Monday, April 1, 2019

নির্বাণ

#হাবিজাবি

ভালো থাকা খারাপ থাকাটা নিজের উপর নিয়ন্ত্রিত করতে পারাকেই কি নির্বাণ বলে? চিনার পার্কের অটোয় একজন অটোওয়ালা আছে,  তাকে আমি কোনোদিন হাসিমুখে দেখিনি। খুব ভুরু কুঁচকে, প্যাসেঞ্জার, ভ্যানওয়ালা, রাস্তার লোক যাকে পারে মুখ ঝুক করে। আমায় একদিন ব্যাগ নিয়ে সামনে কেন বলে ধমকেছিল।আমি ভয়ে ওর অটোয় চড়িনা। হ্যাঁ, আমি একটু পলায়নবাদী আছি বটে কিন্তু নেগেটিভ লোক, অকারনে অপমান করা লোকের থেকে দূরে থাকলে শান্তি বজায় থাকে দেখেছি। যেসিন এসব তুচ্ছ খোঁচা গায়ে মাখবো না জানি নির্বান লাভ করবো। 

রাজারহাটের রাস্তায় দুধারের মাঠে সাদা সাদা মিনি কাশ ফুলের মত ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে, আর রাস্তার মাঝে গোলাপী আর হলুদ ফুল।  হুট করে চোখে পড়ে গেছিল, তারপর থেকে চোখ ফেরানো যায় না আর। খুউউব মন খারাপ থাকে যখন দেখেছি চারপাশে চোখ মেললেই মন ভালো হবার রসদ লুকিয়ে থাকে। কিংবা মন খারাপ থাকলে চোখ খুঁজে ঠিক কী দেখলে দোস্তের  মন ভালো হবে। 

 এপাড়ায় কেউ ঘুঘনি মুড়ি মাখিয়ে মাখিয়ে খায় না,  কিংবা চায়ে ডুবিয়ে ডুবিয়ে আয়েস করে বান পাঁউরুটি। আমি দেখেছি এ দুটো খাবারই বড় আরাম করে খেতে, আমি চায়ে ডুবিয়ে  খেতে গিয়ে অম্বল করে ফেলেছি, স্টিলের প্লেটে কিরকম করে ধোয়াতে আটকে গেছি। সব কিছুর স্বাদ সবাই পাবেনা এইই নিয়ম.....কিন্তু আমার ককম্ফোর্ট জোন কোথায়? আমি একদিনের আউটিং এর নামে রিসর্টে গিয়ে আরাম পাইনা আবার মাছি ভনভন করা জায়গায় স্বস্তি পাইনা। 

ইচ্ছে করে এক্ষুনি এই বসন্তের বিকেলের হাওয়া গায়ে ওই সেইই ফুলে ছাওয়া রাস্তাটা ধরে চলে যাই, সেই আমার পুকুরটার পাড়ে। বসে বসে ঠোঙায় মুড়ি আর সিঙারা মাখিয়ে মাখিয়ে খাব। মাড়োয়ারি শিঙারা না,  বাঙালী শিঙারা, হলুদ বেশী দেওয়া পুর। আঙুল গুলো হলুদ হয়ে যায়। ওই পুকুরটা আমার বলছি কেন? কারন ওটা আর কাউকে দেখাতে নিয়ে গেলে আর থাকে না যে, কালাচাঁদের দোকানের মত, স্রেফ আমার জন্যেই।

আজ রাতে খুব ঝড় জল বুঝি? হলেও আমি ভিজতে যাব না, আমার মন খারাপ লাগছে গাড়ির স্ক্র‍্যাচ রিমুভার বিক্রী করা ছেলেটার জন্যে। খুব করে বলেছিল, কত ডেমো দেখালো, নিয়ে নিলেই হত নাকি? সারাজীবন আমার এ দোলাচল কি ঘুচবেনা? সেদিন মাঝিটা মাত্র কুড়ি টাকা বখশিসের জন্যে আপনি আপনি করে কথা বলল আমার শুনে অস্বস্তি হচ্ছিল খুব তবু বলতে পারলাম কই,  আমায় তুমি বলুন। যেমন বলতে পারিনি ক্রেডিট কার্ডের ছেলেটাকে আমার সাথে চা খেতে, যেমন বলতে পারিনি আমার ম্যানেজারকে এরকম বালের কাজ আমি করবো না,  যেমন..... 

একদিন নির্বাণ হবে আমার, এসব তুচ্ছ জিনিস সব উপেক্ষা করে হলুদ রঙের ফুল হয়ে যাব।

Wednesday, March 27, 2019

আলাপ

একটা ভূতের গল্প হয়ে যাক? আলাপ সিরিজই হয়ে যাচ্ছে দেখছি!
**********************************

-হ্যাল্লো ম্যাডাম?

-কে কে বলছেন!

- আমি ভূত।

-মানে! ইয়ার্কি মারছেন! অসভ্যতার একটা সীমা থাকে। রাত দুপুরে এসব অসভ্যতা করার জন্যই নেট নেন বুঝি!

- আস্তে ম্যাডাম আস্তে। অত মাথা গরম করলে খুলি ফেটে আমি হয়ে যাবেন তো!

-মানে ফের বাজে বকছেন! আপনাকে নলক করতে বাধ্য হচ্ছি।

-হাঃ হাঃ হাঃ (বেশ মহিষাসুর টাইপ করে পড়ুন,ইনফ্যাক্ট চাইলে আপনার কানের কাছে গিয়েও এরকম আওয়াজ দিতে পারি)। 

-হ্যাল্লো ম্যাডাম!

-একি! আপনাকে তো আমি ব্লক করলাম এক্ষুনি! আপনি এলেন কিভাবে!

-ব্লক হয়না তো! ভূত মানে অতীত ম্যাডাম, অতীত মানে যা ঘটে গেছেই, তাকে আপনি ব্লকাবেন কিভাবে!

-দেখুন এসব নোংরা অসভ্যতা আমার ভাল্লাগছেনা। কোনোভাবে হয়ত ব্লক হচ্ছেনা, এনিওয়ে আমি মেসেঞ্জার ওড়ালাম।

-হ্যাল্লো ম্যাডাম।

-একি!! হোয়াটসঅ্যাপে!  আপনি আমার নাম্বার জোগাড় করলেন কিভাবে!

- আহ শান্ত হয়ে শুনুননা একবার! ভালো করে দেখুন আমার নাম্বার আসছে? আসছেনা তো? কারন আমি সত্যিই ভূত।

-আপনি একজন হ্যাকার এবং কোনো ভাবে এটা হ্যাক করে করছেন। আমি টেকনোলজি বিশেষ বুঝিনা তাই ব্যপারটা ধরতে পারছিনা।

- শুনুন আপনিও আসলে ভূত থুড়ি পেত্নী,  তাহলে আমায় স্বীকার করতে এত অসুবিধে কি?

- মানে! বোকা কথা বলে পেঁয়াজি না মেরে ফুটুন তো।

- আচ্ছা দেখুন এতবার বলছি, আমি ভূত, আপনি সমানে হ্যাকিং,  খারাপ লোক ইত্যাদি নিয়ে পড়ে আছেন। আমি যদি ভূত নাওও হতাম খারাপ লোক তো নাও হতে পারতাম নাকি? একবার কথা অব্দি বললেননা ঠিক করে৷ এত অবিশ্বাস নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে নাকি, মরেই গেছেন তো ম্যাডাম আপনি!

- দেখুন ওসব ড্যাশের কথা বলে লাভ নেই, চিঁড়ে ভিজবে না। হ্যাঁ অবিশ্বাস করছি, কারন আপনাকে বিশ্বাস করার মত কিচ্ছু ঘটেনি।

-অবিশ্বাস করার মতই বা কি ঘটেছে?

-নাম হীন, ছবি হীন, বন্ধু হীন একটা অচেনা প্রোফাইল থেকে পিং করা, মেসেঞ্জার উড়িতে দেবার পর নিজের নাম্বার হাইড রেখে হোয়াতে ডিস্টার্ব করা সবটাই অবিশ্বাসের।

-আচ্ছা বেশ মেনে নিলাম। এবার ধরুন আমি পাঁচশো হাজার বন্ধু নিয়ে,  যে কোনো কারোর একটা ছবি, যে কোনো একটা নাম পদবী, বায়ো ইত্যাদি নিয়ে,  আপনার পরিচিত গ্রুপে চারটে কমেন্ট করে আপনার সাথে কথা বলতাম, তাতেই আপনি আমায় জেনে চিনে যেতেন?

-না তা হয়ত হতনা। আমি অচেনা লোকের সাথে এমনিও কথা বলিনা।

-ফেসবুকে সবাই আপনার চেনা?

-ফেসবুক আর ইনবক্স এক না। পার্সোনালি সবার সাথে কথা অবশ্যই বলিনা।

-বেশ, তাহলে আর কি! ফেসবুকে চাট্টি বাজে মিথ্যে বলে, কমেন্ট করেই আপনার সাথে আলাপ করব!

-মানে! কিরকম লোক আপনি! মিথ্যে বলে কথা বলবেন,  সেটাও গলা বাজিয়ে বলছেন!

-কী করব ম্যাডাম,  সত্যি বললাম আপনি তো বিশ্বাস করলেন না!

-কারন সেটা বিশ্বাসযোগ্য না!

- আচ্ছা বেশ শুনুন, আপনার বাড়ি শোভাবাজার, ভাড়া থাকেন, বাড়িতে মা বাবা আছেন। বাবা ব্যাংকে চাকরি করতেন এখন রিটায়ার করেছেন। আপনি চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট। এসব গুলোই আপনি বলবেন হ্যাকার বলে আমি জেনেছি বা আপনার ফেসবুক থেকে জেনেছি, যদিও লাস্টের ইনফরমেশনটা ছাড়া কিছুই আপনার প্রোফাইলে নেই। আপনার একটা ছোট বোন ছিল, দু বছর বয়সে সে মারা যায়, আপনার কনুইএ একবার চিড় খেয়েছিল, আপনার জ্যেঠতুতো দাদা কুকুরকে বাঁচাতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করে ফেলে, এখনো আপনার বাঁ হাত পুরো টা টান করতে পারেননা। আর কিছু বলব?

- আপনি কে? কী চান?

- বিশ্বাস করবেন না জানি। তাও আবারও বলি আমি ভূত। বেঁচে থাকলে আমার বয়স আপনার বয়সের থেকে দশ বছর বেশী হত, মরে গিয়েও অবশ্য একই আছে।

-আপনি সত্যি বলছেন?

- হ্যাঁ রে বাওয়া হ্যাঁ। আমাদের সম্পর্কে যা সব শোনেন,  সবই ভুলভাল। আসলে ধরুন মানুষ মরে অন্য ডাইমেনশনে চলে যায়। আমরা আপনাদের সাথে কমিউনিকেট করতে পারিনা চট করে কারন টাইম ট্রাভেল করে ওয়ার্ম হোল দিয়ে এক্স্যাক্ট আমার জীবনেরই ফিউচারে যাওয়ার সোজা কোনো রুট পাওয়া যাচ্ছিল না। হয়ত অন্য কোনো প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে চলে গেলাম আর সেখানে হয়ত আমার মা বাবার বিয়েই হয়নি, কিংবা আই হয়ত এখনো বেঁচে আছি। তবে রিসেন্টলি একজন এটা আবিষ্কার করেছে। ফলে আসা যাওয়া সোজা হয়ে গেছে।

-আমার খুব অবাক লাগছে। বিশ্বাস করার মত না। তাও আপনার কথার কারিকুরিতে বিশ্বাস করে ফেলছি যেন।

-ইটস ওকে। একটু শক্ত বটে বিশ্বাস করা।  তবে বিশ্বাস করলেও ক্ষতি নেই কিছু। এই যে আপনার আগের বয়ফ্রেন্ড যে আপনাকে ঠকালো, তাকে তো চিনতেন অনেকদিন, তাও চেনা হল কই। আরে আরে ওরকম মুখ করবেন না, আই অ্যাম সরি, আমার বলা উচিত হয়নি ও প্রসঙ্গ।

-আপনি আমার মুখ দেখতে পারছেন?

- সত্যি বলতে কি আমি তো যেখানে খুশিই যেতে পারি। আপনার ঘরেও। কিন্তু সেটা ঠিক হবে না,  তাই এই চ্যাটেই এসেছি...না আপনার মুখ আমি দেখতে পারছিনা তবে, অনুভূতি বলে তো একটা ব্যাপার আছে নাকি?

-😀

- হাসির কী হল! আগেকার মানুষের অনুভূতি বেশী ছিল, তাদের শিকড় ছিল...আপনাদের মত ভার্চুয়াল জগতের শিকড়হীন সম্পর্কে বিশ্বাসী ছিলনা।

-এমন বলছেন যেন কত বছর আগে জন্মেছিলেন। আপনি ইয়ে মানে কতদিন হল, মানে..

