Tuesday, July 19, 2022

পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা(৪)

গরম কমার মুখে ঠিক হল এদিককার ছোট আর ভাঙাচোরা বাড়ি ছেড়ে ওইদিকের বড় ভালো বাড়িতে যাবো। যাবো যাবো করছিলাম অনেকদিন ধরেই,  নানান টালবাহানায় আটকে ছিল। যাবো ঠিক হতেই যেন আরো মায়া পড়ে যায় এই ঘর খানাতেই৷ বিকেলের পড়ন্ত সূর্য,  নিস্তব্ধ দুপুরে আসা কাঠবিড়ালি সবাই এসে জমা হয় পকেটে।সেদিন হল কি, যে কুকুরটা মাছের  কাঁটাকুটি,মাংসের হাড়গোড় খায় সে যথারীতি এসেছে।এদিকে আমাদের সেদিন তরমুজ দিয়ে লাঞ্চ হয়েছে। সে অবশিষ্টাংটা ওকে ছুঁড়ে দিয়ে দেখছিলাম খায় কিনা। ও বাবা তাকালো,  "এ তুমি কী দিলে!" বললাম আজ নেই যা পালা, তাতেও তাকিয়ে, "কিছুই কি নেই" ভাব।
শেষে দুটো বিস্কুট দেওয়া হল। একটা খেয়ে তাকাচ্ছে, "এটাই দিলে হত আগে, তা আর একটু হবে নাকি?"
হেংলু কাঠবিড়ালিটার নাম দেওয়া হয়েছে টংলু। তিনি সকালে এসেছিলেন দেখে চাট্টি মুড়ি দিয়েছি, ও বাবা সে কী ভয়! তুড়তুড় করে পালালো। মুড়ি এলোমেলো হয়ে গেল তাও এলো না। যেই ময়ূরাক্ষী কলেজে বেরিয়েছে, অমনি আবার এসেছে।কুড়কুড় করে খাচ্ছে। ঘরেতেও চলে আসছে দিব্যি।  
এখানে দিন শুরু হয় খুব সকালে। আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে যাবার জন্য যে লোক ঠিক করেছি তারা সাতসকালেই হাজির! সমস্ত মোটামুটি গুছিয়ে নেবার পর চারপাশ তাকিয়ে আনন্দই হল।এদিকটাও বেশ গাছপালায় ঘেরা।নিম, শিমূল, বট। কিন্তু টংলু? তার তো বেশ মুড়ির নেশা হয়েছিল, সে এখনো ঘুরে ঘুরে খুঁজে চলেছে নাকি? 

কোকিল, বুলবুলি, কাঠঠোকরা, দোয়েল, পায়রা ওদিকেও ছিল, এদিকে এর সাথে কাক, ছাতারেদের ভীড় আছে দেখছি। সকালবেলা থেকে হরেক পাখির আওয়াজে ঘুম ভাঙে। কোকিল গুলোর বর্ষা যেন শুরুই হয়না। একেকদিন হনুমানের দল আসে৷ ছানা কোলে মা হনুমান লাফাতে না পারলে গোদাটা এসে সাহায্য করবে কিনা জানতে চেয়ে পাশে বসে। তার ভারে গাছের ডাল ভেঙে যায়, মা হনুমান ছানাটাকে নিয়ে লাফ মেরে অন্য গাছে যায়। ও বাড়িতে থাকতে একটা বুলবুলি সকাল বেলা আমাদের চা খাবার সময় বারান্দার তারে এসে বসতো, সেদিন দেখি এ বাড়ির বারান্দাতেও এসে বসে ডেকে চলে গেল। কি জানি খোঁজ নিতেই এসেছিল কিনা৷ আমার কাজের টেবিলের ওপাশে জানলা দিয়ে দেখা যায়, নিম গাছের ডালের দাঁড়কাক,কিংবা কার্নিশে বসা ছাতারের ঝগড়াঝাটি৷ কাঠবিড়ালি গুলোও খুব খেলে তুড়তুড় করে৷ তাদের ভয় একটু কমেছে, আমাদের কার্নিশে এসে মুড়ি খেয়ে যায়। 



লেখালেখি আজকাল আর করা হয়না তেমন,কাজ,পড়াশোনা আর গল্পে সময় কেটে যায়। একেকদিন সকাল সকাল বাজারে যাই। স্টেশনের মাছওয়ালাকে বললেই দিয়ে যায়, তাও যাই কখনো। পথ ভুলে এলোমেলো হয়, কেমন সব পুরোনো পুরোনো বাড়ি।সকাল সকাল কচুরির দোকানে ভীড়। রোয়াকে বসে সকাল সকাল খেয়ে কাজ বেরোনো লোকজনের সাথে আমিও বসে জিলিপি খাই৷ ড্রামের জল আলগোছে গলায় ঢালে তারা আমার শৌখিন মজদুরি ওখানেই থেমে যায়। দেখতে দেখতে রথ চলে এলো। গ্রামের দিকের মেলার আলাদা একটা ধরন থাকে, আমাদের গ্রামের বাড়ির ওখানে শীতে ভীমমেলা হত। এক সপ্তাহ ধরে, সে কি আনন্দ আমাদের তখন। সে সময়, আনন্দের উপকরন বাক্সবন্দী এত থাকতো না তাই এই সব মেলার অপেক্ষা আলাদাই ছিল।  সারারাত ধরে যাত্রা হত, আর এমনি মেলার হরেক মজা, নাগরদোলা, বন্দুক, আদ হাত লম্বা রঙীন জিভেগজা।  এ জায়গাটা গ্রাম না হলেও ছোট গঞ্জ বটে। এখানেও সপ্তাহব্যাপী রথের মেলা হয়৷ একদিন গেছিলাম, রথের মেলায় যা যা থাকে,  ফুলের গাছ, জিলিপি, পাশকুঁড়ার চপ, হরেক রোল চাউমিনের দোকান। গৃহস্থালির জিনিসের  দোকানে ভীড়, মাইকে সতর্কবার্তা,  সব পেরিয়ে একটা কম আলো পৌঁছনো জায়গায় এখানকার ভূমীজ এক বুড়ি বসে আছে তার পসরা নিয়ে। ছোট ছোট অ্যালুমিনিয়ামের বাসন, কী হয় ওগুলো দিয়ে কে জানে!
মথুরা কেক, রথের মেলায় 

একদিন পূর্নিমায় ছাদে গিয়ে দেখি চাঁদ উঠলো এই বড় একটা। শ্রাবন মাসের চাঁদ, নিম গাছের মাথায় উঠে চারদিন সাদা করে আলো দিচ্ছিলো। সে আলো গায়ে মেখে গাছগুলো খুব রসস্থ হয়েছে। আরো রাতে পরীরা নেমে আসবে আমি জানি, সে সময় গাছেদের সাথে পরীদের কথা হয়, মানুষদের করা সব বোকামো, সব বজ্জাতি, সব ভালো সপাটে উড়িয়ে দেয়,,পাত্তাও পায়না মানুষে সেখানে। সেই আলো সেই হাওয়া গায়ে লেগে গেলে মানুষ হালকা হয়ে যায়। তার শিকড় ছড়িয়ে যায় অনেএএক দূর। ছোট খাটো না পাওয়া কিংবা পাওয়ার বাইরে দুহাত বাড়িয়ে চাঁদ ছুঁয়ে দেয়।

Saturday, May 14, 2022

পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা...(২)

লম্বা একটা লোহার বিম আর আড়াআড়ি অনেক গুলো কড়িবরগা মাথা তুললে দেখা যায়। ছোট্ট একফালি দোকানটার গায়ে বয়সের ছাপ পড়েছে। দেওয়ালে পলেস্তারা খসেছে অনেক জায়গায়, কাঠের ছোট চেয়ার টেবিল, কালো হয়ে গেছে দেওয়ালের রঙ।  উপরে নাচা করে রাখা কত সব জিনিস, এক কোনে উঁচুতে কেন কে জানে একটা ধূলোয় ঢাকা মিক্সি৷ বয়সের ছাপ পড়েছে বটে কিন্তু তার এখনো দাঁত পড়েনি, চুল পাকেনি,সুগার প্রেশার কোলেস্টেরল পাকড়ায়নি। কোলকাতা শহরের বুকে নিজের মতো সময় কিনতে পাওয়া যায়। এসির আরামে, কেতাদুরস্ত গদিতে বসে, কেতাদুরস্ত মোহিতো নামের সরবতে চুমুক দেবে? তার দাম আলাদা। আলাদা করে রিসর্ট, ওয়ো ইত্যাদির কথা বলছিইনা। আমার মতো মানুষ যাদের রাস্তায় হাঁটা নেশা, তাদের কাছে এই রকম দোকানের মূল্য বেজায়। চায়ের দাম ফুটপাথের চায়ের দোকানের থেকেও কম। আমার চাহিদাও বেশী না ফলে  এ দোকানে যা যা মেলে, পোচ, ডিম টোস্ট, অমলেট, গোলমরিচ আর মাখন দেওয়া টোস্ট ইত্যাদি আমার জন্য ঢের। কায়দার কাপের কফির চেয়ে বরং বেশী লোভনীয়। তা আমারও যেমন চকচকে উন্নতি নেই, এ দোকানটারও নেই। শ্যামবাজারের মোড়ের মাথায় সারাদিন অগনিত "কাস্টমার" আসলেও নেই। দু ঘন্টা বসে থেকে পঞ্চাশ টাকা বিল হলে হবেওনা। তাতে তো কই এদের মুখে ছায়া পড়তে দেখছিনা?

আমাদের এ দেখার গোলমাল আছে। আমি অর্থনীতির ছাত্র ছিলাম না, মূল্য স্থির ব্যপারটা আমার আয়ত্ত্বের বাইরে। কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের এত অপশন এত স্বাচ্ছন্দ্যেও সুখ নেই কেন? বলতেই পারো নেই কে বলেছে! ও তোনার দেখার ভুল। বেশ তো,  তবে মানুষে মানুষে এত কোন্দল কেন ফেসবুক টুইটারেও। এখানে তো দেশ, বর্ণ, জাতি, টাকার সে অর্থে প্রভাব থাকা উচিত ছিল না। তবে তা হল না কেন? সামান্য একটা জিনিস ভালো বা লাগলেও পাঁচজনে ঝাঁপায় কেন ট্রোল করবে বলে? স্রেফ যশ খ্যাতির ছবি ছাপাবে বলে পাখির বাসা ভেঙে পাখির ছানার ক্ষতি করতে বাধে না।মানুষ তো সুখে আছে, হাতে টাকা আছে তার। রেস্তোরাঁ যাত্রা তার কাছে পারিবারিক ক্যালেন্ডারের তারিখ হিসেবে না, নতুন জামা কিনতে তিথি লাগে না। এত চাই, এত পাচ্ছো তবু অস্থিরতা কমে না কেন?   

এসব কিছুই ভাবছিলাম না ওই দোকানে বসে। কাঠে চেয়ারে ঠেস দিয়ে বসে আরাম করে গল্প করছিলাম মোবাইল সরিয়ে রেখে। তার আগে সেই কলেজ স্ট্রীট থেকে হাঁটতে শুরু করেছি। বেশী দূর নয় অবশ্য, অনভ্যাসে তাইই অনেক মনে হচ্ছিল।রাস্তায়  কপিলা আশ্রমের দোকান ভেঙে জায়গা না পাওয়া যুবক ভারী অনুনয়ের সঙ্গে বলছিল সেইই আসলে আসল। ঠনঠনিয়া পার হতেই  উদয়পুরের হাভেলীগুলোর মতো দেখতে নাম না জানা রাণীর প্রাসাদ কত গল্প শোনাতে চাইছিল, সেসব পার হয়ে যেতে হয়। অমৃতর লাল দইটা দোকানের নামকরণের মর্যাদা রেখেছে। তারপর নিয়মিত ক্রেতারাও উঠতে লাগলো, পাশের টেবিলের নতুন আসা খদ্দেরের টোস্ট ফুরিয়ে গেল। চা নেবে কিনা আর কেউ জিজ্ঞেস করে আর কেউ হ্যাঁ বলল না, শাটার আর্ধেক নেমে গেল। 

আর সেই মুহূর্তে আর একবার উপলব্ধি করলাম , সুখ স্বপনে শান্তি শ্মশানে নেহাতই  লরিবাক্য, ভালো থাকতে জানলে দুইই দিব্যি ধরা যায়। এই তো কালিঝুলো দোকানে,  চায়ের কাপে, হাতের ফাঁকে তারা হাজির.....কুড়িয়ে নিলেই হল।

পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা.. (১)

