Wednesday, April 21, 2021

নয় পাহাড়ের উপত্যকায়(দুই)

 কেইবুল লাম জাও ন্যাশনাল পার্ক লোকটাক লেকের এক অংশেই। পৃথিবীর একমাত্র ভাসমান ন্যাশনাল পার্ক যেখানে সাংহাই হরিণ থাকে। সাংগাইকে নাচুনে হরিণ বলে, আসলে ওই বায়োমাসগুলোর উপর দিয়ে ওরা যখন দৌড়ে যায়,  সেই তালে নীচের জলে ধাক্কা খায় বায়োমাসগুলো আর নাচের ছন্দ বলে ভ্রম হয়। এই হরিণগুলো একসাথে থাকে আর বাইচান্স মানুষে ছুঁয়ে দিলে (মানে মানুষের পাকামির তো শেষ থাকেনা, তাকে গুনে গেঁথে দেখতে হবে, জানতে হবে  বাকি সব প্রাণী কোথায় খাচ্ছে কী খাচ্ছে, কিভাবে মৈথুন করছে, তাই কলার লাগাতে যায়। এবার এটা লিখতে লিখতেই ভাবছিলাম, জানতে চাওয়া দোষের বলা যায় না, এদিকে জানতে গিয়ে প্রাইভেসিতে হাত দিচ্ছি তাও তো মিথ্যে না!), তাদের আর দলে ফিরিয়ে নেয় না। তখন তারা একা হয়ে যায়; একঘরে হয়ে যাওয়া সেই হরিণ মনের দুঃখে আত্মহত্যা করে। কোন জায়গার বায়োমাস এক মিটার অব্দি যায়নি,  সেটা তারা ভালোই জানে, সেইখানে গিয়ে ডুবে যায় ইচ্ছে করে। মানুষ নাকি সামাজিক প্রানী! একে মারছে, ওকে কাটছে, এই জাত ওকে ছুঁচ্ছে বলে পিটছে, ফুহ! 






বনের মধ্যে তখন রোদ এসে পড়ছে দূরের ঘাস জমির উপর, খালের জলে দুটো নৌকা বাঁধা নীচে, একটু আগে টেলিলেন্স দিয়ে সাংগাই হরিণ দেখা হয়েছে,প্রাথমিক উত্তেজনা থিতিয়ে এখনাবার সব শান্ত। জঙ্গলের অদ্ভুত একটা রূপ হয়, তাকিয়ে থাকলে ঝিম ধরে, ইচ্ছে করে হেঁটে বনের মধ্যে দিয়ে গাছেদের সাথে আলাপ করে আসতে। নৌকায় চড়ে একটু চুপ করে ভাসমান মাটি, গাছেদের, পাখিদের আলাপ শোনার উপায় অবশ্য রইলো না। বনকর্মীটি কথা বলতে ভালোবাসেন। সাধারণতঃ দীর্ঘদিন প্রকৃতির কাছে সমর্পিত অবস্থায় থাকলে কথা বলা কমে যায়, কিন্তু এর অল্প বয়স, হয়তো এখনো অতদিন এই জঙ্গলে নেই। সে খুব উৎসাহে বলতে লাগলো,  মনিপুরে মেয়েদের ডানকানে ফুল থাকলে তাকে এনগেজড বলে বুঝে নিতে হিয় আর বাঁ কানে ফুল থাকলে ফাঁকা আছে বলে ভাবা যায় ইত্যাদি প্রভৃতি৷ একেকটা হরিণের ওজন ১২০ কেজি অব্দি হতে পারে,তারা লাফিয়েও ডোবে না যখন আমিও নামি একটু,  ডুবে যাবো না আশা করা যায়! দিব্যি খানিক তুড়ুক তুড়ুক করে লাফিয়ে নেওয়া গেলো। একটা তেত্রিশ বছরের দামড়া লোক লাফিয়ে এমন খুশী হতে পারে তা দেখে লোকগুলো অবাক হয়েছিলো হয়ত, হোকগে যাক। 

লোকটাক তো আর ছোটখাটো জায়গা হ্রদ না, তাই সামান্য উঁচু থেকে দেখলে ওই রিং রিং ব্যপারটা আরো ভালো বোঝা যায়। মাওপাকচুর বাড়ির কাছে ছোট্ট পাহাড়, বাপ্রে কী ফিটনেস ভদ্রলোকের এই বয়সেও! তরতর করে উঠে গেলেন। ওনার সাথে আমিও উঠলাম ঝোপঝাড় সরিয়ে,  পাথর ডিঙিয়ে। দলের বাকিরা আসেনি। পাহাড়ে উঠে নীচে তাকাতেই, "আরিব্বাস রে " বলে থমকে যেতে হয়। তখন সন্ধ্যে নামার আগে, সূর্য ঢলে গেছে খালি তার গোলাপী রঙটা সারা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে, সে রঙে হোলিখেলছে পাহাড়,  হ্রদ, বায়োমাসের রিং সব। ক্যামেরাটা বাগিয়ে কিছু ছবি তুললাম বটে তবে যা চোখে দেখলাম তার সিকিভাগও তুলতে পারলাম কই! চারিদিকে লোকটাকের রঙ্গোলী রিং, ঠিক মাঝখানে আমরা দাঁড়িয়ে, পাখির ডাক ভেসে আসছে ইতিউতি, দিন শেষের আলোয় ডুবে যাচ্ছে সবাই আস্তে আস্তে, অন্ধকার নেমে আসছে। সেই একদম নির্জন পাহাড়ে অন্ধকারে রাস্তা গোলমাল হয়ে যায়, নামার সময় সতর্কতা আরো বেশী রাখতে হয় কারন ঘাস শুকিয়ে হলুদ হয়ে থাকা রাস্তার পাশেই খাদ।পড়লে মরবো কিনা জানিনা, হাত,পা, কোমর না ভাঙার কারন নেই। সাপ খোপও থাকতে পারে হয়তো। কিন্তু সত্যি কথা বলতে সেই মুহূর্তে আমার এসব কিচ্ছু মনে আসছিলো না, একটু আগের পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা হাওয়া আমার স্থিতি দিয়েছে, শান্ত করেছে। সেই হাওয়া বুকে নিয়ে অন্ধকার জঙ্গলে হেঁটে যাওয়া ছাড়া আর কিচ্ছু ভাবা যায় না।দুশ্চিন্তা তো ছেড়েই দিলাম।



















এদের ভারী সুন্দর নিয়ম,  সূর্যের সাথে কাজ শুরু, সূর্য ঢলতে কাজ শেষ। প্রাচীন মানুষের নিয়ম। পাওয়ার কনজাম্পশন কত কম।  আমরা কেন যে ভালো নিয়মগুলো সব জলাঞ্জলি দিলাম! সন্ধ্যে নামতে একগাদা ঝিঁঝি ডাক শুরু করলো। আশেপাশের থেকে পোকা মাকড় এসে আসর জমালো। এঁরা সাতটার মধ্যেই খেয়ে শুয়ে পড়ে, আমরা থাকায় আট্টার সময় টেবিল সাজালো, সেও এখানে মেলা রাত। লোকটাক হ্রদের আড় জাতীয় মাছ,সবজি রুটি ডাল আর কালো চালের পায়েস, তোফা খেয়ে শুতে গিয়ে দেখি,  তাপমাত্রা বেশ কমেছে। মশারীটা মাওপাকচুবাবুর আলাদাই কেতের। ঝালর দেওয়া,  এদিকে ফুটোফাটা। সে মশারি খাটেই লাগানো থাকে অষ্টপ্রহর তাই কিঞ্চিৎ ধূলো টুলোও আছে। সে থাক। আপাতত কম্বল গায়ে এলার্ম সেট করা যাক। কাল সাড়ে চারটেয় নৌকা করে হ্রদে ঘুরতে যাওয়ার কথা। সাড়ে চারটে শুনেই সবাই কাঁইমাই লাগিয়েছে। না না অত সকালে উঠবো কি করে। দলে গেলে মুশকিল এইটাই। পাঁচটায় রফা হল, যদিও সেই নৌকায় উঠতে সাড়ে পাঁচটাই বাজলো। এরা অবশ্য খুবই সময়জ্ঞানী, সাড়ে চারটেতেই এসেছিলো।


মাথায় টোকা দিয়ে, বসার মাদুর বগলে নিয়ে লাইফ জ্যাকেট পরে (আমাদের মাঝির অবশ্য লাইফ জ্যাকেট ছিলো না),  ভোরের ঠান্ডা আলো আর হাওয়ায় একজনের বাড়ির উঠোন দিয়ে নৌকায় ওঠা গেলো। সালতির মতো নৌকা। বিদেশে কায়াকিং করে এরকম নৌকায়। দুটো সালতি জোড়া দিয়ে আমরা সাতজন বসেছি। বড় বড় ঘাসের মধ্যে দিয়ে, এগোচ্ছি। বাপরে কি ঠান্ডা রে বাবা। সূর্যের আলো এখনো নরম, পাশের পাহাড়ে ভরসা দেবার মতো করে এসে পড়ছে। লেকের মাঝে মাঝে বায়োমাস জমাট বেঁধে ফ্লোটিং চড়া বানিয়েছে, সেই চড়ায় একটা হোমস্টে আছে। আমরা দেখেছিলাম কিন্তু আপাতত সেটা চালু না। এদিক সেদিক পাক মেরে মেরে ঘুরতে ঘুরতে লোকটা নিয়ে গেলো আমাদের একটা ওরকম চড়ায়, গরমকালে এরা এখানে এসে থাকে। দেখতে তেমন উমদা হয়তো না, কোনোরকম বাঁশের ঠেকনা দেওয়া বাড়ি, ভিতরে একটা অস্থায়ী উনুন আর ঘাসের বিছানা। কি তু গরমের দিনে দুপুরে চারিদিকের ঠান্ডা বাতাসে আরাম যা হয়। ময়লা জামা, পরা উজ্জ্বল হাসি হেসে লোকটা তার সামার ক্যাম্প ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলো। তাতে এতটুকু মালিন্য নেই।

 


ফেরার সময়,  মনিপুরি ভাষা শেখাবার চেষ্টা করলো সে খুব, কিন্তু নেহাতই নিরেট মাথা আমাদের,  তেমন কিছুই মনে রাখতে পারিনি, তবে গানের গলাটা খাসা। ভারী সুন্দর গান শোনালো। যাদের বাড়ির উঠোন দিয়ে গিয়েছিলাম, ফেরার সময় ভালো করে দেখতে দেখতে আসছিলাম, মাওপাকচুর বাড়ির মতোই এই বাড়িটাও নিকোনো উঠোন, তারপর লাল মেঝের দাওয়া, চিনের চালের ঘর৷ লাল মেঝের দাওয়ায় ছেলে কাঁখে বসে একজন। বাড়িটার চারধারে ফুলের গাছ, একটা হাঁস বা মুরগী পোষার জায়গা ওদিকে। ভারী শান্তি লাগে দেখলে। ইচ্ছে হয় এখানেই থেকে যাই, লেকের জলে মাছ ধরবো, অবসরে বই পড়বো, আর মাঝে মাঝে পাহাড়ে উঠে বসে থাকবো। কিন্তু সেই শান্তির জীবন বাপার মতো মানসিক স্থৈর্য,  নির্লোভী ভাব, শান্তি খিয়ে বসেছি কবেই হয়ত।

নৌকা ভ্রমন করে ফেরার পর, মিসেস মাওপাকচু, দলের মেয়েদের মনিপুরী পোশাক দিয়ে সাজিয়ে দিলো,তারপর কালো চালের মিষ্টি লুচি, কলা, আর দেশী ডিম খেয়ে মাওপাকচুর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পালা। আজ আমরা যাবো অন্য দিকে, উখরুল। লম্বা জার্নি আছে সামনে, উখ্রুল নিয়ে আমাদের পড়াশোনায় বিস্তর খামতি ছিলো। বলছি। 

মিস্টার এন্ড মিসেস মাওপাকচু

(ক্রমশঃ)


Wednesday, April 7, 2021

নয় পাহাড়ের উপত্যকায়(এক)

দার্জিলিং এর লেখায় পজ পড়েছে এতো আরো কিছুদিন পজ দেওয়া যাক। এর ফাঁকে দুড়ুম করে মনিপুর থেকে ঘুরে এলাম, সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের ভাষা, লোকজন, সেসব ভুলে যাবার আগে লিখে রাখি। আমাদের বন্ধুদের গ্রুপে বেড়াতে যাবার কথা লেগেই থাকে, মিশর থেকে মিজোরাম আফ্রিকা থেকে আলাস্কা সব ঘোরার প্ল্যান হয়, তারপর পকেট, ছুটি সব আমাদের ফোঁস ফোঁস করে ভয় দেখায় আমরাও ল্যাজ গুটিয়ে কাজে বসি। তবু মাঝে মাঝেই ফোঁসফোঁস উপেক্ষা করেই কিছু জায়গা ফাইনাল হয়, টিকিট কেটে নেওয়া হয় ফস করে। অনেকে মিলে প্ল্যান করলে এইটা সব চেয়ে জরুরী।  ফস করে টিকিট কেটে নেওয়া। তাহলে সেটা আর কেউ ক্যানসেল করতে পারে না। না হলে কিছু না কিছু এসে দেখবে ভন্ডুল হবেই। এবারে শুরু হয়েছিলো আসাম দিয়ে। তারপর মেঘালয়, টিকিটের দাম দেখি আকাশ ছোঁয়া হয়ে গেলো আমাদের গ্রুপ কলের মাঝেই। গুগল কিছু ডেটা চুরি করে বটে!! শেষে আমরা কোড নাম দিয়ে প্ল্যানিং শুরু করলাম। মানে যাবো মনিপুর কিন্তু বলছি মুম্বই। সত্যি বলতে এরকম করে কাজ আদৌ হয়নি হয়তো, তবু তাও তাতেই আমাদের মনে ভাব খুব কিছু করলাম! নর্থ ইস্ট এতোটাই আনএক্সপ্লোরড যে অন্য দেশ ভাবে লোকে!  ওরকম প্রায়  অচেনা একটা জায়গা দেখার উত্তেজনা আলাদাই হয়। প্রায় অচেনা বলতে আমি বলছি কমন ডেস্টিনেশন না আর কি। আহা ভাবলেই ভাল্লাগে।  "বাবু পন্ড দেখো", বলে হাঁক পারা থাকবে না।  "এই বয়সেই কেমন স্মার্ট হয়েছে দেখো এই টুকু ছেলে"  বলে বাঁদরামি করা বাচ্ছার গর্বিত মা বাবার হাঁকডাক থাকবেনা, জোরে গান চালিয়ে শান্তি নষ্ট করা থাকবে না। সুতরাং একদিন সকালে এয়ারপোর্টে সাত মক্কেল জুটে গেলো এই "রোজ একই দিন রিপিট হচ্ছে যেন " থেকে পালাতে। দেখা হতেই এমন বুঁদ হয়ে আড্ডা মারতে লেগেছিলাম, দু ঘন্টা আগে এয়ারপোর্ট এসেও আমাদের হাঁকডাক করে ডেকে পাঠিয়ে তবে প্লেনের পেটে তোলে! 







