Wednesday, June 15, 2016

আমাচু

এভরিথিং কামস উইথ প্রাইস কথাটা আমি আর নতুন করে কি বলব।  ব্লগ এ পাঠকের সংখ্যা বাড়ার বদলে যে কমছে সে কি আমি মূল্য দিয়ে খরিদ করিনি।  দিনের পর দিন ফুককুড়ি করে কাটাই , অফুরান সময় বরবাদ করি সেই মূল্যেই এটা কেনা। একটা  দিলাম।  একবার মাথায় ভূতচেপেছিল রূপকথা লেখার সে সময়কার। তেমন দাঁড়ায়নি তাও যারা পড়েন যদি একটু মতামত দেন।
******************************************************************************

 সে এক দেশ ছিল নাম সর্গিরি। সেখানে গোলা ভরা ধান ছিলো , খাল বিলে মাছ ছিল, মোবাইল এ টাওয়ার ছিল, ইন্টারনেট এ স্পিড ছিল, রাস্তায় জ্যাম, খানাখন্দ কিচ্ছুটি  ছিল না।  কিন্তু আমাচু  এর মনে সুখ ছিল না. থাকবে কি করে তার যে নির্বাসন চলছে। হয়ত ভাবছ  নির্বাসন দেওয়া হয়েছে বলে সে বেজায় বাজে ছেলে, ইস্কুলে পড়া  না করা, কুকুরের লেজ এ পটকা ফাটানো ছেলে। তাহলে বাপু রোসো  একটু, আগে পুরোটা বলি কেন এমন হলো তার।আমাচু এর দেশ গোরামুর এর অদ্ভূত এক নিয়ম ছিল, পড়াশোনা করে আমরা যেমন চাকরি বাকরি করি ওদের দেশে নিয়ম ছিলো রাজার সেনাদলে নাম লেখাতে হবে। সেই সেনাদলে তোমাকে যুদ্ধ করতে হতে পারে রাজার হয়ে, সে রাজা যতই ভুল করুক, কিচ্ছুটি  বলা যাবে না, কিংবা রাজার যা আদেশ দেবে তাই করতে হবে।ভাবো একবার।  তোমার ইচ্ছে তুমি গিটার বাজাবে তা না তোমাকে চাষ করতে যেতে বললো  রাজা।তোমাকে তাই যেতে হবে।আমাচু ছিলো  বেজায় ভিতু আর কুঁড়ে।  তাই রাজা তাকে হুকুম দিল 'যাও তুমি ওই পূব দিকের যে প্রকান্ড মাঠটা  আছে সেখানে গরু চড়াও'। সে বেচারা আর কি করে তাই গেলো  করতে।ভাবছ বুঝি গরু চড়ানো  মজার কাজ মোটেই তেমন না , প্রায় মরুভূমির মত কড়া  রোদ সেখানে। তারমধ্যে সাপখোপে ভরা জায়গা। তবু আমাচু মন দিয়ে করত. কারণ ও সত্যি যে আর কিচ্ছুটি  করতে পারেনা। প্রথম প্রথম গরুগুলো জঙ্গলে হারিয়ে যেত, যেখানে সেখানে গোবরের নাদা ফেলে একাকার করত, কিন্তু আস্তে আস্তে আমাচু শিখে নিয়েছে কি করে গরুগুলোকে এক জায়গায় রাখা যায়, কি করে গরুর দুধ বাড়াতে হয়।  গরুপ্রধান ও খুব খুশি। খালি সুখ নেই আমাচুর মনে, থাকেই বা কি করে,চারিদিকে একটা জনপ্রাণী নেই, কাহাতক গরুদের  সাথে কথা বলে তাদের যত্ন আত্তি  করে দিন কাটে।  এমন সময় একদিন জঙ্গল পেরিয়ে, তারপর যে বড় মাঠটা  আছে সে মাঠ পেরোলে  যে গ্রামটা আছে, যার নাম কিরিমুরু  সেখানের লোকেরা এদিকে ঘুরতে এলো।আমাচু তো ভারী খুশি। ওদের সাথে গল্প গুজব করে তবু কটা দিন ভালই কাটবে ভেবে। তা কাটলও কটা  দিন মন্দ না।আমাচুরের ব্যবহারে খুশি হয়ে সক্কলে জানালো যে ওকে কিরিমুরু গ্রামের সাথে যোগাযোগ রাখতেই হবে। এদিকে ওই জঙ্গলে তো ইন্টারনেট নেই, তবে উপায়?কারণ  ওই দলের সাথেই আসা এনাকিনি নামের মিষ্টি মেয়েটাতো ওর জন্যে অপেক্ষা করে থাকবে। আমাচু  তখন করলো কি কাঠকুটো জড়ো  করে একটা নৌকো বানালো।  তারপর অনেক কষ্টে মাঝে মাঝে গিয়ে এনাকিনির সাথে দেখা করে গল্প করে আসত। এদিকে হয়েছে কি , গরুপ্রধান আমাচুরের  এই এডভেঞ্চার টের  পেয়ে গেলো।  সে লোকটা ভারী হিংসুটে, সে রাজামশাই কে জানালো, আমাচু  নিয়ম ভেঙ্গেছে।ও ব্যাটা ভুলে গেছে যে এই দেশে যা কখনও  ঘটেনি তা করাই হলো অন্যায়। আমাচু  তেমন কাজ করেছে। নিজের সীমানার বাইরে ও কিনা পা রেখেছে তাও এতবড় স্পর্ধা আমাদের পথ না থাকায় নিজেই নিজের পথ তৈরি করেছে! এদিকে রাজা পড়লেন মুশকিলে।  আমাচুকে মেরে ফেলা যায়  বা নির্বাসন দেওয়া যায় কিন্তু আজকাল আবার রাজ্যে বিদ্রোহ দেখা যাচ্ছে এদিক সেদিক , যদি আমাচুর কথা তাদের কানে ওঠে মুশকিল হয়ে যাবে। রাজামশাই বুদ্ধি খাটিয়ে আমচুকে বলল 'সর্গিরি দেশে  গরু গুলো চড়ানো শুনেছি ভারী মুশকিল, তুমি তো এ কাজে বেশ দক্ষ হয়েছ তাই যাও ওই দেশে গিয়ে গরু চরাও'।আমাচু  পড়ল বিপদে। কি করে আর , এনাকিনি কে বলে গেল যত্ততাড়াতাড়ি পারে সে ফিরবে। দিন যায় রাত যায়, আমাচুর  ফেরার দিন আর আসে না। রাজা খালি বলে না না এখনি আসবে কি। সর্গিলি থেকে কিরিমুরু গ্রামে নৌকো করে যাওয়া যায় না। সে অনেক দূরের  পথ। মাঝে পাহাড়, নদী মরুভূমি, ঠান্ডা সমুদ্র সব পরবে।  এখন উপায়! শেষ মেস  আর না পেরে আমাচু নাইটেঙ্গেল পাখিটার কাছেযাবে স্থির  করলো ।  সেই যে নাইটেঙ্গেল পাখিটা, মনে আছে তো।  সারা রাত শিশিরে ভিজে যে বুকের উষ্ণতা দিয়ে রাজকুমারির জন্যে একটা লাল গোলাপ ফুটিয়ে দিয়েছিল।  সেই নাইটেঙ্গেল। সবাই তোমরা জানো  বটে যে সে মরে গেছিলো , আসলে উষ্ণতার দেবতা ওর কাজে খুশি হয়ে ওকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল আর বর দিয়েছিলো  যে ও  হবে তাদের রাজা যারা এখনো ভালোবাসে। কারণ তাদের সবার থেকে উষ্ণতা নিয়েই নাইটেঙ্গেল প্রাণ ফিরে পেয়েছে।  আমাচু  জানে না কোথায় থাকে এই নাইটেঙ্গেল । আমাচু  বেড়িয়ে  পড়ল নাইটেঙ্গেলকে খুঁজতে। বড্ড শীত পড়েছে। আমাচু  গরু চড়ায় ,ওর কাছে গাড়ি ঘোড়া  কিছু নেই. কোথায় খুজবে নাইটেঙ্গেলকে। কিন্তু  নাইটেঙ্গেলকে আজ যে ওর বড্ড দরকার। আমাচু  পেলেট  নদীর ধারে  যে মস্ত ঝাঁকড়া গাছ আছে সেখানে গেলো।  সেখানে টুই পাখি আর টিটিটি  পাখি মন দিয়ে গান ধরেছে। কিচ কিচ পাখি ,ক্যাকাও এর সাথে কি একটা বিষয়ে গম্ভীর আলোচনা করছে। আসেপাশে আরো হাজারও পাখির মেলা। আমাচু  জিগ্গেস করলো তোমরা কেউ কিং নাইটেঙ্গেলকে দেখেছ? সব পাখি সমস্বরে জানালো কেউ দেখেনি। কেউ দেখেনি। আমাচু  তখন পিসিং সমুদ্রের ধরে বসে থাকা  সিগাল পাখি পককম  কে জিগ্গেস করলো "সী  গাল তুমি তো কত্ত পাখিকে দেখেছ যারা শীতকালে উড়ে যায় ওই দূর দেশে তুমি নাইটেঙ্গেলকে দেখোনি?' পককম  গম্ভীর ভাবে একখানা মাছ চিবুতে চিবুতে  জানালো সেও দেখেনি। মনের দুক্ষে আমাচু  গেলো  ঈভান পাহাড়ের চুড়ায় , কিন্তু সেখানে বরফে ঢাকা সব, কেউ কথাও নেই। আমাচু  আর কি করে ফিরতে লাগলো। খানিক দূর এসে ঠান্ডায় আমাচুর  নাকের ডগা অসার হয়ে গেলো। সস্তার টুপি  আর দস্তানা ভেদ করে কান আর হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ছেড়া  জুতো  ভেদ করে বরফের কুচি ঢুকে যাচ্ছে পায়ের মধ্যে। খিদেয়  তেষ্টায়  ঠান্ডায় আমাচুর প্রায় বেঁহুশ অবস্থা তখন। হটাৎ সুইটুইটুই সুইটুইটুই করে ভেসে এলো একটা স্বর।কিং নাইটেঙ্গেলএসেছে! 'আমাচু  , ওঠো দেখো আমি এসেছি' আমাচু  খুশিতে ক্লান্তিতে কেঁদে ফেলল।
