সকাল, ইতিউতি পাখি ডাকছে। এক চক্কর হেঁটে ফিরে জয়চন্ডীর দিকে যাচ্ছি হঠাৎ ফাঁকা জঙ্গুলে রাস্তায় হঠাৎ দেখি গুড়ের জ্বাল দিচ্ছে। কাল থেকে খেজুর গুড় করে করে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। এমন মাটি ফুঁড়ে সে মিলবে কে ভেবেছিলো। একটা টিনের ছাউনিতে লোকটা থাকে, আজ সংক্রান্তি, তাই এক বুড়ি এসেছে খালি বোতল হাতে, দর কষাকষি চলছে। আমাদের অনেকটা করে গুড় খেতে দিলো, বোতল নেই শুনে জায়গা মেজে দিলো। তারপর খেজুর রস খাবো বলে গাছ থেকে হাঁড়ি নামিয়ে দিলো। রস জমেনি বেশী। সকালেই সবটা নিয়ে গুড় জ্বাল দিতে বসে গেছে। তাও যেটুকু ছিলো দিয়ে দিলো। 


আমি আগেও বলেছি না? আমাদের চারপাশে ভালো লোক বেশী, কাগজে যাই লেখা থাক না কেন। এই যে কাল আমরা যখন রাস্তা খুঁজছি, মাইলস্টোনে ভরসা রাখা যাচ্ছে না, জিপিসেও না তখন একজন "না না ওদিকে রাস্তা ভালো না, এদিকে ভালো" এসব বলে যে ডিরেকশন দিলো কি দায়?




জয়চণ্ডী পাহাড়ে একটা ছেলে পাকামো মেরে একটা খাড়া পাথরে চড়ে বসেছে। আর নামতে পারছে না ব্যাটা। তার বাড়ির লোকে উৎকণ্ঠিত হয়ে দেখছে, অবশেষে একজন হাত বাড়ালো, সে হাঁচোরপাঁচোর করে নেমে এলো। আমরাও হাঁফ ছাড়লাম, ওখান থেকে পড়লে আর দেখতে হতো না।




গড়পঞ্চকোট ঘুরে আমরা ফিরতি পথে আর শোভা দেখতে দেখতে না, হোটেল দেখতে দেখতে আসছি। কিছুই পছন্দ হয় না শেষ অব্দি হাইওয়েতে ধাবায় খাবো ঠিক হলো। খেয়েই কেসটা খেলাম।
ঘুম পাচ্ছে বেজায়। কোনো গানই আর ভালো লাগছে না। বাকিরা (অমিতেশ বাদে, সে ব্যাটা ঘুমোচ্ছে) চেষ্টা করছে পছন্দের কোনো গান চালাতে, সৌরভ হলো জিপিএস কিং, সে জিপিএস এর বাইরে অন্য কিছুকে ভারী ইয়ের চোখে দেখে সেও দেখি জিপিএস ছেড়ে ঘুম দেবার ফিকির ভাঁজছে। ক্রমে সূর্যদেব আপিসের কাজ সেরে ফেসবুক করতে গেলেন, আমরা শক্তিগড় পৌঁছলাম।




জানিনা কী যে গেরো চা এ লেগেছে যা চা খাচ্ছি তাইই খারাপ। অমিতেশ কফি খাবে আমরা চা, তাতে লোকটা চাফি বানিয়ে দিলো!! রাগের চোটে গড়গড় করতে করতে মিষ্টিই খেয়ে নিলাম গোটা কতক। যদিও দুপুরের রুটি মাংস পেটে তাঁবু গেড়ে বসেছে তাও।


রাতের বেলা গাড়ি চালানোর আলাদা রকম ব্যাপার। পুরো ফোকাসটা দিতে হয় রাস্তায়, গাড়িতে। চারদিকে ঘোঁত ঘোঁত করে গাড়ি ছুটবে তারমধ্যে বিচলিত না হয়ে গাড়ি চালাতে হবে। তবে গাড়িতে ইয়ার্কি মেরে উড়িয়ে দেবার বন্ধু বান্ধব থাকলে সে চ্যালেঞ্জ মজার, সব চ্যালেঞ্জ এর মতোই। গান, ইয়ার্কি, হাসি, আর হুশ হাশ করে পেরিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক গাড়ির মাঝে.....এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না ।









Thursday, February 1, 2018

এ শহরে, আনাচে কানাচে

লিফটটা নীচে ছিলো, আমি ঢুকে দেখি দুটো ছেলে এক মনে টাইপ করছে মাথা নিচু করে অথচ কোনো ফ্লোরই সিলেক্ট করেনি! আমি তিন দিলাম। তাদের কোনো হেলদোল নেই, হয়ত তিনেই যাবে। তিনে নেমে দেখি তারাও নামলো, নামার পর হোয়াটস্যাপ গ্রুপে দেখি কলটা ক্যানসেল হয়ে গেছে। এই এই হোয়াটস্যাপ হয়েছে মাইরি, অফিস এর লোকজন এটাকেই অফিস বানিয়ে দিয়েছে। রিড রিসিপ্ট অফ করেছি, কাল জানলাম গ্রুপে তাতে কোনো ফরক পড়ে না। জানাই যায়, কে পড়েছে কে পড়েনি।  যন্ত্রণা মশাই।
ফের লিফটলবিতে এসে দেখি সে দু মক্কেল এক জন  উপরে যাবার আরেকজন নীচে যাবার বোতাম টিপে দাঁড়িয়ে, আবার ফোনে ব্যস্ত। বোঝো! এনারা একজন চারে যাবেন আরেকজন দুই বা একে আর চ্যাটের নেশায় ভুলেই গেছেন।