ছোট্ট পুচকে একখানা এয়ারপোর্ট, কোলকাতার মতো গরম নেই, তবে রোদ বেশ চড়া।  বাঙালী খালি আমরাই নামলাম মনে হয়,  ইনার লাইন পারমিট করাতে হল কেবল আমাদেরকেই কিনা। সেও ভারী অদ্ভুত নিয়ম, নতুন করালে ১০০ টাকা আর রিনিউ করালে ২০০! মগ দেশ পাশেই বোঝা যায়! গাড়ি চলা শুরু, নতুন জায়গার হাওয়ায় মন চনমনে।রাস্তার পাশেই ফাঁকা মাঠ আর তারপরেই নীল পাহাড়। রোদের তেজ যেমন আছে, হাওয়ায় ঠান্ডা ঠান্ডা ভাবও আছে।  ত্রিশ চল্লিশ বছর আগেকার কোনো ছোট গ্রাম মতো যেন। টিনের চালের বাড়ি, অনেক বাড়ি দোকানের দেওয়ালও আবার টিনের। গায়ের উপর বাড়ি দেখে দেখে ক্লান্ত চোখে এতো খোলা জায়গা দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়।  ঝকঝকে নীল আকাশ, ছোট ছোট জন বসতি পেরিয়ে যাচ্ছিলাম। মূল রাস্তা থেকে ডানদিক নিল গাড়িটা, একটা পুরোনো বিষ্ণুমন্দির আছে এখানে। একটা দড়ি ফেলা আড়াআড়ি রাস্তায়, কী ব্যপার? দোলের রেশ শেষ হয়নি এখনো, চাঁদা তোলা হচ্ছে। এই চাঁদার ব্যপারটা তারপর ঘনঘন হতে থাকবে। এখানে ছেলের দল চাঁদা তোলে না, মেয়ে বউ এর দল তোলে, বাচ্ছা মেয়েরাও আছে কিন্তু বাচ্ছা ছেলেরা নেই। মেয়ের দল গাড়ি, বাইক সব থামায়, দশ টাকা বিশ টাকা বা খুচরো কিছু দিলে রাস্তা ছাড়ে তবে। চিত্রাঙ্গদা দড়ি ফেলে অর্জুনের পথ আটকেছিলো তবে!! বোঝো!এদ্দিন ভেবে এসেছি তীর ধনুক নিয়ে যুদ্ধ করেছে! ড্রাইভার ভালো জানেনা কোথায় যেতে বলছি, গুগলও ভালো বোঝে না, নেহাৎ সরকার বাহাদুর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রেখেছিলো তাই জানা গেলো এটাই সে প্রাচীন মন্দিরটা। ভেঙে চুরে গেছে, মন্দিরও বন্ধ। তবু, আমার অত খারাপ লাগছিলো না, ঝিরঝিরে হাওয়া আর কড়া রোদের এই কম্বোটাই আমার সেরা লাগে তার সাথে একগাদা পাখির ডাক, কিছু আমাদের রোজকার দেখা পাওয়া চড়াই আছে বটে, তবে আজকাল দেখতে পাওয়াই যায় না যাদের, সেই বুলবুলি, দোয়েল, ফিঙেও আছে। তুড়ুক তুড়ুক করে উড়ছে, দোল খাচ্ছে, মন্দিরের ছাদে বসে আড্ডা মারছে।দূরে পাহাড়ের কোল থেকে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে, চারপাশে ছোট জনবসতি, টিনের চালের ঘরের সব মিলিয়ে ভারী ঝিম ধরা শান্ত একটা পরিবেশ, টেনশন নেই, তাড়া নেই।

দোলের ছুটি এদের এখনো চলছে, আইএনএ মিউজিয়াম বন্ধ। খানিক আপশোষ তো হোলোই। সেই কবে একটা মেরুদন্ড সোজা লোক বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করেছিলো, সকলে একবাক্যে তাকে নেতাজি বলতে দ্বিধা করেনি। দ্বিতীয় জায়গা যেখানে স্বাধীন ভারতের পতাকা উঠেছিল সে জায়গা দেখতে না পেলে আপশোষ হবেই।লোকটাক হ্রদে আমরা মাওপাকচুর ঘর বুক করে রেখেছিলাম।সে কেমন ঘর জানিনা, তবে ভদ্রলোক ভারী অমায়িক এটা জানতাম। আমাদের ড্রাইভারবাবু তো কিছুই চেনেন না, মাওপাকচুর সাথে কথা বলে, গুগল ম্যাপের নির্দেশ শুনেও ভারী নাকানিচোবানি খেয়ে তিনি পৌঁছলেন। লোকটাক লেকের ঠিক পাড়েই পাহাড়ের কোলে ওনার বাড়ি। লোকটাক লেকের বৈশিষ্ট্য হল, বায়োমাস গুলো জমে জমে ভারী সুন্দর একটা রিং রিং আকৃতি করেছে সারা লেক জুড়েই। যেন কাদের রঙ্গোলী দেবার শখ হয়েছিলো। আলপনা বললাম না,  কারন সাদা রঙের না, সবুজ রঙের সে রিং। গাড়ি থেকে নেমে একটা উৎরাইতে নেমেই দেখি তকতকে লাল মেঝের মস্ত দাওয়া একটা বাঁধানো উঠোনের চারপাশে। উঠোনের মাঝে তুলসীমঞ্চ।  দাওয়ার এক পাশে মস্ত টেবিল চেয়ার পাতা কাঠের কাজ করা আর দাওয়ার ওইদিকে জাল বোনার সরঞ্জাম, চরকা এইসব। ছোট্ট একটা সুইফট বাসা বেধেছে দেওয়ালের গায়ে। দেখেই মনে এতো শান্তির একটা ভাব হয় সব অবসাদ কেটে যায়। তাই ঘরের বাথরুমে স্নানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে কি নেই তা নিয়ে কোনো অভিযোগই যেন আকার নেয় না। দোতলায় ছোট্ট একটা লাইব্রেরি আর ক্লান্ত হলে লেকের দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য জানলা। জানলা দিয়ে দেখা যায় ডিঙি ভাসছে একটা।  দুপুরে ঝকঝকে স্টিলের থালায়, স্টিলের ডেকচিতে সে আমাদের খেতে দিল। মনিপুরি স্টিকি রাইস, নিজের ক্ষেতের বাঁধাকপি, ডাল, দেশী মুরগি, আর জলপাই এর চাটনি। অন্যরকম স্বাদ, কিন্তু মিসেস মাওপাকচু রেঁধেছেন নিজেই, আর এত যত্ন করে খেতে দিয়েছেন মিস্টার মাওপাকচু,  সব মিলিয়ে ভারী আনন্দ হল খেয়ে। 

কি ভাগ্যিস এঁর ঘর বাথরুম আমাদের দলের মেয়েদের চূড়ান্ত অপছন্দ হয়েছিলো। মানে পুরো পরিবেশ নিঃসন্দেহে ভালো কিন্তু ঘরে ধূলো, কিংবা চানের জায়গা না থাকা বাথরুম তাদের স্বস্তি দেয়নি তেমন, ফলে আমার খানিক সুবিধেই হল। মানে খেয়ে উঠেই কেউ গড়াতে চাইলো না, ফলে আমাকেও তাড়া দিয়ে বের করতে হল না। আসলে আমি কোথাও বেড়াতে গেলে যতটা পারি বাইরে বাইরে কাটাতে ভালোবাসি, হোটেলে বসে থাকবো, কিংবা ঘুমোতে যাবো বলে পাহাড়ে উঠবোনা এ আমি ভাবতেই পারিনা তাই কিঞ্চিৎ লড়তে হয় সদলবলে কোথাও গেলে। সুবিধে হল, এই দলের সবার ধরন আলাদা হলেও সবারই মোটামুটি এমপ্যাথি কোশেন্ট বেশী। আমার তো মনে হয় আর কিছু না,  মায়া ব্যপারটা বড় জরুরী,  ওটা থাকলেই হয়তো আর্ধেক সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। (ক্রমশঃ)

Wednesday, March 31, 2021

অনেকদিন পরে পাহাড়ে (চার)

দাওয়াইপানি থেকে ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। রাস্তা বেশী না, তবু সেই টুকু রাস্তাও আমাদের পাশে পাশে সঙ্গ দিয়ে গেল কাঞ্চনজঙ্ঘা।  দার্জিলিং এই নিয়ে তৃতীবার আসা আমার। সত্যি বলতে এ আগে দুবার ঘুরে আহামরি আমার লাগেনি, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাইনি বলে না; বড় বেশী বাড়ি, বড় বেশী লোক যেন। প্রথমবার এসেছিলাম বন্ধুদের সাথে, ঝিরঝিরে বৃষ্টির সাথে এক বিকেলে আলাপ হয়েছিলো, কোত্থাও জায়গা না পেয়েউঠেছিলাম আস্তাবলের ওদিকের এক হোটেলে। সে একেবারে হোটেল ডিলাক্স টাইপ, পাশের ঘরে সব কছু শোনা যায়। পরের রাতটা অবশ্য সে সময় আমাদের জন্য খুউউউব ভালো হোটেলে কেটেছিলো। এখন খুঁতখুতানি বেড়ে গেছে কি? দুরাত হুরুম হারুম ছোটাছুটি করেই কেটে গেছিলো। আর একবার মা আর দিদিভাইদের সাথে, সেও ছিলো বর্ষার দার্জিলিং, সেবারেও মিরিক যাবার কুয়াশা আর মেঘ মাখা রাস্তাটা ছাড়া আর কিছুই তেমনঅনে দাগ কাটেনি। মেঘ মাখা পাহাড়ি গাছের ভীড়ে পাহাড় বড় অদ্ভুত সুন্দর লাগে। কী যেন রহস্য ঢাকা আছে ওইদিকটা, পা বাড়ালেই কোন অচেনা জগতে ঢুকে যাবো যেন, সে আমাদের সাধারন লাভ ক্ষতির জগতের বাইরে।বাকি দার্জিলিং বড় ঘিঞ্জি।

 

 শুনে মোহর বলেছিলো, "বেশ তো এবার আমার সাথে চলো, দেখাই যাকনা আমার প্রিয় শৈলশহরটা তোমার ভালো লেগে কিনা।"  আমরা উইকেন্ডটা এড়িয়ে ছিলাম ইচ্ছে করেই, লোক কম হবে। রাজভবনের পাশে গাড়ি দাঁড়ালো, আমি তো এর আগে রাজভবনের দিকটাতেই আসিনি! হোটেলের ঘরে পৌঁছে জানলার পর্দা সরাতেই কাঞ্চনঞ্জঙ্ঘা! আহা ঘরটাও ভালো, এ কদিন তো নিজেদের আনা চাদর বদলে থাকা হচ্ছিলো এখানে আর সে ঝামেলায় যাবার দরকার পড়লো না, ওরা চোখের সামনেই অন্য একটা ঘর রেডি করছিলো দেখে খানিক ভরসা মিলেছিলো। চান টান করে ইলেক্ট্রিক হিটেড কম্বল্রর তলায় পা গুটিয়ে বসে যা আরাম বাপরে বাপ।কিন্তু ঘরে বসে থাকতে মোটেও ভাল্লাগেনা। দার্জিলিংের আশপাশে কিচ্ছু দেখবো না এমনটাই ঠিক আছে। স্রেফ এদিক সেদিক খাবো, রাস্তায় রাস্তায় হাঁটবো, ভীড়ে কিংবা বাজারে। উইকডেজের বেলা,  তাই ম্যালের পিছনের রাস্তায় লোক নেই তেমন, এক দুজন স্থানীয় লোক পেরিয়ে যাচ্ছে, এক বুড়ি চা নিয়ে বসে আছে, যাকে আমরা রোজই পাক খাবার সময় দেখতে পাবো। দার্জিলিং মানেই ফেলুদা ফেলুদা গন্ধ এমন, ম্যালে এসে জানতে ইচ্ছে করে পশ্চিমদিক কোনটা, সকালে কোন বেঞ্চটায় রোদ পড়ে....সর্বোপরি সেই সময়কার দার্জিলিংটা কেমন ছিলো ঠিক? ভানুভবন তখন এরকম মাথা চাড়া দিয়ে সমস্ত ভিউ বন্ধ করে দেয়নি, ঘোড়ায় চড়া একটা থ্রিলিং ব্যপার ছিলো নির্ঘাত, বাঙালীর হাতে সময় ছিলো নিজেকে দেবার, সাতদিন দার্জিলিং শুনে অবাক হবার ব্যপার ছিলো না।

 