'কেঁদনা আমাচু , তুমি ভারী ভালো ছেলে আমি জানি। এনাকিনি তোমার অপেক্ষায় আছে যাবে না তুমি'?
আমাচু  কাঁদতে কাঁদতে জানালো এনাকিনির কাছে ফিরতে গেলে ওদের দেশের রাজা ওকে কয়েদ করবে।  রাজা কিরিমুরু গ্রামের সক্কলকে বশ  করেছে, তাই কেউ চায়না এনাকিনি আর আমাচুর  বিয়ে হোক। ওদের ওরা একসাথে থাকতে দেবে না. ও এনাকিনিকে সর্গিলিতে আনতেও পারবে না , রাজার সেনারা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে এখন উপায়। এনাকিনির কাছে ও কেমন করে পৌঁছবে ?
কিং নাইটেঙ্গেল  বলল ও একটা বর দিয়ে  আমাচুকে কে পাখি বানিয়ে দিতে পারে কিন্তু আমাচুকে ঠান্ডা পিসিং সাগর পেরোতে হবে। নাইটেঙ্গেল  পাখি বর দিয়ে খালি নাইটেঙ্গেল পাখিই বানাতে পারে। যদি আমাচু পিসিং সাগর পৌঁছতে  গিয়ে জমে যায় তবে নাইটেঙ্গেল কিছুই করতে পারবেনা।  তবে আরো একটা উপায় আছে।  এনাকিনি যদি খুব খুব মন দিয়ে চায় আমাচুকে  দেখতে তবে এনাকিনির উষ্ণতায় পিসিং সাগরের ঠান্ডা ও কেটে যাবে।  কিন্তু এনাকিনি কে এক মুহুর্তও অন্য দিকে মন দিলে হবে না, তাহলেই পিসিং সাগরের ঠান্ডায় আমাচু পাথর হয়ে যাবে। কিন্তু পাখি হয়ে পৌঁছলে এনাকিনি আমচু কে চিনবে কেমন করে? নাইটেঙ্গেল জানালো সে উপায় আছে কিরিমুরু গ্রামে পৌঁছনোর  পর ভয় না পেয়ে রাজাকে কাছে দাঁড়িয়ে জানাতে হবে রাজা অন্যায় করেছে, আমাচু তাহলেই মানুষ হয়ে যাবে, আর কিরিমুরুর লোকেরাও রাজার বশ  থেকে বেরিয়ে আসবে।  এদিকে এনাকিনি তো এমনিতেই সারাদিন মনমরা হয়ে থাকে আর আমাচুর  কথা ভাবে। আমাচু জানে , আমচু তাই এককথায় রাজি হয়ে গেল। নাইটেঙ্গেল বললো  'বেশ , আজ  তুমি এমনিতেই ক্লান্ত, গিয়ে ঘুমিয়ে পর, কাল সকালেই রওনা  দিও। পরের দিন সক্কাল বেলা আমচু দেখল সে নাইটেঙ্গেল  পাখি হয়ে গেছে। আর কি তর সয়।  উড়তে থাক উড়তে থাক। পাহাড় , নদী মরুভূমি পেরিয়ে আমচু এলো পিসিং সাগরের সামনে। চারিদিকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া  দিছে। বরফ পড়ছে  সমানে , সূর্যের নাম গন্ধ নেই কোথাও। মনে মনে বলল আমচু এনাকিনি আমি জানি তুমি চাইছ আমি যাতে আবার কিরিমুরু গ্রামে তোমার সামনে হাজির হই। তুমি খালি সেটাই চাও, আর বলো মনে মনে ঘিরে থাকো  যাতে পিসিং সাগরের ঠান্ডা দৈত্য আমায় না ছুঁতে পারে। এনাকিনি শুনতে  পেল সেকথা সেইই দূর কিরিমুরুতে বসেও।  এক মনে যা বলা হয় তাই ঠিক পৌঁছে যায় সে তো তোমরা জানই। এনাকিনি তখন দূরের  জঙ্গলের পাশে গিয়ে একমনে বলতে লাগলো 'আমাচু  যেন পৌঁছে  যায়, পিসিং সাগরের ঠান্ডা দৈত্য যেন ছুঁতে  না পারে আমাচুকে '। এদিকে হয়েছিল কি রাজামশাই তো সবাইকে বশ করে রেখেছিলো  , এনাকিনির মা বাবাকেও বশ করে রেখেছিল।  এনাকিনি যখন একমনে ডাকছে , এনাকিনির মা এসে এনাকিনিকে খুব বকাবকি করতে লাগলোকেন এনাকিনি কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেড়িয়েছে , কেন এখানে আমাচুর  জন্যে কাঁদতে এসেছে, এনাকিনি কি জানে না, আমাচু  খারাপ, আমাচুকে নিয়ে সবাই তামাশা করে। গরুপ্রধান এর ছেলেই তো আছে, এনাকিনিকে বিয়ে করার জন্যে।তাছাড়া আমাচু রাজার প্রিয় না , আমাচু  খারাপ কারণ আমাচু  যা নিয়ম তা না মেন মেনে এনাকিনিকে ভালোবেসেছে। এনাকিনি এইসব কথায় হটাৎ মনসংযোগ  হারিয়ে ফেলে। এদিকে আমাচু  মাঝ সমুদ্রে তখন  , চারিদিকে হু  হু করা ঠান্ডা বাতাস। ঠান্ডার দৈত্যটা ছো মারবে বলে এগিয়ে আসছে। আমাচুকে ঘিরে থাকা উষ্ণতা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। আমাচুর  ডানা  পাথর হয়ে যাচ্ছে।
'এনাএএএকিনই' মনে মনে চেঁচিয়ে  উঠলো আমাচু। আমাচু  আর পারছে না। সব শক্তি একাকার করে ঠান্ডার দৈত্যের হাত এড়াতে চাইছে আমাচু। যে গাছটার  নিচে বসে এনাকিনি আমাচুকে ডাকছিল সেই গাছটা ফিসফিসিয়ে বল , 'এনাকিনি, এনাকিনি ,মিষ্টি মেয়ে , আমাচুকে ঘিরে রাখো। তোমার মা এখন রাজার বশে আমাচু  এসে সব ঠিক করে দেবে।' এনাকিনির হুশ ফিরল , তারাতারি আবার চোখ বুজে আমাচুকে ডাকতে থাকলো। আমাচু তখন প্রায় দৈত্যের কবলে। আমাচুর  শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে। কিন্তু তখন পাথর হয়ে যায়নি আমাচু। এনাকিনির উষ্ণতা একটু একটু করে জ্ঞান ফিরিয়ে আনলো আমচুর , তলিয়ে যাবার আগে উড়ে চলল কিরিমারুর পথে আবার। কিন্তু ছোট্ট পাখি সে এখন, এনাকিনির উষ্ণতায় এখনো ঠান্ডার দৈত্য ওকে পাথর করে দেয়নি , কিন্তু ছোট্ট শরীরে আমাচু  আর বল পাচ্ছে  না। আমচুর ঘুম পাচ্ছে ,  ৩দিন কিচ্ছু  না খেয়ে সে উড়ছে এখনো একদিনের রাস্তা বাকি। এমন সময় আমাচু দেখল একটা পীচ ফল কে যেন ওর ঠোটে ধরল। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে একঝাঁক  পাখি , ওরা এইসময় শীতের দেশ থেকে গরমের দেশে যায় ওদের নাম  দিংকানো।  ওদেরই  একজন  একজন  নিজের ঠোট  থেকে বাড়িয়ে দিয়েছে একটা ফল।
'আমাচু  ছোট্ট  পাখি , তোমার কথা আমরা জানি ,আমরা সবাই আছি তোমার সাথে'  ---কিচির মিচির করে জানালো ওরা।
আরও একদিন এক রাত উড়ে গোরামুর দেশে পৌঁছলো  যখন অর আর একফোটাও শক্তি বাকি নেই এইরত্তি শরীরে। কিন্তু আমাচুর  ওই বন্ধুরা, দিংকানোরা  তারপর  গোরামুর  দেশের গাছেরা  আমচুকে ভোলেনি।  গাছের দিল আশ্রয়, পাখিরা দিলো  খাবার, নদী দিল জল।  আমাচু  সুস্থ হয়ে সোজা উড়ে গেলো  রাজার কাছে।  একরত্তি পাখিটা গলা ফুলিয়ে জানিয়ে দিল রাজাকে রাজা আমাচুর  সাথে অন্যায় করেছে। সে এনাকিনিকে বিয়ে করবে আর কিরিমুরু গ্রামেই থাকবে। রাজা ওই খুদে পাখিরসাহসে ভয় পেয়ে গেল। যেই না ভয় পাওয়া, সব লোকেরা রাজার বশ মুক্ত হয়ে গেল, আর আমাচুও মানুষ হয়ে গেল আবার। তারপর আর কি দুজনে বিয়ে করে একসাথে সুখে দিন কাটাতে লাগলো। কিরিমুরু গ্রামের সক্কলে সে বিয়ের ভোজে হাজির ছিল। আর এসেছিল দিংকানোরা , টুই পাখি আর টিটিটি  পাখি কিচ কিচ পাখি ,ক্যাকাও ,পককম।  কিং নাইটেঙ্গেল এর এর অবশ্য ভোজ এ আসা হয়নি ওকে আর এক জায়গায় যেতে হয়েছিল কিনা । সে অন্য গল্প ,আমাচুর ভোজের খাওয়া  শেষ হোক তারপর বলব তোমাদের।