দিনের সব চেয়ে কোন সময়টা ভালো লাগে? আমার অফিসের দিনে দুপুরের সময়টা, আর ছুটির দিনে সকালবেলাটা। আলসে মানুষ কিনা আমি। আজকাল লাঞ্চ স্কিপ করি, ওই সময়টা নিজের মতো ঘুরে বেড়াই। লাঞ্চ করলে ঘোরা যায় না, কিন্তু ঘুরলে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে পেয়ারা মাখা, কি চা আর কাচের বয়ামে রাখা লম্বু বা খাস্তা বিস্কুট দিব্যি খাওয়া যায়।  নিউটাউনে আজকাল সাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়। সাইকেল চালিয়ে প্রেম করে লোকজন মলয় বাতাসে কিংবা ব্যায়াম, আমি ধুলোভরা রাস্তায় লোক,  ভেড়ির জলে মাছরাঙা, চকচকে পিচঢালা ফাঁকা রাস্তা এই সব দেখে বেড়াই।

অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে বড় বড় মিষ্টি নারকেলি কুল খাচ্ছি দেখি এক মক্কেল পেল্লায় বিপদে পড়েছে। ক্লায়েন্ট এসেছে। সে সাহেব তো নানান প্রশ্ন করছে তাকে, ঝুপ্স দেখে বিমোহিত সে, হর্ণের শব্দে হাঁ, এরই মাঝে আশে পাশে সকলে মজা করে পেয়ারা মাখা খাচ্ছে আর ওই ছোকরাকে, নিঁভাজ শার্ট পেন্টুল পরে, হাতা না গুটিয়ে বিদেশী কায়দায় ইংরেজি বলতে হচ্ছে, বাইরে ফেসবুকিয় কায়দায় "দেখেছ ক্যায়সা লাট হ্যায় হাম" মুখ কিন্তু মনে মনে ফাটছে সে পস্ট বোঝা যায়।

ইউনিটেক এর মোড় পেরোতেই রাস্তা ক্রমে ফাঁকা, এক দুটো গাড়ি ধুলো ছিটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। রবিরশ্মি নামের একটা লাল বাড়ির কম্পলেক্স, কারা থাকে? কাঁটাঝোপ, বাবলা গাছ গাছড়া পেরোলে নার্সারি। দুপুর বেলার রোদে লোক নেই তেমন। বড় সড় যে কম্পলেক্সগুলো,  কারা যেন রয়েছে। যাক এখানে তবু লোক থাকে, ইডেন কোর্টটা দেখলে মনে হয় যেন ঘন্টা হিসেবে কাটাতেই লোক আসে। একোয়াটিকার আগে একটা ঝুপড়িতে হাম হাম করে টুয়েলভ সি বাই টু এর ড্রাইভার খালাসীরা ভাত মাছের ঝোল খাচ্ছে। আমার পিঠটা ঘেমে উঠছে ক্রমে। টাইম হিসেব করে দেখলাম এবার ফিরতে হবে। চা চা করছে মনটা। এ দিকে এতোই লোক কম দুপুরে চা ওলারা চা বানায়ই না।

ফিরতি পথে সিগ্ন্যালে দাঁড়িয়ে আছি, এক বাইকওলা  আমায় জিজ্ঞেস করলো, এইসব সাইকেল আমাদের কোম্পানি থেকে দেয় কিনা। বললাম না ভাড়া নিতে হয়। বলে নিলে কি হয়?" এই সাইকেল চালানো যায়"। 
- ব্যাস খালি এমনি এমনি চালানো?
মানে অ একটা ওই পাহাড়ে উঠে কি লাভ যখন নেমেই আসতে হয়!

সন্ধ্যেবেলা চা খেতে নেমে দেখি নিটোল একটা চাঁদ উঠেছে। অফিসের এতো আলোয় কিচ্ছু দেখা যায়না। সাইকেল গুলো তখনো আছে। ফের একখান সাইকেল নিয়ে ডিএলেফটু এর পাশ দিয়ে,  খালের দাহার ধরে নেশাগ্রস্তের মতো চালালা। ভেড়ীটা দূর আছে কিন্তু এই মায়া মায়া চাঁদের আলোয় ওখানে না পৌঁছতে পারলে হবে না মনে হচ্ছে যেন।  পাহাড়ে বসে চাঁদের আলোয় জ্যোৎস্না মাখা হয়না কতকাল, ভেড়ির আলোয় হোক।

অনেক অনেক্ষণ পর ফিরে দেখি অফিস ফাঁকা, বেশীরভাগ বেরিয়ে গেছে। ম্যালা কাজ জমে আছে, ঘাড় গুঁজে কাজ শেষ করতে আর কষ্ট হলো না, চাঁদের আলোয় মাখা ভেড়ির জল তেষ্টা মিটিয়ে দিয়েছে আজ....

Sunday, January 28, 2018

লাল পাহাড়ের দেশে




শালের গোড়ায় বসেছিলাম, রোদ এসে পড়েছে, মাঘের রোদ, জ্বালায় ভালোই, তবে প্রেমের শুরুর মতো এখনো জ্বলুনি শুরু হয়নি তেমন। লোক নেই কোনো আমরা ছাড়া। আসার কথা ছিলো চারজনের, এসেছি দুজনে। কেয়ারটেকার ছেলেটা একটু আগে চলে গেছে রাতে দেশী মুরগী বানাবে। "মেয়েদের চক্করে এক্ষুনি পড়ুনি বাবু, আমি শিলদা কলেজে পড়তে জিএস ছিলুম, কত ছেলের যে কেরিয়ার ডুম হয়ে গেলো এই মেয়েদের চক্করে পড়ে। মেয়েগুলো তো বিয়ে সেই বাপ মা এর দেখে দেওয়া, দেখতে শুনতে ভালো, চাকরি করে ভালো এমন ছেলেকেই বিয়ে করবে। অল্পবয়স তোমাদের বলে দিচ্ছি তাই"। বলে গেছে আমাদের। 
কি ভেবেছে কে জানে, দুজন ছেলে ঘুরতে এসেছে মানে নির্ঘাত দাগা খেয়েছে, দিওয়ানা হয়ে গেছে। ট্রেন ধরেছি সেই সাত সকালে। শালিমার থেকে। শালিমার স্টেশনটা মজার। একটা মাত্র চায়ের স্টল আর দুখানা প্ল্যাটফর্ম, তাতে একটা দুরন্ত আর একটা আরণ্যক দাঁড়িয়ে। লোকজন নেই, পরিষ্কার একটা ল্যাদখোর স্টেশন। ট্রেনে ভীড়ও ননেই তেমন। ট্রেনে বসে বসে দেখছি কেমন মাটির স্ট্রেকচার বদলে বদলে যাচ্ছে, মাটি ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে আর গাছ গুলো বলছে আমি আছি তো এখনো।






