Tuesday, February 25, 2020

বালিতে কদিন ( এক)

এটাও একটা বেড়ানোরই গল্প, তবে সব বেড়ানোর গল্পেরই একটা পূর্বকথন থাকে। তা আমার এবারের গল্পটার পূর্বকথন বেশ খানিকটা লম্বা। এ ব্লগের পাঠক কেউ আছে কিনা জানিনা। যদিও থাকে, সে এই বেড়ানোর গল্পের পূর্বকথন স্কিপ করে যেতে পারেন। ঘটনার ঘনঘটায়, বেড়ানো পর্বে আসতে সময় লাগবে খানিক।

সে ম্যালা দিন আগের কথা। আপিস করে, গরম কালে আম-টাম খেয়ে, শীতে কলাইশুঁটির কচুরি খেয়ে ফেসবুকের মন্ডপে রাজা উজির মারিনা, ফুক্কুড়ি করে আড্ডা মেরে  বেড়াই। সুযোগ পেলেই ধাঁ করে চলে যাই আজ ভেড়ির ধারে তো কাল পাহাড়ে। ফেসবুকে ছদ্মবেশে ফুক্কুড়ি করতাম বলেই সচরাচর দেখা সাক্ষাৎ করতে চাইতাম না কারোর সাথেই। ছদ্মবেশ শুরু করেছিলাম টংলিং এর গল্পের মতো পালাতে গিয়ে, কল্পানার বিশেকে নিয়ে , তারপর দেখলাম , ছদ্মবেশে থাকার সুবিধে হল , চেনা মানুষজনের কী কেন না ভেবেই নিজের মনে যা খুশী লেখা যায় । তো এই জন্যেই ওই আড়ালে থাকতে থাকতেই বন্ধু বানানো । ফেসবুক এর অন্ত্রাল আমায় প্রচুর কিছু দিয়েছে , আর সে সূত্রেই এ পোস্টের অবতারনা। এমনিতেও সামনাসামনি কথা বলার থেকে মেসেজে কথা বলতে আমি স্বস্তি বোধ করি অনেক বেশী, ফলে ফেসবুকে আড্ডায় আমি স্বস্তিও পাই বেশী। তো এরকমই কোনো এক বেয়াক্কেলে বারবেলায় একজনকে হঠাৎ প্রস্তাব দিই, "দেখা করবে?" আড্ডা তার আগে অনেকদিন ধরেই হয়, সে আমার বহু লোকের সাথেই হয়, কিন্তু আমার মতন এমন কন্দরবাসী লোকের মুখে এ হেন প্রস্তাব শুনে সে ঘাবড়েছিল বিস্তর (আমি সচরাচর দেখা করা এড়িয়ে যাই, সামনে আসতে ডরাই)। সেদিন প্রথম সাক্ষাতে মেলা আড্ডা হয়েছিল , যা আমার মত আন্সমার্ট লোকের জন্যে অবাক কান্ড বটে। আড্ডার মধ্যে এটুকু মনে আছ সেদিন একটা প্রপার বিয়ের কিরকম মেনু হতে পারে সে নিয়েই আলোচনা কফির কাপে,  আলো আঁধারি গলিতে, দমকা হাসির পাল্লায় পড়ে জমে গেছিল। প্রেম বিয়ে এসবের ইচ্ছে একেবারেই ছিল না।  তবু ওই আর কি, মোহন সিরিজের মতই কোথা হইতে কী হইয়া গেল, সেদিনের সেই মেনু নিজেদের কাজে লেগে গেল।

এবার অত খেলে ঘুরতে তো যেতেই হয়, হজম করার জন্যেই। সুতরাং আমরা একটা বেড়াবার জায়গা খোঁজার জন্যে দুনিয়া তোলপাড় করে ফেললাম প্রায়। আসলে পৃথিবীতে এত কিছু দেখার আছে আর আমরা এত কম দেখেছি তাই আমাদেএ হাল হল প্রায় কাঙালের শাকের ক্ষেত দেখার। দুজনেরই প্রথম পছন্দ পাহাড়, কিন্তু দেখা গেল কাশ্মীরে যাওয়া যাবে না," একরাশ বিপদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কানাকানি" করা যাবে না বসন্ত৷ এসে গেছে বলে। অরুনাচল যাওয়া যায় কিন্তু প্রচুর ধকলের রাস্তা। হিমাচল যাওয়াই হয়নি কখনো, কিন্তু ময়ূরাক্ষীর (ইয়ে মানে ওই নদীর ঘাটেই নৌকা বাঁধা হল আর কি) আবার দুবার ক্যানসেল করা হয়েছিল হিমাচলের টিকিট তাই ওর খুঁতখুঁত। ওদিকে আন্দামান, কেরালা ঘোরা আমার।দেশের বাইরে থাবা বাড়াতে গিয়ে আমাদের ঘোরা গ্রীস, ইওরোপ, কম্বোডিয়া সব ঘোরা হয়ে থিতু হওয়া গেলো বালিতে। সমুদ্র আছে, ছোট খাটো পাহাড় আছে,জঙ্গল আছে আর আছে সপ্তম অষ্টম থেকে পঞ্চদশ  শতক এর মন্দির। অনেকে বেড়ায় হোটেলের ঘরে, পুলে রিল্যাক্স করে, আমার বেড়ানোয় হোটেলে কম থাকার ভাগ থাকে। কেমন যেন মনে হয় দু চোখ ভরে যতটা পারি দেখে নিই, রঙ রূপ গন্ধ, আর আরামের জন্যে আমার কোলকাতার ঘরটাই আছে তো। তবে এ আমার ব্যক্তিগত ভাবনা, সবার ঘোরার ভঙ্গী এক হবে না স্বাভাবিক তাইজন্যেই ঘোরাঘুরি করার পার্টনার বা দল উমদা হওয়া খুবই দরকার। মানে হাতির পার্টনার পাখি হলেই চিত্তির। তো সৌভাগ্যক্রমে আমার ঘুরতে যাওয়ার পার্টনারটি আমার মতোই হয়েছে। তাই টিপিক্যাল বিবাহপরবর্তী ভ্রমন আমাদের ছিল না এটা। আট রাত নদিনের এই ট্রিপটায় আমরা বালি লম্বক ভালোই ছানবিন করেছি।

বালি জায়গাটা চুজ করার আরেকটা মারাত্মক কারন বলাই হয়নি, এর থেকে বেশী রেস্তোঁ ছিল না, মানে ক্রাঞ্চ না করে ঘোরার আর কি। আর দেশে ঘুরলে ওই লেভেলের স্বাধীনতা মিলত না। মানে যে স্বাধীনতায় প্রত্যেকে বয়স্ক মানুষের মতই আচরন করবে অবোধ শিশুর মতো অযথা কৌতূহল বা রাস্তায় নোংরা ফেলে নিজেকে পরিচ্ছন্ন ভাবার মত পাগলামো করবেনা আর কি। তো যাই হোক, বালি যাবার একখানা দামী অর্থাৎ সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস আর একখানা কমদামী অর্থাৎ এয়ার এশিয়া উপায় আছে। এয়ার এশিয়া খুবই ইয়ে, ফ্লাইটে জল অব্দি দেয়না ফ্রিতে কিন্তু তাও এয়ার এশিয়াতেই যেতে হয়, কারন দুটো এয়ারলাইনসের দামের তফাৎ বিস্তর৷ সমস্যা আমাদের জলে তত হয়নি যতটা হয়েছিল মার্কেটে করোনা ভাইরাস নিয়ে একটা ভয় চালিত হওয়ায়। বিয়ের ঝামেলা মিটিয়ে মাস্ক কেনা আমাদের হয়ে ওঠেনি, এদিকে হোটেল ফ্লাইট সমস্ত বুক সেই কবে থেকে, করোনা ভাইরাসের কারনে ক্যান্সেল তো করা সম্ভবই না তাহলে শোকেই মরে যাব। যা হবে দেখা যাবে ভঙ্গীতে বসা গেলো ফ্লাইটে, কুয়ালালামপুর এর হল্টে নাক চোখ চ্যাপ্টা দেখলেই সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে খেয়াল করলাম, ঠক বাছতে গাঁ উজার হয়ে যাবে,  সুতরাং 'সমুদ্রে পেতেছি শয্যা শিশিরে কী ভয়!' ভঙ্গীতে চোখ বোজানো গেল যতক্ষন না বালিতে নামার ঘোষনা করলেন পাইলটবাবু। ঘুম ভেঙে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি ঘন নীল জল বেষ্টন করে একটা ছোট্ট সবুজ ভুখন্ড উঁকি মারছে।



বালি এই সময় বৃষ্টি বাদলার জায়গা। মানে আমাদের ভাদ্র মাসের মতো, খানিক বৃষ্টি বা মেঘ বা চড়া রোদ্দুর সাথে দরদরে ঘাম। সারা রাতের প্রায় নির্ঘুম যাত্রার পর হোটেলে গেলে আর বেরোতে ইচ্ছে করবেনা তাছাড়া গাড়িতে উঠে খানিক পকেট ঝেড়ে ঝুড়ে পাওয়া কেক খেয়ে আর নতুন দেশ দেখতে দেখতে অত টায়ার্ডও লাগছিল না। আমাদের ড্রাইভার সূর্য ভারী হাসিখুশী মানুষ , আমাদের জন্যে প্রচুর সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে এয়ারপোর্টে তাও বিরক্তি দেখলাম না। এটা অবশ্য পরে আরোই দেখেছি , এখানের অধিবাসীরা মূলতঃ সোজা সরল আর হাসিখুশী , ঠক জোচ্চোর কি নেই, তাও আছে সে পাল্লায়তেও পড়েছি তাও বল্ব মূল সুরটা এখানে সহজ। এই যেমন ডেনপাশর , কুটা , সেমিনিয়াক এসবই শহর অঞ্চল , কিন্তু সরু রাস্তাতেও কেউ হর্ণ দিচ্ছে না , কেউ বাইক রেখে রাস্তা ব্লক করেনি , দুটো বাড়ির মাঝে ফাঁকা জায়গা হলে সেখানে ধান রুইয়েছে, উন্নয়নের জন্যে গাছ কেটে দেয়নি। লম্বা ইমিগ্রেশন আমাদের যা কাহিল করেছিল, মেঘলা আকাশ,এক পশলা বৃষ্টি আর সবুজ ঝকঝকে পরিষ্কার বালি আমাদের ফের চাঙ্গা করে নিয়ে গেল পাহাড় ঘেরা সমুদ্রের মাঝের মন্দির তানহা লটে। এই মন্দিরটা আসলে বরুনদেবের মন্দির,পঞ্চদশ শতকে শেষ হয়েছিল এ মন্দিরের কাজ। একটা ন্যাচারাল আর্চ এর উপর একটা মন্দির আর একটা মন্দির সমুদ্রের মধ্যে একটা শিলাখন্ডের উপর। বালিনিজদের কাছে ভারী পবিত্র এই মন্দির তাই পুজো-আচ্চা চলে এখনো। রাস্তায় আসতে আসতেই শুনেছি, আমাদের ড্রাইভার সুর্যর থেকে, বালিতে আশী ভাগ হিন্দু যদিও ইন্দোনেশিয়ায় মুসলমান সংখ্যাগুরু। জানি এসব তথ্য গুগল ঘাঁটলেই মেলে তাও আমি সব জিনিস গুগল থেকে জানার থেকে এখনো মানুষের মুখ থেকে কিছু জিনিস জানতে ভালোবাসি।  একটা গুহামত জায়গায় কিছু পুরোহিত গোছের লোক নির্দেশ দিচ্ছে দেখি কী সব। কাছে গিয়ে উঁকি মারতেই একটা ছোট্ট গুহাগাত্রের ঝোরা থেকে মুখ ধুতে ইশারা করল দেখি, একিরে বাবা, আমাদের দেশের মন্দিরের মত নাকি? পয়সা নেবার বাহানা জোর করে? তা আমাদের কানে চাঁপাফুল আর ভেজা চাল দিয়ে কপালে টিপ পরুয়ে দেওয়ার পর দেখি ডোনেশন বক্স, জোর জুলুম নাই।












আস্তে আস্তে সমুদ্রের জল বাড়তে লাগলো মন্দিরে যাওয়ার রাস্তায় জলের অংশ বাড়তে লাগলো সাথে সাথে। ঢেউ এর ঝাপ্টা উপেক্ষা করে লোকজন দিব্যি ছবি তুলে বেড়াচ্ছে, কটা বাচ্ছা দেখি জলের মধ্যে দিব্যি হুড়ুমদুড়ুম করছে।  মন্দিরের পাশের ক্লিফটায় কিছু দোকানপাট, মাথা খোলা রেস্তোরাঁ।  এক কাপ কফি বা চা এর জন্যে মনটা বেশ আনচান করছিল, এখান থেকে সুর্যাস্তটা বেশ চমৎকার দেখাবে। ও বাবা কি জায়গা রে বাবা! দাম দস্তুর হচ্ছে রেস্তোরাঁয়!  যেই নিজেদের মধ্যে বলেছি," এই ওই দোকানটায় তো পনেরো হাজার ডাবের দাম বলছিল" অমনি দোকানদার তরুণী হেসে বলে আমিও তাইতেই দেব।  ও ভালো কথা,  ওখানে টাকা বদলে রাশী রাশী টাকা পাওয়া যায়, যদিও তার মানেই সব খুব সস্তা তা না, একটা ডাব পঁচানব্বই থেকে একশো ষাট টাকা অব্দি হতে পারে আমাদের হিসেবে। যাকগে হিসেব থাক এখন, যতই হোক এমন সুন্দরী দয়ালু মহিলা উপেক্ষা করা যায়, তাই ওইখানেই বসা গেল। মস্ত বড় ডাব,  আর কফি অর্ডার করে দেখি মেঘের ফাঁকে সুর্য কেমন ডুব দেবার তাল করেছে আজকের মত আপিস থেকে। ট্রপিকাল দেশ বলেই হয়ত বা সমুদ্রের ধারে বলে, জানিনা, ভাত এদের প্রধান খাবার। ভাত বা নুডলস, নাসি গোরেং হল মিক্সড ফ্রায়েড রাইস আর মি গোরেং হল মিক্সড নুডলস,  সাথে থাকবে দুটো ছোট্ট কাঠিতে গোঁজা মিষ্টি সস মাখানো চিকেন, একটা পোচ, কিছু পাঁপড় আর শশা, টমেটো। এবার অঞ্চল বা দোকান ভেদে একটু তফাৎ হয়, মানে মি গোরেং এ  বেশীরভাগ জায়গায় পোচের বদলে ডিমটা ভেজে ভেজে উপরে দেবে ছড়িয়ে, এইসব আর কি। শেষ বিকেলের আলো মেখে সমুদ্রে ধারে পাহাড়ের উপর বসে আরাম করে খাওয়ার এই মুহূর্তটা বহুদিন মনের মধ্যে থাকবে , সূর্য ওঠা আর ডুবে যাওয়া কতবার দেখলাম তবু প্রতিবারেই এমন ভালো লাগে বলেই বোধহয় জীবন এত সুন্দর। (ক্রমশ)


Sunday, January 19, 2020

ফির লে আয়া দিল...মজবুর কেয়া কিজে

"ফির লে আয়া দিল, মজবুর কেয়া কিজে....রাস না আয়া রেহনা দূর কেয়া কিজে..."