একদম শীতের শেষে তিনটে গাছ এনেছিলাম। আমি গাছ ভালোবাসি কিন্তু যত্ন জানিনা। টবের গাছের যত্ন অনেক। বেচারাটা অল্প মাটি পায়, তাতেই মাস থুড়ি দিন চালানো কষ্টকর, তাই একটু বেশী যত্ন লাগেই। বাড় কমিয়ে কিংবা ডাল ছেঁটে। আমার এসব ভালো লাগেনা, একটা নিমের বীজ কোথা থেকে এসে পড়েছিল, তা থেকে গাছ হয়েছে, অমন একটা সজীব গাছকে মেরে ফেলার কথা আমরা ভাবতেও পারিনা, তাই নিজের মত বেড়ে উঠেছে। আশ্চর্য রকম রোগা হয়ে, বেঁটে হয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে নিজেকে। নিজে নিজেই, বাবা হয়ত মাঝে সাঝে ডাল ছেঁটেছে কিন্তু মূলতঃ তারই উদ্যোগ ছিল বাঁচার। হাঁ করে দেখার এত কিছু থাকে আমার, আমি হাঁ করে দেখি, কেমন বিন্দাস বাঁচে গাছটা,ওর মাটি পাওয়া বন্ধুরা এই মোটা এই লম্বা এই বড়। গাছেদের আলাদা নেটওয়ার্ক,  তাই ওও জানে নির্ঘাত, কিন্তু তাতে ওর দুঃখ দেখিনা, বসন্তে কচি পাতা, ফুল, প্রজাপতি অভাব নেইই৷ 

আমার আনা তিনটে গাছই শীতের গাছ। ডালিয়া, ক্যালেন্ডুলা, আর গোলাপ। আশ্চর্যজনকভাবে তিনটে গাছই বেঁচে আছে দিব্যি। ডালিয়া ফুল ফোটায়না, একদিকের পাতা,ডাল সব মরে শুকিয়ে গেছে, অন্যদিকে দিব্যি কচি কচি পাতা! ফুল দিক বা না দিক একে উপড়ে ফেলব কেন! ফুল দিলে ভালো না দিলেও ভালো। ক্যালেন্ডুলা কুঁড়ি ধরায়, তারপর কুঁড়িতেই মরে যায়, অপুষ্টিতে হয়ত। সার দিলে হয়, কিন্তু আমার দৌড় খালি মাটি আলগা করে দেওয়া আর রোজ জলটুকু দেওয়া। আজ দেখি একটা কুঁড়ি মাথা তুলেছে গায়ের জোরে কিংবা মনের জোরে। হলুদ রঙের ছোট্ট ফুল ফুটেছে।
 গোলাপটার সব পাতা ঝরে গেল যখন কী দুঃখ কী মন খারাপ। তারপর এক সকালে দেখলাম কচি কচি পাতা হয়েছে।বেঁচে থাকা দেখতেও এত আনন্দ!  তারপর থেকে সে রোজই নতুন নতুন পাতার জন্ম দেয়। আমি মাটি আলগা করতে গেলে কাঁটায় হাত ছড়ে যায়, বকুনি দিই মাঝে, তারপর আবার সকালে জল।

আশা করে আছি একদিন গাছ বড় করতে পারা শিখবো গাছেদেরই কাছ থেকে। যেমন করে আমার বুকের মধ্যে অকারণ না পাওয়া কিংবা আরো পাওয়ার চাহিদা মাথা চাড়া দিলে শান্ত করে দেয়,সে ভাষা আমি টের পাই তেমন করেই ঠিক কী কী করলে ওদের সাথে আরো ভালো করে কথা বলতে শিখবো সেটাও বলে দেবে নির্ঘাত।আপাতত স্রেফ জল দিতে দিতে বলি, মরে যাস না...আমার ইচ্ছের জোরে চুনিপান্না হোক বা না হোক, হলুদ ফুল আর সবুজ পাতা হয়েছে,চুনিপান্নার থেকে কম কি?

পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা... (৩)

দুপুরে পিছনের অশ্বত্থ  গাছটা থেকে ঝিরিঝিরি হাওয়া ভেসে আসে। আমাদের গ্রামে অশ্বত্থকে বলে আশুথ গাছ । বট আশুথের হাওয়া বড় মিঠে হয়।  গরমে আগে এ অঞ্চলে আসিনি। মাসখানেক আগে যখন এসেছিলাম তখন লু বইত, বন্ধুরা এসেছিল। সপ্তাহান্তের দিন, দুপুরবেলা জানলা বন্ধ করে আড্ডায়,হুল্লোড়ে, তরমুজে মজে থাকতে মন্দ লাগেনি একটুও৷ বন্ধুরা না আসলেও আমি জানি ওই লু আমায় কাহিল করতে পারত না, গরম আমার শীতের চেয়ে ঢের বেশী ভালো লাগে। এবারে এসে এক দু পশলা বৃষ্টি পেয়েছি মাঝে মাঝে। গাছগুলো আবার সব সবুজ হয়ে গেছে। কাঠবিড়ালী, দোয়েল, হাঁড়িচাচা, ছাতারে, শালিখ সব্বাই ফিরে এসেছে। এমনকি পাগলা কোকিলেরাও। সকালে বেশীক্ষন ঘুমোলে ডেকে ডেকে তুলে দেয়, দুপুরে সব নিঝুম হয়ে যখন স্রেফ পিছনের বারান্দা দিয়ে অশ্বত্থের হাওয়া এসে ঘোরে তখনো কোকিলটা ডেকে যায়। মেয়ে কোকিলটাও আছে,  দেখেছি। বিশ্রী দেখতে। জীবজগতে মানুষ ছাড়া আর কোনো মহিলাই মনে হয় রূপসী না। তবে যার যাতে মজে মন, কালো কোকিলটা ওই বিশ্রী ছিটছিট মহিলা কোকিলের জন্যই ডেকে ডেকে হেদিয়ে গেল!


সকালে চা বিস্কুট খাচ্ছিলাম বারান্দায়, বিস্কুটের টুকরো পড়েছিল মনে হয় বারান্দায়। একটা কাঠবিড়ালী কুটকুট করে খেয়ে গেল। ওই সময়টা কাঠ হয়ে বসে থাকতে হয়। সামান্য বাড়াচাড়তেই ছোট্ট জীবটা ভয়ে চিড়িক চিড়িক আওয়াজ করে ছুটে পালায়। বাড়ির সামনের কামিনী গাছটা ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। অনেক রাতে বারান্দায় দাঁড়ালে ফুলের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে থাকে। আর সকালে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি। কামড়ায় না, নিজের মনে ফুলে ফুলে ঘোরে,  মধু খায়, চলে যায়। কাঁঠাল গাছটায় দোয়েল আর শাহ বুলবুলিটা এসে বক্তব্য রাখে, চারদিক সরেজমিনে দেখে। হাঁড়িচাচা লম্বা লেজ নিয়ে উড়ে এসে বকে দেয়বলে মনে হয়। ছাতারেও ছাড়ে না, কেন এত বেলা অব্দি ঘুমিয়ে আছি বলে ডেকে বকে একাকার করে। সকালে খানিক পরেই আসে সব্জিওয়ালা, তারপরেই মাআআছ মাছ বলে মাছওয়ালা। 


শান্ত দিন দুড়দুড়িয়ে টিম মিটিং, কাজের ফাঁকে গলে যখন বিকেলে যায় এক ঝাঁক টিয়াপাখি চক্কর কাটতে কাটতে ঘরে ফেরে ট্যাঁ ট্যাঁ আওয়াজে। সারাদিনের গল্প গাছা করে হয়ত। কে কোথায় কী নতুন জিনিস দেখেছে, জেনেছে। চায়ের কাপে, টিয়ার ঘরে ফেরায়, মেঘের লালে সন্ধ্যে নামে। এই ঘরটাও ছেড়ে দেবো আমরা, সে কাজেই আসা। অন্য ঘরে যাবো, সে ঘর খানিক বড়, খানিক কম ভাঙাচোরা। কিন্তু এ পাড়ার কাঠবিড়ালী, প্রজাপতি, ছাতারে, দোয়েল কেউই যাবে না ওখানে। এদিকের আম,  কাঁঠাল,  নিম গাছেদেরও দেখা যাবে না। অশ্বত্থ গাছের হাওয়াও না। আমাদের জীবনে চাহিদা কিঞ্চিৎ কম। আমাদের ভাঙাচোরা বাড়িতে বাইরের লোক না এলে অভাববোধও কিছু হয়না। এলোমেলো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকি। সেদিন বাজারে গেছি, রাস্তায় রাস্তায় কচুরি জিলিপির আহ্বান অগ্রাহ্য করা যায় না। হেঁটে হেঁটে এ গলি সে গলি করতে করতে একটা পুরোনো ভাঙা বাড়ির সামনে পড়েছি। এই মোটা থামগুলো ভেঙে পড়ছে, খড়খড়ি দেওয়া জানলায় ধুলোর আস্তরন। সামনের দেউড়িতে আবর্জনা। কোন প্রজন্মের শখ কোন প্রজন্মে ঘুচে গেছে কে জানে! পাশেই ইটালিয়ান সেলুনে দাড়ি কাটছে একজন, আর তারপাশেই মুরগি। মাছওয়ালা আমায় জোর করে দুটো পাবদা পুরে দেয়। আর লাগবে না বললে বলে,  নিয়ে যা নিয়ে যা, এমনিই দিচ্ছি, টাকা নেবো বলেছি কি? ও দুটো তোর জন্য ! 


পাগলা কোকিল বৈশাখের শেষে ডেকে যায়, পাগলা মাছওয়ালা এমনি এমনি মাছ দেয়..পাগল বিনে ভালো থাকার জো নেই কিনা।

Saturday, March 5, 2022

চাঁদ দেখতে চন্দ্রাহতরা

কোথাও বেড়াতে গেলে আমার এনার্জি যাতা লেভেলের হয়ে যায়। কাল অনেক রাত অব্দি বাইরে বসে থাকার পরেও আজ দিব্যি সাত সকালে উঠে তৈরী। সাত সকাল মানে অবশ্য তেমন কিছুও না, জেলেরা মাছ আনছে এমন সকাল। মেঘলা হয়ে আছে চারদিকটা, মাঝে মাঝেই টুপটাপ বৃষ্টি। একটু পরেই রম্ভা বেরিয়ে যাবো। যাওয়ার আগে ছোট্ট শান্ত সমুদ্রপাড়ের জনপদটা ঘুরে ঘুরে দেখে নিচ্ছি যতটা পারি। একটা ছোট্ট দোকানে খুব করে সকালের জলখাবার খেয়েছি কলাপাতায়।  ধোসা আর ঘুগনি, অদ্ভুত কম্বো! কতরকম খাওয়া যে আছে দুনিয়ায়। যা জানিনা তাইই অদ্ভুত লাগে। আমি যেমন, মুড়ি যে কোনো তরকারি দিয়ে তরিবৎ করে খাই, মাছের ঝোল দিয়েও, ডাল দিয়েও, যে খায়না সে ভাববে আজব কম্বো! 
অটোতে করে চলেছি, গাড়িতে ভাড়া বেশী হত, আমাদের এবারে বাজেট কাটছাঁটের ব্যপার আছে। অটোতে লম্বা ফাঁকা রাস্তা পাড়ি দিতেও মন্দ লাগেনা কিন্তু। খালি আওয়াজ খানা দিচ্ছে হানা এই যা। গোপালপুর থেকে রম্ভার রাস্তাট ভারী মনোরম। একটু দূরে ছোট ছোট নীল পাহাড়, রাস্তার পাশেই চাষের ক্ষেত, সবুজ হয়ে আছে। হাঁ করা ছেলে আমি, হাঁ করে এত রঙ, এত তরতাজা চারদিক দেখতে দেখতেই রাস্তা ফুরোয় আমার। তারাতারিনী মন্দির হয়ে তারপর রম্ভা যাবো৷ ভক্তি আমার নেই, কিন্তু মন্দির, মসজিদ, চার্চ এসব ভারী ইন্টারেস্টিং জায়গা। মানুষ দেখা তো আছেই, পুরোনো মন্দির গুলোয় যা অপূর্ব কারুকাজ থাকে আমাদের এখনকার লোকেদের দিলে ছড়িয়ে লাট করবে। এইতো সেদিন রাজস্থানের দিলোয়ারা মন্দিরে দেখি মন্দির পুনরুদ্ধারের অংশে পুরোনোর পাশে নতুনটা খুবই নিম্নমানের কাজ! যাকগে সে কথা থাক। তারাতারিনী মন্দির চড়তে গেলে হাজারটা সিঁড়ি ভাঙতে হয় অথবা রোপওয়ে চড়তে হয়। তা কোভিডের কারনে রোপওয়ে বন্ধ। 

