Tuesday, March 14, 2017

উপনিষদ মহারাজ - আগের বারের পর

রাধা কৃষ্ণ নিয়ে বোধহয় কয়েকশ বা কয়েককোটি লেখালেখি হয়ে গেছে। দোলের সময় বলে আসলে মনে এলো,  নইলে আমি সেই সমুদ্রে আর কিই বা জল ঢালবো। রাধা কৃষ্ণ কে অ্যাক্সেপ্ট করার মধ্যে  তৎকালীন সমাজের একটা দিক অন্তত বোঝা যায় ( মানে ওই নামে কেউ থাক বা না থাক,  গল্পটা আছে যখন আর সেটা চলছে যখন) তা হলো,  তুমি যদি শারীরিক ভাবে সক্ষম হও তবে তুমি যা চাও তাই পাবে সমাজ গল্প সাজিয়ে দেবে, ঈশ্বর বানিয়ে দেবে। আর তুমি যদি অক্ষম হও তবে গল্পে কাব্যে জীবনে তোমার ঠাঁই নেই। আমি জানিনা এ গল্প কতটা সত্যি, আয়ান ঘোষকে নপুংসক বানানো হয়েছিলো কৃষ্ণ কে ঈশ্বর বানাতে কিনা, আমি জানিনা এ কাহিনী কোনো বিক্ষিপ্ত রাখাল ছেলের কিনা আমি জানিনা এ গল্প কোনো বিরহিণী নিজেই বানিয়েছে কিনা,  কিন্তু মাঝে মাঝে ভাবতে চেষ্টা করি যে সমাজে জরু গরু এক পদবাচ্য করা করা সে সমাজে বউ চোখের সামনে অন্য পুরুষে আসক্ত,  এ তথ্য জেনেও কিছু বলতে পারেনি তা কি শারীরিক দুর্বলতায় না সুগভীর উদাসীনতায় বা ঘৃনায়? হয়ত আয়ান ঘোষ সেই সময়ের থেকে একটু অন্যভাবে ভাবত,  যে আমার না, তাকে জোর করে কি পাওয়া যায়, সেই টুকু বোধ ছিলো আর তাই হয়ত ভারতীয় সমাজ তাকে নপুংসক আখ্যা দিয়েছে। আসলে আমরা বোধহয় সবাই বড় বেশী কৃষ্ণ সিন্ড্রোমে আক্রান্ত, একা মেয়ে নদী পেরোতে গেলেই ঝাঁপিয়ে পরা যায়, একা মেয়ে স্নানে গেলে তার সাথে অসভ্যতা করা যায় তাকে লজ্জায় ফেলা যায়, কেউ রিফিউজ করলে তাই তার মুখে অ্যাসিড ছোঁড়া যায়, ধর্ষণ তো জলভাত।
আয়ান ঘোষের উদারতা শেখা আমাদের কর্ম না বোধহয়।
এইসব আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে রাস্তা পেরোচ্ছিলাম। এইদিককার কোলকাতা টা যেন অন্যরকম, এত গাছ এত পাখি ঠিক কোলকাতার সাথে যেন যায় না। আবার যায়ও। নইলে ধর্মতলার এই ইউরিনালের গন্ধেও পলাশ ফোটে কি করে। রাজভবন দেখলেই আমার কেমন মনে হয় আমরা প্রজা হয়ে থাকতেই ভালোবাসি, নইলে রাজভবন নাম রেখে দেওয়ার কি মানে কে জানে। অবশ্য নাম বদলাতে গেলেও মুশকিল, পূর্ব দিকে থেকেও পশ্চিমবঙ্গ নাম কেন বদলে বাংলা বা বঙ্গ হবে না সে নিয়েও গোছা গোছা প্রতিবাদ নেমে যায় আজকাল। মাঝে মাঝে আমি ভাবি,  ভাগ্যিস কাগজ কলমে লিখতে হয়না, তাহলে বোধহয় আর একটাও গাছ বাঁচত না যে পরিমান লেখালেখি হয়। খারাপ বলছি না তবে মাঝে মাঝে মনে হয় শব্দরা আজকাল স্যোশাল মিডিয়া ছেড়ে জ্যান্ত হয়ে পড়ছে, ধেয়ে আসছে, কোনোদিন হয়ত এই শব্দবানেই মারা যাবো।

এমনিতেই সবাই বলে পালানো খারাপ, কিন্তু আমি জানি পালানো ভালো মাঝে মাঝে। তাই যথারীতি পালিয়ে ছিলাম পূর্নিমায়।

"বাবু , রাত্তিরে জঙ্গলে না যাওয়াই ভালো" । জঙ্গলে না যাওয়াই ভালো! বলে কি? আরে এরকম পূর্নিমার রাতে জঙ্গলে যাব বলেই তো এত কাঠখড় পুড়িয়ে এলাম নাকি? কেওনঝাড়ের এক জঙ্গলে এসেছি, অখ্যাত জঙ্গল । এই ঝাঁ ঝাঁ বৈশাখে খুব এক্টাকেউ এ তল্লাটে আসে না । তবুও , আমার টিকিট কাটা ছিলো না বলে, কাল অব্দি আসার ঠিক ছিলো না । তারপর হঠাৎ করে তৎকাল এ টিকিট পাওয়া এবং কপাল জোরে ডাকবাংলো ফাঁকা পাওয়া । না পেলে কি হত জানি না , কারন এখানে থেকে ফেরার ট্রেন নেই বিকেলে কোনো । আর স্টেশনের যা ছিরি দেখলাম আসার পথে তাতে রাতে ওখানে থাকা আর গাছতলায় থাকায় খুব তফাৎ কিছু হতো না ।
যখন নামলাম স্টেশন থেকে, কড়া রোদে চারদিক ঝকঝক করছে । লু বইছেই বলা ভালো । তবে আমার আবার এরকম ঝাঁ ঝাঁ রোদ বেশ লাগে । ঘাম হওয়া রোদ না , এরকম খাঁ খাঁ রোদ । জানিনা এখানে কি আছে দেখার মতো । জঙ্গল আছে এটুকুই জানি খালি, আর সেই শুনেই বেড়িয়ে পরেছি । স্টেশন এ নেমেই বুক শুকিয়ে গেলো , গাড়ি নেই । ট্রেন একটু দেরী করে এসেছে বটে তবে সেটা কারন না মনে হয় । যাকগে কারন নিয়ে মাথা ঘামালে আমার চলবে না । দেখি আর কি উপায় হয় ।
একটা গাড়ি পাওয়া গেছে শেষমেশ । এক রাত থাকবো খালি বেশী ঝামেলার দরকার নেই , কিছু চাল ডাল আর ডিম কিনে চললাম । বনের মধ্যে দিয়ে রাস্তা , চারদিক শুনশান । একটু একটু গা ছম ছম করে বইকি , একদম একা ঘুরতে গেছি অনেক জায়গায় কিন্তু বনের মধ্যে আসা হয়নি কখনও । টাওয়ার আছে এখনো তবে নেট নেই । ভালোই হয়েছে। খেয়ে দেয়ে একটু চরকি পাক লাগাতে লাগাতেই বিকেল ঘনিয়ে এলো । চারিদিকটা কি অস্বাভাবিক নিরিবিলি। তারপর আসতে আসতে চাঁদ উঠতেই যেই না আমি জঙ্গলে যাব বলে পা বাড়িয়েছি অমনি , কেয়ারটেকার সনাতন এর সাবধানবানী, ,"বাবু, রাত্তিরে জঙ্গলে না যাওয়াই ভালো "।
এমন চমৎকার চাঁদ উঠেছে , হাওয়া দিচ্ছে , আশপাশে না গিয়ে বসে থাকিই বা কি করে , তাই বললাম আরে এই তো আশেপাশেই আছি । একটু পরেই তো রাতের খাওয়ার ব্যাপার আছে আর কাল তো চলেই যাবো , একটু ঘুরে নিই। সনাতন আর কিছু বলল না আমিও এগিয়ে গেলাম । বাংলোর পাশ দিয়ে একটা শুঁড়ি পথ জঙ্গলে ঢুকেছে , খানিকটা এগিয়ে দিয়ে ওই পায়ে চলা রাস্তাটা আবার দু ভাগে ভাগ হয়ে গেছে একটা গেছে নদীর দিকে আর একটা জঙ্গলের দিকে। শালের জঙ্গল তাই ফাঁকাই মোটামুটি , খুব গভীর না । জ্যোৎস্নার আলোয় সব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে । মায়া মায়া লাগছে সব । ইচ্ছে করেই নেট অফ রেখেছি , যাতে টাওয়ার থাকলেও আমি এ বনভূমি থেকে বিচ্যুত না হই । অনেক অনেক ক্ষন এলো মেলো ঘোরার পর যখন , ভালো লাগছে ,ভালো লাগছে ভাবে টইটম্বুর বাংলোর দিকে ফের রওনা দিলাম।
এখানে খাওয়া দাওয়া জলদি হয়ে যায় । খেতে খেতে যথারীতি ভুতের গল্পও শোনা হয়ে গেলো । পুরনো বাংলো আর ভূতের গল্প থাকবে না তাইই কি হয় । তা ভূতের গল্পে রসভঙ্গ করতে নেই , আমি তাই বিস্ময় ভাব নিয়ে সব কটাই শুনে গেলাম ।  তারপর সব চুপচাপ হতেই আমিও বেড়িয়ে পড়লাম । ইচ্ছে ছিলো নদীর ধারে যাওয়ার । জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এই রাতে নদীতে যেতে চমৎকার লাগবে । তবে অনর্থক রিস্ক নেওয়ার ইচ্ছে আমার নেই , তাই সাথে ফোন টা নিয়ে বেরিয়েছি , অন্তত টর্চ হিসেবে কাজে দেবে।
ঝিম ধরা রাত, অনেক্ষন জ্যোৎস্নায় থাকতে থাকতে গাছ গুলোরও যেন নেশা ধর গেছে। কি অদ্ভুত যে লাগছে কি বলব । নদীর দিকটা তূলনামূলক ভাবে ফাঁকা । নদীর পাড়ে বসে রইলাম অনেক অনেকক্ষন । তারপর একসময় ফেরার জন্য হাঁটা দিলাম । খুব একটা দূরে না বন বাংলো গান গাইতে গাইতে হাঁটছি এলোমেলো ভাবতে ভাবতে। হঠাৎ খেয়াল হলো , অনেক্ষন হাঁটছি । এতোক্ষনে রাস্তা যেখানে ভাগ হয়েছিলো সেখানে না পৌছনোর কিছু নেই। বুকের মধ্যে একটা ঢেউ খেলে গেলো । এ জঙ্গল কত বড় নিরাপদ কিনা ইত্যাদি খুব বেশী ডিটেইলস আমার জানা নেই , তার থেকেও বড় কথা আমার মনে এলো , এরকম শুখা জায়গায় বিষাক্ত সাপের আনাগোনা অস্বাভাবিক না ।

অজ্ঞতা একপ্রকার আশীর্বাদ , কিন্তু সবক্ষেত্রে না । যতক্ষন সাপের কথা মনে পড়েনি একরকম ছিলো , মনে পড়ে থেকে অবস্থা শোচনীয় । যতদূর মনে পড়ছে কেলোটা করেছি নদীর ধার থেকে ফেরার পর জঙ্গলে ঢকার সময় , অন্য কোনো শুঁড়ি পথে ঢুকে গেছি । রাত্তির বারোটা বাজে , এ সময় জঙ্গলে এরকম আবোলতাবোল ঘোরা বিপজ্জনক । মাথা খারাপ করে লাভ নেই । শান্ত হয়ে ভাবলাম , আমি রাস্তায় কোনো টার্ন নিইনি , মানে কোনো গলিতে ঢুকিনি , তারমানে উলটো রাস্তায় হাঁটলে আমি নদীর পাড়ে পৌঁছতে পারবো। একবার নদীর পাড়ে পৌঁছে গেলে যে জায়গাটায় বসে ছিলাম সেখানে গিয়ে ফের ফেরার চেষ্টা করা ভালো । জ্যোৎস্নাতে ভুল হওয়াটা অস্বাভাবিক না সুতরাং রোমান্টিসিজম বেশী না করে টর্চ জ্বালিয়ে সতর্ক ভাবে দেখে নেওয়াই ভালো ।
সত্যি বলতে কি ভয় করছেনা এটা বলব না ।বেশ ভয় করছে কিন্তু ভালোও লাগছে । এই মাঝরাত্তিরে , ফটফটে জ্যোৎস্নায় ঘুমিয়ে থাকা বোকামো না পথ হারানো?
নদীর পাড়ে এলাম , এদিক ওদিক একটু মন দিয়ে দেখতেই রাস্তাও খুঁজে পাওয়া গেলো । বাংলোর কাছাকাছি প্রায় তখন , সড়সড় করে কি যেন চলে গেলো আমার কাছ দিয়েই । আমি জঙ্গল অভিজ্ঞ লোক না , আমি জানিনা কিসের শব্দ কতদূর দিয়ে গেলো । আমি জানি ওই মুহুর্তে আমি স্রেফ জমে কুলফি হয়ে গেছিলাম । নড়তে পারার অবস্থায় আসার পরেই প্রায় দৌড় লাগিয়ে বাংলোয় ।
আমরা আমায় ভিতু বলতে পারেন কিন্তু ওই অবস্থায় না পড়লে ঠিক বোঝাতে পারবো না। নিস্তব্ধ জঙ্গল , জ্যোৎস্নায় সব অপার্থিব লাগছে সেই সময় যে কোনো শব্দই অন্য রূপ নিয়ে আসে। পরে ভেবেছি বোকার মতো পালিয়ে না এলে ঠিক পরীদের দেখা যেত, এরকম রাতেই তো তারা নামে।
পরের দিন সকালে আলোয় ঝলমল করছে চারিদিক গতরাতের কথা মনে করে একটু হেসে রওনা দিলাম, ডেরায় ফিরবো বলে।

Sunday, February 12, 2017

সবুজ-নীল স্বর্গে (হ্যাভ্লক পর্ব )

নবমীর চাঁদ উঠেছে আকাশে, পরিষ্কার বিরাট আকাশে অজস্র তারা ঝিকমিক করছে। দূরে কোনো একটা রিসর্টে বোধহয় একদল বিদেশীরা আস্তানা গেড়েছে , সকালে দেখেছিলাম বটে কয়েকজনকে এই বিচেই ঘোরাঘুরি করতে। তাদের গান বাজনার আওয়াজ ভেসে আসছে। বিচে তেমন লোক দেখছিনা। একটা কাপল অব্দি নেই। হ্যাভলকের ডলফিন রিসর্ট এর বিচটা খুব মায়াময়। রিসর্টটা গাছপালাইয় ভরা । বিছানা থেকে শুয়ে সমুদ্র দেখা যায় তাই জন্যই কি লোকে ঘর ছেড়ে বাইরে এসে বসেনি। একজন বুড়ো মানুষ খালি নারকেল গাছের বেঞ্চে বসে আছে । 




ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হয়েছে আমার । ব্যাচেলর, মহারাষ্ট্রের মানুষ, বুড়োদের জ্ঞান দেওয়া দোষ এখনো আচ্ছন্ন করেনি ভদ্রলোককে। আমায় বললেন ইয়ংম্যান  আমি এখানে এই নিয়ে সাতবার এলাম । তোমার বয়েসে বোধহয় প্রথমবার এসেছিলাম , তখন সব দেখার ইচ্ছেতে দৌড়াদৌড়ি করে আন্দামান ঘুরতাম। বার দুই এসেছি গার্লফ্রেন্ডদের নিয়ে , বার  দুই বন্ধুদের নিয়ে । এখানে এলে আর ফিরতে ইচ্ছে করে না ঠিকই আবার করেও বুঝলে । ও ভারী ধাঁধার জিনিস । কদ্দিন আছি কদ্দিন নেই , তার আগে প্রিয় জায়গা গুলো ভিজিট দিচ্ছে বুঝলে । যাও ইয়ংম্যান, ঘুরে এসো ...এ সময়খানা পাসিং ক্লাউডসদের দিলে তুমি আমায় গালি দেবে মনে মনে হাহাহা। 

আমিও আর বসিনি , অন্ধকারে সমুদ্রের নীল সবুজ রঙ দেখা যাচ্ছে না বটে কিন্তু নবমীর চাঁদে একটা নীলচে এফেক্ট দেখতে পাচ্ছি যেন । মনে ভুল নাকি কে জানে। সারাদিন ক্লান্তিহীন ভাবে সমুদ্র দেখে চলেছি বলেই নাকি?  রিসর্টএর এয়ারকন্ডিশন্ড বারে কিছু লোককে দেখেছি খানিক আগে তারা কি পাগল? এখানে এসে বিচের ধারে মদের গেলাস নিয়ে বসলেও বুঝতাম। গাছ ঝুঁকে এসেচে জলের ধারে । ওয়াই আকারের ডালের উপর আমি লম্বা হয়ে পা মেলে শুয়ে পড়েছি । পাতার ফাঁক দিয়ে ঝিরিঝিরি চাঁদ দেখা যাচ্ছে আর তারা । পায়ের কাছে সউদ্রের জল ছলাৎ ছলাৎ করছে । ইন্টারনেট এর কোনো অভাব বোধ করছিনা আমি , কোন রকম অভাবোধ মনে আসছে না । আহ কি আরাম।