এই লাইনটাই মনে হয় ঠিক আমার গ্রামের বাড়িতে   যাবার রাস্তায় পড়লে, যখন থেকে হাওয়ার গন্ধ বদলে যায়, জমির আল ধরে হাঁটা হয়, অন্যরকম একটা হাওয়া এসে বয়ে যায়। খুব বেশী আবেগ বোধহয় নেই আমার, আমার সারাদিন কাজের ফাঁকে মনে পড়ে গ্রামের বাড়ির কথা, এমনও না, কিন্তু এলেই ভারী একটা অন্যরকম হয়। সে আমি ঠিক বোঝাতে পারবো না কেমন। 

"আরে পাইলট, কখন এলি?" "কেমন আছিস"?  "আজ থাকবি তো"? এসব কথা খুব বেশী শোনা হয় না বলেই হয়ত। আমাদের বাড়িতে বিস্তর লোক থাকতো এক সময়, জেলেদের হাঁড়ির মত হাঁড়িতে ভাত বসাতে হত, এখন সেই বাড়িতে জনা পাঁচেক লোক থাকে। শীত প্রায় চলেই গেছে, জল মিষ্টি মুখে দিয়ে পাঞ্জাবীর হাতা গুটিয়ে মাঠে। চড়া রোদের মধ্যেই পিঠে মেশিন নিয়ে একজন আলুতে ওষুধ দিচ্ছে। জানুয়ারি মানে বাংলায় মাঘ মাস, এখনই হাওয়ার ধরনটা দেখো! যেন বসন্ত আর অপেক্ষা করতে নারাজ! আরে ওইটা কি হুশ করে চলে গেল? ভাম না খাটাশ? মোটা মত লেজ, কুকুরের মত দেখতে। মাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে। 

একগাদা ছাতারে পাখি ছ্যা ছ্যা করে উড়ে গেল, ঠিকই তো, এমন জায়গায় এসে ফোন দেখা মোটেও কাজের কথা না। আচ্ছা ওই হলুদ পাখিটা কি ফেলাকাকা? "কোকিল মনে হচ্ছে, পাতকো কোকিল"।  অ্যাঁ কোকিল! হলুদ রঙের! ধুস নির্ঘাত  অন্য কোনো পাখি। এহ না মানুষের বইটা না পড়ে ফেলে রাখা খুবই খারাপ করেছি। দূর থেকে ভুটভুট করে পাম্পের শব্দ আসছে, জমিতে জল সেঁচা হচ্ছে। আমাদের এবারে সর্ষে বোনেনি? হয়ত  অন্য কোনো মাঠে হয়েছে।

 জুতো খুলে মাঠে নামি, কাদা মেখে এগোই,আমগাছটার কাছে যাব, সেই গরমে আমায় আম দিয়েছিল, তারপর থেকে কাছে এসে কথা তো দূর মিনিমাম থ্যাঙ্কিউটাও দিইনি। 

থ্যাংক ইউ হে, মনে আছে আমায়? সেইই যে  সেইই বছর আমায় আম দিলে, কচি আমডালটা কই? দু বছরে এত বড় হয়ে গেছে? দুই না তিন? কথা বলবে না নাকি হে? আমি তো সব জায়গার সব গাছকে বলেছিলাম তোমায় জানাতে, আমি কী করব বলো, বন্যা হল একবার, একবার তো আমি এলামই না। না না অজুহাত হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা শোনো তবে,  আমি সত্যিইই চেয়েছিলাম, তবু আসিনি, আসা হয়নি। মানুষদের নানান রকম থাকে জানোই তো, সব চাওয়া পাওয়া মেলে না যে।  হয়ত আমার আরো বেশী করে চাওয়া উচিত ছিল, যাতে দেখা করতে আসা যায়।

ছাতারে গুলো চুপ করে গেছে। র‍্যাট্যাট্যাট করে করে একটা কাঠবিড়ালী ডাকছে খালি। আমগাছেরা গম্ভীর হয়, আরো মন দিয়ে বলতে হবে। একটা পাতা ছুঁয়ে চোখ বুজে বললাম, থ্যাংক ইউ,  সত্যি সত্যি।  তারপরেই সেই হাওয়াটা আবার দিলো, যে হাওয়াটায় মাথার চুল এলোমেলো হয়, বুকের ভার নেমে যায়, চোখ বোজা যায় আরামে।

" তুমি আমাদের ঘর বানিয়ে দেবে? "

কচি গলায় ডাক শুনে চমক ভাঙে।  দু তিনটে বাচ্ছা মেয়ে। রঙীন ফুলের মত। 

কীরে? তোরা কী করছিস এখানে?

"দেখোনা, আমাদের ঘর তৈরী করছি আর ভেঙে যাচ্ছে খালি।" 

তারপর দেখা যায়, সমস্ত কিছু ছড়িয়ে ফেলা, ভেঙে ফেলা অগোছালো একটা লোক কঞ্চি বাঁধা গাছের গায়ে লাল নীল ওড়না, চটের বস্তা এসব চাপিয়ে ঘর বেঁধে দিচ্ছে তাদের। ঘরের ব্যবস্থা হতেই রান্না বসাতে ব্যস্ত হয়ে গেল।নেমতন্নও ছিল বইকি। কিন্তু ওই আর কি, মহারাজের এসব সয় না যে। পা চালাই ফের। একটা বুড়ি একগাদা কাঠকুটো নিয়ে নড়বড় করে চলেছে। এক বার নামিয়ে ফের নতুন বোঝা নিতে এলো। সাদা শাড়ি কোনোমতে প্যাঁচানো গায়ে। এই বয়সেও এত বোঝা বইতে হয়? মলি পাগলি নিশ্চিন্তে গাছের নীচে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। পাগলদের আর নির্বান পাওয়া লোকেদের তফাৎ কিছু নাই মনে হয়। 

বাড়ির ছাদে এলেই পুরোনো শীতের কথা মনে আসে হুড়মুড় করে। লেপ রোদে দেওয়া দুপুর, কমলালেবুর দুপুর, দিদিদের কয়েতবেল মাখা দুপুর, নীচে বালির পাহাড় করা থাকতো সে সময়, ঘর বানাবার কী একটা প্ল্যান হয়েছিল।আচ্ছা আমি বরাবরই ভীতু মনে হয়, কই কখনো তো ছাদ থেকে বালিতে লাফ মারিনি। কী হত এমন হাত পা ভাঙতো হয়ত।যাকগে,  নস্টালজিয়ায় বাঁচতে আমি তেমন ভালোবাসিনা।যা গেছে তা যাক। বরং আলসেতে ঠেস দিয়ে দেখি   ধলিগাইটা একলা দাঁড়িয়ে জাবর কাটছে, ওই দিকে নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে তালফোঁপরার ঢিপি।মেজদাদাকে বললে ছাড়িয়ে দেবে। বলব না যদিও। কিন্তু এই যে চাইলেই পাবো এই নিশ্চিন্ততাটা বড় জরুরি জীবনে।



খাবার ডাক পড়ে। সাজিয়ে গুছিয়ে বড় যত্ন করে খেতে দেয় দুই জ্যেঠিমা মিলে। ঘরের তৈরী গাওয়া ঘি থেকে ঘরের বানানো আমসত্ত্ব, বড় ভালোবাসা জড়িয়ে থাকে সবেতে। একবার এক বন্ধু বলছিল, পরের জন্মে, সে কিছুতেই মানুষ হতে চায় না। কেন যে এ বারেই হয়েছে সে জানেনা কিন্তু যদি হবার চয়েসেই দেওয়া হয়, সে মানুষ হবেনা। আমি বলেছিলাম, আমারও মনে হয় আগের জন্মে নির্ঘাত কোনো বদ কুত্তা ছিলাম আমি। মানে এত বিস্কুট খেতে ভালোবাসি দেখেই মনে হয়। হয়ত কোনো এক বেখেয়ালে ভুল করে বলে ফেলেছিলাম, "শালা মানুষে এত বিস্কুট খেতে পায় পরের জন্মে মানুষ হলে ভালো হয়"।তারপরেই এই দুর্দশা, মানুষ হবার এত হ্যাপা সইতে হচ্ছে!
কিন্তু এই যে এত মানুষের এত অকারণ  ভালোবাসা আমি পাই, শুধু মানুষ কেন গাছেদেরও পেয়েছি,কেউ না জানুক আমি জানি সে কথা....এত মায়া এত ছায়া এসব বড়ই মহার্ঘ্য জিনিস। হ্যাঁ সফল সুদর্শন ঝকঝকে পুরুষ আমি নই কিন্তু আমার পাওয়ার ঝোলাটাও কম না...প্রতিদিনের খারাপের মধ্যে যে ভালোটুকু, সে দিয়ে কুড়িয়ে বাড়িয়ে বলে ফেলাই যায় হয়ত, পরের বারেও মানুষ হলে এত ভালোবাসা পাবার ঝোলা নিয়েই মানুষ হলে মন্দ হয়না।


Sunday, January 12, 2020

ঘুরপাক

এমন শীতকালের দুপুরে বাড়ি থাকা উচিত না মোটেও, কতদিন হয়ে গেল স্রেফ বেরোতে চাই বলেই বেরোনো হয় না। কাল পূর্ণিমা ছিল, অফিসের আমাদের টিমের ছেলেপুলেরা মিলে মোচ্ছবের জন্যে জড়ো হয়েছিলাম মধ্যমগ্রামে একজনের ফ্ল্যাটে। যাবার পথেই চাঁদটা দেখেছি, গোল্লা মার্কা, ডানদিক দিয়ে সাথে সাথে যেতে যেতে সামনে এসে বাঁ দিক নিল। চারদিক এত আলো তার থাকা না থাকায় তেমন কিছু প্রভেদ হয়না। এমন করে করে পূর্ণিমা চলে যাবে আমি বুড়ো হয়ে যাব কিন্তু আমার আর একটা আদিগন্ত মাঠে সভ্যতার আলোহীন জায়গায় চাঁদের আলো মাখা হবে না। সে যেন একজন্ম আগের কথা,  পূর্ণিমার রাতে পাহাড়ে চড়া, হরিণ দেখা। এই হুল্লোড়ে মেতে যেতেও খারাপ লাগবে না জানি কারন বিশে আছে। টংলিং এর বিশে না, এ রক্তমাংসের মানুষ, প্রচন্ড স্মার্ট, প্রচন্ড শার্প, যে কোনো আসর জমাতে ওস্তাদ। মুখচোরা, আনস্মার্ট আমি এই ধরনের লোক ওয়ালা জমায়েতে খুশী, আমার দিকে ফোকাস থাকবে না, সাক্সেস্ফুল পার্টির জন্যে আমার চিন্তা থাকবেনা। বিশে তো ওর আসল নাম না, ছোটমোট করে বলছি। যার ফ্ল্যাটে গেছি তার বারান্দায় একটা নারকেল গাছ লুটিয়ে এসে পড়ে, চাঁদের আলো অবশ্য আসার সুযোগ পায় না, এপার্টমেন্ট কম্পলেক্স এটা,  একগাদা আলো জ্বেলে রাখা আছে। হুল্লোড়ের কমতি ছিল না কিছু, ছেলেগুলো পার্ক স্ট্রীট ঘুরে দর করে হুকো অব্দি এনেছে। 

মাঝরাতের পর যখন আসর শেষের দিক, গ্লেনলিভেটের বোতলখানা নিঃশেষ হয়ে কোনের দিকে লুকিয়ে গেছে, ছাদে যাই চুপিচুপি একাই। হ্যাঁ এইবার বেশ চাঁদ দেখা যায় বটে। আহা চারদিক চুপচাপ তারমধ্যে চাঁদের আলোয় বিরাট একটা ছাদ....আরেকটু চারদিকের অকারণ বিজলিবাতি নিভে গেলেই পরীরা নামত। নেহাত পরী দেখতে নেই মানুষের, আমি নেমে আসি। আহা বড় ভালো একটা দিন গেলো....সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে গুনগুন করছিলাম, কিচ্ছু চাইনি আমি আজীবন ভালোবাসা ছাড়া।হঠাৎ নিজের মনেই হেসে ফেলি, এ গানের লাইনের সাথে আমার মোটেই মেলেনা। নিজের কাছে সত্যি লুকিয়ে লাভ নেই, আজীবন আমি অনেক কিছু চেয়েছি, চাই....ভালোবাসা অবশ্যই চাই, তবে একরকম ভালোবাসাই খালি তা না। এ ছাড়া ভালো থাকা, ভালো ঘোরা,  মেলা জিনিস....সেদিন এক দাদা বিশেকে বলছিল, "কেন দেশ ছাড়ছিস বেকার, যতই পয়সা হোক সেই তো মনে হবে কম পড়ছে, আরেকটু হলে ভালো হত। তার চেয়ে এখানে বন্ধু বান্ধব পোষ্য গাঁজা নিয়ে ভালোই তো আছিস।" গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে দেশ, বিদেশ....কেউ কেউ না ছুটে পারে না। 

সকালে ঘুম ভাঙা চোখেই মনে হয় পালাতে হবে।মদের গ্লাস, হুঁকো পেরিয়ে.... অনেকদিন শীতের রোদে চুল শুকোনো বুড়ি, ব্যা ব্যা করে ডেকে চলা ছাগলছানা, নদীর ধারে নৌকা সারানো, দেখতে দেখতে পথ চলা হয়নি.....

***************************************

কিছু পেতে ইচ্ছে হলে তার জন্যে এফোর্ট দিতে হয়, না ভুল বললাম, বিনা প্রচেষ্টায় পাওয়া যায়না তা না,  বাপ ঠাকুর্দার উত্তরাধিকার মেলে, সেটা এনক্যাশ করাই যায়। তবে নিজের কিছু ইচ্ছে,শখ লক্ষ্য থাকলে তা বিনা আয়াসে মেলেনা। বেরিয়ে পড়া হচ্ছেনা বলে কাল কাটিয়ে আপশোষ করা আমার সয়না। তাছাড়া আমি ভালো করে দম নিতেও পারছিলাম না যেন, শীতকালটা নিষ্ফলা কেটে যাবে? জমিতে নেমে মাঠের ঘ্রাণ নেব না কিংবা দুম করে বেরিয়ে সারাদিন যথেচ্ছ ভাবে চা, কাঠিভাজা কিংবা রাস্তায় বানানো গজা খেয়ে জিনসের পকেটে হাত মুছে হুট করে উড়ে যাওয়া কোনো পাখি দেখে দাঁড়িয়ে যাব না তাও কি হয়! সুতরাং সপ্তাহান্তের একগাদা কাজ ফের পেন্ডিং করে দিয়ে বেরিয়ে পড়তেই হল। কোথায় যাব জানিনা, বেলাও হয়েছে মেলা, তবে আমার একটা কম্ফোর্ট রাস্তা আছে, দুপাশে ভেড়ি, গাছপালা মফস্বলি বাজার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার স্পেশাল একটা ডায়লেক্ট সমৃদ্ধ সে জোন। বাসন্তী হাইওয়ে।