-আরে ভূত হয়েছি কিনা জানতে চান তো? এত আমতা আমতা করার কী আছে। পাঁচ বছর। না পাঁচ বছরের তফাতে এত কথা বলছি না, যদিও পাঁচ বছরে বদলেছে অনেক। আসলে ওই ওয়ার্ল্ডে সব কিছুই আলাদা ভাবে তৈরী হচ্ছে জানেন। ওখানে মায়া দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে মানুষের জীবন বইছে। আমার শুরুতে ভারী অসুবিধে হত, ছোট্ট একটা চাকরি করে আরো দশটা মানুষ তারা হয়ত সে অর্থে নিজের না, এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি, তাদের নিয়ে বাঁচা। বিলাসের জায়গা কমে গেছে, তবে আস্তে আস্তে সে স্বাদ পেলে আর অভাববোধ থাকেনা। বাড়িতে রঙচটা হাফ প্যান্ট পরে থাকার সুখের মত। বোঝাতে পারলাম না ঠিক মনে হয়।

-জানি। আমি বুঝি।

-জানি ম্যাডাম,  তাই জন্যেই তো আপনাকে পিং করছিলাম।

-আচ্ছা আপনি সামনে আস্তে পারেন না?

- হুঁ। পারি তো। কিন্তু এই যে একটু দূরে থাকা, দুম করে প্রথমেই সব দূরত্ব ঘুচিয়ে না দেওয়ার অসুবিধেটুকু থাক না?

- আর ফের কথা বলতে ইচ্ছে করলে?

- হবে। চিঠি লিখে রাখবেন। আমি পড়ে জবাব দেব।

-পুরোনো দিনের মত?

-আমি তো পুরোনো দিনেরই লোক।

- বেশ।  এমনিতেও আজকাল আর ভরসা বিশ্বাস করতে পায়ারিনা, এই চিঠি চিঠি খেলাটাই থাক।

-খেলা না ম্যাডাম,  আপনার বিশ্বাস ফিরিয়ে আনবো ফের, দেখবেন।

-আপনি চলে যাবেন আবার আপনার ওই দুনিয়ায়?

-যেতে তো হবেই ম্যাডাম। সব কিছুর জায়গা থাকে। চাইলেও তো এখানেই থেকে যাবার উপায় নেই। তবে একজন বন্ধু যাকে এখনো চিঠি লেখা যায় তাকে পাবেন।

-মন খারাপ করছে।

-সেকি! এক্ষুনি তো কথাই বলতে চাইছিলেন না।!
- 😑
- আহা রাগ করেনা ম্যাডাম।

-ধোর মশাই আপনার ম্যাডাম। আমার নাম আছে একটা।  আর আপনার নামটাই বা কি? স্যার বলে ডাকতে পারবো না!

- আচ্ছা আচ্ছা,  চিঠিতে জানাবো। কিংবা আপনি জানাবেন। দেখি কে আগে লেখে। আজ যেতে হবে। সময় শেষ,  ডাক পড়েছে। ভালো থাকবেন। চিঠি লিখবেন কিন্তু।

Tuesday, March 26, 2019

আবার পাহাড় (শেষ)

আলো ফুটতেও আকাশ পরিষ্কার হল না। তখনো সূর্য ওঠেনি, ওঠার আগের আকাশ। কিচিরমিচির পাখির ডাক নিয়ে রাস্তাটা ধরে হাঁটছি, ওদিকে খাদের উপর মেঘের সমুদ্র। সমুদ্রের মাথার উপর লাল সূর্য টা হেসে উঠতেই সকাল হয়ে গেল।



চা নুডলস খেতে ঝোলা গুটিয়ে জিসিংভাইকে থাকার কড়ি দিতে গেলাম। সে তো দেখি হিসেবে কেসিনাগের ভাই। যা হিসেব দিলো, তাতে করে আমার থাকা ফ্রি, খাবার খালি পয়সা ধরেছে! বললাম তাকে, হ্যাঁ হ্যাঁ ভারী ভুল হয়ে গেছে তো। এবার সে হিসেব করে চারজনের ভাড়া করে ফেললো। বললাম, কত্তা থামো, এরপর তো কেসিবাবু বাঁশে ছেড়ে দেবেন। যাই হোক হিসেব মিটিয়ে, ফিরতি রাস্তা ধরলাম। নামার রাস্তা এতোই প্রলোভনের হয়, ইচ্ছে করে ছুট লাগাই....গড়গড় করে নেমে যাব! কিন্তু লোভে পাপ পাপে গড়িয়ে পড়া। তাই ব্যালেন্স করে করে,নামতে হয়। মেঘমাতে আর্মির ক্যাম্প আর বৌদ্ধ মনস্ট্রি রাস্তার দুই পারে রয়েছে। বেশ চমৎকার সহাবস্থান বটে।ঘন্টার আওয়াজ পেলাম মনষ্ট্রি থেকে, শান্ত সকালে যেন ওটাও একটা অংশ, আলাদা না। আর্মির লোকেরা রাস্তা দেখিয়ে দিল আমায়, এখানে একটা রাস্তা নীচে বনে চলে যায়,পথ হারাবার চান্স থাকে।






মেঘমা থেকে চিত্রে অব্দি আবার খানিক গাছপালা আছে। লোকজনের সাথে দেখা হয় রাস্তায়, মানেভঞ্জন থেকে আসছে সব।নানানরকম দল, অল্পবয়সী, মাঝবয়সী...রাস্তায় একটা কুকুরের সাথে আলাপ হল। আলাপ সামান্যই অবশ্য, কারন তিনি আমায় রাস্তা দেখাতেই ব্যস্ত ছিলেন, কথাবার্তায় বিশেষ উৎসাহী না। ছবি তোলাতেওনা। একবার একবার দাঁড়িয়ে পথচলতি কারোর সাথে কথা হচ্ছে, কিংবা ছবি তোলার চেষ্টা করছি হয়ত, উনিও দাঁড়িয়ে পড়ছেন, একটা ফুল কি পোকা তাড়া করছেন। তারপর যেই না বলছি, "কিরে আর যাবি? অনেকটা রাস্তা এলি তো, যা এবার ফিরে যা। টাটা। "
অমনি বকে ধমকে একাকার। "আমি যাবনা বলেছি কি? তুমিইই তো দাঁড়িয়ে পড়ে ছবি তুলছ, বকবক করছ! কী যে স্বভাব মানুষের কে জানে বাবা! এসব বদভ্যাস আমাদের নেই। চলো চলো। " বলে পাঁইপাঁই দৌড়চ্ছে, ফের আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।
- দাঁড়া রে ব্যাটা তোর একটা ছবি তুলি? 
-আহ কেন বাপু বেশ তো কান চুল্কাচ্ছি আরাম করে, ছবি দিয়ে কী হবে!এই করতে করতে আমার সাথে তিনি চিত্রে অব্দিই এলেন। তারপর কোনো রকম মন খারাপ, পিছুটান ছাড়া চলেও গেলেন। 
ধর্মরাজ কি ডাউনহিল এলেন?


চিত্রে থেকে পাইন বনের রাস্তায় নামছি টুকটুক করে। ইচ্ছে করেই আস্তে আস্তে নামছি। আর তো একটু পরেই তো আর এই পাহাড়, গাছ, নির্জনতা সব ফুরিয়ে যাবে। একটা রাস্তায়, গাছের ছায়ায় আধশোয়া হয়ে ভাবছি না এত পাখি দেখলাম, তুলতে আর পারলাম না। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ....ঝিরঝিরে পাইন বনের হাওয়ায় ঘুম এসে যায়। এমন সময় একটা পাখি পোজ দিয়ে বলল, ছবি তুলবে? আচ্ছা এই নাও তোলো। তারপর সে কতক্ষন ধরে আমার মডেল হল, তার ঠিক নেই। খচাৎ খচাৎ তুলে তাকে থ্যাংকইউ বলতেই সে আমায় ভালো থেকো হে বলে পালালো। 


শেষ বাঁকটা নামছি যখন পাইন গাছেদের উদ্দেশ্য করে বললাম, "এবার সেভাবে কথা হয়নি তেমন, নিজের মনে বকেছি, এখন বলি?যদিও জানো তোমরা,ইয়ে মানে শ্রদ্ধা টদ্ধা ওজনদার কথা, তা বাদ দাও, আমি তোমাদের ভালোবাসি। সত্যিইই। ভালো থেকো কেমন? আর ইয়ে থ্যাংকু। " 
বাকি আরো কথা হল বটে, তবে সে সব পার্সোনাল। আমি জানি ওরা বুঝেছে, হাওয়াটা বদলে গেল দেখলে না? আর থ্যাংকুটাও নিয়েছে, ওটা যে আমি ফর্মালিটি করিনি সে বেশ বুঝেছে। গাছেদের এই ব্যাপারটা অবাক লাগে না আর, আমি জানি ওদের টেলিপ্যাথি তীব্র, সব জায়গার গাছেদের কানেকশন ওদের আছে। মানে ধরো আমি কোলকাতায় একটা গাছের গায়ে পানের পিক ফেললাম পাহাড়ের গাছ জানবে, ওরা তোমায় উপেক্ষা করবে। আর যদি ওদের কাছে একবার পৌঁছে যেতে পারো, জীবনটা বদলে যাবে। না না গাড়ি বাড়ি যশ কিছুই হবে না, জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে। গাঁজা ভাঙ না খেয়েই ফুরফুরে মন হয়ে যাবে।





ফেরার সময় ট্রেনে ওয়েটিং লিস্ট দুই...অগত্যা বাসেই। শিলিগুড়ির বাসস্ট্যান্ডের কাছে দাঁড়ালে হরেক মানুষ দেখা যায়। চানা মটর কচুরি ভাত ডাল খাওয়া প্যাসেঞ্জার, দালাল, মজুর, গোমড়া টিকিট কাউন্টারের লোক, টাকা হারিয়ে গেছে বলে সাহায্য চাওয়া মিথ্যুক ...অপেক্ষা কোলাজ হয়ে যায়।আজ ত্রয়োদশী বা চতুর্দশী। জানলার পর্দা সরিয়ে দেখছি, দুধারের মাঠ, গাছ, বাড়ি ঘর সব চাঁদের আলোয় অন্য ডাইমেনশনের হয়ে গেছে যেন....চাঁদের আলোই ওই জগতে যাবার রাস্তা....প্যারালাল ওয়ার্ল্ড।সেই চাঁদের আলো, একবুক তেষ্টা নিয়ে খাল, মাঠ, ঘরবাড়ি বুকে পুরে নিচ্ছে,আগামী এক পক্ষকালের অন্ধকার সইবার জন্যে....যেমন করে এই মহারাজও রোজকার দৈন্য সইবার জন্য শক্তিটা বুকের মধ্যে পুরে নিয়ে এসেছে....





Saturday, March 23, 2019

আবার পাহাড় (২)

ঠান্ডার জায়গায় ঠান্ডাকালে যাবার অসুবিধে সুবিধে সবাইই জানে। আরেকটা অ্যাড করে দিই, জামাকাপড় মোজা সব পরেই শুয়ে পড়ো, সেই পরেই ফের সকালে বেরিয়ে পড়ো। তাই সকালবেলা যখন ঘুম ভাঙলো, আমার জানলার কাচের বাইরের অন্ধকার কেটে গেছে দেখে, তুড়ুক করে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়তে সময় লাগে না বিশেষ। 
ছাদে গিয়ে দেখি ওইই তো স্নো পিক দেখা যাচ্ছে। কাঞ্চনজঙ্ঘা না কুম্ভকর্ণ কোন পিক জানিনা, কিন্তু গরম চা এর কাপ হাতে, পাইন বনে ঘেরা গ্রামে চাদে বসে স্নো ক্যাপ মাউন্টেন দেখতে গেলে নামের অত মহিমা লাগে না। অন্তত আমার কাছে। সুন্দর রোদ মাখা সকাল। কিচিরমিচির করে পাখি ডাকছে। একটু পরেই বেরিয়ে পড়ব। তার আগে হেঁটে হেঁটে ভিউ পয়েন্ট থেকে দেখে আসা গেল একবার। মন্দির থেকে ঘন্টার আওয়াজ ভেসে আসছে।





এক পেট নুডলস খেয়ে, পদ্মদিদির ভরে দেওয়া চা ফ্লাস্কে আর জল বোতলে নিয়ে শেরপা নিবাসের পাশ দিয়ে হাঁটা শুরু হল। আলোয় ছায়ায় মোড়া রাস্তা। পদ্মদিদির বর বলে দিয়েছে ফুটবল গ্রাউন্ড অব্দি চওড়া রাস্তা তারপরেই ফুট ট্রেল শুরু, কোনো ভাবেই যেন ওই ফুট ট্রেল না ছাড়ি৷ আর পদ্মদিদি বলে দিয়েছে সাবধানে যেত। শেরপা নিবাসের পাশে একটা ঘোড়া একমনে পাতা চিবোচ্ছে। খান কতক ছেলে ট্রেক শুরু করবে বলে প্রস্তুত, গাইড এলেই শুরু করে দেবে। অল্পবয়সীইই সব, কলেজ পড়ুয়া বা আরেকটু বেশী। ফুটবল গ্রাউন্ড এর পাশেই প্রাইমারি স্কুল। ট্রেইল ধরে একটু এগোলেই জঙ্গলের রাস্তা শুরু। সাদা একটা ফুলের গাছ আছে সবুজ জঙ্গলটায় মাঝে মাঝে আলো জ্বালিয়ে ফুলে ভরে আছে।