Tuesday, June 7, 2016

একলা পথে ...(বাকিটুকু)

শুরুতেই মাপ চাইছি , অনেকদিন পর আবার পরের পর্ব লিখছি তাই। বেশি বাকি নেই , আগেই শেষ করা উচিত ছিলো।

******************************************************************

 ...আবার একটা মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে এলাম। নদীর ঘাটে গিয়ে দেখি তখনো লোক হয়নি তাই এখন ভটভটি ছাড়বে। না নদীর ধরে ঘটে একা বসে রইলাম। আমার তাড়া নেই।  একজন দুজন করে লোক হচ্ছিলো। সব ৪-৬ জনের দোল. আমি একা তাই ভরসা আছে কথাও না কথাও ঢুকে যাব।  এক দলের এক মাঝবয়েসী লোক , বেশ একটা নেতা নেতা ভাব আছে,  দেখি মাঝির সাথে দরাদরি করতে শুরু করলো। মাথা পিছু ১৫ টাকার পরিবর্তে ২৫ টাকা করে দিলে সে আমাদের নিয়ে যাবে।নেতামষায় আর তার সঙ্গী ভদ্রলোক দুজনেই খানিক নেশা করেছেন , তবে নেতা মশাই এর অবস্থা কিঞ্চিত অস্থিতিমূলক।ভটভটিতে এক মহিলাও ছিলেন , আলগা চটক আছে। তাকে দেখে তো নেতা মশাই এর নেশা এবং অস্তির অবস্থা বেড়ে গেলো। হটাৎ লম্বা হয়ে নৌকোয় শুয়ে পড়লেন। সঙ্গী বললেন " কিরে কি হলো? তুই ঘুমোনোর জন্য এলি নাকি " ?
-তুই থাম।  বরং একটা গান কর।
সঙ্গী হাঁ। নেতা মশাই আবার বললেন , " জানিস না রাজেশ খান্না যখন শুয়ে ছিলো শর্মিলা ঠাকুর গান গাইছিলো '!
কে যে রাজেশ খান্না কে যে সর্মিলা ঠাকুর পুরো ঘেঁটে ঘ।  সঙ্গীর অবস্থা করুন। মেয়েটি মুচকি হাসলো। নৌকো এগিয়ে চলেছে।ওদিকটা বাংলাদেশ এদিকটা ভারত। আমার বাংলাদেশ নিয়ে তেমন কোনো টান বা  নস্টালজিয়া নেই , তবু অদ্ভূত একটা মনের ভাব হলো।  খানিক দূরে তিন নদীর মোহনা। জলঢাকা , ইছামতি আর একটার কি নাম ছিল ভুলে গেছি। খানিক নদীর উপর ঘুরে ফেরা। চা খেতে সেইচা এর দোকানেই আবার।  খিদে পাচ্ছিল , কিন্তু কোনো খাবারই মন:পূত  হচ্ছিলনা। আরো খানিকক্ষণ থাকতে ইচ্ছে করছে।  ওদিকে মেঘ করেছে  খুব।  থাকি আর একটু? বৃষ্টি হলে ভিজব না হয়। এই করে আরো খানিকক্ষণ কাটিয়ে বাইক স্টার্ট করার পর পরই তিনি এলেন। আকাশ ভাঙ্গা না হলে বেশ ঝমঝমিয়ে। তীরের ফলার মত বিধছে গায়ে।  তবু দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না।  রাস্তায় লোক কমে গেছে। গাছগুলো মাথা নেড়ে নেড়ে এনজয় করছে দিব্বি , ব্যাটা থাকতোরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। হু হু বাওয়া , আম্নুষ হওয়ার মজা মন্দ নাকি। দেখ দেখ কেমন সাঁই সাঁই  করে চলেছি আর  বিভিন্ন জায়গার বৃষ্টি দেখতে দেখতে ভিজতে ভিজতে যাচ্ছি।
কিঞ্চিত পরেই অবিশ্যি এ সুখ আর ছিলো না , বৃষ্টির দাপট বাড়ল , আমার পক্ষিরাজ থামলো।  গাড়ি থামিয়ে আপাদমস্তক ভেজা অবস্থায় এক কা এর দোকানে চা চাইলাম। লোকটা কিরম সন্দেহ জনক দৃষ্টিতে দেখছিল , যেন এরকম ভিজে কেউ যায়না।  যত্তসব জ্বালাধরানো ফোস্কার দল।
উহ বেজায় ঠান্ডা রে বাবা।  কাঁপতে কাঁপতে  রওনা দিলাম।  

Wednesday, April 27, 2016

একলা পথে ...

আমার মাথার মধ্যে একটা পোকা আছে যেটা কিনা প্রায়ই নড়ে ওঠে। খাচ্ছি , অফিস যাচ্ছি , আড্ডা মারছি , বই পড়ছি সব ,  ওই , দিনকতক কোথাও না বেড়াতে গেলেই কিরকম অস্থির অস্থির লাগে। আমারপক্ষিরাজ মানে আমার পালসারটাও আস্তাবল মানেগ্যারাজে বন্দী থাকলেক্ষেপে যায়।  আর কেউ টের না পাক আমি পাই। তাই কোনো এক শনিবার না রবিবার দুম করে বেরিয়ে পরেছিলাম। মানে ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজতে মাজতে সিদ্ধান্ত ঘুরতে যাব , তো চালাও পানসি বেলঘরিয়া।
বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় অবধি ঠিক ছিলো গাদিয়াড়া যাব ,কিনতু হটাৎ  করেইমত বদলে টাকি।  টাকিতে লোকে পিকনিক করতে যায় বা ভাসান দেখতে।  আমার কিনতু টাকি যাওয়ার এক এবং একমাত্র কারণ ছিল ইছামতি। এমন সুন্দর নামের একটা নদী তাকে না দেখে থাকা কি ঠিক! নদীর বুঝি অভিমান হয়না।

বাইক এ তেল ভরা নেই --দূর  দেখা যাবে , রাস্তায় কি আর কিছু পাবোনা।  ...এহে ক্যামেরাটাও তো আমার কাছে নেই ---তাতে কি চোখের লেন্সটা তো আছে রে বাবা।  উফফ বয়স্ক লোকেদের মতো করিস না তো , চল তো ,যা হবে দেখা যাবে। কিছু খেয়ে বেরোতে বলেছিলেন বটে বাবা কিনতু আমি এমনিতেই যথেষ্ট দেরী করে ফেলেছি এরপর দেরী করলে রোদ উঠে যাবে। এয়ারপোর্ট এর জ্যাম কাটিয়ে মধ্যমগ্রাম পৌঁছলাম , স্পীড ৬০-৬৫ এর বেশি ওঠেনি তেমন। মধ্যমগ্রাম থেকে ডানদিকের বাদু যাবার রাস্তা ধরে এগোলাম, বারাসাত দিয়ে না গিয়ে।  রাস্তা মোটামুটি যেমন খারাপ হয় তেমনই , ভালো হবে এমন আশাও ছিল না। রাস্তা চিনিনা , এদিক সেদিক জিগ্গেস করে এগোচ্ছিলাম।  তা হটাৎ  একটা রাস্তা বেশ ভালো লেগে গেল. চারিদিকে প্রচুর গাছপালা রাস্তাটার , আর বেশ মসৃনও বটে।কিনতু ইনটুশ্যন  বলছে এ রাস্তা ভুল।  তবু ওই রাস্তা ধরেই এগোলাম। কিছুদূর গিয়ে আমার অনুভূতি  সত্যি করে রাস্তাটা ভুল প্রমানিত হলো। আমায় ঠিক প্রমান করলো মানে মারাত্মক ভাবে ঠিক প্রমান করলো।  রাস্তা বলে আর কিছু নেই।  একধারে ভেড়ি আর অন্যপাশে ইঁট  পাঁজা।  আর আমার চমত্কার মসৃন রাস্তা একটা মাটির রাস্তায় পরিনত হয়েছে। অত্যন্ত অসমান।  প্রচুর ধূলো উড়ছে। ভেড়ি দেখে আমায় থামতেই হলো।  জল দেখলেই আমি আরস্থির থাকতে পারি না।  একজন লোক মাছ ধরছে। "ও কাকা কি মাছ ধরছ?" , বেশ একটা "কুবের হে মাছ কিবা" স্টাইল নিয়ে জিগ্গেস করলাম।  লোকটা আমায় সম্পূর্ণ  উপেক্ষা করে উদাসীন হয়ে মাছ ধরতে লাগলো , কয়েকটা ছেড়ে দিলো।  ভাগ্যিস আসে পাশে কেউ নেই , এই বলে মনকে সান্ত্বনা দিয়ে আমি নিজের মনে ভেড়ির  জল , মাছেদের লাফালাফি , পাখিদের ওড়া উড়ি ,পোড়া ইঁটের  গন্ধ নাকে নিয়ে দেখতে লাগলাম। আহা বড্ড ভালো লাগছে।  টাকি  অবধি যাওয়ার কি খুব দরকার আছে. এখানেই দাঁড়িয়ে থাকি না কেন।
            হটাৎ  লোকটার মনে হয় আমায় ন্যালাখ্যাপার মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মায়া হলো।  আমার সাথে খানিক কথা বার্তা বললো।  কথা থেকে আসছি কোথায় যাব।  মানে সেই চিরন্তন বেসিক প্রশ্ন।  আমি অবশ্য দার্শনিক জবাব দেওয়ার রিস্ক নিইনি  , এ চত্বরে মেরে পুঁতে দিলে কেউ খবর পাবে না।  যাইহোক সে চিংড়ি মাছ ধরছে সে খবর শোনার পর আমার চটকাটা ভেঙ্গে গেছিলো। আবার বাইক স্টার্ট করলাম।  এহে বেজায় ধূলো। রাস্তা অতি খারাপ , আজ ফিরে পালসি কে চান করাতে হবে। এই সময় পুরো দুনিয়ার উপর রাগ হয়ে যায়। শালা বড্ড রোমান্টিসিজ্ম এর ভূত চেপেছিল  না তোমার।  নাও বোঝো এখন।
সাড়ে ১২টা  পৌনে একটা নাগাদ পৌঁছলাম শেষমেষ।
আমার পালসি কে একধারে দাঁড় করিয়ে রেখে চক্কর কাটা শুরু করেছি, হটাৎ   একটা ডাবওয়ালা কাম  ভ্যানওয়ালা এসে আমায় খুব উত্সাহের সাথে জিগ্যেস  করলো "কোথা থেকে আসছ  , বর্ডার দেখতে যাবে? বাইক তো যাবে না -- তা কোনো ব্যাপার না।  ক জন আছ  তোমরা?"
-"আমি একা। "
- "একা তো ভাই একটু বেশি ভাড়া  পরবে , তা তোমার থেকে বেশি নেব না তুমি আমায় ২০০ টাকা দিও। "
ধুস কোথায় ভাবলাম একাবোকা দেখে সাহায্য করতে এলো।  বুঝলে হে সবই give  এন্ড take . তাকে কাটিয়ে আমি এগোলাম খানিক।  এদিক সেদিক জেনে বুঝলাম বাইক  যায় বর্ডার কিংবা  মিনিসুন্দরবন অবধি তবে আই -কার্ড লাগে , তা আমার তো ড্রাইভিং লাইসেন্স আছেই।  মিনি সুন্দরবন আর কিছুই না কৃত্রিম ভাবে খানিকটা জায়গায় সুন্দরবন অঞ্চলের গাছপালা লাগানো হয়েছে।  টাকির আসল রাজবাড়ি ভেঙ্গে গেছে আর একটা আছে তবে তা দেখতে আমি একটা উত্সাহী না।  বস , বর্ডার মিনি সুন্দরবন সব হবে আমি আগে একটু ইছামতি দেখতে চাই. যার জন্যে আসা।  গেলাম নদীর ধারটায়। ঘটে কেউ নেই , বসলাম।  স্বপ্নের ইছামতির সাথে  স্বাভাবিক ভাবেই মিললনা।  না মিলুক।  এই ইছামতি আলাদা থাকবে আর স্বপ্নেরটাও থাকবে। এক বুড়ো মাঝি দাঁড় বেয়ে চলেছে।  খানিক আগেই শুনেছি , হাতেটানা  নৌকো বন্ধ।  চড়তে হলে ভটভটি চড়তে হবে , তাই দাঁড় টানা নৌকো দেখে খুব উত্সাহ নিয়ে ডাকলাম - "ও চাচাআআআ ,... নেবে একটু, একা আছি, কোনো ঝামেলা করব না। " কিনতু আবার সেই উদাসীনতা! আমাকে একটুও পাত্তা না দিয়ে বুড়ো  মাঝি তার নৌকো নিয়ে চলে গেল।  একটু নিলে কি এমন ক্ষতি হতো  . দূর দূর।  উঠে পড়লাম।  যাই একটু মিনি সুন্দরবনই দেখে আসি।  তার আগে এক কাপ চা পেলে মন্দ হয় না!
                                            আমার মুখের মধ্যে মনে হয় একটা অজ্ঞানতার চাপ আছে।  তাই আমায় বেশির ভাগ লোকেই জ্ঞান দিয়ে ওই অজ্ঞানতাটা মুছে দিতে চায়। এখানেও তার বিরূপ ঘটল না।  চা দোকানি  ভদ্রলোক বললেন - " কলকাতাআআ  থেকে  একা আসছ !এই বয়েসে বাইক  চালাচ্ছ ! না না খুব রিস্কি , একা একা এতদূর আসা বাইক  নিয়ে। " মনে মনে বললাম 'যতোটা ছোট ভাবছেন অতোটাও না , মেঘে মেঘে বেলা মন্দ হয়নি। ' মুখে বললাম " হ্যা কাকু এইতো চলে তো এলাম। "
- "কিসে পড় ?"
এটাও বাঁধা প্রশ্ন।  ওই যে অজ্ঞানতার ছাপ তার ফল মনে হয়। একবার একজনকে মরিয়া হয়ে বলেছিলাম "পড়িনা , ক্লাস সেভেন পাস করে এদিক সেদিক হাতের কাজ করি। " চাকরি করি বললে উল্টোদিকের লোকজন হয় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মত করতে থাকে বা দর্জি হয়ে যায় , জুল জুল করে মাপতে থাকে , তাই আমি আজকাল আরবলিনা আমি কোনো এক বাতানুকূল  অফিসের শ্রমিক , লোকে গালভরা নাম যাই দিয়ে থাক না কেন।  বরং বলে দিই কিছু একটা যখন যেমন মনে আসে।  বললাম "ফার্স্ট ইয়ার এ পড়ি। " মানুষটা  খারাপ না , আমায় বললেন, " দেখো এদিক সেদিক ঘুরে।  বর্ডার মিনি সুন্দরবন,ভটভটিতে চড়বে তো চড়ো। বনধুদের  সাথে এলে আরো ভালো করতে।"  একা এসেও যে আমি খারাপ করিনি সে কথা তাঁকে না বলে আমার পক্ষিরাজ কে বললাম "চল তোকে মিনিসুন্দরবন ঘুড়িয়ে আনি । সুন্দরবন তো মনে হয়না যাওয়া হবে তোকে নিয়ে। "