 কোথাও পৌঁছতেই হবে এমন চিন্তা নিয়ে বেরোইনি বলেই হুট করে একটা রাস্তা দেখে মনে হল, এটা কোথায় যায়? গিয়েই দেখা যাক। আরিব্বাস রে, এত কাছে এমন একটা জায়গা আছে? খালের পাশ দিয়ে সার সার নারকেল গাছ, এদিকে পিকনিক স্পট ভাড়া হয় মনে হয়, রাস্তাটা ঢালাই রাস্তা। একটা বেঁটে মত গাছে একটা ফিঙে বসে দোল খাচ্ছে। দেখেই হাত কামড়াতে ইচ্ছে হল, এহ ক্যামেরাটা নিয়ে বেরোলামনা কেন! ধুর ধুর এইসব হিসেব করে বেরোনো কি আর আমার হয়! আমার গন্তব্য মাঝরাস্তায় ঠিক হবে, গাড়ির জ্বালানী যে ভরতে হবে হঠাৎ খেয়াল হবে, ক্যামেরার বদলে চোখ আর মোবাইল ভরসা হবে, এ এতই স্বাভাবিক নিজেকে আর গালমন্দ করিনা। বেকার করেই বা কী হবে! এ বয়সে কি আর শোধরাবার, তার চেয়ে যা আছে তাই নিয়েই ঘর করে নিই। ভারী নিরবিলি এলাকাটা, পিকনিক এবং তজ্জন্যে নিয়োজিত উব উব উব সিজন কেটে গেলে একদিন আসতে হবে আবার। গরমকালে এত বক দেখতে পাবো না হয়ত কিন্তু বটের হাওয়া তখনও থাকবে। আরে তাই তো, বট গাছ কতদিন পর দেখলাম! ভাবো!  বট, অশ্বত্থ, পিপুল আমাদের দেশী গাছ অব্দি আর দেখতে পাইনা সহজে হ্যাঁ, খালি শিকড়হীন ছায়াহীন সব গাছ।ফিঙে দোয়েল, বক দেখতেও কি আর পাই সহজে! তিনটে গোলাপি মতন ছানা শূয়োর গুটগুট করে ভেড়ীর বাঁধ ধরে চলেছে। একটা পিকনিক পার্টির পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখি ফিশ ফিঙ্গার নামিয়েছে, একগাদা লোভ দিয়ে গেলাম মাইরি। একাবোকা অতিথি মানুষকে চাট্টি ফিশ ফিঙ্গার দিয়ে আপ্যায়ন করা সেই সংস্কৃতি আজকালকার ছেলে ছোকরারা আর মানছে না দেখছি। ভাবলাম এট্টু সেসব সোনালীদিন মনে করিয়ে দিই, থাক বাবা চেলা কাঠ নিয়ে তাড়া করলেই চিত্তির হবে। 


চা না,  একটা ফিশ ফিঙ্গার না, যা যা তোদের রাজহাঁসে তাড়া করবে হুহ্। চলেই যাব যা। রাস্তায় একটা কালীমন্দির পড়েছিল, মনের দুঃখে ভিতরে নজর চালিয়ে দেখে নিলাম পুজো টুজো হয়েছে কিনা, অন্তত একটা নকুলদানা জুটতো।  নাহ্ ছেলে ছোকরাগুলোর ভক্তি টক্তি মোট্টে নেই! আরে পুজো কর ভোগ দে না হলে খামোখা মন্দির বানিয়ে লোভ দেখাবার কি! যত্তসব ইয়ে, যাকগে আমিও হ্যাংলা নাকি। আরো খানিক এগোই, স্পীড দিচ্ছিনা বেশী, বেশী জোরে ছুটলে চারপাশের অনেক কিছু মিস হয়ে যায়, আমার তো প্রথম হবার চাহিদা নেই, আমার বরং চারপাশ থেকে রঙ রূপ রস নেবার আছে। চলতে চলতে হঠাৎ মনে হয় আচ্ছা চন্দ্রকেতুগড় গেলে কেমন হত? সেটা অবশ্য বসিরহাট এর ওদিকে না? গুগল বলছে এখান থেকেও যাওয়া যাবে, তিরিশ কিলোমিটার মত মোটে।  এরাস্তায় অনেকবার এর আগে এসেছি, ঝড়খালি অব্দি গেছি কখনো, কখনো সন্দেশখালী,বড় আর ছোট পরিতোষপুর। মালঞ্চ যাবার আগেই চৈতল এর ওখান থেকে বাঁয়ে নিতে হবে, কিন্তু এই রাস্তাটাই যে বড় ভালো লাগছে?

এ দ্বন্দ্ব মনে হয় আমার সর্বক্ষনের, সারাজীবনের সঙ্গী হবে। এ দ্বন্দ্ব মিটলেই আমার মুক্তি হয়ে যাবে আমি জানি। যে রাস্তায় চলেছি তা যতক্ষন আমায় রঙ রূপ রসের জোগান দিয়ে চলেছে, মনের আরাম দিয়ে চলেছে ইচ্ছে করে না সে রাস্তা ছাড়তে। মিস হয়ে যায় অনেক অনেক কিছু তাতে,  কিন্তু আমি নাচার। আজ থাক বাঁয়ের রাস্তাটা আজ অতটা টানছেনা যতটা সামনের রাস্তাটা, দুধারের ভেড়ি নিয়ে টানছে। সুতরাং স্টিয়ারিংএ মোচড় পড়ে না, চলতে চলতে মালঞ্চর আগে একজন বলল, বসিরহাট দিয়ে ঘুরেও বেঁড়াচাপা পৌঁছনো যাবে। বেশ বেশ, তাই যাব খন। মালঞ্চতে একটা লোক ছোট্ট একটা ভ্যানে মিষ্টি বেচছিলো গতবার, কী খেয়েছিলাম মনে নেই, লোকটাকে মনে আছে আর তার হাসিটা। তাকে পেলামনা আর, কোথায় চলে গেছে কে জানে। চা খেয়ে কাঠিভাজা আর গুড়কাঠি চিবোতে চিবোতে ফের চলা শুরু। চেনা চেনা নামগুলো দেখে ভারী আনন্দ হচ্ছে, এসব জায়গা নাকি খুব গোলমেলে। গোলমেলে তো বটেই, আমায় কেমন বেঁধে ফেলেছে, এই রাস্তাটা, কেমন ফিরে ফিরে আসতেই হয়। হঠাৎ করে বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি সবুজ আর হলুদের রঙে ক্যানভাস ঢেকে গেছে। 





একটা মলিন দোকানের সামনে লুঙিপরে উবু হয়ে বিড়িবাঁধছে একজন। তার দোকানের সামনেই থামা গেল। পায়ে পায়ে জমির ধারে এগিয়ে যাই, রঙের সমারোহ তো চলতে চলতেই দেখেছিলাম, এখন নাকে এলো ভুলে যাওয়া কোন ছেলেবেলার ঘ্রান। সর্ষেফুলের গন্ধ, মাটির গন্ধ। আহাহা। বুক ভরে শ্বাস টানি, মাটির এই গন্ধটা বুকে যেতেই যে শান্তিটা হল, আমি ঠিক বোঝাতে পারব না। একটা বউ আসছে একটা মা ছাগল আর আর একটা মানুষ আর একটা ছাগলের ছানা নিয়ে। শান্ত দুপুর। দূরে রাস্তা দিয়ে সাইকেলে কেউ কেউ চলে যাচ্ছে। মনের মধ্যে অনেকটা আরাম পুরে নিয়ে ফের চলা শুরু। এবার ঘড়ির দিকে চোখ পড়ল, তিনটে দশ, নাহ আজ আর চন্দ্রকেতু গড় যাওয়া যাবে না। যদিও একজন বলেছে ভেবিয়া শ্মশানের ওখান থেকে শর্টকাট আছে একটা, তাও থাক, বরং নদীর দেখে আসি একটু। সুতরাং আবার সেই টাকি।

টাকি পৌঁছে হাত কামড়াচ্ছি। কেন এলাম!  পিকনিক মাইক, থিকথিকে ভীড়। কোনোরকমে পার্কিং এরিয়া থেকে বেরিয়েই হনহন করে হাঁটছি যতটা সম্ভব এই ভীড় পার হওয়া যায়। পিকনিক মানেই মাইক আর বক্স মাস্ট না? কেউ কারো কথা শুনতে পাচ্ছেনা, কোনো দল মদ খেয়ে টাল, কেউ বেলা পৌনে চারটের সময় বেশীরভাগ জায়গায় খেতে বসেছে সবে। আমি গেঁয়ো কিনা, আমার পিকনিক মানে, দল বেঁধে রান্না করে মাংস ভাত খাওয়া। সে সব মনে হয় এখন চলে না, তাছাড়া মাংস এমন কিছু মহার্ঘ্য না আজকাল, আরো আইটেম তো চাইই। হনহন করে মেন জেটি পেরিয়ে যাই। আরো অনেকটা হাঁটলে আমি জানি একটা মাচা পড়বে, সেখানে বসে থাকব না হয় খানিক। কিন্তু এত আওয়াজ আর লোক, উহ কী ভুলটাই না করলাম। চলতে চলতে একজন ডাক দেয়, হাত নৌকায় চড়বে? হাত নৌকায় আমার বরাবরের টান, তাছাড়া ভুটভুটিতে এত আমোদপ্রেমী মানুষের ভীড় আমার সইবে না। সুতরাং মিঠুনের (নামটা পরে জেনেছি) নৌকায় আধঘন্টার কড়ারে ওঠা গেল। বাপ ছেলে দুজন দুদিকে বসল, আমি মাঝে। আসলে মাছ ধরা নৌকা, শীতে মাছ মেলেনা তেমন তখন লোক নিয়ে ঘুরিয়ে আনে। নৌকা চলরে শুরু হতেই আওয়াজের দাপট কমে আসে। মিঠে রোদে শান্তি লাগে বড়। বাংলাদেশের বাঁধ ব্যবস্থা থেকে, মিঠুনের পারিবারিক খবর সব রকম গল্প হয় ইছামতীর বুকে। কোলকাতা মিঠুনের বাবার ভালো লাগেনা, অসুখের জন্যে থাকতে হয়েছিল বটে। আমায় বর্ষায় গেলে টাটাকা ইলিশ খাওয়াবে, হোটেলে ওঠারও দরকার নেই ওর ঘরেই সব  ব্যবস্থা হয়ে যাবে আমার। এত ভালোবাসা আমি পাই প্রতিবার ইছামতীর তীরে আমার ঝোলা ভরে যায়।আমার অপটু হাতের দাঁড় দিয়ে মিঠুন হাসে, আমার নাগরিক স্বার্থপর বলেনা ওর বোনেদের শ্বশুরবাড়ির দিকে গেলে আমার বাড়ি যেন যায়। মাটির সাথে থাকা এই মানুষগুলো আরেকটু বেঁচে থাক, ভালোবাসার বড় অভাব, বড় বেশীভিতর থেকে খালি হয়ে গেছি, পরের বার যেন ওই রকম করেই আমিও ডাক দিয়ে যেতে পারি।

নদীর ধার ধরে আরো খানিক হেঁটে ফিরতি পথ ধরি, আকাশে তখন লালের নানান শেডের কেরামতি চলছে। সুয্যিদেবের গাল্ফেন হয়ত লিপস্টিক পছন্দ করতে গেছেন! মীনাখাঁ বাজারে থেমে চা খেতে গিয়ে  কি খেয়াল হল চাউমিনের অর্ডার দেওয়া গেল। বাপ্রে এ চাউমিন, না আমার ফ্রেন্ডলিস্ট! মানে সর্ষের তেলে ভাজা সে চাউমিনে বাদাম থেকে ধনেপাতা, জিরেগুঁড়ো থেকে ভিনিগার কী নেই!! সভয়ে চেয়ে দেখি, পাশের ছেলেটা কাগজের উপর ভেজিটেবল চপ নিয়ে তাতে আধ হাতা কুমড়োর সস, সোয়াশ কাসুন্দি, পাঁচ বিঘে জমির শশা, গাজর সব উপুর করে দিয়েছে। নিজের প্লেটটা তাড়াতাড়ি আড়াল দিয়ে হামহাম করে খেয়ে নিলাম। কী দরকার বাবা, আমার প্লেটের দিকে কেমন করে যেন তাকাচ্ছিল, হয়ত ক্ষেতের লাউ টাউও কিছু আছে দিতে চায়! 

ভেবেছিলাম চাঁদের আলো মেখে ফিরব। কিন্তু চাঁদ উঠলো যতক্ষনে আমি কোলকাতার আলোজ্বলা রাস্তায়। চাঁদটা যেন চোখ মেরে বলছে,  অতই সোজা নাকি হে, এক যাত্রায় সব পেয়ে যাবে..."আমায় নিয়ে ঘুরতে হলে আবার বেরোতে হবে,  সব কিছু পেয়ে গেলে বাঁচতে ইচ্ছে করবে নাকি? পরেরবারের জন্যে খানিক বাকি রইল না হয়।তদ্দিন যা পেলে আজ, তা নিয়ে উটের কুঁজ বানিয়ে নাও, তেষ্টায় কাজে দেবে।"

Wednesday, January 1, 2020

হ্যাপ্পি নিউ ইয়ার

কাল এক বন্ধুর বাড়ি জড়ো হয়েছিলাম কয়েকজন। আড্ডা মেরে খেয়ে দেয়ে হুট করেই ইচ্ছে হয়েছিল আরেক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে সারপ্রাইজ দেবার। কাল মদ টদ খাওয়ায় হবে জেনেই গাড়ি নিয়ে বেরোয়নি, এক বন্ধু তার সাইকেল বের করল, সাইকেলের পিছনে বসে মাতাল, হুল্লোড়ে মানুষ আর কুকুরের পাল সামলে মিনিট কুড়ির কোলকাতার রাস্তা। ভারী অদ্ভুত লাগছিল, আজ থেকে এক নতুন দশক শুরু হল। এক দশক আগে এরকম মাঝরাতে সাইকেলে করে বেরোবো এ ভাবতেই পারতাম না।জীবনের এই যে বাঁক গুলো দেখা যায়না,  স্পীডে গাড়ি চলতে চলতে বাম্পার চলে আসে, মনে হয় অনন্ত খারাপ রাস্তা খালি আছে সামনে, তারপর কখন যেন ফের রাস্তা মসৃন হয়ে যায়, দুপাশে গাছ দিয়ে ঢাকা রাস্তায় ঢুকে পড়া যায় আচমকাই, এতেই বাঁচাটা বড় রোমাঞ্চকর মনে হয়। এরকমই কোনো পয়লা জানুয়ারি একলা বরফঢাকা এয়ারপোর্টে বসে কেটেছিল, কোনোটায়  বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রনায়, কোনোটায় মা পরের দিন মটরশুঁটির কচুরি করবে সেই আনন্দে,আবার কোনোটা কিচ্ছু না স্রেফ আরাম করে ঘুমিয়ে। 

 রাত দেড়টা বলে মনেই হয়না!! এত লোক এত গাড়ি। একটা ছেলে মাতাল হয়ে তার বাবাকে চেঁচিয়ে বলছে, "ঘরেএএ ঢোক বলছি, চল ঘরে চল"।  আর তার বাবা তাকে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে চলেছে, সংলাপ অদলবদল হয়ে গেছে আর কি মদের প্রভাবে। একত্রিশে ডিসেম্বর মানেই মদ খেতে হবে আর তারপর এরকম ছড়াতে হবে এমন নিয়ম কবে হল কে জানে! একটা গলিতে ভুল করে ঢুকে পড়েছিলাম, রাস্তা গোলমাল করায়, দেখি এক গাড়ি ছেলে মেয়ে মিলে গাড়ি থামিয়ে, অসংলগ্ন ভাবে কী সব যেন বলছে। এক মোড়ে কিছু লোক খামোখা বাওয়াল দিয়ে দিল একটা খালি ট্যাক্সিকে, কেন যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা লোককে হর্ণ দেবে! মাতালদের পাশ কাটিয়ে চলেছি আমরা। সাইকেল দেখে কেউই কিছু বলছেনা,খালি একপাল কুত্তা তাড়া করে আসা ছাড়া। বাপ্স কামড়ে দেবে নাকি! পায়ের গুলিটা তাক করেই ছুটছে যে! একটা পুলিশের গাড়ি টহল দিচ্ছে। উৎসবের রাতে এদের জ্বালা বাড়ে।