আন্দামান এসেছি নয় রাত্রি কাটাবো বলে । তার মধ্যেই একদিন এখানে মানে হ্যাভলকে এসেছি । এত পরিষ্কার ঝকঝকে বিচ ,এত সবুজ দেখে আমি পাগলে গেছি। দুপুরে রাধানগর বিচে স্নান করতে গেছিলাম । ফেব্রুয়ারি বলেই বোধহয় লোকজন কম। তাও কিছু বাঙালী, কিছু নিউলি ম্যারেড কাপল ( মেয়েগুলোর হাত ভরা শাঁখা পলা , চুড়ি মেহেন্দি আর ছেলেগুলোর বংশংবদ ভাব দেখে মনে হচ্ছিলো) , কিছু সাদা চামড়ার লোকজন আছে বই কি । আমি একটু ফাঁকা একটা জায়গায় নেমেছিলাম । স্বচ্ছ কাচের মতো জল , যেন খাওয়া যাবে। চারিদিক সবুজে ঢাকা । এ সমুদ্রে ঢেউ নেই খুব বেশী । আমি ভেসে ভেসে সাদা বালি আর পাহাড় গাছ এইসবের দিকে চেয়েছিলাম । 







জলের রঙের এরকম ভ্যারিয়েশন আমি খুব বেশী দেখিনি । ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্র কালির দোয়াতের মতো নীল ছিলো । আর দীঘা পুরী তো কোনোভাবেই এ লিস্ট এ আসবে না। এখানে তীরের কাছে পাথরেরর উপর সাদা জল তারপর সবুজ তারপর নীল। হ্যাঁ কালাপানি লোকে বললেও আ মার কাছে নীলই লাগছিলো । কালচে নীল । 


আন্দমান ঠিক উইকেন্ড ট্রিপের মধ্যে পড়েনা বলেই বোধহয় এখনো এত সুন্দর আছে । আমরা তো ইজিলি এক্সসসেবল জিনিস ভালো করে রাখতে জানিনা । হয়ত আমার কথাটা একটু ক্যাপিটালিস্ট , বুর্জোয়া টাইপ হচ্ছে কিন্তু তাও সব জিনিসে সবার অধিকারে আমি বিশ্বাসী না। তার ততটাই পাওয়া উচিত যে যতটার যোগ্য। আমি যদি গামছা পরে সমুদ্রে নামি বা নাইটি পরে তাহলে সমুদ্রের মর্যাদাহানী ঘটে এটা বোঝার ক্ষমতা যাদের নেই তাদের দীঘাই থাক স্নানের জন্য। ভালোবাসা আদর যত্ন রেস্পেক্ট প্রকৃতি কম বোঝে না। যারা দেয়না তারা পায়ও না।


Monday, January 30, 2017

বইমেলা

এ তুলো ধুনবে কে , কথাটা আমার ব্লগের জন্য।  আমার এক বন্ধুকে এই ব্লগের কথাটা বলেছি সেদিন, কি খ্যাক খ্যাক করে হাসলো মশাই কি বলব।  বললো সে ব্লগ পড়ে  কে ? আমি আর কি বলি , মান রাখতে ঢপ  দেওয়া শাস্ত্রে লেখা আছে। তাই  বললাম ,কেন , জানিস না কত্তো  লোক আছে পরে তারা , শুধু কি স্বদেশ বিদেশ থেকে অব্দি।  কি বলব আর , আয়সা খ্যাক খ্যাক করে হাসলো , নেহাত আমি সত্যি কোথায় প্রতিবাদ করতে পারিনা তেমন তাই  বেঁচে গেলো। তা কেউ পড়ুক না পড়ুক লিখি এক দু কথা।  আজ্ঞে  হ্যাঁ বইমেলা এসে গ্যাছে আর তা নিয়ে দু কথা লিখবো না তাও কি হয়। 

ফেসবুক এখন মোটামুটি মনোপলি বাকি ,  বিবাহ কিংবা মৃত্যু , পোস্ট দিয়ে খুন তো তুশ্চু , লোকে ফেসবুকে সেরা গ্রুপ পিকনিক প্রতিযোগিতা অব্দি নামিয়ে দিচ্ছে।  বাঙালির জীবনে দুটো জাতীয় দাবি, অম্বল আর লেখা।  আমার মতো প্রতিভাবিহীন লোক ব্লগে পোস্ট নামিয়ে দিচ্ছে আর ফেসবুকে সাহিত্য কর্ম করবেননা , বই লিখবেন ও শ দুই কপি বেচবেন না এটা অন্যায়।  তা ভালোর সাথে সাথে কিছু বাঁশ এসে টুকটাক খোঁচা মেরে যাচ্ছে বইকি।  এই ধরুন কাগজের শিলালিপি ( শিলালিপি কি করে কাগজের হয় তা আমায় জিজ্ঞেস করে লাভ নেই, আমার বুদ্ধি ওই মুরগির লেভেলের ) গ্রন্থটির জনপ্রিয় লেখক কে এড়িয়ে আপনাকে মেলায় যেতে  হবে।  দেখা হলেই ভদ্রতা করে হলেও বইটা কিনতে হবে , সে আপনি পড়তে চান বা না চান।  এ ছাড়াও আছে , যে সারাবছর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বুক ফাটিয়ে লিখেছে জ্বালাময়ী ভাষণ তার বই বের হচ্ছে নামি পাবলিশার থেকে এরম নানা বৈচিত্র্যে ফেসবুক সরগরম।  বইমেলা এসে গ্যাচে।

কিছু কিছু লোক থাকে যাদের সব পুরোনো জিনিসই ভারী পছন্দ , আমাদের সময় হু হু বাবা কেমন হ্যারিকেন ছিল জানিস , মশারি পুড়িয়ে দিয়েছি তাতে কি অধ্যাবসায়ের আরেক নাম ছিল ইত্যাদি।  তা সেরকমই লোকের পোস্টও ফেসবুকে তাক লাগাচ্ছে। ' আমাদের সময় ধুলো ছিল আজ আর নেই আজ আর নেই , কোথায় হারিয়ে গেলো সোনালী ধুলো গুলো সেই।  আজ আর নেই।'  কিংবা কেউ লিখছে 'ধুলো ও হাঁচিদের দাবি মানতে হবে , ছোট বলে তাদের হটিয়ে দেওয়ার এ ভোগবাদী দুনিয়ার আক্রোশের তীব্র বিরোধিতা করলাম।'
হাঁচি বলতে মনে পড়লো , আমি বইমেলায় কত জন কে যে হেঁচে অন্যের গায়ে হাত মুছতে দেখেছি তার তুলনা বুঝি  স্রেফ দুর্গাপূজোয় মেলে।
এবারে বইমেলায় বড় বড় তাঁবু মতো করেছে,  স্টল গুলো সব। মন্দ না বেশ বাইরে স্টল নাম্বারও আছে। আর বড় পাব্লিশাররা অফকোর্স বাইরে। এখন বইমেলায় সব চেয়ে সুবিধে যেটা লাগে আমার ধূলোর ওই নাকানাকি বা চুলোচুলি নেই।

বছর দুই পর আমিও এবারে গেছিলাম বইমেলায়। আইন্সটাইনের অপ্রকাশিত সূত্রের একটি হলো যেকোনো স্থান , সঙ্গী বা সঙ্গীনীর উপর প্রভাবশীল । মানে গঙ্গার ধারে গার্লফ্রেন্ডের সাথে গিয়ে যেরকম লাগবে একা গিয়ে বা দঙ্গলে গিয়ে সেরকম লাগবে না । বইমেলার তা না কিন্তু । একবার বইএ মিশে গেলে আর কিছু লাগে না। তবে তেমন বইপড়ুয়া বন্ধু পেলে ঘোরাটা জমে যায়। 

বই পড়ুয়া মানেই জমবে তাও না। আমার এক বন্ধু আছে যে ভারী কঠিন কঠিন বই পড়ে, আমার সব মাথার উপর দিয়ে যায় সেসব বই। আমি তাকে এড়িয়ে যেতে ভালোবাসি বইমেলায়। আবার আরেক বন্ধু আছে যে প্রকাশকের সামনেই বলে এটা কিনেছিস, তুই কিছুই কিনিস না (নিজে অবশ্য কি কিনেছে ভগবানেও জানে না, প্রকাশক দূর কি বাত) আমি তাকেও এড়িয়ে যাই। একদল বাংলাদেশ এর স্টলের সামনে সেল্ফি তোলা ঝাঁককে পেরিয়ে, টিভি চ্যানেলের গেম শো টপকে, পাঁচ মেশালি প্রকাশনে ঢুকলে খানিক বই দেখা যায় স্বস্তিতে। 
ফেসবুক খ্যাত প্রকাশনা গুলোতে আমি তবু যেতে পারি বই দেখতে,  কেউ চেনে না  তাই "এটা আমার বই দেখুন না একবার" এ বক্তব্যকে গড়িয়াহাট বা কলেজস্ট্রীটের ফুটপাথ ধরে যাওয়ার সময় যেমন উপেক্ষা করা যায় তেমনই করা যায়। খুব অস্বস্তি লাগলে অন্য যে কোনো স্টলে চলে যাওয়া যায়। আর চেনা স্টল,  যে বই গছাবেই তার নাম্বার আর পজিশন মুখস্থ করে যাওয়াই ভালো।

এ বার বই মেলায় আমার একটা প্রাপ্তি হয়েছে, কি সেটা পরে জানাবো। কয়েকটা বই কিনেছি,  কয়েকটা পাইনি পরে কিনবো। বাকিরা কে কেমন ঘুরলো বইমেলা?

Thursday, January 19, 2017

উপনিষদ মহারাজ

"আরে দেখে চলতে পারেন না নাকি, অদ্ভুত লোকজন সব, না মেয়ে দেখলেই ধাক্কা মারতে ইচ্ছে করে"। 

ঝাঁ ঝাঁ করে বাক্যবান উড়ে এলো। তাকিয়ে দেখলাম, অল্পবয়সী না, তবে তরুণী,  সুন্দরী না  তবে মিষ্টি, তন্বী না বরং ঈষৎ পৃথুলা। আমার বয়স এখন ত্রিশ, কিছু না হোক খান দুই জোরালো আর খান পাঁচেক খুচরো প্রেম করেছি।  এ বয়েসে এসে খামোখা কাউকে ধাক্কা মেরেছি এ অপবাদ সহ্য শুনব কেন। মেয়েদের অত ইয়ে করার কিছু নেই আমার মতে আসবে যাবে,  না থাকলে কবিতা আউরাবে কিছু ন্যাকা বাঙালি এই তো। আমি আধুনিক সন্ন্যাসী, এসবে কিছু যায় আসে না।  অত অবাক হবার কিছু নেই। আধুনিক কবিতায় 'তুমি কাঁসার থালার আর আমি গাড়ির স্টিয়ারিং শুনে যখন চমকাননা সন্ন্যাসী আধুনিক শুনেও অমন ইয়ে করার কিছু নেই। আজ্ঞে না আসারাম বাপু টাইপ না। আমার নাম মহারাজ  উপনিষদ। অবশ্যই বাপ্ মা এর দেওয়া নাম না।  সন্ন্যাসী মানেই কোনো নেশা করবে না নির্মোহ হবে এমন তো না রে ভাই, স্বয়ং বিবেকানন্দ চা সিগেরেটের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন আমারও প্রচুর শখ ইত্যাদি আছে বৈকি।

 হ্যাঁ যা বলছিলাম আপনাদের রোমান্টিক নায়কদের মতো ভ্যাগাবন্ড না আমি। গরীব পকেটে পয়সাহীন চেয়ে চিনতে খাওয়া সমাজের প্রতিভূও না। আমার একটা ফার্ম হাউস আছে, তিরিশ বিঘে জমি নিয়ে। ক্ষতিকারক সার ছাড়া অবলুপ্তপ্রায় ধান ফলাতে চেষ্টা করি। কেবল পুরোনো বইয়ে যে আমের দেখা পাওয়া যায় সে আম গাছ খুঁজে আনতে চেষ্টা করি। খরচা অনেক হয় তবে আরাম যেটা হয় তা হল হারিয়ে যাওয়া বীজ ফের চালু করতে পারলে। এসব জিনিস বাজারে প্রচুর দামে কেনার লোক আছে।  কিন্তু সেইই সব না, আবার এ আমার আশ্রমও ঠিক না আশেপাশের গ্রামের লোকেদের কাজ করার জায়গা কিন্তু গ্রামের লোক মানেই বুক ভরা মধু ভাবার কারন নেই তাছাড়া দাদা মামা কাকারা মেলা ঝামেলা  আছে সে সব সাম্লাতে আমার ভাল্লাগেনা। আমার এক পার্টনার আছে সেই এসব দেখে, আমায় কি করে যেন সহ্য করে নিয়েছে ব্যবসাতে। আসলে সেই কোন ছোট্ট বেলার বন্ধুত্ব , সহজে ছেঁড়া মুশকিল। মাঝে মাঝে আমি পালাই,  পালাই মানে এই না এক বস্ত্রে বা প্রচুর টাকাপয়সা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট জায়গায়। যখন যেমন ইচ্ছে করে তখন তেমন। কখনো ইচ্ছে হলে এএক বস্ত্রে কখনও রুক্স্যাক কাঁধে।এখন যেমন আমি বেরিয়েছি অনেকদূরের একটা ধোঁয়া ধোঁয়া গ্রামে যাবো বলে। গ্রামের নাম জানিনা, কোনোদিন দেখিনি কিন্তু কেমন জানি চোখে ভাসছে। প্রথমে কোলকাতা, এখানে কয়েকদিন এলোমেলো ঘুরব, ইচ্ছেমতন খরচা করব খেয়ে, কি কোলকাতা থেকে নৌকো ভাড়া করে সপ্তাহব্যাপী ঘুরব। নেশা আমার দাস, ইচ্ছে হলে মদ সিগারেট খাই ইচ্ছে না হহলে মাস বছর না খেয়েও থাকি।আমার নৌকো আমার আধিপত্য,  গড়গড়া থাকবে,  অম্বুরি তামাক থাকবে, বেকড রসগোল্লা থাকবে।  মানে জমিদারের মতন। তারপর হাতে যখন পয়সা তলানিতে ঠেকবে তারপর ভাবছি ট্রেনে টিকিট ফাঁকি দিয়ে ওই ধোঁয়া গ্রামখানায় যাবো। এবারের প্ল্যান এটাই তবে আমার মাথায় পোকা আছে তো তাই অন্যরকম হতেই পারে, প্ল্যান করে কিছু করব না এবারের ইচ্ছে এরম ঘোষনা হলো মাথার মধ্যে। যাই হোক এসবের আগে আমায় এরম অপবাদ দিচ্ছে কে তাকে একটু চমকানো যাক। আজ্ঞে হ্যাঁ আমি ইচ্ছে না হলে মেয়ে বলেই শিভালরি দেখাতে এক্সট্রা অ্যাডভান্টেজ দিইনা।  ইচ্ছে হলে দিই। এখন আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ আমার একটা পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে মোষের পিঠে চড়তে ইচ্ছে করছে তা না এই ভরা ধর্মতলায় আমি করে কাকে ধাক্কিয়েছি!!