অনেকগুলো সিঁড়ি পেরিয়ে একটা চাতালে পৌঁছে দেখি অনেকদূর অব্দি নীচটা দেখা যাচ্ছে, মেঘের জন্য ঈষৎ ঘোলাটে হলেও গাছপালা, পাহাড় থেকে দূরের নদী আর সমতলভূমি দেখতে চমৎকার লাগে।কতরকম লোক উঠছে, ছোট ছেলে থেকে হাঁফ ধরা বুড়ো বুড়ি সবাই৷ পুন্যের লোভ না ভক্তি জানিনা, এই মনের জোর বাড়ানো ওষুধটা মন্দ কি যাদের কাজ হয়। আমার যেমন হয় না, কিন্তু আমার আবার অন্য জিনিসে কাজ হয়, ওই মন্দিরের কাজ দেখবো, পুরোনো দেওয়ালের গায়ে দিলে কেমন রোমাঞ্চ হয়। মাঝে মাঝে টাটকা দই আর কারি পাতা দেওয়া জল নিয়ে মেয়েরা বসে আছে।  দশ টাকা বিশটাকা গ্লাস, বললেই ঘোল বানিয়ে দেবে। লোভ হচ্ছিল খুব, কিন্তু বাতিকও তো কম না, মানে জল নিয়ে। আসলে সেই একবার ধর্মতলায় লেবুর জল খেয়ে প্রান যায় যায় অবস্থা হয়েছিল  সেই থেকেই আমার অচেনা জল টপ করে খেতে ভয় লাগে। মন্দিরের গায়ের কাজ চমৎকার। কত দেবি দেভী, যক্ষিনীদের মূর্তি, কিছু চিনি কিছু চিনিনা। বাঁদরের উৎপাত ভয়ানক। পান্ডাদের চেহারা বেশ পালোয়ান সুলভ। মন্দিরে গিয়ে পুজো না দিয়ে  স্রেফ কাজ দেখলে কেমন অপছন্দের চোখে তাকায়। ঘুরে ঘুরে এক একটা প্যানেলের কাজ দেখছিলাম, তখনকার দিনের পুরুষমূর্তিদের স্ট্রাকচার কিঞ্চিৎ মেয়েদের মত, নারী পুরুষ বিভাজন চিহ্ন দেখে করতে হয়। এদিকে কালের নিয়মে নাক ইত্যাদি অংশ খসে গেছে, আর আমার মূর্তি সম্পর্কে পড়াশোনাও কম, ফলে আরোই চিনতে অসুবিধে হচ্ছে পূর্ব পরিচিত কাঠামো না হলে। কিন্তু খুঁজে খুঁজে মিলিয়ে এটা চন্ডী ওটা বিষ্ণু এরকম বের করতে পারলে বেশ আনন্দ পাওয়া যায়। 
মন্দিরের পিছন দিকটায় স্বাভাবিকভাবেই লোক কম, পাহাড় কেটে চওড়া রাস্তা হচ্ছে ও দিকটায়, দূরে ঋষিকুল্যা নদী দেখা যাচ্ছে। পাহাড় কাটলে আমার বেজায় দুঃখ হয়। পাহাড় নিজেই একটা জ্যান্ত জিনিস তায় কত প্রাণী, কত গাছ, কত ইতিহাসের আবাস। এত উন্নতি মানুষ রাখবে কোথায় কে জানে! মন্দিরের বাইরে খোদাই করাএকটা মূর্তির উপর একটা গোদা হনুমান বসে বসে আধখানা নারকেলের মালা কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে, আর তার পাশে একটা হেংলু মত ছানা হনুমান প্রানপন তাকিয়ে আছে, যদি ওকে একটু দেওয়া হয়। গোদাটা পাত্তা না দিয়ে খেয়েই চলেছে, শেষে ছোটটা গোদাটার গায়ে গুঁড়ো গুঁড়ো পড়া নারকেল গুলো তুলেই খাচ্ছে আবার তাকাচ্ছে এতে যদি মায়া হয়। অতই সোজা হে, গুঁড়ো খেয়েই আমাদের যাপন চলে মায়া আর লাগে কই কারো! আরেকপাশে আরেকটা ছোট বাঁদর মন খারাপ করে বসে, যেন সাতসকালে ওকে ইস্কুলে যেতে বলা হয়েছে আর ও যেতে চায়ইই না। 
নামার সময় একটা মোটাসোটা প্রৌঢ়কে দেখি ঘেমে নেয়ে অস্থির, হাত ধরে দুটো স্টেপ তুললাম। স্ট্রোক হয়ে গেছে কিনা কে জানে! তবু উঠতেই হবে! নামার পথে লোভ ভয়ের থেকে বেশী হল, টকটক পান্তা স্বাদের ওই দই এর ঘোল খেলুম এক চুমুক। রম্ভায় পৌঁছে ঘরে ঢুকে  দেখি নারকেল গাছের পর্দা চিল্কাকে দেখতে দিচ্ছে না।  ম্যানেজারকে বিস্তর অনুরোধ করে ঘর বদল হল, চান করে কাঁকড়াও খাওয়া হল। যদিও আহামরি কিছু না। পূর্ব ভারতের আতিথেয়তা শিল্পের উন্নতি সাধন খুব দরকারি। হিমাচলের প্রতিটা সরকারি হোটেলের স্টাফদের ব্যবহার খুব ভালো ছিল এখানে যেন দায়সারা ভাব সবার মধ্যে। আজ নৌকা চড়ব না আমরা, কাল যাবো আজ এমনিই বসে থাকবো জলের ধারে, রাতে জ্যোৎস্নায় ধোওয়া পাহাড় হ্রদ দেখবো এই আশায় এসেছি, যদিও আজও আকাশের মুখ ভার। জেটিতে হরেক লোকের আনাগোনা তখন, একটা অল্পবয়সী পরিবার এসেছে, ছেলে মেয়ে দুটো অল্প বয়সেই বাপ মা হয়েছে, ছানাটাও ক্ষুদে। লোকটা, ছেলেই বলা যায়, ছেলেকে সামলাবে না বউকে না শালীর আবদারে পোজ দিয়ে ছবি তুলবে সে নিয়ে নাজেহাল হচ্ছে। খানিক বাদে একটা বড় দল এলো, ক্যাচোরম্যাচোর করে একাকার। কতগুলো নৌকা এলো গেলো, কত গুলো পরিযায়ী পাখি একমনে খাবার খুঁজে গেল। ক্রমে সন্ধ্যে হয়ে এলো, পাহাড় গুলো জমাট ছায়ার মতো হল, জলে সেই ছায়া ঘনিয়ে এলো।  
সন্ধ্যে থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে ফের টুপটাপ করে। ঢাকা বারান্দায় বসে চায়ের কাপ হাতে ঝুপ্সি অন্ধকারে বৃষ্টি দেখতে দেখতে ভাবছিলাম কখন ব্যাটা থামবে আর জ্যোৎস্না দেখতে পাবো। একটা বড় পরিসরে, চাঁদের আলোয় কখনো কেউ ডুব দিলে তার হয়ে গেল, সারাজীবন বুকের মধ্যে খানিকটা জায়গা বালি বালি জ্যোৎস্না হয়ে যাবে। ভিতর থেকে তাড়া খাবে সবসময়ে, কিন্তু কিসের তা সে জানবে না, টের পাবে না কেন এই অস্থিরতা। তারপর আবার কোনো নিস্তব্ধ চাঁদের আলোয় স্নান করে টের পাবে তার আসল পাওয়ার জায়গা কোনটা, কিসে তার শান্তি। তারপর? তারপর আবার ভুলে গিয়ে খোঁজ লাগাবে।
চাঁদ বেরোলো,  মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে। দূরে চিল্কা আর সংলগ্ন বেঁটেখাটো পাহাড়, গাছপালায় চাঁদের আলোয় অপার্থিব রূপ নিয়েছে। ভালো বোঝা যায় না কেন, কিন্তু এসব সময়টা মনে হয় আমি যেন এখানে অনাহুত, এরা সবাই কথা বলছিল নিজেদের মধ্যে আমায় দেখেই চুপ, কিংবা এখনো বলছে আমার কানে যাচ্ছে না। আমি পাহাড়, জল, গাছ, বাতাস সবেতেই প্রাণ খুঁজে পাই, আমার কাছে এরা কেউই প্রাণহীন না।মনে হয় এদের ভাষা শিখে উঠতে পারিনি এখনো তাই বুঝতে পারছিনা। মেঘের কারনে চাঁদের আলো ব্যহত হচ্ছে ঠিকই, তাছাড়া বৃষ্টিতে ছাদটা খুবই ভয়ানক কাদাকাদা হয়ে আছে। পূর্ব ভারতের সরকারী প্রপার্টি, তাই এদের ছাদ তকতকে রাখার দায় নেই আর কি! রাতে খেতে গিয়ে সে এক চিত্তির, উড়িষ্যায় এসেছি ডালমা খাবো মেনুতে থাকলে সেটাই স্বাভাবিক। তা বাবুরা ডালমা বানাতে যা সময় নিলেন, ফ্রায়েড রাইস চিলিচিকেন নেমে যেত। সময়টা বৃথা যায়নি অবশ্য। এক ভদ্রলোক বাইক চালিয়ে ব্যঙ্গালোর থেকে আসছেন, কত অনামা গ্রামে ঢুঁ মেরেছেন,কত ডিট্যুর করেছেন সেসব শুনছিলাম। আর্লি রিটায়ারনেন্ট নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শুনলেই ভাল্লাগে এসব। সকালে চিল্কাতে বোটিং করা হিবে ইনি আমাদের অনুরোধ করলেন ওনাকেও সাথে নিতে, একার জন্য খরচটা বেশী হয়ে যেত। বেশ তো আপত্তির কিছু নেই আমাদেরও। 
বোটিং এর সঙ্গী আরো একটি কাপল জুটে গেল। ভালোই তো ভাগাভাগি হবে খরচ। হালকা ভয় ছিল, এরা কিরকম লোক হবেন, "অ্যাই বাবু লেজ খাবি", কিংবা " হ্যাঁ বাবলাদা, দারুণ, বিউটিফুল  জায়গা বুঝলে, কাল হেব্বি মাছ খেয়েছি, রাতে একটু চলেছে বুঝলে তো...." এরকম লোক হলেই চিত্তির। খুব উচ্চকিত উচ্ছ্বাস বরদাস্ত হয় না। যাক সৌভাগ্যক্রমে এঁরা সেরকম নন। অবশ্য রম্ভা তো তেমন পপুলার ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন নয়, ফলে ওই ভীড়টা কমই। মাঝির পেট্রল বাঁধা, যতটা ঘোরানোর কথা ততটাই ঘোরাবে। তবে কাঞ্চনমূল্য ধরে দিলে তেমন পূজার ত্রুটি মাফ হয়ে যায়, জল থেকেও পেট্রল উৎপাদিত হয়। সেই কোনকালে কোন সাহেব এসে হ্রদের মাঝে ঘর তুলেছিল, স্রেফ সকালে ব্রেকফাস্ট খাবে বলে ভাবলে ভারী অবাক লাগে। অবশ্য শখ শৌখিনতার সাথে  প্রাচুর্য্যর যোগ আছে তো বটেই। সাহেব শৌখিন ছিলেন বটে। হ্রদের ধার ঘেঁষে থাকা বেঁটে খাটো পাহাড়ে হরেক পাখির আনাগোনা, ময়ূর, মাছরাঙা, পানকৌড়ি আরো অনেক মাইগ্রেটরি বার্ড। বাঁদরও আছে। কেউ কাউকে বিরক্ত করছেনা, নিজের মত মাছ, কিংবা পোকা কিংবা ফল খুঁজছে খাচ্ছে। মাইগ্রেটরি বার্ডদের ভয়ানক আশ্চর্য লাগে। বছর বছর একই রাস্তা ধরে কেমন আসে। সাংঘাতিক স্মৃতিশক্তি বটে। আচ্ছা এই যে চলার পথে আমাদের দেখে, গাছেদের ডালে বসে, কত নতুন পাখিদের সাথে আলাপ হয় এসবও মনে রাখে? পরের বছর এসে খুঁজবে আমায়? 
আজ দুপুরেই ট্রেন ফেরার। কিন্তু ট্রেনটার আপডেট পাচ্ছিনা অনেক্ষন থেকে। বিজয়ওয়ারা ঢকেনি এখনো সেটাই দেখিয়ে চলেছে। স্টেশনে গেলে বোঝা যাবে। আপাতত টামপারা লেক যাই। আজ ভারী রোদ ঝলমলে দিন। এতোই বেশী টাম্পারায় বোটিং করার কথা ভাবা যাচ্ছে না। কিন্তু হ্রদটা ভারী সুন্দর। নীল আকাশ, গাছাপালা ঘেরা হ্রদ, দূরে একটা ঘাটে স্নান করছে কিছু যুবক লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে। আমারও স্নান করতে ইচ্ছে হচ্ছিল এমন টলটলে জলে কিন্তু ট্রেনটার কী হল খোঁজ নেওয়া দরকার।
স্টেশনে এসে মাথায় হাত পরে গেল। চেন্নাইতে বন্যা হয়েছে,  অনেক কটা ট্রেনের ট্র‍্যাক জলের তলায়, আমাদের ট্রেন কোথায় কেউ জানে না। হ্যাঁ বেরিয়েছে যখন হাওড়া যাবে তবে সেটা কাল না পরশু কেউ জানে না! কাল ভোরের মধ্যে না পৌঁছলে আমাদের চলবে না। একজনকে উজিয়ে যেতে হবে আরো দুশ কিলোমিটার সেখান থেকেই। আর একান্তই না হলে সকালের মধ্যে, তাতে যদি একজন অন্তত অফিস করতে পারে। উপায় কি? এখন আর কোনো ট্রেন নেই। কাছাকাছি বড় স্টেশন ভুবনেশ্বর। খোঁজ লাগানো শুরু হল গাড়ির,যদি ভুবনেশ্বর অব্দি চলে যাই তাহলে কত টাকা লাগবে, কতক্ষন লাগবে? সেখান থেকে ট্রেন পেয়ে যাবো অনেক বা বাস। পরের একটি ঘন্টা চলল আত্মীয়দের থেকে (ময়ূরাক্ষীর এক মাম থাকেন এদিকেই),  ইন্টারনেট থেকে পাওয়া নাম্বারে, আমাদের ড্রপ করে গেল যে গাড়ি তাকে ফোন করে খোঁজ নেওয়া। আজ বিয়ের দিন বলে সমস্ত গাড়ি বুকড,কিছুই পাওয়া গেল না। একজন বলল যদিও পাঠাচ্ছে, খানিক বাদে সেও বলল হবে না! আমি ওলা,  এমএমটি এসবও দেখেছি কিচ্ছু নেই এখানে। ব্রহ্মপুরে সার্ভিস নেই!  শেষে স্থির হল, চলো বাস স্ট্যান্ডে যাই। কোনো বাস ধরে ভুবনেশ্বর যাই। এ জায়গা একটেরে ছোট্ট স্টেশন হলেও ভুনবনেশ্বর না, অন্তত সেখান থেকে কিছু না কিছু মিলবেই৷ যে অটো ধরে ফের স্টেশন থেকে বাস স্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছি সে কথা শুনে কিছু বুঝেছে মনে হয়। বলল, কেন এখান থেকেই সোজা কোলকাতার বাস যায় তো, ওতেই চলে যান, আবার ভুবনেশ্বর ইত্যাদি করার দরকার কি?

