Saturday, May 14, 2022
পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা...(২)
পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা.. (১)
পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা... (৩)
দুপুরে পিছনের অশ্বত্থ গাছটা থেকে ঝিরিঝিরি হাওয়া ভেসে আসে। আমাদের গ্রামে অশ্বত্থকে বলে আশুথ গাছ । বট আশুথের হাওয়া বড় মিঠে হয়। গরমে আগে এ অঞ্চলে আসিনি। মাসখানেক আগে যখন এসেছিলাম তখন লু বইত, বন্ধুরা এসেছিল। সপ্তাহান্তের দিন, দুপুরবেলা জানলা বন্ধ করে আড্ডায়,হুল্লোড়ে, তরমুজে মজে থাকতে মন্দ লাগেনি একটুও৷ বন্ধুরা না আসলেও আমি জানি ওই লু আমায় কাহিল করতে পারত না, গরম আমার শীতের চেয়ে ঢের বেশী ভালো লাগে। এবারে এসে এক দু পশলা বৃষ্টি পেয়েছি মাঝে মাঝে। গাছগুলো আবার সব সবুজ হয়ে গেছে। কাঠবিড়ালী, দোয়েল, হাঁড়িচাচা, ছাতারে, শালিখ সব্বাই ফিরে এসেছে। এমনকি পাগলা কোকিলেরাও। সকালে বেশীক্ষন ঘুমোলে ডেকে ডেকে তুলে দেয়, দুপুরে সব নিঝুম হয়ে যখন স্রেফ পিছনের বারান্দা দিয়ে অশ্বত্থের হাওয়া এসে ঘোরে তখনো কোকিলটা ডেকে যায়। মেয়ে কোকিলটাও আছে, দেখেছি। বিশ্রী দেখতে। জীবজগতে মানুষ ছাড়া আর কোনো মহিলাই মনে হয় রূপসী না। তবে যার যাতে মজে মন, কালো কোকিলটা ওই বিশ্রী ছিটছিট মহিলা কোকিলের জন্যই ডেকে ডেকে হেদিয়ে গেল!
সকালে চা বিস্কুট খাচ্ছিলাম বারান্দায়, বিস্কুটের টুকরো পড়েছিল মনে হয় বারান্দায়। একটা কাঠবিড়ালী কুটকুট করে খেয়ে গেল। ওই সময়টা কাঠ হয়ে বসে থাকতে হয়। সামান্য বাড়াচাড়তেই ছোট্ট জীবটা ভয়ে চিড়িক চিড়িক আওয়াজ করে ছুটে পালায়। বাড়ির সামনের কামিনী গাছটা ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। অনেক রাতে বারান্দায় দাঁড়ালে ফুলের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে থাকে। আর সকালে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি। কামড়ায় না, নিজের মনে ফুলে ফুলে ঘোরে, মধু খায়, চলে যায়। কাঁঠাল গাছটায় দোয়েল আর শাহ বুলবুলিটা এসে বক্তব্য রাখে, চারদিক সরেজমিনে দেখে। হাঁড়িচাচা লম্বা লেজ নিয়ে উড়ে এসে বকে দেয়বলে মনে হয়। ছাতারেও ছাড়ে না, কেন এত বেলা অব্দি ঘুমিয়ে আছি বলে ডেকে বকে একাকার করে। সকালে খানিক পরেই আসে সব্জিওয়ালা, তারপরেই মাআআছ মাছ বলে মাছওয়ালা।