"কেন আপনাকে খামোখা ধাক্কা দেব কেন? আপনার কাঁধ বেশ শক্তপোক্ত,  আরেকটু হলে আমার মোবাইল পড়ে যেত আমার কি দায় পড়েছে আমার মোবাইল কত হার্ড সে টেস্ট করার না,  মোবাইলখানা মাটিতে পড়ে গেলে কি থুতুর মধ্যে, আপনার ধারনা সেটা খুব উপভোগ্য আমার জন্য? "
মেয়েটা একটা মন্তব্য করেই এগিয়ে গেছিলো, কেউ তাকে ডেকে এরকম কথা বলবে আশা করেনি বুঝি।  আর এখনকার মেয়েদের যেমন ধারা, খান দুই ইংরেজি গুঁজে দিয়ে মুখে বিরক্তি, বিস্ময় রাগ এর ঝাল্মুড়ি বানিয়ে "হোয়াটস রঙ উইথ য়ু, এক তো অসভ্যের মতো না দেখে চলেন আবার ঝগড়া করেন"?
 খুব গম্ভীর হয়ে বললাম " দেখুন মহাশয়া,  আপনি যবন বাক্যে কি বললেন আমি বুঝতে পারিনি, বাকি কথার এক এক করে উত্তর দিচ্ছি, আমি দেখেই চলছিলাম আপনিই মোবাইল দেখে চলছিলেন।  দুই আমি ঝগড়া করছি এমন যদি বলেন আপনি ঝগড়াঝাঁটি করছেন"।
 মেয়েটার মুখে খুব দ্রুত একটা ভয়ের ছায়া খেলে গেলো, পাগলদের দেখলে  ভরা রাস্তাতেও যেরম ভয় নিয়ে রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়ায়। এবার কি হবে আমি জানি,  খুব দ্রুত হাঁটবে মেয়েটা আর বাড়ি গিয়ে বলবে কি অসভ্য একটা।লোকের পাল্লায় পরেছিলো। সে সুযোগ না দিয়েই আমি বেশ সন্ন্যাসী সুলভ একখান হাসি যাতে হালকা তাচ্ছিল্য হালকা কয়টুক ইত্যাদি মেশানো থাকে না সেরকম ছুঁড়ে এবাউট টার্ন করে নিলাম।আরো ঘাবড়াক খামোখা লোককে কটু কথা বলবে না আজ।

এগিয়ে গেলাম প্রিন্সেপ ঘাটের দিকে।  নৌকা গুলো সব ডিঙি নৌকা টাইপ। আমাদের সব ভালো জিনিস শখের জিনিস আয়েসের জিনিস শেষ করে দেবার এ প্রবৃত্তি কেন কে জানে। একটা বাজরা পাওয়া যায়না একটা ঘোড়া পাওয়া যায়না ধুস। একাবোকা দেখেই বোধায় কেউ গা করছেনা।  হুঁ হুঁ যখন জানবে আমি পুরো সাতদিনের জন্য নৌকা ভাড়া করব তাহলে আর এরকম নির্লিপ্ত ভাব স্রেফ কর্পূর হয়ে যাবে। একজন বুড়ো মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম কাকা ভাড়া যাবে নাকি। আমায় অবাক করে হাত নেড়ে বলল না ভাড়া নাই। বোঝো!! মাথা এরপরেও গরম হয়নি সে স্রেফ ওই যোগবলের কারনে। অন্য জায়গায় যেতেই পারতাম, কিন্তু আমি তো সন্ন্যাসী মানুষ আমার ধৈর্য থাকা উচিত। বেশ মোলায়েম করে জিজ্ঞাসা করলাম কেন কাকা,  আজ বুঝি কাকিকে নৌকা চড়ানোর আছে, তা আমায় দাও না আমি না হয় হাল টেনে দেবো। যথারীতি রেগে টগবগ করতে লাগলো, এই ভাই তুই যা তো এখান থেকে,  ফোট। খুব মানে লাগলো জানেন। খুব মানে খুব,  বেশ শাপ টাপ দেওয়া যেত, নৌকা ডুবে যাবে আর আমায় গিয়ে উদ্ধার করতে হবে তাহলেই ঠিক হত। কিন্তু সন্ন্যাসী হলেও আমার সে তেজ নাই। তাই বললাম,  কাকা,  ফোট মানে? আমায় কি তুমি ফুলের কুঁড়ি বা বোম ভাবছ? আমি তোমার নৌকায় ফোটার ইচ্ছা প্রকাশ করিনি সত্যি, স্রেফ ঘুরব ভাবছিলাম। সে আর সময় ব্যয় না করে এগিয়ে গেলো। আমিও এদিক সেদিক দেখে একটা অল্পবয়সী ছেলেকে পাকড়ালাম। সন্দ সন্দ মুখ করে রাজি হলো।

 আমার একটা সমস্যা আছে পরিচিত লোকেদের সামনে আমার সংকোচ হয়, আমায় ভদ্রতা করতে হয় হেঁ হেঁ হাসি দিতে হয়। আজকাল ফেসবুক এসে অনে সুরাহা হয়েছে,  যেমন কেউ বলল,  "আমার ঠাকুমা পঁচানব্বই বছর বয়েসে চলে গেলেন আমাদের শিশুপ্রান কে অনাথ করে, যদিও উনি শেষে দু বছর বিছানা ছেড়ে ওঠেননি তাও ওনার স্নেহাশীষ  থেকে বঞ্চিত হইনি"..ইত্যাদি। সাথে শেষশয্যায় শায়িত ঠাকুমার সাথে সেল্ফি। আমার ঠিক জানা কত বছর অব্দি ঠাকুমাকে উনি এক্সপেক্ট করেছিলেন। মায়াদয়া থাকলে সন্ন্যাসী হওয়া যায়না। তাই আমার মায়াদয়া এমনিতেই কম,  রাস্তায় কুকুর এর পাল কে আদর দিলে আমার ইচ্ছেহয় ওদের বাড়িতে একপাল ছেড়ে দিয়ে আসতে।  পঁচানব্বই বছর বয়েসের একজন মারা যাওয়ায় যখন কেউ শিশু প্রাণে ককিয়ে ওঠে তাকে দেখলে আমার  অটোমেটিকালি শ্রদ্ধা হয়, আহা পারলে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতাম মশাই। লোকসমাজে ভদ্রতা করে বলা  যায়না, কিন্তু ফেসবুক সমাজে যায়। সে মশাই এক অদ্ভুত জগৎ যে যা পারছে করছে। এক পাল লোক একটা খেলনা পেয়েছে, যেখানে প্রেম, চুমু, সেক্স পলিটিক্স, খিস্তি আঁতলামি সব চলে।  ভাটবকা তো বটেই।  আমি খিস্তি দিইনা সুড়সুড়ি দিই, তাই তো তাই তো মশাই, কি করে এ কচি বয়েসে (বয়েস কিছু না হোক চল্লিশ হবে) এ শোক সইবেন এরকম আরকি।

মাঝি ছেলেটা বেশ চটপটে, অম্বুরি তামাক গড়্গড়া আমিই এনেছিলাম, দেখে বলল স্টিক লাগবে কিনা। গাঁজার গন্ধ আমার পোষায়না আর গাঁজ টেনেও আমি সজ্ঞানে ছিলাম তাই আমার গাঁজার দরকার নেই বললাম।  তাকে বলাই ছিলো আগামি সাতদিন আমি এখানেই থাকবো। অবাক হয়েছিলো কিন্তু রাজিও হয়ে গেছিলো অ্যাডভান্স দিতে।
ধুঁকতে থাকা ট্রাফিক, ঘাম পেরিয়ে ছেলেটা পৌঁছয় অবশেষে। ভিড় দেখে গাছের পাতাগুলোও থমকে গেছে।  হাওয়াহীন সে শহরও শীতল হয়ে যায়। গঙ্গার বুকে সন্ধ্যে নেমে গেছে কখন। নৌকোয় টিমটিম করে হ্যারিকেন জ্বলে। মাঝিদের খাবারের গন্ধ নাকে ঝাপটা মারে। ছেলেটা বোধহয় অন্ধকারে নৌকোয়য় ভাসতে চায়,  মেয়েটা বোধহয় ভয় পায়। বাতাসে গুমোট ভাব বেড়ে যায়। দূরে ভোঁ শোনা যায়। অলস ট্যাক্সি শেষ সওয়ারির জন্য বসে।বাদামওলার আর বিক্রির চেষ্টা নেই। ট্রাফিক পুলিশও খানিক নিশ্চিন্ত। চা এর দোকানে ভিড় মরে গেছে।  মেয়েটার বাস ছেড়ে দেয়। ছেলেটা দৌড়ে বাসের পাদানিতে। গুমোট কেটে হঠাৎ ছাতিমের গন্ধ ছড়িয়ে যায়। ছেলেটার ফাঁকা শহর,  ছাতিম ফুলের গন্ধ আর হঠাৎ নামা বৃষ্টি সংগে নিয়ে হাঁটা দেয়।
আমি মহারাজ উপনিষদ যার প্রেম সয় না সেও খানিক থমকে দাঁড়াই তারপর আমার মাঝিকে বলি নৌকা ছাড়তে। 
গঙ্গায় আজকাল আর স্রোত কই। হেলতে দুলতে এগিয়ে যাচ্ছে নৌকা। প্রায় খাল হয়ে যাওয়া নদীর দুপাড়ে এলোমেলো দৃশ্য। একমনে নাক খুঁটছে একজন, একজন ঘাটের ধারে উদাস। আমার হঠাৎ ভারী ক্লান্ত বোধ হতে লাগলো। সাতদিন বোধহয় কাটাতে পারব না।
(কেমন লাগছে প্লিজ জানাবেন কেউ যদি পড়েন, এটা সিরিজ করন কিনা ভাবছি)

Tuesday, January 10, 2017

**** দুপুরবেলায় ****

দুপুরমানেই কিছু আলসে ব্যাপার নয়। অন্তত আপিসপাড়াতে তো নয়ই। পার্সোনাল লোন নেবার জন্য এক দুটো ছেলে যারা থাকে দুপুরবেলা কি একটু বেশী তৎপর হয়? আর আজকাল নেটব্যাঙ্কিং এর জমানায় কেউ কি সত্যিই নেয়? কি জানি। আমি ওদের পাশ কাটিয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাই। পেয়ারামাখার ভ্যানের সামনে মাছির মতো ভীড়। এই ভীড়ে কিছু মহৎ প্রাণ থাকে যাদের দেখলেই শ্রদ্ধা হয়, তারা পাকা পেঁপে কিনে খায় এক প্লেট ভরে। রুটির ঝুপ্স আর ভাতের ঝুপ্স গুলোতেও খুব ব্যস্ততা। শিঙাড়ার দোকান বা ঝুপ্স এর কোনো চিহ্নই থাকেনা, কোন মন্ত্রবলে সন্ধ্যেবেলায় গজিয়ে যায় কে জানে। আমি পায়ে পায়ে বিশুর দোকানে এগিয়ে যাই, পুদিনা হজমোলা না ইমলিটা সেটা দেখিয়ে দিতে হয় খালি। পাশের নোংরা মাঠটায় কতকগুলো ছেলে ক্রিকেট খেলছে, এদের স্কুল নেই নাকি! পাশের আমড়া ওলাটার বিক্রির দিকে মন নেই, একজন কে বলে দিলো হবে না এখন। রাস্তায় কুকুর এর আধিক্য আমাত না পসন্দ তার থেকেও না পসন্দ ছোট কুত্তোগুলো মলিন মুখে ঘুরে বেড়ালে। আজ আমায় স্বস্তি দিয়ে ব্যাটারা ঘুমোচ্ছে দেখি এক মনে, মায়ে পোয়ে। ওই একটা ক্ষুদে ছানা ঠিক ফাঁকি দিয়ে উঠে এদিক ওদিক টহল দিচ্ছে। অনেককটা ওলা, থাকে সবসময়েই এই সময় তাদের ল্যাদ টাইম। মানে বুকিং না এলেই ভালো হয় খানিকটা এরম ভাব। এক মনে গাছের ছাওয়ায় বসে তাস খেলছে বাসের ড্রাইভার কন্ডাকটর রা। এহ আমার কি ইচ্ছে ছিলো ট্রাক ড্রাইভার হবার। রাস্তায় ধারে এরকম দুপুরে ধাবায় বসে ঝাল ঝাল মাংস (তখন নিশ্চয়ই ঝাল খেতে পারতাম) আর রুটি খেয়ে ফের রওনা দিতাম, কান্ট্রি রোড ইয়ে মানে কুমার শানু শুনতে শুনতে।
নাহ যাই, এম্নিতেই পিএল খচে আছে। আমায় বলেছিলো এটা একটা ডেলিভারেবল হল হ্যাঁ, এইরকম ফন্ট এইরকম বক্স। তা আমি ভালো মনে বলেছিলাম এই বক্সে ফ্লিপকার্টের ডেলিভারিও হয়ে যাবে। নাহ ট্রাক ড্রাইভার না হয়ে সুখ নেই।