সামনে গুরাস পিছনে ম্যাগনেলিয়া

 নীল ঝকঝকে আকাশ, ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ পাখি উড়ছে। আমি তাক করলেই তারা উড়ে পালাচ্ছে। বদামির সীমা থাকে মশাই। এই পাখিগুলো এত জ্বালিয়েছে, মানে ফচকেমি করে খালি উড়ে উড়ে পালিয়েছে ফোকাস করতে গেলেই যে আমি ঠিক করেছি পরের জন্মে এইরকম ফুদকুরি পাখি হয়েই জন্মাবো আর মানুষ গুলোকে উত্যক্ত করবো মনের সুখে। লাল লাল ফুলের গাছও ঢের আছে আর আছে ঘাসফুল। অদ্ভুত আরাম আর আনন্দ হচ্ছে এই পুরো জঙ্গলটার রাস্তায়, যতক্ষন না টংলু পৌঁছচ্ছি একা আমি। উঠতে উঠতে হাঁফিয়ে পড়লে পাখির ছবি তোলার নামে জিরিয়ে নিচ্ছি একটু। খানিক ওঠার পর দেখি শুকনো সাদা পাতা ছড়িয়ে গাছের তলাটা কেমন যেন বরফের রঙ নিয়েছে। ছবি তোলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভালো পারিনা, তাই যা চোখে দেখলাম তা লেন্সে ধরা গেল না।




গাছতলায় আরাম করে বসে একটু জল খেয়ে চা এ চুমুক দিচ্ছি। ঝিরঝিরে হাওয়া দিচ্ছে। ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মতো জ্যাকেট, গেঞ্জি খুলে ফেলেছিলাম ক্রমে, এখন আবার মনে হচ্ছে পরে নিলেই ভালো। এই জ্যাকেট খোলা পরার ক্যাপ্টেন গিরি টংলু অব্দি চলেছিল। বেশ খানিক ওঠার পর একটা খোলা জায়গা এল আর সেখান থেকেই দূর পাহাড়ের উপর টংলু দেখতে পেলাম। দেখে সত্যি বলব আমার শুকিয়ে গেছিল। হ্যাঁ! ওই পাহাড় চড়তে হবে এখনো! ইরিবাপ্রে। কী আর করা দূরে না তাকিয়ে ফের ফুল পাখি গাছ পালা দেখতে দেখতেই হাঁটা দিলাম। খানিক ওঠার পর দেখি, অ্যাঁ! আমি এই এতোটা উঠে পড়লাম! মানে রাস্তা যতটা কঠিন লাগে দেখলে অতটাও না। চলা শুরু করলেই সোজা হয়ে যায়। 







আর দু পাক ঘুরে একটা ঝাঁকড়া গাছের পাশ দিয়ে উঠলেই ওই তো টংলু। একটা মারুতি ওমনি দাঁড়িয়ে আছে। তার ভিতরে দুজন কি সব করছে। একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। বাড়িটায় গিয়ে খোঁজ নিতে গেছি, ওটাই ট্রেকার্স হাট কিনা ওব্বাবা একটা বিটলে বদ কুকুর ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এলো। পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে গলে আমায় সে কি চমকানি। জ্বালাতন তো! কই কে আছেন? এটা ট্রেকার্স হাট? উঁহু এটা না এটা না, ওই বাঁকটা এগিয়ে যাও ওইখানে৷
বাঁকটা ঘুরতে দেখি এক দল ঘোড়া একটা ফাঁকা জায়গায় লুটোপুটি খাচ্ছে খুব গড়াগড়ি দিয়ে। আজব তো! ঘোড়ারা তো নাকি খালি মরে গেলে শুয়ে পড়ে শুনেছিলাম! ওইদিকে দুটো কুকুর চেঁচাচ্ছে হিংস্র ভাবে; বাঁধা আছে দেখছি! যাক!





ট্রেকার্স হাটে ঢুকে দেখি দুজন লোক, স্থানীয় না অবশ্যই, হিন্দিতে আমায় বলল, ওই দিকে কেউ আছে কিনা খোঁজ নিতে, বাঙালীই হবে বোধ হচ্ছে। "কোই হ্যায়" বলে উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখলাম একটা খাবার জায়গা, কেউ নেই, আমার আওয়াজেই মনে হয় এক অল্পবয়সী মেয়ে বেরিয়ে এলো ভিতর থেকে। 
"বুকিং নেই, ঘর চাই।"
-ভাইয়া বল সকতে হ্যায়।
চেয়ারে ব্যাগ রেখে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। মেঘে স্লিপিং বুদ্ধ তো দূর বুদ্ধের নাকটুকুও দেখা যাচ্ছেনা! অবশ্য নতুন করে হতাশ হবার কিছু নেই, আমার সাথে কাঞ্চনজঙ্ঘার সম্পর্ক পদ্মাবতী আর আলাউদ্দীন এর মতোই। রানী দেখা দেবেননা আমিও নাছোরবান্দা, দেখি কতদিন অপেক্ষা করায়। 
বাঙালী ভদ্রলোক দুজন তখন বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। আমায় একা দেখে অফার করলেন ওনাদের সাথে সান্দাকফু অব্দি যেতে, গাড়িতে জায়গাও আছে, আর সান্দাকফুতে বুকিংও। কাল ওনারা নেমেও যাবেন। কিন্তু আমার তো তাহলে হাঁটা হবে না। আমি তো হাঁটতেই এসেছি...নিজের মতোন, গাছেদের সাথে বকবক করবো, পাথরে শুরে পড়বো, ইচ্ছে মতো জায়গায় বসে গান গাইবো হেঁড়ে বেসুরো গলায়....কিংবা একদম চুপ করে পাহাড়ি নিস্তব্ধতা বুকে পুরে নেব।
সবিনয়ে জানালাম এ যাত্রায় হবে না, তবে পথে এই যে কত লোক পাওয়া হয়ে যায় তবু বলি কেন একা ঘুরি?








খানিকবাদে জিসিং ভাই এলো। গাল দুটো টমেটোর মত লাল। খুব নাকি বুকিং চলছে তাই ঠিক সামনের ভালো ঘর গুলো দিতে পারবেনা। পিছনের ঘর এ থাকতে পারি। তাই সই। ব্যাগ বস্তা রেখে বেরোলাম। ট্রেকার্স হাটে জিসিং ভাই বিরানব্বই সাল থেকে আছে। নিজের ফার্ম মত বানিয়ে ফেলেছে এতোদিনে। গরু, মুরগী, কুকুর, ঘোড়া, ছাগল নিজের ক্ষেতিবাড়ি। তবে শুনে যেমন মনে হচ্ছে ওরকম না। এই ধরো একটা পাথরের উপর মুরগির ঘর, উঁচু নিচু চড়াই ভেঙে খানিক গিয়ে গরুর থাকার জায়গা। ওইই দূরে পাহাড়ের ঢালে অল্প করে চাষের জায়গা। আরো খানিক নীচে নেমে গেলে জল ধরে রাখার জায়গা...ওইইই টুমলিং থেকে আসে। জলের বড় অভাব এখানে। এই ধরে রাখা জলই বয়ে নিয়ে যেতে হয় ট্রেকার্স হাটে। ওইই যে নীচে টুমলিং দেখা যাচ্ছে। 


সোজা রাস্তায় গেলে ঘুরপথ হবে, পিছনের এই পাহাড়ি পায়ে চলা রাস্তা ধরে গেলে কম হবে খানিক। নীল আকাশে মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, সুন্দর হাওয়া, আমি তরতর করে হেঁটে নেমে গেলাম ঘোড়াগুলো যে রাস্তায় গেছে সেই পথে। এ পাহাড়টা পুরো ন্যাড়া। গাছ নেই একদম। হয়ত মরে গেছে বা শীতের পর পর বলে এত ন্যাড়া বোঁচা লাগছে। চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়েছি একটা চ্যাটালো জায়গা দেখে। মেঘ গুলোর হাবভাব দেখছি। পুরোই কেতাদুরস্ত মানুষ এর মতো ব্যবহার! এই দিক থেকে মেঘবাবু এক যাচ্ছেন, ওদিক থেকে মেঘবাবু দুই আসছেন, দুজনে মুখোমুখি, "হাই, সব ভালো তো?"? " হ্যাঁ হ্যাঁ, হ্যাভ এ নাইস ডে"। ব্যাস কথা শেষ, দুজনে নিজের মত চলতে লাগলো। শেষে রোদ যখন নাকটা ভালো রকম খামচাতে শুরু করলো ফের ওঠা গেল। রাস্তার ধারে একটা বৌদ্ধ মন্দির মত আছে, সেখানে ঢোকার আগে একটা ছোট গেট, কেউ কোথাও নেই, ঝরা পাতার রাশি, ফুল ফুটেছে লাল গাছটায়, এমনকি পাখির আওয়াজও শোনা যায়না।



টুমলিং এ ঘরবাড়ি কিঞ্চিৎ বেশী। সান্দাকফু যাবার গাড়িগুলো সারাই ঝাড়াই হচ্ছে এখানে। এখানেও একটা বৌদ্ধ স্তুপ টাইপ আছে। আমি ঘুরে দেখলাম, ফল আর জল দিয়েছে খেতে, নো পয়সা। আমি আবার মন্দির টন্দিরের খুচরো টাকা নিয়ে আরেক মন্দিরের কাজ সেরে থাকি....যদিও এখানে প্রয়োজন নেই। টুমলিং থেকেও কিচ্ছু দেখা গেল না। মেঘ বরং আরো বেরেছে। ফেরার রাস্তাই ধরলাম আবার। এদিকে মেঘগুলো নেমে এসেছে উপত্যকায়। মেঘ দিয়ে পুরোই ঢেকে গেছি। এইরে, রাস্তাটা কোথায়?




টুমলিং টংলুর থেকে নীচে। ফলে নামার সময় রাস্তা ঠাওর করে করে না নামলেও চলে কারন পুরো জায়গাটাই ফাঁকা, গাছপালা নেই, রাস্তা হারাবার প্রশ্নই আসেনা। কিন্তু ওঠার সময় তো লাগে। এমন মেঘে ঢাকা তারা হয়ে আছি, গরুর পাল, ঘোড়া গুলো,কিচ্ছুই দেখতে পাচ্ছি না। শেষমেষ জলের লাইন যেটা কিনা জিসিং ভাই দেখিয়েছিল, টুমলিং থেকে যে লাইন দিয়ে জল এসে টংলুতে আমাদের খাওয়া ধোয়ার ব্যবস্থা করে সেই জলের লাইন ধরে ধরে এবড়োখেবড়ো বেপথে চলতে লাগলাম। চলতে চলতে একটা নীচু জায়গায় দিল্লি একটা ঘোড়ার কংকাল পড়ে আছে। মরে কংকাল হয়ে শুয়ে আছে....বড় অসহায় দেখতে লাগে। পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাই, ট্রেকার্স হাটের কাছাকাছি এসে দেখি, একটা দল খচ্চরের পিঠে জিনিস মালপত্র চাপিয়ে হেঁটে আসছে, কথা ভাসছে তাদের 
"টংলুতে কিছুই নেই"
"সেবার অমরনাথের রাস্তায় গেছিলাম, ওটা আরো খাড়াই...."
এসব দলকে সযত্নে পাশ কাটিয়ে যেতে হয়। বেলা হয়েছে বেশ, খেয়ে নিলেও হয়। মেঘ এখোনো কাটেনি। তবে দু হাত দূরের জিনিস দেখা যায়নার থেকে বেটার হয়েছে।





খেয়ে উঠে আশপাশটা চড়তে বেরিয়েছি ফের। খাদের দিকে মেঘ হলে কি হয়, গাছের উপর রোদ পড়েছে বেশ, কিচিরমিচির করে সেই ফচকে পাখিগুলো খুব আমায় প্রভোক করছে আর যেই না ফোকাস করার চেষ্টা করছি অমনি ফুড়ুৎ। যা যা, তুলবো না ছবি হুহ, এলেন আমার ক্যাটরিনা রে। পস্ট শুনলাম কিচিরমিচির করে আমায় আওয়াজ দিয়ে পালালো ফচকে গুলো। 




সকালে মারুতি ওমনিতে যাদের দেখেছিলাম, তারা ক্যাম্প করতে এসেছে। গাড়িতেই থাকা খাওয়া শোওয়া সব। তবে কতদূর যেতে পারবে ওরা জানেনা, কারন, গিসিবাসের পর তো ওমনি আর যাবে না। যাকগে ওরা তা নিয়ে অত ভাবছেই না। কম্বলের উপর জায়গা করে দিয়েছে, আঙুর খাও, লাঞ্চ করে যাও আমাদের সাথে, গাঁজা খৈনী চলবে কিছু? বেশ খানিকক্ষণ আড্ডা মেরে উঠে পড়লাম। এই যে আমি কোনো স্নো পিক, কোনো স্লিপিং বুদ্ধ দেখতে পাচ্ছিনা তাতেও আমার কোনো দুঃখ হচ্ছেনা। আমি উঁকি মেরে মেরে দেখছি লাল গরুটা হাম্বা হাম্বা করে জিসিং ভাইকে ডাকছে, "এবার আমায় ঢুকিয়ে দাও না ঘরে", বলে বলে। ছাগল গুলো তো বোকার হদ্দ মেঘে মেঘে কোথায় ঘুরছে কে জানে! মুরগীটা কোঁক্করকোঁ করে করে চিক্কুর ছাড়ছে, মুরগী না মোরগ এটা? কে যেন ডাকে? ভারী সুন্দর দেখতে কিন্তু। তবে আমি আবার সাধক মানুষ কিনা, এমন সুস্বাস্থ্যের মুরগী দেখলে মনে হয় খেতেও হেব্বি হবে।