ওদিকে ট্রেনে তখন এক রুমাল ওলা বকুনি খাচ্ছে, কেন আগের দিন সে টাকা নেয়নি আর আজ মনেও করায়নি। রুমালওলা জানাচ্ছে ও জানে মাস্টারমশাই ঠিক মনে রেখে দেবে। যাক বাতাসে বিশ্বাসের অক্সিজেন এখনো মেলে। সেদিনই এক বন্ধুর সাথে তর্ক হচ্ছিলো, বিশ্বাস করা ভালো না ভালো না নিয়ে। আমি অসহায় ভাবে স্বীকার করেছিলাম আমি ভালো খারাপ জানিনা আমি অবিশ্বাস করতে পারিনা, কারন আমার বুদ্ধির পরিমাপটাই কম, অ যোগ করতে যে টুকু মাথা খাটাতে হয় তা আমার নাই।

এই গেস্ট হাউসের ব্যবস্থা দিব্যি ছিমছাম, শাল পাতা পরিষ্কার করছে একজন, ঝাঁটা দিয়ে, ওইদিকে, কয়েকজন মিস্ত্রী কাজ করছে। কেয়ারটেকার ছেলেটা বেরিয়ে যেতে আমরাও বেরোলাম, টোটো ডাকা হয়েছে। এখানে নাকি এক অতি প্রাচীন ভয়ানক জাগ্রত মন্দির আছে যা অবশ্য দর্শনযোগ্য। মন্দির যদি খুব পুরোনো হয় তা দেখতে আমি খারাপবাসিনা, বেশ কাজ টাজ দেখা গেলো, সে মমন্দির সিসিটিভির মতো জেগে থাকা হোক কি দারোয়ানের ঝিমুনির মতো হোক আমার যায় আসে না।
মন্দিরে যেতেই দেখি সকলে পাত টাত সাজিয়ে বসেছে খেতে, খিদে পায়নি বলব না তবে মন্দিরে নিরামিষ হয় কিনা আমার আবার দীক্ষা আছে নিরামিষ খেতে নেই, তাই খুব একটা উৎসাহ দেখাইনা। বাইরে থাকতে অবশ্য প্রতি বৃহস্পতি বার সাঁই মন্দিরে গিয়ে প্রসাদ প্যাক করে নিয়ে আসতাম, রাঁধার ভয়ে। আর বাড়ি ফিরে একটা অমলেট বানিয়ে দিব্যি, সেসব খাওয়া যেত। কিন্তু বসে খেলে তো আর তা হবে না। তাও বন্ধুটাই জিজ্ঞেস করেছে এখানে কি ভোগ খাওয়া হচ্ছে অমনি পুরোহিত বলে দুজন? আচ্ছা যাও যাও বসে যাও ওখানে, আর দুজনের একশো টাকা দাও। থতমত খেয়ে টাকা দিয়ে ফেলে বসে বসে ভাবছি, এরপর গিয়ে আবার খেতে হবে, শালারা খিচুড়ি লাবড়া খাওয়াবে একটা ডিম অব্দি দেবে না নির্ঘাত। নাহ শুরুতে একটা ভালো পোলাও দিলো, আহা কষা মাংস দিলে জমে যেত রে। তারপরেই খিচুরি, লাবড়া আর আলুপোস্ত। আলুপোস্ত দিয়ে খিচুড়ি!! কত কি জানার কত কি দেখার বাকি! খিদে পেয়েছিলো বটে, তাছাড়া ভবঘুরেদের এতো খুঁতখুঁতে হলে চলেও না, কিন্তু স্রেফ এই বিস্বাদ খিচুড়ি আমি খেতে পারবোই না। নাড়াচাড়া করছি খাবার নিয়ে, পাশে এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা বসে ছিলেন। চিনি না, জানি না, তিনি হঠাৎ ওই আমার খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া দেখে বললেন, 'খেতে কষ্ট হচ্ছে না বাবা? মাছ দেবে, আমার নাতিটাও এমন, খাবার খুঁটবে খালি। নাও ওই যে মাছ এসে গেছে, খেচুরি টুক খেয়ে নাও দিকি।' এই যে রাস্তায় নামলেই সারা দুনিয়ার লোকে আমার সঙ্গ দেয় খেয়াল নেয় তারপরেও বাড়ি থেকে কেন চিন্তা করে কে জানে!

গনগনি হলো শিলাইবতী নদীর খাত, লাল পাথুরে মাটিতে অদ্ভুত এক খোয়াই তৈরী করেছে। আমাদের পশ্চিমবঙ্গে বেশীর ভাগ জায়গা থেকেই নীল আকাশ চোখে পড়ে না আবহাওয়াগত কারণেই। এখানে আকাশ দিব্যি নীল, নীচে লাল নদীখাতে গড়ে ওঠা ছবি, আর খাদের উপর ঘেরা সবুজ গাছের সারি। এ জায়গাটা বলে মিনিয়েচার অফ গ্র‍্যান্ড ক্যানিয়ন অফ এরিজোনা। তা বলার দরকার নেই , হয়ত ক্যানিয়ন বলাটা বাড়াবাড়িই কিন্তু সত্যিই বড় সুন্দর। হাঁ করে করে দেখতে হয় লাল, সাদা সবুজ, নীল এর চমৎকার একটা কম্বিনেশন। শিলাইবতী নদীতে চান করছে দেখি অনেকে। রোদে গরমে ঘেমে উঠেছি ততক্ষণে, খুব ইচ্ছে করছিলো জলে নেমে ঝাঁপাই জুড়তে। গামছাটা আনলে নেমেও যেতাম হয়তো, তার বদলে দু চারটে শিং নেড়ে তেড়ে আসা গোমাতাকে সাবধানে কাটিয়ে, নদীর ধার ধরে ধরে একটা পাথরে বসলাম। একটা লোক মাছ ধরছে, ছোট্ট একটা মাছ ধরা নৌকা নিয়ে, লগি দিয়ে ব্যালান্স করতে করতে। ক্রমে রোদ যখন মাথা টাথা ধরিয়ে দিলো, উঠে খাদটার অন্যদিকে গেলাম। এদিকটাও ভারী চমৎকার। মাথার উপর পাথুরে ছাদের আড়াল। কতকগুলো বাচ্ছা দেখি হাঁকডাক করে হাজির, কি না তাদের ছবি তুলে দিতে হবে। 'কি রে ব্যাটা পড়াশোনা, ইস্কুল নাই এখানে ফুক্কুড়ি করছিস? '
'কোন ইস্কুলে পড়েছ তুমি হ্যাঁ? ছাব্বিশে জানুয়ারি ইস্কুল থাকে?'
অতএব হার মানতেই হয়, তাদের ছবি তোলা হলো, দাদা তুলবে ছবি আর বোন কি বসে থাকবে? ব্যাস তিনিও এলেন, দাদার হাত ধরে ঝুলতে ঝুলতে।