কেভেন্টারস আহ একেবারেই ফাঁকা। একটা স্থানীয় ছেলে ছোকরাদের দল বসেছে ক্লক টাওয়ারের  দিকটায় বাকি ফাঁকাই। কেভেন্টারাসের সুবিধে হল, মেনু ঠিক করার দরকার নেই, কী খাবো জানি। স্বাদ নিয়েও চিন্তা নেই, আবেগেই মোটামুটি ভালোলাগা স্থির হয়ে যায়, তা না হলে ছোটবেলার দুর্গাপুজোর সব স্মৃতি এত ভালো হয় কি? রেস্তোরাঁয় খাওয়া নিয়ে একটা কথা বলি, আমি আর মোহর যখন বিয়ের আগে রেস্তোরাঁয় যেতাম, মূল উদ্দেশ্য থাকতো সময় কাটানোর বয়সকালের প্রেম, চড়া রোদে মাইলের পর মাইল হেঁটে বেড়ানোর উৎসাহ বা ক্ষমতা আর ছিলো না। কিন্তু সমস্যা হত, খাবার এলেই আমরা একবার চুপ করে যেতাম, এবং মিনিট দশেকের মধ্যে প্লেট সাফ। নে এবার কত বসে থাকবি থাক! ফাঁকা কেভেন্টারস এর ছাদও তাই আমাদের বেশীক্ষন আটকাতে পারলো না। পর্ক প্ল্যাটার এর পর হট চকলেট,  কফি তাতেও না। শেষে নীচে নেমে আইস্ক্রীম নিয়ে হাঁটা দেওয়া ছাড়া উপায় রইল না। 



আগে দুবার দার্জিলিং এসেছি কিন্তু আমি চার্চটা দেখিনি। সত্যি! যদিও চার্চ বন্ধ ছিলো, কিন্তু বাইরে থেকে দেখতেও কম ভালো লাগছিলো না। নির্মল ঝকঝকে আকাশের গায়ে চার্চের টাওয়ারটা দাঁড়িয়ে ছিলো আরাম করে। চার্চের পাশেই পশ্চিমবঙ্গ ট্যুরিজমের হোটেলটা।আমরা জায়গা পেয়েছিলাম কিন্তু ঘর গুলো যতটুকু দেখেছিলাম ইন্টারনেটে কেমন কেমন লাগছিলো, ছাড়াছাড়া মাংসের ঝোল যেমন হয়...সরেজমিনে দেখতে গিয়ে দেখি পুরোনো দিনের এই বড় বড় ঘর, পুরোনো আসবাব, ফাঁকা ফাঁকা চারদিক। মন খারাপ করা যেন। সামনের লনটা ভালো, তবে সে বুড়োদের জন্য আর বাচ্ছাদের জন্য। চুপ করে লনে বসে থাকার মতো ধৈর্য্য কিংবা ঘাসে দৌড়ে বেরানোর সরলতা আমাদের নেই।  




তারপর ফের হাঁটা শুরু করলাম, আরো পিছন দিকে, রাজভবন পেরিয়ে গেলাম, কি একটা যেন পার্ক আছে, বড় বড় গাছ পালা ছাওয়া সেও পেরিয়ে গেলাম। ট্যুরিস্ট নেইই এ রাস্তায়,স্থানীয় লোক, স্থানীয় বাড়ি। পাহাড়ের বাঁকে,  গাছের ছায়ায় সত্যি বলতে দার্জিলিং ততক্ষনে ভালোবাস্তে বাধ্য করে ফেলেছে আমায়। 





Sunday, March 14, 2021

অনেকদিন পরে পাহাড়ে(তিন)

 সেই কবে ছায়াতালে মোমো খেতে খেতে থেমেছিলাম। তারপর লম্বা গ্যাপ দিয়েছি। সরি হ্যাঁ? 

সকাল বেলাতেই বেরিয়ে পরবো,  লম্বা পাড়ি দিয়ে দাওয়াইপানি।  ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম, কয়েকটা হোমস্টে, গাছপালা জঙ্গলে ঘেরা। দাওয়াইপানি আজকের ইন্টারনেট যুগে অচেনা নাম না, দার্জিলিং এর কাছেই। মুশকিল অন্য জায়গায়, আজকাল কোনো জায়গাই অফবিট নেই, তাই সব জায়গাতেই ভীড়,  "কাল থেকে তো সমানে পাদলা পায়খানা হচ্ছে" ,  বাক্যাংশ শোনা যায় গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে কিংবা উড়ে আসে ব্লুটুথ স্পিকারে টুম্পা সোনা অধিকাংশ জায়গায়। আরেকটা দিকও আছে, যেটা সত্যি বলতে কোভিডের আগে কখনো চোখেও পড়েনি। একটা কম্বলের ওয়্যার পড়াতে খুব এক্সট্রা পয়সা লাগে না খুব কিছু, হোমস্টে গুলোতে সেই কন্সেপ্টই নেই। কেন কে জানে!দাওয়াইপানিতে আমারা থাকবো ঠিক করেছিলাম যখন যে ভদ্রলোকটির সাথে কথা হয়, ফোনের ওপারে ভারী বিনয়ী নম্র এক পাহাড়ি মানুষ। বীরেন রাই এর দু রকম ঘরের একটু বেটার যেটা সেইটায় বুক করেছিলাম মাস দুয়েক আগে প্রায়। ভদ্রলোক ফোনে জানিয়েছেন যে ভালো রাস্তায় কাজ চলাচলের জন্য আটকে আছে, অন্য একটা পাথুরে রাস্তা আছে সেটায় আসা সব ড্রাইভারের জন্য সম্ভব নাও হতে পারে। কথাবার্তা বলে ঠিক করা গেলো তিনমাইল অব্দি আমরা যাবো নিজেদের ঠিক করা গাড়িতে বাকিটা ও ব্যবস্থা করবে। কালুক থেকে দাওয়াইপানি কম দূর না। বীরেনের মাখন হাত, ঝকঝকে নীল আকাশ, উচ্ছল তিস্তা নদী সে রাস্তা নিমেষে পেরিয়ে যায়। ছেলে ঘুরতে ভালোবাসে, ছবি তুলে বাঁধিয়ে রাখে ঘরে, বন্ধুরা মিলে ঘুরতে গেলে ফূর্তি না করে স্রেফ স্টিয়ারিং এ মন দিতে হওয়ায় ভেবে নিয়েছে এবারে আর নিজে গাড়ি চালিয়ে যাবেনা ঠিক করেছে। হাসিখুশী, নম্র এবং দক্ষ ছেলেটাকে ভারী ভালো লেগেছে। আবার কখনো দেখা হবে কিনা কে জানে!


 তিনমাইল থেকে দাওয়াইপানির রাস্তাটা আহাহা।এবড়োখেবড়ো রাস্তায় সচরাচর গাড়ির চাকা চলে না বোঝা যায়।দুধারে ঘন জঙ্গল, পাখির ডাকের আওয়াজ শোনা যায় না অবশ্য গাড়ির আওয়াজে। এই রাস্তাটায় আবার আসতে হবে তো পায়ে হেঁটে। দাওয়াইপানিতে কিচ্ছু করার নেই সেইটাই একটা ভালো দিক, পাহাড় দেখো, জঙ্গলে হাঁটো বা গ্রামে ঘোরো ব্যাস। কিন্তু শুরুতেই মুশকিল। বীরেন রাই গেছে গ্রামের লোকের সাথে হাত মিলিয়ে রাস্তা ঠিক করতে,  আর ওর বউ আমাদের ঠিক করা ঘর দিয়ে দিয়েছে অন্য এক দলকে। তারা তো এরকম মওকা পেয়ে আর বেরোবেনা ঘর থেকে। এদিকে অন্য যে ঘরটা দিচ্ছে সেটা বড়ই ঘিজিমিজি মতো, মানে একটা গ্রুপ এসেছে তারা তোয়ালে পরে খালি গায়ে দেখলাম নতুন অফার করা ঘরটার পাশের ঘরটা থেকে বেরোচ্ছে। আমায় আপনারা নাক উঁচু বলতেই পারেন, কিন্তু কিছু জিনিস আমার বরদাস্ত হয়না।  খালি গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়ে আসা এই দল শিওর রাতের বেলা উল্লাস যাপন করবে মদ খেয়ে  কন্ট্রোল করতে না পেরে বমি করে বা চড়া মিউজিক চালিয়ে। পাহাড় মাখতে  এসে এসব আমার পোষায় না। সুতরাং অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, ওই ঘরে যাবো না। ফোনাফুনি, এক্সপ্ল্যানেইশন ইত্যাদির মাঝে দেখি এক বাঙালী লোক এসে বলছে, "কী হয়েছে?" বাঙালী দেখে নেচে উঠেছি এমন না, কারন বেশীরভাগ সময় বাঙালীরা এসব ক্ষেত্রে অ্যাডজাস্ট করার পরামর্শ দেয়, তাছাড়া উটকো লোককে জবাব দিতেও ভাল্লাগেনা। 




ভদ্রলোক নরম গলায় বললেন, ওনার নাম সূর্য।  এখানেই আড্ডাহাট বলে একটা হোমস্টের মালিক। একবার যদি আমরা দেখে নিই ঘরটা।  সমস্যা যখন হয়েইছে, এটা ওনার গ্রাম, গ্রামের অপবাদ হতে দিতে চাননা বলেই বলা। মুখের উপর না বলা যায় না, পছন্দ না হলে না বলব, একবার দেখেই আসা যাক। আড্ডাহাট একটু উপরে, চড়াই ভাঙতে হয় একটু। পিছন থেকেই  জঙ্গল শুরু। দেখে ভালোই লাগলো। থেকেই যাই নাকি?


 


ভদ্রলোক জানালেন,ওনার বন্ধুরা এসেছে, সময় কাটাতে একসাথে,বোর্ডার আর কেউ নেই তাই কুক ছুটিতে।  মায়াই লাগলো,  বেচারা, তার চেয়েও মায়া লাগলো বন্ধুর বউদের  উপর,  তাদেরই রান্না করতে হচ্ছে কিনা। এক্সট্রা এক জোড়া লোক তাদের দেখাশোনা। কোনো মানে হয়! কিন্তু কোনো রকম অসন্তোষ না রেখেই তারা আমাদের খেয়াল রেখেছিলো একথা না বললে অন্যায় করা হবে। আড্ডাহাট এর একটা লম্বা বারান্দা আছে, সব থেকে কোনের ঘরটা আমাদের ছিলো, বাকি দুটোয় সূর্যবাবুর বন্ধুরা ছিলো, তারা নিজেদের মধ্যে আড্ডায় ব্যস্ত, নীচে, উপরটা আমাদেরই দখলে বলা যায়। 

কালুকে কেনা পেয়ারা ওয়াইন।দেখতে অবশ্য স্কচের মতো


খেয়ে দেয়ে যে পথে গাড়িতে এসেছিলাম সেই রাস্তাতেই খানিক হাঁটা গেলো। ফিটনেস কমে গেছে খুব। চড়াই ভাঙতে কষ্ট হয়। কেউ কোত্থাও নেই, চেনা অচেনা কিছু পাখিরা ছাড়া। ক্যাঁ ক্যাঁ করে ডাকছে গাছের আড়ালে লুকিয়ে। বনে জন্তু কিছু আছে ছোটো তারাও লুকিয়ে আমাদের দেখছে কিনা কে জানে! এক জায়গায় খেলার মাঠ করা আছে। এতো গুলো গাছ কেটে মাঠ বানালো বলে ভাবতে গিয়ে টের পেলাম এটা ন্যাকামি হচ্ছে, হোমস্টেতে যে থাকছি, সেও গাছ কেটেই গড়ে উঠেছে, এই গ্রামটাই তাই। তা বেচারারা খেলবে কোথায় তাহলে? আবার এই করে ভাবতে গেলে পুরো জঙ্গলটাই সাফ হয়ে যায়! আমাদের এখন সামনে ঢাকতে গেলে পিছন ফাঁক হয়ে যায় আর পিছন ঢাকতে গেলে সামনে দশা। জনসংখ্যা আর লোভ দুইই না কমালে খুব কিছু উপায় নেই। মোটা ল্যাজওয়ালা কালো রঙের কী যেন ফস করে পিছন দিয়ে পার হয়ে গেল!  গা ছমছমে কোনো জন্তু বেশ! ভাবার তো দোষ নেই, দেখতে যখন পাইনি,বন বিড়ালই বা ভাববো কেন শুধু! 