বেলা পড়ো পড়ো যখন, একটা পরিবার এলো, বাবা মা ছেলে, প্রপার ট্রেকিং ব্যাগ, জামা জুতো লাঠি নিয়ে। আমার মতো যা আছে নিয়ে বেরিয়ে পড়া পাব্লিক না। আর কেউ না আসলে জিসিং ভাই আমায় সামনের ঘরটা দেবে, আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেলে ওই ঘর থেকেই স্নো ক্যাপ মাউন্টেইন দেখতে পাওয়া যায়। আর কেউ এলো না, ঠান্ডা আরো বাড়লো....ক্রমে অন্ধকার হয়ে এলো আর একটা ফ্যাকাশে চাঁদ উঠলো। ওই অন্ধকারে ওই চাঁদেরই জোর বেজায়। সে যে কী অদ্ভুত, কী মায়াবী লাগছিল বোঝাতে পারবোনা। চাঁদের আলোয় মেঘে ঢাকা টংলু আমার কাছে ভারী অচেনা লাগছে। যেন এই পাহাড়, গাছ, ঘরবাড়ি, রাস্তা সব অন্য জগতের। আমি ওই রাস্তা ধরে কুয়াশায় মেঘে মিলিয়ে গেলে অন্য কোথাও পৌঁছে যাব। আমি বোঝাতে পারবোনা সে অনুভূতি। বাঁধানো রাস্তা ধরে হাঁটছি, কেউ কোত্থাও নেই, নিজের পা এর শব্দ ছাড়া.....চুপ করে বসে রইলাম একটা জায়গায়। তারপর গেলাম ফের সেই ছেলে দুটোর গাড়ির কাছে। ওরা তখন কাল ওদের সঙ্গে আনা কাঠ জ্বেলে আগুন পোহাচ্ছে।বসে কফি খেলাম, আবোলতাবোল ভাবতে ভাবতে ফিরেও এসেছি আবার। ঠান্ডায় হাত পা জমে যায় মশাই। জিসিং ভাই এর ছেলে পেম্বা ক্রুজে শেফ, ছুটিতে এসেছে। কিচেনে কাঠের আগুনে রান্না হচ্ছে, আমি আর পেম্বা খানিক গল্প করছি, ওদিকে জিসিংভাই, ওর বৌ,শালী আর দুজন লোক মিলে গল্প গুজব করছে। একটা দল এলো এগারোজনের। রাতের রান্না শেষ প্রায়। এমন সময় দেখলাম সেই সুন্দরী কমলা থুড়ি মুরগী কাঠের থালায় শুয়ে এলেন। পেম্বা, যার নামের মানে শনিবার, সে দামী ঘড়ি হাতে, একটা চপার হাতে লেগে পড়লো কাজে। ঢিমে আঁচে কাঠের উনুনে হওয়া দেশী মুরগীর মাংস আর ভাত.....খেয়ে হাত ধুতে ইচ্ছে করে না এত ঠান্ডা। কুয়াশা কিংবা মেঘ আরো নেমে এসেছে, ওদিকের মাঠে দুটো দল ক্যাম্প করেছে, কুকুর দুটো ডেকে উঠছে মাঝে মাঝে। আস্তে আস্তে সব চুপ করে গেল। আমি ছাড়া এদিকের ঘর গুলোয় আর কেউ নেই। জানলার পর্দা সরিয়ে উঁকি দিলে ফ্যাকাশে চাঁদ, কুয়াশা কিংবা মেঘ, কয়েকটা তারা....আর অনন্ত নিস্তব্ধতা। যতবার ঘুম ভাঙলো রাতে ততবার এ দৃশ্যের বদল হয়নি, আলো ফোটা অব্দি।










(ক্রমশ)

Tuesday, March 19, 2019

আবার পাহাড়

প্রেম বোঝা যায় বিরহে বলেছিলাম না? তা যেমন সত্যি, তেমনি জড়িয়ে মড়িয়ে থাকলে ভালোবাসা জন্মায় এও সত্যি। দূরে আছি পাহাড়ের থেকে কতদিন? প্রায় এক বছর হতে চলল মনে হয়। তাও কয়েকদিনের কাছাকাছি থাকাই তো ছিল কেবল, কিন্তু সত্যিকারের দূরে তো নেই আসলে। ভালোবাসা শিকড় মেলে, সেই শিকড়টা তো পাহাড়ে গিয়েই বসিইয়ে , ছড়াতে দিয়েছিলাম। তাই পাহাড় না দেখলে কষ্ট হয় কিন্তু এটাও জানা থাকে আছে তো....

পাহাড়ে বারবার আমি অসময়ে যাই। ইচ্ছে করে যাই এমন না আসলে অত গুছিয়ে নিজের সাথে ঘুরতে যেতে ভালো লাগেনা। ফলে, যে সময়ে রডোডেনড্রনের আগুন জ্বলে আমি পাহাড়ে থাকিনা, যে সময় পরিবেশ উপযুক্ত থাকে সক্কলে টিকিট কেটে ফেলে আমি এদিক সেদিক ঘুরঘুর করে ভাবি, একবার ঠিক সময়ে যাব। টুকটাক ঘোরাঘুরি করার ফলে জানি, শহরে চাঁদ ঠিক প্রকাশ পায়না। তাই দোল পূর্নিমা না পেলেও একদশী দ্বাদশীর চাঁদও আলো ছড়াতে ভালোই পারে যদি তুমি দেখার সুযোগ পাও।

সান্দাকফু যেতে অন্তত গোটা পাঁচেক দিন লাগেই। আমার মধ্যবিত্ত জীবন প্রেমে অত দিন দেয় কই! ফলে পাহাড়ে হাঁটবো এই ইচ্ছে টুকু পূরন করতে টংলু টুকুই ঘুরে আসি। সেবার টংলু যেতে গিয়েই ভার্সে চলে গেছিলাম, পেন্ডিং আছে অনেকদিনকার। ফের সুমিতদাকে জ্বালাতন, কোন রুট দিয়ে যাব কোনটা দিয়ে ফিরবো, কতক্ষন লাগবে মোটামুটি। একটা দিনই ছুটি খালি, সোমবার, মানে সোমবারেই বিকেলের মধ্যে শিলিগুড়ি নামতে হবে। মোটামুটি যা বোঝা গেল, টংলু থেকে মানেভঞ্জন তিন সাড়ে তিন ঘন্টায় নেমে আসা যায়। কিন্তু এ তো এক্সপার্ট ট্রেকারের মত, আমি তো সে অর্থে ট্রেকার নই। ধুস যা হবে দেখা যাবে....

সুতরাং দুদিন আগে টিকিট দেখতে বসে দেখা গেল.... কী আবার অফকোর্স ওয়েটিং। জেনারেলে যাওয়া যায়....বাসের টিকিট আছে কি? আরিব্বাস আছে তো। চলো ফের। অফিস থেকে ফেরার পথে মনে পড়ে, একটা রুকস্যাক তো কিনতে হত। পাওয়ার ব্যাংকও তো নেই। যাকগে যাক। এই ব্যাকপ্যাকেই হয়ে যাবে।

শিলিগুড়িতে নেমে চা বিস্কুট খেয়ে গাড়ি খুঁজছি। শেয়ারে যাব অবশ্যই। সুখিয়াপোখরির গাড়ি মেলে, তবে এইখানে সব দার্জিলিং এর গাড়ি। দার্জিলিং মোড় অব্দি না গিয়ে আর, এখান থেকেই ঘুম অব্দি চলে যাই, ফের না হয় ওখান থেকে সুখিয়ার গাড়ি ধরে নেব। শেয়ার গাড়ির মজা বা সাজা যাই বলো না কেন, বেশ হরেক কিসিমের লোক মেলে। আমার পাশে যে তিনটে ছেলে তাদের দুজন হল গিয়ে স্টুডেন্ট। শৌখিন। হুঁ হুঁ বাবা ফেলুদা আম্মো তো পড়েছি খানিক নাকি? হাতে ওয়ান প্লাস, আঙুরের প্লাস্টিক, শেয়ার করার আধিক্য, পাহাড় দেখেই খচাৎ খচাৎ ছবি...দার্জিলিং প্রথমবার, কলেজ পড়ুয়া শিওর। আর এক জন গায়ে সস্তার চকচকে কোট, হাতে উল্কি, রোঁয়া ওঠা ফুটপাথের ব্যাগ, বিরক্ত মুখ চোখ, ঢুলতে ঢুলতে সারা রাস্তা.....দার্জিলিং এ কোনো হোটেলে কিংবা দোকানে কাজ করে। নাহ আমি জিজ্ঞেস করিনি কিছুই, ও আমার ভাল্লাগেনা,কাউকে দেখা মাত্রই কোথায় থাকো, কী করো নিয়ে প্রশ্ন করা। কিন্তু বসে বসে আন্দাজ করতে দোষ নাই। বলতে পারো স্টিরিওটাইপ আন্দাজ, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেলে বলেই না স্টিরিওটাইপ আন্দাজ করা হয়ে থাকে!

পিছনের মহিলা পুজো দিতে চায়, একটা নারকেল তার দরকার। পাহাড়ের শেয়ারের গাড়ি বড়ই এডজাস্টেবল হয়। সামনে ড্রাইভার সহ চারজন বসে যায় দরকার পড়লে, যে কোনো গাড়িতে। সে অভিজ্ঞতা পড়ে বলছিখন। যার যেমন দরকার সেখানে দাঁড়াতে পারে। ফলে এনার নারকেলের জন্য বার চারেক হল্ট হল, বিভিন্ন দোকানে। কার্শিয়াং, সোনাদা আর দু জায়গায়। সামনে দুজন বুড়ো মানুষ। বুড়ো মানুষ বলাটা মনে হয় পলিটিক্যালি কারেক্ট হল না। যাকগে এ আমার হাবিজাবি, আমি তো সত্যিই গেঁয়ো আনপড়....। 
হ্যাঁ কি বলছিলাম যেন, সামনের দুই বুড়ো মানুষ, বকম বকম করছিল নেপালি ভাষায় ড্রাইভারের সাথে, বুঝছিলাম না কিছুই। হঠাৎ করে, আমায় বলে সুখিয়া যাবে? ট্রেক করতে বুঝি? ওই যে ওই পাহাড়টা সুখিয়া। বোঝো! আঙুলের তাক বরারবর পাঁচ ছয়খানা পাহাড়, কোনটা সুখিয়া?

ঘুমে নেমে জ্যাকেট গলাচ্ছি, দেখি একা দেখেই তাক করেছে, সুখিয়া? একশো দেবে? না দেবো না বলে, একটা প্রায় চলন্ত গাড়িতে ঝপ করে উঠে পড়েছি। এ রুটের গাড়ি, সুখিয়া নামিয়ে দেবে। আচ্ছা আমার কি খিদে পাচ্ছে একটু? একটা পকেটে খচমচ করছিল চকলেট, চেপ্টে গেছে, ঠান্ডা কিনা তাই গলে গিয়েও ফের র‍্যাপারের গায়ে জমে গেছে। এখানে আমায় কেউ চেনে না, আমিও কাউকে চিনিনা, আর এই গাড়িতে কালচার এর ধ্বজাধারী কেউ নেই, সব আমার মতোই অশিক্ষিত, আনকালচার্ড, লোকজন সুতরাং বেশ আরাম করে জিভ দিয়ে চেটে চেটে চকলেটের র‍্যাপার খানা খাওয়া গেল। খেতে খেতেই সুখিয়ার চেকপোস্ট এ দেখি সিট তুলে তুলে কী যেন সব দেখলো।

সুখিয়া থেকে ধোত্রের ডিরেক্ট যেতে গেলে রিম্বিকের গাড়িতে উঠতে হবে, দার্জিলিং থেকে আসে। খুবই কম কম আসে। অনেক্ষন দাঁড়িয়ে চা কেক টেক খেয়েও গাড়ি আসছেই না যখন ভাবছি একবার আলতো করে মানেভঞ্জন এর গাড়ি গুলোকে জিজ্ঞেস করবো ধোত্রে অব্দি কত নেবে বুক করলে, সেই সময়েই একজন বলল (তার আগে মেলা মাথা খেয়েছি লোকজনের গাড়ি কই গাড়ি কই বলে), ওই তো তোমার গাড়ি।

ও বাবা যেই না গাড়ি এসে থেমেছে দেখি পিল পিল করে চারজন লোক ছুটে এলো। দুজন স্থানীয়, দুজন ট্যুরিস্ট। এবং আশ্চর্য হয়ে দেখলাম তারা সকলেই ফিট করে গেল আমি হাবার মত বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। ড্রাইভারদাদাকেই বললাম গোঁয়ারের মত, আমাকেও নিতেই হবে, ইয়ার্কি নাকি, আমি সেই কক্ষন থেকে দাঁড়িয়ে আছি! 
-তুমিও যাবে? আচ্ছা বসো সামনে। দেখছি, খেয়ে আসি কেমন?