ক্রমে অমন মাথা ফাটিয়ে দেওয়া সূর্যের তাপও কমে আসে, লাল পাথরে সুর্যাস্তের ছবিটা বেড়ে লাগছে। জামা প্যান্টুল অনেক আগেই ধুলোময় হয়ে গেছে, খাদ ধরে উপরে উঠে এসে দেখি কাজু, দেবদারু গাছের ফাঁকে লাল সূর্যটা হেব্বি একটা পোজ দিয়ে বলছে আমি চল্লুম বাপু আজকের মতো খেলা শেষ।



আরো অন্ধকার হতে আমরা রওনা দিলাম। দুপাশে জঙ্গলের থেকে ঝিঁ ঝিঁ আওয়াজ আর হঠাৎ চমকে দেওয়া গাড়ির আলো ছাড়া শব্দ নেই, জন নেই। এই অন্ধকার নৈঃশব্দ্য ভেদ করে আমরা দুজন বকবক করতে করতে, বেসুরো হেঁড়ে গলায় গাইতে গাইতে যাচ্ছি। তারপর এক সময় বকবক থামিয়ে দুজনেই স্রেফ নিজের সঙ্গে চলতে শুরু করলাম কখন। আসলে এই নৈঃশব্দ্য এই নির্জন অন্ধকার তো মেলে না সবসময়, নিজের সাথে অন্ধকার জড়িয়ে হাঁটাই বা কোথায় হয়।

তারপর রাস্তার মাঝে এক জায়গায় খাবার হোটেল পাওয়া গেলো। হোটেলের বৌদিও অবাক হয়েছে বেশ। হোটেল কাম বাড়ি, দরমার বেড়া দেওয়া কিন্তু তকতকে। চা, পিঁয়াজি খেয়ে রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে এগোলাম ফের। আর হাঁটা না, হাত দেখিয়ে একটা মোটর ভ্যান থামিয়ে উঠলাম। ফাঁকা মোটর ভ্যানে হাওয়াতে এতক্ষণের না টের পাওয়া ঠান্ডাটা ঝাঁপিয়ে পড়লো আমাদের উপর। শীত তাড়াতেই গল্প জুড়লাম। কাকা আমাদের গেস্ট হাউস অব্দি ছেড়ে দেবে, আমলাতোড়া পেরিয়ে বেশ খানিক্টা গেলে গেস্ট হাউস। এই ভ্যানগুলোর দাম ছাপ্পান্ন হাজারটাকা। কাকা টাকা জমাচ্ছে এরকম একটা ভ্যান কিনবে। তারপর তো নিজেই আলু লোড করবে, না হলে খাটনি বেশী লাভ কম হয় খালি। সব জায়গায় সেই একই গল্প দেখি, হয় ভ্যান নয় বাড়ি কালকের জন্য ভেবে আজকের দিনটাকে আখমাড়াই। অবশ্য ঠিকই আছে, স্বপ্ন আর আশা এই না থাকলে থাকেই বা কি।

বন্ধুটার পেট খারাপ হয়েছে। ওকে বললাম, ভাই তুই যা ফিরে আমি একটা রাউন্ড হেঁটে তারপর আসছি। কুয়াশার পাতলা চাদর নেমেছে, আকাশে আধভাঙ্গা চাঁদ, আশেপাশের বাড়ির লোকে ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা কে জানে তবে সাড়াশব্দহীন। একা একা হাঁটছিলাম, রাস্তা দিয়ে। ভাগ্যিস আমি রোজ থাকিনা এখানে। এমন ঘুমিয়ে পড়া সন্ধ্যে আমার রোজ রোজ কিছুতেই ভালো লাগতো না এ আমি নিশ্চিত। আসলে আমি ওই আড্ডা হইচই জীবনও খারাপবাসি না। মাঝে মাঝে দম বন্ধ লাগে বটে সাজানো গোছানো কাজে কথায়, আমি পালাই তখন। ভীড়ের আড়ালে, নিজের সাথে একটু আর আমাদের এই সভ্যতার উপেক্ষার আড়ালে মুচকি হাসি নিয়ে আমাদের কন্ট্রোল করা প্রকৃতির সঙ্গে খানিক সময় কাটালেই আবার কিছুদিন ফ্ল্যাটের দাম, বাজারদর, ব্যালান্স শীট, ক্লায়েন্ট কল, পিওয়ান, সইয়ে নেওয়া যায়....এই শাল, কাজুগাছের বন, রাঙামাটি, খোয়াই এর ঢাল, ট্রেন থেকে এক ঝলকে দেখা ফুলের ক্ষেত,অচেনা মানুষ এর যত্ন এই সবে পকেট বোঝাই রইলো.....হালকা হলেই বেরোতে হবে আবার,অন্য কোথাও.....