বনপথে হাইক করে ফিরে গ্রামটা একটু ঘুরতে না ঘুরতেই বীরেন রাইজি হাজির হলেন। অত্যন্ত কাঁচুমাচু মুখে বারবার ক্ষমা চাইছিলেন। দেখে মায়াই লাগছিলো, আমরাই উল্টে বললাম আর কি করা যাবে! ক্রমে অন্ধকার নেমে এলো, গাছের ফাঁকে, বারান্দায়। প্রচন্ড ঠান্ডা হলেও ওই নির্জন বারান্দায় আমরা ঝুম হয়ে বসে রইলাম কতক্ষন কে জানে,  অন্ধকারের রঙ বদলালো, হাওয়ার গতি বদলালো, নীচ থেকে সূর্যর নেপালি সহকারী দেশী মুরগী কাটতে নিয়ে যাচ্ছে আওয়াজ এলো, বাচ্ছাগুলোর আওয়াজও ভেসে আসছিলো মাঝে মাঝে কিন্তু সব কিছু ঝাপিয়ে দূর পাহাড়ের জ্বলে ওঠা আলো, আর পিছনের জঙ্গলের শীত জড়িয়ে ছিলো চেয়ারগুলোয়। 

সকালে উঠে দরজা খুলে বেরিয়ে দেখি ফের তিনি। যদিও তেমন পরিষ্কার ভিউ না, কিন্তু তাতে আনন্দের কম হয়না কিছু। আর তার সাথে কিচিরমিচির কিচিরমিচির করে একগাদা পাখি তাদের সকালের বাজার হাট, দোকান পাতি করছে। এই দোল খেলো একজন তো ঝটাপটি করলো ওই দুজন, একা বসে রয়েছে আরেকজন ওই ডালে। আমি কাঁচা হাতে একবার ওই দিক আর এই দিক করে খান কতক কে ফ্রেম বন্দী করার চেষ্টা করলাম বটে, তবে তেমন হল কই আর। 







Friday, February 19, 2021

অনেকদিন পরে পাহাড়ে(দুই)

 ছায়াতাল বলতে বলতেই মনে পড়লো, এ লেখা লিখছি যখন, উত্তরাখন্ডের হিমবাহ গলে যাওয়া ঘটে গেছে।আমরা শুকনো নদী পেরিয়ে সিকিমের পথে চলার সময় দেখেছিলকম মরা নদীর কংকালে কেমন মানুষ পোকারা বাসা বেঁধেছে, নোংরা থিকথিকে। উত্তরাখন্ডের নদীগুলোর ওই দশা করতে গেছিলো,  টানেল করে স্বাভাবিক নদীপথ বদলে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাঁধ গড়ে ভূপ্রকৃতি বদলে উন্নয়ন আনতে চেয়েছি তার দাম দিয়েছে কাজ করতে আসা শ্রমিক, কতদিনের প্রাচীন গ্রাম। যারা ওই নদীর জলে পুষ্ট হয়েছে এতদিন, ক্ষীন স্বরে প্রতিবাদ জানিয়েছিলো, তাদের নদী ধ্বংস হয়ে গেছে, তারা উড়ে গেছে হঠাৎ করে গলে যাওয়া হিমবাহের জলে, নতুন তৈরী হওয়া তালে।  


প্রকৃতি আমাদের কাছে আয়ের উৎস, তাকে দোহন করে আমাদের রবরবা তাকে আদর যত্নটুকুও করতে আমাদের কষ্ট। গাছ কেটে, নদী শুকিয়ে, আবর্জনায় ভরিয়ে দিয়ে আমাদের উন্নতি হতে পারেনা তা কি না বোঝার মতো বোকা আমরা?  নাকি আমরা ওই ফ্রায়েড ফ্রগ সিনড্রোমে আছি সব্বাই। আরেকটু কম নিঃশ্বাস নিয়ে, আরেকটু কম সবুজে,  কটা প্রাণ জলাঞ্জলি দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে ভেবে নিচ্ছি! সত্যি সত্যি সময় এসেছে চাকা ঘোরাবার, এত উন্নয়ন,  এত সভ্যতার কোন প্রয়োজনটা আছে! বটলড ওয়াটার না খেয়ে নদীটাই যদি পরিষ্কার রাখতাম? একটু কম বিলাস যাপন করে, একটু কম আরামে থাকলে এত ক্ষতি হত কি? আর হলে হত, কিছু তো করার নেই। এতো পেয়ে, এত দৌড়েও লাভ ঠিক কী হচ্ছে? শান্তি নেমেছে কি? রোজ একটা স্বাচ্ছন্দ্য পেয়ে মনে হচ্ছে এটা ছেড়ে কিভাবে ছিলাম।অথচ দিব্যি ছিলাম! 


বেড়ানোর গল্প করতে গিয়ে অনেক বেলাইনে কথা ছোটালাম। অবশ্য আমার ব্লগের পাঠক কেউইই নেই, নিজে নিজে কথা বলি নিজে নিজেই শুনি,  আর বেড়ানোর গল্পে পরিবেশের সংকট এর কথাও থাকুক। না হলে আমাদের সাধের সোনার ডিম পাড়া ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিও আর ডিম পাড়বে না। ছায়াতাল এর কাছেই একটা গেট আছে ভার্সে স্যাংচুয়ারির। এমনি লোকে খুব একটা যায়না, তাই কেউই ভালো বলতে পারছে না, কোথায় সে জায়গা। অবশেষে একজন পথ বাতলালো সিকিমিজ ভাষায় নরেনকে। সে আমাদের একটা জায়গায় নামিয়ে বলল ওই তো উপরে উঠে যান, মিল যায়েগা। সে একটা সরু সুঁড়িপথ, পাহাড় বেয়ে উঠছে। এখানেই সত্যি? হাঁটিহাঁটি পা পা করে এগোনো গেলো,এক ঝাঁক রঙ বেরঙের চঞ্চল পাখির ওড়াউড়ি, তাদের কিচকিচ ছাড়া আর শব্দ নেই কিছু। বাঁশের গাছ, ঝরে পরা পাতায় মচমচ শব্দ করে যত উঠছি বন যেন তত অপরূপ হচ্ছে। রডোডেনড্রনের সময় না এখন,  কিন্তু জঙ্গল রিক্ত না। পাতা লাল হয়ে যাওয়া গাছ, কতদিনকার প্রাচীন সব ফার্ণ জড়ানো গাছ দেখতে দেখতে দেখি একটা ভাঙাচোরা ঘরে, পাশে একটা পাকা পরিত্যক্ত ঘরের পাশে একটা গেট  ভার্সের ভিতর ঢুকছে। কেউ কোথাও নেই। চুপচাপ একটা দুপুর জঙ্গলে শুয়ে আছে। আমরাও নিজেদের মধ্যে কোনো কথা বলছিলাম না। হাঁ করে করে আদিম গাছ গুলো দেখতে দেখতে হাঁটছি, মাঝে মাঝে জলের আওয়াজ আসছে এদিক সেদিক থেকে, পাহাড়ি ঝোরা। কতক্ষন হেঁটেছিলাম জানিনা, তেরচা করে আসা রোদে পাখির ছবি তোলার চেষ্টার ফাঁকে খেয়াল হল,  আমাদের নামতেও হবে। আমরা তো পুরোটা ট্রেক করবো বলে আসিনি। সেই কতদিন আগে এর আরেক পারে এসেছিলাম, সেই সব গাছ, ভার্সের ট্রেকার্স হাটের কাছে সেই চ্যাটালো পাহাড়টা,মিংমা, রাতের কুকুরগুলো সবার খবর নিলাম আলগোছে গাছেদের কাছে। চিৎকৃত শব্দের প্রয়োজন মানুষের। গাছেরা জ্ঞানী হয় তাদের এসব লাগে না। কিন্তু তাদের উত্তর বোঝার জন্য এমন অল্প সময় সংপৃক্ত থাকলে হয়না। আবার আসবো দেখো,  প্রায় অস্পষ্ট স্বরে বলে আসি।






ফার্মিং এর শখ আমার বড়। কিন্তু আমার সব শখই কল্পনায় বেশী আসলে কম। এইখানে একজন পাহাড়ি মানুষ ফার্মিং করেছে একটা পাহাড়ের ঢালে। সে কত রকম গাছ, এলাচ,কফি,পীচ,কমলালেবু, পেয়ারা,আনারস। এলাচ গাছে টিপটিপ করে জল পড়ছে, ওইদিকে কমলালেবুতে বুলবুলি এসে বসছে, ওই লোকটার বউ আচারের শিশি সাজিয়ে রাখছে রোদে। আহা এমন একটা জীবন হলে মন্দ হয়না। এমন পাহাড়ে হবে না, তাহলেই পাহাড় কেজো হয়ে যাবে। প্রেমে খানিক অকাজ না থাকলে চলে না। কিংবা কে জানে হয়তো থাকতে থাকতে, কাজের মধ্যে পাহাড় আরো কাছের হয়ে যাবে। পাশাপাশি থাকলে মায়া তো কমেনা,বাড়েই বরং। লোকটা আবার অর্গানিক ওয়াইন বানায়। সব কটা চেখে টেখে পেয়ারারটাই সব চেয়ে ভালো লাগলো। ওয়াইন আমি অত বুঝিনা, স্বাদে ভালো লেগেছে মানে এটা হয়তো সব চেয়ে কমজোরি ওয়াইন! কে জানে। পীচ ফলের গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে নীচের উপত্যকা দেখতে দেখতে সত্যি বলতে জীবনকে একটা ধন্যবাদ দেওয়া দিতে ইচ্ছে করে। সারাদিন কত না পাওয়া নিয়ে অস্থির করি, এই নেই সেই নেই,ওই হলো না, কত কি যে হয় তার হিসেব করিনা। 


ফার্মে আসার আগে একটা মনস্ট্রি গিয়েছিলাম, পাহড়ি গাঁয়ের মন্সট্রি যেমন হয়, ছোটখাটো, ছায়া ছায়া অন্ধকার, বৌদ্ধ দেব দেবী,  পিতলের প্রদীপ। তার একটু উপরেই কার যেন সমাধি, চুপ করে ঘুমিয়ে আছে পাহাড় জঙ্গলের মাঝে। রিনচেনপঙ গ্রাম হলেও খাবারের জায়গা আছে। গ্রাম না বলে হয়তো ছোট গঞ্জ বলা ভালো। নরেনই নিয়ে গিয়েছিলো, একটা খাবার দোকানে। দোতলায় উঠতে দেখি স্থানীয় লোকজন দিব্যি মোমো আর বিয়ার নিয়ে আড্ডা জমিয়েছে। সিগারেটের ধোঁয়া পার করে জানলার ধারে একখান জায়গায় বসা গেলো। পাশের টেবিলে এক পুলিশ সাহেব তার অধস্তন লোকজন নিয়ে এলো দেখলাম। নাহ খাবার ভালোই হবে এখানে। আচ্ছা অধস্তন দেখলে কেমন বোঝা যায় না? আমাদের দেশে এই সামন্তপ্রথা বড়ই জোরালো, কর্পোরেট হোক কি গাঁয়ের পুলিশ প্রভুবাদ থেকেই যায়। যাকগে যাক,  গরম গরম মোমো এসে গেছে, অত তত্ত্বকথায় মন দেবার থেকে তাতেই দেওয়া যাক। (ক্রমশ)










Saturday, February 13, 2021

অনেকদিন পরে ...পাহাড়ে(এক)

 এক বছর আগে কোভিড নিয়ে কথাই হয়নি প্রায় আর এই এক বছরে কোভিড ছাড়া কথাই হয়নি প্রায়।  এত আনপ্রেডিক্টেবল জীবনে হাঁটুর জোর, ধকল নেবার ক্ষমতা মাত্র কিছু বছর অব্দি, তার মধ্যে যদি এক বছর নষ্ট হয়ে যায়,  পাহাড়ে না হেঁটে কেটে যায় তাহলে বেজায় দুঃখের মশাই।


এক বছরটাকে আর বাড়তে দেওয়া যায়না।  থাকি একখানা ছোট ফ্ল্যাটে বয়স্ক বাপ মা এর সাথে সুতরাং চাইলেই যা ইচ্ছে হোক বলে বেড়ানো যায়না। কিন্তু চিনিপ্রেমীদের  কথা চিন্তামনি ভেবে না রাখলে তার ব্যবসাও লাটে ওঠে। রানীগঞ্জের  আস্তানাটাই কাজে লাগানো যাবে ফেরার পর, কটা দিন কাটিয়ে আসলেই হল। মোহরের জন্মদিন আর আমাদের অ্যানিভার্সারি মিলিয়ে একটা পাহাড় সফর করে ফেলাই যায়৷ জানি জানি আপনারা হাসছেন খুব, ভাবছেন প্রথমবার বলেই এতো ফুত্তি প্রাণে, তা প্রথম বছর তো সত্যিই আশ্চর্যজনক একটা ব্যপার। একজন মানুষ জন্ম আলাপের কারনে বা কাজের সূত্রে বেঁধে থাকার কারনে পাশাপাশি থাকা না , এসবের বাইরে একজনের  সাথে সারাক্ষন থাকার  , রাগ, অপমান, আনন্দ দুঃখ সব ভাগ করে নেবার  এই অবাক ব্যপারটা সেলিব্রেট করতেই হয়। তবে আমার মতে সব কটা বছরই এমন আশ্চর্যজনক হয়, হওয়া উচিত। নিজের নিজের মতো করেই উদযাপন হলে তাতে হাসির কিছু দেখিনা। 


 কোভিড এর কারনে কিছু এক্সট্রা ব্যপার , মানে হাতের কাছের পাহাড়ে ট্রেনের বদলে ফ্লাইট আর নিজেদের চাদর ইত্যাদি বওয়া! ও এই ফাঁকে একটু বলে নেওয়া ভালো, ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাসের কথা আমাদের মাথাতেই আসেনি, তাতে খরচ খানিক কম আর আরাম একটু বেশীই হত। সকাল সাড়ে ছটার ফ্লাইট ছ ঘন্টা দেরীতে দৌড়নোয় মাথায় এসেছিলো সেসব। বেড়াতে বেরোনোর আগের রাতটা ছোটবেলার মতোই উত্তেজনার হয় কিন্তু। বোর্ডিং পাস এলো কিনা, ব্যাগেজ ট্যাগ নাকি আজকাল দিচ্ছেনা? সাদা কাগজে চিপকে নে রে, স্যান্ডেল জোড়া কাল সকালে মনে করে ভরতে হবে। ভোর বেলার এলার্ম, অন্ধকার মাখা রাস্তা পেরিয়ে অনন্ত অপেক্ষা। শেষমেশ সত্তিকারের বাগডোগরা থেকে বেরোনোর সময়েই নেতিয়ে পড়েছি প্রায়। আজকের প্ল্যান চৌপাট অলরেডি। দিন পাঁচেকের সফর আমাদের এবারে,  প্রথম দেড় দিনের জন্য রাখা ছিলো কালুক। পশ্চিম সিকিমের ছোট্ট একটা গ্রাম। পেলিং এর কাছে কিন্তু "সেরকম কিছু দেখার নেই" বলেই হয়তো তেমন ভীড় হয়না। ভাগ্যিস! তা আজ তো পৌঁছতেই সন্ধ্যে নেমে যাবে। যাকগে ভেবে লাভ নেই। এয়ারপোর্টের বাইরেই বীরেনের গাড়ি অপেক্ষা করছিলো আমাদের জন্য। বেচারি সেই কোন সকালে এসেছে আমাদের নিতে তারপর এতক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলো অথচ এতটুকু বিরক্ত না, এমন ধৈর্য্য, ভদ্রতাবোধ সকলের মধ্যেই থাকলে জীবন বোধহয় আরেকটু সহজ হতো! কিংবা কি জানি পাহাড়ের কাছে খোলা প্রকৃতির কাছে থাকে বলেই হয়তো এদের উদারতা বেশী হয়, গিজগিজে ভীড়ের মধ্যে ছোট্ট চৌখুপীতে থাকতে থাকতে আমাদের মধ্যে সংকীর্ণতা বেশী। মেল্লি পৌঁছে থামা গেলো খানিক। এখান থেকে সোজা গ্যাংটক চলে যায়। একটু আগে কালিম্পং এর দিকে রাস্তা চলে গেছে, আর এখান থেকেই জোড়থাং হয়ে সিকিমের বিভিন্ন দিকে যাওয়া যায়। এর আগে ওখরে যাবার সময় এই রাস্তা ধরে এসেছি। নীচে তিস্তা। চারপাশের চেহারা বদলে গেছে অনেক আগেই, সবুজে মোড়া পাহাড়,  পাহাড়ি মানুষ,  ঠান্ডা কনকনে জল, গরম ধোঁয়া ওঠা নুডলস আর চা মন চনমনে হবার আর কি চাই?