Tuesday, January 3, 2017

ফ্রেন্ডায়নামিক্স

-"বাবান,  অ্যাইই বাবান ফের টিভির সামনে।  সারাদিন তোর কার্টুন দেখা আর ভিডিও গেম ছাড়া আর কাজ নেই না। "
-"বারে আমার তো ছুটি এখন। এখনও কি ক্লাস শুরু হয়েছে নাকি। "
- কেন এতো বই কিছু পড়া যায় না না? কেয়ারলেস মিস্টেক গুলো হয় বলে মিস বলেছেন না তোকে বই পড়তে।
এরপর যা হবার তাই, বাবান এর ভ্যাঁ, ওর মা এর মার ইত্যাদিতে পাড়া চমকিত,  টিভি বন্ধ,  অল কোয়ায়েট অন ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। রন্টুর দিদি আর ভাগ্নে দিন দুয়েকের জন্য এসেছে, টিভি আর গেম নিয়ে মা ছেলের খন্ড যুদ্ধ লেগেই আছে। আজ কিছু বাড়াবাড়ি এই যা। রন্টু তখন ডমরুধরের আড্ডায় ডুবে ছিলো, খেয়াল করেনি। খানিকবাদে চা এর দরবার করতে গিয়ে দেখে পরিস্থিতি কিঞ্চিৎ বেশীই শান্ত। বাবান এর দাদু দিম্মা গেছে ডাক্তারের কাছে তাই বাবান আজ প্রায় একা অভিমন্যু,  ওর মা মানে মৌ একাই সপ্তরথী তুল্য আর কি বাবান এর জন্য। ভাগনের ভগ্ন হৃদয় পুনরুত্থানে যুগে যুগে মামারাই আবির্ভূত হন।  তাই রন্টু বারান্দায় গিয়ে বাবানের কাছে দাঁড়ালো। সে তখনও ফোঁপাচ্ছে।
- " আরে ধুর ব্যাটা,  তুই দেখি আমার কালকে তোর সাথে বক্সিং টুর্নামেন্টটা প্রায় কেঁচিয়ে দিলি। আমি তো আবার বাচ্ছাদের সাথে লড়ি না আমি বড়দের সাথে ছাড়া লড়িনা।"
- "আমি বড় হয়ে গেছি" - কান্না চেপে জবাব এলো।
- "তাহলে কাঁদছিস যে,  বড়রা কাঁদে নাকি।  তা তুই যে বই পত্তর মোটে পড়িস না তার ফলে তো তুই জানতেই পারছিস না সে কেঁদো বাঘ আর ডাইনোসর এর যুদ্ধ টার কথা "।
- "ধ্যাস ওরকম লড়াই আবার হয় নাকি, বাঘ আলাদা সময় এর আর ডাইনোসর আলাদা সময় এর।  মামান তুমি আমায় বড্ড ছোট ভাবো।"
- ধুর ব্যাটা,  সে তো এক এই ওয়ার্ল্ড এ দুজন দু সময়ের লোক। আমি যে ইউনিভার্স এর কথা বলছি সেটা তো প্যারালাল একটা ইউনিভার্স। সেখানে বাঘ,  ডাইনোসর,  তিমি, ইঁদুর সব্বাই থাকে। শুনবি তো বল।
- হ্যাঁ হ্যাঁ মামান বলো প্লিজ। 
- দাঁড়া এক কাপ চা নিয়ে আসি আর ওয়াইফাই টা কানেক্ট করে দিই দিদিকে ব্যাস তাইলে আমরা অন্য ঝাড়া হাত পা হয়ে অন্য ওয়ার্ল্ড এ।
চা খেতে খেতে,  রন্টু শুরু করে, সেবার বেজায় বৃষ্টি হচ্ছে জঙ্গলে।  বৃষ্টি মানে কোলকাতায় যেমন দেখিস এক ঘন্টা খুব জোর তেমন না।  জঙ্গলে বৃষ্টি মানে সে একটানা।  সাতদিন দশ দিন ধরে হয়েই চলেছে। জঙ্গলের মধ্যে ঝির ঝির করে বয়ে চলা নদী সে জল কোথায় রাখবে না বুঝতে পেরে দুকূল ছাপিয়ে দিচ্ছে। বনের পশুদের হয়েছে মুশকিল। ওরা সাঁতার জানে কিন্তু এরকম চুপ্পুর বৃষ্টি খাওয়া দাওয়া হচ্ছে না ভালো, রোদের দেখা নেই বলে মন মেজাজও ভালো নেই। কত বড় বড় পশু গেলো ভেসে। একটা বাঘ ছিলো ওই জঙ্গলে। বাঘেরা ইউজুয়ালি একাই থাকে। এ বাঘটাও একাই থাকত। তার উপর ছিলো সে বদমেজাজি। ফলে বন্ধু বান্ধব প্রায় ছিলোই না তার। কেবল একটা ছোট সাদা ইঁদুর কি করে যেন তার বন্ধু হয়ে গেছিলো। সাদা ইঁদুর আবার বেজায় ভদ্র ইঁদুর। সাত চড়ে রা কাড়ে না,  মনে বেশী দুঃখ হলে কুড়কুড় করে আরও খানিক গর্ত খুঁড়ে মাটির নিচে চলে যায়। এ দু মক্কেলের বন্ধুত্ব হবার চান্স নেই তবু হয়ে গেছিলো কিরকম করে যেন।
- ও মামান,  ইঁদুরের ভাষা আর বাঘের ভাষা কি এক নাকি, ওরা কথা বলত কি করে?
- শোন ব্যাটা,  বন্ধুত্বের একরকম ভাষা হয়, যেমন তুই যখন তুই যখন ক্লাসে গার্ডার ছুড়ে লোককে মারিস আর সেই সময় মিস আসলে তোর বন্ধু অয়ন দূর থেকে তোকে সাবধান করে দেয় তেমন। তবে এরা কথা বলত জঙ্গলের ভাষায়।
- জঙ্গলের ভাষা কি হয় মামান?
- মানুষেরা কি সব জানে বা বোঝে নাকি? এই যে জঙ্গলে কত কি ঘটে যাচ্ছে,  রাত হলে হুতুম প্যাঁচা হুতুম থুমো করে কি বলছে এসব মানুষ বোঝে না বলে ভাবে মানুষ খালি কথা বলতে পারে তাদেরই ভাষা আছে। কিন্তু তা নয় সবার আলাদা আলাদা ভাষা আছে, সে অন্য একদিন বলবখন, এখব গল্পটা শোন।
এইবারের বৃষ্টিতে জল যখন আস্তে আস্তে নিচু জমি ছেড়ে এগোচ্ছে ক্রমে আর একটু উঁচুর দিকে তখন পশু পাখীরা সব  উড়ে গেছে, বাঘ তো আগের দিনই শজারুকে চোখ রাঙিয়ে এসেছে, সেই নিয়ে কিছু বচসা হয়েছে। বাঘকে কেউ আর ডাকেনি। ইঁদুর এর বন্ধুরা অবশ্য ইঁদুরকে ডেকেছিলো কিন্তু ইঁদুর বন্ধুকে ফেলে যায়নি।  সে বাঘকে ডাকতে গেছিলো। কিন্তু এর মধ্যেই, জলের বেগ বেড়ে যায় খুব আর সেই সাথে বাঘ আর ইঁদুর দুজনেই ভেসে যায়। ইঁদুর বাঘের গোঁফ ধরে ঝুলে পড়েছিলো বলে একসাথেই ছিলো।
নদীর স্রোতে অনেক সময় ঘুর্নি হয় দেখেছিস তো?আরে মনে নেই সেবার সেই দামোদরের বান দেখাতে নিয়ে গেছিলাম,  দেখালাম, হ্যাঁ ওরকম। ওরকম একটা বড় পাকের মধ্যে দু মক্কেল গিয়ে পড়ল ভাসতে ভাসতে। তারপর সোঁ সোঁ শব্দ আর হাঁচরপাচোঁর ভেসে যাওয়া ছাড়া কিছু খেয়াল নেই তাদের।  অবেক অনেক্ষন পর তার টের পেলো স্রোত হাল্কা হয়ে এসেছে,  মৃতপ্রায় অবস্থায় তারা এক নদীর ধারে পৌঁছল।
ঝকঝকে রোদ উঠেছে।  অমন বিরাট একটা বিপর্যয় যে ঘটেছে টেরই পাওয়া যায় না। ইঁদুরের জ্ঞান এলো আগে।  সে উঠে বাঘের নাকের ফুটো দিয়ে লেজ গলিয়ে সুড়সুড়ি দিয়ে ঘুম ভাঙালো বাঘের। তাদের সেই বনটাই না?  তবে গাছপালা গুলো এমন অন্যরকম লাগছে কেন? যাই হোক বাঘ আর ইঁদুর দুজনেই এইসব ব্যাপারে খিদে পেটে মাথা ঘামায় না। ধড়ফড় করে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো তারা।
-কিরে সব গেলো কোথায় বলত? অ্যাইসান খিদে পেয়েছে মনে হচ্ছে তোকে দিয়েই ব্রেকফাস্ট করি, হেঁড়ে গলায় বাঘ বলে উঠলো।
-" মামান, বাঘটা কি পচা,  বন্ধুকেই খেয়ে নেবে বলছে "।
-"দূর ব্যাটা,  ইয়ার্কি করে বলেছে,  এই যে কাল আমাদের লড়াই হবে তার মানে কি আমরা সত্যি কারের শত্রু  নাকি? যাইহোক শোন তারপর।"
ইঁদুরও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে,  গাছে চেনা পাখিদের ডাক শোনা যাচ্ছে না,  চেনা বন্ধুদের কথাবার্তাও শোনা যাচ্ছে না। এক জায়গায় বসে থাকলে তো হবে না,  তাই তারা এগোলো একটু। ইঁদুরের আর কি সে তো ঘাসের বীজ, ছোট পোকা টোকা খেয়ে নিচ্চে মজাসে। ইঁদুরের পার্সোনাল ফেভারিট ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক অবশ্য, তা যখন পাচ্ছে না যা পায় খেয়ে নিচ্ছে। খেয়াল কর বাবান,  ইঁদুরটার বুদ্ধি কেমন খাওয়া নিয়ে অত ইয়ে নেই।
- "মামান তুমি কি আমায় গল্প বলতে গিয়ে পড়ার কথা বলতে চাইছ তাহলে আমি আর শুনব না।  তাছাড়া ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক ইঁদুর পাবে কোত্থেকে।"
- "আরে না খামোখা মামার বাড়ি এসে কেউ পড়ার গল্প করে নাকি। আমি বললাম ইঁদুরটার ভালো বুদ্ধি। আর ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক পাবে না কেন, সেই সেবার ইঁদুরদের গ্রামের একটা স্মার্ট ছোকরা ইঁদুর গেছিলো তো শহরে,  কেকের দোকানেই থাকত তো,  দেখে শিখে নিয়েছে। নেহাত ওর ডাস্ট এলার্জি ছিলো তাই জঙ্গলে ফিরে এলো নইলে ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক ছেড়ে আসতই না। আর শোন তুই যদি এভবে বিরক্ত করিস আমি আর বলব না গল্প।"
- আরে না না মামান, রাগ কোরোনা প্লিজ,  বলো "।
হ্যাঁ,  এদিকে বাঘের তো খিদে পেয়েছে সে তো আর এইসব ঘাসপাতা খেয়ে বাঁচতে পারবে না। মাংস চাই।  কি হবে দেখতে দেখতে দেখে একপাল হরিণ চড়ছে। ব্যাস বাঘের ব্রাঞ্চ কম্পলিট। ব্রাঞ্চ মানে জানিস তো? ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চ এর মাঝামাঝি খাবার আর কি। কিন্তু এরকম কেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, জঙ্গলটা, তবে কি সবাই অন্য জায়গায় চলে গেলো?  আসলে কি হয়েছে বলত, বাঘ বাবাজি আর ইঁদুর রানী ওই যে ঘূর্ণিতে পড়েছিলো, ওটা ছিল একটা একটা ওয়ার্ম হোল।
- "মামান ওয়ার্ম হোল কি হয়"?
- বলছি।  কিন্তু আমি যখন বললাম প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে বাঘ আর ডাইনোসর এর লড়াই হয়,  প্যারালাল ওয়ার্ল্ড কি হয় জিজ্ঞেস করলি না কেন?
- "আমি তো জানি,  তুমি সেদিন  গল্প বলছিলেনা, টাইম ট্রাভেল নিয়ে, কিন্তু ওয়ার্ম হোল কি বলোনি তো।
- আচ্ছা বলিনি? তবে শোন,  ছোট করে কেমন, নইলে বাঘটার আবার দুঃখ হবে ওদিকে। ধর তুই একদিন পেটে ব্যাথার বাহানা করে স্কুল গেলিনা,  না না আমায় লুকিয়ে লাভ নেই আমার এক্সট্রা একটা পাওয়ার আছে আমি এসব জানি, হ্যাঁ তো স্কুল গেলিনা আর সেদিন তোদের স্কুলে একটা সারপ্রাইজ ট্রিট হলো। তুই গেলি না তাই খেতে পেলিনা এবার পরের দিন স্কুল গিয়ে তোর বন্ধুর থেকে তুই জানতে পারলি ঘটনাটা। তোর কাছে একটা টাইম মেশিন থাকলে ডেফিনিটলি তুই আগেত দিন ফিরে যাবি আর স্কুল গিয়ে খেয়ে আসবি। কিন্তু তাহলে তো আজকে তোর বন্ধুর সাথে এ কথা বার্তাটাই হতোনা তাই না। তাই বিজ্ঞানীরা বলছে তুই যেই মুহূর্তে টাইম মেশিনে করে অতীতে ফিরে গেলি আর অতীতটা কোনোভাবে ট্যাম্পার করলি সাথে সাথে একটা প্যারালাল ওয়ার্ল্ড তৈরী হয়। সে দুনিয়ায় তুই স্কুল।গেছিস,  ট্রিট পেয়েছিস। আর এ দুনিয়ায় ট্রিট পাসনি।  এবার এই সব ভিন্ন যে প্যারালাল দুনিয়া চলছে তার মধ্যে চলাচল সম্ভব আর এই রাস্তাটাকেই বলছে ওয়ার্ম হোল। কোথায় যে আছে এ ওয়ার্ম হোল কেউ জানে না। আমাদের বাঘ বাবাজি আর ইঁদুর রানী সেই ঘূর্ণিতে পড়েছিলো সেই সময় ওরা একটা ওয়ার্ম হোলে পড়ে গেছিলো।
এইবার বাঘ আর ইঁদুর একটা জরুরী মিটিং এ বসল। অনেক বাকবিতণ্ডার পরেও দুজনে কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না কি হয়েছে ব্যাপারটা। সেই সময় হঠাৎ একটা রক্তজল করা হুংকার শুনতে পেলো তারা। বাঘ বনের রাজা, সে যে যথেষ্ট সাহসী সে কথা কে না জানে।  আর ইঁদুর ছোট হতে পারে তবে সাহস তারও কম না। তবুও সে ডাক শুনে দুজনেরই প্রাণপাখি খাঁচা ছাড়া হবার জোগার। তারা আগে এমন ডাক শোনেনি। সামনে তাকিয়ে দেখে বাঘের দ্বিগুণ চেহারার এক বিরাট প্রাণী এগিয়ে আসছে। ওরা তো আর আগে ডাইনোসর দেখেনি তাই বুঝতে পারলো না এটা কে তাই ডাইনোবাবু নিজেই নিজের পরিচয় দিলেন। 'আমি ডাইনো দ্য গ্রেট, যাকে বলে এ জঙ্গলের শেষকথা। কোথাকার খোকারে তুই'? বাঘ তো হেভভি খচে গেলো। হ্যাঁ তাকে খোকা বলা ইয়ার্কি পায়া,  সে রাজা বাঘ তাকে এমন করে ইয়ে করা। বাঘও রেগে মেগে উত্তর দিলো 'শোনো আমি বাঘ আমার জঙ্গলের রাজা তুমি ডাইনো না ভলক্যানো আমার জানার দরকার নেই। আওয়াজ নিচে রাখো। '
এই সময় হঠাৎ ডাইনোর নজরে ইঁদুর পড়লো। মানে পড়ার কথা না,  তাও কিরম দেখতে পেয়েছে। আর পেয়েই ডাইনোবাবুর সেকি হাসি, খ্যাক খ্যাক, খাউয়া খাউয়া, খোয়াক খো খোয়াক খো মানে যতপ্রকার বিশ্রী করে হাসা যায় হেসেছে আর কি। বাঘ আর ইঁদুর দুজনেই খুব অবাক। এই ধেড়েটার মাথায় গন্ডগোলা আছে নাকি রে। হাসি থামিয়ে ডাইনো বলল,  এই পোকাটা কে রে তোর সাথে, তোর বডিগার্ড নাকি। অপমানে ইঁদুরের নাক লাল হয়ে গেলো। মানে ইঁদুর যাকে খায় তাকে বলা মানে কি হেনস্থার কথা। বাঘ ইঁদুরের বন্ধু তো তাই বাঘ ব্যাপারটা বুঝে গেলো আর রেগে গেলো খুব। 'এই শোন মোটুরাম,  আমার বন্ধুকে আজেবাজে কথা বলার স্পর্ধা পাস কোত্থেকে তুই। চুপ করে যা আর সরি বল না হলে তোর খবর আছে। '
'খবর আছে? হ্যাঁ আমার?' ফের এক দফা খচমচ করে হেসে নিলো ডাইনো।
'শোন সাহস থাকে কাল সকালে এই নদীর ধারে আয়। আশা করি ভয় পাবি না।  লড়ে দেখাস আমার সাথে।'
' ওরে তোকে ভয় পাবো!! তুই বরং তোর বডিগার্ড পোকাকে নিয়ে আসিস। ' বলে দুমদাম করে চলে গেলো। 
ইঁদুর দুঃখ পেয়েছিলো খুব কিন্তু একই সাথে ভয়ও পেলো বাঘের জন্য। অতবড় চেহারার প্রাণীটার সাথে বাঘ লড়বে কিভাবে। হ্যাঁ বাঘ শক্তি সাহস দুটোরই তুলনা হয় না তাও। এই অজানা দেশে তো বাঘ একমাত্র বন্ধু।  তাছাড়া বাঘ বদমেজাজি হলেও বাঘকে ইঁদুর খুব ভালোবাসে, এমন চমৎকার বন্ধু তার আর নেই। ইঁদুর কিচমিচ করে সেটাই বলল বাঘকে। বাঘ বলল অত ভাবিস না যা হবে দেখা যাবে কাল।
পরেরদিন সকাল সকাল দুজনেই হাজির নদীর ধারে। ওখানে অবশ্য শুধু ওরা দুজনেই ছিলো না।  ইঁদুর এসেছে, দূর থেকে হরিনেরা এসেছে, নীলতিমি এসেছে,  ম্যাকাও পাখি এসেছে আরও অনেকে এসেছে যারা ভুল করে ওয়ার্ম হোলে ঢুকে পড়েছিল। ডাইনো বলল প্রাণের মায়া চাইলে ফিরতে পারিস কিন্তু। বাঘ বলল তোর ভয় করে তুই পালা। ডাইনো বলল 'বেশ তবে আর দেরী করা কেন। শুরু করা যাক। '
রেফারি কেউ ছিলো না। জঙ্গলের নিয়ম হলো যে বাঁঁচবে সে জিতবে। তারপর সে লড়াই শুরু হলো। বাঘের ক্ষিপ্র গতি ডাইনোর বিপুল শক্তির সামনে লড়ে যেতে দিচ্ছিলো। একসময় বাঘ এর পা পড়ে গেলো একটা গর্তে। ইঁদুর ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। কিন্তু অবাক ব্যাপার ডাইনো হাত বাড়িয়ে বলল উঠে এসো হে আগে বেকায়দায় পেয়ে তো মারতে পারিনা। বাঘ তো অবাক। আরে এতো খারাপ লোক না। ফের বাঘ উঠে আবার লড়াই শুরু হলো এবার ওই গর্তে ডাইনোর পা ঢুকে গেলো। এবার বাঘ বলল তুমি উঠে এসো দেখি আমার হাত ধরে। এবার ডাইনোও অবাক। নীলতিমি বলল পাশ থেকে ওহে তোমরা খামোখা লড়ছ কেন? দুজনেই তো দিব্যি ভালোমানুষ দেখছি। বাঘ মুখ গোমড়া করে বলল ও আমার বন্ধুকে অপমান করেছে। ডাইনো অবাক হয়ে বলল,  অপমান করলাম কই হে আমি তো মজা করছিলাম। অ তুমি আমায় জানোনা কিনা তাই ভুল বুঝেছ। ম্যাকাও আর ফিঙেও বলল হ্যাঁ হ্যাঁ ডাইনোদাদা আমাদের অমন খারাপ নয়।
তারপর আর কি ব্যাস। মিটমাট হয়ে গেলো। ওরা ওখানেই রয়ে গেলো সবাই মিলে।
যা ব্যাটা এবার দেখতো মাংসের গন্ধ আসছে মনে হচ্ছে দুজনের জন্য দুখানা করে কষা জোগাড় হয় কিনা?