সামনে আরো দুজন ছিল। আমি গিয়ারের একদিকে এক ঠ্যাঙ আরেকদিকে আরেক ঠ্যাং রেখে বসেছি। একটু ভয়েই, গীয়ার ফস করে ইয়েতে মেরে দেবে না তো? সুখিয়া হল বাজার এলাকা। মাঝের চারজন লোক গেছে বাজার করতে, ড্রাইভার গেছে খেতে। গাড়িতে বাকিরা ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে, শুধু বাঙালী ট্যুরিস্ট বাদে। খানিকবাদে ড্রাইভার এলো, বাজারুরা তখনো আসেনি। আরো খানিক বাদে, গাড়ি ম ম করা কেক বিস্কুটের গন্ধ নিয়ে বাকিরাও এল।

মানেভঞ্জন এর কাছে এসে আমায় নামিয়ে দিল। আমি অবাক! অ্যাঁ! যাব কী করে? কাঁউমাউ করে বললাম, এখান থেকে তো কিছুই পাবো না! সে হেসে হেসে বলল, "আরে বাবা এখানে এরা তিনজন সামনে এলাউ করে না, এগিয়ে এসো আছি আমি"। টুকটুক করে হেঁটে, গাড়ি, পারমিট চত্বর পার হওয়া গেল। এখান থেকেই সান্দাকফু ট্রেক শুরু করে বেশীরভাগ লোকে। গাড়ি, পারমিট, গাইড সব এখান থেকেই। মানেভঞ্জন নামটা কেমন অদ্ভুত না? কার মান এখানে ভঞ্জন করেছিল কে, কে জানে!

ধোত্রে আরো সতেরো কিলোমিটার। এ রাস্তায় গাড়ি বেশী চলে না। নিস্তব্ধ রাস্তায়, নেপালী গান আর বুড়ো বোলেরো চলতে লাগল। খানিক বাদে ফের থেমে গেল।
-উতরিয়ে।

আরে ফের কী হল? এবার গেছে গাড়ির ক্লাচের তার কেটে। গদি পেতে শুয়ে পড়ে সারানো হল। এখোনো দশ কিলোমিটার বাকি৷ ধোত্রে হল একটা পাহাড়ি গ্রাম। ছোট্ট, শান্ত। ইচ্ছেগাঁও বা সিলারির মত হাইপড না তাই এখনো ফাঁকাই। বেশীরভাগ ট্রেকাররাই এসে থাকে। খুব কম এমনি ট্যুরিস্ট। এখন বাজে দুটো। সুমিতদাই একজনের নাম্বার দিয়েছিল, তার বাড়িতেই আগে গেলাম, সে নেই, তার ছেলে বলল বাবা না এলে কিছু বলা যাবে না। সে তার বন্ধুকে দিয়ে পাঠালো শেরপা নিবাসে। মন্দ না কিন্তু কিরম কিরম যেন। আচ্ছা আজ সোজা টংলু চলে যাব? ওই ছেলেটা তো বলছিল ঘন্টা দেড়েক লাগবে। ওর ঘন্টা দেড়েক মানে আমার যদি আড়াইও লাগে...দুটো বাজে...সন্ধ্যে হয়ে যাবে....থাকগে। আমি তো কোথাও পৌঁছতে আসিনি। শেষ তক পদ্ম দিদির বাড়িতেই থানা গাড়লাম। একা বলে আর স্টুডেন্ট বলে (ওই আর কি, ঝাড়ি মারলে কিসে পড়ো শুনি যখন হোটেলে স্টুডেন্ট নয় কেন), খানিক ছাড় টার দিয়ে থাকতে খেতে দিল।

খেয়ে উঠে ফের বেরিয়ে পড়েছি। জঙ্গলের দিকটায় যেতে গিয়ে দেখি একটা ছোট পুকুর মত, পাশে একটা লোমওয়ালা গরু জাবর কাটছে। আজ বেশী হাঁটবোনা। কাল টংলু ছয়, ওখান থেকে টুম্লিং দুই ব্যাক করে টংলু ফের দুই, মানে দশ এগারো কিলোমিটার হাঁটা আছে। একটু উঁচুতে ভিউ পয়েন্ট। যদিও এখন কিছুই দেখা যায় না, কিন্তু সকালে নাকি চমৎকার কাঞ্চনজঙ্ঘা সহ স্নোক্যাপ মাউন্টেইন দেখা যায়। ভিউ পয়েন্টের কাছে আরো চারটে ছেলে ছিল। চারজনেই ফোনে ট্রাই করছে, একটু নেটওয়ার্ক পেয়েছে কিনা। গলা নিচু, একটু সাইড হয়ে কিংবা সামনে দাঁড়িয়েই, জোরে জোরে কথা বলা দেখেই ওপারের লোক কারা আছে বোঝা যায়। ফরেস্টের রশিদদা ছিল ওখানে। শিলিগুড়ির ছেলে। টংলুর রাস্তাটা জিজ্ঞেস করে নেমে এসেছি ওখান থেকে ফের। এত লোক ভাল্লাগেনা। এদিক সেদিক চলতে চলতে গ্রামটার মধ্যে ঢুকে গেছি। এক মহিলা রোদে উল বুনছে এক মনে, বাঁহাতে গরু, ছাগল, মুরগির ঘর। চাল বাছছে একজন। রোদ কমে আসছে ক্রমে। রাজন বলে একজনের সাথে আলাপ হল, রান্না করছিল, বীফ কারি। তার গোল্লা মত ছেলেটাকে নিয়ে তার বউ দাঁড়িয়েছিল। গোল্লাটা একবার আমার কোলে এসি এক হাতে আমার দাড়ি আরেক হাতে চশমা খামচেছে। রাজনের ক্ষেতিবাড়ি আছে, টুকটাক মূলো, আলু, বিট, গাজর ফলায়, আর গাইডের কাজ করে৷ 
-চায়ে পিলো ভাই থোড়া, কুছ নেহি তকলিফ হোগা।

সহজ জীবনে সহজ সুর থাকে। বেশী কিছু চাহিদা নেই, তাই সহজে পথের আলাপে বাড়ি ডেকে বসতে দেওয়া যায়। সত্যি বলতে আমাদের গ্রামেও আমি দেখেছি ছোটবেলায় বাড়িতে কেউ এলে আগে বসানো হত। জল মিষ্টি দেওয়া হত। ভিখারী এলেও দুপুরে খালি পেটে যেত না। অনাহুত কেউ ছিল না কোনোদিন। কবে থেকে সন্দেহের বিষ ছড়িয়ে গেল, কবে থেকে আমাদের দৃষ্টিসীমা ছোট হয়ে গেল, আমরা দরজাটুকু একটু ফাঁক করে জিনিস নিই খালি...দেওয়ার পালা ঘুচেছে কবেই। তাই মনে হয় পাবার জিনিস কিনেই মেলে। দাম হীন জিনিসের অধিকার আমরা হারিয়ে ফেলেছি কোন ফাঁকে।

ক্রমে অন্ধকার নেমে আসে। এক দুটো হোমস্টের আলো ক্রমে নিভে যায়। বাকি গ্রাম আগেই অন্ধকার। পদ্মদিদি আমাদের খাইয়ে নিজে খেতে যায়।এই ছাদটা বড় ভালো, পিছনেই স্নোক্যাপ মাউন্টেইন দেখতে পাবো কাল ভিউ ক্লিয়ার থাকলে। রাত বাড়তে হাওয়াও বেড়েছে বেশ। ঠান্ডা টাও। বেশী রাত অব্দি ছাদে থাকা যাবেনা। কিন্তু কী অপরূপ লাগছে। বিকেলে মেঘলা গ্রামটাকে যেমন বিষন্ন লাগছিল, এখন তেমনই মায়াবী লাগছে। আকাশে তারা ফুটেছে অনেক, হাওয়াটা থেমে গেছে। চাঁদের আলোয় জঙ্গল, গ্রাম সব যেন অবাক এক জনপদ হয়ে গেছে। এখানে যেন আর থাকা মানুষের সীমার বাইরে। এক্ষুনি জঙ্গল পাহাড় জেগে উঠবে। যারে মানুষ না থাকে তাই জন্যেই কী এত হাই উঠছে? জানি জানি এতটা জার্নি, রাতে ভালো না ঘুম হওয়ার কথাই বলবে....কিন্তু সত্যিটা কী তা কে জানে.....









(ক্রমশ..)

Monday, March 11, 2019

আলাপ

- আচ্ছা শুনুন। আপনিই আসবেন বলেছিলেন তো?

- আমায় কি মিথ্যেবাদী মনে হয়!

- উহ লংকার চপ মনে হয়।এত ঝাল কেন! 

- কি!??

- না না আপনাকে না।  এই যে নরেনের দোকান থেকে দুটাকার মুড়ি আর চপ কিনেছিলাম কিনা।

- ও আপনিই চপশিল্পের ব্র‍্যান্ড এম্বাসাডর!  ওই জন্যেই এরকম ড্রামের মত চেহারা! 

- দেখুন প্রথম দিনেই এরকম ড্রাম টাম বলে অপমান করাটা কি ভালো হচ্ছে?

- ও আচ্ছা পরের দিন অপমান করব বলছেন?

- আহ কি মুশকিল ভুঁড়ির কথা আসছেই বা কেন। প্রথম দিন ডেট এ গিয়ে এসব কথা বলা ঠিক না! 

- ডেট? দেখা করা মানেই কিছু ডেট না। তাছাড়া হামহাম করে এক ঠোঙা মুড়ি চপ খেতে খেতে হাজির হওয়া লোকের সাথে ডেটিং করতে চাইও না।

- আচ্ছা আচ্ছা আপনাকে কি আর অফার করতাম না। এই তো নিন না।

- আপনি কি পাগল! ফার্স্ট ডেটে এসে লংকার চপ মুড়ি অফার করছেন! নবান্নে তো আপনাকেই দরকার, বাইরে কেন?

- যাক আপনি স্বীকার করছেন এটা ডেটই?

- আপনি খুবই পাজি লোক মশাই। 

- সে অবশ্য অস্বীকার করা যায় না। আচ্ছা দুধ চা না লিকার? 

- মানে? এত কিপ্টে নাকি আপনি যে একটা কফিশপেও যাবেন না!!

- তা না তবে ইয়ে মনের ভুলে ঝগড়া করতে করতে আপনি দেখুন লংকার চপ আএ মুড়ি খাচ্ছেন আমার থেকে, এর সাথে কফি ভাল্লাগবে?

- অ্যাঁ! ও হ্যাঁ তাই তো! কিন্তু আপনি আমায় ঝগ্রুটে বললেন নাকি? 

- না না তাই কি বলি! আচ্ছা শুনুন আপনার মা লুচি বানাতে পারে তো?

- কেন!!

- না মানে,  যেদিন আপনার বাবাকে বিয়ের কথা বলতে যাব....

- কি!! আপনি আমার বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবেন!! আমার বাবাকে! আমার বাবা প্রথমত, আপনার মত চরিত্রহীন না,  আমার মা ছাড়া অন্য কারোর দিকে নজর নেই। দ্বিতীয়ত,  আমার বাবা স্ট্রেট, তৃতীয়ত  আপনি গে যদি আমার সাথে ডেটে এলেন কেন?

- ওরেবাবা। আরে না না,  বিয়ের কথা মানে আপনাকে বিয়ে করার কথাই বলতে যাব আপনার বাবাকে।

- মানে!! গাছে না উঠতেই এক কাঁদি! চপ মুড়ি খেয়েছি আর ভাঁড়ে চা খেয়েছি আপনার সাথে বলেই কী ভাবছেন আপনার প্রেমে পড়ে গেছি!

- আহা রাগ করো কেন। আজকেই তো বলতে যাবনা। কদিন আরেকটু ঘোরাঘুরি করে নিই।

- আরে তুমি আমায় তুমি বলছ কেন! অদ্ভুত তো।

- ইয়ে তুমিও তো তাই বললে। 

- ও হ্যাঁ।  উহ খুবই জ্বালাও হে তুমি! 

- আচ্ছা ওই জন্যেই আগে থেকে বলে দিচ্ছিলাম,  বলছি লুচি আমি সাদা ধপধপে ফুলকো খাই হ্যাঁ? 

- ওহ এলেন লাটসাহেব রে।

- না না লাটসাহেবরা এসব সুখাদ্য খায়না।  যাক যা বলছিলাম। সাথে বেগুন ভাজার ঝামেলায় যেও না বুঝলে, কারন আমি আবার বেগুনের বোঁটার দিকটা খাই খালি। 

-তুমি মেফিস্টোফিলিস! উরুক্কু বাঘ। গন্ডার। তুমি ভেবেই নিয়েছ আমার সাথে বিয়েটা ঠিক আর সমানে খাওয়ার কথা বলে চলেছ।

- আচ্ছা আচ্ছা ক্যাপ্টেগিরি পরে হবে। দেখো, বিয়ে কেন করে লোকে খাওয়ার জন্যেই কিনা? এই তোমার বাড়ি যাব কথা বলতে, তারপর আবার মা বাবার সাথে যাব, তোমার বাড়ি থেকে আসবে, আইবুড়ো ভাত,বিয়ে বৌভাত....উফফ

- পেটুক কোথাকার। ইয়ে শোনো তোমার মেনু ঠিক করা আছে?