    

 মন চনমনে হলেও পৌঁছতে পৌঁছতে নেতিয়ে গেছিলাম। সেই কোন সকালে উঠেছি, রাতেও উত্তেজনায় ঘুম হয়নি ভালো, পাক খাওয়ানো এই রাস্তা সব মিলিয়ে ভারী হা দশা হয়েছিলো। সন্ধ্যের অন্ধকারে পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চড়িনি আগে তেমন স্মরনকালে, এক একটা বাঁক পেরোচ্ছি আর আলো কমছে একটু একটু করে তারপরই ঝুপ করে সন্ধ্যের অন্ধকার। সে বদলটা চোখে না দেখলে আমার মতো কারোর পক্ষে বোঝানো মুশকিল। আঁকতে জানলে, রঙ তুলির জ্ঞান থাকলে তাও খানিক বোঝানো যেত। গাড়িতে অতটা বোঝা যায়নি, হোটেলে নেমে টের পাওয়া গেল ঠান্ডাটা কেমন।  বাপ্রে বাপ। আমার একটা কোট আছে, বেজায় গরম আর আরাম হয় ঠান্ডায়, তেমনই কদাকার দেখতে। তা আমার বাপু কদাকারই ভালো, নিজের চেহারাই বা এমন কি যে জ্যাকেটের চেহারা নিয়ে মাথা ঘামাবো! সে জ্যাকেট আর এদের একখানা উমদা ওয়েলকাম ড্রিংক শীত রোধ করায় বেরোনো গেলো বারান্দায়। সামনে পেলিং, গেজিং এইসব শহরের ঝিকিমিকি আলো, ঝুপসি হয়ে থাকা গাছেদের অবয়ব কনকনে ঠান্ডাকে উপেক্ষা করিয়ে দেয় একটু হলেও।  খানিকক্ষণ ঝুম হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে হোটেলের সামনের দিকে এসে দেখি একখানা চাঁদ উঠেছে চমৎকার।  আহাহা আরো কিই বা চাওয়ার থাকে। কালুক থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা চমৎকার দেখা যায় তবে আমার কাছে পাহাড় মানে পাহাড়, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেলে তো তো কথাই নেই, না পেলেও দুঃখী হয়ে থাকার ব্যপার নেই। পাহাড়ের গা দিয়ে হাঁটবো,  পাহাড় মাখবো এইই তো অনেক। আর আমার সাথে কাঞ্চনজঙ্ঘার আলাদাই সম্পর্ক!  সেও দেখা দেবে না আমিও ফিরে ফিরে আসবো। কিন্তু এবারে পাহাড় দেখেছে আমি আর একা একা তার কাছে আসিনি, তাই আমার সাথে লুকোচুরি খেলার দুষ্টুমিও করেনি। বরং যুগলকে প্রথমবার দেখার জন্য, উপহারই দিয়েছে। 



পরের দিন সকাল বেলাতেই সেই উপহার জানলার পর্দা সরাতেই! কাচঢাকার জানলার ওপারে সবুজ গাছপালার উপর আর নীল আকাশের নীচে সাদা ঝকঝকে পুরো হিমালয়ান রেঞ্জ!!! এটা অবশ্য আমার গিফট না আজ মোহরের জন্মদিন উপলক্ষেই গিফট নিশ্চয়ই।

 

 তবে পাহাড় অত কৃপন না,  একে দিলে ও নিতে পারবে না এমন ছ্যাঁচড়ামি করা পাহাড়ের স্বভাবে নেই। এই হোটেলটা দিব্যি,  আলাদা আলাদা কটেজ আছে ফলে খাবার জায়গা  ছাড়া অন্য জায়গায় লোকজনের মুখ না দেখলেও চলে। নিজেদের কমলালেবু, কিউই, বাতাবীলেবু এসবের গাছ টাছ আছে।  সবমিলিয়ে চমৎকার একটা সকাল। আহা এখানেই বেশ থেকে যাওয়া যেত। যাবে না জানি, অত পরিশ্রম করা সইবে না আমাদের, সুখী সুখী "যদি থেকে যাওয়া তে" টাইপ ভাবনাতেই আনন্দ আর কি।



 বীরেনের ভাই গাড়ি নিয়ে চলে এসেছিলো। নাইন পয়েন্টস সেভেন পয়েন্টস দেখবার তাড়া আমাদের ছিলো না, সে ইচ্ছে নিয়ে আসিওনি। এসেছি স্রেফ ফাঁকা একটা জায়গায়, পাহাড়ি রাস্তায়, রোদ ছায়ার সাথে,  পাখির ডাক শুনতে শুনতে, হাঁটতে।  কালুক জায়গাটায় বাজার মতো খানিক থাকলেও, আমাদের হোটেলটা তফাতে খানিক, সেখানে বাজারের কোনো কোলাহলই কানে আসার চান্স নেই। কালুকের পাশেই রিনচেনপঙ নামেই আরেকটা ছোট্ট গ্রাম আছে, আর এদিকে ছায়াতাল বলে আরেকটা সুন্দর ছোট গ্রাম। খানিক দূর গেলে পেলিং পড়বে, তবে আমরা পেলিং যেতে চাইনা, সিংসোর ব্রিজ না, কিচ্ছু না। এই রিনচেনপঙ, তার ছোট্ট মনস্ট্রী, ছায়াতাল আর সেখানে ভার্সে স্যাংচুয়ারির একটা গেট আছে, সেই গেট থেকেই ভার্সের দিকে খানিক যাবো। বীরেনের ভাই নরেন প্রথমে বুঝতে পারেনি ভালো কোথায় যেতে হবে, সে নিয়ে গেছে একটা পার্ক মতো জায়গায়। সেটা আসলে একটা পাহাড়ের মাথায় ওদের এক রাজার স্ট্যাচু বানানো, মানুশশের তৈরী ওই স্ট্যাচু দেখেই মুখ কুঁচকে না করেছি। তারপর কি মনে হল, চলো যাওয়াই যাক। পাহাড়ের মাথায় স্ট্যাচু, পাহাড়ের গা পেঁচিয়ে ওঠার রাস্তা। দূরে গাছপালার মধ্যে একটা গ্রামে জল তোলার আওয়াজ আসছে খালি আর কোত্থাও কোনো আওয়াজ নেই। ওহ না ভুল বললাম,  দু চারটে ভারী চঞ্চলমতি পাখি এদিক সেদিক উড়ছে আর টুই টুই করে ডাকছে। ভাগ্যিস পার্ক ভেবে এড়িয়ে যাইনি। ভারী চমৎকার জায়গাটা, আমরা দুজন ছাড়া আর লোক নেই, ফলে,  "এই বাবুনদা এদিকে আয়, ছবি তুলবো" কিংবা "একটা সিগারেট হবে নাকি ঘোষদা" এইসব অত্যাচারে শান্তিভঙ্গ বা রসভঙ্গ হবার চান্স নেই। হ্যাঁ মানছি আমরাও ট্যুরিস্ট কিন্তু পাহাড়ে গিয়ে একটু পাহাড় বুকের মধ্যে না নিয়ে ওইরকম কলতান যারা করে তাদের আমি নমো করি দূর থেকে।  দূর থেকে ছায়াতাল লেক, পাহাড়ি ঘর বাড়ি খেলনার মতো একটু খানি হয়ে দেখা যাচ্ছিলো। আহ এই রাজাটা বেজায় ভালো জায়গায় দাঁড়ারে পেয়েছে তো। (ক্রমশ)














Wednesday, January 27, 2021

পাড়ায়

 ফট করে ধারনা বদলে গেলে গোলমাল লাগে।  এই যে মনাদা, সারাক্ষণ মুখ গোমড়া করে থাকে, দোকানে ওষুধ কিনতে গেলে পাঁচন খাওয়া মুখে ওষুধ দেয়, কথা বলেনা একটা দুটোও, মোটেও ভাল্লাগেনা। সেদিন বারান্দা থেকে দেখি পিন্টুকাকুর দোকানের পাশে এক পাগলী নাকি পাগল, জুটেছে কোত্থেকে। জামা কাপড়ে জটায় জুটায় বোঝার উপায় নেই সে কে।  জামা জুতোই আমাদের আজকাল জানার উপায় কিনা। পাগল হলেও সে ভারী সতর্ক লোক। পা টিপে টিপে দুদিক থেকে আসা অটো, বাইক, গাড়ির ফাঁক দিয়ে পার হয়ে এসেছে।  টাইম কলের মুখ খুলে বন্ধ করে নিশ্চিত হয়েছে নাহ জল নেই। ফের পা টিপে টিপে ফিরে গেল নিজের জায়গায়। হাওয়ায় খানিক যোগ বিয়োগ করে  নিজের থলে হাতড়ে জল বের করে এঁটো বাটি ধুয়ে নিলো ভারী যত্নে।  আরো অনেকক্ষন পর কিকাজে বারান্দায় গিয়ে দেখি সে তখনো ওখানেই আছে। এদিক থেকে মনাদা বেরিয়ে পাঁউরুটির দোকান থেকে একটা গোল পাঁউরুটি কিনে এনে তাকে দিয়ে গোমড়া মুখে ফের ঢুকে গেল দোকানে। বোঝো! গোমড়া লোকটার মধ্যে এমন একটা মানুষ আছে কে জানতো! 


এ পাড়াটা আসলে একটা অদ্ভুত বিটকেল পাড়া। সারা দিন প্যাঁপোঁ হর্ণ, মানুষের বোধ বুদ্ধি কম যেখানে সেখানে থুতু তার মধ্যে কেমন করে শিরাওঠা আঙুল আলতো হাতে হাত বুলিয়ে দেয় পাগলাকে দেওয়া পাঁউরুটুর মধ্যে দিয়ে! ওই যে অত

সেদিন বন্ধুদের মধ্যে আড্ডা হচ্ছিলো,  কী কথা থেকে জানি ভালো থাকা খারাপ থাকার কথা উঠলো। আগের থেকে ডিপ্রেশন বেড়েছে সেই নিয়ে কথাসূত্রেই একজন বলল যে আগে মোটেও মানুষ ভালো ছিলো এমন না হয়তো বুঝতই না কোনটা ডিপ্রেশন। আমার তা মনে হয়না, ডিপ্রেশন ছিলো হয়তো কিন্তু এখন সত্যিই বেড়েছে। ভালো না লাগাও বেড়েছে যত আমাদের অপশন বেড়েছে। আগে বেড়াতে গেলে বেড়াতে যাওয়াই শেষ কথা ছিলো, কোন হোটেল, তার কি ভিউ কি রিভিউ, গাড়িতে এসি আছে না গদি আছে কিচ্ছুর তোয়াক্কা করতাম না। এখন যেন সেরা জিনিসটা পেলেও মনে হিয় কই ও তো আমার থেকে বেটার পেলো, বেটার দেখলো। সারাক্ষন আরো পাওয়ার হতাশার থেকে তো অল্পে আরাম পাওয়া ভালো ছিলো!  মানছি সাইকেলে বসে কাঁদার থেকে মার্সিডিজে বসে কাঁদা আরামদায়ক কিন্তু কান্না পেলে তো সে আরাম খুব একটা আরাম বলে মনে হয়না। লস্ট চাইল্ডের সে বাচ্ছাটার মতো দুনিয়ার তামাম জিনিস কেবল খারাপই লাগে। আসলে অভাব অভিযোগ তখনও ছিলো তবে আমার মনে হয় কাদা মাখা পা এড়াতে গিয়ে আমরা পুরোটাই কংক্রীটে ঢেকে মাটিতে জল যাওয়ার উপায় বন্ধ করে দিয়েছি। আর্সেনিকের উপদ্রব বেড়ে গেছে।  কিন্তু তামাম জায়গা কি  ঢাকে না , ফাঁকফোকর খুঁজে নেয় ঠিক কেউ, হাত বাড়িয়ে দেয় নোংরা ধুলো ছেঁড়াখোঁড়া পিঁচুটিওঠা মানুষটার দিকে,    জল জমা হয় ফের মাটিতে।


Thursday, December 31, 2020

করোনাকালে সেলুনে

 ফট করে ঘড়ির কাঁটা সরে আবার আগেই লিখে ফেলি। শুরু করেছিলাম বছরটা যখন কে জানতো এমন আক্ষরিক অর্থেই নড়িয়ে দেওয়া বছর হবে! সুতরাং পরের বছরে হয়তো দেখা গেলো আমি কমন্ডলুর জল কিবোর্ডে ঢেলে হিমালয় চলে গেছি আর এ বছরের লাস্ট আওয়াজ খাওয়াটা কাউকে জানানো বাকি হয়ে গেল। আমাদের জীবনের গতিপ্রকৃতি এতোই বদলে গেছে,  করোনা এখন আর ইন থিং না, মানে সাত মাস আগেও যার ভয়ে দোকান বাজার বন্ধ রেখে করোনা ডায়েরি লিখতো সবাই তাকে ডরালে উলটে লোকে আওয়াজ দিচ্ছে!  