মিনিসুন্দরবন  জায়গাটা ভালো।  কৃত্রিম ভাবে তৈরী হলেও , ভারী চমত্কার জায়গা। সুন্দরী গাছ ,মাঝে মাঝে পাখিরা উড়ছে, ডাকাডাকি করছে।  একটা জায়গায় ঝুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলাম খানিক।  হাঁটাহাঁটি করতেও দিব্যি লাগছিল। স্থানীয় কিছু মহিলারা খেজুর গুড় , রস আর কি কি যেন সব বিক্রি করছিল।  অনেকবার ধরে ডাকাডাকি করার পর দাঁড়িয়ে পরে বললাম " না গো দিদি , আমি খেজুর রস খাইনা , আর এখন এই চড়া রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে খেজুর গুড় খাওয়ার ইচ্ছাও নেই (এটা অবশ্য মনে মনে বলেছি )।"
-"নিয়ে যাও খেজুর গুড়  বাড়ির জন্য।"
তাতেও আমি ঘাড়  নেড়ে উদাস গলায় বললাম নাহ।  কি জানি কেন আমি কিছু না নিলেও তার আমাকে বেশ পছন্দ হয়েছিলো , হতে পারে আমি তার গুড়ের খাঁটিত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলিনি বলে কিংবা আমায় দেখে তার যাদবপুর  পড়তে যাওয়া ভাই এর কথা পরে গেছিল সেই জন্যে।  
-"গুড়  তুমি বানিয়েছ দিদি?"
-"নাহ তোমার জামাইবাবু , ও এইসব বানায় আমি খালি বিক্রি করি। "
-"কখনও  বাংলাদেশ গেছো ?"
- নাহ আমাদের কেউ তো ওখানে নেই খামোখা যাব কেন। "
তার সাথে আরও খানিক গল্প হলো।  তার ভাই যাদবপুরে পড়ে। সবসময় তো লোক আসে না , এইবার গরম পরে গেছে আর রসও  হবে না লোকও  হবে না।  আমায় বললো  "মুখটা তো শুকিয়ে গেছে একেবারে, খাওয়া দাওয়া করেছ কিছু? চট  করে মিথ্যে আমি বলতে পারিনা , বিশেষ করে এমন মায়া নিয়ে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে মিথ্যে আদৌ বলা যায় কিনা আমি জানিনা , তাই সত্যিটাই বললাম , এখানে তো খাওয়ার দোকান তেমন নেই , ফেরার পথে খেয়ে নেবো কিছু। বললো "  চলো  আমাদের বাড়ি কাছেই ,  ওখানে যাহোক দুটো মুখে দেবে।" সামান্য একটা জিনিসও কিনিনি আমি তার থেকে , তবু কে ভাবতে পেরেছিলো এমন অচেনা একজন  মানুষ তার মায়ার আঁচল  বিছিয়ে দেবে। আমি আমার জীবনে এরকম কত মানুষের কাছে যে ঋণী  আমি জানি না।  একবার কলেজে পড়ি  তখন।  প্রচন্ড এক গরমের দুপুরে কলেজ এর ক্লাস না করে মাঠে মাঠে ঘুরতে বেড়িয়ে ছিলাম।  রাস্তা ভুল করে তেষ্টায়  যখন ধুঁকছি , আমাদের হোস্টেল এ কাজ করতো  এমন একজন আমায় ডেকে  তার বাড়ি নিয়ে নিয়ে ঝকঝকে ঘটি ভরে ঠান্ডা জল দিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে খেতে নিষেধ করেছিল , এবং জলের সঙ্গে খানকতক বাতাসা দিয়েছিল , শুধু জল খেতে নেই।  আমি এদের ভালবাসা কক্ষনো ফিরিয়ে দিতে যাইনি  কারণ আমার সে ক্ষমতা কোথায়।  খালি বুকের মধ্যে যখন অনেকটা ফাঁক  হয়ে যায় , বেড়িয়ে  পরি আমি জানি পথে ঘাটে  সে ফাঁক  বুজিয়ে দেওয়ার লোক আছে। (ক্রমশ) 

Saturday, April 16, 2016

বসন্তে বরফে

ধরা যাক শুক্রবারের রাত বৃষ্টি দিয়ে সুরু হয়েছে, এবং আপনি জানেন শনিবার ও রবিবার স্নো স্টর্ম এলার্ট আছে। ভরা বসন্তে। অবশ্যই শীতের দেশের  কথা হচ্ছে এখানে।  গাছ-টাছ গুলো পুরো  ঘেঁটে গেছে, বল ভাই ফুল ফোটাবো না ফোটাবো না।  ওসব ফুল ফুটুক না ফুটুক জাতীয় কাব্য করা পোষাচ্ছে না আমদের।  সারা শীত অপেক্ষা করে সবে একটু মাঞ্জা মারতে লেগেছি আর সেসময় এইসব ঝকমারি ভাল্লাগেনা সত্যি! তা আমি এসব কথা জানি কারণ আমার তো নির্বাণ লাভের বিশেষ বাকি নেই , আমি হত জন্মে কি ছিলাম কিঞ্চিত বুঝতে পারি , আগামী দিনের শিষ্য শিস্যাদের জন্য এগিয়ে রাখছি আর কি।  আমি আগের জন্মে গাছ ছিলাম , তাই এ জন্মে আমার এক জায়গায় থিতু হতে এত আপত্তি , বোর ভাবটা এখনো এজন্মেও আছে আর কি।  আর আমার রোদ উঠলেই যে এত ফূর্তি হয় তার কারণও ওই পেটুক মানুষ তো তাই আগের জন্মে কিসে খাবার দাবার বানানো যেতো সেটা এ জন্মেও মনে রেখে দিয়েছি আরকি। তো যা বলছিলাম , সকাল বেলা খামোখা ঘুম ভাঙ্গার যেদিন কারণ থাকবেনা সেদিনই তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙবে , আড্ডা মারার যখন কেউ থাকবেনা আড্ডা পাবে এসব তো চিরন্তন সমস্যা ও আজকাল আমি গায়ে মাখিনা। তাই চোখ মটকে , কম্বল চাপা দিয়ে ভাবছিলাম ঠিক কি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করলে শুধু  এবং শুধুমাত্র নাকটা বাইরে বেরিয়ে থাকবে, বাকি সমস্ত চোখ কান মাথা ঢাকা থাকবে। আর সেই সঙ্গে ফেসবুক আর চ্যাট কর্তে কোনো সমস্যা থাকবে না. তা উত্তর যে আসবেনা তা তো আমরা জানিই(অবশ্য বদলে তুমি বলে কে  আসার কথা সেও আসেনা) , কিন্তু এক বন্ধুকে খুব বেশি জ্বালাতন করায় একখান আইডিয়া দিলো অবিশ্যি।  ওই সেই হতোনা ছোটবেলায় কিছু জিনিস নিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করলে হাতে একটা কিছু ধরিয়ে দিয়ে বলতো যাহ পালা এটা নিয়ে, বা কই দেখি কে আজকে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে পারে বা কে বেশিক্ষন  চুপ থাকতে পারে সেরকম।  বলল স্নো পরছে যখন যাও না কেন একটা স্নো ম্যান বানাও না , আর শোনো গাজর দিও নাকে , তোমায় ভরসা নেই কাচকলা গুঁজে দিতে পারো। তা প্রথমে আমি বলেছিলাম যে আমি তো বাচ্ছা  ছেলে না , যে স্নো ম্যান বানাবো, সে তখন জ্বালাতনের হাত থেকে বাঁচতে মরিয়া , খুব উত্সাহ দিলো , আরে বাচ্চা বয়েসে কি তোমার ওখানে বরফ পড়ত ? ইত্যাদি ইত্যাদি।  তা বার আমি খেয়ে যাই , খেয়ে গেলামও ( ভালই হয়েছে স্বীকার করি অবশ্যি) জ্যাকেট জুতো গ্লাভস পড়ে  , বাড়িতে যে বাচ্চাটা থাকে তাকেও বললাম কিরে চল  যাবি নাকি। তার মা তো খচে ব্যোম , এই না টিনটিন ওকে আমায় এখন রেডি করাতে হবে। তা আমি তো প্রায় সন্ন্যাসীর লেভেল এর মানুষ , তাই নির্বিকার ভাবে বললাম তা করাও না , আমি অপেক্ষা করতে পারি , কিরে যাবি তো? স্নো ম্যান বানাবো কিন্তু আমি। ব্যাস আর কিছুর দরকার পরে কি।  দুই মক্কেল , বড়া মহারাজ ছোটা মহারাজ চলিলেন, সাগর থুড়ি বরফ সঙ্গমে। তা আমি যেমন বুদ্ধিমান , একখান জায়গায় অনেক স্নো জমা করে স্নো  ম্যান  রূপ দেবার চেস্টা করছিলাম। 
এমনটা শুরুতে আমি করছিলাম 