Sunday, January 7, 2018

জলে জঙ্গলে(শেষ পর্ব)

পাখির কিচমিচ আর পেছনের পল্টনের 'ওই যে দেখা যাচ্ছে ঘর, এবার চলা শেষ', ছাপিয়ে আরেকটা আওয়াজ পাচ্ছিলাম, চেনা গম্ভীর আওয়াজ, সমুদ্রের গর্জন। ডাবল বেডরুম ভাড়া করেছিলাম, তাদের অ্যাটাচ বাথ্রুম নাই জানা গেল। রাগী ভদ্রমহিলা তো পারলে আইল্যান্ড ডুবিয়ে দেয়, অবশ্য ওনার রাগ পুরোপুরি অযৌক্তিক তাও না। আমাদের না হয় শয়নং যত্রতত্র ভাব, বাচ্ছা মহিলা সমেত এ অবস্থায় ভালো লাগার কথাও না। সই সাবুদ করে, ব্যাগ রেখেই সমুদ্রের জলে। না, চান এখানে করা যায় না, কারন যেখানে সেখানে গাছের গুঁড়ি,মূল থাকতে পারে, সমুদ্র এগিয়ে আসছে। তবু সমুদ্র পাড়ে এসে কি জল না ছুঁয়ে থাকা যায়? 




সমুদ্রের গর্জন আছে কিন্ত বেলাভূমি শান্ত। লোক নেই জন নেই, একধারে জঙ্গল আরেকধারে সমুদ্র, আর একটা ভার্জিন বিচ। 'কেবল পেটে বড় ভুখ না খেলে নাই কোনো সুখ'। সেই কোন ভোরে বেরিয়েছি, খাওয়া হয় নাই প্রায় কিছুই, অল্প কেক বিস্কুট ছাড়া। কেয়ারটেকার ছেলেটার নাম শঙ্কর, আহা মিলটা দেখুন, ভিতরকণিকা হলো গিয়ে ওড়িশার অ্যামাজন আর সেখানে এক দ্বীপে বাস করে শঙ্কর। যাকগে আপনারা আমায় খিস্তি দেবার আগে খাবারটা খেয়েনিই বরং। রাঁধে বেজায় ভালো ছেলেগুলো (আরো দু তিনজন আছে),অবশ্য খিদেও পেয়েছিলো। এখানে খাবারের আলাদা কোনো জায়গা নেই বলেই মনে হয় খাবার দাবার ইনক্লুডেড থাকে এদের ঘরভাড়ার সাথে। খেয়ে দেয়ে আমরা আর বসলাম না, চারটে বাজে, সুতরাং আর খানিকক্ষণ আলো পাবো। সেই অনাঘ্রাতা সমুদ্রতীর ধরে হাঁটছি, বালিতে থেবড়ে বসছি জলের ভয় না করেই, কে জানে আবার কবে পাবো এমন ঝকঝকে সমুদ্রপাড়। সূর্য ক্রমে নেমে আসছে, ওই দূরে একটা বালিয়াড়ি টাইপ, কি জানি কি করে এরকম মরুভূমির মতো বালিয়াড়ি তৈরী হলো। বালিয়াড়ির গা ঘেঁষে একটা একলা মরে যাওয়া গাছ দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রর অপেক্ষায়। কবে যেন ও একবার ছোঁয়া পেয়েছিলো সমুদ্রের, সব পাতা ঝরে গেছে কবেই, তবু কিসের বিশ্বাসে কে জানে এখনো অপেক্ষায় রয়েছে।




এতো নিস্তব্ধতা লাস্ট শুনেছিলাম সিকিমে, চুপ করে থাকলে সমুদ্র ক্রমে বুকের মধ্যেই ঢুকে যায়। ওহ না পুরো ফাঁকানা, আমরা ছাড়া দুটো কুকুর আছে। সৌরভটা কুকুরপ্রেমী, দুটোকে একটু আস্কারা দিতেই লুটোপুটি খেয়ে প্যান্টুল কামড়ে একাকার করলো, এদিকে আমি নিরাপদ দূরত্বে। ওব্বাবা নিরাপদ বলে কোনো শব্দ হয়ই না আসলে, পিছন থেকে এক মক্কেল এসে গরুর মতো ঢুঁ দিয়ে গেলো হঠাৎ। ওদিকে সূর্যর রঙ বদলে গেছে, টকটকে লাল হয়ে আসছে ক্রমে। একটা গোটা সমুদ্র, একটা মস্ত সূর্য, কিছু নেড়া গাছ, আর কিছু সবুজ গাছ এর মালিক হয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছি। লক্ষ্যশূন্য লক্ষ বাসনাহীন হয়ে যাচ্ছি। 









আরে একটা কাঁকড়াছানা খাবি খাচ্ছে না? ভালোবাসা মায়া দয়া এসবই আমার খুব কম, আমি একজন স্বার্থপর নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ তাও কাঁকড়াছানাটা দেখে একটু মনে হলো বেচারা বোধহয় জোয়ারের টানে শক্ত বালিতে এসে পড়েছে আর পৌঁছতে পারছে না। সেটাকে একটু জল অব্দি এগিয়ে দেওয়া গেলো। আসলে খেলা আর কি। 