শান্ত দিন দুড়দুড়িয়ে টিম মিটিং, কাজের ফাঁকে গলে যখন বিকেলে যায় এক ঝাঁক টিয়াপাখি চক্কর কাটতে কাটতে ঘরে ফেরে ট্যাঁ ট্যাঁ আওয়াজে। সারাদিনের গল্প গাছা করে হয়ত। কে কোথায় কী নতুন জিনিস দেখেছে, জেনেছে। চায়ের কাপে, টিয়ার ঘরে ফেরায়, মেঘের লালে সন্ধ্যে নামে। এই ঘরটাও ছেড়ে দেবো আমরা, সে কাজেই আসা। অন্য ঘরে যাবো, সে ঘর খানিক বড়, খানিক কম ভাঙাচোরা। কিন্তু এ পাড়ার কাঠবিড়ালী, প্রজাপতি, ছাতারে, দোয়েল কেউই যাবে না ওখানে। এদিকের আম, কাঁঠাল, নিম গাছেদেরও দেখা যাবে না। অশ্বত্থ গাছের হাওয়াও না। আমাদের জীবনে চাহিদা কিঞ্চিৎ কম। আমাদের ভাঙাচোরা বাড়িতে বাইরের লোক না এলে অভাববোধও কিছু হয়না। এলোমেলো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকি। সেদিন বাজারে গেছি, রাস্তায় রাস্তায় কচুরি জিলিপির আহ্বান অগ্রাহ্য করা যায় না। হেঁটে হেঁটে এ গলি সে গলি করতে করতে একটা পুরোনো ভাঙা বাড়ির সামনে পড়েছি। এই মোটা থামগুলো ভেঙে পড়ছে, খড়খড়ি দেওয়া জানলায় ধুলোর আস্তরন। সামনের দেউড়িতে আবর্জনা। কোন প্রজন্মের শখ কোন প্রজন্মে ঘুচে গেছে কে জানে! পাশেই ইটালিয়ান সেলুনে দাড়ি কাটছে একজন, আর তারপাশেই মুরগি। মাছওয়ালা আমায় জোর করে দুটো পাবদা পুরে দেয়। আর লাগবে না বললে বলে, নিয়ে যা নিয়ে যা, এমনিই দিচ্ছি, টাকা নেবো বলেছি কি? ও দুটো তোর জন্য !
পাগলা কোকিল বৈশাখের শেষে ডেকে যায়, পাগলা মাছওয়ালা এমনি এমনি মাছ দেয়..পাগল বিনে ভালো থাকার জো নেই কিনা।
Saturday, March 5, 2022
চাঁদ দেখতে চন্দ্রাহতরা
Monday, February 14, 2022
চাঁদ দেখতে.. গোপালপুর রম্ভা
Sunday, January 23, 2022
আমলামেথি আর বিদ্যেধরী
সড়াৎ করে টার্ণটা নেওয়ার পর থেকেই রাস্তাটা খারাপ হতে শুরু করেছিল। তাও গুগল ম্যাপকে ভরসা করেই বেঁকেছিলাম। এখন তো একেবারে ফাটা বাঁশে আটকে যাওয়া কেস রে ভাই।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি বিশ্রী আবহাওয়া। লেপমুড়ি দিয়ে ভূতের গল্প পড়ো, মাঝে মধ্যে একটু কফি খেলে। দুপুরে কচ্ছপের মতো অতি কষ্টে বেরিয়ে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি খেলে ব্যস। আর কিচ্ছু করা শাস্ত্রে মানা। কিন্তু মাঝে মাঝে শাস্ত্রের নিয়ম অগ্রাহ্য করাও মহারাজ ঋকানন্দের নিয়ম৷ লম্বা পাড়ি দেওয়া হয়নি অনেকদিন, জলের শব্দ শোনাও হয়নি কত্তদিন। এই বছরের একুশটা দিন কেটে গেছে আমি আপিস করেছি, খেয়েছি, আড্ডা মেরেছি, ঘুমিয়েছি, পড়েছি, উদ্ভট ভিডিও দেখেছি কিন্তু নিঝুম দুপুরে নদীর ছলাৎ ছলাৎ শুনিনি, নতুন মানুষ দেখিনি, পথের ধারে হঠাৎ থেমে চায়ের দোকানের সস্তার কেকে আমেজ করে কামড় দিইনি, হুট করে আসা বৃষ্টিতে কিংবা শেষ বিকেলের সূর্য মাখিনি। পথ আমার সব শক্তির আধার, আমার ভালো থাকার ওষুধ। তাই আমার উপায় ছিল না আজ লেপমুড়ি দিয়ে জিরোবার।