- না না চলো  চলো ফিশফ্রাই খেতে খেতে ঠিক করি। আর বলছি শোনোনা, লুচি আমি একটু ভালো খাই হ্যাঁ, মানে স্রেফ চারটে লুচি ধরানো বাড়িতে আমি ভাইফোঁটা নিতেও যাইনা....মানে...

-উফফ...রাক্ষস কোথাকার, বলে দেবো এক ধামা লুচি করতে সেদিন। 

-ইয়ে তারমানে ফাইনাল? 

-- হ্যাঁ আমার যেমন কপাল...চলো এবার মেনুটা করেই ফেলি।

Thursday, February 28, 2019

দিনকাল

দিনকাল খুবই খারাপ যাচ্ছে। হাজারটা চিন্তার মাঝে একটা কাচের বয়ামের গজা নিয়ে আনমনে খাচ্ছি, একটা বাইক এসে প্রায় গুঁজে দেয় আর কি! খাবি খেয়ে হাত থেকে সাধের গজা গেল মাটিতে...টাকা মাটি হতে পারে ডিমনিটাইজেশনে টাকা বদলাতে ভুললে, গজায় মাটি লাগলে দিনটাই মাটি হয়!

যে ঝালমুড়িওলার থেকে খাই, সে ছেলেটা এক মনে দাদ চুলকাচ্ছে দেখলাম...ওই হাত দিয়েই আবার পিঁয়াজ শশা মেশাবে...থাক গে যাক আমি চা খাই বরং। ও বিশু, একটা খুব কড়া কফি...
-দাদা আজ তো কফি করিনি।

নাহ এ দুনিয়ায় বেঁচে থেকেই বা কি লাভ...উদাস মনে তাই এক ভাঁড় চা আর কাচের বয়ামের সাদা পাতা জড়ানো প্যাটিস,  ভিতরে সুজি আর কিসের যেন পুর দেওয়া, ছোটবেলায় খাওয়া বিলকুল মানা ছিল, সেই জিনিস খাচ্ছি। এক জীবনে থুড়ি এক দিনে আর কিই বা বাকি আছে খারাপ হবার, কাকে ঠুকরে দেবে হয়তো কিংবা কুকুরে তাড়া করবে...করুক গে যাক...

এমন সময়...না কাক বা কুকুর না,  আরো সাংঘাতিক বিপর্যয়! এক সাথে চার জন ম্যানেজারের দল বিশুর দোকানেই চা খেতে এসেছে...এহে আরেকটু আগে দেখলেই বাপীদার দোকানে চলে যেতাম...গাড়িটার পিছনে লুকোবো?  অ্যাঁ কি বললেন? এরকম কেন করছি? আরে এক্ষুনি, ক্লায়েন্ট, ক্লাউড, হাবিজাবি বকতে হবে... এই শোকের দিনে অন্তত না প্লিজ....
"কিরে, কি খবর?"
হয়ে গেল! 

দিনের শেষ আওয়াজ খাওয়াটা বাকি ছিল...হাবিজাবি বকতে বকতে বলে, কিরে বিয়েবাড়ি নেই? 
-না ওই জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে আছে।
- তা তোর বিয়ে হয়ে গেছে?
- না -_- 
- হবে না?

অ্যাঁ এটা একটা কথা? হবে না আবার কি!  তোমার মেয়ের সাথে আলাপ করব হ্যাঁ? 😡

Monday, February 18, 2019

একদিন হঠাৎ

একটা কাজ ছিল আজ। জরুরী খুবই। তা বেরোনোর আগে,শীত ফুরোনোর রবিবারের সকালে পাতলা চাদরে পা ঢুকিয়ে, সব্যর আশ্চর্য ভ্রমন পড়ছিলাম। সান্দাকফুর রাস্তায় হাঁটছে তারা,  জলে ভিজছে, জ্যোৎস্না মাখছে, হাঁটছে হাঁটছে....আমার সব গোলমাল হয়ে গেল। বই নামিয়ে চানে ছুটলাম....চেয়ারে রাখা জামা জিন্স গলিয়ে হনহন করে গ্যারাজে। ততক্ষনে আমি জানি আমার আর ওই জরুরী কাজ করার উপায় নেই, আমায় বেরোতেই হবে। আলতো শীতের এই রোদ উপেক্ষা করে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে আমার রবিবার কাটতে পারবে না।

সাড়ে এগারোটা কোথাও যাওয়ার জন্যে বেশ দেরী। রোদ চড়া,  বেলাও অনেক। কোথায় যাব মাথায় আয়াছে না, মালঞ্চর রাস্তা ধরেই যাই। যদ্দুর যাওয়া যাবে যাব। ডেস্টিনেশন জেনে আর কবেই বা আমার কোন চলাটা হয়েছে। ঠিকাছে, চালাও পান্সি....

এই কিছুদিন আগেই শীতের শুরুতে এসেছিলাম যখন এ রাস্তাটা অন্যরকম ছিল। অনেক কটা গাছেই পাতা নেই আর এখন, পলাশ, সজনে ফুলে ছেয়ে আছে।  সজনে ফুল এক অদ্ভুত কম্বিনেশন দেয়। সাদাটে ফুলগুলো সবুজ গাছে যেন আলো জ্বালিয়ে রাখে। বাঁ পাশে খাল সংস্কার হচ্ছে মনে হয়, পাঁক তুলছে। উহ বেজায় গন্ধ। ডান দিকের জমিগুলোয় সর্ষেফুল আর নেই...ন্যাড়া জমি পড়ে আছে শুয়ে। 

বাবুরহাট বলে একটা জায়গার নাম শুনেছিলাম। দেখা যাক কেমন হয়! ভালো না লাগলে ব্যাক করবো। মীনাখাঁ থেকে বাবুরহাট সাত কিলোমিটা মত। সুতরাং চাপ নাই খারাপ লাগলেও চট করে চলে আসা যাবে ফের। তাছাড়া এমনিতেও জানিনা কোথায় যাব! মেন রাস্তার থেকে সরু খানিক, দুপাশে জমিতে ধান বুনছে।  এসময় ধান কেন? শীতের শেষে এ সময় ধান রুইতে হয় নাকি? আলু উঠে যায় তারপর কি হয় যেন চৈত্রের ফসল? মনে পড়ে না....চাট্টি হাবিজাবি জঞ্জালে মাথা ভরা, নিজের জমির হিসাব নাই....ফসল এর খবর রাখিনা ভাত জুটে যায়! 

স্যালোর জলে চান করছে কটা ছেলে।  দেখে আমারও ভারী সাধ হল অমন করে হুড়ুম হুড়ুম করে চান করবার। এহ একটা গামছাও যদি আনতাম! গাড়িটা সাইড করে আল ধরে ধরে হাঁটছি, ধান জমির মাঝে মাঝে শশা ক্ষেতও আছে। একটা ফিঙে তারে বসে দোল খাচ্ছে। কোথা থেকে উদাসী কোকিলের ডাক ভেসে আসছে একটা।  সব ঋতুর আলাদা আলাদা গন্ধ,  রঙ থাকে। হ্যাঁ আমাদের এই ঘোলাটে আকাশেও থাকে, আমি বুঝতে পারি। মানে শুধু তাপমাত্রা বা ফুল দিয়ে না, সবটা দিয়ে। গরমের দুপুরের রঙটা প্রায় এরকমই হবে খালি ধরো এক্সপোজারটা আরেকটু বেশী হবে, তুলিতে আরেকপোঁচ নির্জনতা আর উদাসী কুবো পাখীর ডাক শোনা যাবে। জমির কাছে এলেই এমন ভালোলাগে আমার। অবশ্য আমার অনেক কিছুতেই ভালো লাগে, আমার নীল আকাশ দেখলে ভালো লাগে, জল দেখলে ভালোলাগে, পাহাড়ে পাইন বনে হেঁটে যেতে ভালো লাগে, রোদ উঠলে ভালো লাগে, চমৎকার গান শুনলে ভালো লাগে, পছন্দের খানা মিললে ভালো লাগে....খারাপ লাগার লিস্টিও কম না যদিও তবে এমন ঝকঝকে দুপুরে খারাপ জিনিস কে মনে রাখে! 

একটা শশা তোলার ইচ্ছে হচ্ছিল খুব। কিন্তু কেউ তো নেই, না বলে ঋকানন্দর নিতে বাধে, আমাদের গ্রামে আমি জমিতে গেলে কেউ না  কেউ এমনিই দিত, "একটা  খা না শশা, ভালো রে"।  কিন্তু 'রাখতে যদি আপন ঘরে বিশ্ব ঘরে পেতাম না ঠাঁই '।   সুতরাং গা ঝেড়ে উঠে পড়া গেল। বাবুর হাটে খান দুই রিসর্ট আছে। একটায় আঁ আঁ আঁ আঁখ মারে হচ্ছে উদ্দাম বেগে  আরেকটায় একটা ছোট পুলে জাঙ্গিয়া পরা একদল মুশকো লোক জলকেলি করছে।  কিছু লোক বিয়ারের বোতল হাতে বসে চিকেন পকোড়া সাঁটাচ্ছে। আমি যেন বুক করব এরকম একটা ভাব নিয়ে মালিকের সাথে কথা টথা বলে চা পেয়ে গেলাম এক কাপ। এমন হুল্লোড়ে  দোষ নেই কিছু তবে আমার এমন হুল্লোড়ে আরাম নাই৷ তাড়াতাড়ি ওখান থেকে বেরিয়ে ফের মীনাখাঁ এসে মালঞ্চ। আর একটু এগোলে একদিকে ধামাখালি, আরেকদিকে বাসন্তি,ক্যানিং ঝড়খালি।  চিকেন পকোড়ার গন্ধে খিদে খিদে পাচ্ছিল। রবিবারের দুপুরে মালঞ্চ বাজার ফাঁকাই। একটা লোক গরম গরম কাঠি ভাজা করছে, পেয়ারা জামরুম নিয়ে বসে একজন। হাবিজাবি মিষ্টির ঠেলা নিয়ে একজন। কাঠিভাজা খেতে খেতে মিষ্টির ঠেলার সামনে গেছি। আজ তো আমার দিন, সারাদিন উল্টোপাল্টা অখাদ্য খাবো।
 " কাকা ওই গোল গোল খাজা গুলো কত করে? একটা দাও তো।" 
আরে হেব্বি খেতে তো। রসে টুপটুপে, পুরীর লম্বাটে খাজাগুলোকে দশ গোল দেবে। জিলিপিও আছে, গুড়কাঠিও আছে, নিকুতি এরা যাকে খেজুর বলছে, আর মালপো। কোনটা খাই? উমম গুড়কাঠিই খাব। 
-কাকা আরেকটা খাজা আর একশো গুড়কাঠি দাও দেখি৷ 

খেতে খেতেই গল্প হয়। তার বাড়ি কোথায় আমার বাড়ি কোথায়। আমার বাড়িতে কে আছে,  এ মিষ্টি কে বানায়....আমার চলার রাস্তায়, গাঁয়ে, হাটে বাজারে পথের আলাপ ছড়িয়ে আছে এমন কত। আগের বার ধামাখালী গেছিলাম, এবার বাসন্তীর দিকে যাই। ক্যানিং গেলে নদী কাছে পাব, ঝড়খালি তো দূর হবে, অন্যদিন আসবো খন, এই ভেবে মাতলা দেখতে চলা শুরু ফের। ক্যানিং এ ব্রিজ হয়ে গেছে, ফেরী নৌকা চলে না,  নদীতে জলও নেই। মন ভরল কই! এক লোক বুদ্ধি দিল, চারটে বাজে, ঝড়খালি চলে যাও, আসতে যেতে দু ঘন্টা লাগবে। 

আসতে যেতে দু ঘন্টা মানে রাত হবে ফিরতে। বুদ্ধিমান লোক হলে কখনোই যেত না। কিন্তু আমার যে চলাতেই আনন্দ, এক্সট্রা চল্লিশ বিয়াল্লিশ কিলোমিটার মানে আশী পঁচাশী কিলোমিটার  তো, টেনে দেব খন। কিন্তু এদিকের রাস্তা তো হাইওয়ে না, আর রাস্তাও বেশ প্যাঁচালো, ফেরার সময় অন্ধকারে তো স্পীড তুলতে পারবো না সেসব খেয়াল করিনি। মাথায় যদি পোকা নড়ে তাহলে আর উপায় কি। সাঁই সাঁই রাস্তা, গোল গোল  টার্ণ, হাপুসহুপুস করে ঝড়খালি পৌঁছলাম যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। এই একটা দৃশ্য কত শতবার দেখেও পুরোনো হয়না। জলের মধ্যে রঙ তুলি ধুয়ে নিয়ে সূর্য বাড়ি ফিরলো আমিও এক কাপ চা খেয়ে আড়মোড়া ভেঙে ফিরতি পথ ধরলাম। ব্যাঘ্রপ্রকল্প দেখা হল না, বন্ধ হয়ে গেছে। অবশ্য দেখবার তাড়া নিয়ে আসিওনি। অনেক লোক সুন্দরবন ঘুরে ফিরছে। আমি আলগোছে একবার বোট ভাড়া কিরকম খোঁজ নিয়ে নিলাম,  বলা যায় না হয়ত কোনদিন শখ হবে রাতে আর না ফিরে থেকেই গেলাম! 