সকালের রোদে চোখ খোলে, ঘুম পুরো না হওয়ার জ্বালা নিয়ে। বন্ধুরা মিলে হইচই করে লুচি বানাই, ট্যারাব্যাঁকা, শক্ত, খড়মড়ে লুচিই হেব্বিই স্বাদ আনে নলেন গুড়ের সাথে। আহা এমন রোদ মাখা সকালে নলেন গুড়ের সঙ্গতে যে সকাল শুরু হয় তা খারাপ হতে পারেনা। একটা কাক এসে বসে জানলায়, এই নে তুইও একটা খা গুড়ে মাখা লুচি, বচ্ছরকার দিন বলে কথা! রাস্তাঘাট, বাস, সব ফাঁকা ফাঁকাই। অফিস পাড়া শুনশান করছে। অটোটা একটু দূরে নামিয়ে দিয়েছে, হাঁটছি। ভাতের ঝুপড়ি বা ঝুপ্স অধিকাংশই বন্ধ। একটা চা পাঁউরুটির দোকানে দেখি একটা লোক আর মেয়ে উদাস হয়ে বসে আছে। আজ বিক্রীবাটা নেই মোটে। রোজটা গেল। ছুটি নিলেই পারতো তো? একদিন বেশ মেয়ের বা ছেলের সাথে কাটাতে যে ইকোপার্ক কিংবা চিড়িয়াখানা,  এমন উদাস হয়ে বসে না থেকে। আসলে আমাদের মধ্যে ভালো থাকা অপরাধ এ ছোটবেলা থেকে গুঁজে দেওয়া হয়, "দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরছিস, ভালোইই তো আছিস",  "ওর আর কি, বিয়ে থা হয়নি, দিব্যি আছে",  "ওদের ঘোরাঘুরির সমস্যা কি, বাচ্ছাকাচ্ছা হয়নি, ভালোইইই আছে"।  সব কটা "ভালোইই" একটা অদ্ভুত সুরে শ্লেষের সাথে বলা! যেন ভালো থাকাটাই দোষের। সারাক্ষণ "খুব চাপে আছি" বললেই তুমি দায়িত্বশীল কর্মঠ একজন মানুষ। 

এত চাপ নিয়ে বেঁচে কি হবে! বুড়ো হাড়ে পাহাড় বাইতে পারবেন না, লজেন চিবিয়ে আরাম পাবেন না, নদীর জলে নামলে ঠান্ডা লাগবে, সুগারে নলেন গুড় নিষিদ্ধ হয়ে যাবে আর ফোকলা দাঁতে মাংসের হাড় চিবিয়ে সুখ হবে না। এই নতুন বছরটা উদযাপনের হোক না, ভালোবাসার, ভালোথাকার। শুভেচ্ছা রইলো।

Sunday, December 29, 2019

ভুটে আর ছোটকা

- ছোটকা
- হুঁ
- ও ছোটকা

- বলবি তো

- তুমি সন্ন্যাসী হয়ে গেছিলে কেন?

- কে বলল?

- ওই তো মা আর বাবা সেদিন কথা বলছিলো...

- ও আজকাল অন্যদের আলোচনায় কান পাতার অভ্যেসও তৈরী হয়েছে!

- না না, ওরকম না। আমার সামনেই বলছিল, তাই ভাবলাম তেমন পার্সোনাল কথা নিশ্চয়ই না। বলো না ছোটকা সন্ন্যাসী হয়ে গেছিলে কেন?

- হুম। তা ভুটেবাবু সন্ন্যাসী কাকে বলে জানা আছে?

-হ্যাঁ জানি তো। ছোট সংসারের মধ্যে আটকে না থেকে, পার্থিব জিনিসের মায়া ত্যাগ করে ভগবানের সন্ধানে যাওয়া।

- আরিব্বাস! ভুটেবাবু! পার্থিব, সংসারের মায়া, কী কেস রে? অংক ক্লাসের নতুন মেয়েটা পাত্তা দিচ্ছেনা?

- আহ ছোটকা! তোমার সবেতেই ঠাট্টা খালি। ঠিকাছে বাদ দাও, আমি যাই।

- আরে চটিস কেন! সত্যিই তো এ সব জিনিস নিয়ে ইয়ার্কি করা ভালোনা মোটেই। তা কী বলছে সে?

- কে আবার কী বলবে!

- ওহ। আচ্ছা ছাড় এসব, চল মন্টুর দোকানে নতুন একটা কারিগর এসেছে, মাছের ডিমের বড়া যা বানাচ্ছেনা রে। চল চারটে করে মেরে আসি।

- নাহ। তুমি যাও। আমার শরীরটা ভালো নেই!

- ওহ। হ্যাঁ শরীর ভালো না থাকলে এসব খাওয়া ঠিক না। তা যাবি নাকি কাল, পাঁচ নম্বর পুকুরে এপার ওপার এর রেস দিতে?

- নাহ ছোটকা, তুমিই যাও। আমার সামনে টেস্ট আছে, ঠান্ডা লেগে গেলে সমস্যা হবে।

- তাও বটে তাও বটে। তাহলে বুঝলি ভুটে এ কদিন তোর ডায়েটেরও বদল আনতে হবে, ঝোল ভাত, আর পেঁপে সেদ্ধ। আর সকালে এক গ্লাস লাউএর রস নাকি? মানে সামনে যখন টেস্ট আর শরীরটাও তোর ভালো নেই বলছিস। আরে আরে অত মুষড়ে পড়ছিস কেন, আচ্ছা আচ্ছা লাউ বাদ।
আচ্ছা আচ্ছা নে এবার বলতো কী হয়েছে। কে এমন পাপিষ্ঠ থোড় কিংবা লাউ মানুষ রূপে আমাদের ভুটেবাবুকে এত যন্ত্রণায় ফেলেছে! তোর ছোটকা আছে না, এত চিন্তা করছিস কেন?

- আমার না ভালো লাগছে না কিচ্ছু ছোটকা। আমি কেন তোমাদের মত হলাম না বলতে পারো? আমার মাথায় বুদ্ধি কম, আমি পড়াশোনায় তুখোড় না, সেরা জায়গা আমার জন্যে না, আমার হাইট দেখো, চেহারা দেখো, লোকজন খোরাক করে, অংক কোচিং এর মেয়ের কতগা বললে না? হুহ আমার দিকে তাকাবে এমন ভাবনাই অসম্ভব। তুমি বলবে আমি হীনমন্যতায় ভুগছি, এসব বাজে কথা, আমার থেকেও আরো কত কত লোকে খারাপ আছে তাই তো? আমি জানি ছোটকা এসব, কিন্তু আমার থেকে ভালোও তো কত লোকে আছে বলো। আমি কেন সেই সেরাদের দলে না? প্লিজ ছোটকা আমায় বোকোনা, হেসোনা। আমি কাউকে বলতে পারিনা এসব, আমার ভালো লাগেনা কিছু। মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে চলে যাই।

- বেশ। বুঝলাম। না আমি হাসবোও না, বোকবোও না। ভুটে তোর ছোটকা কিছু সেরাদের দলে পরে না। না, না, আগে আমায় বলে নিতে দে। তুই বলছিলিনা, আমি কেন সন্ন্যাসী হয়ে গেছিলাম? আমি সন্ন্যাসী হইনি, স্রেফ বলতে পারিস ভবঘুরে হয়ে গেছিলাম। তুই জানিসই আমি নাস্তিক, ভগবানের খোঁজে আমায় যারা ভালোবাসে তাদের ফেলে বেরিয়ে যাওয়া আমার জন্যে না। আমি গেছিলাম কেন, সে প্রসঙ্গ আপাতত থাক, আমি ফিরে এসেছিলাম কেন সেটাই বলি বরং।
ঘুরতে ঘুরতে আমি সেবার একটা শহরের গঙ্গার কাছে এক বস্তির কাছাকাছি একটা আস্তানায় থাকি। দাড়ি গোঁফে এমন চেহারা হয়েছিল, আর ইচ্ছে করেই একটা গেরুয়া পরেছিলাম বলে খাওয়ার অভাব হতনা। তো আমার মনের অস্থিরতা কমেনি কিছুই, বিরক্ত লাগে সব কিছুই, হতাশ লাগে তোর মতই। মনে হয় আমি অপদার্থ। আমার বন্ধু বান্ধবরা বিরাট চাকরি করে তখন, কেউ কেউ ভারী চমৎকার গান করে, কেউ ভালো খেলে...আমি ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছি! সে সময়েই খেয়াল হল হঠাৎ, বস্তির লোকগুলোর আনন্দ ফূর্তির কম নেই। মানে খুবই আশ্চর্য ব্যপার, এই আজ অমুক পুজো, কাল ডান্স ধামাকা, পরশু তমুক। তবে লোকগুলো বেশীরভাগ পুজোয় আশপাশের সকলকে খাওয়াতো, ওদের সামর্থ্য মত। আমি খুব তাচ্ছিল্য ভরে ভাবতাম, অশিক্ষার কারনে এসব করে৷ দুঃখের এত কারন তাও দুঃখ নেই, নির্বোধ ভাবতাম ওদের এতই নির্বোধ ছিলাম।
তারপর জানিস একদিন খেয়াল হল, আরে আমার বিরাট চাকরি করা সফল বন্ধু গুলোও তো দিন রাত খেটে, অবসরে এই হুল্লোড়টাই করে পাবে গিয়ে বা পুজোয় বা বারে। তারপর বলে, এত স্ট্রেস আর ভাল্লাগেনা।

ভাবলাম খুব বুঝলি ভুটে, ভালো থাকা খারাপ থাকা আসলেই তো নিজের উপর। আমি দশটাকায় ভালো থাকতে পারি আবার একশো টাকাতেও পারি। হয়ত দশটাকায় ভালো থাকাটা একশো টাকায় ভালো থাকা লোকটা বুঝতে পারছেনা তাই ভাবছে আমি খারাপ আছি। আমি খারাপ আছি না ভালো সেটা অন্যের ইলিউশনে হয়ে যাচ্ছেনা তো? বুঝতে পারছিস ভুটে কী বলছি?

- হ্যাঁ ছোটকা, মানে এই যে বড়রা ভাবে এখনকার আমাদের ভিডিও গেমস জীবন কীই দুঃখের, এদিকে আমরা দিব্যি আছি সেরকম না?

- কারেক্ট। একদম তাই। যেই মাত্র এটা ভাবলাম, অমনি মনে হল, বেশ তো আমার জীবনটা অন্যের চোখে "সফল" কিনা দেখার বদলে, নিজের চোখেই দেখি একবার? ঝেড়ে ঝুড়ে দেখলাম, আমার ছেঁড়া জামার পকেটে বোঝাই করা মনি মানিক! দাদা, বৌদি,দিদি, মা বাবা, দু চার খানা বন্ধু বান্ধব, তুই তখন হোসনি তাই তোকে কাউন্ট করিনি, যাইহোক সব্বাই আমায় কত ভালোবাসে তা টের পেতে বেগ হলনা। জানিসই তো ভালোবাসা দিব্যি বোঝা যায়। তো যেনা টের পাওয়া, দেখলাম, আমার সকালের রোদ মাখা বিছানায় যে ওম লেগে থাকে রাতের চাঁদের আলোয় তা ঝকঝকে হয়ে যায় কেমন। বুঝলি ভুটে, তুই হয়ত সেরা না, তুই হ্যান্ডসাম না, হয়ত কেন তাইই, তুই যা বললি তা মেনেই নিলাম, সবাই দিব্যি সোজা সরল পথে তরতর করে এগিয়ে যায় তুই পাক খেয়ে খেয়ে লগি ঠেলিস, তাও ভুটে দেখবি হয়ত ওই পাক খেতে খেতেই একটা ডলফিন ঘাই মারলো, অনূকুলে পাওয়া হাওয়ার তরতর করে এগিয়ে যাওয়া নৌকাটা সেই ডলফিন মিস করে গেল।

এক জীবনে সব মেলে না রে ভুটে, তার জন্যে হা হুতাশ করার বদলে না পাওয়া গুলোকে সঙ্গে নিয়ে চলতে গিয়ে দেখলি আচানক সব রামধনু জুটে গেল।

- ঠিক। আমার কোনো বন্ধুর এমন ছোটকা নেই এ আমি হলফ করে বলতে পারি। ইয়ে, মন্টুর দোকানে যাবে নাকি? শরীরটা এখন দিব্যি চাঙ্গা লাগছে কিনা....

Wednesday, December 18, 2019

তাড়াহুড়োয় তাড়োবা (শেষ)

বাঘ দেখে ফিরে ভয়ানক খিদে পেয়েছে দেখে গেটের বাইরেই এক হতভাগা রেস্তোরাঁয় ঢুকে পরা গেল। সে এক আজব রেস্টুরেন্ট মাইরি! ধরো খাবার অর্ডার দিলে,  বলল দেরী হবে কিন্তু, তুমি অন্য একটা অর্ডার দিলে বলল আচ্ছা এটা হয়ে যাবে এক্ষুনি। তো স্বাভাবিকাবেই জলদি হবে এমন জিনিস, ডিম পাঁউরুটি অর্ডার দেবে তুমি। তাতেও দেখবে এক্ষুনি ব্যাপারটা কালের কাছে স্রেফ মায়া। তার এক্ষুনি আসলে আধঘন্টা, কিন্তু তাতে কি, পুরো মহাকালের তুলনায় সে তো নখের ডগাও না। তাই তুমি বসেই থাকবে বসেই থাকবে, ঘড়ির কাঁটা সরে যাক, খিদেয় তুমি নেতিয়ে যাও, যাই হয়ে যাক। আমায় এমন হাব্লা মত দেখতে কাউকে তাড়া দিলেও পাত্তা দেয়না। সমুটা বেশ লম্বা চওড়া আছে , সৌরভটাও কুস্তিগীর মত হয়েছে দেখতে, কিন্তু দুটোই ভারী মোলায়েম স্বভাবের। কাউকে গিয়ে ধমক দিয়ে বলবে সে ওদের ধাতে নেই, নিজের মনে বিড়বিড় করবে , তারপর হয়ত দুটো ঘাসের ডগাই চিবোবে। আর দলের মেয়েগুলোও ওরমই , তাদের আবার যত ধমক ধামক মার ধোর আমাদের উপর, কিচ্ছু না করলেও , বাইরে বলতে বলো ঝিম মেরে পড়ে থাকবে। শেষে আর্যদা গিয়ে দাঁড়াতে সামান্য মিলি সেকেন্ড তাড়াতাড়ি করল বটে।

তখন বেশ রোদ উঠে গেছে। রিসর্টের চারদিকে যে উঁচু উঁচু ঘাসের বন দেখে মনে হয়েছিল কাল রাতে বাঘ লুকিয়ে বসে আছে, আজ কেমন রুক্ষ মত মায়া মায়া লাগছে। চারদিকটা বেশ ফাঁকা, রিসর্টে বেশী কাউকে দেখতেও পাচ্ছিনা। যদিও আরেকটা গাড়ি আছে এখানে। এমন পাখি ডাকা শান্ত পরিবেশ,  এমন ছুটি আমাদের খুব একটা মেলেনা কারোরই। এলোমেলো ছড়িয়ে বসে আড্ডা হচ্ছে,  তারই ফাঁকে একজন দুজন করে গিয়ে চান সেরে আসছে। সৌরভ এর ইচ্ছে ঘুম, এর মধ্যেই ঘুমিয়েও পড়েছে। কাল সারা রাত থেকে প্রায় জাগা, পেটে খাবার পড়তে আর এমন শান্ত পরিবেশে ইচ্ছে করছিল শুয়ে পড়তে। কিন্তু আমাদের ফের একটা সাফারি আছে। এবারের সাফারিটা ঘোষ দিয়েই বুক করা ছিল, তাই রিসর্টেই আনতে এসেছিল লোক। রাতের অন্ধকারে টের পাইনি, কিন্তু দুপুরের রোদে দেখতে পেলাম রিসর্ট আর মোহারলি গেটের মাঝে মস্ত একটা জলাশয়।  একটু দূর থেকে হুডখোলা জিপে বসে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।