বাচ্ছাটাই বললো আরে টিনটিন এরকম না , স্নো  ম্যান বানাতে প্রথমে তোমায় একটা বড় আর একটা ছোট স্নো বল বানাতে হবে।  প্রথমে একটা স্নো  বল বানিয়ে রোল  করো  তাহলেই ওটা বড় হয়ে যাবে। আমি দেখলাম সত্যিই তাই। দূর দূর কত কম জেনেও যে মানুষ বাঁচে আমায় না দেখলে বোঝা মুশকিল। তো যাই হোক দুখানা স্নো বল হলো ছোটটিকে বড়র মাথায় বসানো হলো।  গাছের ডাল ভেঙ্গে হাত আর চোখ ও হলো।  কিন্তু ওই নাকেই  সমস্যা। আমার যেমন আমার বানানো স্নো ম্যান এর ও তাই হবে , স্বাভাবিক , কুছ নেহি তো থোড়া  থোড়া  তো হবেই। যতবার আমি গাজর গুঁজি ততবার সে পপাত চ।  এমন কল্লে রাগ ধরে না, দিয়েছি জোরে গুঁজে ব্যাস , আমার স্নো ম্যান এর মুন্ডুও গেলো।  এত সইতে পারে কখনও।  রাগ করে বললাম আমার ক্ষুদে সঙ্গীকে সব ব্যাটা এই গাজরের দোষ।  কিন্তু যথারীতি ছোটরা  জানে বেশি , আমায় বলল  না টিনটিন , আসলে এই স্নোটা তেমন স্ট্রং ছিলো  না। পরেরবার অবশ্য  ভালই হয়েছিলো।  


তারপর আমরা বরফে দৌড়াদৌড়ি করে স্নো  ফাইটও করেছি হু হু।  বসন্ত আসুক না আসুক কত্তা ফূর্তি  বেড়ে হয়েছে।



Wednesday, March 23, 2016

নানারকম (৮)

ধরুন আপনি বিদেশী রেস্তোরাতে খেতে গেছেন , চোখের সামনে থরে থরে সাজানো জিলিপী। লালচে হলুদ রসালো বস্তুটা দেখেই চোখ অবভিয়াসলি চকচক করে উঠবে। মেনুতে দেখি জিলিপীর নামও নিশান নেই।  ভাবলাম ডেকে জিগ্যেস করে ব্যাপারটা বুঝিয়ে নাম জেনে অর্ডার দেবখন। মধ্যপ্রাচ্যের দোকান এর হিসেব মেনে বেশ সুন্দরী একজন খাবার দাবার দিচ্ছিল।  তাকে এই বিষয়ে খানিকটা জ্ঞান দেওয়া তো ফু মশাই। বেশ ডেকে গুছিয়ে বলা হলো , ওই যে প্যাঁচানো , সোনালী বর্ণের বস্তুটি দেখা যাচ্ছে , ওটা আমাদের অতি প্রিয় একটি ইন্ডিয়ান মিষ্টি। তা ওই বস্তুটা আপনাদের ফ্লেভার এ কেমন হয় তা জানার বিশেষ আগ্রহ  হচ্ছে।  তা ও জিনিস কে বলেন কি আপনারা?
"ওহ ইউ মিন জালেবী "? 
আমাদের মুখের অবস্থা কেমন হয়েছিল সে বর্ণনা না দেওয়াই ভালো। 
খেতে গিয়েছিলাম জেরুজালেম বলে একটি রেস্টুরান্ট এ।  ছোট্ট , বাঁশ এর দিয়ে ঘেরা ছাউনি মতো করা।  দেখনদারির দিক থেকে ভারতবর্ষের যেকোনো পাহাড়ি এলাকার পাতি রেস্টুরেন্ট এর মতই। কেবল মাছি নেই ,আর প্লাস্টিক এর জগ নেই , যেটা এক্ষুনি উল্টে পরে একাকার হবে। আমরা অনেকজন ছিলাম তাই একটা গোল টেবিল বৈঠক এর মতই  বসে অর্ডার নিয়ে বিরাট চিন্তায় পরে গেলাম। তার কারণ অনেক কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে।  শেষ মেষ আলাদা আলাদা অর্ডার করাই সাব্যস্ত হলো। আমি একটা কম্বিনেশন প্ল্যাটার নিয়েছিলাম।  তাতে ফালাফেল নাম একটা অতি সুস্বাদু খাবার থাকে  যেটা কিনা আমাদের আমাদের পৌকোড়ার মত খেতে অনেকটা। সেটার সাথে হামাস ডিপ থাকে। আর ছিল আঙুর পাতার একটা বস্তু।  খেতে মন্দ না।  আর থাকে অনেক কটা কাবাব আর পোলাও এর মত একটা ব্যাপার। 
এটা গুগল বাবুর থেকে ধার করা ছবি , আমি খেতে ব্যস্ত ছিলাম তাই ভালো ছবি তুলতে পারিনি 
এইটার নাম হলো ল্যাম্ব শ্যাঙ্ক ,আদতে পার্সিয়ান খাবার সম্ভবত 

এখানার নাম চিকেন Gyro



বাক্লাহামা বলে একটা মিষ্টি খেলাম , মশাই কি বলব দিল জান তর হয়ে গেল একেবারে। বেশি মিষ্টি খাইনি , একটা জিলিপি একটা বাক্লাহামা আর একটার নাম ভুলে গেছি ,  দেখা হিসেবে নাম দিলে  খেজুর স্যান্ডউইচ বলা যায়।
********************************************************************************

আমি যেখানে থাকি সে বাড়িতে একটা বাছা আছে যে মোটামুটি আমার বন্ধু স্থানীয়।  আমার বাচ্চাদের ততক্ষণ ভালো লাগে যতক্ষণ না তার বাবা মা তাদের প্রতিভার প্রদর্শন শুরু না করে। স্বাভাবিক বাচ্চা গুলোর সাথে আমার বরং বেশ জমেই যায়।  তো সেই ছেলেটার সাথে আমার যেহেতু বন্ধুত্বপূর্ণ  অবস্থান , তাই সে কার্পেট এ জল ঢাললে আমি ব্যাপারটা চেপে দেওয়ার চেষ্টা করি , সে মাঝে মাঝে চাঁদে বা মঙ্গলে রকেট ছাড়ে , আমি তার একমাত্র প্যাসেঞ্জার যাকে সে প্রাণ হাতে করে জায়গা দেয়।  এবং অবশ্যই যখন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা হয় , এক আধটা বুলেট অর গায়ে লাগলেও (ইচ্ছে করে নয়রে ভাই , আমি পাষন্ড না) চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করে না।  তো একদিন আমি কৌতূহলী হয়ে জিগ্যেস করেছিলাম , সারাক্ষণ যে তোমার রি দুটো  "গুড পিপল" আর "ব্যাড পিপল" এর ফাইট চলে , কেন? ভালোরাই তো জিতবে ?
"ওহ টিনটিন , আমি তোমাকে আমার মতো বুদ্ধিমান ভেবেছিলাম। যে ভালো যুদ্ধ করবে সেই জিতবে" ।
ঠিকই তো , ভালো খারাপ তো বিজয়ী বা বিজিত নির্ধারণ করেনা , যুদ্ধ করে , ক্ষমতা করে।  বাচ্ছারা চিরকালই বুদ্ধিমান হয়। 






Friday, March 4, 2016

ঘোরাঘুরি - হার্শী(2)

জীবন অনেকটা বাইক চালানোর মতো। হু হা স্পিড তুলে যাচ্ছ , আচমকা গর্ত , লাও , হয় ছিটকে পড়লে নয় কোনরকমে বেঁচে গেলে।হাঁ সাবধানী বাইক ওলা কি নেই আর , প্রচুর। অচেনা রাস্তায় ৪০ এর বেশি স্পিড তুলবেই না। আমি ওই প্রথম শ্রেণীতে পড়ি। বাইক  থেকে ছিটকে পড়ি , চোট্ পাই আবার অজানা রাস্তায় গাড়ি ছোটাই। অজানা রাস্তা আমায় গাছের ছায়া , নদীর জল দেয়, এবড়ো খেবড়ো রাস্তাও দেয়না এমন নয়। এত কথা বললাম কারণ হার্শী ঘোরার বাকিটুকু বলতে বসেছি কিনা। 
যাই হোক , হার্শীতে পৌঁছে , অনেক কেক , মিষ্টি (বাড়ির তৈরী বেকড সন্দেশ) আরো অনেককিছু সাঁটিয়ে দেখি অর্ণব দা , আর অনন্যাদি দুজনেই আমার জন্যে হরেক রকম গিফট এনে রেখেছে। আহা এই বয়েসেও বড়দিনের গিফট পেতে কি যে ভালো লাগে তা কি বলব। তা এমন দাদা দিদি কি আমার পাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু পেয়েছি তো :)।  
বেকড সন্দেশ 

হু হু বাওয়া , ছবি তুলে রেখেছি,  এক আধটাও সরানোর চান্স নেই 

আমরা দুটি ভাই যিশুর গান গাই 


 দেহে মনে বল জোগার করে বেরোনো হলো, অরুনাংশু দার বন্ধুকে নিয়ে আসা হলো। তারপর বাকি কটা  দিন যা আড্ডা হলো তা তো আর না বললেও চলে। এর মাঝে একদিন নর্থ আর সাউথ এর যে সিভিল ওয়ার  হয়েছিলো , সেই গেটিসবার্গ যাওয়া হলো। একটা জিনিস দেখে ভালো লাগে , বিজয়ী এবং বিজিত দুইয়ের জন্যই স্বারক রয়েছে।কেমন উত্তর দক্ষিন ঝগড়া করার পরেও মিলেমিশে আছে, আমাদের ভারত পাকিস্থান বাংলাদেশ এর বর্ডার মুছে যদি এমন একটা যুক্তরাষ্ট্র হত বেশ হত কিন্তু। তা হওয়ার না বোধহয়।  পারস্পরিক কারনহীন ঘৃনা কি আর যাওয়ার। 