একপাটি ছোটদের চটি পড়ে আছে, ঢেউ এর টানে চলে এসেছে কবে মনে হয়। এই জগত প্রপঞ্চময় আমি মানি, এইযে একলা গাছ, একপাটি চটি, ভাঙা ডাল এরা সবাই কথা বলে নিজেদের মধ্যে আমরা সে ভাষা পড়তে পারিনা। এই চটিটা মন খারাপ করছে না আনন্দ পাচ্ছে কে জানে।
"ওই পিছনের জঙ্গলটায় যাবি?" সৌরভের ডাকে সম্বিৎ ফেরে। হ্যাঁ হ্যাঁ চল। ওয়াচটাওয়ার বলে যে দোতলা বাড়িটা আছে তার পিছন দিয়েই একটা শুঁড়ি পথ চলে গেছে। মানুষ যাতায়াত করে তারমানে, খুব চাপের রাস্তা হবে না। কিন্তু এ জঙ্গলে বুনো শূয়োর, হায়না, শজারু আছে শুনেছি, তেনারা বৈকালিক ভ্রমনে বেরোলেই চিত্তির। সূর্য ডুবে গেলেও আলো এখনো আছে, পাখিদের কিচমিচ শোনা যাচ্ছে, জঙ্গুলে গন্ধ। এক জায়গায় গিয়ে রাস্তাটা শেষ হয়ে গেলো। আরো যাওয়াই যায়, তবে সে রাস্তাটা একটু বেশীই জঙ্গুলে হয়ে যাবে, ওদিকে আলো কমে আসছে দ্রুত। তাই ফিরেই এলাম দুজন, জঙ্গল ভালোবাসি, কিন্তু এ ভালোবাসা অনেকটা ওই ভার্চুয়াল ভালোবাসার মতো। জঙ্গলকে চিনে, জেনে তার বিছুটিপাতা বা পচা পাতার সংস্পর্শ গায়ে নিয়ে ভালোবাসা না, তাই জঙ্গল কি বলে আমরা বুঝবো এমন সাধ্য নেই, তাই জন্যই ফিরে যাওয়া উচিত।

ফিরে এসে সেই বেলাভূমি ধরে ফের হাঁটছি। চাঁদ উঠে গেছে তখন, আকাশ ভরে তারা। ষষ্ঠীর চাঁদে এতো জোর থাকে? দূরে গাছেদের মাথা ঢেকে কুয়াশা নেমে আসছে সীবিচে, কোন আদিম রাত নেমে এসেছে গহীরমাথায়। চুপ করে করে থাকা গাছ গুলো কত কি বলছে আমি শুনতে পারছি না বুঝতে পারছি না, দীর্ঘদিনের মনুষ্য সভ্যতা আমাদের প্রকৃতি থেকে কেড়ে নিয়েছে ক্রমেই, আমরা অনর্থক বাজে বকে বকে প্রকৃতির কথা শুনতে পাইনা আর। সব কিছুর একটা নিয়ম থাকে, যেমন সন্ধ্যে হলে পড়তে বসতে হয়, অফিস এর সময় অফিসে থাকতে হয়, তেমনই, এই সময়টা চুপ করে থাকতে হয়। এই এক আকাশ ভরা তারা, চাঁদের আলো, চিকচিকে বালি, সমুদ্রের গর্জন, গাছেদের মাথা নাড়া এসব কিছুই তোমায় বুকে ভরে নিতে গেলে মুখ বুজিয়ে থাকতে হবে। এই গাছ, এই সমুদ্র, চাঁদের আলো কবে থেকে এইখানে রয়েছে, যেন আমরা অনধিকারচর্চা করে ফেলছি ওদের মাঝে, ফিরতে লাগলাম।

হোটেলের কাছে এসে দেখি sos পাঠানোর মতো করে কে যেন টর্চের আলো ফেলছে আমাদের দিকে। আমরাও ফেললাম। দেখি হোটেলের ছেলেটা, শঙ্কর, জঙ্গল থেকে হায়েনারা বেরোয় তাই আমাদের দূরে যেতে নিষেধ করছে। তাছাড়া চা-টা খেতেও ডাক দিচ্ছে আর কি। চা খেয়ে হোটেল এরিয়াটা ঘুরে দেখতে গিয়ে দেখি দুটো ছেলে রান্না বসিয়েছে, বদরু আর কামাল, মুর্শিদাবাদ এর ছেলে, রাজমিস্ত্রির কাজ নিয়ে এসেছে। কড়াইতে সোয়াবিন হচ্ছে দেখে বললাম আরে সমুদ্রে এতো মাছ ধরে খাও না কেন হে, বলে দূর ধরতে পারিনা, ওরা (শঙ্কর এন্ড টিম) তো ওদের সাথেই খেতে বলে, কিন্তু রোজ রোজ অমন খাওয়া যায় নাকি, পয়সা নেয় না ওরা আবার।খুব বেশী বয়স না, একজনের বিয়ে হয়ে গেছে, মেয়ের ছবি দেখালো, তিনমাস বাড়ি যায়নি এবার যাবে, যাবেই। 
পিছনের জঙ্গলে সৌরভ একবার টর্চ ফেলে দেখালো, যেখানে টর্চের আলো শেষ সেখান থেকেই সেখান থেকেই ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমরা আবার সমুদ্রের ধারে হাঁটা মারলাম, কুকুরটা পাহারা দেবার মত করে করে আসছে, আমরা থামলে সেও থামছে, ব্যাটা মানুষ ভালবাসে খুব। কিন্তু আমি তো কুকুর ভালোবাসিনা, জোর করা ব্যাপারটাই অপছন্দের আমার, সে যে কোনো কিছুই হোক, ভালোবাসাও জোর করে দিতে এলে বিরক্তি হয়।

রাতেও পেল্লায় খাওয়া দাওয়া করালো শঙ্কর। তারপর গল্প শুরু করলো, ডুবুরিরর ট্রেনিং নিয়েছে সেই গল্প। ট্রেনিং এর কঠিন দিনগুলোর কথা, জলের নীচের কথা বলতে বলতে চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিলো ওর, ভালোবাসার কাজ পেলে যা হয়। আবার ভোর তিনটেয় উঠবে সে, আমাদের ব্রেকফাস্ট বানিয়ে দেবে, ভবানী বলেছে সাতটায় বেরোবে। কোনো আলাবেজার নেই ছেলেটার মুখে, দিব্যি হাসতে হাসতে জানালো, কম ঘুমোলে ওর কোনোই অসুবিধে হয় না। রোজ বুকডন দেয় ও আশী একশোটা, দিব্যি আছে। সুখ শান্তি আসলেই সহজ ব্যাপার, চাইলেই দিব্যি পকেটে নিয়ে ঘোরা যায়, আমরা চাইতেই জানিনা।