দুপুরের জঙ্গল সকালের থেকে আলাদা। শীতের দুপুরে গাছগুলো সারসার দাঁড়িয়ে। সকালের হিহি ঠান্ডা এখন নেই। নিস্তব্ধ জঙ্গলে মাঝে মাঝে মাঝে দুটো চারটে পাখির ডাক,  হরিনের ডাক। শুরুতে একটা সম্বর দেখে এদিক ওদিক ঢুঁ মারছি, এখনো কিছু পাইনি তেমন। তারপর হঠাৎ খুব উত্তেজিত হয়ে বলল কল শোনা গেছে কল শোনা গেছে। হুড়মুড় করে জিপ নিয়ে গেলো।  বাঘ ওই জঙ্গলে দেখা গেছে অল্প, এবার তিনি যে কোনো দিকে যেতে পারেন। এমন কি আরো গভীর জঙ্গলেও যেতে পারেন। সবাই অপেক্ষা করছে।  অপেক্ষা করতে করতেই দেখি একটা ডালে এক ঝাঁক হরিয়াল বসেছে। ওইদিকের গাছে ছোট্ট একটা দোয়েল পাখি মনের আনন্দে দোল খাচ্ছে। ওই একটা কাঠঠোকরা উড়ে গেল। কোনো চাপ নেই জীবনে, বাঘ দেখতে পাওয়ার, দেখাতে পারার কিচ্ছু না। ঝলমলে কটা প্রজাপতি উড়ছে এদিক্সেদিক।দূরে একপাল হরিণ অব্দি ঘাস খেয়ে চলেছে একমনে। জাস্ট পাত্তা দিচ্ছে না বাঘ আসতে পারে কি পারেনা তার। আর মানুষগুলো, ছুটিতে এসেও বাঘ দেখতে পাবে কিনা, পেলেও ক্যাপচার করতে পারবে কিনা সেই নিয়ে উৎকন্ঠায় কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে!  সুখ শান্তি আসলে মানুষ হারিয়েই ফেলেছে!









অনেক্ষন এদিকসেদিক করেও পাওয়া গেলনা বাঘের দেখা। খালি একদিনের বাসী বাঘের বর্জ্য দেখা গেল। এ জঙ্গলে একটা বেশ সুন্দর গাছ আছে। এরা বলে ঘোস্ট ট্রি। সাদা,  লাল আর বাদামী তিনটে কালার চেঞ্জ হয় সারা বছর ধরে।  ভারী সুন্দর গাছ। সাদা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে ডালপালা মেলে ভূতের সিনেমা ভাব আসে বটে। এ জঙ্গলে শাল গাছ প্রচুর আছে। তাড়োবা লেকে নাকি কুমীর আছে বলছিল। মিথ্যে না সত্যি কে জানে! এইসব জায়গায় এলে আমার কেমন মনে হয়, আমরা কখন চলে যাব তার অপেক্ষা করে গাছগুলো। চলে গেলেই নিজেদের গল্পগুজব শুরু করে দেবে। গাছ টু গাছ টক, মানুষের সে কথা শোনার অধিকার নেই। নিজেদের বিরাট সভ্য ভেবে সে অধিকার তারা নিজেরাই হারিয়ে ফেলেছে!


ফেরার পথে দুপুরের দেখা বাঁধটার জলে দারুণ একটা সূর্যাস্ত দেখলাম। হালকা থেকে গাঢ় হয়ে যাওয়া লালের নানান শেড দিগন্তব্যাপী বাঁধের জলের উপর।আহা এমন রঙ এর খেলা দেখতে পাওয়াও কম সৌভাগ্য না। না সে ছবি তুলিনি আমরা , ও ছবি স্রেফ মনে তুলে রাখতে হয়।রিসর্টে ফিরে খুব খানিক কাড়াকাড়ি করে খাওয়া,  আড্ডা হল জমাটি। আমরাবেই কজন সবসময় প্রাণের নেশায় বুঁদ থাকি, আলাদা করে মদ গাঁজা দিয়ে আমাদের বুঁদ হতে হয়না, হুল্লোড় করতে,  ফূর্তি করতে আলাদা করে উপকরণ দরকার পড়েনা। নেশা আমাদের কিসে হয় কে জানে, হয়ত একইরকম কটা একটু আধপাগল, তথাকথিত আনস্মার্ট,  হাবলা লোকেরা এক হলে তাদেরই আঁচে। নয়ত এরকম জঙ্গুলে সন্ধ্যেয়, মদ গাঁজা ছাড়া এত হাহা, এত প্রাণ লোকের কাছে অবিশ্বাস্য বটে।






রিসর্টে একটা ভারতীয় মেয়ের দল আর কটা বিদেশী এসেছে। বিদেশীগুলো রাতের একটা সাফারিতে যাচ্ছে। আমাদের অফার করেছিলো, দুটো সিট আছে, কেউ যদি যাই। সবাই আড্ডা দিতেই উৎসাহী বেশী, বন্ধুদের ছেড়ে অযাচিত সাফারি কেউই নিলনা। বাইরে আগুন জ্বেলে মেয়েদের দলটা নাচ গান করছে। আমাদের দলের ছেলেপুলেরা নেহাতই দুধভাত টাইপ। কেউই মাইরি গিয়ে আলাপ জমাবার চেষ্টাও করলাম না! বরং এক আকাশ তারা দেখে কোনটা কালপুরুষ,  কোনটা সপ্তর্ষিমণ্ডল, গুঁড়ো গুঁড়ো তারাগুলো কী হতে পারে সে সব আলোচনায় মেতে গেলাম সবাই মিলে। তবে মিথ্যে বলব না, আগুন ঘিরে গোল হয়ে বসে আড্ডা মারার ইচ্ছে আমাদের সকলেরই ছিল। রাতে খাওয়ার পর তাই নিভু নিভু আগুনের চারপাশে গুটিগুটি জড়ো হয়ে নরক গুলজার শুরু করা গেল ফের। হোটেলে লোকগুলো আমাদের দেখে ফের কাঠকুটো গুঁজে দিয়ে গেলো। আগুনে আঁচে মাথার উপর এক আকাশ তারা নিয়ে আমাদের আলাপ আরো একটু দমে বসানো গেলো, পাক হতে গেলে তা বড় জরুরী কিনা।

পরেরদিন আমাদের খুটওয়ান্ডা গেট থেকে সাফারি করার কথা। ওটা একটু দূরে, সকাল সকাল বেরোতে হবে কাল থেকে ভালো ঘুম নেই, তবুও শুয়ে পড়েও ফুক্কুড়ির শেষ হয়না। এ ওর ঠ্যাং টানাটানি করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি কে জানে। ভোরের আলো ফুটছে তখন, আমাদের গাড়িটা জঙ্গুলে রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে জঙ্গলের পাশেই একটা ছোট্ট গ্রাম পেরোচ্ছে। সার সার লোক, বউ সব রাস্তাতেই সুলভ শৌচাগার চালু করেছে! আমাদের দেশের লোকেদের বেসিক সেন্স এত কম কেন? নোংরা থাকবো নোংরা ভাববো এতে এত সুখ পায়! এত গুরু ঠাকুর, এত ধর্মীয় অনুশাসন এত ছুৎমার্গ কোথাও বলা নেই পরিচ্ছন্নতার মত প্রাথমিক বিষয় নিয়ে? দারিদ্রতা কোনো কারনই না, আমি মার্সিডিজ এর দরজা খুলে থক করে রাস্তায় থুতু ফেলা লোক দেখেছি প্রচুর। বোধটাই নেই। মন খারাপ হয়ে যায় এসব ভাবলে। একটা সময় পর হয় সব ধ্বংস হয়ে যাওয়াই ভালো। ভারতবর্ষের এত প্রাচীন ইতিহাস, আজ নোংরা, জনসংখ্যার ভারে ক্লান্ত, অশিক্ষিত, গাম্বাট লোকের মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাকগে,  ভাবব না এসব বেড়াতে এসে। মনটা সরাতে তাকালাম আকাশের দিকে একবার, সকাল হয়ে গেছে, আমরাও খুটওয়ান্ডা গেটে পৌঁছে গেছি।



খুটওয়ান্ডা গেট দিয়ে বেশী গাড়ি ঢোকে না, তাই সামনে আর কোনো গাড়ি ছিলো না। ঘুরে ফিরে সেই মোহারলির দিকেই যাবে যদিও তাও,  খানিক হলেও অন্য রাস্তা। জঙ্গলে হুড খোলা জিপসিতে ফাঁকা জঙ্গলে সকালবেলার বুনো গন্ধ নিতে নিতে যাচ্ছিলাম আমরা। ময়ূর, সম্বর, চিত্রল হরিণ, প্রজাপতি, পাখি দেখতে দেখতেই ফের উত্তেজনার খবর পাওয়া গেল। বাঘ দেখা গেছে!









বাঘের খবর শুনেই সারা পাড়া চুপ! দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই, মানে বসে আছি আর কি জিপে।বিস্কুট খাচ্ছি, শুকনো ডাল থেকে পাশের বন্ধু কারোর ছবি তুলতে ছাড়ছিনা, দু চারটে ফিসফিস করে কথাও বলছে লোকজন, এমন সময় ঘাড়ুম করে একবার বাঘ ডেকে উঠলো, ব্যাস, পুরো এলাকা বোমা ছাড়াই তটস্থ। ও বাবা! সেই যে ডাক শোনালো তারপর আর কিচ্ছু নেই। মহা অলস বাঘ তো! আমার থেকেও বেশী দেখছি! বসে বসে আলোচনা করছি, বিস্কুটের লোভ দেখি বাঘটাকে বাইরে বের করা যায় কিনা। আসলে সে খুবই কাছে আছে, শীতকালের শুরুতে ঘন জঙ্গল বলে একশো মিটারের তফাতেও ব্যাটা গা ঢেকে জিরোচ্ছে। অনেক অনেক্ষন বসে থাকার পর,  গাইড আমাদের কথাকেই সমর্থন করল,"শুয়ে পড়েছে মনে হয়"। বোঝো! এ কেমন ব্যাভার হল হ্যাঁ? লোকজন এসেছে বাড়িতে আর আপনি শুয়ে থাকবেন? অবশ্য ঠিকই আছে! আমিও বাড়িতে লোকজন এলে পালাতে ভালোবাসি। মহারাজদের ধরন একই রকম হবে স্বাভাবিক!

একটা ঘুরতে যাবার কত কথা হতে থাকে, কত আলোচনা, কত ঝগড়া, কত তর্ক...... বেড়ানো মনে হয় আমাদের সেই সময় থেকেই শুরু হয়ে গেছিল,  সেই যখন থেকে স্বপ্ন দেখছিলাম। আমাদের বেড়ানোটা আসলে তো দেড়দি এর না, অনেক গুলো দিনের, মাসের। আবার কবে সবাই একসাথে হব কে জানে! ফেরার পথে  দুপুরবেলার হাইওয়েতে গাড়ির মধ্যে, পড়ন্ত বিকেলে ধাবায় খেতে গিয়ে, এয়ারপোর্টের সফিস্টিকেশনে আমরা দেড় দিনের মেয়াদটা আরো আরো লম্বা করছিলাম। না, বাঘ আমরা তিনটে সাফারিতে মোটে একটাতে দেখেছি, তবে তাতে আমাদের প্রাপ্তির ঝুলি কিছু কম হয়নি।  শেষ হয়ে গেল তাই মন খারাপ তো হচ্ছিলোই, কিন্তু তাই বলেই আমরা মন খারাপ করে মুষড়ে পড়ে বাকি সময়টা নষ্ট করার জনতা না। যেটুকু মুঠোয় ধরে বুকপকেটে গুঁজে নিই....পরের জার্নি শুরু করার আগে অব্দি।



Friday, December 6, 2019

তাড়াহুড়োয় তাড়োবা (২)

নেশা করলে যেমন মনে হয়, ভাই কাল সব সামলে দেব, আজ একটা বিছানা দে শোবার, ওইরকম ভাব নিয়ে আমাদের আর্লি চেকিন করা ঘরে ঢুকে পড়া গেল। রিসর্টের মালিক এর কিছু একটা ঘোষ, আমরা যখন বুক করছিলাম এর ঘরের ছবিতে খাটের যে ছবি ছিল তাতে আবার একটা আলো লাগানো টাইপ ছিল, আমাদের দলের একজন আবার তাই দেখে বলেছিল, মায়াবী আলো কেমন, চল এটাই বুক করি। তা চারটে দামড়া ছেলে দেখে মনে হয় মায়াবী আলোর তার কেটে দিয়েছিল। মেয়েদের ঘরে রেখেছিল কিনা জানিনা অবশ্য। যাইহোক আলো অন্ধকার কিচ্ছু না, শুতেই ঘুম। এমন ঘুম সৌরভের অ্যাসিংক্রোনাস নাক ডাকার আওয়াজ অব্দি কিচ্ছু করতে পারেনি।

জামা বদলাবার মত গাধামি আমাদের ঘরের কেউই করেনি, জিন্স জামা যা পরে ছিলাম সব পরেই শুয়েছি, খালি তার উপরে হুডি আর মাফলার। এই বুদ্ধিমানের মত ঘটনায় আমাদের ঘরটা মিনিট দশ পনেরো সময় বেশী ঘুনিয়ে বেশ বাঘের মতই হালুম হুলুম করে পার্কের গেটে পৌঁছে দেখি,   একটা মিটমিটে আলোয় কজন গাইড না ড্রাইভার খোদায় মালুম বসে আছে। তখনও কাউন্টার খোলেনি, ভোরবেলার অন্ধকারে বসে বসে খিদে পেয়ে গেল। এদিকে ঘাপচু (আসল নাম ভুলে গেছি)  আর নন্তে খালি বিস্কুট এনেছে তাও হাবার মত মেরি বিস্কুট!! কোনো মানে হয়! গজগজ করে তাই খান পাঁচেক খেতে খেতেই কাউন্টার খুলে দিল। ওবাবা এখানে ভারী অব্যবস্থা তো! আমরা সেই কখন এসেছি অথচ আমরা ফার্স্ট জিপ হব এমন উপায় নেই। ওদিকে কাউন্টারে আমাদের অনলাইন এর বুকিং দেখে বলল,  তোমরা এক গাড়িতে সব কটা ক্যামেরা রেখেছ, অন্য গাড়িটায় কিন্তু নিতে পারবেনা!! মাইরি বর্গি এলো দেশে বলে কেন ভয় দেখাতো বুঝছি! এই সাফারিটাতেই দুটো জিপ আর ক্যামেরা মিলে হাজার চব্বিশ দিয়েছিলাম( পরের গুলোতেও তাইই অবশ্য),  এরপরেও আবার অযথা ক্যামেরার চার্জ নিলে ভাল্লাগে? খুব গজগজ করে নিলাম অযথা, আর আসবোনা ইত্যাদি বলে, যদিও এমনিতেও আর আসা আমাদের হবেনা সেও জানি!