এরপর হল সংগ্রামের ইতিহাস। বাপরে বাপ, সে কি মারাত্মক জায়গা ব্রহ্মপুর বাস স্ট্যান্ড। বিশ বাইশ  বছর আগের হাওড়া বা ধর্মতলা বাস স্ট্যান্ড মনে আছে কারো? সেরকম ভয়ানক জায়গা, অজস্র দালাল, কোন বাস কখন ছাড়বে কোনো প্রপার কাউন্টার নেই। সরকারি কাউন্টার মাছি ওড়ানোর ভঙ্গীতে আমাদের তাড়িয়ে বলল আজ আর কোনো বাস নেই। আর কোনো সাহায্য মিলবে না মুখ করেই বলল। ফের গেলাম বেসরকারি বাস ছাড়ছে যেখান থেকে সেখানে। একটা লোক যার সর্বাঙ্গ থেকে দেশী মদের গন্ধ ভেসে আসছে এই বিকেলবেলাতেই, সে আমাদের খুব অ্যাসিওর করছে যে এই বাস ভুবনেশ্বর অব্দি যাবে ঠিকই, কিন্তু সে দায়িত্ব নিয়ে আরেকটা বাসেতুলে দেবে। মানে তুলে দেবেনা, ফোন নাম্বার দেবে। তাকে কাটানো কি সোজা, না মশাই যাবো না বলে হেঁকে ডেকে খোঁজ নিতে গেলাম ডিরেক্ট বাস আছে কিনা, আছে একটি কিন্তু সাড়ে পাঁচটায় ছাড়বে আর কিছু নেই। ব্রহ্মপুরের সার্ভিসের ওপর অতটাও ভরসা আর নেই ওই একটি বাসের ভরসায় থাকবো, এদিকে রেডবাসে দেখছি ভুবনেশ্বর থেকে ভলভোর আর দুটি টিকিটই আছে। ভুবনেশ্বর কতক্ষনে পৌঁছবে তাও বুঝছিনা, টিকিট কেটে পৌঁছতে না পারলে? শেষমেশ যা হবে হোক,একটা ভুবনেশ্বরগামী বাসেই উঠলাম, ততক্ষনে আরো অনেকটা সময় চলে গেছে এক এজেন্ট থেকে অন্য এজেন্ট ছোটাছুটি করতে। তারা আমাদের একটা প্রায় ছেড়ে যাওয়া বাসে বসিয়ে দিল। স্লিপার কোচ, কিন্তু আমরা বসে যাওয়ার সিট পেয়েছি। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা, অল্প আলো ছায়ায় দেখছি কেউ নিজের জুতো মাথার পাশে রেখে আরামে ঘুম দিতে যাচ্ছে স্লিপার সিটে, কেউ বা জুতো রাখছে জলের বোতলের খোপে। আমাদের দেশে সাধারন পরিচ্ছন্নতা বোধের একটু অভাব আছে। খানিক এমপ্যাথির অভাবও, ওইখানে কেউ জলের বোতল রাখতে পারে ভাবার দরকার কি! আমার হলেই হল। বাস ঘন্টা দুই চলার পর টয়লেট যাওয়ার একান্তই দরকার পরল, বারংবার কন্ডাকটরকে বলে যা বুঝলাম, ওদের ইচ্ছে যেখানে হবে সেখানেই থামাবে। মুখের উপর হ্যাঁ হ্যাঁ থামাচ্ছি বলাটা ওদের এক মিথ্যে বুলি। আরো জ্ঞন্টাখানেক পর যেখানে থামালো, সেটা একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। এর আগে বড় বড় কিছু ধাবা পেরিয়ে এসেছি। মেয়েরা কোথায় যাবে ভাবার দরকার নেই! বাকি যাদের সে সুবিধে আছে তাদের ওই সামান্য রাস্তার ধারেই কাজ সারতে হল।  সাড়ে চার ঘন্টা না পৌঁনে পাঁচ ঘন্টা নাগাদ যখন পৌঁছলাম ভুবনেশ্বর একটাই চিন্তা, ট্রেন তো সব ভরা দেখাচ্ছে, বাসেও কি জায়গা পাবো না?

বাস স্ট্যান্ডের প্রায় প্রতিটা কোলকাতা গামী বাসে খোঁজ করে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল যে নাহ, জায়গা নেই। কেউ কেউ অফার করল  মেঝেতে বসে যাবার জন্য৷ একটা বাস পেলাম যার কেবিনে দুটো জায়গা হতে পারে। কেবিনে বসে সারারাত যাওয়া? একা হলে হয়ত ভাবতাম না, কিন্তু ময়ূরাক্ষীর পক্ষে একটু বেশীই চাপের হয়ে যাবে। কিন্তু আমি সৌভাগ্যবান ময়ূরাক্ষী আমার আজীবনের  ট্রাভেল পার্টনার বলে। আমাদের কাছে উপায় তখন ভুবনেশ্বর হোটেলে রাত কাটিয়ে সকালে বাস বা কিছু ধরে যাওয়া অথবা এই বাসে কেবিনের সিটে বসে যাওয়া। ভাবার উপায় বেশী ছিল না সিট ভর্তি হয়ে যাচ্ছে, হ্যাঁ কেবিনের সিটের জন্যেও ময়ূরাক্ষী সম্মতি জানাতেই টিকিট নিয়ে নেওয়া হল। পুরো দামই পড়েছিল। লাস্ট খেয়েছি ব্রহ্মপুর স্টেশনে, ট্রেনে খাবো বলে আনা আলুর পরোটা, মাঝের সময়টা বাস ধরতে পারার তাড়নায় খিদের কথা ভাবার ফুরসত হয়নি।আর এ বাস কোথাও খাবার জন্য থামবেও না। তড়িঘড়ি কিছু শুকনো খাবার আনাগেল। তারপর শুরু হল বিচিত্র ভ্রমন। আরো তিনটি ছেলেও উঠেছিল কেবিনে, অল্পবয়সী খেটে খাওয়া ছেলে বোঝা যায়৷ তাছাড়া কেবিনে ড্রাইভার, খালাসী আর কন্ডাকটর।  বাস খানিক এগোতেই, মহানন্দা ব্রিজ। যে চাঁদ দেখার জন্য এতো ছুটোছুটি,  সেই চাঁদে ভেসে যাচ্ছে মহানন্দা নদী। আধঘন্টা চলা যায় এমন সিটে সারারাত পারি জমানো আমরা সব ভুলে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। ক্রমে শহর ছেড়ে হাইওয়ে ধরে এগোতে লাগলো বাস। রাত বাড়লো, মাঝখানে পেরিয়ে যাওয়া জনপদ, শহর ক্রমে ঘুমন্ত হল। মূল বাসের মধ্যে এসির আরামে বাকিরাও ঘুমোচ্ছে। খানিকবাদে কন্ডাকটর চলে গেল, তারও একখানা শোওয়ার জায়গা আছে। কেমন আমাদের দিল না দেখলি বলে আমরা খুব লোভী চোখে দেখলাম। খালাসী চাপড় মেরে মেরে সাউন্ড বক্স চালালো। নব্বই এর যে গান একদম চলেনি, সে গানগুলোই এদের এত পছন্দ কেন কে জানে! 

ডিট্যুর করে ড্রাইভার খাবার তুলে নিল এক ফাঁকে, রুটি,  পনিরের তরকারি। খালাসী রোল করে করে খাইয়ে দিল ড্রাইভারকে। ময়ূরাক্ষীকে বললাম দেখে নে রে, খিদে পেলে একটা চিপ্স দিলে হবে না লম্বা সফরে বেরোবো যখন। এর আগে টোলে কিচ্ছু দেয়নি এরা, আমরা ডেলি বাস ইত্যাদি বলে এখন দেখলাম বাংলায় ঢোকার  আগে ড্রাইভার বদলে গেল,  মানে একজন মাঝরাস্তায় উঠে এলো আর একজন নেমে গেল। এমনকি ফাস্ট্যাগ অব্দি বেরিয়ে এলো, আর বাসের বোর্ড,  যাতে লেখা থাকে কোথায় যাচ্ছে সেটাও বদলে গেল। এত কিছু জানাই যেত না কখনো বাসে ঘুমিয়ে থাকলে! এও একবার হল্ট দিয়েছিল, কিন্তু কোনো দোকানে না, স্রেফ রাস্তার উপর। আবার সেই একই অবস্থা মেয়েরা কোনো রকমে বাসের পিছনে আড়াল খুঁজতে গেল, ছেলেদের লজ্জা পাওয়ার অধিকারও নেই, গাছের এক ধারে দাঁড়লে অন্য ধারে আরেকজন দাঁড়িয়ে যায়। আমি পশ্চিমবঙ্গে,  হিমাচলে বাসে ট্রাভেল করেছি লম্বা লম্বা, এরকম অসভ্যতা উড়িষ্যাতেই দেখলাম। ধাবাতে দাঁড়াতে কী হয়? নাকি রাস্তা আমাদের জন্মগত ডাস্টবিন, শৌচাগার সব এ ধারনা এ রাজ্যে বেশীই? হাইওয়ে ঘুমোয়না। ড্রাইভারের ঠিক পিছন থেকে রাস্তা দেখতে দেখতে আর নিজেদের মধ্যে তামাশা করতে করতে দেখলাম অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে গেছি কখন। আসলেই কঠিন সময়গুলোয় অসুবিধের দিকে ফোকাস রাখলে জার্নি আরো আনকম্ফোর্টেবল হয়ে যায়। 

ভোরবেলা বাবুঘাটে এসে ভাঁড়ে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে যে আরামটা পেয়েছিলাম বলার না। সত্যি বলতে কাল রাতেও ভাবিনি এরিকম ভাবে সত্যিই পৌঁছে যাবো, কিন্তু দিব্যি গেলাম যখন দেখলাম সারারাত ঠায় বসে থেকে এসে আবার অফিস করতে করতে মেসেজ করছি, পরের বার পাহাড় যাবো বুঝলি? 