সকালে নাকি অনেক শুশুক আসে, ছটায় উঠে পড়েছিলাম তাই। নাহ শুশুক দেখতে পাইনি। কিন্তু একটা চমৎকার সূর্য সকাল বেলা চান টান সেরে সমুদ্র থেকে টুপ করে উঠে আড়মোড়া ছাড়লো, তারপর কাজে লেগে গেলো কেমন তাই দেখা হলো। মরা কচ্ছপের খোলা পড়ে আছে একটা বালির উপর, কাল দেখিনি আজ দেখলাম। কাল রাতে কেউ একজন বেরিয়েছিলেন, বালিতে পায়ের আর ক্ষুরের দাগ আঁকা, কুকুর না অবশ্যই। 



ব্রেকফাস্ট করে সকলের বেরোতে সেই সাড়ে সাতটা ভেজেই গেলো। গাছে গাছে টিয়া, মাছরাঙা, কাঠঠোকরা দের আড্ডা বসে গেছে। "কিরে কি খবর, আজ কি প্ল্যান? আজ ভাবছি ওপাড়ায় গিয়ে একটু ছানবিন করে আসবো। ওবেলা কন্সার্ট আছে আসছিস তো"।


নৌকা ধুয়ে মুছে রেখেছিলো ভবানীর সহকারী মাঝি। সকালের নরম রোদ মেখে মেখে চলতে বড় ভালো লাগছিলো। আমাদের ট্রেন সাড়ে তিনটের ধৌলি ওটা ধরতে না পারলে মুশকিল কাল আবার অফিস আছে। বোটে ওই বাঙালী পরিবারের যেই লোকটা সবচেয়ে বেশী লাফালাফি করছিলো তার সাথে আলাপ হয়ে গেলো। ভালো লোক, হুল্লোড়ে আসলে। পঁচিশে ডিসেম্বরের কেক খাওয়া হল। আমাদের বললেন ছেড়ে দেবেন ভদ্রক অব্দি। অচেনা অজানা দুটো ছেলেকে ফস করে গাড়িতে তুলে নিতে চাওয়া মোটেও সবাই করে না। এদের উপরেই আমরা কাল কি বিরক্ত হচ্ছিলাম, জঙ্গলে লাফালাফি করছিলো বলে। আসলে শুধু সাদায় কালোয় তো কেউ হয় না। যাই হোক আমরা ধন্যবাদ দিয়ে জানালাম দরকার নেই, আমরা চলে যাবো। জয়নগর ঘাটে এসে, পানিবাবু আমাদের উপর ঠান্ডা পানি ঢেলে দিলো প্রায়। বলল, চাঁদবালী পৌঁছে দেবে দুশ টাকা লাগবে। যেই বললাম তুমি তো আগে বলোনি অম্নি খারাপ ব্যবহার করলো। আমাদেরও রাগ ধরে গেলো, বেশ যাবোই না, আর যেভাবেই যাই তোমার সাথে না।

ঘটনা হলো, ওইখান থেকে চাঁদবালী প্রায় এগারো-বারো কিলোমিটার। রাগের মাথায় না বলে তো দিয়েছি। ঘড়িতে বাজছে এদিকে বারোটা কুড়ি। ধৌলি সাড়ে তিনটে, ভদ্রক থেকে চাঁদবালী পৌঁছতে লেগেছিলো দু ঘন্টা। মানে একটার মধ্যে পৌঁছতেই হবে। হনহন করে খানিক হেঁটে এগিয়ে যাবার পর দেখি একটা বাইক আসছে। লিফট চাইলাম। বাচ্ছা ছেলে, আমাদের দুজনকে নিতে গিয়ে প্রায় কাত হয়ে যাচ্ছিলো। যাইহোক সে আমাদের যেখানে পৌঁছে দিলো সেখান থেকে রাজকনিকার অটো মেলে, তা সেটাও রেগুলার না, মাঝে মাঝে আসে, এখন উপায়? 
দাঁড়িয়ে আছি, ঘড়ির কাটা বারোটা চল্লিশ। এমন সময় মরুভূমিতে উটের মতো, শীতকালের নলেন গুড়ের মতো, গরমের শরবতের মতো দেখি আমাদের বোটের সঙ্গীরা। ওনারা নিজেদের গাড়ি চালিয়ে ফিরছেন। আমাদের বললেন 'আরে তোমাদের খুঁজলাম আমরা, চলো, ভদ্রক অব্দি তো যাবো না রাস্তা খুব খারাপ, কালকেই টের পেয়েছি আমরা জাজপুর হয়ে চাঁদিপুর যাবো, যাইহোক তোমাদের রাজকনিকায় ছেড়ে দিচ্ছি।' ধড়ে প্রাণ এলো। রাজকনিকায় অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে নেমে এলাম। সত্যি মানুষের কোথায় যে কোন পাওয়া জমে থাকে কে বলতে পারে। অবশ্য এ আমি বহুবার দেখেছি, রাস্তায় নামলেই দেখি, পথে প্রান্তরে লোকেরা সাহায্য করতেই প্রস্তুত বরং। খারাপ কি পাইনি? পেয়েছি কিন্তু আমি বিশ্বাস করি এখনো মানুষ টিকে আছে এই ভালোবাসাগুলোর জন্যই। 
রাজকণিকায় অটো ভর্তি না হলে তো ছাড়বে না, বললাম চলো ভাই আমরা পুরো ভাড়া দিয়ে দেবো সবার। চাঁদবালীতে পৌঁছে দেখি একটা বাস ছাড়বো ছাড়বো করছে। সৌরভ ছুটলো সুলভ শৌচাগার আমি ছানাপোড়া কিনতে, আহা ও জিনিস মিস করলে ট্রেন ছাড়ার থেকেও বেশী পাপ হবে। 
বাস ছাড়লো, একটা কুড়ি, ধৌলি আধঘন্টা লেট দেখাচ্ছে, যাক তাহলে আরামসে পৌঁছে যাবো, চাপ নেই। 'আছে আছে আমাদের টেলিপ্যাথির জোর আছে'। কিন্তু ওই there are many slips between cup and the lips.... মফস্বলের বাস, সে নিজের মর্জিতে চলে। হয়ত দূরে কোনো বাড়ি থেকে বৌটি বাপের বাড়ি থেকে ফিরছে, সকলে আসছি আসবে ইত্যাদির পালা মেটানো অব্দি বাস অপেক্ষা করবে। তাই সেসব সেরে বাস যখন নামালো তখন বাজে চারটে, আর আমরা ওখান থেকে অটো ধরে স্টেশনে এলাম চারটে দশ। ধৌলি মিনিট দশেক আগেই বিদায় নিয়েছে!