যাওয়ার জায়গার অভাব নেই। কিন্তু ট্যুরিস্ট প্লেসে ঠিক যেতে চাইছিলাম না। একটু হলেও নাগরিক উল্লাস তফাৎ থাক। আবার নদীও চাই, সমুদ্র বা পাহাড় তো বললেই পাওয়া যায় না। সুতরাং গুগলবাবুকে একটা গাঁ এর ঠিকানা দেওয়া হল। আমলামেথি। কেমন সুন্দর নাম না? নাম শুনেই প্রেমে পড়ে গেছিলাম আসলে। তা গুগলের মনে হয় অত ভালোলাগেনি। ওই যে ওর কথা না শুনে শুরুটা অন্য রাস্তা নিয়েছিলাম তাতেই তার মাথা গোলমাল হয়ে গেছে মনে হয়। শুরুতে বলছিলাম না, ওই চুড়িবাজার থেকে টার্ণ নিয়ে খানিকদূর ভারী সরুরাস্তা দিয়ে এগোনোর পর দেখি একটা দরগার পাশে মেলা মতো বসেছে, আর সেই দু পাসের পসরার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে জায়গা আছে তাকে যদি রাস্তা বলা যায় তবে সে রাস্তায় ওইদিক থেকে একটা টেম্পো আর বড় লরি ঢুকে এসেছে। এদিকে আমার বাঁ দিকে গরম জিলিপির কড়াই, ডানদিকে এক বাইকওয়ালা আরাম করে চিনেবাদাম সওদা করছে। সবাই অপেক্ষা করছে কখন তার কেনা শেষ হবে সে গেল, এরপরেই সাঁত করে কটা ভ্যান ঢুকে ব্যাপারটা বেশ খোলতাই করে দিল। একদিকে খাদ আর উটের দ হয়ত নেই কিন্তু গরম জিলিপির কড়াই, লরি,আর কাঁচা রাস্তার কম্বোটাও কম না। কী করে যে পার হলাম সে দ তা আমারও মনে নেই। আমার হাতেই স্টিয়ারিং ছিল কিন্তু ও পথ দিয়ে আমি মানে এই আমিই পেরিয়েছি!!
এই বীর ভাব কিন্তু বেশীক্ষন রইলনা। গুগল ম্যাপ আজ আমাদের বেশ অ্যাডভেঞ্চারে নামাবেন স্থির করেছেন। দু কদম যেতে না যেতে তিনি আরেকটি বাজারের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে। শুক্রবার না হলেও শনিবারের হাটও বেশ রমরমাই৷ মাছ,সবজি, গামছা, দাদের মলম আর তার সাথে রাস্তা সবার মানে আমারও মান্র আমার সাইকেলের এই ভাবনায় কিছু মানুষ সাইকেল রেখে দিয়েছে। সেসব সদিয়ে যাও বা পেরোলাম, একটা সরু এমন রাস্তায় ঢোকালো, যার একদিকে পুকুর,একদিকে খাটাল বা বাড়ির দেওয়াল! আর ভরসা করা গেল না। আমার সনাতনধর্ম বেঁচে থাক, মানুষ ডেকে জানা গেল আর কিলোমিটার দুই এই রাস্তা সইলে মেন রাস্তায় ওঠা যাবে। দাঁতে দাঁত চেপে এসব খারাপ সময়গুলো পার হলে কিন্তু ম্যাজিক মেলে, আর খারাপ রাস্তাতেই মেলে। এই যেমন দেখোনা, ভেড়ির ধারে গাড়ি থামিয়ে, হাঁটতে মন্দ লাগছে নাকি? রোদ বেরোয়নি ঠিক কথা কিন্তু এই যে পানকৌড়ি কাদাখোঁচা আরো কত চেনা অচেনা পাখি উড়ছে। আরো কতক্ষন পরে ফের রওনা দিলাম। কত লোকে পথ চিনিয়ে দিল এদিক না ওদিক, রাস্তায় নামলে রাস্তা চিনতে আর কঠিন কি। ।