Monday, February 14, 2022

চাঁদ দেখতে.. গোপালপুর রম্ভা

আমাদের উঠলো বাই তো ঘুরতে যাই এমন না, আমাদের হল ওহ আগের উইকেন্ড বাড়িতে ছিলাম এবারেরটায় না বেরোলে কেমন করে হবে! পড়াশোনা, কাজ, সব গোল্লায় পাঠিয়ে আমরা ঘুরতে চলে যাই। আমাদের "উন্নতি" হয়না, আনন্দ হয়। এবার কোনটা ভালো কোনটা খারাপ এ নিয়ে তর্ক চলতে পারে, কিন্তু সে সময়টাও আমরা আনন্দ করে কাটিয়ে দিই।  এমন না আমরা খুব "অফবিট" জায়গা খুঁজে ঘুরতে যাই। আজকাল অফবিটে যা ভীড় অর্থে পপুলার ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন হয়ত ভীড় কম! কদিন আগেই হিমাচল ঘুরে এসেছি, পকেটে টান পরে কিনা বলতে পারবো না, আমার ঝোলায় ক মুঠো চাল আছে সে দেখে আমি বেড়াতে বেরোইনা, ঝোলার খবর নিতে যাওয়ার সময়টা বরং পথের খবর নেওয়া জরুরি বোধ করি। পরে সে যা হবে দেখা যাবে কিন্তু দিন ফুরোলে জিরোনো ছাড়া গতি থাকবে না। মুশকিল অন্য জায়গায়, ছুটি মেলে না সহজে। শহরে জ্যোৎস্না দেখে দেখে বা বলা ভালো না দেখে দেখে আমরা ক্লান্ত। তাই ঝুপ ঝুপ করে পূর্ণিমা দেখে টিকিট কাটা। একটু নিরিবিলি, বিশেষ কিছু "করার" নেই তাই তাই গোপালপুর আর রম্ভা। গুরু নানকের জন্মদিন উপলক্ষ্যে একটা দিন ছুটি পাওয়া যেতে পারে, সুতরাং, ঘরে কে থাকে আর। 

হাওড়া স্টেশনে সাউথের ট্রেন ধরার জন্য দাঁড়ালে বেশ অদ্ভুত একটা ফিলিং হয়। এই যে দাঁড়িয়ে আছি সামনেই ছোট ছোট প্লাস্টিকের চাদর পেতে আলাদা আলাদা পরিবার বসে। রাতের খাওয়া চলছে দিব্যি স্টেশনের মেঝেতে বসেই। আমি কি একটু উন্নাসিক হয়ে গেছি? আমি কিছুতেই পারবো না। অবশ্য আমার বাতিক একটু আছে বরাবরই অস্বীকার করে লাভ নেই। কিংবা সেরকম দায়ে পড়ে গেলে খেয়েও নেব কে জানে। খাওয়া দাওয়ার পর বাসন মাজাও হচ্ছে কাছে কল থেকে। এরই মাঝে কেউ ঘুমোচ্ছে প্রেমসে, ব্যাগ পোঁটলা কিচ্ছুর চিন্তা না করেই। ট্রেনের সময় সমাগত, এঞ্জিনের পরে পরেই জেনারেল সম্ভবতঃ,  ভীড়ে থিকথিক করছে সেখানটা। কোভিড এর ভয় মিডিয়ার বাইরে বরাবরই কম, এসব জায়গায় আরো কম স্বাভাবিক ভাবেই। আমি যে সময়ের কথা বলছি, সেকেন্ড ওয়েভ খানিক মাথা নামিয়েছে। আমাদের আলাদা আলাদা জায়গা পড়েছে এবারে। আমার সাইড লোয়ারের সাথে কেউ সিঙ্গল সাইড আপার থাকলে বদলে নেবো এই আশায় ছিলাম। তা আমার পাশে সাইড আপারে যিনি এলেনে তিনি তো এন্ট্রি নিলেন একেবারে নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকির খুব খারাপ নকল ভার্শনের মতো। রাত  এগারোটায় সানগ্লাস পকেটে পুরে ধীরে সুস্থে জানালেন,  না তার পক্ষে সম্ভব না কোথাও যাওয়া। বেশ বেশ। এবারে ট্রেনে আবার সবাচ্ছা পরিবারের ভীড় বেশী। আমার ট্রেনে বাচ্ছা থাকলে একটু আতংকই লাগে। অধিকাংশ বাবা মা মুগ্ধ কাজল পরে থাকে। ময়ূরাক্ষীর সিটটাও লোয়ার ছিল, ফলে একজনকে আমার সাইড লোয়ার দিয়ে তার মিডল বার্থটা নেওয়া গেল, কিন্তু কপালগুনে উলটো দিকে একটি বছর চার পাঁচেকের বাচ্ছা সহ পরিবার।  রাত এগারোটায় ট্রেন ছাড়লো, তার মিনিট দশ পনেরো পর ধীরে সুস্থে তারা বাচ্ছাকে খাওয়াতে বসল, বাচ্ছা খাবে মোবাইল দেখতে দেখতে, অবশ্যই লাউডস্পিকার অন থাকবে ফোনের। তারপর ঘন্টাখানেক পর বাচ্ছার বাবা মা খাবে, তারও খানিক পর বাচ্ছার বিছানা করে ঘুম পারানো অব্দি সেই মোবাইল তারস্বরে বাজবে। মোটামুটি একটা দেড়টা অব্দি এসব চলল। ওবাবা সাত সকালে সেই ছানা নাগাড়ে চেঁচিয়ে সবাইকে তুলে দিলেন। তারপর ঘন্টাখানেক মোবাইলে ভিডিও চালিয়ে,  সবাইকে বিরক্ত করে তিনি নিদ্রা গেলেন! 

এদিকে ট্রেন চলতে চলতে দেখি পাহাড় আর হ্রদের মাঝখানের একরাস্তায় এনে ফেলেছে। বাঁ পাশের জানলা দিয়ে তাকালে দেখি ছোট ছোট পাহাড়, আর ডানদিকে তাকালে চিল্কা। ভারী সুন্দর ওই রাস্তাটা। খানিক আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে, জানলার কাচ দিয়ে টুপটাপ চল পড়ছে, বৃষ্টি ধোয়া কাচ দিয়ে নীল চিল্কা দেখা যাচ্ছে। এসেই পড়লাম প্রায় আর একটু পরেই নামবো। ট্রেনের  জায়গাও অনেক ফাঁকা হয়ে গেছে, ভুবনেশ্বরেই যা নামার নেমে গেছে, বাকিরা সেই দক্ষিন ভারতেই চলেছে। চিকিৎসার কারনেই যায় মূলতঃ,  বাক্স প্যাঁটরা বেশী থাকে, তাদের চোখে মুখে হালকা একটা উদ্বেগ। ব্যবসা বা চাকরির জন্য যাচ্ছে যারা তারা অনেকটাই নৈর্ব্যক্তিক।  আমার মানুষ দেখতে বেশ লাগে। আজকাল মাস্কের কারনে মুখ ঢাকা থাকে ফ্লাইটে, কিন্তু ট্রেনে এত কেউ মানে না। দিব্যি মাস্ককে চোখের ফেট্টি করে যেতেও দেখি, কোভিডে ভয় প্রথম দফায় পেয়েছে লোকে কিন্তু এখন আর সাধারণ মানুষের ক্ষমতা নেই ভয় পাওয়ার। 

ব্রহ্মপুরে নামার লোক বেশী নেই। ট্যুরিস্ট তো কেউ নামলো না, স্থানীয় মানুষ নামলো কয়েকজন। স্টেশনটা বেশ ঝকঝকে তকতকে, ছোট্ট স্টেশন হলে একটা লিফট আছে। বুড়ো কিংবা পায়ের সমস্যায় থাকা মানুষগুলোর কথা ভেবেছে সেটাই ভালো ব্যপার। আমাদের সাথে লাগেজ খুব বেশী না, তবে গোপালপুরে আমরা ঘুরতে এসেছি পুরোনো দিনের মতো হোটেল বুক না করে, আর এখানে হোটেল তেমন কেতের কিছুতে থাকবো এমন প্ল্যানও নেই, তাছাড়া এই কোভিডের চক্করে ট্রেনে লাগেজ দেওয়া বন্ধ করে দিয়ে এক্সট্রা চাদর বইতে হয়। তাও দরাদরি করে অটোয় না ওঠার মত লাগেজ না। গোপালপুরে যেখানে নামাবে সেখানেই বিচ শুরু, আর হাতে গোনা কয়েকটা হোটেল। দিব্যি ছিমছাম জায়গা। তবে যে হোটেলে শুরুতে ঢুঁ মারতে গেছি সেখানে একটা ১৭ সিটার গাড়ি এসে থেমেছে, আর যেখানেই থাকি বাপু এখানে না এই বলে  এদিক সেদিক করে একটা হোটেলে আস্তানা গাড়া গেল। সমুদ্রের ধারের হোটেল, এসি আছে যদিও আমাদের লাগবে না, বাথরুমও পরিষ্কার,ঘর দোরও একটু আগে মুছে গেছে কড়া ফিনাইলের গন্ধই বলে দিচ্ছে। সস্তায় ঘুরবো বলে এসেছি এর চেয়ে বেশী আর কিই বা চাই। 

জায়গাটা খুবই ছোট্ট আর শান্ত। ভাতের হোটেল আছে,  যেখানে সস্তায় ভাত ডাল তরকারি মাছ মেলে, ছোটখাটো চাউমিন ইত্যাদির দোকান। সব মিলিয়ে একদম নিরালা একটা সমুদ্রতীরস্থ গ্রাম। হাঁটতে হাঁটতে পান্থনিবাসের দিকে এগোচ্ছিলাম। রাস্তায় লোক নেই বিশেষ, পান্থনিবাস মনে হয় বালিয়াড়ি বাঁচাতেই একটু ভিতরের দিকে বানিয়েছিল। মুশকিল রাতের বেলা ঝাউবন পেরিয়ে সমুদ্রে যেতে দেয় না। তাই এটাকে আমরা থাকার জন্য ভাবিনি। কিন্তু জায়গাটা এমনিতে ভারীসুন্দর। লোকজন নেই, ঝাউবন পেরিয়ে বালিয়াড়ি টপকে সমুদ্রের ধারে উল্টোনো নৌকার পাশে গিয়ে বসা গেল।  সমুদ্রের সাথে প্লেটোনিক প্রেমে আমার চলে না, স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে সমুদ্র বুকের মধ্যে ভরে নেওয়ার স্থৈর্য আসেনি এখনো, তাই জল দেখলেই নামতে ইচ্ছে করে, পায়ের তলার বালিগুলো তিরতির করে বয়ে যায় আঁকড়ে ধরা আঙুলের ফাঁক দিয়ে তাতে এই বয়সেও আনন্দ পাই। একটা ছেলে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে একা একা, দূরে এই অবেলাতেও কটা ছেলে জলে নেমেছে।সমস্ত জায়গাটা শান্ত নিঝুম মতো। ওই দূরে দুটো মাঝি ছায়ায়  জিরুচ্ছে। জলে নামাই যাক নাকি? বিকেল হয়ে এসেছে তাতে কি? 
এদের আজ কী যেন উৎসব আছে। এই কার্তিকের পূর্ণিমা উপলক্ষ্যেই। অমন ফাঁকা সমুদ্র সৈকত খানিক বাদেই লোকে লোকে ভরে গেল। তবে এখানকার ভীড়ের চরিত্র কিঞ্চিৎ আলাদা মনে হল। নিজেদের মধ্যে গল্প, আনন্দ করছে বটে, কিন্তু উচ্চকিত কোলাহল যা বিরক্ত করে অন্যকে তা বিশেষ টের পেলাম না। মেলায় মূলতঃ ঝালমুড়ির স্টল, আর না হলে প্লাস্টিকের খেলনা। ভীড়ের মধ্যে দিয়ে এগোতে থাকলে চোখে পড়বে, ভাঙা এক পরিত্যক্ত  বাড়ি চারিদিকের সাজানো  হোটেলের পাশে দিব্যি দাঁড়িয়ে। এখানে আকাশ এত নীল, আর সমুদ্রের ঢেউয়ের আওয়াজ এতোই জোরালো তার মালিন্য চোখে পড়েনা, বরং মনে হয় যেন ইতিহাস কী বলতে চায়, কান পাতলেই শোনা যাবে কিংবা হয়ত যাবে না। সেসব পেরোলে আরো নানাব রকম পসরা সাজিয়ে লোক বসেছে। ভারী চমৎকার একটা স্থানীয় খাবার খেলাম। অনেকটা ভাপা দই এর মত। শালপাতায় দেয়, দিব্য খেতে। রাস্তাতেও মেলার রেশ। দুপুরে যে ফাঁকা শুনশান রাস্তা দেখেছিলাম বিকেলে তাই ভরন্ত গাছের মতো হয়ে গেছে। খাওয়ার দোকান, মানুষ, আনন্দ। আচ্ছা একটু তফাৎ থেকে দেখে, মানে আমরা যেমন কোনো উই এর ঢিপি,বা মাছের ঝাঁক, কিংবা পিঁপড়ের সারি দেখি, আমাদের যদি কেউ এরকম ভাবে দেখে কিরকম লাগে তার? ঘিনঘিনে? মজার? ভয়ের? 
পূর্নিমা দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু চাঁদ আমাদের ভাসাতে রাজী না এবারে।থেকে থেকেই বৃষ্টি আসছে টিপটিপ করে, মেঘে ঢেকে যাচ্ছে চাঁদ। একটু রাতে মেঘ কাটতে শীতের কামড় উপেক্ষা করে ছাদে দাঁড়িয়ে রইলাম অনেক্ষন। সীবিচ ফাঁকা হয়ে গেছে ততক্ষনে। জোরালো আলো লাগানো আছে বটে, কিন্তু সমুদ্রে চাঁদের আলো বোঝা যায় বেশ। কেউ কোথাও নেই তেমন। অনেক অনেক পরে পায়ে ব্যথা হয়ে নীচে এসে দুখানা চেয়ার পেতে বসা গেল, একটা শুনশান সমুদ্রের হাওয়া, চাঁদ আর সমস্ত ক্লান্তি উড়িয়ে পাশাপাশি চুপ করে বসে থাকার আরাম নিয়ে। 
(ক্রমশঃ)