Friday, December 23, 2016

মনখারাপের গন্ধ

মন খারাপ ব্যাপারটা খুব গোলমেলে কেন যে মন কেমন করে কেন যে করেনা কে জানে।  খেয়াল করলেন কি , মন কেমন বললাম দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আসলে কিন্তু দুটো মোটেও এক না। বন্ধুত্ব আর প্রেমের যতটুকু তফাৎ ততটাই তফাৎ এক্ষত্রেও।  আর তাই গুলিয়ে যাওয়া সহজ।  এই যে শীতের পড়ন্ত বেলা ,আমি অফিসে বসে হিজিবিজি টাইপ করছি , কাজে ফাঁকি মারছি এসবের মধ্যেও আমার  মন পড়ে আছে একটা নদীর ধারের ঘুমন্ত গ্রাম , দাঁড়িরা ঝপাং ঝপাং দাঁড় টানছে , দূরে দূরে একপাল গরু ঘুরে বেড়াচ্ছে , একটা বৌ এক বোঝা এঁটো বাসন নিয়ে মাজতে এসেছে।  আমি কিন্তু জীবনেও এরকম দৃশ্য দেখিনি।  পড়েছি হয়ত,  দেখিনি। আমার গ্রামের বাড়ির দিকে নদীই নেই ।  শীতকালে দুপুরে মা জ্যেঠিমা জ্যেঠতুতো দিদিরামিলে  রোদ পোহাতে যেত ছাদে।  লেপ তোষক মেলা থাকত।  কয়েৎবেল মেখে খেত , আমার জন্য বরাদ্দ থাকত কমলালেবু। আমি  বই পড়তে পড়তে কমলালেবু খেতাম। বিকেলবেলা হাফপেন্টুল জুতো মোজা পরে ফুটবল খেলতে যেতাম , শীতকালে বোধহয় একটু আগেই যেতাম।শীতকালে আলু ফলত , ছুটির দিন পড়াশোনা সেরে আমি মাঠে যেতাম বড় জ্যেঠা মানে বাবুজির সাথে।  ছোট ছোট আল দিয়ে দিয়ে খাল থেকে জল এনে মাঠে দেওয়া হত।  আমি আল গুলো ফুটো করতাম , তারপর ফের বাঁধ দিতাম।  সারা হাতে পায়ে কাদা মেখে একটা বা দুটো আলু বসতাম। আলু বসানোর নিয়ম আছে , ওই যে ছোট ছোট চোখ মত , ওগুলোর এদিক ওদিক করে লাগাতে হয়। আমি যে আলুবসাতাম সেই আলু গাছটা থেকে আলু হতো  কিনা তা জানার আগ্রহে রোজ উত্যক্ত করতাম বাবুজিকে।  সর্ষে গাছের মধ্যে দিয়ে ইচ্ছে করে যাতায়াত করে গায়ে সর্ষে ফুল মাখতাম , কেউ দেখলেই বকুনি দিতো। সন্ধ্যেবেলা বাড়ির সামনে আগুন পোহানো হতো।  তারপর আলু কাটা হতো , মনে আলুর চোখ  দেখে দেখে কাটা হতো বসানো হবে বলে। বাকি আলুটা খাওয়ার জন্য ব্যবহার হতো। আলুরদম মুড়ি আর দুধ যে কি অমৃতের মতো খাবার শহুরে লোকেরা জানতেও পারবে না।  অবশ্য অমৃত ব্যাপারটাই তো তাই। শান্ত  গেরস্থালি শেষপাতে ক্ষীর কারোর কাছে অমৃত কারোর কাছে বিষ।  হ্যাঁ  যা বলছিলাম , আমাদের বাড়িতে গরু ছিল সে গরুর দুধ এর মোটা মিষ্টি সর পড়তো , আমি দুড়মুড়ি আলুরদমের সাথে ওই সরটা  মাখতাম।  ঠান্ডা কোনোদিন পড়তো কোনোদিন তার আত্মীয়  পরিজন নিয়ে আসত। মানে আমরা বলতাম আজ শীতের বাবা মা সবাই এসেছে। এই যে শীতকাল এর জন্য আমার মাঝে মাঝে মন কেমন করে, মন খারাপ না। আমার একটা যদি নদীর ধারে জায়গা থাকতো তবে আমি এই যে শীতের ভোরে লেপের আদরে থাকার মতো বুকের মধ্যে যে মনখারাপটা সেঁধিয়েছে তাকে তুড়ি মেরে বের করে ওই জায়গায় চলে যেতাম। ভালো লাগতনা হয়ত, সন্ধ্যের পর ঝিঁ ঝিঁ ডাকা ঘুমন্ত জায়গা আমার ভালো লাগবেনা এতো বলাই বাহুল্য। এত কথার কারন আর কিছুই না মন ভাল লাগছে না। কিছুতেই না,  আর্সালানের বিরিয়ানি  না,  নলেন গুড়ে আর পিঠে না,  পুরোনো বই যাই দিই মন খারাপটাকে,  সেই লস্ট চাইল্ড এর বাচ্ছাটার মতো না না করছে। এ ব্লগ যদি কেউ পড়েন এ লেখা যদি কারোর চোখে পড়ে বলতে পারেন আপনাদেরও এমন হয় কি? কেমন করে রোদ জ্বালানো যায়?

Monday, December 12, 2016

রাস্তায়

সকালবেলায়
আগে বাইক নিয়ে যাতায়াত করতাম যখন নজর খালি স্পিডোমিটার এর দিকে থাকত, মানে কোন ফাঁক পেলেই সাঁই সাঁই স্পীড উঠবে তাই চিন্তা। আজকাল ফের রাস্তাঘাটে নজর দিতে দিতে যাওয়া যায়। সকালে চারদিক যখন প্রচন্ড ব্যস্ত তখনও আমাদের শহরে কছু লোক ভারী নির্বিকার চিত্ত থাকে। অটোর বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখতে দেখতে দিব্যি লাগে। একজন পচাৎ করে থুতু ফেললো, আবার নিজেই নিজের থুতু মাড়িয়ে চলে গেলো কোনো হেলদোল ছাড়াই। মোড়ের মাথায় রিক্সা গুলো মাইকেল শুমাখার এর মতো টার্ন নেয়। সে সময় ধাক্কা লাগার, জামা ছিঁড়ে যাবার বা স্ক্র্যাচ পড়ার সম্ভবনা ৯৯.৯৯%। সেটা অবশ্যই রিক্সাওলার দায় না। এরকম শিল্পকর্ম যে দেখায় তার অহংকার না থাকাই খারাপ। সে সুন্দরী তরুণীর মতো নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে গোঁত্তা দিয়ে চলে যাবে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে এটাতেই বরং স্বাভাবিক লাগে। বুকের মধ্যে শান্তি আসে যাক এই পাঁচশ হাজারের বাজারে সব বদলে যায়নি।
একটা ভ্যান দেখি ডানদিক ধরে একগাদা সিমেন্ট এর বস্তা নিয়ে হেলতে দুলতে যাচ্ছে। পিছনেই একটা বাম্পার লাগানো টয়োটা ইনোভা প্যাঁ পোঁ করে অস্থির হর্ন দিচ্ছে। ড্রাইভারটা নিশ্চয়ই পায়ের সাথে ব্রেক বেঁধে রেখেছে। নইলে ড্রাইভার এর ভালো ধৈর্য, গুঁতো মারার ইচ্ছে দমন করা খুব সহজ কাজ না। অটোরা আবার ভ্যানেদের ব্যাপারে বেশ সহনশীল দেখা যাচ্ছে। একবারও হর্ন না দিয়ে 'মেরা আশিক ছাল্লা' শুনছে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে। গানের আওয়াজ সম্ভবত অটো ছাপিয়ে ভ্যান অব্দি পৌঁছচ্ছে, ভ্যানচালকের মাথাও দুলছে তালে তালে। ইনোভার ড্রাইভার এর দু চারটে দাঁত এতক্ষনে পড়ে যাওয়া উচিত, কড়মড় করতে করতে। ডানদিকে টার্ন নেওয়া এতো যন্ত্রণা জানলে সে হয়ত বাঁয়ে টার্ন নিতো, গন্তব্য পাল্টাতো কিন্তু দাঁত বাঁচত। আমি এরকম একটা সাজেশন দিতাম হয়ত কিন্তু আমার পাশের রাগী ভদ্রলোক অলরেডি এ নিয়ে একটা পেপার রেডি করে পড়তে শুরু করছেন, রিস্ক হয়ে যাবে।
এতো ভালো ভালো জিনিস দেখার পর আমার অফিস বাস মিস করাই উচিত ছিলো, কিছু উপভোগ করতে গেলে তার দাম দিতে আমি প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু চিনার পার্কের মোড়ে দেখি আরেক।মজা চালু। কি করে যেন একটা ডানদিকে টার্ন নেওয়া জাইলো দুটো বাঁয়ে যাওয়া রিক্সার মাঝে পড়ে গেছে। একেবারে দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম কেস । যেহেতু এ মজাটা আমি দেখিনি তাই বাকিরা দাম দিলো, বাসটা আটকে রইলো আমার ওঠার জন্য।
******************************************
ছুটির দিনে গাড়িখানাকে অসূর্যস্পশ্যা হবার হাত থেকে বাঁচাতে নিয়ে বেরিয়েছিলাম। তা পাড়ার লোক ভালো বলতে হবে, গলিতে আড়াই প্যাঁচে পড়েছি যখনই বা মোড়ের মাথায় ডানহাতে মুরগি বাঁ হাতে ডাবোলা আর সামনে থেকে ধেয়ে আসা রিক্সার ভয়ে কম্পিত হৃদয়ে স্টার্ট বন্ধ করে খাবি খেয়েছি এগিয়ে এসেছে তারা। "হ্যাঁ ভাই দে ফার্স্ট গিয়ার দে, কোনো ভয় নেই এগো আসতে আসতে"। আমি এগিয়ে গেছি। কিন্তু বেপাড়ার লোক বা রিক্সা কেউই এতো উদারহৃদয় না। গলি থেকে মেন রাস্তায় পড়ার মুখে, কিঞ্চিৎ অপেক্ষা করেছি বেশী, একটা বাসকে বেড়িয়ে যেতে দিয়েছি দুটো অটোর পথ ছেড়ে দাঁড়িয়েছি এবং তারও পরে দুইখানি রমণীর পথের কাঁটা না হয়ে অপেক্ষা করেছি দস্তুরমতো ভদ্রলোকসুলভ আচরণ করে।
তা রিক্সাওলার আচরণটা দেখুন একবার, বাস অটো কারোরটা চোখে পরলোনা, মেয়েদুটির জন্য অপেক্ষা করাটাই চোখে পড়লো!!!
আমায় বলল "ছবি তুলে রাখো, ছবি"!!

****************************************
রাজারহাটের এই রাস্তাটা আমায় লবটুলিয়া মনে করিয়ে দেয়। যেন জমি বিলির বন্দবস্ত হয়ে গেছে মকাইএর ক্ষেত বা টালির খোলা বা কংক্রিট এর বাড়ি উঠবে। সব বাড়ি ঘর তৈরী হয়নি এখনো তাই ইতস্তত ঝোপঝাড়, গাছপালা ফাঁকা মাঠ দেখা যায়। সকালগুলো ভারী নরম হয়, বেলা বাড়লেই কেজো ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায় আর দুপুর গুলো ফের উদাসীন। দিনে রাতে প্রায় সব ধরনটাই আমি গেছি এ রাস্তায়। শীতকালে সন্ধ্যেবেলা গাছগুলো ঝুপ্সি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একা একা সেই কবে থেকে, যখন এ রাস্তা ব্যস্ত হয়নি তখনও বা যখন এ রাস্তা হয়নি তখনও। যেদিন জ্যোৎস্নায় ভিজতে পারে সেদিনও গাছেদের খুব কিছু যায় আসে না। মাঠগুলো খুশি হয়ে যায় খালি।
এ রাস্তায় একটা জলাশয় আছে ছোট্ট, ইকোপার্ক না, সে তো এখন সাজানো গোছানো ড্রয়িংরুম এর বাসিন্দা। এ একটা ছোট্ট জলাশয়, পরে হয়ত নোংরা নালা হয়ে যাবে। একটা হাফপেন্টুল পরা ছেলে খালি গায়ে একা একা আখ চিবোচ্ছে মন দিয়ে। দূরে বড় যে বাড়িটা তৈরী হচ্ছে সেখানে দড়ি ঝুলে ঝুলে মিস্ত্রীরা রঙ করছে। বাসটা একটা টার্ন নিলেই রাস্তা আরও ফাঁকা হয়ে যায়। অনেককটা কলা গাছের ঝাড় আছে। বোধয় গাছের প্রাচীরের অন্যদিকে কয়েকঘর রয়ে গেছে এখনো।তাদের গরু গুলো আরাম করে শুয়ে জাবর কাটে।এখনোও এখানে অনেক বক দেখা যায়। সাদা সাদা বকগুলো গরুগুলোর ঘাড়ে পিঠে লাফিয়ে লাফিয়ে হেঁটে নেয়। গরুগুলো বৃদ্ধ ঠাকুরদার মত চোখ বুজে প্রশ্রয় দেয় খালি। আর একটু গেলেই আমাদের আপিস। কেন যে রাস্তাটা এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। ওই যে দূরে একটা ভাঙা বাড়ি আছে ওখানটা কোনোদিন যাওয়া হয়নি, যাবোও না কখনও। ওই ভাঙা বাড়ি, গাছ, মাঠ ঝোপ যদ্দিন আছে এ রাস্তা আমার সারাদিনের ফুয়েল, ততদিন আপিস যেতে আমার কষ্ট নেই।
*****************************************

আমার মাথায় কিঞ্চিৎ গোলমাল আছে এ মোটামুটি সবাই জানে, তবে ওটা যে কিঞ্চিৎ না ভালোরকম আছে আজ নিজে ভালোমতো প্রমান পেয়ে ধন্য বোধ করছি। এই ভরা সোমবারে, ইনবক্স উছলিয়া যায় কাজের লিস্টে আমি মাঝপথে বাস থেকে নেমে পড়েছি কেন না আমার এই মাঠ মাঠ রাস্তা দিয়ে হাঁটার সাধ হয়েছে। তামাম বাস, গাড়ি, বাইক হাঁ করে একবার নজর করে নিচ্ছে হলো কি, মানে দেখে তো অপ্রকৃতস্থ মনে হয় না, দিব্যি নিঁভাজ ফুল হাতা শার্ট, পেন্টুল, পালিশ করা জুতো পিঠে ব্যাগ, এ হেঁটে বেড়াচ্ছে কেন এমন তাও এমন প্রফুল্ল বদনে একা একা। মহিষ গুলোর গলায় ঘন্টা বাঁধা টুং টুং করে জাবর কাটছে। পিচ ঢালা হচ্ছে রাস্তায়, বেজায় ধূলো, আমি আমার ডাস্ট এলার্জি ভুলে ছোটবেলার মতো হাঁ করে দেখছি একটা লোক কেমন দড়ি বাঁধা বালতি নিয়ে খাল থেকে জল তুলছে। এ জিনিস এখনও আছে জানতেই পারতাম না। রোদটা সোজা মুখঝামটা দিচ্ছে। আচ্ছা রোদের যে একটা গন্ধ আছে বলেছি কি? গরমকালের রোদের গন্ধ আর শীতের রোদের গন্ধ এক না কিন্তু। ধূলোরও গন্ধ আছে। তার রোদ আর ধূলোর মিক্সড ফ্লেভারের গন্ধটা আবার হাওয়ার উপর ডিপেন্ড করে। একগাদা নীল ফুল হয়েছে। কি ফুল কে জানে। খচমচ করে ছবি তুলে রাখলাম। অ্যাহঃ মনের ভুলে ঠোঁট চেটে ফেলেছি একগাদা বাজে খেতে বালি।
শীতকালের রোদ বড় বিপজ্জনক হে, কোনদিন আমার অফিস, শহর সব পেরিয়ে যাবে এ শর্মা থামবে না।