আবারও একটা সরু রাস্তায় ঢুকে পড়েছি। এবারে আবার একদিকে খাল একদিকে খেতিজমি।বৃষ্টি এলো ঝমঝম করে এর মধ্যেই।একটা ন্যাংটো খোকা ছাতা মাথায় দৌড়ে গেল, দুটো ছোট মেয়ে ছুটতে ছুটতে বৃষ্টি মাখছে, একটা ছোট ছেলে তার ছোট ছাগল ছানা বুকে জাপটে নিয়ে মাথা বাঁচাতে যাচ্ছে। পথের ধারে কত অজস্র দৃশ্য তৈরী হয় সেসম দু চোখে নিয়ে এই বিপজ্জনক রাস্তায় চলতেও অসুবিধে হয়না। বৃষ্টি থেমে যায় আচমকাই, দূরে দবুজমাঠ আরো তকতকে হয়ে করে দিয়ে৷ একজনকে জিজ্ঞেস করি রাধারাণীপুর জায়গাটা কোথায়? কেউ চেনে কেউ চেনে না, তবে আছে ঠিক। আসলে চলার নেশাতেই চলছি, পৌঁছতেই হবে এমনও কিছু নেই। তবুও পথচলতি লোক উপযাচক হয়েই বলে দেয়, কেউ বলে আগিয়ে দেবো চলো। পথের ধারে এর কুড়িয়ে পাওয়া ধন থাকে আমার ঘরে থাকতে ইচ্ছেই করে না তাই।
আমলামেথি নামের মতোই জায়গাটা। মস্ত গাছের নীচে ছোট্ট দোকান, দুপুরের খাওয়া চলছে তখন। রাস্তায় থেমে চা বিস্কুট খেয়েছিলাম এক জায়গায়। বাপ গিয়েছিল খেতে, সদ্য গোঁফের রেখা গজানো ছেলে সামলাচ্ছিল দোকান।ভাত খাওয়া থামাতে ভাল্লাগেনা কারো, তার চেয়ে চলো নদীর কাছেই বরং। বিদ্যেধরী নদীর কাছে কতবার এলাম এই নিয়ে? কী জানি! এক নদীতে তো একের বেশীবার আসাও যায় না। দুপুরের খেয়ায় ছাগল, বাইক, সাইকেল, ডাব সবই চলেছে ওইপারে। অত বাছবিছার চলে না এদিকে। ছাগলও বাধ্য ভারী, চারটি কাঁঠালপাতা দেওয়া আছে, চিবিয়ে চলেছে আপন মনে। ওইপারে পৌঁছে বাঁধ ধরে হাঁটা শুরু করেছি। বাঁধের ধারের গাঁ টা শীতের দুপুরে ঝিমোচ্ছে। মাঝে মাঝে মোরগের কোঁকরকোঁ, গরুর হাম্বা, কিংবা ছাগলের ম্যা ম্যা ভেসে আসে। বাঁ হাতে বিদ্যেধরী ছলাৎ ছলাৎ করে সঙ্গ দিচ্ছে। একটা মোহনচূড়া পাখি লাফিয়ে লাফিয়ে পোকা না কি যেন ধরছে। মোটকা একটা শালিখ তার সাথে ভাব জমাতে যাচ্ছে। মোহনচূড়ার মত সুন্দর পাখি পাত্তা দেবে কেন, উড়ে উড়ে পালাচ্ছে। মাছরাঙা আর একটা ঘুঘু বসে আছে চুপটি করে ইলেকট্রিক তারে। একটা মৌটুসী আকন্দ গাছে দোল খেয়ে নিল। একটা বাঁশপাতি উড়ে গেল। ক্যামেরাটা আনিনি, আসলে খুব প্ল্যান করে বেরোইনি তো। বেরোতে হবে, এই তাড়না থেকেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। খুব অসুবিধেও বোধ করছিনা। দিব্যি ভারমুক্ত হেঁটে যাওয়া। একটা বৌ কোলের ছেলে নিয়ে নতুন বাছুরএর তদারকি করতে গেল। ঝপঝপ করে জল ঢালছে মাথায় একটা ছেলে। ক্যাঁচক্যাঁচ করে টিউবয়েলের আওয়াজ আসছে। পাশের পুকুরের একঝাঁক হাঁস আরাম করে সাঁতার দিচ্ছে। ফিরতে ইচ্ছেই করছে না। হেঁটে চলেছি কতক্ষন দেখিনি, কতদূর এলাম কে জানে। "কাদের বাড়ি এসেছ? কোথায় যাবে?" জাল সারাতে সারাতে হাঁক দেয় কেউ। গ্রামের পথে এভাবে খোঁজ নেওয়া স্বাভাবিক। উত্তর দিয়ে এগোই। রোদ পরে আসছে ক্রমেই। ফিরতে হবেই। একবার ঠিক আসবো, পিছুটান না রেখে। যেখানে অন্ধকার নামবে সেখানেই মাথা গোঁজার ঠাঁই জুটিয়ে নিয়ে কিংবা না জুটিয়ে নিয়ে। পথের দেবতা কবে আমায় তেমন ভাবে নিয়ে বেরোবে কে জানে....