গাড়ি ছাড়ার আগে পাশে ঝুপড়ি থেকে চা খেতে গিয়ে দেখি এই সাতসকালে কয়েকজন স্থানীয় মানুষ  ভয়ানক তেল মশলা দেওয়া কি একটা তরকারি, খানিক পোহার উপর দিয়ে খাচ্ছে। তাড়াতাড়ি পালিয়ে এলাম,  বাফ্রে, যদি বলে চা এর সাথে এ জিনিসও খান! আমার এর আগে এমন হুড খোলা জিপে জঙ্গল সাফারির অভিজ্ঞতা বছর আষ্টেক আগে ডুয়ার্সে। গেট পার হয়ে খানিক যেতে যেতেই জঙ্গল তার পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে ধরা দিতে থাকে। লাল মাটির রাস্তায় ধূলো আর ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপট নিয়ে জিপ এগোয়, তখনো ভালো করে রোদ ওঠেনি। তাই ভরসা আছে, জঙ্গল এর প্রাণীদের দেখা পাবার। জিপটা একটা গোঁত খেয়ে একটা সরু রাস্তায় ঢুকে একটা জলাশয়ের ধারে পৌঁছলো। গাইড ব্যাটা খালি বলে চলেছে গরমে সব ঘাস ফাঁকা হয়ে যায় তো, তাই খুব ভালো সাইটিং হয়, এই সব জলে বাঘে জল খেতে আসে হ্যানা ত্যানা। শুনলেই রাগ আর দুঃখ হচ্ছিল। তাড়োবার জঙ্গলে বড় জানোয়ার বলতে মূলতঃ বাঘই। এছাড়া ব্ল্যাক লেপার্ড আছে, সে তো এমনিই ভয়ানক রেয়ার। আর বুনো কুকুর আছে।  বাঘ দেখতে না পেলে মুখে যাই বলি না কেন৷ ভয়ানক দুঃখ হবে  একথা সত্যি। তবে আমরা জঙ্গল ব্যপারটা এমনিতেও খুব ভালোবাসি, তাই সে শোক সামলেও নেব এ কথাও মিথ্যে না। তাই বলেই যদি সকাল থেকেই গাইড গান শোনায় যে কিছুই না মিলতে পারে বলে ভাল্লাগে নাকি!  জলের উপর গাছে কটা সারস বসে ছিল। সারসই তো বলে নাকি, ইংরাজিতে স্টর্ক বলে যাকে? খচাং খচাং করে ছবি তুলে নেওয়া গেল কুয়াশার সর পড়া জলের উপর দিয়ে।












দুধারে ঘন বাঁশবন এর ফাঁকে বাঘ থাকতেই পারে, এমন অবস্থার মধ্যে দিয়ে খোলা জিপে সকাল সকাল যেতে বেশ লাগছিল। মাঝে মাঝে এ ভারতভূমির আদিবাসী রাজাদের তৈরী নিশান দেখা যাচ্ছিল মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে। তাড়ু বলে একজন বাঘের দ্বারা মারা যায়, সেই থেকেই তাড়োবা। মন্দিরটাও আছে একখানে। নানান রকম পাখির ডাক, জিপের টায়ারের সাথে লাল মাটির ঘষার আওয়াজ আর গাইডের টুকটাক কথা শুনতে শুনতে হঠাৎ একজায়গায় দেখি আরো কটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাইডে গাইডে কথা হয়ে গেল, উত্তেজনা দেখেই মনে হল কিছু নির্ঘাত আছে এখানে...বাঘই নাকি?

জানা গেল হ্যাঁ, কল শোনা গেছে। কল মানে বাঘের আসার খবর জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ে বার্কিং ডিয়ার বা বাঁদর বা ময়ুরের মাধ্যমে। জঙ্গলের নিজস্ব সিকিউরিটি সিস্টেম। তাহলে বাঘ হরিণ পায় কি করে? বাঘ অনেক অনেক ক্ষন একই জায়গায় বসে থাকে,  তারপর হরিণে বা বাইসনের দল যখন একটু ঢিল দেয় ব্যাস। ঘাপ!

জিপ গুলো সব টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের সামনে একটু জল, তারপরে ওই পারে বাঁশের বন। বাঘ বাঁ দিক থেকে আসবে এমনটাই কল থেকে বোঝা গেছে। টানটান স্নায়ূ প্রায় শিথিল হয়ে আসবে এমন সমত কোঁয়াকো করে ময়ূরের তীক্ষ্ণ স্বর শোনা গেল,  তাতে যেন নিস্তব্ধতা না ভেঙে আরো ছমছমে হয়ে গেল চারিদিক। ওই যে ওই যে কোনায়, ওই গাছের ফাঁকে আসছেন তিনি। লম্বা লম্বা ঘাস এর ফাঁক দিয়ে অবয়বটা দেখা যেতে সবার ক্যামেরা সচকিত হয়ে গেল। ক্রমে ঝোপঝাড় পেরিয়ে রাজার মত মর্ণিং ওয়াকের ভঙ্গীতে এগিয়ে আসতে লাগলেন তিনি। দৃপ্ত ভঙ্গী, কোনো টেনশন নেই।থাকবেই না কেন! একটা থাবড়া মারলে সামনের জনের (বেশীভাগের) ভব্লীলা কাবার হয়ে যাবে! ক্রমে ক্রমে আমাদের দিকেই আসতে লাগলেন। চিড়িয়াখানায় বন্দী বাঘ না, নিজের এলাকায় ঘুরতে বেরোনো পূর্ণবয়স্ক একজন বাঘ যার থেকে আমাদের দূরত্ব হয়ত পঞ্চাশ -ষাট মিটার! অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। বাঘ চাইলে আমাদের দিকেও আসতেই পারে। গাইড ফিসফিস করে বলে দিচ্ছিল এলেও আমরা যেন কেউ উত্তেজিত হয়ে লাফালাফি না করি। চুপ করে বসে থাকলে,  বাঘকে বিরক্ত৷ না করলে সে নিজের মত চলে যাবে, মানুষ কিছু তার ছুঁয়ে দেখতে চাওয়ার জিনিস না। বিরক্ত করলেই চিত্তির!

ব্যাটা জলের কাছে এগিয়ে এসেই জলশৌচের ভঙ্গীতে পেছন ডুবিয়ে দিয়ে বসে গেল! নির্ঘাত কোনো বাঙাল বন্ধুর বাড়ি নিমন্ত্রণ ছিল আগের রাতে, একগাদা ঝাল খেয়ে ত্রাহিমাম ত্রাহিমাম বলে সাত সকালেই ছুটে আসতে হয়েছে! অনেকক্ষন জলে পেছন ডুবিয়ে থেকে শান্তি পেয়ে ফের উঠে বাঁশবাগানের ধারে খেলতে খেলতে চলল, কখনো থাবা ছুঁড়ে বাঁশপাতা ধরছে লেজটা খাড়া করে। একবার মিষ্টি করে হাই তুলল একটা চমৎকার। তারপর হেলতে দুলতে চলে গেল আরো গভীর বনের দিকে।








বাঘ দেখে ফেলেই আমাদের এত্ত আনন্দ হয়েছিল  কী বলব! অথচ এমন কিন্তু হবার কথা ছিল না! বাঘ  এরকম কোনো ক্রমে বাঁচিয়ে রাখতে হবে এমন দিন হয়ত তিন পুরুষ আগেও কেউ ভাবেনি! আর ভাবেনি বলেই ওদের মেরে পিটে এমন সংখ্যালঘু করে দিয়েছে!  কেত আছে ভাই। কেমন আরামসে এলো, আশেপাশে লোকজনকে স্রেফ ইগ্নোর করে নিজের মত ঘুরলো, চলে গেল। এইসব নানান কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ গাইড এর ইশারায় গাড়ি দাঁড়িয়ে দেল। দেখি সামনে এক বিস্তীর্ন ঘাসভূমি, অনেক কটা চিত্রল হরিণ ঘুরছে(বেশী দেখা যায় বলে কদর নেই তেমন), সামনেই গাছে রাস্তায় অসংখ্য হনুমান মজাসে ডাল ধরে ঝুলছে, রাস্তাত বসে আছে। চমৎকার একটা সকাল!








হরিণ গুলো শিং তুলে একবার দেখে, তারপর নিজের মনে ঘাস খায়, হনুমান গুলোকে দেখলে আমার বরাবর হিংসে হয়। কিরকম লেজ ঝুলিয়ে বসে থাকে ডালে। পরেরবার আমি হনুমান হব ঠিক। অমন একটা তাগড়া লেজ থাকবে, মগডালে বসে দোল খাব..মাঝে মাঝে ফল পাকুড়ে কামড় দেবো, ভালো না লাগলে ছুঁড়ে ফেলব। তবে বনের হনুমানই হব, লোকালয়ের গুলো কেমন উকুন বাছতেই ব্যস্ত থাকে মানুষের মত। দূষন বেশী বলেই হয়ত।



হনুমানদের কেরদানী আর হরিণদের শান্তিতে ঘাস খাওয়া দেখার পর ফের এগোনো গেলো।



(ক্রমশ)

Thursday, November 28, 2019

তাড়াহুড়োয় তাড়োবা

দেড় দিনে?!!! কিই বলছিস!! পয়সা বেশী হয়েছে?! মাথা খারাপের দল সব!কিরকম বন্ধু, অ ফেসবুকে!এরকম করে ঘোরার কোনো মানেই হয়না যাই বলিস! 

উপরের সব কথাই শুনতে হয়েছে। তাদের পক্ষে অস্বাভাবিকও না। কেউ যদি শোনে স্রেফ দেড় দিনে কোলকাতা থেকে নাগপুরে গিয়ে ঘুরে আসছে তাহলে এসব বলবেই। খুলেই বলি তবে। আমরা সাতজন বন্ধু পাঁচটা আলাদা লোকেশনে থাকি দেশ আর রাজ্য মিলে। সবাইকে জড়ো করতে হবে, আবার ছুটিও নিতে পারবে না,  আবার একসাথেই বন্ধুরা মিলে বেড়াতে হবে এত ক্রাইটেরিয়া থাকলে যা হয় আর কি! সুতরাং উইকেন্ডে আমরা তাড়োবা যাবার তোড়জোড় করতে লাগলাম। ফেসবুক এক আজব জায়গা সবাই জানে কিন্তু আজব মানুষের গজব দুনিয়া কেমন হয় বলে নিই আগে বেড়াতে যাবার আগে। একটা কথা সত্যি যে তুমি যা খুঁজবে তাইই পাবে বা তার কাছাকাছি কিছুই পাবে, মানে তুমি ঝিনুক খুঁজলে পাখি পাবে না, তেমনই আমি নিজে আজব বলেই হয় আমার আজব কিছু লোকজন জুটে যায়। তার মধ্যে একজন মানুষ বাংলাদেশ থেকে দুদিনের জন্যে এলেও আমার সাথে দেখা করে যান, একগাদা বই আনেন, নিজের ছেলের আলমারী থেকে। আমেরিকায় থাকা এক দিদি জামাইবাবুকে আমার খুব দরকারি জিনিস বিনা দ্বিধায় আনার জন্যে বলতে পারি।  আর বন্ধু বান্ধবদের কথা? সে বলে শেষ করা যাবেনা!!  এইটুকু বলি আমার গল্প, আড্ডা, বেড়ানো, প্রয়োজন,  সবই এই ফেসবুক থেকে পাওয়া। তো এইরকমই কটা ছেলে মেয়ে মিলে আমরা সারাক্ষনই প্রায় বেড়াতে যাবার কথা ভাবি। কত জায়গা পৃথিবীতে আমরা কিছুই দেখিনি প্রায়। বেড়ানো জন্য সঙ্গী যদি প্রপার না হয় তবে একা বেড়ানোই বেটার এ আমি মনে করি। প্রত্যেকের বেড়ানোর ধরন আলাদা, কেউ ভালোবাসে কোনো জায়গায় গিয়ে স্রেফ ল্যাদ খেতে, কেউ ভালোবাসে খুব ঘুরে নিতে, কারোর খাওয়া, থাকা প্রায়োরিটি থাকে তো কারো আরেকটা জায়গা দেখা। কেউ ভালোবাসে শপিং বা পাবে যেতে কেউ ভালোবাসে ঝুম হয়ে বসে থেকে নিস্তব্ধতা শুনতে। তা আমাদের এই সাতজনের বেড়ানোর ধরন, বা জায়গা একই রকম পছন্দ তা কিন্তু না৷ আমাদের কারোর পাহাড় ভালোলাগে, কারোর সমুদ্র, কেউ ভালোবাসে সমুদ্রের ধারে হোটেলে সাতদিন ঝুম হয়ে কাটাতে কেউ ভালোবাসে পাহাড়ে হেঁটে বেড়াতে। তাও আমরা একসাথে যেতে চাই,  প্রাণপণ চেষ্টা করি একটা এমন জায়গা, সময় ঠিক করতে যাতে করে সবাই একোমোডেট করে যাই। আসলে বোধহয় যদি পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, মায়া আর কম্ফোর্ট জোন ব্যাপারটা থাকে নিজের পছন্দ অপছন্দটা আপনা থেকেই নমনীয় হয় যায়।

অনেক ক্যালকুলেশন, অনেক দিন ক্ষন, অনেক জায়গা  মেক মাই ট্রিপে ঘুরে স্থির করা গেল এবার হবে জঙ্গল, আর  নাগপুরের ফ্লাইটটা খানিক সহজ হচ্ছে।  বেশ কথা, কিন্তু ছুটি? তা তো নাই আমাদের কারোরই! বাবুবাড়িতে ছুটি মেলা সোজা না। কিন্তু ওই যে,  আমরা যাবো ভেবেছি যখন, কে পারে রুখতে! সুতরাং প্ল্যান হল, শুক্রবারের ফ্লাইট ধরা হবে, আপিসের পর, রাতে পৌঁছে, শনিবার সকাল আর বিকেল দুটো সাফারি নেওয়া হবে,  আর রবিবার একটা সাফারি করে সেদিনই ফেরা।  কি আর এমন ব্যাপার তাই না?  


প্রথম ধাক্কা এলো শনিবার সকালের সাফারি বুক করতে গিয়ে। মারাঠা দস্যু আক্রমন ঘটে গেল আমার ব্যাংক একাউন্টে। আগে বুকিং করলে ডাবল চার্জ!! আমরা সাতজন মানে দুটো গাড়ি লাগবে। ফস করে ক্যামেরা আর দুটো জিপ মিলিয়ে হাজার পঁচিশেক নেই হয়ে যাবার পর আমার টনক নড়ল, আচ্ছা এত কেন? না ভুরু কুঁচকে তাকাবার কিছু নেই, আমি একটু ইয়ে মত আছি। বহুবার অমন ঘটেছে, ঘটনা ঘটানোর পর উপলব্ধি করেছি ছড়িয়েছি বলে৷ টিকিট কাটার আগে বাঘের মতই ক্ষিপ্র ভঙ্গীতে কাজ করেছি, স্রেফ একটা সাফারি আমার সোজা বাঘ থেকে ইঁদুর করে দিল, চিঁ চিঁ করে লিখলাম এই ঘটেছে।  এরা সবাইই ভীষণ ভদ্র ফলে কাঁচা খিস্তিটা আর করল না কেউ, বরং কেউ কেউ চেষ্টা করল ফোন করে কথা বলে ক্যানসেল করানো যায় কিনা, ইত্যাদি। অতীত বদলে বর্তমানের  আর ভবিষ্যতের ভিখারি দশা বদলাতে পারলে তো কথাই থাকত না। সুতরাং আমাদের কাছে দুটো অপশন রইল, হয় এই সাড়ে তিন হাজার এর মায়া ত্যাগ করা যাক না হয় লুঙ্গী ঝেড়ে মাঠে নেমেই পড়া যাক। কত দূর কপর্দকশূন্য হব আর,  এমনিতেও গরীবের হারানোর কিছু থাকেনা বিশেষ! 