Wednesday, October 26, 2016

বাড়ি ফেরা

হ্যাঁ হ্যাঁ দিব্যি বেঁচে বর্তে আছি হে। অনেক দিন পাত্তা নেই দেখে ধরে নিচ্ছি কেউ কেউ উদগ্রীব হয়ে পড়েছিল আমার জন্য ( কেন মশাই অমন খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসার কি হ্যাঁ , আমি কি অত টাই ইয়ে নাকি যে কেউ ব্লগে ঢুঁ মারেই না , নতুন লেখা না পেলে খোঁজ নেয় না, হুহ ) , তাই বলছি বেঁচে তো আছি বটেই দিব্যি কলকাতার দুর্গাপূজো ২বছরকাল পর দেখে, পাটিসাপ্টা ক্ষীর , লুচি , মাছ মাংসের ভবিষ্যৎ উদ্বিগ্ন করে , ভুঁড়ির পরিধি বাড়িয়ে বহাল তবিয়তে বিরাজমান।
হ্যাঁ  কথাটা ঠিকই ধরেছেন , স্বদেশে পূজ্যতে রাজা আপ্তবাক্য স্মরণ রেখে মহারাজ দেশে ফিরে এসেছেন।
ফলে আপনাদের সাথে বিস্তর আড্ডা দেওয়ার আছে।  কেমন আমায় হবু প্রোডিউসার ভেবে ওলার দাদা (বিহারি দাদা) আমায় তাঁর  বীরত্বের কাহানি শোনালেন।  কেমন আড়াই বছর পরে দোকানে এক অনুষ্ঠান উপলক্ষে ফুল কিনতে গিয়ে দর করতেই কাকুটি বললেন আমি তো তার রেগুলার খদ্দের উনি আমায় ঠকাবেন!! তাপর অটোভাড়া দেবার আগে থ্যাংক ইউ বলতে অটোওলা কেমন সন্দ সন্দ করে তাকালো।  তারপর বাসে এখনো লোকে কেমন তুই তোকারি করলো -_- ।  সব বলতে হবে তো নাকি।
তো শুরু থেকে বলি কেমন? টিকিট পেয়ে আমি খুশি তো বেজায় সাথে চিন্তা ২৩+২৩+ক্যারি অন + ব্যাকপ্যাকে আমার এই রাশি রাশি মালপত্র ধরবে কেমনে। জিনিসপত্র দেদার কেনা হয়েছে , বই নয় নয় করেও দেখি ১০ কেজি।  হ্যাঁ বলে কিরে।  দওওশ কেজিইই।  লোকনাথ কে ডেকে লাভ নাই।  আমি রণেও নেই , বনেও নেই , জলেও নেই , জঙ্গলেও নেই।  তাইলে।  লাগাও সমুদ্র মন্থন পালা।  অগতির ভরসা অর্ণবদা।  বললাম তোমায় অল্প বই পাঠাই ? ভালোমানুষদের সমস্যা হলো তারা মুখের উপর না বলতে পারে না।  হ্যাঁ  বলল, আমিও ভালোমানুষদের সাথে যা করে তাই করলাম , মানে আমার খান কতক মানে বেশ  বেশ কিছু বই পাঠিয়ে দিলাম।  তবুও ওজন আর কমে না।  কি রে বাওয়া ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া নাকি।  যাক অবশেষে ফেলে ছড়িয়ে যাহোক করে হাজির। ক্যারিঅনে ৭ কেজি না ১৬ কেজি জিনিস ভরেছি।  ওজন নিলেই চিত্তির ।এয়ারপোর্ট  এ ব্যাগ উল্টে গড়াতে গড়াতে কোনো মতে চেকিন করতে গিয়ে দেখি আমার শুরুতেই চাপ। বলে নাকি একখান ব্যাগের ওজন ৫১lbs ।  অবশ্য মাসিমা ভালোই ছিলেন আমায় গম্ভীর হয়ে বললেন যা বাছা এবারের মতো ছেড়ে দিলাম। খুশি খুশি যাচ্ছি মনে চিন্তা , ক্যারিঅন টা কি হবে।  তা যেখানে বাঘের ভয় ইত্যাদি , খ্যাক করে ধরলো । তোমার পেটমোটা বলে তোমার  ব্যাগের এমন পেটমোটা করেছো এ ফিট করবে বলে আমি মনে করছি না ইত্যাদি ।যথারীতি মাপ টাপ  নিয়ে দেখা গেলো তিনি আনফিট।  বললুম উপায় কি মাদমোয়াজেল।  বললো আজ তোর শুভ দিন (আমাদেরও, হতচ্ছাড়া আব্লুশ  এদ্দিনে বিদেয় হচ্ছে ) তোর এ ব্যাগটা  আমরা চেকিন্ করে দিচ্ছি।  ভয়ে ভয়ে জানতে চেয়েছি যেই পয়সা কত লাগবে দিদি, বলে ওরে বিচ্ছু  কিচ্ছু না কিচ্ছু না , তুই বিদেয় হচ্ছিস এ খুশিতে ফিরি ফিরি।
আম্মো লাফাতে লাফাতে ঢুকে পড়লুম।
জানলা দিয়ে শেষ বারের মতো ডেনভার দেখলাম , আমার এদ্দিনের সুখ দুঃখের শহর।
শিকাগো এয়ারপোর্ট টা বলবো কি মনে হচ্ছিলো ভারতের কোনো এয়ারপোর্ট।  সব ভারতীয় বাবা মা।  ছেলে মেয়েদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে ফিরছন।  এক কাকিমা দেখি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন ঠায়  , একিরে বাবা চেনা তো না , তবে কি বাঙালি? খিস্তি মেরেছি ফোনাচ্ছি সেইটে শুনেছে নাকি।  নাহ  মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে  দক্ষিণ প্রদেশীয়।  ভয়েভযে ফোন রাখতেই দেখি বলে একখান কাগজ দিয়ে তার মেয়ের সাথেএকটু কানেক্ট করিয়ে দিতে হবে।  যাক বাবা স্বস্তি।  সন্ত্রাসবাদী ভাবেনি এই ঢের।  শিকাগো থেকে প্লেন  এ আবুধাবি ওখান থেকে কলকাতা। শিকাগো থেকে প্লেন টেকঅফ করার সময় মিশিগান হ্রদ দেখলাম , হ্যাঁ বড় বটে।  এই যে ছবি


  তা শিকাগোর ফ্লাইটে  আমার পাশে দুই কাকু কাকিমা বসলেন।  আমার জ্যাকেট ও প্যান্টে ম্যাংগো জুস্ ঢাললেন।  আমি সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম আমি ম্যাচিওর্ড মানুষ হয়ে উঠেছি।  " নো ওরিজ  , আই উইল টেক কেয়ার অফ ইট আন্টি " ছাড়া কিছুই বললাম না ।  বাকি যাত্রাপথ যেমন বোরিং এক্সপেক্ট করেছিলাম তেমনই হলো খালি অনেক ভালো ভালো মেঘ , অনেক কটা মালভূমি আর খান কতক লেক দেখেছি।



আমায় আপনারা আওয়াজ দিতে পারেন কিন্তু কলকাতায় ট্যাক্সি স্টার্ট নেবার পর আমার মনে হয়েছিল একি রে বাবা কি করছে এ , রেলিং এ ধাক্কা লাগবে নাকি , আর তারপর অপরিসীম দক্ষতায় যেভাবে কাটালো আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম, এ কথা স্বীকার করতে আমি বাধ্য।
পরেরদিন এক বন্ধুর বাড়ি যাবো , তার বাড়িতে অনুষ্ঠান ছিল।  তখনই ওই ফুলের দোকানের ঘটনা ঘটলো।  আমি তো অব্বাক।  বলে কি রে , আড়াই বছরের পুরোনো খদ্দেরও  রেগুলর কাস্টমার। এ কি মহাকাশ টাইম জন্যে চলে নাকি। আর অটোর কথা তো বললামই , যেই থ্যাঙ্কু বলেছি , পরিষ্কার শুনতে পেলাম মনে মনে বলছে ব্যাটা ভাড়া না দিয়ে পালাবার ছক করছে নির্ঘাত।
 
ওলার দাদার গল্পটাও শুনিয়ে দিই তবে। " সে তো হয়েছিলো একবার , এক মন্ত্রী আমার গাড়ির সামনে বাইক রেখে চলে গেছে । হরিদ্বারের মন্ত্রী । আমি বলেছি কে রেখেছে এখানে বাইক । মন্ত্রী বলে আমি । আমি তো সোজা বলে দিয়েছি সরাও এখান থেকে । ব্যাস মন্ত্রী দিয়েছে আমায় এক চড় । আমার মাথা ফাথা গরম । এত বড় সাহস আমার গায়ে হাত তুলিস । দিয়েছি এক ঝরাকসে । ব্যাস পুলিশ , পার্টির ছেলেরা হাজির । পুলিশ কথা তথা বলে আমায় বলল , যে তুই যদি পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চাস তবেই ছাড়া পাবি ।আমিও বললাম  আমার মাথা কেটে ফেললেও আমি মাথা ঝোকাব না । তারপর অন্য পার্টির আরেক নেতা এসে গেলো । আমায় বুকে নিয়ে বলল আমি অনেক দেখেছি কিন্তু এরকম ছোট বেলায় মা কা দুধ পিকে আয়া বহুত কম দেখা । ব্যাস তারপর লড়াই শুরু হয়ে গেলো । আমিও দিলাম উস্তুম খুস্তুম । তারপর থানার বড়বাবু নিজে আমায় ছেড়ে দিয়ে গেলো স্টেশনে । "
সিনেমার নাম কি দেবো বলুন তো ? বেঙ্গল কা সিঙ্ঘাম?
আচ্ছা শুভ  বিজয়া জানানোর পক্ষে কি বেশি দেরি হয়ে গেছে? তাইলে হ্যাপ্পি দিওয়ালি।  আপনাদের তুবড়ি দোতলা অব্দি উঠুক , রং মশালে বালি কম থাক , চরকি বাঁই বাঁই করে ঘুরুক।

Wednesday, September 7, 2016

ছোটবেলার হিজিবিজি ৩

ষষ্ঠীর সকাল থেকে ঢাক বাজতো না বোধহয় । বাজলেও আমার মনে নেই। জেনারেটার এর লোকজন এসে আলো লাগাত । তাপস , মানকে গৌরহরি ওরা কেমন ওই বয়েসেই দুটো তার জোড়া দিয়ে আলো জ্বালিয়ে দিতে পারত । ফটকে ওর দাদুর ঢাকের সাথে কাঁসি বাজাত । কিন্তু ব্যাটা যা নাচত না । অক্ষয়কুমারের মতন নাচতে পারত । আমি অরিত রন্টি বুয়া (পিসি ফিসি না, আমার এক দিদির ছেলে) একবার লুকিয়ে নাচতে গেছিলাম , ধরা পড়ে "কান ধরে তুমি নিয়ে চল" হয়ে গেছিলো । -_- যাকগে । বড়পুকুরে ছোটদের নামা বারণ ছিল একা একা কিন্তু সঙ্গে বড় কেউ থাকলে নামা যেত । ঘাটের সিঁড়ি কতদূর চলে গেছে জানার খুব ইচ্ছে হতো । ওর তলাতেই পাতালপুরী? সোনার কাঠি পকেটে ছিলো না কিন্তু ডুব দেবার সাধ হত ভারী । সিঁড়ি ধরে পা ছুঁড়তাম আর একবার অরিত এক ধাক্কা মেরেছিল কি নিয়ে একটা লড়াই হয়েছিল তাই , আমিও নাকানি চোবানি খেয়ে সাঁতার এবং ডুব দুটোই শিখে গেলাম । ধাক্কা জরুরী , ভালবেসেই হোক কি খারাপবেসেই হোক ।
বড়পুকুর এপাড় ওপাড় করতে পারা মানে তুমি হ্যায় ব্যাক্তি । আমি পারতাম না কিন্তু পাড়ার ছেলেরা নারকেল, তাল গাছ থেকে ঝাঁপ মারতে পারত। আমার বাড়ির সব কটা ছেলেই ইঙ্কলুডিং মি , ন্যাদোশ , কেউ পারবে না আমি জানি , অত ভয় দেখালে আর কি করে হবে -_- ।
পুকুরের পারের কৃষ্ণচুড়া গাছটায় যে ফল হত তা দিয়ে খেলা হত, কার মুণ্ডু কাটা পড়বে ।
সপ্তমীর দিন সকালে কলাবউ চান হবে তার আগে ঘট ডুবানো হবে । সক্কাল বেলা ঢাকের আওয়াজে ঘুম ভাঙবে , কনরকমে ব্রাশ করে (বা না করে ) জামা বদলে ( এটা মাস্ট , পূজোর কাছে বাসী জামা প্যান্ট গেলে ঘাড়ধাক্কা খাওয়া মাস্ট) দৌড় দিতাম । মূল যে পুরোহিত সে তো আমাদের বাড়ির ফিক্সড পুরোহিত , লক্ষ্মী সরস্বতী কালী সব পূজোয় সেই আসবে তার কাছ থেকে গল্প শুনবো , কেমন করে আমাদের বাড়ির কালীপূজোর দিন ডাকাত আসতে গিয়ে নাকাল হয়েছিলো ডাকাতেরা ( তখন অত কূট প্রশ্ন মাথায় আসত না , নিজের নাকাল হবার গল্প কেন কেউ বলবে বা ইত্যাদি, আমি গল্প শুনেই দেখতে পেতাম একটা নৌকা করে দামোদর দিয়ে লাল ফেট্টি বাঁধা ডাকাত আসছে ) যাইহোক তাকে আমরা সব্বাই নাম মাধঅবো বলে ডাকতাম , আসল নাম অন্য , কিন্তু কেন কি জানি আমরা ওই বলি এখনও মানে আমারা যারা ছোট ছিলাম এখন ধেড়ে হয়ে গেছি ।
মা জ্যেঠিমারা কেউ শাঁখ বাজাচ্ছে ,কেউ জলের ঝারি টা দিয়ে জল ফেলছে আর দাদারা বোমগাছ বাঁধতে ব্যস্ত । শব্দদূষন নিয়ে অত চিন্তা করিনি , কড়াকড়িও ছিলো না খুব । দিনে রাতে যখনই আরতি বা কলাবউ চান বা ওরকম কিছু হবে একটা করে গাছ ্বোম বাঁধা , একসাথে আটটা না বারোটা ধুম দাম করে ফাটবে । বেশ আওয়াজ হয় । পিলে চমকানো টাইপ আর যে কানে হাত চাপা দেবে তাকে বাকিরা দুয়ো দেবে । পিলে চমকালেও , ছেলে ছোকরারা কানে হাত চাপা দিত না। লুজ বোমও হত সেগুলো ফাটাতে এক্সেস পাওয়া মানে বড় হয়ে গেছি । মনে আছে আমি ক্লাস সেভেনে না এইটে পেয়েছিলাম , কি হাবভাবটাই না নিয়ে ছিলাম।
ঘটডুবানো আর কলাবউ চান এর পর ঘরে গিয়ে খেয়ে দেয়ে আবার পুজোর কাছে । আমরা একটা খেলা খেলতাম , লে ম্যান বলে , দু দল থাকবে একজন এক পায়ে গিয়ে ওপারের লোককে ছুঁয়ে দিলে আউট । মানে কাবাডির মত । আর খেলতাম চোর পুলিশ । পুলিশ হতে কেউ রাজি হত না , কারন চোরের জীবন অনেক রোমাঞ্চকর। সে যে কোন নিয়ম ভেঙ্গে যে কারোর পিছনে শেল্টার নিতে পারত , কিন্তু পুলিশ তো নিয়ম ভাঙ্গে না । তাই লটারি করে মারামারি করে চোর পুলিশ ঠিক হত । আরও একটা কারন ছিল , চোর এর গুলি করার স্কোপ অনেক বেশী , সে যাকে পারে গুলি করে , পুলিশ পারে না ফলে ক্যাপ ফাটাতে কম পারে ।
দুপুরবেলায় মা এর একটু ঘুম লাগবেই , এবং মা এর লাগবে না শুধু কাকিমাদের জ্যাঠিমাদেরও লাগবে এবং আমরা তো ফ্রি । সুতরাং বিছানায় বন্দি । আমাদের কোড ছিল, নাম ধরে ডাকলে তো বকুনি এবং মা শুধু না মা এর কাঁচা ঘুম বরবাদ এর শাস্তি হিসেবে বিকেলেও আটকে দিতে পারে তাই কুহু (কোকিলের ডাকটা ইজি কিনা) করে ডাক দেওয়া হত । বেজায় বেশী বুদ্ধি ছিল তাই বুঝিনি , মা এরা বুঝেও পাত্তা দিত না । অমন কাঁচা হরবোলার ডাক ধরতে না পারার কোনও কারন থাকতে পারে নাকি । কোনো কোনো দিন বাকিরাও ঘুমিয়ে পড়ত। আমার চোখে আর ঘুম আসত না , আমি উঠে পড়তাম । পুরনো বাড়ির পিছন দিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতাম । ঝুপ্সি হয়ে থাকত এক এক জায়গা , আমার মন খারাপ করত আমি আবার এসে মা এর কাছে শুয়ে পড়তাম ।
সন্ধ্যে হত , আলো জ্বলে উঠত । একরাশ ফুল দিয়ে সাজানো হত বিকেল থেকেই , আর বেলপাতার মালা গাঁথা হত । ওই দূরে হটে যেত অন্ধকার।যে জায়গা গুলো পেরোতে অন্যসময় বুক শুকিয়ে যেত , বীর এর ন্যায় এগিয়ে যেতাম সেসব জায়গায় ।
বাজি পোড়ান হত চারদিনই । ছাদের থেকে দেখতাম উঠে একটু রাত হলে , সিনেমা চালানো হত । আমাদের টিভিটা বাইরে বের করে দেওয়া হত । কিন্তু কি সিনেমা চলত আমার মনে নেই । আমি ঘুমিয়ে পরতাম -_- । অষ্টমীর দিন সকাল সকাল উঠতে হবে বলে বাজি পোড়ানোর পরেই আমাদের ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হত।