গেটিসবার্গ যাওয়ার পথেই এদেশের আদি অধিবাসী আর বর্তমান অধিবাসী দের লড়াই এর গল্পটা জানা হলো। আগে ভাসা ভাসা  জানতাম। ব্রিটিশ উপনিবেশের একদল দন্ডপ্রাপ্ত আসামী জাহাজে করে ছেড়ে যাওয়া হয়।  ঠান্ডায় খিদেতে তাদের নরখাদক করে তুললেও শেষ রক্ষা হয়নি। সেই জাহাজের কেউই বাঁচেনি। তারপর আরো দু জাহাজ লোক আসে, আরো বেশ কিছুদিন পর. তার কয়েকজন টিকে যায়।তারপর আরো এবং তারাই ক্রমে শক্তিশালী হয়ে এদেশে আদি অধিবাসীদের মেরে তারায় , লুকিয়ে পরতে বাধ্য করে।  
গেটিসবার্গের যে জায়গায় লড়াই এ  উত্তরের লোক জিতে গেছিলো ( দক্ষিন নাকি একটা সময় অবদি জিতছিলো তারপর তাদের সেনাপতি ভাবলো আরে এত মেরেই এনেছি প্রায়, চলো সোজাসুজি চার্জ করা যাক, এদিকে গরুগুলো বোঝেনি পাহাড়ের নিচে আছে ওরা , ওই ভাবে হামলা করা আর আত্যহত্যা করা একই ব্যাপার হবে) সেই জায়গায় একটা একটা স্থাপত্য আছে যেটা কেমন দূর্গ মার্কা দেখতে। তবে উপত্যকাটা সত্যি সুন্দর।ছোটো টিলা , ঢেউ খেলানো মাঠ , গাছের সারি সব মিলিয়ে চমত্কার ল্যান্ডস্কেপ।


আসলে এই হার্শী গ্রামটা বেশ সুন্দর।ছিমছাম ছোট্ট। দূরে পাহাড় আছে, ছোটো নদী আছে , আঙুরের খেত আছে। ঘোড়ার আস্তাবল আছে আবার চকোলেট  ফ্যাক্টরি এবং তার কারণে গড়ে ওঠা এই জনপদ টাতে রেসের মাঠ ও আছে।
হার্শী চকলেট ফ্যাক্টরি এর লোকজন ব্যবসা ভালো বোঝে তাই , ওখানে গিয়ে কি করে চকলেট তৈরি হয়ে তার ডেমো দেখা যায়। এমনকি একখান করে চকলেট খেতেও দেয়. কিন্তু যেখান দিয়ে বেরোয় লোকে ওই ট্যুর শেষ করে সেখানে যথারীতি গুচ্ছ ম্যাগনেট টিশার্ট ইত্যাদি হরেক মাল, যার দাম মোটেও ৫টাকা নয়। 
বোঝো!




আঙুরের ক্ষেত আর ঘোড়ার চারণভূমি পাশাপাশি। আমি আগে কখনও আঙুর ক্ষেত ও দেখিনি, ইচ্ছে ছিলো আঙুর  ছিঁড়ে মুখে ফেলার কিন্তু , ইয়ে একা কিংবা আমার বাঁদর বন্ধুকুলের সাথে যাইনি।  তাই সংযত বাচ্চা হয়ে রইলাম।

আঙুর ক্ষেত 




ইন্ডিয়ান ক্রেভের্নস বলে একটা গুহা আছে যেখানে স্ট্যালাগটাইট আর স্ট্যালাগমাইট দেখা যায়. এক ভদ্রলোক নাকি এখানে একা একা বিশ বছর কাটিয়েছিলেন।বোঝো! ওই প্রায়ন্ধকার গুহায় এদ্দিন কাটানো! কার সুখ যে কিসে থাকে কেই বা বলতে পারে।

এটা ভুট্টার মত দেখতে না?



সেই আমিশ দের গপ্পো বলেছিলাম না কোন একটা লেখায় তারা 

চাকা ব্যবহার করে বলে সভ্য সমাজের সাথে মিশবো না 


 ফেরার সময় গ্রেহাউন্ড এর বাস ধরে ফিরছিলাম। রাতের বেলা ট্রাভেল করা একটা অন্য অনুভূতি। দুপাশের গাছ গুলো ছায়া ছায়া হয়ে থাকে। দূরে মিটমিটে আলো।আকাশে আজ মেঘ বলে পুরপুরি অন্ধকার ননা। কেমন আলোর একটা আভা এখনো। পেন্সিলভেনিয়া থেকে ওয়াশিংটনডিসি এর রাস্তায় খুব বেশি শহর পরে না। একটানা গাড়ির স্রোত, ভিডিও গেমস এর মতো।
একটু একটু খিদে খিদে পাচ্ছিলো, পকেট হাতরে দেখি, ক্রিস্পি মজুদ। অনন্যাদি, রাস্তার কথাও ভোলেনি।শরতচন্দ্রকে "সেন্টিমেন্টাল " টাইপ বলে যতই খোরাক করি, সেই কবে লিখে গেছিলো " এদেশের পথে ঘাটে দিদিরা রয়েছে", আজও সমান সত্যি,শুধু দেশে না বিদেশেও।

Tuesday, February 9, 2016

ব্যাচেলার আর বাচ্ছা

আমাদের মতো ব্যাচেলার  দের খুব যন্ত্রণা। বিবাহিত এবং ছোটো বাচ্ছা হয়েছে এমন বন্ধু বান্ধব দের সংখ্যা কম না। তাদের ধারনা ছুটির দিন,  অফিস দিন যেকোনো সময়েই তাদের সময়ে তাদের বাচ্ছাদের বিপুল বুদ্ধি (যা কেবল ও কেবলমাত্র তাদের ছেলে/মেয়েদেরি আছে) দেখতে আমি খুবই উতসুক, কারন আমি ব্যাচেলার আর আমার অফুরন্ত  সময়। আর মশাই বিয়ে শাদি করে ছেলে পুলে হলে লকে এমন ভোঁতা হয়ে যায় জানা ছিলো না।  ফেসবুকের দৌলতে তারা কবে হাঁটছে, লাথি মারছে সব জেনে ধন্য হচ্ছি তাতেই শান্তি নেই, সেদিন রোববার,  সুন্দর  রোদ উঠেছে।  আমি সারা দিন ল্যাদ খাওয়ার ইচ্ছে নিয়ে ১২টার সময় প্রথম চায়ে চুমুক দিচ্ছি। এক সহকর্মী  র ফোন,  দুপুরে খেতে ডাকছে। শুনতে সাধু প্রস্তাব। কিন্তু এর একটা ছোট ছেলে আছে, সুতরাং সেই বিস্ময় বালকের কান্ড কারখানা আমায় শুনতে হবে ও পরম পরিতোষে আহা অবিশ্বাস্য বলতে হবে। ইয়ে হবে না,  হয়েছিল। আমার সাধের রবিবার দুপুর স্রেফ ইন দ্য ভোগ অফ বাচ্ছা হয়েছিলো :(

Friday, January 29, 2016

নানারকম 7

বেড়ানোর গল্পটা না শেষ করে অন্য বকবক করছি বলে মাফ চাইলাম আগেই।  কিন্তু কি করবো , আজকে যে রোদ ঝলমলে সকালে হাটতে পেয়েছি। বেশ কয়েকদিন পরে আজ টেম্পারেচার ০ এর উপরে। আজ ইচ্ছে করেই হেঁটে এলাম। এখানকার রাস্তায় এমনিতেই লোকজন কম , তে শীতকালে এরই কম।  তাই বরফ চূড়ো পাহাড়টা পাশে নিয়ে,হাত পা নেড়ে গান গাইতে গাইতে  হাঁটতে দিব্বি  লাগছিল।  মাথার উপর দেখি একঝাঁক বোকা হাঁস ক্যাও ম্যাও লাগিয়েছে। বোকা না বলে উপায় কি , জানুয়ারি শেষ হতে চললো এই সময় ওরা এখানে কি করছে , ওদের তো এখন আমাদের দেশের ওদিকে থাকার কথা! নির্ঘাত জিপিএস হারিয়ে ফেলেছে, আর এখন চেঁচামেচি করছে। 

দেশে বইমেলা শুরু হয়ে গেছে।  বইমেলাটা আমার মত কিছু বই পাগলের কাছে দুর্গাপূজোর মত। বই দেখব ,নাড়বো ঘাঁটবো , হয়ত বেশি কিনিনা , কিন্তু লিস্ট করে রাখব। কলেজ স্ট্রিট থেকে কিনব বলে। আহা। বইমেলা  হলো এমন এক জায়গা যেখানে একা একাও যাওয়া যায়, দোকাও যাওয়া যায় ,দল মিলেও যাওয়া যায়।  প্রতিটা জায়গার চরিত্র বদলে বদলে যায় কার সাথে যাওয়া হচ্ছে তার উপর। যেমন গঙ্গার পারে একা বসে থাকতে যেমন লাগবে , পাশে প্রেমিক/প্রেমিকা থাকলে অন্যরকম , আর বন্ধুরা থাকলে অন্যরকম। কিন্তু বইমেলার চরিত্র বদলায় না। এত বই এত বই , কি কিনবো কি কিনবনা সেটাই সব না। 

আজকে আবার মেঘলা দিন।  বাড়ি থেকে বেড়িয়েই দেখি পাইন গাছের মধ্যে  দিয়ে শন শন  করে হাওয়া দিছে।  শব্দে মনে হচ্ছে সমুদ্দুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আজ আর নীল পাহাড়টা পাশে নিয়ে হাঁটা যাবে না, গাড়িতে যেতে হবে। 
কয়েকদিন আগে একটা স্টেট পার্ক এ গেছিলাম। উপত্যকার মতো।  পুরো মাঠ জুড়ে বরফ চিক চিক করছে।  অনেকদিন আগের মরে যাওয়া এক ড্যাম এক পাশে পরে আছে।  বরফ এর নদীর মতো লাগছে দেখতে।  কয়েকটা গাছ যারা পাতা জড়িয়ে ফেলে না তারা বসন্তের ভরসা দিচ্ছে। আর যাদের পাতা নেই তারা অদ্ভূত জীবনীশক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বসন্তকালের জন্য। 



মৃত নদীও দাগ রেখে যায় 



কতদিন হয়ে গেলো বাড়ির বাইরে। ভয় করছে , চেনা মুখগুলো বদলে গেছে নাকি কে জানে। তবু রিস্ক তো নিতেই হবে, ফিরতেও হবে। কোলকাতা নিয়ে এই পোস্টটা  দেখলাম সেদিন ফেসবুকএ , রইলো 


Thursday, January 14, 2016

ঘোরাঘুরি-হার্শী(1)

শীত পড়ছেনা শীত পড়ছেনা করে রোজী আক্ষেপ শুনি বাড়ি থেকে।  শীত কালের যে কি সুখ কি জানি বাপু।  হাজার খানা সোয়েটার কম্বল জড়িয়ে বসে থাকা। ব্রাশ করা থেকে শুরু করে বাড়ি ফিরে হাত মুখ ধোয়া তক , হাড় দাঁত সব্বাইকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলা! শীতকাতুরে যারা প্রেম করে তাদের কি সমস্যাতাই না হয়! প্রেমিকার সামনে মাফলার জড়িয়ে দাড়ানোর মতো বুকের পাটা আর কজনেরই বা হয়।  আহারে তারা নিগ্ঘাত বাড়ি ফিরে হেঁচে কেশে একাকার হয়।  এছাড়া বাইক  চালানোর সময় হেলমেট খুলে কেত মারার উপায় নেই , বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফুকবে সে যো নেই। এর চেয়ে মশাই গরম কাল ঢের ভালো।  আহা ফুরফুরে হওয়ায় উড়তে উড়তে বাইক চালানো , ইচ্ছে হলেই জল খেতে পারা( দাঁত  থেকেহাড় ঠান্ডা হওয়ার ভয় না করে) ইত্যাদি ইত্যাদি।  তবে হাঁ  শীতকালের মরশুটির কচুরি , নলেনগুড় দিয়ে পিঠে , ইত্যাদি সুখাদ্যের সমাহার হয়, বইমেলা হয়।   তাই শীতকালটা সওয়া  যায় কষ্টমষ্ট  করে। তবে এসবই  দেশের কথা।  এখানে তো শীতকাল মানে ঘরবন্দি। ঘুরতে যাওয়া যাবে না , হাঁটতে যাওয়া যাবে না , দূর দূর।