বুড়ো বাপ মা বাড়িতে থাকায় আমি একটু বেশীই সাবধানী, তাছাড়া আমার অফিস বাড়ি থেকেই, সেই সুবিধেটুকু নিয়ে যতটা পারি করোনাকে ভক্তি শ্রদ্ধা করেই চলি৷ মুশকিল হল চুল নিয়ে। গোঁফ দাড়ি আমার তিন আনা, তা নিয়ে বিলাসের কোনো অপশনই নেই। মাথার চুলও কিছু বিজ্ঞাপন দেবার মতো না উলটে টাক ঢাকাই দায় তাও সেলুনে যাওয়া আমার একমাত্র বিলাস বলা যায়। তা কোভিড লকডাউনের কারনে বাড়িতে কাঁচি ট্রিমার দিয়ে যতদিন চলল চলল তারপর আর পারা গেলো না। আমাদের পাড়া মনে হয় পৃথিবীর দুঃসাহসীতম পাড়া। তারা বহুদিন আগে থেকেই মাস্কহীন জীবন যাপন করে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে মুরগী কাটে, টাকা নেয় এই সময়েও। মাস্ক পরলেও, সরিয়ে দিয়ে রাস্তায় থুতু ফেলে নেয় সাবলীল ভাবে। সুতরাং পাড়ার সেলুনে যাওয়াটা সে সময় ভাবা যায়নি। অগত্যা, পার্লার নামক ভয়াবহ জায়গায় মাথা মুড়োতে গেলুম৷ ওরে বাবা সেকি সব ব্যবস্থা। আমার বিলাসের জায়গা সেলুন বলেছি, সে জায়গা আরামের। রতনদার সেলুনে গোবিন্দার কিংবা দেবের কিংবা জিতের সিনেমা চলে আর রতনদা আরাম করে কাঁচি চালায়। স্রেফ ছোট করে দাও বলেই আমার দায় শেষ। আরাম করে চোখ বুজে বসে থাকো, কাজ শেষে ঘাড় মাথা মালিশ করে দেবে। লোক থাকলে বসে বসে কাগজ পড়ো, দেশ গাঁয়ের খবর শোনো, সুমনের কিংবা অর্ণবের সার্কাসের থেকে সে ঢের ভালো। আর নতুন সেলুনটায় ছেলেটা অনন্ত বকে যায়, যতজন আসে সবার সাথে, না হলে ফোনে, না হলে নিজের মনেই৷ ওখানেও একই ব্যপার কাজ মিটলে ঘাড় মাথা মালিশ ফ্রি, বেশীক্ষন করাতে চাইলে ত্রিশ টাকা দিলেই আরো মিনিট পনেরো দেবে। 


পার্লার ব্যপারটা ওরে বাবারে টাইপ। তারা আমায় স্প্রে করে দিলো শুরুতেই, কেমন একটা দেবতা দেবতা ভাব আসছিলো যখন ধোঁয়ার মধ্যে থেকে বেরিয়েছিলাম। সে যাক ভালোই এদের ব্যবস্থা তাহলে। ওবাবা বলে কিনা আগে শ্যাম্পু করতে হবে! শ্যাম্পু তো চুল কেটে তারপর করি! তার আগে তো স্প্রে করে চুল ভিজিয়ে কাজ হয়। তাও মেনে নেওয়া গেলো, এক মহিলা ব্যপারটা করছিলেন আর তাকে তো আর না করতে পারিনা নাকি! তারপর তো একটা আবোদা ছেলে ভোঁভোঁ করে কানের গোড়ায় ট্রিমার ধরে,  ক্লিপ দিয়ে চুল এদিক থেকে সেদিক করে,  ইঞ্চি মেপে ভারী কসরত করলো। মোটেও আরাম নেই, চোদ্দবার, "সার ঠিক আছে, সার কিরকম স্টাইল করেন, সার অমুক সার তমুক" করে জ্বালিয়ে মারলে। অমন কেতাদুরস্ত জায়গায় তো আর বলতে পারিনা,  ভাই চুল কাটলেই ভালো লাগে আর কোনো স্টাইল নেই, কেটে দে যা পারিস। শেষমেশ নিষ্কৃতি পেয়ে দেখি এক গোছা চুল সাইড থেকে কেমন যেন উঁকি মারছে। বাড়ি এসে তাকে কাঁচি দিয়ে কেটে নিতে হল! এত সব কান্ডের শেষে আর মাথা মালিশের কথা বলতে ভরসাই হল না,  হয়তো ঝাঁটপাট দিয়ে পয়সা শোধ দিতে হবে!


তো বচ্ছরকার শেষ মাসে কোভিড যখন একটু কমছে বলে সবাই বলছে, মানে সরকারের মতে, টেস্ট করাচ্ছে কিনা আদৌ তা কে জানে! সে যাক সেই ভরসাতেই গুটি গুটি গেছি।  যেই না জিজ্ঞেস করেছি স্যানিটাইজার ব্যবহার করছো? ওবাবা কি হাসি। বলে, "আমরা তো মাস্কও ব্যবহার করিনা। অত ভয় পেলে হয় নাকি! তুমি বললে আমি স্যানিটাইজার ঘষে,  মাস্ক পরে, নতুন কাপড় দিয়ে কেটে দেবো,  কিন্তু বলছি শোনো ভয় নেই। " সে আশ্বাসবানীতে ভরসা হল না বিশেষ। আমার জন্য ওই নতুন কাপড়, স্যানিটাইজার ঘষাই রইল কিঞ্চিৎ মূল্য বেশী দিয়ে। তা কাটতে কাটতে জানালো, মাস্ক টাস্ক ওই বাসে উঠলে পড়ে, বাস থেকে নেমে যদি দেখে কেউ পরে নেই ওও পরে না,  ও তো আর গা* না। 


শালা এটাই বাকি ছিলো, আশা করি পরের বছর মাস্কহীন কাটাতে পারবো, গা* না হয়ে। 

Friday, December 4, 2020

পথ চলতি

 এই রাস্তাটায় আর কোনো গাড়ি দেখিনি অনেক্ষন। মাঝে মাঝেই ঘন শালের জঙ্গল, ফাঁকে ফাঁকে উঁচুনিচু অসমান ভূপ্রকৃতি,ইতিউতি খেজুর গাছ।  মুকুটমনিপুর থেকে বেরিয়েছি অনেক্ষন আগে, এখন ভরদুপুর তাই হয়তো দু চারটে যা পুকুর দেখছি  সেখান থেকে ভিজে কাপড় কোমরে গুঁজে বুড়ি দেখা যাচ্ছে। বাংলার রাস্তায় তিন কিসিমের মহিলা সমস্ত অঞ্চলেই দেখা যায়। এই কোমরে শাড়ির মুড়ো গোঁজা শীর্ণ বুড়ি, মাথায় কাঠকুটোর বোঝা নেওয়া গতযৌবনা,  আর ন্যাংটা (শীতকালে হাফ ন্যাংটা) ছেলে কাঁখে বৌ। হাওড়া, হুগলী,বর্ধমান, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, দুই চব্বিশপরগনা,  মানে জোলো , শুকনো কিংবা শস্য শ্যামলা বাংলা সবেতেই এরা থাকেই থাকে। সেই একইরকম ভঙ্গী, একই রকম অবয়ব, পুরোনো বাড়ির বটগাছের মতো। 


শীতের দুপুর দেখতে ভারী ভালো লাগে, মাঝে মাঝে গুড়ের গন্ধ ভেসে আসলে চোখে পড়ে মস্ত জায়গায় গুড় জ্বাল দেওয়া হচ্ছে, হঠাৎ করে জঙ্গলের মধ্যে থেমে গিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দাঁড়ালে নিজের কানের মধ্যেকার রক্তচলাচলের আওয়াজ নিয়ে ঘিরে ধরে শালের জঙ্গল। তারপর নাম না জানা কোনো পাখির ডাক ভেসে আসে, তাতে খানিক প্রাণ পায় যেন চরাচর। চটকা ভেঙে যায়। চলা শুরু হয়। এই যে আজ দুম করে মুকুটমনিপুর গেলাম, ফের সোজা পথে না গিয়ে ঘুর পথে চলেছি ফিরে,  রাস্তা দেখবো বলে, পথের বাঁকে হঠাৎ করে আসা গরুর গাড়ি ক্রমে বদলে বাইক, টোটো হয়ে যায় সেই বদলটা মজা লাগে। হাইওয়ে দিয়ে চললে স্পীড মেলে বটে কিন্তু এই যে পথের বাঁকে অজানা গ্রাম, তাদের জীবনের এক ঝলক,  কিংবা এই নিস্তব্ধতা সেসব খুব মেলেনা। মুকুটমনিপুরের ড্যাম এর নীল জলের পাশে দাঁড়িয়ে সকালে চমৎকার লাগছিলো, নিঃসন্দেহে খুবই ভালো ভাবে মেইন্টেইন করা হয়েছে সমস্তটা। পাহাড় ঘেরা হ্রদের ধারে ছুটির দিন নয় বলেই হয়তো ভীড় তেমন ছিলো না। পরেশনাথের মন্দিরের কাছে কিছু জটলা ছিলো।  ওখান থেকে সমস্ত অঞ্চলটা দেখা যায় সেটাও কারন। ভীড় থেকে সরে নামতে গিয়ে দেখি একটা মহাবীরের পুরোনো মূর্তি এমনিই মাটিতে শুয়ে লম্বা হয়ে, বেদী নেই, তেল সিঁদুর, সিক্কা, ভীড় কিচ্ছু নেই। খালি জন্মপোশাকে আরাম করে মহাবীর শুয়ে, পায়ের কাছে ড্যাম আর পাহাড়। একটা গিরগিটি পায়ের কাছে বসে খবর নিচ্ছে, দু চারটে বুনো ফুল ঝরে পড়েছে। আহ এর চেয়ে আরামের শয়ান আর কিই বা হয়৷ আমি নিশ্চিত, মহাবীর সমাধি এটাই যদি হত এরকম ভাবে গাছ পালা পাহাড় গিরগিটি প্রজাপতিদের সাথে  উনি   তাইই চাইতেন। 


চলার পথে অবশ্য শুধু অবিরাম নির্জনতা কিংবা জঙ্গলের ছায়াই থাকে না, আচম্বিতে শুরু হওয়া পথ অবরোধ,  বাজারের মধ্যের রাস্তা সবই থাকে। ক্রমে ক্রমে আলো কমে আসে। বাঁকুড়া থেকে হুগলী ঢুকে গেছি গাছপালা আর জমির চেহারা বদলে গেছে। অনেকদিন পর এতোটা খোলা আকাশ জুড়ে গোলাপী সুর্যাস্ত দেখতে পেলাম। দাঁড়াতেই হয়। চায়ের দোকানও জুটে যায়। অল্পবয়সী এক বউ দোকানদার। হাসিমুখে বায়নাক্কা সয়ে চা সিঙারা দেয়। দূরের মাঠে আগুন জ্বালিয়ে ধানের গোড়া পোড়ানো হচ্ছে আর একটু একটু করে রাত নামছে তখন মস্ত একটা লাল পূর্ণিমার চাঁদ নিয়ে, সেই আলো মেখে ঘর ছাড়ার আমন্ত্রণ নিয়ে ঘরের অভিমুখে চলতে থাকি...



Monday, November 23, 2020

হাওয়া বদল

 রানীগঞ্জ এসেছি কদিন হলো। আমার ওয়ার্কস্টেশন সমেত। পুরো সপ্তাহটা এখান থেকেই কাজ করে ফিরবো। যাইহোক,তো কেমন মনে হচ্ছে শীতের শুরুতে পশ্চিমে হাওয়া বদল করতে এসেছি আমরা! শনিবার এসে বিকেলে বাজার থেকে টুকিটাকি সব জিনিস যেমন দড়ি, তালা, মগ, শুকনো লংকা এসব এনেছি।নরম রোদে সকাল হয় একটু দেরীতে,কিচিরমিচির পাখির ডাকে। বারান্দায় চেয়ার পেতে চা খাই, একটা লোক হরেক রকম মাছ এনে বিক্রী করে যায়,এক দুটো প্রজাপতি উড়ে বেড়ায় সকালে নরম রোদে ডানায় ঝিলিক তুলে। শুকনো পাতার রাশিতে মচমচ আওয়াজ করে কাজের মেয়েটি, শিবানী, আসে। ওরা তিন বোন এক ভাই, সবার নামই ঠাকুর দেবতার নামে। বোকাসোকা আছে খানিক, নিজের মনে ঘুরে ঘুরে কাজ করে,  চা নিয়ে আরাম করে বসে পাঁউরুটি ডুবিয়ে চা খায়। সকালে রোদের ওম নিয়ে তাজা হয়ে বেরিয়ে টুকটাক বাজার আনি,তারপর কাজে বসি। রান্নাঘর থেকে ছোঁকছাঁক আওয়াজ আসে। গতকাল বিকেলে দামোদরের চরে গেছিলাম। দ্বারকনাথ ঠাকুরের বানানো কার এন্ড টেগোর কোম্পানির জেটির ভগ্নাবশেষ আর মন্দির ডানদিকে, আমরা ভুল করে বাঁদিকে শ্মশানে পৌঁছে গেছিলাম। শেষ বিকেলের গোলাপী আলোয় চিতার ধোঁয়া মিশে যাচ্ছিল। ছায়াছায়া অন্ধকার নেমে আসছিলো চারদিক জুড়ে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে দেখি অষ্টমীর চাঁদ উঠেছে চমৎকার। কোয়ার্টারটা একদম লাস্ট বাড়ি, তারপর ঝোপঝাড় গাছপালা। এই বাড়িটায় আমরা  ছাড়া আর কেউ থাকেওনা। মূলতঃ শিফটিং করতেই এসেছি আমরা। কারন বাড়িরটার ভগ্নদশা। দেওয়াল ফুঁড়ে গাছের শিকড়, বর্ষাকালে ড্যাম্প দিয়ে জল আসে।  অন্যবাড়িটার আশেপাশে লোক থাকে ভালোই হবার কথা।তাও আমাদের মন খারাপ করে বাড়িটার জন্য, সামনের আমগাছে শুয়ে থাকা কাঠবিড়ালিটার জন্য, পাশের ঝাউগাছটায় যেটায় হাওয়া দিলে শোঁ শোঁ আওয়াজ হয় সেটার জন্য, এই নির্জনতাটার জন্য।ওই বাড়িটাকে সাফসুতরো করে মুভ করাটায় নানান অছিলায় ডিলে হয়ে চলে। এখানে বাজার হাটে দেহাতি বা ব্যবসায়ী লোকেদের ভীড়। বাড়িগুলো অদ্ভুত শ্রীহীন। নীচে গুদাম উপরে বাস। পাকা দোতলা তিনতলা বাড়ি কিন্তু দেখতে কেমন যেন। ঘর দিয়ে বাড়িতে ঢোকার পর উঠোন। আর দেহাতি বস্তিটা আর পাঁচটা গরীব বস্তির মতোই, শুয়োর ঘোরাঘুরি করা।  