Sunday, December 26, 2021
আনাচ কানাচ
Saturday, December 11, 2021
মহারাজ, একি সাজে এলে হৃদয়পুর মাঝে (পর্ব দুই)
| ছেলের মন্দির (ঘটোৎকচ এর মন্দির । এরকম প্রাকৃতিক হওয়াই উচিত ছিল বটে ওরকম বীরের ) |
| ঐ যে কালো মত মূর্তিটা বশিষ্ঠের(চুরি করে তোলা ছবি কিনা তাই এমন) |
| মনু মন্দির |
Friday, November 26, 2021
মহারাজ, একি সাজে এলে হৃদয়পুর মাঝে
নষ্ট ব্যপারটা একেকজনের কাছে একেকরকম। মাস গেলে বিশাল বড় কোনো পদে থাকা লোকের কাছে এক সপ্তা কাজ না করর ঘুরে বেড়ানো হল সময় নষ্ট, কারোর কাছে গান শোনা সময় নষ্ট কারোর কাছে গান হীন দিন মানে নষ্ট। এত নষ্টের কথা এলো কারন, সেদিন শিমলা ম্যালে যেই না ঝুপ্পুস করে মেঘ নেমে এলো আর তারপর পরেই বৃষ্টি, কানে এলো, 'এরকম আবহাওয়া বেড়াতে এসে দিনটাই মাটি'। আমাদের অবশ্য মোটেও মনে হল না নষ্ট হল কিছু। দিব্যি মেঘে মেঘে ছেয়ে গেল চারপাশটা, তার ফাঁক দিয়ে দিয়ে সেই কতকালের পুরোনো সব স্থাপত্য উঁকি দিচ্ছে, একদুজন স্থানীয় লোক দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে,চারপাশটা বিলকুল ফাঁকা।জুতো ছেড়ে এখন আমার মোজা ভিজেছে টের পাচ্ছি, শীতে কাঁপছি তার মধ্যে ফূর্তিটা আসছে কোত্থেকে হ্যাঁ?
আসলেই আনন্দ ব্যপারটার জন্য কোনো উপকরণই পর্যাপ্ত না আবার অপর্যাপ্তও না। কতদিন হয়েছিল আমার মনের ভিতরটা কেমন ভেজা খড় হয়ে পড়েছিল। কিছুতেই লম্বা সময়ের আনন্দ আর হয় না। কিছুতেই আগুন জ্বলে না। তারপর ট্রেনের ভোর এলো, চা, নাস্তা- ব্রেড অমলেট, আলুপরোটার হাঁকডাক, চলন্ত গাছপালায় রোদ দেখতে দেখতে ভিতরের ভেজা খড়টা যে শুকোতে শুরু করেছে তা সত্যি বলতে খুব একটা টের পাইনি। মনের ব্যপার স্যপারই আলাদা মশাই, কখন পাক খেতে খেতে পাহাড়ের উপর আর কখন নীচে টের পাওয়াই যায় না! সে যাক বেড়ানোর গল্পে এসব অবান্তর কথা। তা অবশ্য সত্যি বলতে আমার লেখায় বাঁধ ছিলোও না কখনো তেমন, সাহিত্য না এ স্রেফ কিবোর্ডে টাইপ আর কি।
ট্রেনে করে বাংলা পার হয়েও কিন্তু মনে হচ্ছিলো না ভূ-প্রকৃতি খুব বদলেছে, জলাশয় কম চোখে পড়ছে বা পড়ছে না, তা বাদ দিলে সবুজ ক্ষেত খামার পুরোটাই সঙ্গ দিলো তো দিব্যি। আর আশ্চর্যের বিষয় দেখলাম ট্রেন যখন ব্রিজে ওঠে আর গুমগুম আওয়াজ হয় ঠিক ছোটবেলার মতই উত্তেজনা হয় নদী দেখার। বহু বহু দিন পর ট্রেনে এমন লম্বা জার্নি, অত সময় পাওয়াই যায় না এখন। মাঝে মাঝে যখন পুরোনো কারোর লেখা পড়ি তিন মাস হাওয়া বদলে কিংবা এক সপ্তাহ আগে থেকে বিয়ে বা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যেত, তাদের ক্ষতি তো কিছু হত না কাজে, আমরা স্ক্রাম স্ক্রাম খেলায় কিই যে মহৎ কাজ করে দিচ্ছি কে জানে!