পরের ধাক্কা এলো, ফ্লাইট বুক করতে গিয়ে, না দামে এবারে কুপোকাৎ করতে পারেনি, কারন এক অপরাধে দুবার সাজা যেমন হয়না, এক আঘাতে দুবার পেড়ে ফেলা যায়না। এবারের ধাক্কা সময়ে। বিভিন্ন রাজ্য থেকে সবাই জুটছিলাম বলেছি আগেই। তা দেখা গেল,  সবাই মিলে জড়ো হয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেরোতে এগারোটা-সাড়ে এগারোটা বাজবে। ওখান থেকে তিন ঘন্টা সাড়ে তিন ঘন্টা তাড়োবা। অর্থাৎ ভোর রাতে পৌঁছেই এক ঘন্টা পরেই হবে আমাদের প্রথম সাফারি। অবশ্য এটা যে আসলেই একটা চাপ এটা আমরা সকলে বুঝেছি অনেক পরে, যাবার  আগে আগে, কারন.... আচ্ছা সে কথায় পরে আসছি।


এরপর ধাপে ধাপে ধাক্কা খেয়েই গিয়েছি আমরা, নাগপুরে যে বন্ধুর ভরসায় ছিলাম, গাড়ি হোটেলের, সে দুম করে সবাইকে ব্লক করে পালিয়েছে। তারপর যে হোটেল বুক করেছি তার খরচা দেখে আমাদের হার্ট বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে, কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, কেউ কাজে ফেঁসে যাওয়াই ক্যান্সেল হয়ে যায় অবস্থা। তো ঘটনা হল আমরা এসবে আর পাত্তা দিইনা। আমাদের সাথে ভালো স্মুথ কিছু তো হবার কথাও না এ যেন আমরা জেনেই গেছি। যে ছেলেটা কোনোদিন মার খায়না সে মার খেলে কান্নাকাটি করে, আর যে মার খেয়ে খেয়ে পোক্ত সে মার খেলে হাসে। আমাদেরও তাই হাল আর কি। 

ক্রমে সেই দিন চলেই এলো। অফিস থেকে হাঁকপাঁক করে বেরিয়ে দেখি উবের কাস্তেতে শান দিয়েছে আমার গলাটা নামাবে বলে। একটা হলদে ট্যাক্সি ঝিমুচ্ছিল, ফিসফিস করে বললাম কাকা  তোমার ট্যাক্সিতে বসে উবের ডাকবো? ধড়মড় করে বলল, "তামাশা করনেকা ক্যা, যাব না বলেছি নাকি!"  

যাই বলো বাপু,  ট্রেনে যাওয়া অনেক আরামের, ফ্লাইটে বড় শীত করে,  তাছাড়া দশ টাকার চা একশো টাকায় বেচে বদ গুলো। শুধু নাক ঠেকিয়ে নীচের মিটমিটে আলো জ্বলা শহর দেখতে ভালো লাগে বেজায়। কোলকাতার থেকে সব এয়ারপোর্টই মনে হয় ভালো। মন খারাপ হয়ে যায় মাইরি। মন খারাপ অবশ্য বেশীক্ষন স্থায়ী হবার সুযোগ পায়না।  এয়ারপোর্টে সবাই মিলে জুটতেই ফের হাসাহাসি ,  গল্প আড্ডা। বন্ধুরা থাকলে অনেক কঠিন জিনিসই কেমন সহজ হয়ে যায় তাই না?


রাতের বেলা গাড়ি বা বাসে করে ট্রাভেলের একটা অদ্ভুত অনুভূতি আছে। হা ক্লান্ত হয়েও সমানে নিজেদের নিয়ে তামাশা করতে করতে কখন দেখি গাড়িটা হাইওয়ে ছেড়ে দিয়েছে। চারপাশ ঝোপঝাড় আর একটা অদ্ভুত আকাশ, গাড়ি কাচ দিয়েই একগাদা তারা দেখা যাচ্ছে, নিঝুম চারধার। একবার থামতে হল আমায়, খোলা বাতাস না হলে চলছিল না। ড্রাইভারজি পছন্দ করছিলেননা, কারন জঙ্গলের সীমান্তে আমরা ঢুকে গেছি তখন। চারপাশে বড় বড় মানুষ সমান ঘাস এর ফাঁকে কিছু থাকলেও টের পাবার উপায় নেই। এমন অদ্ভুত ছমছমে জায়গায় নামতে অস্বস্তি লাগে তো বটেই কিন্তু অদ্ভুতের আলাদা টানও থাকে। সেই টানেই মনে হয় শারিরীক অস্বস্তি ফেলে দিয়ে,  ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপট সরিয়ে অন্ধকারে চোখ মেলে দেখতে ইচ্ছে করে, এক আকাশ ভর্তি ঝুরো ঝুরো জটলা করা, কিংবা আলাদা থাকা তারা দেখে থমকে যেতে হয়।

ড্রাইভারজি তাড়া দেয়,উঠে আসি। ফের চলা শুরু হয়। কতক্ষন পর, জঙ্গলের মধ্যে কাঁটা তার ঘেরা হোটেলে আমাদের গাড়ি ঢোকে। শুনশান সে হোটেল্র খোলা জায়গায় দাঁড়ালে শিরশির করে পাশের ঝোপঝাড়ের দিকে তাকিয়ে।  খাবার জায়গায় আলো জ্বলছে, কেউ কোথাও নেই, আমাদের অবশ্য কিছু যায় আসেনা তাতে। কে যেন কেয়ারটেকারকে খুঁজতে গেল, বাকিরা ওইখানেই থাবা গেড়ে ঝোলাঝুলি খুঁজে কী আছে বের করতে লাগলো। বলছিলাম না,  মার খেয়ে খেয়ে বিগড়ে যাওয়া ছেলেপিলের দল সব! 

(ক্রমশ)

Friday, November 15, 2019

বত্রিশ সিংহাসন

বত্রিশ কোটি বছর ধরে যার জীবন আবর্তিত হচ্ছে, তার আবির্ভাব আলাদা করে আবির্ভাব  দিবস উদযাপন এর প্রয়োজন নেই এ কথা তো আর আমার শিষ্য শিষ্যাদের বুঝিয়ে উঠতে পারা যায় না। তাই সকাল দুপুর নানান ভাবে নানান উপাচারে ভোগ গ্রহন করতেই হয়। 
অফিসে, বিকেলবেলা বাচ্ছা শিষ্য গুলো টেনে নিয়ে চলে,  আরে চলো না দাদা একদিনই তো। তাদের ইচ্ছে ছিল প্রিন্সেপঘাট। নৌকায় বসে নিজের হাতে সেজে  মহাপ্রভুকে নিবেদন করবে,  জল টল খাওয়া হবে। তা মহাপ্রভু নিজের বাহন নিজেই চালনা করেন বলে রাজী হলেননা কিছুতেই। 
শেষে কচি শিষ্যদের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,  চল তবে কিন্তু প্রিন্সেপ ঘাট না,  ভেড়ি ঘাট! এক ওস্তাদ শিষ্য আছে, সে সব জানে কোন কোনে মহারাজের নিবেদনের জিনিস মিলবে। এদিকে মহারাজ তো এমনি একা একা ঘুরে এসব জায়গার সব জানে, কোথায় পার্থেনিয়ামের ঝাড় আছে, কোথায় কালীর মন্দির, কোনখানে বাড়ি, কোনখানে বসার জায়গা সব জানেন। মহারাজের লীলা আর এরা সব জানবে কী করে! বলছে দাদা তুমি এসব জায়গার খোঁজ পেলে কি করে! 

পাশেই কালীমন্দির। অন্ধকার  থেকে এক দুটো ইঁদুরের লাফানোর আওয়াজ ছাড়া আর তেমন আওয়াজ নেই। দুই শিষ্য হাবিজাবি বীজ ফেলে  মসৃন করছে একজন পাহারা দিচ্ছে আরেকজন মহারাজের মাথায় আরাম করে দিচ্ছে একটু। এমন সময়,  কে যেন এলো, সকলে সচকিত। ওস্তাদ শিষ্য আশ্বস্ত করলো, আরে কিচ্ছু হবেনা, আমি এসব ঢের দেখেছি।  প্রভু আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন!  প্রভু অল্প হাসে,  যে আসে তার দিকে তাকিয়ে বলে কী ব্যপার। সে ওই মন্দিরের পুরোহিত, "প্রভু এক দুই টান...."। 

এইসব দ্রব্য লোকে শেয়ার করতেই ভালোবাসে। তাই কিছু সময় পর দেখা যায় সকলেই প্রসাদ পাচ্ছে। শিষ্যরা অবাক,  'প্রভু আপনার সত্যিই কিচ্ছু হল না!! " এসব সামান্য নেশায় মহারাজের সত্যিই কিচ্ছু হয়না। মহারাজের তো নেশা পার্থিব জিনিসে নেই! এসব কথা বোঝার সময় তাদের এখনো হয়নি। রাস পূর্ণিমার চাঁদ একটু ক্ষয়েছে কিন্তু তাতে তার রূপের খুব ক্ষতি হয়নি। ভেড়ির জলে চাঁদের সেই রূপ দেখে যে মাতাল হয় তার নেশার মাপকাঠি এরা বুঝবে কি করে। তারা বুঝতেই পারেনা, মহারাজ কেন ভেড়িতে আরো থাকতে চায়, তাদের প্রাণে ভয়, তারা শহরের আলোয় ফিরতে চায়। 

অরসিক থাকা মানেই এসব জায়গা ভীড়। তাই মহারাজ সদলবলে শহরের আসবাগারে যান। খাদ্য পানীয়তে মজে যায় শিষ্যরা,  মহারাজের এসবে আসক্তি নেই, তাঁর তফাতে বসে শিষ্যদের হুল্লোড় দেখতেই আনন্দ। ভালোবেসে বাচ্ছাগুলো কেক আনে, বত্রিশ লক্ষ কোটি বৎসর এর বৃদ্ধ কেক কাটেন হাসিমুখে। বাড়ি ফিরে দেখেন সংসারাশ্রমে তাঁর মা হাঁটুর ব্যথা উপেক্ষা করে,  চালের রুটি বানিয়েছে।পরের দিন তাঁর রান্নার দিদি রাগারাগি করে, কেন আগের দিন পাঁচ ভাজার কথা বলা হলনা, অন্যদিন হয় এত কিছু যেখানে স্রেফ মাংস কেন হবে, ভাইয়ের জন্মদিনে কি আর সে আপত্তি করতো বেশী রান্নায় ইত্যাদি...
মাতাশ্রী পরের দিন ডিউ কেকটা বানালেন। মহারাজ এত ভালোবাসাতেও টলেননা,  সামান্য ধোঁয়ায় তাঁর কী হবে!

Wednesday, November 6, 2019

আর ইউ হ্যাপি?

#হিজিবিজি 

হ্যাপি কথাটার মানে কি সুখী না খুশী? নাকি দুটোই? দুটো একসাথে না হবারও তো কিছু নেই।  আমাদের আপিসের এক ছেলে,  বিদেশে বিস্তর টাকা মাইনের চাকরি পেয়েছে। টাকার অংকটা এমনই বাড়িতে, পুরোনো আপিসে কোত্থাও আটকাতে পারেনি কেউ, সে নিজেও না। নিজেকেই যুক্তি দিচ্ছিলো, "বাইরে আমি বিএমডাব্লিউ X সিরিজ চালাবো এখানে হলে আইটেন,  কেন যাবনা বলতে পারো?" 

ঠিকই হয়ত। আবেগ দিয়ে বোকারা চলে, তাদের উন্নতিও কম হয়ত তাই। আচ্ছা তাহলে আড়াইহাজার বছর আগে যে রাজপুত্র রাজপ্রাসাদ,  রাজভোগ ফেলে রাস্তায় নেমেছিল সে কি বোকা? তবে সে বোকাকে দেখেই কেন মনে হত লোকের যে লোকটা জানে শান্তি কি, অবিচল থাকলেও রোবট হবার দরকার নেই! 

আমার এক বন্ধু আছে ডাক্তার মানুষ। ডাক্তার হয়েও মোটামুটি আমার মতই অবস্থা তার,  যদিও আমাদের দেশে অন্তত (বিদেশের কথা জানিনা), তার আরো অনেএএক গুন রোজগার হবার কথা। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,  তোর আপশোষ হয়না? হাসেনি, বলেছিল, "কি জানিস, বন্ধুদের সাথে বেরোলে একেবারে কি মনে হয়না কখনো? হয় তো। তবে কি জানিস, যখন নিজের জন্যে অনেকটা সময় বাঁচিয়ে,  নিজের মত কাটাতে পারি জীবনটা, আর আপশোষ হয়না।" 

আসলেই তাই মনে হয়, এত খারাপ লাগা,  অসুখে থাকা আসলেই অন্যের সাথে তুলনায়। ও এই করেছে আমি কী করলাম এই ধারণা কবে কেমন করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের অজান্তেই। তাই আমাদের যাই থাকনা, হ্যাপ্পিনেস নেই। 

আমাদের মনে হয় আরেকবার ভাবার সময় হয়ছে, আড়াইহাজার বছর আগেকার কথাগুলো, অন্তত এখনকার মত করেই। রোজ রোজ এত মানুষ এত দৌড়চ্ছে, এত মদ এত জুয়া এত রোজগার কিন্তু কিসের জন্যে করছি? কী পাচ্ছি ঠিক? দামী দোকানে খাওয়া, দামী জামা পরা, দামী জায়গা থাকা৷ দামী গাড়ি চড়া.... নিঃসন্দেহে এগুলো আকর্ষণীয়, কিন্তু ছায়া ঢাকা শান্ত জীবনের মত শান্তির কি? আমি ঠিক জানিনা। আমার সেই জীবনটায় গিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে, যেখানে এক সংসার ভরা লোকের মাঝে একদম কিচ্ছু না করা দু একটা লোক থাকে, যারা কিছু করেনা তবুও তাদের বাতিল বলে ত্যাগ করে না কেউ, বাড়িতে ভিখারী আসলে তার বরাদ্দ চাল, আলু থাকে। বিকেলে ঘুড়ি ওড়ানোর সময় থাকে, পাঁচ সাতদিন এমনিই কোনো জায়গায় যাওয়ার থাকে সব দেখবো ওই সময়ে এইরকম ভাব না নিয়ে।জানিনা, হয়ত আমার সে জীবন সইবেনা, সওয়ানোর মত মন আছে কিনা কে জানে! ডুব দেবার মত মন..... যখন  কেউ বলবে কোথাও থেকে,  তুমি সফল? সুখী? আমি হাসব খালি তাতেই সব জবাব হয়ে যাবে.....

Wednesday, October 9, 2019

পুজোর চালচিত্র

পুজো এলেই আমার বেজায় ভালো লাগে। হ্যাঁ হ্যাঁ ভীড় হ্যানাত্যানা কিচ্ছু আমায় কাত মাত করতে পারে না। সাধকদের সব রকম অভ্যেস আছে।ভৈরবের ভৈরবী থাকে, সাধকদের সাধিকা, অবধূতের মাতাজি....নইলে আবার সিদ্ধিলাভ মুশকিল কিনা। তাই ভীড়ে ভালো করে দৃষ্টিসঞ্চালন করে দেখছিলাম উপযুক্ত কাউকে কিনা। দূর দূর তক কুছু নাই মশাই, কোলকাতা যেন ভেজ থালির মতই খাঁ খাঁ করছে! 