Sunday, January 23, 2022

আমলামেথি আর বিদ্যেধরী

সড়াৎ করে টার্ণটা নেওয়ার পর থেকেই রাস্তাটা খারাপ হতে শুরু করেছিল। তাও গুগল ম্যাপকে ভরসা করেই বেঁকেছিলাম। এখন তো একেবারে ফাটা বাঁশে আটকে যাওয়া কেস রে ভাই।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি বিশ্রী আবহাওয়া। লেপমুড়ি দিয়ে ভূতের গল্প পড়ো, মাঝে মধ্যে একটু কফি খেলে। দুপুরে কচ্ছপের মতো অতি কষ্টে বেরিয়ে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি খেলে ব্যস। আর কিচ্ছু করা শাস্ত্রে মানা। কিন্তু মাঝে মাঝে শাস্ত্রের নিয়ম অগ্রাহ্য করাও মহারাজ ঋকানন্দের নিয়ম৷ লম্বা পাড়ি দেওয়া হয়নি অনেকদিন, জলের শব্দ শোনাও হয়নি কত্তদিন। এই বছরের একুশটা দিন কেটে গেছে আমি আপিস করেছি, খেয়েছি, আড্ডা মেরেছি, ঘুমিয়েছি, পড়েছি, উদ্ভট ভিডিও দেখেছি কিন্তু নিঝুম দুপুরে নদীর ছলাৎ ছলাৎ শুনিনি, নতুন মানুষ দেখিনি, পথের ধারে হঠাৎ থেমে চায়ের দোকানের সস্তার কেকে আমেজ করে কামড় দিইনি, হুট করে আসা বৃষ্টিতে কিংবা শেষ বিকেলের সূর্য মাখিনি। পথ আমার সব শক্তির আধার, আমার ভালো থাকার ওষুধ। তাই আমার উপায় ছিল না  আজ লেপমুড়ি দিয়ে জিরোবার।

যাওয়ার জায়গার অভাব নেই। কিন্তু ট্যুরিস্ট প্লেসে ঠিক যেতে চাইছিলাম না। একটু হলেও নাগরিক উল্লাস তফাৎ থাক। আবার নদীও চাই,  সমুদ্র বা পাহাড় তো বললেই পাওয়া যায় না। সুতরাং গুগলবাবুকে একটা গাঁ এর ঠিকানা দেওয়া হল। আমলামেথি। কেমন সুন্দর নাম না? নাম শুনেই প্রেমে পড়ে গেছিলাম আসলে। তা গুগলের মনে হয় অত ভালোলাগেনি। ওই যে ওর কথা না শুনে শুরুটা অন্য রাস্তা নিয়েছিলাম তাতেই তার মাথা গোলমাল হয়ে গেছে মনে হয়। শুরুতে বলছিলাম না, ওই চুড়িবাজার থেকে টার্ণ নিয়ে খানিকদূর ভারী সরুরাস্তা দিয়ে এগোনোর পর দেখি একটা দরগার পাশে মেলা মতো বসেছে, আর সেই দু পাসের পসরার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে জায়গা আছে তাকে যদি রাস্তা বলা যায় তবে সে রাস্তায় ওইদিক থেকে একটা টেম্পো আর বড় লরি ঢুকে এসেছে। এদিকে আমার বাঁ দিকে গরম জিলিপির কড়াই, ডানদিকে এক বাইকওয়ালা আরাম করে চিনেবাদাম সওদা করছে। সবাই অপেক্ষা করছে কখন তার কেনা শেষ হবে সে গেল, এরপরেই সাঁত করে কটা ভ্যান ঢুকে ব্যাপারটা বেশ খোলতাই করে দিল। একদিকে খাদ আর উটের দ হয়ত নেই কিন্তু গরম জিলিপির কড়াই, লরি,আর কাঁচা রাস্তার কম্বোটাও কম না। কী করে যে পার হলাম সে দ তা আমারও মনে নেই। আমার হাতেই স্টিয়ারিং ছিল কিন্তু ও পথ দিয়ে আমি মানে এই আমিই পেরিয়েছি!!

এই বীর ভাব কিন্তু বেশীক্ষন রইলনা। গুগল ম্যাপ আজ আমাদের বেশ অ্যাডভেঞ্চারে নামাবেন স্থির করেছেন। দু কদম যেতে না যেতে তিনি আরেকটি বাজারের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে। শুক্রবার না হলেও শনিবারের হাটও বেশ রমরমাই৷ মাছ,সবজি, গামছা, দাদের মলম আর তার সাথে রাস্তা সবার মানে আমারও মান্র আমার সাইকেলের এই ভাবনায় কিছু মানুষ সাইকেল রেখে দিয়েছে। সেসব সদিয়ে যাও বা পেরোলাম,  একটা সরু এমন রাস্তায় ঢোকালো, যার একদিকে পুকুর,একদিকে খাটাল বা বাড়ির দেওয়াল! আর ভরসা করা গেল না। আমার সনাতনধর্ম বেঁচে থাক, মানুষ ডেকে জানা গেল আর কিলোমিটার দুই এই রাস্তা সইলে মেন রাস্তায় ওঠা যাবে। দাঁতে দাঁত চেপে এসব খারাপ সময়গুলো পার হলে কিন্তু ম্যাজিক মেলে, আর খারাপ রাস্তাতেই  মেলে। এই যেমন দেখোনা, ভেড়ির ধারে গাড়ি থামিয়ে, হাঁটতে মন্দ লাগছে নাকি? রোদ বেরোয়নি ঠিক কথা কিন্তু এই যে পানকৌড়ি কাদাখোঁচা আরো কত চেনা অচেনা পাখি উড়ছে। আরো কতক্ষন পরে ফের রওনা দিলাম। কত লোকে পথ চিনিয়ে দিল এদিক না ওদিক, রাস্তায় নামলে রাস্তা চিনতে আর কঠিন কি। ।

আবারও একটা সরু রাস্তায় ঢুকে পড়েছি। এবারে আবার একদিকে খাল একদিকে খেতিজমি।বৃষ্টি এলো ঝমঝম করে এর মধ্যেই।একটা ন্যাংটো খোকা ছাতা মাথায় দৌড়ে গেল, দুটো ছোট মেয়ে  ছুটতে ছুটতে বৃষ্টি মাখছে, একটা ছোট ছেলে তার ছোট ছাগল ছানা বুকে জাপটে নিয়ে মাথা বাঁচাতে যাচ্ছে। পথের ধারে কত অজস্র দৃশ্য তৈরী হয় সেসম দু চোখে নিয়ে এই বিপজ্জনক রাস্তায় চলতেও অসুবিধে হয়না। বৃষ্টি থেমে যায় আচমকাই, দূরে দবুজমাঠ আরো তকতকে হয়ে করে দিয়ে৷ একজনকে জিজ্ঞেস করি রাধারাণীপুর জায়গাটা কোথায়?  কেউ চেনে কেউ চেনে না, তবে আছে ঠিক। আসলে চলার নেশাতেই চলছি, পৌঁছতেই হবে এমনও কিছু নেই। তবুও পথচলতি লোক উপযাচক হয়েই বলে দেয়,  কেউ বলে আগিয়ে দেবো চলো। পথের ধারে এর কুড়িয়ে পাওয়া ধন থাকে আমার ঘরে থাকতে ইচ্ছেই করে না তাই।


আমলামেথি নামের মতোই জায়গাটা। মস্ত গাছের নীচে ছোট্ট দোকান, দুপুরের খাওয়া চলছে তখন। রাস্তায় থেমে চা বিস্কুট খেয়েছিলাম এক জায়গায়। বাপ গিয়েছিল খেতে, সদ্য গোঁফের রেখা গজানো ছেলে সামলাচ্ছিল দোকান।ভাত খাওয়া থামাতে ভাল্লাগেনা কারো, তার চেয়ে চলো নদীর কাছেই বরং। বিদ্যেধরী নদীর কাছে কতবার এলাম এই নিয়ে? কী জানি! এক নদীতে তো একের বেশীবার আসাও যায় না। দুপুরের খেয়ায় ছাগল, বাইক, সাইকেল, ডাব সবই চলেছে ওইপারে। অত বাছবিছার চলে না এদিকে। ছাগলও বাধ্য ভারী, চারটি কাঁঠালপাতা দেওয়া আছে, চিবিয়ে চলেছে আপন মনে। ওইপারে পৌঁছে বাঁধ ধরে হাঁটা শুরু  করেছি।  বাঁধের ধারের গাঁ টা শীতের দুপুরে ঝিমোচ্ছে। মাঝে মাঝে মোরগের কোঁকরকোঁ, গরুর হাম্বা,  কিংবা ছাগলের ম্যা ম্যা ভেসে আসে। বাঁ হাতে বিদ্যেধরী ছলাৎ ছলাৎ করে সঙ্গ দিচ্ছে। একটা মোহনচূড়া পাখি লাফিয়ে লাফিয়ে পোকা না কি যেন ধরছে। মোটকা একটা শালিখ তার সাথে ভাব জমাতে যাচ্ছে। মোহনচূড়ার মত সুন্দর পাখি পাত্তা দেবে কেন,  উড়ে উড়ে পালাচ্ছে। মাছরাঙা আর একটা ঘুঘু বসে আছে চুপটি করে ইলেকট্রিক তারে। একটা মৌটুসী আকন্দ গাছে দোল খেয়ে নিল। একটা বাঁশপাতি উড়ে গেল। ক্যামেরাটা আনিনি, আসলে খুব প্ল্যান করে বেরোইনি তো। বেরোতে হবে, এই তাড়না থেকেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। খুব অসুবিধেও বোধ করছিনা। দিব্যি ভারমুক্ত হেঁটে যাওয়া। একটা বৌ কোলের ছেলে নিয়ে নতুন বাছুরএর  তদারকি করতে গেল। ঝপঝপ করে জল ঢালছে মাথায় একটা ছেলে। ক্যাঁচক্যাঁচ করে টিউবয়েলের আওয়াজ আসছে। পাশের পুকুরের একঝাঁক হাঁস আরাম করে সাঁতার দিচ্ছে। ফিরতে ইচ্ছেই করছে না। হেঁটে চলেছি কতক্ষন দেখিনি, কতদূর এলাম কে জানে। "কাদের বাড়ি এসেছ? কোথায় যাবে?" জাল সারাতে সারাতে হাঁক দেয় কেউ। গ্রামের পথে এভাবে খোঁজ নেওয়া স্বাভাবিক। উত্তর দিয়ে এগোই। রোদ পরে আসছে ক্রমেই। ফিরতে হবেই। একবার ঠিক আসবো, পিছুটান না রেখে। যেখানে অন্ধকার নামবে সেখানেই মাথা গোঁজার ঠাঁই জুটিয়ে নিয়ে কিংবা না জুটিয়ে নিয়ে। পথের দেবতা কবে আমায় তেমন ভাবে নিয়ে বেরোবে কে জানে....