যা গেছে তা যাক বলে চটপট মোবাইলে দেখা শুরু করলাম নেক্সট প্ল্যান কি। খড়গপুর চলে যাওয়া যায় একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন আছে, অথবা নেক্সট এক্সপ্রেস ট্রেন যেটা আসবে সাড়ে ছটা না পৌনে সাতটায় সেটার জন্য অপেক্ষা করা যায়। কি করবি? চল খরগপুর অব্দি এগিয়ে যাই, অন্তত অনেকটাই এগিয়ে যাবো আর ওখান থেকে অপশনও অনেক পাবো। আর এক্সপ্রেসটা যদি ঝোলায় তো পথে হয়ে যাবো। যদিও প্যাসেঞ্জার ট্রেন, তাও, কি বলিস? সুতরাং ঝটপট টিকিট কাটা হলো (খড়গপুর তক, অজ্ঞার কারনে হাওড়া অব্দি দিলো না), এক নম্বরে দাঁড়িয়েই আছে ট্রেন, রাইট টাইম যদিও চারটে কিন্তু ইন্ডিয়ারেলইনফো বলছে কুড়ি মিনিট লেটেই ছাড়ে। দৌড়াদৌড়ি করে যাও হলো, ইঞ্জিন বদলাচ্ছেরে, সৌরভ তুই ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে গেটের মুখেই থাক, আমি একটু হালকা হয়ে আসি, ছানাপোড়ার চক্করে যাওয়া হয়নি কিনা।
তা অত দৌড় ঝাঁপের দরকার ছিলো না, ট্রেন ছাড়লো পাঁচটায়। পাক্কা এক ঘন্টা লেট প্রথমেই। এটার পৌঁছনার সময় আট্টায়, সাড়ে আটটায় এক্সপ্রেস ট্রেনটা পৌঁছনোর কথা খড়গপুর। দেখা যাক। তেমন হলে টিকিট না কেটেই ট্রেনে উঠতে হবে এবং ফাইন দিয়ে নিতে হবে। অবশ্য অমরাবতী এক ঘন্টা লেট দেখাচ্ছে। সাব্বাশ পাগলা। আমরা তাড়াহুড়ো করে উঠেছিলাম একদম শেষ কামরায়। কদলী কদলী করে একবার একটা লোক ছাড়া আর কাউকে দেখলাম না খাবার বিক্রী করতে। হ্যাঁ একটা লোক ছিলো বটে, জ্যান্ত দেশী মুরগী নিয়ে, কিন্তু ইয়ে কাঁচাই খেয়ে নেবার মতো খিদে পায়নি কিনা। সৌরভ এদিকে লম্বা হয়ে ঘুম দিচ্ছে আরামসে। আমি খিদের চোটে কাওয়ালি গাইছিলাম, 'কচুবনে হেগে গেলো কালো কুকুরে'। সৌরভ আঁতকে ধড়মড় করে উঠে বলল, কি হয়েছে হ্যাঁ ভাই, অবরোধ না অ্যাক্সিডেন্ট, কারা চেঁচাচ্ছে হ্যাঁ। নাহ কলিকালে গুনীর কদর নেই মশাই, আমি কথা না বাড়িয়ে বললাম, ওরে খেয়াল করেছিস কি, পুরো কামরা খালি? খাকি আমরাই পড়ে আছি? টিনটিন এর মতো আমাদের রেখে ট্রেন এগিয়ে যাবে না তো? 
সুতরাং আমরা এক এক করে কামরা এগোতে থাকলাম, কারন প্রতি স্টেশনে এক মিনিট করে থামছে ট্রেন। আর ফেরিওয়ালা যতক্ষণ না দেখবো আমরা থামবো না। শেষে একটা কামরা থেকে নামতে যাবো দেখি এক মুড়িওলা আসছে!! আরে এসো এসো, মুড়ি চা খেয়ে ঘড়িতে আর স্টেশনে মিলিয়ে দেখি ট্রেন সেই এক ঘন্টা লেটেই ছুটছে। আচমকা মোহন সিরিজের গল্পের মতো কোথা হইতে কি হইয়া গেলো, খরগপুরের আগের স্টেশন থেকে এমন এলো মাত্র চল্লিশ মিনিট লেটে পৌঁছে দিলো। বাহ বাহ কেয়াবাত। ওদিকে অমরাবতী তখনও আড়াই ঘন্টা লেটে। সুতরাং লাস্ট মেদিনীপুর লোকালই ভরসা।

ওই মেদিনীপুর লোকালে রাত পৌনে বারোটায় বসে বসেই পুরো জার্নিটা চোখের সামনে ঝালিয়ে নিলাম একবার, তিনদিন স্নান নেই, কোথাও তেলচিটে বালিশ চাদর দিয়ে ঢাকা হোটেল তো কোথাও কমন বাথ্রুম ওলা হোটেল, অপরিচিত লোকের বাইকে নির্জন সন্ধ্যেবেলা অজানা গন্তব্যে যাচ্ছি কখনো, কখনো অপরিচিত কেউ লিফট দিচ্ছে, ঝড়ে বেগে বাইকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কেউ আবার আবছা অন্ধকারে কাঠের উনোনের ধারে বসে ডুবুরির গল্প শোনাচ্ছে কেউ, মসৃন বালিতে প্রথম পায়ের ছাপ আঁকছি কোথাও কখনো খিদেতে কোঁ কোঁ করছি.....সব মিলিয়ে যে মশলামুড়িটা মাখা হয়েছে আমতেল দিয়ে তার সুবাসে একটুও টায়ার্ড লাগছে না, এখনো হা হা করে হাসছি, ঠ্যাং টানছি আর, আর স্বপ্ন মাখা চোখে পরের বেরোনোর প্ল্যান করছি।