অগত্যা মন দিয়ে ঠাকুর দেখাই স্থির করতে গিয়ে দেখি অসম্ভব। মোবাইলে তাগ করে সহস্র ফটোগ্রাফার! একজনকে বললাম,  "আরে দাদা আপনার হাতে তো ছবি কথা বলে!! হেব্বি তুলেছেন, একবার ওই এঙ্গেল থেকে দেখুন তো। আলোটা দারুণ ক্যাপচার করেছেন।" ব্যাস নিমেষে ঠাকুরের সামনেটা হালকা হয়ে গেল, ফটোগ্রাফারের দল "ওই" দিকটা চলে গেল। 


যাহঃ শালা! কাত্তিক গনেশ এরা এমন ট্যাবলেট সাইজ কেন? আর এবারে কি সিংহ পাতা ফেলেছে? সব কটা মন্ডপেই ঘোড়া দিয়ে কাজ চালাচ্ছে? ঘোড়া আবার হিংস্র ঘোড়া, ঘ্যাঁক করে দাঁত বের করে অসুরের হাত খাচ্ছে। ঘাসের বদলে মাস? ভেগানগুলোর চোখে এ দৃশ্য পড়লে মরেই যেত। 


সারা শহর টহল দিয়ে মহারাজের পা যখন বিদ্রোহ করছে,  ভীড় পেরিয়ে নদীর ঘাটে বসতে এসেছি। চার দিকটা তূলনামূলক ভাবে শান্ত এখানে। লোকজন তেমন নেই, একটা একা বোকা লোক নদীর ধারে চুপটি করে বসে ওইপাড়ের আলো দেখছে, এপাড়ের ভীড় হুল্লোড় পার হয়ে। আর ওই কোনায় একজোড়া ছেলে মেয়ে হাতে হাত দিয়ে আলো মেখে দাঁড়িয়ে। খানিক বসে থেকে ফিরতি পথে দেখি, একটা খুব খেঁচুটে মুখের গোঁফালো লোক আইস্ক্রীম কিনে দিচ্ছে একটা নাকে সর্দি মাথায় উকুনে ভরা বাচ্ছাকে। ট্রাফিক ছাড়তেই বাঁধ ভাঙা ভীড়ে বয়স্ক বাবার হাত ধরে তার মেয়ে নিয়ে যাচ্ছে।


আমার বন্ধুরা ভারী বিরক্ত হয় এই মেট্রোর সাড়ে ন লাখ মানুষের ভীড়ে, রাস্তায় জ্যামে, এত মানুষের ঠাকুর দেখবার জন্য রাস্তায় নামায়...কিন্তু এই যে এত ভালো ভালো দৃশ্য এগুলো পুজো না এলে কেইই বা দিত! 


ভালো হোক,  আনন্দে কাটুক সবার পুজো।



*******★**************★*****************



"কিরে এখনো কতদূরে?"


ফোনের ওপারে বাবার উত্তেজিত গলা। রওনা দিতে দেরী হয়েছে বিস্তর। ইচ্ছে করেই খানিকটা। যা হয়, বাবার উত্তেজনা বোঝার ক্ষমতা ছেলের থাকেনা। উলটে বিরক্ত হয়ে বলি, "আসছি তো অমন করছ কেন?" 


এবারে  আমাদের পুজো কোনোমতে হচ্ছে।মানে ঢাক, কাঁসর সবই আছে কিন্তু সে ঢাকে যতটুকু কাঠি না পড়লেই নয় ততটুকুই পড়ছে। হবার কথাই ছিল না, ধনাদার বউ মারা গেল পুজোর মুখেই,ভুল চিকিৎসায়। যে ডাক্তার অপারেশন করেছিল সে ডাক্তার মন দিয়ে ব্লাড রিপোর্ট দেখেনি, আরো অনেক অপারেশনের তাড়া, লোভ।পিজিতে শেষ কদিন যিনি দেখেছিলেন তিনি খুবই চেষ্টা করেছিলেন যদিও। বাড়ি অব্দি পৌঁছতে অনেকবার থামতে হয়। লোকুদার দোকান, কুমোরপাড়ায় কে একজন যেন, আমি চিনিনা, আমায় চেনে এমন কত জনের সাথে, কুশল মঙ্গল সেরে পৌঁছতে হয়। বাড়ি পৌঁছলে অসময়েও মা জ্যেঠিমা মিলে গরম লুচি ভেজে দেয়। 


সকালে ঘুম ভাঙে দূরে রথতলায় ক্লাবের পুজোর মাইকের আওয়াজে। চন্ডীপাঠ হচ্ছে। আচ্ছা ওরাও তো মাইকটুকু বন্ধই রাখতে পারতো। নাহ তা মনে হয় হবার না! ক্লাবের পুজোয় তো কাল নাকি "ডান্স নাইট" ও হয়েছে। লোকে মদ খেয়ে তাতে পয়সাও দিয়েছে। আমি হয়ত এ যুগের সাথে ফিট করিনা, আমার মনে হয় একটা সামগ্রিক অবক্ষয় আমাদের সবাইকে গ্রাস করছে। একটা ভিডিও দেখেছিলাম, বাচ্ছা ছেলে একটা দাঁড়িয়ে দেখছে এরকমই এক "ডান্স নাইট",  অশ্লীল ভঙ্গীতে নাচছে একটা মেয়ে। এইই একশো বছর টিকে গেলে সংস্কৃতি বলে গৃহীত হবে হয়ত! সকালে চন্ডীপাঠ রাতে সর্বসমক্ষে শরীরী আবেদন পূর্ণ নাচ।


এবারে মাছ ধরা নেই, চা খেয়ে ঘুম ভাঙা চোখে হাঁটা দিয়েছি। বড় সবুজ চারদিক। কিছুদিন আগে বন্যা হয়েছিল। রাস্তার ধারে মাঝে মাঝে ভেঙে গেছে। কোনদিকে যাচ্ছি কে জানে! লক্ষ্মীর আঁচলের মত ধানের মাঠ, পটলের বরজ, অসময়ের শিম। পিতৃস্মৃতি, মাতৃস্মৃতি মন্দির বানানোর চল আছে খুব এখানে। মন্দির মানে সিমেন্টের চ্যাটালো উঁচু একটা বেদীর মত। তার একদিকে ভস্মাবশেষ রেখে উঁচু করা, মাথায় তুলসীগাছ পোঁতা থাকে। বৈশাখ মাসে জল দেবার রীতি আছে। ভালো নিয়মটা কিন্তু বেশ। একটা সিমেন্টে বাঁধানো বসার জায়গা রইল, বৈশাখ মাসে চারদিক যখন ফেটেফুটে যাবে, নিয়ম এর চক্করে হলেও তুলসী গাছ একটু জল পাবে। আসলে কিছু নিয়ম মন্দ থাকেনা, সময়ের সাথে সাথে শুধু রীতি গুলো মনে রেখে কজ টা ভুলেই চিত্তির হয়।  এই যে অশৌচ চলছে আমাদের,  নিরামিষ খেতে হয়, নতুন কিছু পরতে নেই ইত্যাদি এ তো স্রেফ শোকের আবহে  হুল্লোড় হয়না সেটাই বলা। কিন্তু যদি হুল্লোড় হয় আর এই নিয়মগুলো মানা হয় তাহলে আর মেনে কি লাভ! 



কোথায় যেন এসেগেছি, এ জায়গাটা বেশ তো। কেমন ছায়া ছায়া মাখা। রোদ থেকে গাছের ছায়ায় গেলে একটা ঠান্ডা ভাব বুকে আসে।  তেমন আরাম পাখার হাওয়া বা এসিতে হয়না। মানসিক ব্যপার কিনা জানিনা, তবে আমি তো তফাৎ টের পাই দিব্যি! একটা কাঠঠোকরা ঠক ঠক করে কাঠে ঠোঁট ঠুকছে। একটা ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছ তেঁতুল ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুকুর পাড়ে। এহে এটা তো কারোর বাড়ির পথ। এখান থেকে আর কোথাও পৌঁছনো যায়না।




"মা এসেছে?" রাস্তায় একজন জিজ্ঞেস করে আমায়। আমি জবাব দিই, সে কেমন আছে জিজ্ঞেস করি, সে নাকি মায়ের খুব বন্ধু, গুছুতদিদি বললেই হবে। আবার হাঁটা দিই, অন্য রাস্তা, চিনিনা এ পাড়াটাও। কিছুই চিনিনা আমি, কেমন অন্ধ কালা ভাবে জীবন কাটিয়ে দিলাম সব থাকতেও! আলপথ ধরে হাঁটছি, দুটো চারটে ফড়িং উড়ে বেড়াচ্ছে, আশ্বিনের রোদের তাত খুব, এখন মোটে সাড়ে নটা তাতেই তেজ দেখো। মাঠের মাঝে একটা কাদের বাড়ি, একটা বউ পিছন ফিরে বসে কী যেন করছে আর বরটা খালি গায়ে প্যান্ট পরে বসে আছে পাশে। একতলা পাকা বাড়ি, উঁচু জানলা, রঙ করা হয়নি এখনো, হবেও না মনে হয়। আলটা একটু চওড়া মত রাস্তায় পরিনত হয়, দুধারে পার্থেনিয়ামের ঝাড়, আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে পেরিয়ে যাই, এলার্জি আছে আমার। রাস্তাটা গোঁত খেয়ে একটা পুকুরের পাশ দিয়ে চলেছে, একটা মুদীর দোকানে আলগা ভীড়। তেমন কিছু বিরাট দোকান না, গ্রামের মধ্যে অল্প জিনিস নিয়ে বানানো দোকান, ধারেই চলে যা বেশীরভাগ সময়।  মাচা বেঁধে কতকগুলো জোয়ানলোক তাস খেলছে। খেলা খুব জমে উঠেছে মনে হয়, খুব উত্তেজিত সব, রঙের টেক্কা থাকতে বিবি দিল কেন বলে, রাস্তার ধারে পুকুরে দুজন বউ চান করছে আর দুটো ন্যাংটা ছেলে খেলছে। একটা লোক আর বউ মিলে জরির কাজ করছে, এখানে পুজো নেই। এ পাড়াটা গরীব না বড়লোক জানিনা, তবে সব কটাই পাকা বাড়ি কিন্তু সব কটাই খুব ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে। আলো ঢোকে না, মাঝের রাস্তাটাও একটা সরু গলির মত, দুটো মানুষ পাশাপাশি চলতে পারে। একদিকে কটা ছাগল বাঁধা পরপর। একটা আবার বোকাপাঁঠা, ওইপাশের দাওয়ায় একটা বাচ্ছা মেয়ে শিউলির মালা গাঁথছে, কিন্তু পাঁঠার গায়ের দুর্গন্ধই বেশী। টিউওয়েল থেকে জল পাম্প করছে একজন মাঝবয়সী বউ। সামনে আর যাওয়া যায় কিনা জিজ্ঞেস করতে, আমি কোথায় যাব খোঁজ নিয়ে বলল, 'এদিক দিয়ে তো বাবা যাওয়া যাবে না, কাদা আছে, ওই দিক দিয়েই যাও"। অ্যাই বলু একে রাস্তা দেখিয়ে দে না।

বলু নামের লোকটা একটা হাতজাল নিয়ে আগে আগে যাচ্ছে কোথায়, আমায় আয় বলে ডেকে নিল। ওবাবা সামনে যে বিস্তর কাদা! বলুর ভ্রুক্ষেপ নেই, "জুতো হাতে চলে আয়"।  নাহ আমি উল্টোবাগেই যাই।



এদিকটায় কখনো আসিনি, কেমন ঝোপঝাড় ভর্তি। তুলসীমঞ্চ, ঠাকুর বেদী, বড় বড় মাছের হাঁড়ি, এটা জেলেপাড়া মনে হয়। চারটে ছাতারে পাখি ছ্যা ছ্যা করতে করতে উড়ে গেল, একটা লোক জমিতে সার দিচ্ছে। দূর থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে, একটা এই মোটা জারুল গাছ দাঁড়িয়ে আছে হাত মেলে।কুকরু কুকরু করে একটা কি যেন পাখি ডাকছে। একটা গাছের নীচে অনেক্ষন বসে থেকে বুকের মধ্যে অনেকটা ঠান্ডা ছায়া ভরে নিলাম। গাছের সাথে কতদিন পর বসা হল! 





Sunday, October 6, 2019

পুজো শুরুর আগে

প্রত্যেকবার পুজো আসে আর আমার সেই ছেলেটার কথা মনে পড়ে যায়। ধুতি পরে হনহন করে চলেছে, একটু আগে ঝামেলা করে এসেছে ছেলের দলের সাথে, একটু পরে পদ্মদিদির কাছে ধরা পড়বে, পালিয়ে গিয়ে সারাদিন অভুক্ত থেকে হঠাৎ করে মিলবে পংক্তিভোজন কিংবা যাত্রাদেখা।

হুট করে কাকার হাতে ধরা পড়ে হতাশায় ডুবে গিয়ে সে যখন গরম কাঁচাগোল্লা চিবোয় মসমস শব্দে আমার মন খারাপ হতে থাকে। সেই ছেলেটার সাথেই আমার শিশির ধোয়া শরৎকালের ভোর দেখা হয় এই বৃষ্টিতে মাখামাখি একটাও গাছ, মাঠ,  ঘাস না থাকা শহরে।

সেদিন একটা কাজে ব্যারাকপুর যাচ্ছিলাম। ডানলপ পার হবার অনেক্ষন পর দুপাশের চেহারা  বদলে যায় অল্প অল্প করে। চোখ পড়ে যায় একটা ভাঙা বাড়ির বটগাছে। পাঁচিল ঘেরা অনেকটা জায়গা নিয়ে ছিল বাড়িটা। এখন আর কেউ থাকেনা,  আর কদিন পরেই তিনদিক খোলা ফ্ল্যাটের বিজ্ঞাপন উঠে যাবে। কারা থাকতো এ বাড়িতে? সেই সর্দার ছেলেটার মত পলানে ছেলে ছিল নাকি? বাড়িদের মন খারাপ হয়? এওরকম একটা বাড়ি দেখেছিলাম,  গড়িয়াহাটের কাছে। ঝকঝকে সব বাড়ির মাঝে,  বন্ধ হয়ে ছাদ ঝুলে যাওয়া একটা বাড়ি। এক পা এক পা করে ঢুকেছিলাম আমি, মাকড়সার জাল, পাতার স্তুপ পেরিয়ে। আবছা অন্ধকারে দেখা যায় দেওয়ালের একটা জায়গায় আলমারী জাতীয় কিছু ছিল বলে কেমিন ফ্যাকাসে, দু চারটে বাজে অদরকারী জিনিস....এ বাড়িতে দুর্গাঠাকুর আসবে না।

সেই সর্দারের গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই ছেলেটা তো ঘরে ফিরতেই চায়নি, তবু পুজোর সময় সেই ভুল করে ফিরে যাওয়া ছেলেটার গল্পই মনে পড়ে। আর এই বাড়িটা দেখেও মন কেমন করে, ভুল করে বা ঠিক করে ছেড়ে গেছে সবাই। প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে বেশ ভোম্বল সর্দার পুজোয় ধরা পড়ে যাবে না, আর এই ভাঙা বাড়ি গুলো ছেলে মেয়ে সব্বাই ফিরে আসবে, হই হই করে আড্ডা হবে, ছুটোছুটি করে খেলতে গিয়ে ছোটদের মধ্যে একজন ব্যথা পাবে,কান্নাকাটি হুলুস্থুল।
প্যারালাল ওয়ার্ল্ড পুজোয় অন্তত সবার পুজো ইচ্ছেপূরনে কাটুক।