ফল দারুণ মেলে এখানে, স্টীলের জিনিসও খুব। রাস্তা দিয়ে সকালবেলা সেদিন যাচ্ছিলাম যখন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে ফুচকা, চাটের ঠেলা নিয়ে লোক বসে খোলা ড্রেনের সামনে। সকাল নটায় দিব্যি ফুচকা চাট খাচ্ছে লোকে। অবশ্য আমি ব্রেকফাস্টে চপ মুড়ি খাই আরাম করে গ্রামের বাড়ি গেলে। মাস্ক টাস্কের বালাই নেই কারো। আখ খাচ্ছে কটা ছোট ছেলে মেয়ে। এই রাস্তাটার নাম রাহুল সাংকৃত্যায়ন মার্গ! শূয়োত ঘোরা এ রাস্তাটায় এ নাম কে কী কেন কেউ জানেও না।  ভাবে হয়তো বড় কোনো পলিটিশয়ান ছিলো! দুপুরবেলা বাজার এলাকাটা তারে তারে জড়িয়ে যাওয়া জটের চেহারা নেয়। অজস্র টোটো, সাইকেল, বাইক, স্কুটি মানুষ ঠেলা আর মশলার গন্ধে একটা ঘূর্ণী তৈরী হয়। 


কোলকাতার আমার রাস্তার ধারের বাড়ির কোলাহল হঠাৎ যেন এক চুমুকে কেউ টেনে নিয়েছে এ বাড়িতে। সন্ধ্যে নামলেই ঝিঁঝিঁর ডাক ভেসে আসে। দূর থেকে মালগাড়ি কিংবা প্যাসেঞ্জার ট্রেনের হুইসেল। দুপুর গড়ালেই শীতের বেলা ফুরোনো টের পাওয়া যায়, যদিও শীত এখনো আরামদায়ক এখানে। একটা জিনিস খেয়াল করেছি, সরকারি কোয়ার্টারে আলো খানিক মিইয়ে থাকে। যত জোরালো আলোই লাগাও না কেন। সেই মিয়োনো আলোয় দূর থেকে দেহাতি গান ভেসে আসে। সে গান যেমন একঘেয়ে যেমন বেসুরো। যারা এ গান শুনে বড় হবে তারা গান মানে বন্দুকের নলই ভাববে!রাতে কখনো বারান্দায় গেলে ঠান্ডা বাতাস ঝকঝকে আধফালি চাঁদের আলো নিয়ে জড়িয়ে মড়িয়ে ধরে।  ঘুম নেমে আসে আমগাছের ডালে, কার্ণিশে,  ড্যাম্প ধরা দেওয়ালে, কম্বলের ওমে।





Saturday, November 7, 2020

কোজাগরী

 কোজাগরী, কে জাগরী...কেউ জেগে আছে কিনা দেখতে একটা মেয়ে সবার দোরে দোরে ফিরছে, এই ঘোর অমানিশায় জ্ঞান বিদ্যা শক্তি দৃঢ়তা নিয়ে কেউ জেগে আছে কিনা জানতে....এতো শক্ত শক্ত কথা অবশ্য বুঝতাম না কিছুই। লক্ষ্মীপুজো মানে হিম হিম রাতে ম্যাড়মেড়ে পুজো। ঢাক ঘন্টা কিচ্ছুর আওয়াজ হবে না,  হিম লেগে যাবার ভয়ে  জ্যোৎস্নায় ধোয়া পৃথিবী দেখা হয়নি আমার চৌহুদ্দির বাইরে। তারপর কবে থেকে কে জানে চাঁদ দেখতে পেলাম আর নেশা লেগে গেল। গোল্লামতো চাঁদটা উঠলে ঘরে থাকলেই আমার ভারী আপশোষ হয়, একটা চাঁদের আলো মাখা রাত নষ্ট হয়ে গেলো, জলের ধারে, ফাঁকা মাঠে, পাহাড়ে না হলে তো আলো মাখা যায় না। ছাদে উঠে দেখেছি হাজারটা আলোর মাঝে মন খারাপ করে চাঁদ সরে থাকে সে আলো মাখা যায়না। তাছাড়া ছাদ থেকে চাঁদের আলোয় বা বৃষ্টির জলে ভেজা আমার পোষায় না তেমন। লক্ষ্মীপুজো বলতে সবার খিচুড়ি আর নাড়ু মনে হয় কিংবা আলপনা, আমার কাছে আরেকটা চাঁদের দিন। অনেকদিন থেকে তাক করেছি কোজাগরী চাঁদের আলোয় ভিক্টোরিয়া কেমন দেখায়। সত্যিকারের পরীরা নেমে আসে কি?  কিংবা কে জেগে আছে খোঁজ নেওয়া মেয়েটা পেঁচা নিয়ে ঘুরে যায় বন্দী পরীর কাছে। পরীদের অমন দেখা যায়না সে কথা বুঝি ভুলে গেছিলাম।  তাই রেড রোড দিয়ে আর আর পার্ক সার্কাস ফ্লাইওভার দিয়ে খুব খানিক চক্কর কেটে গাছের ফাঁক দিয়ে ভিক্টোরিয়া দেখা গেলো,  কিন্তু চাঁদের আলো তেমন মাখা হলনা। সারা শহরের হাসপাতাল বাদে সব আলো বন্ধ করে রাখা উচিত মশাই পূর্নিমার রাতে। পাঁচবার পাক খাবার পর আশপাশের ভূতগুলো অব্দি সন্দেহজনক ভাবে তাকাচ্ছে দেখে পালিয়ে এক বন্ধুর বাড়ি খুব কড়া নেড়ে নেড়ে পালিয়ে এসেছি। পরে বলে দেবোখন আমার পোষা ভূতেরা করছিল।


লক্ষীপুজোর রাত পার হয়ে যায়, চাঁদ ক্ষইতে শুরু করে আর ফস করে হাওয়াটা কেমন বদলে যায়। শীতকাল অত ভালো না যে যাই বলুক। হ্যাঁ মটরশুঁটির কচুরি মেলে,  নলেন গুড়, পিঠে মোয়া কিন্তু তাও গরমকালের একটা আলাদা কেত আছে, অমন গুটিশুটি মেরে থাকে না। তাছাড়া এই হাওয়াটায় বাড়িতে বসে থাকা আরো খারাপ। এই সময়ের দুপুরবেলা হেঁটে কিংবা গাড়িতে কিংবা যাতে ইচ্ছে যেখানে সেখানে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে হয়। নৌকায় করে অজানা কোনো গঞ্জ, ভটভটি চড়ে ধূলো খাওয়া বিকেল।


আমার যে আর এই হিসেব কিতাব করতে মন চায় না,  মনের মধ্যে কে জেগে আছো ডাক আসে বার বার...ফস করে চলে যাওয়া আর হয় না...



Wednesday, October 28, 2020

শুভ বিজয়া

 হুট করে দিনের আলোয় একটা শেয়াল দেখা সাংঘাতিক উত্তেজনার ব্যপার। ঝকঝকে রোদ, কার্তিক মাস পড়ে গেছে, অক্টোবরের শেষ, রোদের তেজ কম কিছু না। করোনার কোনো ভয়ের ছাপবে দিকে নেই তেমন। এক বুড়ি পাঁচিল বেয়ে বেড়ে ওঠা লাউশাক পাড়ছে, ক্লাবের পুজোর মাইক বাজছে,  চার পাঁচটা বাচ্ছা ছেলে মেয়ের দল সাঁই করে ছুটে গেলো। এমন সময় শেয়ালটাকে দেখা গেলো মাঠের ধারে, হিসি করতে বসেছে। ভারী ভদ্র সভ্য শিয়াল কিন্ত। কাজ মিটিয়ে আমার দিকে একবার আলগা তাকিয়ে পাশের জঙ্গুলে জায়গাটায় ঢুকে গেলো। আমি বালি মাঠের পাশ দিয়ে চড়কতলা হয়ে হাঁটা দিয়েছি। কোথায় যাচ্ছি জানিনা, এমন রোদে খুব বেশীদূর যেতে পারবোনা। এই রাস্তাটা আমার ভারী ভালো লাগে, ডাক্তারদের বাড়ির পাশ দিয়ে পুকুরটা পেরোনোর সময় দুটো কাদাখোঁচা কে ডাইনে রেখে খানিক এগোলে মন্দিরগুলো। কার পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে বানানো কে জানে। মাইকের আওয়াজটা পিছিয়ে পরে ক্রমে। আরো এগোই,  আমার এই গ্রামের রাস্তায় হাঁটলেই কেমন নেশা লাগে, মনে হয় আরো খকনিক এগোই, বাঁশঝোপ, হলুদ রঙের জারুল ফুল, এবড়োখেবড়ো আল, ধানজমি, কদম গাছের ছায়া পেরিয়ে এগিয়ে এগিয়ে যাই, ফেরার কথা না ভেবেই এগোই। তা তো আর হয় না। ফোন আসে মায়ের, "কই রে খেতে আয়"।


সুজাতা বৌদি জোর করে একবার এসো না, দুটো গরম মোচারর বড়া খেয়ে যাও না, সুজিতদাদা পটল ক্ষেতে দেখতে পেয়ে হাঁক দেয়, " পাইলট আয় আয়, পটল নিয়ে যা।" কেউ না কেউ ডাকে, কবে এলি, কেমন আছিস, দিদিরা কই, মা কই খোঁজ নেয়, বাড়িতে ডাকে, বাড়ির ছোট ছেলে এসেছে। পুরোনো বাড়ির উঠোনে কারা যেন বেগুন গাছ লাগিয়েছে,সারা বাড়িটা জঙ্গলাকীর্ণ, কোনো কোনো জানলার শিক ভেঙে গেছে, মাটির উনুন দুটো কবেই হাওয়া হয়ে গেছে। খড়ের গাদা করা সেখানে। রান্নাঘরের চালটা ভেঙে গেছে। দোতলায় যাওয়ার রাস্তাটা আগাছায় ভরা। বড় মায়া লাগছিলো বাড়িটার জন্যে, আহারে বেচারি।  পিছনের আতা গাছটা হয়তো হাত বুলিয়ে যায় দক্ষিনের ঘরের জানলাটায়, আশ্বাস দেয় পরস্পরকে তার ডালেও আতা হবে আবার, আর এই বাড়ির ঘরেও হাসি কান্নার রোল উঠবে। লোক ডাকিয়ে বাড়িটা সংস্কার করায় না কেন? 