Thursday, September 1, 2016

ছোটবেলার হিজিবিজি 2



অনেকের পরের পার্ট শুনতে ইচ্ছে হলো তাই তাই পরের কিস্তি লিখতে বসলুম।

মহালয়া তো চলে এলো। ভাবলে অবাক লাগে এত্ত গাছ পালা চারদিকে ছিলো কিন্তু একটাও শিউলি গাছ ছিলো না। শিউলি গাছ ছিলো স্কুলে, হস্টেলে থাকতে সকাল বেলা পড়া পড়া খেলতাম যখন দেখতাম গাছের তলাটা সাদা আর হলুদের কম্বিনেশনে ছেয়ে গেছে। কিন্তু কোনো পল্লী বা শহুরে বালা সে ফুল আমায় দেবার যুগ্যি মনে করেনি কখনওই। যাকগে কৈশোর না আমার ছোটবেলার কথা হচ্ছিলো। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহালয়ার থেকে আমাদের টিভিতে দেখানো মহালয়া নিয়ে বেশী উৎসাহ থাকত। তখন কালার টিভি এসে গেছে, রংচঙে যুদ্ধ দেখতে ভারী ভালোলাগত। মেজজ্যেঠু আবার চারটের সময় উঠবেই আর চালাবেই। সত্যি বলতে কি, আমি এই বয়েসেও মহালয়া শুনতে বসলে একটা করে নতুন গান আবিষ্কার করি। যাই হোক ওই রেডিওর মহালয়া নিয়ে আমাদের একদমই উৎসাহ ছিলো না তাই শুনতামও না। আমাদের মানে আমার এক কাকা থাকত হিন্দমোটরে, সেই খুড়তুতো ভাই, দিদিরা আমার বয়েসী ছিলো তারা আসত, তারপর দিদিভাই মানে সব থেকে বড় দিদির ছেলে মেয়েরাও আমার বয়েসি তারাও আসত। এছাড়া আমার দিদি তো আছেই। পাড়ার ছেলেদের সাথে বিকেলে মাঠে যা খেলা হতো অন্যসময় তেমন বন্ধুত্ব ছিলো না। তার একটা কারন তারা বেজায় শক্তপোক্ত ছিলো, আমি প্যাংলা দুর্বল সে লড়াইতে হেরে ঘরে ফিরতাম। তাছাড়া আর একটা কারন ছিলো গ্রামের দিকে লোকজনের মুখের ভাষা অত রেস্ট্রিক্টেড ছিলো না। তারা ওই বয়েসেই অনায়াসে খিস্তি দিতো আমিও সে জিনিস শিখে বাড়িতে বলে বেশ অভূতপূর্ব অভ্যর্থনা পেয়েছিলাম বলে বেশ মনে আছে। ফুলদিদি কলেজ থেকে ফিরে আমার জন্য আনা সন্দেশটা অব্দি লুকিয়ে দিতে পারেনি :'( । ছোড়দি মানে আমার দিদি পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো। সেবার যখন মা ওকে ঘরে খাটের পায়ার সাথে বেঁধে রেখেছিলো কে বাবুজিকে ডেকে এনেছিলো হ্যাঁ, এই শর্মাই তো নাকি। কোন আক্কেলে তুই মাকে বলতে গেলি " ম্যা ম্যা বাবু না **** বলেছে "!! যাকগে সে শোধ আমি নিয়েছিলাম এক খাবলা চুল তুলে এনে। সে অন্য প্রসঙ্গ। যা বলছিলাম, তা আশেপাশের ছেলেপুলেদের সাথে পূজোর সময় খেলার কোনো মানা ছিলো না। খালি মারামারি না করলেই হলো। মারামারি মূলত আমার ভাগনের সাথেই হতো অবশ্য। ঠিক বেছে বেছে যে সোজা প্যাঁকাটি টা আমি তুলে আনবো ব্যালেন্স করে আঙুলের ডগায় নিয়ে ঘুরবো বলে সেইটিই ওনার চাই। না পেলেই চিলচিৎকার করবে। ও আবার কি! আর আমি বাড়ির ছেলে ওরা নাকি কুটুম মানুষ ওদের দিয়ে দেওয়াই উচিতকর্ম। কই মামাবাড়ি আমি যখন যাই পাপুদা যখন বাজি ফাটায় আর আমায় বলে তুই বাচ্ছা ওদিকে গিয়ে দাঁড়া তখন তো কারোর উচিতকর্ম এর কথা মনে পরেনা। হুহ।

তো মহালয়ার সময় যেটা দেখানো হত টিভিতে সেটা আবার ষষ্ঠী বা সপ্তমীর দিন দেখানো হত। অসুরের ওই ডায়লগ আর হাসিটা আমি ওর মধ্যে তুলে ফেলতাম। আমাদের অসুরের উপর বেশী শ্রদ্ধা ছিলো মনে হয়, গায়ের সবুজ রংটার জন্য কি? নইলে আমরা যখন নিজেদের মহালয়া করতাম ওই টিভির মতো অসুরের পার্টটা করার জন্য এমন লড়াই হবে কেন? আমাদের চার জনের মূল যে দলটা ছিলো তাতে মেয়ে কেউ ছিলোনা বলেই বোধহয়, আর সে বয়েসে নিজের পুরুষত্ব সম্পর্কে আমরা চার জনেই বেশ সচেতন ছিলাম দেবত্ব লাভেরর জন্যও সে বিসর্জন দিতে নারাজ ছিলাম। মহালয়ার পরেও স্কুল খোলা থাকত কিন্তু সে খালি সময় নষ্ট করা। আমি তখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম কাকারা আর দিদিরা কবে আসবে। চতুর্থীর রাতেই সব জড়ো হতো। মামাতো দাদা দিদি আর মাসতুতো দাদারাও আসতো কিন্তু ওরা ঢের বড় ছিলো তাই তাদের আমার তাদের নিয়ে কোনোরকম উৎসাহই ছিলো না। ওরা বোকার মতন না খেলে দিনরাত গান শুনতো আর আড্ডা মারতো। আমাদের ওদিকে ঘেঁষতে অব্দি দিতোনা। আমরাও থোড়ি পাত্তা দিতাম। মা মাসি জ্যাঠি দিদিদের আলাদা দল ছিলো ওদিকেও যেতাম না কি বকতে পারে বাবা। বাবা কাকারা কোথায় থাকত কে জানে এমনিতেই বাবাই এর সাথে আমার যোগাযোগ ওই রাতের বেলা গরম রসগোল্লায় আর সকাল বেলা আপিস যাবার সময় বাবাই এর পাত থেকে এক গাল খাওয়ায় ও একখানা করে লাল নোট ( দু টাকার নোট, পাঁচ টাকার নোট দিতে গেলেও আমি দুটাকাটাই নিতাম ওই লালের মোহে!!) পাওয়ায়। পূজোর সময় সে ভদ্রলোককে দরকার পড়তো খালি ক্যাপ ফুরিয়ে গেলে। এমনিতে ওই চতুর্থী বা পঞ্চমীর দিন মেজদাদা বন্দুক ক্যাপ সব এনে দিতো কিন্তু সে তো কেমন করে জানি এক দিনের মধ্যেই নেই হয়ে যেত।

ঠাকুরের গায়ে গর্জনতেল মাখানো আর ডাকের সাজ হতো পঞ্চমীর দিন। চোখ আঁকাও ওইদিন রাতেই হতো বোধহয়, তারপর তো ঘিরে দেওয়া হত বোধনের আগে দেখতে দেওয়া হত না। কিন্তু ওই যে ফিনিশিং টাচটা দেওয়া হত ওই সময় আমরা সবাই হাঁ করে বসে থাকতাম আর আমাদের এক্সপার্ট কমেন্ট দিতাম। এবারের অসুরটা কেমন রোগাটে হয়েছেনা? ক্লাবের ঠাকুরের ময়ূর টা দেখেছিস যেন সব পালক ঝড়ে যাবে এক্ষুনি। আর সাপটা আমাদের ঠাকুরেরই সেরা। সিংহটা বেশী ভালো হয়েছে না ইঁদুর সে নিয়ে আমাদের খুব গন্ডগোল হতো। কেন জানিনা দুগগা ঠাকরুন ছোটদের কাছে তেমন ইয়ে পেতেন না তার অস্ত্র শস্ত্র বরং বেশী আকর্ষণীয় ছিলো। একবার মহালয়াতে হেমা মালিনী দুর্গা হয়েছিলো, আমাদের জ্বলে গিয়েছিলো দেখে। মানে এটা একটা কথা হলো হ্যাঁ সারাক্ষণ নেচে যাবে সে আবার কি। একটা যুদ্ধ নেই ভালো গল্পো নেই ভালো!! যত্তসব!! এর চেয়ে সেই যেবার কুমিরে মহিষাসুরের বাবা না কাকা কাকে টেনে নিয়ে গেছিলো সে বরং ঢের ভালো হয়েছিলো। এরকম সব কর্মব্যস্ত ভাবেই পঞ্চমীর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামত। বড়দের অত্যাচারে অত্যাচারিত আমরা ঝুলন্ত হয়ে ( মানে হেঁটে স্বেচ্ছায় তো আর যেতাম না ) ঘরে ফিরতাম

Monday, August 29, 2016

ছোটবেলার হিজিবিজি



কোনো কিছুর জন্যই নির্দিষ্ট অপেক্ষা ভারী চমৎকার হয়। মানে যে জিনিস আসবেই জানি বা হবেই জানি শিগগির সেরকম জিনিস এর অপেক্ষা। যেমন পূজোর মাস খানেক আগে থাকতে পূজোর অপেক্ষা। পূজো আসছে বলে আমার ছোটবেলার গল্পো মনে পড়ছে এবং শোনাতেও -_- ^_^ । আমার ছোটবেলা কেটেছে গাছপালা পুকুর মাঠ মানুষ জন দিয়ে। তাই বোধহয় এ সবকটা আমি আমি এখনো এত ভালোবাসি। হ্যাঁ ইনক্লুডিং মানুষ। আমি ক্যাবে উঠি কি ফেসবুকে বকবক করতে আমার আপত্তি নাই।জানতে শুনতে দেখতে আমার ভারী ভালোলাগে।

ছোটবেলার কথা বলছিলাম না। আমার ছিলো মস্ত যৌথ পরিবার। জ্যাঠা জ্যেঠী কাকা কাকি দাদা দিদি ভর্তি। আমার বেশ মনে আছে আমাদের পেল্লায় একটা হাঁড়ি ছিলো ভাতের। মাঠে কাজ করতে আসা বা এদিক সেদিক সব মিলিয়ে জনা ত্রিশ জনের রান্না হতো। শুনতে ভালো বোধ হলে কি হয় খানিক বড় হয়ে টের পেয়েছি সে কি ঝঞ্ঝট এর জিনিস। তবে সে এক মস্ত ব্যাপার বাপস। ভাতের ফ্যান গালার জন্য একটা নির্দিষ্ট উঁচু জায়গা থাকত, দুজন মিলে ওই মস্ত হাঁড়িটা নিয়ে হেলিয়ে দিতো কি এক কায়দায়। তারপর একটা জাঁতাও ছিলো আর শিলনোড়াটা একটা ফিক্সড জায়গায় বসানো থাকত। না দুটো শিলনোড়া থাকত একটা আমিষ মানে পিঁয়াজ রসুন বাটা হবে একটা নিরামিষ পোস্তো ফোস্তোর জন্য। আর আমাদের জেলে একজন নির্দিষ্ট ছিলো, মানে সবারই থাকত কিনা জানিনা তবে আমাদের বামুন, নাপিত আর জেলে নির্দিষ্ট ছিলো। নাপিত মানে হরেনকাকা আসত আমাদের ন্যাড়া করে দিতে -_- । তবে মাছধরাটা একটা বিরাট ব্যাপার ছিলো। ভোরবেলা শংকর জেলে মানে আমার শংকর কাকা আসত, হাঁক দিতো, গ্রামের দিকে সকাল তাড়াতাড়ি হয়। লোকজন সব জড়ো হতো। তারপর সেই মাছ ভাগ বাটোয়ারা করে কেটে ধুয়ে প্রত্যেকের জন্য ঠিক করা.... সে এক যজ্ঞ্যি!! ওই সময় মা জ্যেঠিমাদের কাছে গেলে কপালে দুক্ষু থাকত। মাছ ফাছ তাই মোটেও রোজ ধরা হতো না। ওই বিশেষ দিনেই। বাকি কেনা। ছোটবয়েসে অত কিছু বুঝতাম না অবশ্য। বাড়ির ছোট ছিলাম, আমার বড় জ্যেঠু ছিলেন আমার দাদুর মতন, মানে আমার বড় জ্যেঠতুতো দিদি আমার মা এর বয়েসি ফলে আমার ঠাকুমা ঠাকুর্দার অভাব আমার বড় জ্যঠু যাঁকে বাবুজি বলতাম তিনি আর বড় জ্যেঠিমা মেটাতেন। আমি ইশকুলে ভর্তি হবার আগে আমার বড় জ্যেঠিমার কাছে দুপুরে গপ্পো শুনতে যেতাম। সব রূপকথা আর ভূত। জানলার বাইরে একটা আতা গাছ ছিলো, সারা বছরে একটা বা দুটো আতা হয়ত ফলত আর পাশেই ছিলো একটা জামরুল গাছ। কি মিষ্টি জামরুল ফলত। পিছনের পুকুর জাম গাছ জামরুল গাছ আর কি কি সব গাছ ছিলো আর ওইটেই ছিলো আমার কল্পনার রাজত্ব। ওই পুকুরটায় ডুব দিলেই আমি জানতাম সেইই পাতালপুরি পৌঁছব। রাজকন্যার থেকে ও বয়েসে তলোয়ার বেশী ইন্টারেস্টিং ছিলো।আমাদের পাড়া মানে আমাদের জ্ঞাতিরাই। সেইরকম সম্পর্কিত এক দাদা আমায় ধনুক বানিয়ে দিতো। এক কাকা আমায় গুলতি ছোঁড়া শিখিয়েছিলেন সে অবশ্য অনেক পরে, আরও বড় হয়ে। শীতকালের সকালে আর সন্ধ্যেবেলা আমাদের বাড়ির সামনে সবাই আগুন পোহাতো। আমিও যেতাম। আর বাবুজি আমায় নিয়ে মটরশুঁটি ক্ষেতে নিয়ে যেত আমিও তছনছ করতাম সারা মাঠ দাপিয়ে বেরিয়ে। আর ফেরার সময় একটা বাপুজি কেক বরাদ্দ ছিলো ^_^। কার কোলে পিঠে চড়ে থাকতাম সারাক্ষন কে জানে তবে মাকে আমার খালি রাতেরবেলা ঘুমোতে যাবার সময় ছাড়া লাগতই না।

আমাদের দক্ষিনবাড়ির যে মাঠটা, ওই যে তারপর যে খালটা দেখা যায় ওপাড় টা কত কি যে হতো! আমার খাল পেরোনো মানা ছিলো একা একা নইলে আমি জানি ওখানে সাপের মাথার মণি ঠিক পাওয়া যাবে খুঁজলে। আর সেই যে মধুসূদন দাদার ভাঁড় সেও কি এখানে এত মেলা লোকের মধ্যে মিলবে নাকি। ওখানেই পাওয়া যাবে।

গুপী বাঘার ক্যাসেট বাজতো ছুটির দিন দুপুরে শুনতে শুনতে বা আনন্দমেলা কি অন্য কোনো বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়তাম বা জেগে থাকতাম।বিকেলবেলা ফুটবল ম্যাচ থাকত। রোদ না পড়লে বেরোনোর অনুমতি ছিলো না, মা এর নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে টের পেলে এক পা এক পা করে বেরোতে গেলেই মা উঠে পড়ত আর আমি বাথরুম যাচ্ছি বলতাম। ঝাঁ ঝাঁ দুপুরের প্রতি টান কি তখন থেকেই কি জানি। আমাদের টিউবওয়েল এর হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতাম, খিড়কির দরজা বন্ধ থাকত তাই পিছনের পুকুরের দিকে যেতে পারতাম না। কিন্তু আমাদের বাড়ির পিছোনে আর একটা দরজা ছিলো, গরু গুলো কে ওই রাস্তা দিয়ে বের করা হত তা সবাই আমায় গরু বলত বলেই বুঝি ওই দরজার প্রতি টান ছিলো, ওখান থেকে বেরিয়েই আমতলা, গরুগুলো ওখানে বাঁধা থাকতো, ফোঁস ফোঁস নিশ্বাস ফেলত। ওদের মধ্যে একটা একটু শিং নেড়ে তাড়া করত বাকি সবকটা শান্ত মনে জাবর কাটত। আমতলা পেরোলেই ইঁটপাঁজা, ওইখানে সাপের খোলস মিলত কিন্তু ওই ছায়া ছায় জায়গাটা আমার ভারী পছন্দ। ওইটে ছিলো আমার রাজপ্রাসাদ, আর খড়ের গাদাটা আমার দরবার। ভারি কুটকুটে আমার সিংহাসন কিন্তু সিংহাসন তো বটে।

রথের দিন আমাদের ঠাকুরের কাঠামো পূজো হত। তারপরেই সেই ম্যাজিক অপেক্ষা। রোজ রোজ ইশকুল যেতাম আর দেখতাম খড়ের ঠাকুরের গায়ের মাটি পড়লো, মুণ্ডু আলাদা করে হবে। দো মেটে হবে এবার। আকশের রঙ এর খেয়াল করিনি তবে মেঘ গুলো বেজায় ফূর্তি করতো। আমিও গাড়ি দাদা নিতে আসার আগে এক কলি হিন্দি গান গেয়ে নিতাম। আমাদের বাড়িতে হিন্দি গান গাওয়ার অর্থ ছিলো সে বখে গেছে। মেজদাদা জানলে তো হয়ে গেলো, স্কেল দিয়ে দেবে হাতের মধ্যে। হ্যাঁ মারধোর করার অনুমতি নিতে হতনা কারোর থেকে তবে মারলেই কাকা(আসলে জ্যাঠা আমি কেন জানিনা কাকা বলি) বা কাকি বা ফুলদিদি বা খুকুদিদি বা কেউ না কেউ এসে বকে দিতো আর মেজজ্যাঠা গুড়কাঠি কিনে দিত। গুড়কাঠি কি ভালো খেতে ^_^।

তারপর একদিন প্যান্ডেল বাঁধা শুরু হতো। আমি ইশকুল থেকে ফেরার পর খেলতে যাওয়া ফেলে ঠাকুর গড়া আর প্যান্ডেল গড়া দেখতাম। তারপর চব্বিশ বাইশ করতে করতে মহালয়া চলে আসত। তারপর...