Sunday, December 26, 2021

আনাচ কানাচ

শীতের শুরুতে এখানে বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়ে যায়। এ বছর এখনো পড়েনি। এখানে মানে বাংলা বিহারের বর্ডারের এক ছোট শহর যেখানে আছি।  ওয়ার্ক ফ্রম হোম অপশনটা আমার জন্য ভালোই হয়েছে। দিব্যি কল নিতে নিতে দেখতে পাই চিড়িকদাসের খুড়তুতো নাতি জানলার কার্নিশে বসে বাদাম খাচ্ছে, সেদিন তো ঘরেই এসেছিল আলাপ করতে। কিংবা নীল রঙের পাখিটা টুইটুই ডেকে ফুরুত করে উড়ে যায়। এ বাড়িটাও ভাঙাচোরা, আগেরটার মতো না হলেও ছাদে লম্বা লম্বা ঘাস, ড্রেনেজ পাইপের ফাঁকে বা জানলার কার্নিশে হলদে রঙের ফুল ফুটেছে। কিন্তু সে সব সমস্যা বলে আমাদের মনেই হয়না। নিজের অবস্থায় অখুশী থাকলে বা অভাববোধ থাকলে উন্নতি হয়,  আমাদের উন্নতি হবে না মনে হয় কখনো। আমরা দিব্যি এসব ছোটখাটো জিনিস পাত্তা না দিয়ে হাঁড়িচাঁচা কিংবা দোয়েল এর আনাগোনা দেখি, নীল রঙের প্রজাপতিটার ছবি তুলতে পারছি বলে কুঁইকুঁই করি, বাড়ির সামক্নে কামিনী ফুলের গাছটায় সাদা হয়ে আছে ফুলে, রাতের বেলা বেরিয়ে প্রানভরে গন্ধ নিই বারান্দা চেয়ার পেতে বসে। 
এমনিতে এ জায়গাটা গরু আর ষাঁড়দের স্বর্গ বলা যায়। ইচ্ছে মতো হাঁটে দুলকি চালে, যেখানে খুশী গোবর ছড়ায়। এখানকার মানুষও মোটামুটি ওই পর্যায় এর উদাসীন করে ফেলেছে, পুরো শহরটাই যেন ডাস্টবিন, যেখানে খুশী থুতু ফেলা স্বাধীন নাগরিকের অধিকার। তবে সবে মিলে একসাথে আছে ভালোই৷ এই তো সেবার একজনের টোটোতে গরুতে মাথা গলিয়ে দিয়েছিল। ভেবেছে সেও যাবে হয়ত একটু হাওয়া খেতে। টোটোওয়ালা না না পয়সা না দিলে নেই ভাব নিয়ে তাড়িয়ে আবার চলতে লাগল। 

ছুটির একদিনে বেরিয়ে পড়েছিলাম। গন্তব্যের থেকে চলার পথ আমাদের কাছে কম আকর্ষনীয় নয়। তাই হুট করে থেমে জঙ্গলের মধ্যে এক আশ্চর্য ঝালমুড়িওয়ালার কাছে দাঁড়াই। কাঁপা কাঁপা হাতে বুড়ো মেখে দেয়, ঝাল কমাতে  পাশের মন্দিরের সামনের টিউবওয়েল থেকে ঢকঢক করে জল খাই জামা ভিজিয়ে। কিংবা দাঁড়িয়ে পড়ি কোনো চায়ের দোকানে, আলগোছে রাজনৈতিক চর্চা শুনতে শুনতে চেখে দেখে স্থানীয় কেক বিস্কুট। ফের চলতে থাকি,  যতক্ষন না আমাদের আটকে দেয় বুনো ফুলে ঢাকা কোনো বাড়ি, কে থাকতো এখানে কিংবা কে থাকে? জানতে যাই না,  পুরোটা না জানাই ভালো। তারপর পৌঁছে যাই সুতানের জঙ্গলে। পিকনিক পার্টি এসেছে একটা, উব উব ডিজে নেই বটে কিন্তু এই জঙ্গলে কোলাহল ভালো লাগে না। হয়ত দলে এলে আমরাও তাইই করতাম। তার চেয়ে জঙ্গলের পথে পথে চলাই ভালো। কখনো পিচকালো রাস্তা কখনো লাল মোরাম। কাঠ কুটো তুলে নিয়ে চলেছে বউ আর তার ছোট দুটো ছেলে মেয়ে। এদের গ্রামটায় যাবে? চলো। দিব্যি ছিমছাম একটা গ্রাম। জঙ্গলের একদম গা লাগোয়া, খুবই সামান্য উপকরণ নিয়েই বেঁচে আছে। ভালো না মন্দ তা বলার আমি কে। তবে মন্দিরটা চমৎকার।  স্রেফ একটা ছাউনিয়াছে, মাটির দাওয়ায়। ভগবান যদি থাকে তো সে এরকম খোলামেলাতেই থাকতে ভালোবাসবে, ওই ঘুপচি ঘরের ধূপের ধোঁয়ার চেয়ে এ স্বাভাবিক বুদ্ধিটা ভগবানে বিশ্বাসীদের হয়না কেন?! এক বুড়ো চাদর জড়িয়ে লাঠি হাতে হেঁটে চলেছে রোদের দিকে, একটা মানুষের ছানা এক বালতি জলে খুব মন দিয়ে চান চান খেলা করছে। একটা ছাগল ছানা এক মনে পাতা চিবুচ্ছে। মাচায় শিম ফলে আছে। দুপুরবেলার সময়, খাটিয়ায় আরাম করে কেউ কেউ খেতে বসেছে। তথাকথিত সভ্য চোখে রাস্তায় খাওয়া যেমনই হোক আমার চোখে মন্দ লাগে না। দিব্যি আরামে খাওয়া। আজকাল প্রায়ই আমার মনে আমাদের এই অবিরাম ছুটে চলার সভ্যতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। চলার নামই জীবন এসব সাদা কালো সরিয়ে যদি একবার দেখি, সারাক্ষন এমন উন্মাদনার জালে  পড়েছি যে আমাদের আর শুধু বিরিয়ানিতে মন ওঠে না, তার সাথে এক হাতা চকলেট সস ঢেলে আরো অন্যরকম করতে হয়। আমি হয়ত খুব বেশী সরল করে দিলাম, বলতে যেটা চাইছি আমাদের কেন আরো আলো আরো বাতাসে সুখ আমাদের যেন হয়না। যাক এসব কথা, সত্যি কথা স্বীকার করা ভালো আমিও এরকম একটা জায়গায় জীবন কাটাতে পারবো কি? 
তালবেড়িয়া ড্যাম এর মত এমন সুন্দর জায়গা প্রায় মিস করেই যাচ্ছিলাম। রাস্তার চায়ের দোকান, মা ছেলেতে চালায়, মা সিঙারার পুর ভরছে আর ছেলে চা বানাচ্ছে। সেখান থেকেই খবর পেলাম কিলোমিটার দশেকের মধ্যেই আছে তালবেড়িয়া ড্যাম। পড়ন্ত দুপুরের গাঁ পেরিয়ে ড্যামের কাছে পৌঁছে দেখি তখনো ড্যামের চারিদিকের পিকনিক পার্টিদের দুপুরের খানার ইন্তেজাম হয়ে ওঠেনি। একদম কৃষ্ণানুগামী এসেছে তাদের রাধা কৃষ্ণকে সোয়েটার পরিয়ে।  কয়েকজন তরুন ড্যামের ঠান্ডা জলেই সাঁতার দেবার তোড়জোড় করছে।ড্যামটার চারধারে ঘন সবুজ শাল পিয়ালের বন। একটা নিম গাছের নীচে একটা সিমেন্টের বেঞ্চে রোদ মাখতে মাখতে দেখছিলাম কেমন একদলের রান্না শেষ হচ্ছে, একদলের নিরামিষ রান্না চলছে, কারোর মাংসের ঝোল নামল বলে।  একই জায়গা হরেক মানুষ হরেক পছন্দ। সৌভাগ্যক্রমে উব উব ডিজে পার্টি নেই বলেই অসহনীয় লাগছে না।  রাতে যখন এসব জায়গায় জ্যোৎস্না হবে কেমন ভেসে যাবে ভাবতে গিয়ে দেখি পড়ন্ত রোদেও কম ভাসেনি। 
তারপর ফের পথ ডাক দেয়, পথের ধারে খেজুর গুড়ের ভাটি। ইলেক্ট্রিসিটি নেই স্বাভাবিক ভাবেই এসব অস্থায়ী জায়গায়, সন্ধ্যে হলেই শুয়ে পড়ো আর সকাল হলেই উঠে খেজুর রস নামিয়ে জ্বাল দাও। মিঠে গন্ধে জায়গাটা আমোদিত হয়ে থাকে। লোভী মানুষ, থমকে যাই, আঁজলায় করে গুড় খাই। আবার কখনো মেচা সন্দেশ এর সারিসারি দোকান দেখলেও দাঁড়িয়ে যাই। চায়ের দোকান থেকে খেজুড় গুড় হয়ে মেচা সন্দেশ চলার পথ একটানা আর হয় কই।
ডিসেম্বরের শেষ, শীতের শুরু। বাপ্রে বাপ ঠান্ডা পড়েছে। পাশের কোয়ার্টার কদিন খুব পরিষ্কার হল, এক দম্পতি এসে থাকছে। যা কিছু বিনা পয়সায় মেলে তার দাম আমরা দিইনা। জ্যোৎস্না মাখতে ছাদে উঠেছিলাম, চাঁদের আলো থৈ থৈ করছে, নারকেল গাছের ফাঁকে, দেবদারু গাছের গোড়ায়, ভাঙা কার্নিশে। আর কোথাও কোনো আওয়াজ নেইঝালি ইলেক্ট্রিক আলো গুলো ব্যাঘাত ঘটায়, তাও গাছের ফাঁকে ফাঁকে এড়ানো যায়। চাঁদের চারদিন আলো জ্বালার কোনো মানেই নেই। আমাদের ভাঙা চোরা কোয়ার্টারে অভাববোধ না থাকার কথা বলছিলাম না, তা সেসব আমাদের ঘরে টুক করে ঘুরে যাওয়া কাঠবিড়ালী, লেবু গাছে ওড়াউড়ি করা প্রজাপতি, কামিনী গাছে দোল খেয়ে যাওয়া দোয়েল এদের জন্যই।  সেদিন গাছ কাটা লোক এসেছিল, হুড়ুমদুড়ুম করে গাছ এর ডাল কেটে "শোভা" বাড়াতে গিয়ে গাছ গুলোকে ন্যাড়াই করে দিয়েছে প্রায়। কাঠবিড়ালি, নীল প্রজাপতি, দোয়েল কেউইই আজকাল আসছে না। আসবেই বা কোথায়! অমন ঘন কাঁঠাল গাছ, কামিনী গাছ, লেবু গাছ কিচ্ছুই কি আর ভালো রেখেছে। ওদের ঘরবাড়ি আমরা রাখতে পারিনি। যে লোকটা গাছ কাটছিল, সে এত কিছু বোঝে না ভাবে না, তার মনে হয় ভালো লাগে না এ কাজ তাই নির্দয় হয়ে গাছ সাফ করে। রাতেরবেলা চুঁইয়ে চুঁইয়ে জ্যোৎস্না গড়িয়ে পড়ে, কাটা পড়া জায়গা গুলোয়, একটু একটু করে সেরে ওঠে। গাছ সাফ করে ফেলবো এ ভাবনাই বড় বেশী দাম্ভিক। কেটে কুটে সব শেষ করে ফেলে মানুষও যখন শেষ হয়ে যাবে জঙ্গল ফের নিজেকে খুঁজে নেবে মানুষ না থাকলেই। সে সময় গুলোতেও এরকম মায়া মায়া জ্যোৎস্না এসে সারা চরাচর ধুয়ে দেবে, ভাঙা কার্নিশ বেয়ে হয়েত কোনো ফ্রেমে হঠাৎ আটকে পড়া হাসি আহ্লাদ লুটোবে। কে বলতে পারে! 

Saturday, December 11, 2021

মহারাজ, একি সাজে এলে হৃদয়পুর মাঝে (পর্ব দুই)

"বাইরেটা একবার দেখ রে গিয়ে"।
তড়াক করে উঠে ঘুমভাঙা চোখে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই স্থির হয়ে গেলাম। বারান্দায় দাঁড়ালে অনতিদূরেই হিমালয়ের বরফ ঢাকা চুড়ো। সামনে বিয়াস নদী বয়ে চলেছে। মনে  হয় চুপ করে দাঁড়িয়ে এই  জীবনকে, এই আকাশ বাতাস  পাহাড় নদীকে, প্রনাম জানাই। রোজকার না পাওয়াগুলো ঠান্ডা হাওয়ায় উড়ে যায়, বুকের ভিতরটা শান্ত শীতল হয়ে দাঁড়ায়।




 


রাজা শৌখিন, রুচিবান ছিল মানতেই হবে।  কী দেখবো সেটা তো আসলেই নিজের উপর তাই একই জল হাওয়ায় পুষ্ট হয়েও সবাই সব দেখতে পায় না।  যাই হোক, অমন সটান সতেজ সকালে স্নোক্যাপ মাউন্টেউন, উপত্যকা আর কাঠ আর পাথদের তৈরী রাজপ্রাসাদ এ নিয়েই এমন বিভোর হয়ে গেলাম, ধুত্তোর রিভার র‍্যাফটিং করার ম্যালা জায়গা আছে ও পরে করব খন বলে কাটিয়ে দিয়েছি। একটা চমৎকার মন্দির আছে, সে মন্দিরে ঠাকুর দেবতা নেই, একটা পাথর আছে।  হিমাচল তো শুধু স্নো ক্যাপ মাউন্টেইন দেখার জায়গা না, এখানকার লৌকিক অলৌকিক বিশ্বাস, গল্পগাথা, আচার আচরণ সব মিলিয়ে আলাদা একটা অনুভূতি তৈরী করে দেয়। এখানেও গল্প শোনা গেল, এই নাগগরের এই শিলাটা নাকি এক ঝাঁক মৌমাছি নিয়ে এসেছিল। দেবতা আর দানবদের যুদ্ধে দেবতারা হেরে যাচ্ছিলো প্রায় টায়ার্ড হয়ে। তাই তারা রূপ বদলে মৌমাছি হয়ে এই শিলাকে এখানে সরিয়ে আনে আর নিজেদের শক্তি রিচার্জ করে নেয়। প্রতি বছর আশপাশ সব গ্রাম থেকে দেবতাদের নিয়ে আসা হয় ( যুগ বদলেছে, এখন দেবতারা নিজেরা আসতে পারে না),  এইখানে নিজেদের রিচার্জ করে নেবার জন্য। হিমাচলের দেবতাদের গল্প গুলো একটু আলাদা না? এরকম রিচার্জ এর গল্প আমি শুনি অন্য কোথাও। আর্য অনার্যদের যুদ্ধ ইতিহাস কি খানিক লুকিয়ে থাকে এসব গল্পে? যাকগে এদের আচারটা বেড়ে খেতে, স্থানীয় কি একটা স্পব্জি দিয়ে বানায়।  আলুর পরোটাটাও চমৎকার।  আমরাও রিচার্জ করে নিলাম।

নাগ্গ‌রের মন্দির। দেবতার মূর্তি নেই , শিলা খন্ড আছে, যেখানে রিচার্জ করে দেবতারা!