এ রাস্তায় স্ট্রীট লাইট নেই, হুশহাস গাড়ির আলো খালি। বাসন্তী হাইওয়ে উঠে গাড়ির স্পীড বাড়িয়েছি এমন সময় হঠাৎ দেখি চাঁদ উঠে গেছে অনেক্ষন। আজ বুঝি ত্রয়োদশী,  চারদিকে ভেড়ির জল চাঁদের আলোয় চকচক করছে। গাড়ি সাইড করে আলো নিভিয়ে বাইরে এলাম।  আমি জানি এসব অঞ্চল সেফ না মোটেও। খুন, রাহাজানি লেগেই থাকে। কিন্তু এ চারিদিকে আদিগন্ত ভেড়ির মাঝে ফাঁকা রাস্তায় চাঁদের আলোয় সে এমন দৃশ্যপট তৈরী হয়েছে তাকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। সে দৃশ্যের বর্ণনা করতে পারি এমন সাধ্য আমার নেই, এ সৌন্দর্যের আনন্দ প্রকাশ করতে পারি তেমন ভাষাও নেই। চাঁদের আলোর নেশা বড় তীব্র,  যে একবার সেই নেশায় বুঁদ হয়েছে তার আর কিছু নেশা লাগে না, মদ না গাঁজা না,  রাজনীতি না, যশ না কিচ্ছু না। 

ফিরতে ইচ্ছে করে না তবু ফিরতেই হয়। এক বুক চাঁদের আলো নিয়ে ফের চলা শুরু।  সায়েন্স সিটির কাছাকাছি তখন, চারদিক ধোঁয়াশায়, মিটমিটে আলোয় আরেক ছবি তৈরী হয়েছে। মাঠের উপর জমাট ধোঁয়াশা, চারদিক শুনশান।  আরেকবার থামতেই হল। চাঁদের আলোয় ভেড়ির জল একরকম আর এই ধোঁয়াশা মাখা মাঠ আরেকরকম। নিস্তব্ধ ভুতুড়ে। ভুতুড়েই কারন এ তো সত্যিই অতীত।  আর একটু পরেই আলো জ্বলা শহরে ঢুকে যাব,  এ সব অলীক ছবি হয়ে থাকবে খালি। তারপর একদিন ঘোর ভেঙে যাবে,  এই সব আলো, হিসেব নিকেশ আসলে বেকার জিনিস, ওই ধোঁয়াশা মাখা ঝুপ্সি মাঠ, সাদা সাদা ফুলের আলো জ্বলা সজনে গাছ, চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া ভেড়ির জল, টুপ করে ডুবে যাওয়া সূর্য,  ঘেমো কপাল গলার গামছায় মুছে কাগজে মুড়ে দেওয়া খাবার.....এসবই আসলে সত্যি টের পেয়ে আবার বেরিয়ে পড়তে হবে একদিন।


Thursday, February 14, 2019

ব্যাঙ আর প্রজাপতি

ভ্যালেন্টাইন্স ডে বলে মনেও পড়েনা আজকাল, বয়স হয়েছে কিনা৷ তবে ফেসবুক খুললে মনে পড়ে যায়। তা প্রেমের উচ্ছাস করছে অল্পবয়সী ছেলে মেয়ে গুলো মন্দ কি। প্রেমের দিন  উপলক্ষে একটা প্রেমের গল্প হোক নাকি?

গল্পটা আসলে একটা ব্যাঙের আর একটা প্রজাপতির। অসম প্রেম। আজকেই একটা ছবি দেখলাম নেটে, সে দেখেই লেখা।

**********************************************

গাছের ডালে বসেছিল সে চুপটি করে। মন ভালো নেই তার।না হয় সে মোটাসোটা থলথলে, গায়ে বড় বড় আব, না হয় তা গলায় গান খেলেনা, না হয় বদমেজাজী বলেই জানে সবাই তাই বলেই অমন করে বলে দেবে সকলের সামনে? 

আজ এখানে উৎসবের দিন ছিল। এখানে মানে এই চত্বরে। বেশী কেউ থাকে না এখানে, কয়েকঘর  সোনা ব্যাঙ, একটা কোলা ব্যাঙ, কিছু প্রজাপতি, কিছু বট, অশ্বত্থ, পেঁপে, পেয়ারা, একটা পিঁপড়েদের ডেরা,  কিছু মৌমাছি, আর কিছু চড়াই, শালিখ, ফিঙে, দোয়েল, মাছরাঙা। ব্যাস। আগে আরো অনেকে মিলে থাকতো। সেবার আকাশ থেকে জ্বালা ধরা  বৃষ্টি নামলো, কত ঘাস গাছ, প্রাণী মরে গেলো। মানুষ গুলো এসে আরো গাছ কমিয়ে দিল, নোংরা ফেলে ডোবাটা ভরিয়ে ফেলল, ব্যাস যারা ছিল তারাও কমে গেল।  এখন খালি ওরাই আছে। 

সেদিন ওরা এক হয়ে উইকেন্ড পার্টি করছিল। সারা সপ্তাহ কাজ থাকে ওদের সবারই খুব, এই মধু জোগাড় করো কি এই পোকা ধরোরে। উইকেন্ড পার্টি মানে আড্ডা খাওয়া গান বাজনা এই আর কি। টুকটাক মনের কথা বলে কেউ কেউ। এই যেমন দেখোনা,  মিষ্টি হাসি নিয়ে ফিঙেটা কেমন দোয়েলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে গান শুনছে। দুজনের দুজনকে ভালো লেগেছে বোঝাই যায়। এক ভাঁড় মধু নিয়ে ওদের আড্ডা এগোক আমরা বরং চারদিক ঘুরে দেখি। আকাশটা আজ ঝকঝকে নীল।  ওদের এই জমায়েতটা সকালেই হয়ে থাকে৷ অশ্বত্থ একটা ডাল নাড়িয়ে তাল দিচ্ছে।  মাথা নেড়ে গান গাইছে পেঁপে গাছটা। চারদিকে খুশী খুশী হাওয়া। 

ভাবছ বুঝি তাহলে প্রথমে কার কথা দিয়ে শুরু করেছি? সে কথায় আসছি। তাড়ার কি? ছুটির দিন, দিব্যি আরাম আরাম গন্ধ চারদিকে। কোনের বাড়ির সোনালী ব্যাঙ পরিবারের একটা মেয়ে আছে। ভারী সুন্দর গানের গলা, দেখতেও তেমনই মিষ্টি। আর নামটাও ভারী  চমৎকার, টুরিং। কিন্তু হলে কি হয় সে মেয়ে বড়ই খামখেয়ালী,  এই ভালো মনে আছে তো তোমায় নিয়ে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে গেলো এই মেজাজ খারাপ তো তোমায় ধাক্কা দিয়ে জলে ফেলে দিল। 

বলছিলাম না ও পাড়ায় এক মাত্র একটা কোলা ব্যাং থাকে? তাকে দেখতে যেমন খারাপ, মেজাজও তার তেমন খারাপ আর নামটা? সেও ততটাই খারাপ, অন্তত তার তো তাই মনে হয়। কালো কোলা থপথপে আবওয়ালা সেই ব্যাং এর নাম  বুরুৎ। শুরুতে এই বুরুৎ এর কথাই বলছিলাম। 

কোনো একদিন এরকম  একআনন্দ খুশীর দিনেই টুরিং কে দেখে মন মজে যায় বুরুৎ এর। টুরিং তখন একটা কচুপাতায় চড়ে দোল খাচ্ছিল আর গান গাইছিল। সেই গানের সুরে হাওয়ায়,  পুকুরের জলে আর বুরুৎ এর মনে লেগেছিল কাঁপন। বুরুৎ  গুটি গুটি এগিয়ে গেছিল গানের দিকে। তারপর? তারপর আবার কি যেমন হয়, টুরিং আর বুরুৎকে প্রায়ই এদিক সেদিক একসাথে দেখা যায়। পাতার প্লেটে পোকা রেখে দুজন দুদিক থেকে খায়, টুরিং গান পাঠায় বুরুৎ শোনে। বুরুৎ চিঠি লেখে গাছের ছালে, টুরিং লজ্জা পায়। বুড়ো বট খুশী হয়ে হয়ে ঘাড় নাড়ে। 

সব ঠিক চলতে চলতেই হঠাৎ করে বাধলো গোলমাল। কাটা গেলো আরো একটা বট, মারা পড়লো আরো অনেক কটা পাখি, পোকাদের চলাফেরার জায়গা গেল কমে। ফলে ওদের পাড়ায় এলো খাবারের কষ্ট। কাজ নেই, সারাদিন বসে বসে একটা পোকাও মেলেনা, সাপ্তাহিক আড্ডা তেমন জমে না আর। কজনই বা আছে পড়ে।  অসময়ে ভালোবাসা টিকতে গেলে যে জোর লাগে তা মনে হয় ছিল না বুরুৎ আর টুরিং এর গল্পে। ফলে হল কি, পোকা না পেয়ে পেয়ে দুজনেই বিরক্ত হয়ে গলা ফুলিয়ে ফুলিয়ে খালি ঝগড়া করে গেল। করতে করতে বিরক্ত হয়ে একদিন দুজনেই অন্য জায়গায় চলে গেল পোকার খোঁজে। 

তারপর অনেক শীত বসন্ত বর্ষা  পার হয়ে ক্রমে ক্রমে জায়গাটায় একটা দুটো নতুন গাছ দেখা গেল, একদুটো নতুন পোকার দেখা মিলল, নতুন দু চারটে পাখিও দেখা গেল, দেখা গেল নতুন নতুন ব্যাঙাচি, ডোবায় নতুন পদ্মফুল, তাতে পদ্মমধু। আবার এক দুই করে মৌমাছি, বোলতা, প্রজাপতি স, মাছরাঙারা আড্ডা জমাতে শুরু করলো। মেজাজ ভালো হল টুরিং এর। মজলিশে এলো সোনালী ব্যাঙেদের পরিবার। খালি সবাই ভুলে গেলো বুরুৎ এর কথা। বুরুৎকে তো আলাদা করে মনে রাখারও কিছু নেই কারন বুরুৎ তো কিছুই পারে না তেমন, না পারে গাইতে না পারে বাজাতে বা পারে মজলিশ জমিয়ে তুলতে। তাছাড়া ও পাড়ায় কোলাব্যাঙ আর একটাও ছিল না, তাই মনেও পড়েনি কারো।

বুরুৎ তো এমনিতেই বদমেজাজী।  তার মেজাজ গেল আরও খারাপ হয়ে। মন খারাপটা রাগে বদলে গিয়ে চেঁচামেচি করতে লাগল ওখানে গিয়ে৷ চারদিকে কেউ কেউ বলল, ওরে থাম থাম, ভুলে গেছি তো কি হয়েছে। এখানে তো আমরা সবাই বন্ধু চলে আয় তো। তাতেও বুরুৎ এর মেজাজ ঠিক হয়না। টুরিং এর কাছে গিয়ে সে বলল, "তুমি তো আমায় ডাকতে পারতে?"
টুরিং তার সোনালী রঙের থ্যাবড়া নাকের ফুটোটা বাঁকিয়ে বলল, উফ ফের তুমি! তোমায় কত খারাপ দেখতে তুমি জানো? তুমি কেমন বদ্মেজাজি জানো? তাছাড়া তোমার কোনো নিজের ছাতাও নেই তবে তোমায় আমি ডাকবো কেন? 
বুরুৎ এর রাগটা মন খারাপে ফিরে গেছে তখন। মুখটা নামিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, "তবে আগে ডাকতে কেন?" 
-অত বলতে পারিনে বাপু। তুমি এখন যাও দেখি,  এদিকে মজলিশ ভণ্ডুল হবে আমার তোমার জন্যে। ওই দেখো মাছরাঙা কেমন ম্যাজিক দেখাচ্ছে।

তারপরেই বুরুৎ গাছের ডালে বসেছিল মন খারাপ করে। তা সত্যি বলতে মন খারাপ হয়েছে ঠিকই কিন্তু ভুলও তো কিছু বলেনি। তোমারই বা অমন হুড়মুড় করার কি ছিল। ভুলে গেছে ডাকতে যখন মনে করিয়ে দাও।  এ তো আর মানুষ না তুমি যে ডাকতে ভুলে গেছে বলে সে নিয়ে দক্ষযজ্ঞ করবে!  তাও এমন আনন্দের দিনে কেউ একজনেও মন খারাপ করলে খারাপ লাগে বৈকি। হোক না সে বদমেজাজি৷ 

মন খারাপ করে বসে ছিল বলেই বুরুৎ খেয়াল করেনি একটা পোকা তার নাকের ফুটোর মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেল। হঠাৎ চমক ভাঙলো, খিলখিল করে একটা হাসি শুনে। কে হাসে? 
একটা হলুদ শাড়ি পরা প্রজাপতি। 
বুরুৎ হেঁড়ে গলায় হাঁক দিয়ে বলল, "এইয়ো কী ব্যাপার? হাসছ কেন?"

-হাসবোনা? ব্যাঙের নাকের ভিতর দিয়ে পোকা ঘুরে চলে যায় আর ব্যাঙ ছেতরে পড়ে থাকে এ দৃশ্য দেখেও হাসবোনা? খ্যা খ্যা খ্যা।

-অ্যাই মেয়ে ফের? দেবো থাবা মেরে বুঝবে। নেহাৎ আমার মন ভালো নেই তাই নাহলে না...