কালকা স্টেশনটা ভারী চমৎকার। খুব বড় কিছু না, কিন্তু ঝকঝকে। পুরোনো দিনের মত করে সাজানো টয় ট্রেনের সামনের স্টেশনের অংশ। এক গাদা পাখি শেষরাতের যাত্রী, হকার সবার মিলিত হাঁকডাকের সম্মিলিত প্রতিবাদ জানাতে লেগেছে। আরে আবার বৃষ্টি এলো দেখছি!এমনিতেই কোভিডের কারনে মা বাবাইকে নিয়ে বহুদিন বেরোইনা, তাছাড়া আমার বাবা পাহাড়ে একটু ভয় পায় তবু পাহাড়ে এসেছি। এর মধ্যে বৃষ্টি ভয় দেখায় খানিক। উত্তরাখন্ডে বিপর্যয় চলছে, আমরা যখন হিমাচলের দিকে পা বাড়িয়েছি, হালকা চিন্তা আছেই।তার মধ্যে বেরোনোর দিন সকালে মায়ের হাতে গায়ে ফুটন্ত জল পড়েছে। আর আশ্চর্য হয়ে দেখলাম এত চিন্তা সমেতও চিন্তা গুলো তেমন হুল ফোটাতে পারছে আনন্দে। মানে এই যে শিবালিক ছাড়ল, আমাদের পাশে পাহাড়ের দেওয়াল আর মায়েদের ওদিকে দিব্যি বিস্তীর্ণ এলাকা তাতেও কি দমলাম নাকি(অথচ আমরা আমাদের সিট ছেড়ে এসেছি ওদিকের)। ছেলেমানুষ হয়ে টাকমাথা টিটিকে বলা গেল সিট বদলাতে, সে ব্যাটা ঝিমুলো তবু শুনলো না, মানুষ এমতাবস্থায় কী করে? চুপ করে বসে থাকে আর যা পাওয়া যায় তাই দেখে কিংবা মন খারাপ করে তো? আমরা দুজন একটুও না দমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম চারপাশ, জানলায় নাক ঠেকিয়ে কিংবা দরজা খুলে দেখলাম কেমন টানেলে ঢুকছে ট্রেন বা পুলের উপর দিয়ে বাঁক নিচ্ছে! তারপর দেখি একজন লোক ভালো দিকের জানলায় বসে ঘুমোচ্ছে, তার সিটে বসতেই বাপ্রে কী ঘুম পেলো!!! মানে অবস্থাটা ভাবুন, আপনাকে বললাম দাদা আপনি ঘুমোচ্ছেন তাহলে আমি এখানে বসি? বসে আমি পাঁচমিনিটের মধ্যে ঢুলতে শুরু করলাম!! একে কাউকে সিট বদলাতে বলাই আমাদের কাছে দুঃসাহসিকতম কাজ তায় সেই সিটের মর্যাদা না রাখে ঘুমিয়ে পড়ায় লজ্জায় আমাদের আমাদের জন্য সীতার পাতালপ্রবেশ এর মতো কিছু প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তা কলিকালেও এসব আছে হে, অবিশ্বাসীর দল, না হলে ফস করে বারোগ স্টেশনটা চলে আসতো না। কালকা শিমলার এই যাত্রাপথের মাঝে মাঝেই ছবির মতো সুন্দর সব স্টেশন পড়ে। শিভালিক এক্সপ্রেস সব জায়গায় থামে না এই একটি স্টেশনেই থামে। বারগের আগে একটা স্টেশন দেখেছিলাম পাহাড়ের বাঁকে, ট্রি হাউস আছে একটা।ওখানে থেকে যাবার ইচ্ছে মনে আসতে আসতেই পরের টানেলে চলে গেছি। বারগে খাবার দাবার পাওয়া যায়। সেইইই কোন ভোরে উঠেছি, সিধে কালকা অব্দি জায়গা পাইনি বলে চন্ডিগড়ে নেমে কামরা বদলে আবার একই ট্রেনে উঠে আসা। খিদে পাবে না হ্যাঁ! আর এরকম একটা বৃষ্টি ধোয়া ঝকঝকে স্টেশনে যদি চা, ভেজ কাটলেট, (আসলে কাটলেটের আকারে আলু টিক্কি বলা যায়, যদিও খেতে চমৎকার) , চানা বাটোরা(সাত সকালে অম্বলের ভয় ছিল কিন্তু এ জিনিস আলাদা খানিক আমাদের এখানকার থেকে) ইত্যাদি মেলে তাকে না করলে পাপ লাগে। খামোখা পাপের পথে যাবার থেকে খাওয়াই ভালো।
তারপর তো টানেলের অন্ধকার, বনের পথের মধ্যে দিয়ে দিয়ে পৌঁছনো গেল আরেক ঝকঝকে সুন্দর স্টেশনে। আহাহা এমন সুন্দর করে রাখতে তো খুব পয়সা লাগে না, আমরা অসুন্দর করে রাখি কেন?