আমরা অনেকেই ভাবি পাহাড়ে গিয়ে থাকবো ঠিক একদিন, পাহাড় দেখবো, ছবি আঁকবো বা গান গাইবো বা বাগান করব এরকম কিছু। তা আমরা ভাবি আর রুশ সাহেব নিকোলাস রোইরিখ নানান কাজকর্ম করে, হিমালয়ের প্রেমে পড়ে সস্ত্রীক নাগগরে বাড়ি বানিয়ে রইলেন। সে বাড়ি আর ছবি গুলো মিউজিয়াম করে দিয়েছে তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি।  আমি ছবিটবি তেমন বুঝিনা, তাও আমার বেজায় ভালো লাগল। আর বাড়িটার কথা আর কি বলব, পাহাড়ের গায়ে গাছপালা ঘেরা দোতলা কাঠের বাড়ি।দোতলার স্টাডি কিংবা বারান্দা থেকেই হিমালয় দর্শন হবে। এদিক সেইক দেখতে দেখতে  পাক খেয়ে খেয়ে নীচে নেমে সমাধির জায়গাটায় পৌঁছেছিলাম। ইচ্ছে করে একটু নীচে সমাধিস্থল পছন্দ করেছিলেন মনে হয়। অযথা ভীড় হবে না, এতটা পাহাড় বেয়ে নামতে হবে বলে, এদিকে পাতা আর ফুল ঝড়ে পড়বে।  মানুষ মরলেই সব শেষ, কারন আদতে এটা যন্ত্র কিন্তু যন্ত্রের তো মেমারিও থাকে। মানে ভিডিও বা ফটো জিনিসটার সাথে অপরিচিত একজন লোকের কাছে সেটা ভূত বলেই মনে হবে, অন্য ডাইমেনশন থেকে কেউ এসে আমায় কিছু বললে সেটা আমার কাছে অলৌকিক অবিশ্বাস্য কিংবা ভৌতিক বলে মনে হবে। তেমনই মানুষ মরে গেল সেই যন্ত্রের ছাপ কোথাও একটা রয়ে গেল কিংবা আসলে অন্য ডাইমেনশনে অন্য জগত শুরু হল? গাছ, পাহাড়, নীল আকাশ, নদী, পাখির ডাক শুনতে শুনতে শুয়ে থাকার বহু পুরোনো  ইচ্ছেটা জোরদার হচ্ছিল। পাক মেরে মেরে ফেরার পথে দেখি একটা বেঞ্চে একজন পাহাড়ি মহিলা শুয়ে আছেন আরামে। ঝাঁটপাট দেওয়া হয়ে গেছে, রোদ উঠেছে আর কি চাই!


দু বছর ধরে টানা ঘরে বসে কাজ করে ফিটনেসের বারোটা বেজে গেছে। একশ মিটার উঁচুতে মিউজিয়াম দেখতে গিয়ে জিভ বেরিয়ে যাবার জোগাড়। রাস্তাটা যথারীতি গাছে ছাওয়া, চড়াই এর মাথায় একটা এই মস্ত লোমওয়ালা কুকুর বসে আছে  অভ্যর্থনা করতে। নিকোলাস আর হেলেনা দুজনেরই একখান করে পালকি ছিল,  ভারতীয় চাকর বাকরেরা বয়ে আনত তাই বুড়ো বয়সেও থাকতে কষ্ট  হয়নি। কে বলতে পারে হয়ত পালকিতে চড়েই মিনিমালিজমের তত্ত্ব আওড়াতেন, যেমন দামী এসইউভিতে চড়ে ইউটিউব ভিডিওতে মিনিমালিজমের তত্ত্ব আওড়ানো হয়। তবে যাই হোক  রোইরিখ সাহেব আর তাঁর স্ত্রীর কাছে ঋণী থাকার কারন অনেক, আধ্যাত্মিকতা, অভিযান, শিল্প, শান্তির প্রচার, সব মিলিয়ে মানুষটা বেশ একটা ছাপ রেখে গেছেন।


ভুন্টুরে পার্বতী আর বিয়াস মিলে গেছে, আমরা পার্বতী নদীর ধার ধরে ধরে কাসৌল এর দিকে যাচ্ছি। পার্বতী নদীটাও একটা কিশোরী মেয়ের মতো বইছে,  আর দূরে বরফ পাহাড়ের চুড়ো দেখা যাচ্ছে। আহা, আকাশটা বেজায় নীল,আর হাওয়াটাও তেমনই তকতকে। এখানেই থেকে গেলে হয় না? হিমাচলে আরো অনেকবার আসতে হবে। এই উদার করা প্রকৃতি থেকে কতদূরে বাস করি, "লক্ষ্য শূন্য লক্ষ বাসনা"। খুব একটা ধার্মিক না বলেই হয়ত মনিকরণ তেমন মনে দাগ রাখেনি যতটা কসৌল আর তার চারপাশটা রেখেছে। যদিও শিখদের এই অক্লান্ত পরিশ্রম দেখলে শ্রদ্ধা করতেই হয়। কোনো আলাবেজার নেই, বড়লোক গরীবলোক যেমনই হও একই মাটিতে বসে একই খাবার খেতে হবে। আমাদের কিছু কিছু ধর্ম সংঘ আছে যারা ডোনেশনের উপর খাবারের বা প্রসাদের তফাৎ করে। এদের সেসব নেই, এটাই বড় আনন্দ দিয়েছে। ফিরতি পথে কুলুতে একটা বৈষ্ণোদেবীর মন্দির আছে। সে মন্দির তিন তলায়, সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। মা দেখলাম উঠেও গেল। ভয় পাচ্ছিলাম,মা এর পায়ের হাল খুবই খারাপ, তাও উঠে গেল দিব্যি। ধর্ম বা ভগবান ব্যপারটা যদি কোনোদিন প্রমানিত হয়ে যায় কিছু নেই ফক্কা সেদিন ওই লোকগুলোকে অল্টারনেট কিছু দিতে হবে,  না হলে সে প্রমান না করে দেওয়াই ভালো। 





ওই মন্দিরের উলটো দিকেই নদীর ধারে একটা চা ওয়ালার থেকে চা খেতে খেতে দেখছিলাম, বিকেলের সূর্য আলো ছায়ার খেলার খেলছে পাহাড়ের উপর। কাজকাম শেষ আজকের মতো, শাটডাউন করার আগে একটু আড্ডা দেওয়া আর কি। দুপুরে খেতে দাঁড়িয়েছিলাম একজায়গায়, একটা ছোট্ট চায়ের দোকান, স্থানীয় কিছু বিস্কুট, লজেন্স, ম্যাগি, ডিম নিয়ে যেমন হয় আর কি। ইন্টারেস্টিং হচ্ছে তার কাছে এক থলি আখরোট আছে, আর পিছনে নিজস্বে একটা তিরতিরে ঝর্ণা, উনুনের পাশে বসে আখরোট ভরে ঠোঙায়, আর ঝর্ণা থেকে জল ভরে আনে মাঝে মধ্যে উঠে। সেই সময়টা আমি হয়ত বসে বসে রেভিনিউ ক্যালকুলেট করি কিংবা অটোমেট করি কোনো ক্যালকুলেশন। জীবনটা এমন সোজা সরল হলে হয়ত আমার ভালোলাগত না, একজায়গায় বসে শান্ত হয়ে থাকাটা তো শিখলামই না এ জীবনে কিন্তু তাও এইসব এতাল বেতাল জীবন ছেড়ে প্রকৃতির মধ্যে ডুবে যাওয়ার ইচ্ছেটা যেন আরো বেড়ে যায় গাছপালা, পাহাড়, নদীর কাছে এলে। 
আমাদের চা খাওয়া শেষ, সূর্যও ডুবি ডুবি, মানালী যাওয়ার আগে একটা শাল ফ্যাক্টরিতে ঢুঁ মারা হয়েছিল। শাল কেনার জন্য না, কাজ কেমন করে করে দেখতে। যে পরিমান ডেডিকেশন দেখলাম, যিনি করছিলেন কাজটা সেই ভদ্রলোকের  বাপ্রে বাপ। কবে যে আমার এরকম ডেডিকেশন হবে, তাহলে তারের বাজনা শেখার শখটা তাহলে মিটবে। নদীর জলের, বাতাসের আওয়াজের সুর তুলতে পারবো বেশ।

 





মানালীতে ফের গাড়ি খারাপ হয়ে গেল যোগীন্দরজির। ব্যাটা মনিকরণ থেকে টার্ণটা নেবার সময়েই ঠোকা লাগিয়েছিল, অ্যাক্সেল গেছে ভেঙে। গাড়ির ঝামেলাটা এ বারে চলবে মনে হচ্ছে। পৌরানিক জায়গা গুলো কেমন দিব্যি জায়গাদখল করে দাঁড়িয়ে আছে। হিড়িম্বা মন্দির, ঘটোৎকচ মন্দির, বশিষ্ঠ কুন্ড আর মন্দির, মনু মন্দির। আমাদের দেশের ইতিহাস আর পুরানে বিরোধ আছে একটা,  আমি বলছিনা সব কটা পুরানই হুবহু সত্যি কিন্তু এই যে বশিষ্ঠ বা মনু বা হিড়িম্বা কিংবা ঘটোৎকচ এদের মন্দির আছে তার একটা রূপ আছে হয়ত এরা এক্সিস্ট করত। দেবতা বা দানব হিসেবে না, মানুষ হিসেবেই। আমরা সবাইকেই পুজো করে ঠাকুর বানিয়ে দিই, রবীন্দ্রনাথ কিংবা সত্যজিৎ এর কোনো গল্প সিনেমার বিরুদ্ধে একটা কথা বললেই যেরকম রে রে করে তেড়ে আসে তাতে এদেরও মূর্তি বানিয়ে, ধূপ ধুনো মন্ত্র দিয়ে পুজোও শুরু হল বলে,  সুতরাং সে হিসেবে বলছি না কিন্তু এই যে হিমাচলের রাম সীতাকে অবিকল একটা মিষ্টি দুটো হিমাচলি বলে দেখা যাচ্ছে, এই যে একটা গ্রামের দেবতা অন্য গ্রামে নিয়ে গিয়ে একসাথে উৎসব হচ্ছে এসবের পিছনের ইতিহাস নিয়ে নিশ্চয়ই গবেষনা হয়, আমিই খবর রাখিনা। হিড়িম্বা দেবী হিসেবে পুজো এখানেই হয় স্রেফ। সারা ভারতে রাক্ষসী, এখানে দেবী। আমি শুনেছি দুর্যোধনের পুজোও হয় এদিককারই কোনো গ্রামে।  একদিন নিশ্চিত জানা যাবে কেন ঘটোৎকচের পুজো শিং লাগানো গাছে হয়, বশিষ্ঠমুনির মূর্তি এমন কালো কষ্টিপাথরে কেন। বশিষ্ঠ মূর্তির  চোখ গুলো জ্বলজ্বলে, ছবি তোলা বারন, মন্দিরের কাজ ভারী সুন্দর । মনুর মূর্তিটা তেল সিঁদুরে ক্ষরে গেছে কে ছিল কেমন দেখতে কিছুই বোঝা যায়না। কিন্তু জায়গার বেশ একটা ব্যপার আছে। ঘিঞ্জি সরু রাস্তা বসতি পেরিয়ে প্যাগোডা ধাঁচের মন্দিরটা, একটু উঁচুতে তাই চারদিক চমৎকার দেখা যায়। মন্দিরের বাইরে এক বুড়ো আর একটা বাচ্ছা বসে ছিল আপন মনে, একজন বলিরেখায়, ভাবনায় আর একজন চিপসের প্যাকেট হাতে আনন্দে।মনুর মন্দিরে এই কম্বোটাই স্বাভবিক বটে। মনুসংহিতা যেমনই হোক, মনুর নৌকার গল্পটা চমৎকার।  মনুর আলয় থেকেই নাকি মানালী নাম,  এখানে গল্প কোথায় শেষ আর সত্যি কোথায় শুরু বোঝা দুষ্কর বটে। 

ছেলের মন্দির (ঘটোৎকচ এর মন্দির । এরকম প্রাকৃতিক হওয়াই উচিত ছিল বটে ওরকম বীরের )
মা এর মন্দির (হিড়িম্বা দেবীমন্দির)



ঐ যে কালো মত মূর্তিটা বশিষ্ঠের(চুরি করে তোলা ছবি কিনা তাই এমন)

মনু মন্দির


(ক্রমশ)

আগের পর্ব এইখানে