- না হলে কি? সত্যি মারতে? বাচ্ছা মেয়েকে মারবে বলে ভয় দেখাও, কেমন বীরব্যাঙ বোঝাই যাচ্ছে!

- বাচ্ছা! কে তুমি? তুমি হলে ধানী লংকা একটা। যাওনা যাও ওদিকে তো মজলিশ হচ্ছে, এখানে কেন।

- সে আমি যেখানে খুশীই যেতে পারি। কিন্তু তুমি এমন ছ্যাতরাব্যাতরা হয়ে শুয়ে কেন?

- এমনি।

-বেশ তাহলে এমনি এমনি চলো দেখি মজলিশে। 

-না না আমি যাব না৷ তুমি যাও।

- কেন তোমার পেট খারাপ হয়েছে বুঝি?

- সে আবার কি! পেট খারাপ হবে কেন। আশ্চর্য মেয়ে তো!

- তুমিও কম আশ্চর্য নাকি! আমায় তো কই বললে না এই হলুদ শাড়ি পরে আমায় কেমন লাগছে? মা এর থেকে চেয়ে নিয়ে পরেছি।

- আজব তো! আমি বলতে যাবই বা কেন! তোমার ইচ্ছে হয়েছে পরেছ, যাও মজলিশে অনেকে কম্পলিমেন্ট দেবে।

ও কি মন খারাপ করে বসে পড়লে কেন!

- আমায় নিশ্চয়ই বাজে লাগছে। 

- না না খুবই মিষ্টি লাগছে তো!

- সে তো এখন আমায় ভোলাতে বলছ। না হলে এতক্ষন তো খারাপ বলছিলে।

- খারাপ আবার কখন বললাম। উফফ মেয়েটা পাগল করে দেবে তো। আমি মরছি আমার জ্বালায়! 

হলুদ শাড়ি পরা প্রজাপতিটা দৌড়ে গিয়ে ব্যাঙের কাছে গিয়ে বলল, "কই দেখি দেখি, কোথায়, দাঁড়াও আমার কাছে ভালো একটা ফুলের রেনু আছে লাগালেই সেরে যাবে। "

- আরে কী আশ্চর্য!  সত্যিকারের পোড় নাকি! এ অন্য পোড়া, তুমি বুঝবে না।

- বোঝাও।

- না। 

- না বোঝালে তোমার নাকে কিন্তু পরাগ গুঁজে দেব।

- আহ মহা ঝামেলা তো! সে অনেক বড় গল্প।

- হ্যাঁ আমি কি ছোট করতে বলেছি নাকি। তুমি যা ক্যাবলা নির্ঘাত তাহলে ঘেঁটে ফেলবে সব।

- কী আমি ক্যাবলা! যাও আমি কিছুই বলব না আর।

- আচ্ছা আচ্ছা  রাগ করেনা.....

.......কথায় কথায় রাত নামে কখন।  বাড়ি ফিরতে দেরী হয়ে যায় তাদের। পরদিন সকালে বুরুৎ দেখে তার মন খারাপটা চলে গেছে, বুকের মধ্যে কেমন যেন উচাটন ভাব। এই যাঃ কাল তো মেয়েটার নাম জানা হয়নি তবে? আর কি দেখা হবে না? দুরুদুরু বুকে ব্যাঙ চলে যায় কালকের সেই গাছের ডালে। কই কেউ নেই। বেলা গড়ায়, মৌমাছির গুনগুন,  পাখিদের হুল্লোড় সব শোনা যায়, কিন্তু সেই হলুদ শাড়ি পরা প্রজাপতি কোথায়? দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে, বুরুৎ কিছুই খায়নি সারক্ষন।  পেটের মধ্যে গুড়্গুড় আওয়াজ হচ্ছে।  মনের মধ্যে একশো মন ভারী বস্তা যেন! এমন সময় কানের মধ্যে কে যেন সুড়সুড়ি দিল।

"কে রে?" 

তাকিয়ে দেখে কালকের সেই মেয়েটা। আজকে একটা সোনালী আর সবুজ বুটিদার শাড়ি পরেছে।  দেখেই তো বুরুৎ এর উলটানো জিভ সোজা হয়ে যায় প্রায়! 

-এতক্ষণ আসোনি যে?

- বা রে তুমি তো বলোনি আমার জন্যে অপেক্ষা করবে। আমি তো এমনিই এলাম।

- না বললে জানতে নেই? 

- না নেই।তোমার নাম কি?

-বুরুৎ। তোমার?

- পুপাকি। তোমার নামটা ভারী মিষ্টি। তুমিও ভারী ভালো।

বুরুৎ তো অবাক। ওকে আবার ভালো বলছে! ওর নামটা ভালো বলছে! এ কেমন মেয়ে। আচ্ছা পাগলি তো। 

বুরুৎ হঠাৎ বলে, " একটা কথা বলব "?

-হুঁ।

-আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম সেই সকাল থেকে...কালকে পরশু রোজ রোজ অপেক্ষা করবো...

- হিহিহি। তাহলে কাজ করবে কখন?

- তাহলে তুমি আমার সাথে চলো। অপেক্ষা না করিয়ে।

- চিনিনা জানিনা যাব কেন? কোথায় রাখবে আমায়?

- উমম...চিনে না হয় নেবে। আর আপাতত এই যে মাথায় বসো আরাম করে আমি তাহলে গল্প করতে করতে চলে যাওয়া যাবে। 

-কোথায় যাবে?

-চলোই না,  যদ্দুর যাওয়া যায় একসাথে।

.....তারপর দেখা যায় কালো থপথপে ব্যাঙ মুখে হাজার ওয়াটের আলো জ্বালিয়ে মাথায় করে একটা প্রজাপতি নিয়ে পথ চলেছে।

Saturday, February 9, 2019

সরস্বতী পুজোয়

"আরে আমি তো দু বছর দুবাইতে বিল্ডিং এর কাজ করেছি। তারপর এই খানে। "
- ফিরলে কেন? এখানে মাইনে তো আর দুবাই এর মতো হবে না।
- মাইনে বাড়াচ্ছিলো না, তারপর আরো সমস্যা...

পাড়ার ওষুধের দোকানের ছেলেটার সাথে কথা হচ্ছিল। হাসীখুশী ছেলেটা আমায় ব্যথা না দিয়ে ইঞ্জেকশন দিয়ে দেয়। আজ দোকান ফাঁকা গল্প করছিলাম তাই। গল্প করতে করতেই খেয়াল করছিলাম, ছেলেটা যা কথাই বলছে তাতে কিন্তু অভিযোগ নেই, হতাশা নেই। দিব্যি হাসিমুখে বলছিল তার ঠিকাদার কেমন নিয়ে গেছিলো এক কাজে লাগিয়েছিল অন্য কাজে, পাসপোর্ট জমা রেখে দিয়েছিল কিনা তাই সুযোগ থাকতেও অন্য জায়গায় চাকরি করা হল না। বোকা সোকা মানুষ বোঝাই যায়। পাসপোর্ট জমা রাখাটাই তো ঠিক না, কে বলবে! কত শত শ্রমিক ওই ভাবে বন্ডেড লেবার হয়ে কাজ করে৷ আর এই হাসিমুখে, তুড়ি মেরে সব, বাঁচাটাই এদের মূলধন হয়ত, না হলে এমন ঝকঝকে হাসিমুখে বাঁচে কেমন করে? কেমন করে দু হাজার টাকায় নিজের খরচা চালিয়ে সব বাড়িতে পাঠিয়েও ফের সে জায়গায় যেতে চায়!

"এখানে মাইনে কম পাই, জমে না কিছু, তাই ভাবছিলাম আবার চলে যাব কিনা। এখানে থাকলে মেয়েটাকে দেখতে পাই রোজ, এটাতেই সব মেকাপ হয়ে যায় বুঝলে। ওখানে থাকতে তো মেয়েকে দেখতেই পাইনি দু বচ্ছর। "

কার সুখ যে কিসে লুকিয়ে থাকে। ছেলেটার দোলাচল বুঝি৷ টাকার টান, অপত্যের টান.....এ দড়ি টানাটানি সব জায়গায়তেই ভায়া। মুখে বলি, হ্যাঁ হ্যাঁ দেখো যেখানে ভালো লাগবে। তার বেশী বলার অধিকার তো আমার নেই। আমি ওর জীবন জানিনা, ওর ভালো থাকা খারাপ থাকা জানিনা, ওর সুখ অসুখ না বুঝে পরামর্শ দেবার আমি কে!

সুখের মতই সত্যি জিনিসটাও বড়ই গোলমেলে৷ ধরা যাক বিদেশী কেউ, যে কোলকাতাকে বোঝেইনি, বলল, কোলকাতায় কোনো সুস্থ মানুষ বাস করে নাকি! এতো ধোঁয়া, অসভ্যতা, কাজ নেই, পরিষ্কার জল নেই, গিজগিজে মানুষ.... এখানে যারা থাকে তারা সবাই খুব খারাপ থাকতে বাধ্য। কথাটা খানিক ঠিক কিন্তু খানিক ভুল। এতো লোক খারাপ থাকলে এমন ঝকঝকে হাসতে পারে?

তার থেকেই সাইকেল নিয়ে মিষ্টি কিনতে যাচ্ছি। কতদিন পর সাইকেল চড়লাম, লগবগ করতে করতে প্যাডেল ঘোরাচ্ছি। এ সাইকেলে আবার বেল নেই, ও কাকা সাইড করে সাইড করে....লগবগ করতে করতেই ব্যালেন্স হয়ে যায়। জ্যাম কাটিয়ে একটা গলিতে ঢুকলাম, অনেএএক দিন আগে কিশোরবেলায় ঘুরতাম এ গলিতে, লুকিয়ে সিগারেট খাবার জন্যে। একবার উত্তেজনায় পিছনের পকেটে রেখে দিয়েই টিউশন ক্লাসে চলে গেছিলাম। কেমিস্ট্রি টিউশন ছিলো মাটিতে বসে, এক টাকাটা পঁচিশ পয়সার ফ্লেক দুমড়ে যাওয়ায় সেকিইই দুঃখ।

এখন এ গলিটা বদলে গেছে, বিস্তর ফ্ল্যাট উঠে গেছে। তাও এখানে বাতাস এখনো একটু পাতলা...একটু ভীতু। 
সরস্বতী পুজোয় রাস্তা জুড়ে জ্যান্ত সরস্বতী ঘুরে বেড়াচ্ছে। কালো শাড়ী পরা এক সরস্বতী ফোনের ওপারে বিশেষ কাউকে বলছে, "গাধাটা, মা এর গলা আমার গলা চিনিস না! "

কাকে হেগে একেবারে যাতা করেছে গাড়িটায়। কন্সটিপেশনের রুগী কাক। শক্ত ইঁট হয়ে গেছে। ভেজা লাল কাপড় দিয়ে ঘষছি, গাড়িটাকে বিড়বিড় করে বলছি, "আমি নিজেও তো খানিক গোছানো খানিক অগোছালো বল, মানিয়ে গুছিয়ে নে একটু। দুবছর এর উপর ঘর করছিস, না হয় কদিন পরিষ্কার করিনি অমন উদাস হয়ে যাবার কি! তাই জন্যেই তো কাল কাপড় বাঁধা ডাকাতনী তোকে আঁচড় কেটে বেড়িয়ে গেল। দুঃখ হয় তো বল?"

"ও ভাই, আমার গাড়িটা ধুয়ে দিবি? কত নিবি?"

আমার উস্কো খুস্কো চুল, বিড়বিড় বকা, গাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে ছাদ সাফ করা দেখে আমায় গাড়ি ধোয়ার ছেলেটা ভেবেছে নির্ঘাত! এহ ডিমোশন হলো। আগে মোটর মেকানিক ভাবত। অবশ্য দোষ দেওয়া যায়না। কারন আমায় দেখতে অমনই লাগে....কিন্তু দুঃখ তাতে না, দুঃখ হল পাশ দিয়ে তখনই একটা বেশ মানে বেশ ভালো আর কি, তরুণী যাচ্ছিলেন, যাকে আমি গাড়ি ধোয়ার ফাঁকে একটু ওই আর কি যাকে বলে তাকাচ্ছিলাম। কে যাচ্ছে না যাচ্ছে খোঁজ রাখা দরকার কিনা!

সবই মায়া হে...যাক যা গেছে তা যাক। বিকেলে আজ রাস্তা ফাঁকাই। সরস্বতী পুজো আজ না কাল? যেদিনই হোক আজ দিনটা সব মিলিয়ে মন্দ না, ওই যে একটা গাছে পলাশ ধরেছে, একজন সার্জেন্ট হাত দেখিয়ে গাড়ির স্রোত থামিয়ে দুটো বাচ্ছাকে রাস্তা পার করে দিচ্ছে, একটা পাঞ্জাবী পরা আর একটা হলুদ শাড়ি পরা। এইসব সুখ গুলো লুকিয়ে থাকে বলেই আমার এই শহর ছেড়ে পালানো হয়না, ওই ওষুধ দোকানে ছেলেটার মত যে ঠিকাদারের বন্ডেড লেবার হয়ে বেশী মাইনের চাকরির মায়া কাটিয়ে রয়ে যায়, মেয়েটাকে বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুমোতে যাবে বলে।