Tuesday, August 9, 2016

ঘোরাঘুরি ( নিউ মেক্সিকো এবং অন্যান্য )(2)

পৌঁছে দেখি দিদিমা দিদিমা চেহারার একজন রিসেপশন এ বসে আছেন। চেহারার সাথে স্বভাবে মিল আছে দিব্যি। সেদিন দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কথা হয়নি তার সাথে , পরের দিন ম্যাপ নিয়ে ঐ বুঝিয়ে দিলো। আমাদের যাওয়ার কথা সেদিন মেসা ভার্ডে( mesa verde ) পার্কে।  বললো পার্কের মধ্যে মামা থাকে তাই খামোখা যেন স্পিডিং টিকিট না খাই।
মেসা ভার্ডেতে আমেরিকার আদি অধিবাসীরা বাসকরতো । পাহাড়ের উপরে বা কোলে ঘরবাড়ি বানিয়ে   আমার ভারী অবাক লাগছিলো ওরা যে সময়কালটা বলছিলো সব চেয়ে উন্নতি করেছে বললো সেটা হলো ঐ ১১০০ থেকে ১৩০০ মতো সময়ে।  ঐ সময়টা ভারতবর্ষ তখন তার সংস্কৃতি , শিল্প সব কিছুতে মাথা ছাড়িয়ে লুটেরাদের কবলে পড়ে  গেছে। আর এরা তখন এই সব তৈরি করছে।






অবশ্য স্বাভাবিক। ক্লিফ প্যালেস বলে এই জায়গাটায় যে লোকজন থাকত তাদের  মেয়েদের গড় আয়ু ছিল ২৪-২৮।  আর ছেলেদের ২৮-৩২।  কারণ সিম্পল।  ঐ পাহাড়ের মাথা থেকে জল নিয়ে এসে , ভুট্টা ভেঙে কিংবা পাইন কোন ভেঙে খেয়ে বাঁচার জন্য ২০০০ ক্যালোরি মিনিমাম লাগে সেখানে ছেলেগুলোর জুটতো খুব বেশি হলে ৯০০ ক্যালোরি।  ব্যাস গল্প শেষ।  আর মেয়েগুলো তো ১৩-১৫ বছর থেকেই বাচ্ছার মা হতে শুরু করত।  তারপরে আর ২৫ এর বেশি বাঁচবে কি করে। আর্ট তো অপচয় ছাড়া হয় না।  খালি খাওয়া বেঁচে থাকার সংগ্রামে আর্ট হবে কি করে।
ওখানে একটা বাঁশের মই বেয়ে উঠতে হতো উপরে , আর সেই নিয়ে এদের আদিখ্যেতা দেখে কি বলব আর।   ৫০০ বার সাবধান করছে যার হাইটে ভয় সে যেন না আসে , জল খায় বেশি করে ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় এদের আমাদের দেশে পাঠিয়ে দিই , ট্রেনে ঝুলতে ঝুলতে যাওয়া কি লাফিয়ে বাসে চড়া এইসব কদিন করলে যদি একটু নিয়ে কমে আর কি।   রেঞ্জার মেয়েটি হাসিখুশি ভালোই ছিলো। কিন্তু সে ভারী ইয়ে মানে বললো যে আমার একজন ভলেন্টিয়ার রেঞ্জার চাই যে আমার সাথে সবার আগে উপরে উঠবে।  এবং অবশ্যই রেস্পন্সিবল এডাল্ট চাই।  আমি নিজেকে যথেষ্ট দায়িত্ববান বলেই মনে করি, না করারই বা কি। মদ খেয়ে গাড়ি চালাই না , স্পিড লিমিট +১০ এর বেশি ছাড়াই না (সে অবশ্য আপনারা বলতেই পারেন যে পুলিশের ভয়ে ) কিন্তু জিলিপির দোকান উপেক্ষা করে চলে কি আমি যাইনা , স্রেফ ভুঁড়ির কথা ভেবে।  তাছাড়া দায়িত্ব নিয়ে আমি নিজের প্লেট এর তন্দুরি শেষ করে অন্য লোকেরটা খাই , যাতে নষ্ট মস্ট না হয়।  তাই আমি তার সহায়ক রেঞ্জার হতে আগ্রহী হলাম।  কি বলব মশাই , আমায় বললে আমি এডাল্ট একজন কে চাই , তোমার সাথে যিনি  আছেন তোমার বাবা বুঝি , তা যাও বাবার সাথে দাঁড়াও, একলা এসো না।  রাগ হয় কিনা , অ্যাঁ এত বড় অপমান।  যা যা আমার দরকার নেই তোর সঙ্গী হওয়ার।


যাই বলো বাপু অদ্দিন আগে তো ভিড় ভাট্টা কম ছিলো খামোখা অত উপরে উঠে কষ্ট করার কি যে দরকার ছিলো!!

 যাই হোক এর কাছের শহর হলো ডিউরাঙ্গ। ছোট্ট ছিমছাম শহর।  পাশ দিয়ে নদী বইছে , ছু ছু ট্রেন মানে কয়লার ট্রেন যায় একটা।  নদীর ধার জলের শব্দ , ট্রেনের হুইসল মনে হয় এখানেই থেকে যেতাম যদি।  তারপরেই অবশ্য ছটপট করে প্রাণ। কফি চাই। কফি খেয়ে একটু জিরিয়ে ফের রওনা। পরের গন্তব্য আমাদের সান্টাফে। ছোট্ট স্প্যানিশ উপনিবেশের স্মৃতি। পৌঁছতে রাত হবে। সান্টাফে  নিয়ে আমার খুব আশা ভরসা ছিলো এমন না কিন্তু এমন চমৎকার লাগলো শহরটা কি বলব।  স্প্যানিশ আদলে তৈরী ঘর বাড়ি গির্জা। চমৎকার লাগে সব মিলিয়ে ঘুরে বেরাতে।তেমন ভিড় ভাট্টা নাই।  শহরটা পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখছি হটাৎ দেখি একদল মানুষ এসে নাচ গান করে জায়গাটা সরগরম করে দিলো। একটা ভুট্টা না কি যেন খেতে খেতে নাচ গান দেখতে শুনতে বেশ লাগছিলো।










বালি সাদা হয় এ জিনিস ভাবলে অবাক লাগে বইকি। আর আমরা পোঁছেছি সূর্যাস্তের ঠিক আগে আগে। ধূ ধূ সাদা বালির মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে আছি , সূর্য্য অস্ত যাচ্ছে , লাল রং ছড়াচ্ছে সাদা বালিতে।   অদ্ভুত সুন্দর একটা দৃশ্য। অনেক অনেক খন পর পার্ক বন্ধ হবার হাঁক দিতে আমরা বেরোলাম ওখান থেকে।





পরদিন সকালে আবার গেছি , কিন্তু উল্টো দিকের রাস্তায় যে এমন বিপদ  জানতো।  নিউ মেক্সিকো বর্ডার সিটি, তাইজন্য বর্ডার পেট্রোলিং পুলিশ চেক করছে সব গাড়িকে। আমরা দুজন কেউই পাসপোর্ট ক্যারি করছিলাম না এবং যেহেতু আমরা সিটিজেন না এখানকার তাই নাকি আমরা সবসময় পাসপোর্ট ক্যারি করতে বাধ্য। বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করছে। কারণ আমাদের গাড়ি সাইড এ দাঁড়াতে বলেছে। জেলে পুরে দেবে নাকি? মোবাইলে টাওয়ার নেই. সফট কপিও ডাউনলোড করতে পারবো না।  কি রে বাবা আসে না কেন।  গাড়ির এসিও অন করার সাহস হচ্ছে না।  কারণ গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট করলে যদি ভাবে পালাচ্ছি।  ভাবছি কাকে আবার কল করে বেইল নেব। অতঃপর একজন মুশকো লোক এসে গম্ভীর মুখে ড্রাইভিং লাইসেন্স ফেরত দিয়ে গেলো।  যাক এ যাত্রায় জেল এ ঢুকতে হলো না !!



ফেরার সময়টা আমিই চালালাম পুরোটা। ভারী মজা পেয়েছি।  কারণ সত্যি বলতে কি একটানা ৫৬০ মাইল ড্রাইভ আমি আগে করিনি আর সৌরভদা ভরসা করে না ছাড়লে হয়তো হতোই না।  নিউমেক্সিকো রুক্ষ প্রদেশ আর কলোরাডো সবুজ ফলে যেই নিউ মেক্সিকো পার হয়ে কলোরাডো ঢুকি যে ফিলিংটা হয় তা হলো , ট্রেন এ করে বিহার থেকে পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় প্রবেশ করার। পাহাড় বাঁক সবুজ গাছ দেখে স্বস্তি ফেরে। না ফিরলে যে পরের বার বেরোনো যাবে না। (শেষ)

*********************************************************************************
এই লেখাটা অনেক দেরি করে দিলাম তাই দুঃখিত যারা অপেক্ষা করছিলেন/করছিলে।  নতুন লেখা আসবে( ইয়েলোস্টোন ঘুরতে গেছিলাম আর সে গপ্পো শোনানোর জন্য প্রাণ চটপট করছে ) তাই এটা শেষ করতেই হতো এবং শেষ হলো :)

Monday, July 4, 2016

ঘোরাঘুরি ( নিউ মেক্সিকো এবং অন্যান্য )

মাঝে মাঝে যে প্রানটা কেন ছটপট করে ওঠে বোঝা যায় না।  ভুল বললাম, দিব্ব্যি বোঝা যায়। আমরা কারনটা এড়িয়ে যাই। নিজেকে ঠকানো এতই সোজা নাকি! ব্যাস তখন তামাম দুনিয়ার সব ভালো জিনিসেও সুখ আসে না। তা আমি নিজেকে ঠকাচ্ছিলামনা , আমি জানতাম আমার মন কেন উচাটন। আমার একটা ঘুরতে যাওয়ার প্রয়োজন। নিজের মত করে। কিন্তু আমার নিজের গাড়ি নেই এখানে, আমি যখন তখন হুটহাট বেরোতে পারিনা। আর রেন্ট নিয়ে বেরোনো যায় কিন্তু সবাই মিলে বড়ই  হাঁ হাঁ করলো। কারণ তারা সুহৃদ , আমার যেহেতু প্র্যাকটিস কম তাই এতো দূর যাওয়ার রিস্ক নেওয়াটা মূর্খের এডভেঞ্চার। অবশ্য এডভেঞ্চার তথাকথিত মূর্খেরাই করে। যাই হোক আমার তো সে ভয়ানক অবস্থা।  মানে ঠিক বোঝাতে পারবনা কেমন কিন্তু আমার খালি মনে হচ্ছিলো আমি আটকা পরেআছি । রোজ অফিসে কাজ করতে করতে , খেতে বসে , ঘুমতে যাবার আগে একলা হাঁটলে স্বপ্ন দেখছি আমি লং ড্রাইভ এ বেড়িয়েছি। সামনে লম্বা একটা রাস্তা , আমি চলেছি। তা অবশেষে আর এক মক্কেল জুটলো।  লং উইকেন্ড এ ঘুরতে যাব। এবং কথা হলো বেশিরভাগ সময় গাড়ি আমি চালাবো। যাব ডিউরাঙ্গো , মেসা ভার্ডে , সান্টা ফে আর নিউ মেক্সিকো।
শুক্রবার তায় লং উইকেন্ড। বিকেল বিকেল বেরোতে পারব আশা ছিল। তা না করেও বা উপায় কি , ডিউরাঙ্গো পৌঁছতে সাত ঘন্টা অন্তত লাগবে।  ১২টায় না পৌঁছলে পরের দিন সকালে বেরিয়ে ঘুরতে যাওয়া চাপ। তো গাড়ি তুলে , মালপত্তর চাপিয়ে সওয়া চারটে নাগাদ বেরোনো হলো।  শুরুটা বন্ধুটা করলো।  খানিক যেতে না যেতেই দেখি বৃষ্টি শুরু হয়েছে , কেস করেছে।  বৃষ্টি দেখতে ভালো , ভিজতে ভালো , চাষে ভালো কিন্তু বেড়ানোর সঙ্গী হলে মুশকিল। এখানে মেঘ গুলো ছোটবেলায় দেখা কার্টুন এর বা ছবির বই এর  মেঘ এর মতন। মানে এই  একটা মেঘ কালো করে বৃষ্টি ঢালছে ১০মাইল পরে সেই মেঘের দম ফুড়ুৎ , সে জায়গা হয়তো খটখটে। বেশ জিপসি জিপসি ভাব আছে , আমাদের মতন দলবল নিয়ে সংসার করা টাইপ না।  তাই কিঞ্চিৎ ভরসা ছিলই।  তাই হলো। ঘন্টা খানেক পর আমি যখন শুরু করলাম দেখি দিব্যি মেঘ গুলো নিজেদের মধ্যে খুচরা আড্ডা মারছে আর এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।  একটু আগেকার মুখ গোমড়া করা কি ঝগড়াঝাটির লেশ নেই।  সোজা রাস্তা , দুপাশে খোলা মাঠ আর দূরে দেখি একটা চমৎকার রামধনু।  অরোরা বেরিয়ালিস টাইপ দেখতে রামধনুটা ( ইয়ে মানে অরোরা বেরিয়ালিস আমি দেখিনি , কিন্তু ঐ   রামধনুটার নাম অমনিই মনে এসেছিলো কেন কে জানে। )





এই রামধনুটা খানিকটা আমাদের সঙ্গ দিলো, তারপর তার চা খাওয়ার সময় হতেই ,সূর্য্য কে হোস্ট এর ভূমিকা দিয়ে ধাঁ। সূর্য্য এত চাপ নেয় না , ব্যস্ত মানুষ থুড়ি সূর্য্য স্র্রেফ বলে দিলো বাপু , আমার সাথে এলে অত রঙের খেলা দেখতে পারবনা এখন , স্রেফ আমার পেটেন্ট গোধূলি দেখাবো , কেমন করে টুপ করে সন্ধ্যে হবে তা দেখবে , and that's it .আমার তো তাতে আপত্তি নেই, কখনো মেঘেদের হুল্লোড় , কখনো ঝগড়া , কখনও রং বেরঙের নক্সা এই দেখবো বলেই তো বেরিয়ে পড়তে চেয়েছি।




এই খানে রাস্তাটা সিঙ্গল  লেন। তাই ওভারটেক করতে হলে নির্দিষ্ট জায়গায় , গাড়ি আর স্পিড বুঝে করাই দস্তুর।  তাই করছিলাম , খালি একটা গাড়ি খুব জ্বলছিলো , ঠিক জায়গা গুলো স্পিড বাড়াচ্ছিল শেষ মেস ওদিকে গাড়ি নেই দেখে ,যে জায়গায় ওভারটেক করা যায় না ( মানে সলিড লাইন রয়েছে)  তেমন জায়গায় স্পিড তুলে সামনেরটাকে কাটালাম।  পাশ থেকে সৌরভডা হাঁ হাঁ করছে , "কি করিস কি করিস, ভাই তুই আজ টিকিট খাবি" ইত্যাদি উপেক্ষা করেই।  তারপর তাকে পার করে হাসি এবং ঠিক একইরকম ভাবে তাকে জ্বালানো।



একটু পর গাড়ি পাহাড়ি রাস্তায় পরলো। এখানে বলা ভালো পাহাড়ি রাস্তা মানে দাজির্লিং এর ঐ ভয়ানক রাস্তার মতন মোটেও না , তাহলে আমি হয়ত পারতাম না।  কিন্তু এটাও বেশ সরু, বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার।  অন্ধকার নেমে আসছে দ্রুত । অসুবিধে হচ্ছিলো কিন্তু চালাতে পারছিলাম । স্পীড কমে গেছিলো , পিছনকার সব গাড়ি সুযোগ পেলেই পেরিয়ে যাচ্ছিল তবে তাতে কি , পাশের ঝুপ্সি গাছ , আবছা হয়ে আশা পাহাড় , অঝোর বৃষ্টি সঙ্গ দিচ্ছিলো , চ্যালেঞ্জ দিচ্ছিলো কিন্তু সে চ্যালেঞ্জ অনেকটা ছোটো বেয়ে প্রথম সাইকেল কিংবা সাঁতার শেখার সময় দাদারা যেরকম দেয় , শিখতে পারার জন্য চ্যালেঞ্জ। আমি এগিয়ে চলছিলাম।
মাঝে একবার তেল নিতে থামা হলো।  তারপর হোটেলে বলে দেওয়া হলো আমাদের দেরি হবে। সাড়ে ১২টার সময় পৌঁছলাম ডিউরাঙ্গো।  (ক্রমশঃ )