কুবুক কুবুক করে একটা পাখি ডাকছে নতুনপুকুরের পাড়ের জামগাছটা থেকে। মিঠুদি দু ছড়া মিঠে কাঁঠালি কলা দিয়ে গেছে, মেজদাদা ডাব পাড়তে গেছে।দশমীর ঢাক বাজছে ঠাকুরদালান থেকে। দশমীর বোলটা বড় বেয়াড়া, খালি মনে করিয়ে দেয় ছায়ার পালা শেষ বাকি রাস্তা সটান হেঁটে যেতে হবে বাঁধানো রাস্তায়। যা দম নেওয়ার নিয়ে যাও হে বাকি পথটুকুর।  


শুভ বিজয়া। 



Thursday, October 15, 2020

ফ কে লেখা চিঠি

 কোথাও একটা থামা দরকার বলে মনে হয়। আবার ঠিক উল্টোদিকেই মনে হয়, থামা মানেই তো ফুরিয়ে গেল। নেই মামা কানা মামা আর দুষ্টু গরু শূন্য গোয়াল কেস। ফেসবুকে,ব্লগে এসে বকম্বাজি করা শুরু যখন তখন শীতের লম্বা রাত, বরফ ঢাকা বোরিং সকাল। পেরিস্তানের  গোপন আস্তানার দরকার তো পড়েই তাই না? সেই আস্তানা থেকেই তোমার সাথে লম্বা আলাপের দিন রাত। একটা চিঠিও আমরা লিখিনি কিন্তু সেসব জুড়লে চিঠি হয় তো বটেই।  ক্রমে পেরিস্তানের সারল্য চলে গেল যেন, ডেটা আর নাম্বারে তৈরী ছায়া মানুষ হয়ে গেলাম কখন। তাই দেখছি, যা দেখাচ্ছে বা আমি দেখতে চাইছি,তাইই শুনছি যা শুনতে চাই। সাউন্ডস ইন্টারেস্টিং তাই না? কিন্তু তা না আসলে, যা শুনতে চাইনা তাও শুনতে হয় কখনো কখনো। তুমি জানো ভালো না লাগা আমাদের জন্মগত। একটা শূন্যতার আবরণ ঠিক ঘিরে থাকেই, তোমায় আলাদা করে বোঝানোর দরকার নেই। কারন আমরা জানিনা কিন্তু সে ভালো না লাগাটা এই নাম্বার আর ডেটা তো কমাতে পারলো না কই। সেদিন ভাবছিলাম, পেয়েছি অনেক নিঃসন্দেহে কিন্তু যে অনন্ত সময়ের বিনিময়ে তাকে কি একেবারেই বিনামূল্যে বলা যায়? খানিক আমাদের  সভ্যতার মতো না? আধুনিক চিকিৎসা,  সকলের না হলেও মোটামুটি সাধরণ মানুষের কাছে পড়াশোনা করার সুযোগ, বৃষ্টিতে শুকনো রাস্তা, বোতাম টিপতেই জল কিংবা আলো...দেওয়ার তো সত্যিই শেষ নেই।কিন্তু পরিবর্তে আমাদের যা দিতে হচ্ছে তাও কি কম? ধরো এই যে আমাদের এতো অবিশ্বাস, এতো ক্রোধ এতো বৈষম্য এতো ঘৃনা এত অশান্তি এও কি এর দায় না? নাকি আমরাই? আমরা আধুনিক বহিঃরঙ্গে হই আসলে সেইই সভ্যতার প্রাক মুহূর্তের লড়াই কিংবা অবিশ্বাস আমাদের মজ্জায় ঢুকে গেছে। অকারণ পশুপাখিদের মারার অভিশাপ আমাদের শেষ দিন অব্দি বইতে হবে, নিজেদের মেরে। আমার আজকাল হতাশ লাগে খুব জানো, সব জায়গায় এতো খারাপ এর অভ্যুত্থান কেন?  নাকি খারাপটা এই আমার একদা পেরিস্তান প্রোমোট করছে? কিজানি! 


অনেকদিন কথা হয়না, দেখা হয়না,  আমরা বড় বেশী ভয়ে বাঁচছি আজকাল। অবশ্য সবাই না। মুশকিল হল আমাদের চারপাশের লোকজন এমন ডিনায়াল স্টেটে চলে গেছে আদৌ আর দেখা হবে কিনা কে জানে। তবে জানো তো  ডিনায়াল স্টেটে  আমরা বরাবরই থাকি কমবেশী এবং তা আজকে থেকে না বহুযুগ থেকেই। যতখুশী খারাপ হোক আমরা তাকাবোনা, সেফ থাকবো আর ভাববো কেউ না কেউ না কেউ আমায় ঠিক রক্ষা করবে। নিজের ক্রশ নিজে বইতে ভুলে গেছি কিংবা শিখিইনি।  এই যে রোজ আমরা নেতাদের দোষ দিই, হাহাকার করি,  ইনফ্যাক্ট করছিও, তাতে তো আমাদের নিজেদের দায় কম না। গনতন্ত্রের একটা সময় তো আসতোই যখন ক্ষমতা এই ধরনের লোকেদের কাছে যেত, সেটা আটকাতে আমাদের নিজেদের কি কিছুই করার ছিলো না? আমরা সেফ থেকেছি, সেফ খেলেছি, আমাদের বাড়ির ছেলে মেয়েরা ডাক্তার জয়েছে কর্পোরেটের কী-বোর্ড পিষেছে কিন্তু প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নামা বা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হওয়া কিছু হয়ে উঠতে উৎসাহ দিইনি। মনের অন্ধকার না কাটা লোকজনকে আমরা প্রার্থী তালিকায় দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। রাজনীতি ওদের জন্যই, আমাদের না! 


তবে সব হয়তো শেষ হয়নি, হয়না। সেদিন ওষুধ আনতে যাবার সময় দেখলাম এক বুড়ো দাদুর হাতটা শক্ত করে তার নাতনী রাস্তা পার করাচ্ছে। কিছু মূল্যবোধ, আর অনেক ভালোবাসা না থাকলে হয়তো সব থেমেই যেত এতোদিনে। থামেনি কখনই যখন এসময়টাও থামবেনা। তবে মূল্য দিতে হবে আমাদের সবাইকে, এক জীবনে না অনেক অনেক জীবন ধরে। 


পুজো আসলেই অন্যবার কেমন আনন্দ হয়,  এবারে ভয়। তাও একটা চোরা আনন্দ, উত্তেজনা অপেক্ষাও আছে জানো। গ্রামে যাবো কিনা। আমাদের শিকড়ের ব্যপারটা খুবই গন্ডগোলের,  খুবই৷ কোথায় কোন তার জুড়ে আছে কে জানে। আমি তো সেই কবে থেকে গাঁ ছাড়া, তবুও গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় হাঁটবো, সবুজ ধানের শিশিরে পা ভেজাবো ভাবলেই মনের মধ্যে চনমনে ভাব আসছে। তুমি জানো পার্টিতে কোনের দিক খুঁজে বোসেথাকা লোকটা আমি, কারেন্ট এফেয়ার্স কিংবা ক্রিকেট  নিয়ে তর্ক করতে ক্লান্ত লাগা লোকটা আমি। হাঁটতে হাঁটতে অচেনা কোনো গ্রামে অচেনা কোনো রাস্তায় নাম না জানা গাছের ছায়ায় হাঁটতে আমি বরং বেশী স্বস্তি বোধ করি, ভাঙা ঘাটের পৈঠায় বসে থাকতে শান্তি লাগে। তাই জন্যই বাড়ি যাবার জন্য এতো উচাটন।


ফেরার কথা বলতেই ফিরতে হল, নিজের কাছে ফিরতে তো হয়ই। তুমিই বা আর কতদিন পালিয়ে পালিয়ে কাটাবে, ফিরবে না?


-

Thursday, September 10, 2020

কাছেপিঠে

 সকাল থেকে ঝড় জল, মেঘলা। সূর্য না দেখতে পেলে ভাল্লাগেনা। এই দুপুরে থম মারা আকাশে পাশের বাজারের মুরগীওয়ালার বাক্স থেকে মোরগের কঁকর কোঁ আওয়াজ আসছে। কেমন যেন পাহাড়ি জায়গায় আটকে গেছি মনে হচ্ছে। লকডাউনের জন্যই গাড়ি  বাইকের হর্ণ নেই, আওয়াজ নেই৷ কতদিনের পর সেদিন বেরিয়েছিলাম।  ফেসবুকে আর খবরের চ্যানেল এর বাইরে যে বিরাট দুনিয়া আছে, তারা দিব্যি আছে। মাস্ক এর বালাই নেই, করোনাতঙ্ক নেই। বাজার হাট করছে, বউকে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসিয়ে চলেছে। স্বাভাবিক দুনিয়া যেমন ছিল তেমন টাইপ। সত্যি বলব? দেখে রাগ হবার চেয়ে আনন্দই হল। ভুল ঠিক জানিনা বেঁচে তো আছে তারা। সুস্থ ভাবেই। আর আমরা হলাম ব্রয়লার মুরগী আমরা কিনা, তাই ফ্লাস্কে চা, কাগজের কাপ, স্যানিটাইজার এর বোতল, টিফিন ক্যারিয়ারে লুচি তরকারি, ব্রেকফাস্ট বক্সে স্যান্ডউইচ। খোরাক লাগছিল নিজেদের। চেনা রাস্তা ছেড়ে একটা অচেনা রাস্তায় গেছিলাম। দুপুরবেলায় খেয়ে আঁচাচ্ছে মেয়ে বউ, দুটো  জোয়ান লোক চিংড়ি মাছের খোসা শুকিয়ে গুঁড়ো করছে। লোকজন নেই কেউ ওখানে। মেছো গন্ধর ঝাপটা সরিয়ে মেঘের আড়াল ধরে হাঁটতে বেড়ে লাগছিল। ওই দূরে একদল লোক নৌকা নামালো জলে, আরো দূরে কাঁধে জাল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে এক বুড়ো। আহ! কতদিন পর আলাদা কিসিমের মানুষ দেখা গেল। আমাদের বাড়ির টবের নিমগাছটার যেমন বৃষ্টি হলে খুব ফুত্তিতে মাথা নাড়িয়ে গান গায় অমনি বেতাল ফূর্তি হল।  ফিরতি পথে আবার রিটার্ন গিফট,ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। সন্ধ্যে হয়ে গেছে তখন। গাড়ি সাইড করে চুপ করে বসে আছি কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না বৃষ্টির প্রাবল্যে, খালি গাড়ির আলোয় ড্যাশবোর্ডের উপর কারুকাজ হচ্ছে আলোয় ছায়ায়। আমি যদি আঁকতে জানতাম বৃষ্টিতে আলোতে ছায়ারে মাখামাখি আমার গাড়িটার ফূর্তির একটা ছবি আঁকতাম বেশ। আবোলতাবোল ভাবনার মাঝেই যেন ফিসফিসিয়ে জানান দিলো, দূর ছবি আঁকার কী, শিগগির আরেকদিন নিয়ে এসো বরং, গ্যারাজ বন্দী থেকে থেকে আর ভাল্লাগেনা। 

জড় জিনিস কথা বলবে কেমন করে ভাবছ বুঝি খুব। বলে, আমরা অমন আলাদা করেছি জড় জীব, আসলে ওদের ভাষা টের পাইনা বলেই। এইতো সেদিন, জায়গা অকুলান হচ্ছিল বলে নতুন ফ্রিজ আনাহল,পুরোনো ফ্রিজটার দুঃখ হচ্ছিল সেকথা বললেই ভাববে, আমার মনগড়া। কিন্তু সত্যিই পাচ্ছিল সে কষ্ট, একদিনের জন্যও খারাপ হয়নি সে, কোনো ট্রাবল দেয়নি, তবু তাকে বিদায় জানানো হচ্ছে তা সে ভাবছিল। ফিসফিস করে বললাম, সে অন্যজনের ঘরে যাবে। তারা তাকে আদরে রাখবে, নেহাত দরকার ছিল বলেইনা নতুন আনা। আমার কথায় কী বুঝল কে জানে, মনে হল যেন অভিমান কমলো তার। 

বড় মায়া হে, সমুদ্রের ঢেউ থেকে নির্জন বিচ,  সাহায্য করতে এগিয়ে আসা ফোগলা বুড়ো থেকে বুড়ো ফ্রিজ সবাই মিলে বড় আঁকড়ে থাকে। এক জীবন,বহুজীবন।



Tuesday, August 4, 2020

লকডাউন এফেক্ট

মানুষ দেখতে আমি ভালোবাসি। ঋকানন্দ খানিক অসামাজিক হলেও মাঝে মাঝে জমেও যায় কোথাও কোথাও। আজ বাজারে যেমন। ডাব অমিল হয়েছে খানিক এখন, এদিকে মায়ের পথ্যে ডাব চাই। খানিকদূর যাওয়ার পর এক বুড়ো মানুষের ভ্যান মিলল। খান দুই ডাব পড়ে আছে, নারকেলই বলা যায় তাদের। তা আমার উপায় নেই, নারকেলই সই। "নিয়ে যা নিয়ে যা, আমিও গুটিয়ে বাড়ি যাই। আমার হয়েছে জ্বালা। বিয়ে করে ফেঁসে গেছি একদম। ছেলেরা বসে আছে তাতে কিছু না, আমি বোস্থাকলেই যত রাগ।" 
এই রে,  গোলমেলে পরিস্থিতিতে পড়ে গেছি। সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, "আহা চাচা রাগ করো কেন, রাগারাগি করে কী লাভ। "
তাতে রাগ মোটেই কমল না, "আমিও বলে দিয়েছি, বেশী দেখলে, ছেড়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করে নেব। মেয়ে দেখা আছে। থাক পড়ে।"

ভক্তিয়ে কেঁপে গেলাম। সত্যি! এরকম তেজ, বীরত্বের কাহিনী স্রেফ শুনেছি আজ স্বচক্ষে দেখে মুচ্ছো যাবার মতই উপায়। তাছাড়া চাচার স্ট্যামিনাও তো বিস্তর! 

-  বলে দিয়েছ চাচা?

-নয়ত কি?

-আহা যাবে কোথায়, খাবে কি? 

- সে হেথা হোথা পড়ে থাকবো! 

তবে? অত ভাবনার বোঝা বইব নাকি? এই দুর্দমনীয় বীরকে নমো করে মানে মানে এগিয়ে গেলাম। একটা বাচ্ছা ছেলে মুসাম্বি বেচ্ছে সাইকেলে করে। বেচায় যে খুব মন আছে তা না।  হালকা গোঁফের রেখা দেখা গেলেও বাচ্ছাই, তাই খানিক দাঁড়িয়ে কেনা কাটা করা গেল। মুসাম্বির ভালোমন্দ আমি বুঝি না। তা দেবে দিক গা। 
জানা গেল সিক্সে পড়েন তিনি। যদিও সিক্সে গোঁফের রেখা দেখাটা আশ্চর্য বটে, সে যা হোক। বললাম, তা পড়াশোনা নেই, বেরিয়েছিস যে।

-ইস্কুল তো বন্ধ।

- তাতে কি বাড়িতেই পড় না হয়। কি আর করা যাবে।
খুব গম্ভীর গলায় বলল," এই বাজারে আর পড়াশোনা"।

আমিও ঘাড় নাড়লাম, সত্যিই তো।  ও বাবা, তারপরেই ব্যাটা ফিচেল হাসি হেসে বলে, "করোনার সুবিধেটাও নিয়ে নিই "। 

বুদ্ধিটা ক্লায়েন্ট ম্যানেজার এর উপর এপ্লাই করবো কিনা ভাবছি।