তাই অনন্যাদি যখন ডাকলেন ওনার বাড়ি ঘুরে যাবার জন্য আমি তো শুধু খাড়া না রেডি স্টেডি গো  বলে ছুটবার জন্য প্রস্তুত। ফ্রন্টিয়ার ডিলটাও দিচ্ছিলো  ভালোই  মোটামুটি। এই সুত্রে একটা কথা বলে রাখা ভালো , এই অনন্যাদি আর অরুনাংশুদা , এনারা দুজনেই অসম্ভব ভালো দুজন মানুষ , আগের বার এনাদের ওখানে গিয়েছিলাম গল্পটা লেখা হয়নি। আমার ব্লগটা হলো দুধ ভাত টাইপ ব্লগ , নির্দিষ্ট পাঠক নেই , কেউ আদৌ পরে কিনা কে জানে তাই না লিখলেও কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি। তাই আমার মতো আলসে মানুষের  লেখার কন্টিনিউইটি  বজায় থাকে না। প্রায় দুবছর হতে চললো আমি দেশ ছাড়া। তবে  ২০১৫ সালে আমি যা পেয়েছি তা অভাবনীয়। তারমধ্যে এই দুজন মানুষের সাথে পরিচিত হওয়া একটা ঘটনা তো বটেই। সব মানুষ তো সমান হয়না, কেউ গোলাপফুল ফোটায় কেউ খালি কাঁটা গাছ হয়ে থাকে। আমি মানুষ হিসেবে ওই কাঁটা গাছ শ্রেনীর।  লতানে তাও আবার।  তা আমার মতো স্বল্প বুদ্ধি , স্বল্প সাহসওলা কুকড়ে  মানুষগুলো যে করে কর্মে খাচ্ছে, তার কারণ ওই অনন্যাদিদের মতো মানুষরা  আছেন বলে।  একটু বেশি ব্যক্তিগত কথাবার্তা হয়ে যাচ্ছে বোধহয় , বোরিং , কিন্তু আমার ঘুরতে যাওয়ার গল্পও তো ব্যক্তিগতই।

তো যাক যা বলছিলাম , ফ্রন্টিয়ার এর ক্যারি অন লাগেজেও টাকা লাগে।  খালি একটা ব্যাকপ্যাক নিতে দেয়। তা আমার মতো ভবঘুরে মানুষের তাতে হয়ে যায়।  একটু চাপাচাপি করতে হয়নি তা নয় তবে সেটা ম্যানাজ করা যায়।
কোথাও যাওয়ার নাম শুনলে মনটা এমন হয়ে যায় অফিসের কাজকম্ম মোটামুটি ডকে উঠে যায়। তার জন্য আমায় ফাঁকিবাজ বললে কি আর করা।  ২৪ তারিখ ওই একটা ব্যাকপ্যাকে হয়ে যাবার যে কেতটা নিলাম একটু আগে , তার ফল টের পেলাম। আমাদের একটা ইংরাজি গপ্পো টাইপ ছিলো।প্যাকিং নাম ছিলো তার। একদম সেই কেস! যাই হোক ২৫তারিখ ভোর ভোর উঠে এক কাপ কফি বানাতে বানাতে আমার বন্ধুকে কল করলাম , তা সে উঠে পরেছিল ,যাই হোক ধরাচুড়ো পরে রওনা হলাম।  সিকিউরিটি লাইন এ কত  কিসিমের মানুষ দেখা যায়।  একজনকে দেখি কোট প্যান্ট পরে পায়ে চপ্পল , কেউ কেউ এই ঠান্ডাতেও হাফ প্যান্টুলুন পরা! ডেনভার এয়ারপোর্ট এ যতবার আসি টার্মিনাল টু  টার্মিনাল সাবওয়ে ট্রেনটা খুব উপভোগ করি। ট্রেনএর একদম সামনের কামরায় উঠলে সামনেটা বোঝা যায় , সাবওয়ে সারফেস বা টেম্পল রান এর জগতে ঢুকে পরেছি মনে হয় আর তারপরেই টার্মিনাল চলে আসে। সিকউরিটি পেরিয়ে এক কাপ কফি নিয়ে বসা গেলো জুত করে।
বাইরে তখন আলো ফুটছে সবে। পাশের আইলে ছোট্ট একটা কুকুর সহযাত্রী। বড়দিন বলে পাইলট থেকে এয়ার হোস্টেস মাথায় লাল টুপি। দিনটা বড় করেই শুরু হচ্ছ।কফির কাপে ছোট্ট চুমুক, আর ঘর থেকে বেড়িয়ে পরার আনন্দ।



আমার বাস ছিলো ওয়াশিংটন ডিসির ইউনিয়ন স্টেশন থেকে।  হ্যারিসবার্গ অব্দি।একটু চিন্তা ছিল।  ফ্লাইট দেরী করলেই তো চিত্তির। উবের বা লিফট নেব ভেবেছিলাম। তাও , অনেকসময়েই ওরা দেরী করে দেয় খুব. যাই হোক সময়ের অনেক আগেই পৌঁছে গেলাম। হাতে সময় ছিল তাই ইউনিয়ন স্টেশনটা  ঘুরে।  বেশ বড় টার্মিনাস। Amtrak এর ট্রেন ছাড়ে।  নিউয়র্ক , বস্টন , পেনসিলভেনিয়া নানান জায়গার যাবার বাস আছে। খিদে পেয়েছিল বেশ , খাবার দোকানও ছিল। (অনেকগুলো অবশ্য ২৫  বন্ধ ছিলো )  , আমি একটা ষ্টারবাকস দেখে এক কাপ কফি নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে দেখি লাইব্রেরী !!   আর সেখানে থেকে তুমি খুশি মতো বই নিয়ে নাও। আর তোমার কাছে এক্স্ট্রা  বই থাকলে দিয়ে দাও।  ভাবা যায়! এ জিনিস দেখে নড়ার সাধ্য রইলো না, খিদে বাবাজীবন সারা রাস্তা তার শোধ নিয়েছিল অবশ্য় ।


ওয়াশিংটন ডিসির সাথে আমার বৃষ্টির একটা সম্পর্ক আছে। আগেরবার এসেছিলাম যখন তখন এরকম আকাশ ভাংগা বৃষ্টি নেমেছিল। সেই বৃষ্টি ভিজে শহর দেখার গল্প করেছি অন্যজায়গায় । এবারে বৃষ্টি বাল্টিমোর থেকে শুরু হয়েছে। ওয়াইপার পাগলের মতো মাথা নেড়ে চলেছে, ভিজতে পারছিনা বটে তবে ভেজা হাইওয়ে শচিন কর্তা, সুমন , রফি , হেমন্ত এর গান (বাসে wifi আর প্লাগ পয়েন্ট দুইই ছিলো ) সব মিলিয়ে অসাধারণ লাগছিল। 
দুবার হল্ট দিয়ে শেষ মেষ বাস পৌঁছলো যখন আমি তখন কাহিল প্রায়। (চলবে)


Monday, January 4, 2016

ঘোরাঘুরি -সী -ওয়ার্ল্ড

--এই লেখাটা ম্যাজিক ল্যাম্প ওয়েবজিন বেরিয়েছিল। 

ছোটবেলায় দেশ বিদেশের এডভেঞ্চার পড়তে পড়তে কিংবা নতুন দেশের ছবি গল্প শুনতে শুনতে সবারই মোটামুটি আমাদের ইচ্ছে করে কবে যাব ওই সব জায়গা গুলো। না ফ্রান্সিস, বিমল কুমারের মত এডভেঞ্চার আমার হয়নি। তবে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে কিছু।আমার প্রোজেক্ট  লোকেশন  ছিলো ক্যালিফর্নিয়া যখন এদেশে আসি। ভারী চমত্কার জায়গা ক্যালিফর্নিয়া। কালিফোর্নিয়ার আমি যেখানে উঠেছিলাম সেই জায়গাটার নাম অরেঞ্জ কাউন্টি। ওখান থেকে সী  বিচ গুলো কাছাকাছি। এছাড়া  ডিজনিল্যান্ড ইউনিভার্সাল ষ্টুডিও তো আছেই। এছাড়া আছে স্যান ডিয়াগো , প্যাসিফিক ওশান এর পাশের শহর। স্যান দিয়াগোতে  সি ওয়ার্ল্ডটা  দেখার ইচ্ছে বহুদিন ধরেই। সি ওয়ার্ল্ডহলো একটা এনিম্যাল থেমে পার্ক। মানেবিভিন্য মজাদার রাইড এর পাশাপাশি , সামুদ্রিক  প্রানীদের  নিয়ে তৈরি পার্ক। তাদের নিয়ে শো হয়. এমনি ঘুরে দেখা যায়। আমেরিকার  বেশিরভাগ প্রদেশে গাড়ি হলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বস্তু।  সৌভাগ্যক্রমে আমি যেখানে ছিলাম সেখানে গাড়ি ছাড়াও চলাচল সম্ভব। মানে বাস ট্রেন আছে আর কি। 
সঙ্গী নেই কেউ যাবার।তাই একা একাই একদিন বেরিয়েই পড়লাম। ও  হাঁ এইখানে বলে রাখি  আমার দেশে কেনা স্মার্টফোন  বিদেশে এসে আনস্মার্ট হয়ে গেছে। যে ফোনটা ব্যবহার করি যার  জিপিএস নেই। আমাদের দেশে জিপিএস ছাড়া অজানা জায়গায় যাওয়া কোনো বাপারই না।  কেউ না কেউ দেখিয়েই দেবে।  কিন্তু এদেশের লোকজন এতটাই টেকনোলজি নির্ভর সে আশা বৃথা। যেদিন যাব ঠিক করেছিলাম তার আগের দিন সন্ধ্যেবেলা গুগল করে পুরো বাপারটা নোট  করে নিয়েছি। দুটো বাস বদলাতে হবে, তারপর ট্রেন, তারপর বাস।  দেশে এই বাপারটা এতটাই সহজ যে  কোনো চাপ নিতে হয়না, কিন্তু এদেশে  যেখানে  সেখানে রাস্তাঘাটে "গুগল ম্যাপ" লোকজন থাকবেনা।


 .
পকেটে বিস্কুট ব্যাগে টুপি আর পাসপোর্ট, আর গায়ে জ্যাকেট চাপিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। বাসস্ট্যান্ডে 10 মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর খেয়াল হলো আরে এতক্ষণে তো বাস চলে আসার কথা. গুগল এ যে সময়টা দেওয়া থাকে বাস এর , সেই সময়েই বাস আসার কথা। ভালো করে বোর্ডটা খেয়াল করে দেখি যাহ বাবা, রোববার বাস বন্ধ থাকে! বোঝো কান্ড। এদিকে 8.10 এ ট্রেন। এখন উপায়! নতুন এসেছি, বুদ্ধি সুদ্ধি আমার একটু দেরিতে পাকে। উবার হবেনা,স্মার্টফোন নেই , উন্স্মার্ট আমার কাছে ক্যাব এর নম্বর নেই। ট্রেনের টিকেট কাটা নেই, তাই ফিরে আসাই যায় তবে যাব বলে বেরিয়ে ফিরে আসতে আমার খুব বাজে লাগে। দৌড়ে বাড়ি ফিরে রুমমেটের ঘুম ভাঙ্গিয়ে তার থেকে ইয়েলো ক্যাব এর ফোন নম্বর নিয়ে ফোন করলাম। ক্যাব এর ড্রাইভার শ্রীলঙ্কার লোক। দীর্ঘদিন আছেন। একজন বাঙালি আর একজন বার্মিজ এর সাথে থাকেন। বক বক করতে করতে ট্রেন এর সময় হয়ে যাচ্ছে কিনা আর চিন্তা করার অবকাশ পাইনি। নামার সময় চমক! দেখি কিছু একটা টিকেট আমায় দিতে চাইছে। জানা গেল, তার কাছে একটা গ্রীনলাইন ট্রেনের টিকেট আছে, এবং সেটাই সে আমায় দিচ্ছে ।এমনি এমনই। আর উনি এটা দিচ্ছেন আমি টিপস দেবার আগেই। (টিপস দেওয়াটা এদেশের বাধ্যতামূলক রেওয়াজ, না দিয়ে চলে যাওয়াটা চূড়ান্ত অসভ্যতা) ,. যদিও সেই টিকেট আমার কাজে লাগার নয়, কারণ আমি যাব Amtrak ট্রেনে। কিন্তু সেটা কথা না, এমন বিদেশ বিভুঁইে এমন অপ্রত্যাশিত ভালবাসা পেলে মনটা ভরে ওঠে। দেশের গন্ডি তখন উপমহাদেশ হয়ে গেছে।
ট্রেন দেখে যথারীতি ধাক্কা খেয়ে গেলাম। দোতলা ট্রেন। ভিতরটা ভারী চমত্কার। গদিমোড়া চেয়ার, কিছু সিট এর সামনে টেবিল আছে কফি খেতে খেতে কাচ ঢাকা জানলা দিয়ে বাইরে দিকে তাকিয়ে থাকতে পারো। তোমার খুশি। Amtrak এর এই ট্রেনটা প্যাসিফিক ওশান এর পাশ দিয়ে যায়। জানলা দিয়ে তাকালেই ঝকঝকে নিল আকাশ , ঘন নীল্ সমুদ্র। একতলাটা ডাইনিং আর টয়লেট। তোমরা আমায় আদেখলে ভাবছ হয়ত। কিন্তু আমার চোখে যে তখন আমাদের লোকাল ট্রেন ভেসে উঠেছে, ইশশ আমরাও যদি এমন পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতাম। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা না ফেললেই তো এমন ঝকঝকে ট্রেন হয়ে যেতো। চেকারকে বললাম যেন সান ডিয়েগো এলে আমায় বলে দেয় আমি যদি এনাউন্সমেন্ট মিস করি বা ঘুমিয়ে পরি। বলে দিয়েছিল। এদেশের মানুষজন সম্পর্কে অনেকেরই শীতল ধারণা আছে, কিন্তু সে ধারণা ঠিক না তার উদাহরণ বহুবার পেয়েছি।





সী  ওয়ার্ল্ডে পৌঁছে মেতে যেতে সময় লাগেনা। শামুর শো দিয়ে শুরু। শামু  হলো তিমির নাম, তার নাচ দেখে মনটা একেবারে তাজা হয়ে গেল। এমনকি আমার মত খুঁতখুঁতে  লোককেও, ভিজিয়ে দিল বলে একটুও রাগ হোলোনা।






 ডলফিন এর মত বুদ্ধিমান প্রাণীর কসরত দেখতে দেখতে মনটা আরো খুশি হয়ে গেল।


 পেঙ্গুইনের নাচানাচি,সী-লায়ন  এর ঝাঁপাঝাপি,মাছদের খেলা এইসব নানান জিনিসের মধ্যে দিয়ে দিনটা কখন ফুরিয়ে গেল টেরই পেলাম না। 

\


 শেষে ওই ক্ষুদে ক্ষুদে মাছগুলো, আমাদের মৌরলা মাছের মত দেখতে ওদের সাথে খেলতে দিয়ে দেরী হয়ে গেল। জলের মধ্যে হাত ডুবিয়ে রাখলে ওরা এসে হাতের মধ্যে
মৃত কোষ খেয়ে যায়, বেশ মজা লাগে। বাপারটা আমি কাটিয়েই দিছিলাম, জানতামনা আগে, এক মার্কিন ভদ্রমহিলা নিজের থেকেই বললেন আমি যেন ওটা অবশ্যই করি, যদি করে না থাকি।ভাগ্গিস বলেছিলেন।হটাৎ খেয়াল হতে দেখি স্টেশন যাবার বাস আমি মিস করেছি এবং পরের বাস আধঘন্টা পরে, তারমানে ৬.৪৫ এর ট্রেন আমি মিস করেছি!

স্টেশনে এসে Amtrak এর কাস্টমার কেয়ারে খোঁজ নিয়ে জানলাম পরের ট্রেন 9.11 তে। এবং সেটাই লাস্ট ট্রেন।বাজছে সবে সাতটা কুড়ি। দুঘন্টা এই স্টেশনটাতে বসে থাকতে হবে!


স্টেশনটা আমাদের দেশের অজ পাড়াগাঁয়ের স্টেশন এর মতোই প্রায়। আসে পাশে একটাও দোকান নেই যে কিছু কিনে খাবো।বিস্কুট সেই কখন শেষ হয়ে গেছে, আর ঘোরাঘুরির নেশায় সারাদিন কিছু খাওয়াও হয়নি। শেড আছে কিন্তু যা হাওয়া দিচ্ছে, তাতে শেড থাকা না থাকা সমান। তারমধ্যে শার্টের দুটো হাতায় ভেজা, মাছগুলোর সাথে ছ্যাবলামো করার সময়। আমি এমনিতেই শীতকাতুরে, কি ঠান্ডা হাওয়া বাপরে বাপ, হাড় অব্দি কেপে যাচ্ছে। স্টেশনে লোক নেই বিশেষ।না একজন আছে দেখছি। স্টেশনে এর শেষ প্রান্তে একজন বসে বসে বিয়ার খাচ্ছে আর ফোনে কথা বলছে। ভালো লোক না মন্দ লোক কে জানে! আমার থেকেই খোঁজ নিলো ট্রেন এর, LA যাবে। এই ট্রেন টাই , অরেঞ্জ কাউন্টি মানে আমি যেখানে থাকি সেখান হয়ে LA যাবে। অন্ধকার স্টেশন, বাতাস বইছে হুহু করে, একটাই অজানা লোক, আশেপাশে দোকানপাট নেই, সব মিলিয়ে গা ছমছমে অবস্থা। এ যদি গুন্ডা বদমাশ জাতীয় লোক হয় হয়ে গেলো আজ আমার।উফফ , না মনটা অন্যদিকে ঘোরাই , দুঘন্টা এরকম খালি পেটে চিন্তা করে করে কাটানো যায় নাকি। থ্রিলার পড়তে গেলেও গরম কফি চাই আর সেখানে থ্রিলারের চরিত্র হতে গেলে খালি পেটে পোষাবেনা বাপু।

ধ্যান করব নাকি!  উহহ আবার হাওয়া দিস কেন বাবা, একটু থামলেও তো পারিস। এই ভিজে শার্ট পরে এই ঠান্ডা হাওয়ায়, খালি পেটে ধ্যান করতে গেলে আমায় মহাপুরুষ হতে হবে। কাউকে ফোন করা যায়, তাতে মনটা অন্যদিকে ঘুরবে, বা বই পড়া যায় বা খেলা যায়, কিন্তু কিছুই করা যাবেনা। আমার অচল স্মার্ট ফোন যেটা কিনা এইসব কাজেই ব্যবহার করি তার চার্জ শেষ। আর যে ফোনটা কাজের, মানে যার থেকে ফোন করি সেটার চার্জ প্রায় তলানিতে, খানিকটা তো রাখতেই হবে।


অফিসের এক কলিগকে ফোন করে বললাম আমার ১১তা বাজবে সান্টা আনা স্টেশন পৌঁছতে সে যেন কষ্ট করে একটু আসে নিতে তার গাড়ি নিয়ে।আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে, কাঁপতে কাঁপতে ঘন্টা দেড়েক কাটালাম।
এইসময় আরো একজন এলো. সেও আমার ওদিকেই যাবে।তার সাথে গল্প করে বাকি সময়টা কাটলো। ভদ্রলোক অ্যানিমেশন এর কাজ করতেন আগে। লাইফ অফ পাই এর কিছু গ্রাফিক্স এর কাজ হয়েছিল ওদের কোম্পানি থেকে।এখন নিজেই একটা ব্যবসা খুলেছে। ওর স্ত্রী আর ও। জমি বাড়ি কেনাবেচার। বোঝো! কোথায় অ্যানিমেশন কোথায় জমি-বাড়ি। আস্তে আস্তে আরো কিছু লোকজন এলো। ট্রেনও এলো। সারাদিনের ধকল এর পর ট্রেন এর উষ্ণ পরিবেশে ঘুমে চোখ জুড়িয়ে এলো। ওই ভদ্রলোককেই, সান্টা আনা এলে যেন আমায় একটু ডেকে দেয় অনুগ্রহপূর্বক বলেই ঘুম। 
স্টেশনে নেমে দেখি কলিগটি এসে গেছে। 



বাড়িতে খাবার ছিলোনা , কেনাও হয়নি, রেধে খেতে হবে ভেবেই খিদেটা দ্বিগুন হয়ে যাচ্ছিলো। এমন সময় রুমমেট এর মেসেজ পেলাম, আমি যেন কোনো দ্বিধা না করে ওর থেকে নিয়ে খেয়ে খেয়ে শুয়ে পড়ি। ...পৃথিবীটা যতটা কঠিন বলে লোকে অতটাও নয় বোধহয় না?