বিকেলে বৃষ্টি এলো যখন, তখনই শুনছিলাম আশপাশ থেকে হা হুতাশ। কারো কারো নষ্ট হল আর আমাদের মতো কারো কারো মেঘ জড়িয়ে হাঁটা হল। শিমলা ম্যালে সবাইই গেছে মনে হয়, ইনফ্যাক্ট সকলেই আমায় বলেছিল শিমলায় না যেতে কিছুই নেই। আমি এখনো হাঁ করা টাইপ গেঁয়ো ভূত বলেই হয়ত আমার খারাপ কিছু লাগেনি। দিব্যি ঝকঝকে তকতকে ম্যালের রাস্তা, বেকারি, পুরোনো স্থাপত্য পাশে পাশে। বৃষ্টিতে মেঘেতে লোকজন কম ছিল সেটা একটা আহ্লাদের ব্যপার ছিল তবে আমার পরের দিন বিকেলে ফের গিয়েও দিব্যি লেগেছে। চার্চের মাথায় শেষ বিকেলের আলো,কিংবা সন্ধ্যের মুখে ঝুপঝুপ করে জ্বলে ওঠা স্ট্রীট লাইট, অন্য স্বাদের বেকারি, ছোট্ট ক্যাফের বাইরে বসে চায়ে চুমুক মন্দ লাগার অপশনই নেই।
হিমাচল ট্যুরিজম এর ব্যবহার, সার্ভিস, হোটেলের মেইন্টেন্যান্স সব কিছু এত চমৎকার লেগেছে বলার না। আর হিমাচলি থালিটার কথা না লিখলে খুব খারাপ হবে। কুমড়ো যদি এত ভালো করে বানানো যায় তবে এরম বিশ্রী করে খাওয়ানো হয় কেন এরকম একটা প্রতিবাদী প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে। আর ওয়ালনাট পাইটার কথা বলিনি বুঝি? থাক বলে বেশী কষ্ট টস্ট দিয়ে লাভ নেই। একখান ছবি দিয়ে যাই বরং।
শিমলা থেকে মানালির রাস্তাটা এইই লম্বা। পাহাড়ে আমার গা গুলোয়, কিন্তু মান্ডি পেরোনোর পর থেকে যেই রাস্তার পাশ দিয়ে বিয়াস দেখতে পেলাম অমনি রাস্তা সারাই এর ধূলো উপেক্ষা করে কাচ নামিয়েছি আর অমনিই আমাদের ড্রাইভার যোগীন্দরজি বিড় বিড় করে জানালো ক্লাচ কাজ করছে না! বোঝো! কিন্তু ওই যে খড়টা শুকোতে শুরু করেছে বলেই হয়ত, তেমন কিছু বিরক্তি হল না। গাড়ি খারাপ হতেই পারে, আমাদের আজ মনিকরন ঘুরে যাবার কথা ছিল তা হবে না আর সত্যি বলতে কি ভালোই হয়েছে। এত লম্বা পথ একদিনে পাড়ি দিয়ে আবার এদিক সেদিক ঘোরা কষ্টকর হয় তাছাড়া অমন করে আর যাই হোক পাহাড়, তাও আবার হিমালয়ের মত পাহাড় ঠিক উপভোগ করা যায় না। যে জায়গায় গাড়ি খারাপ হয়েছিল, রাস্তার কি সব কাজ চলছিল, সে কি ভয়ানক ধূলো। তাও আমার হাঁচি টাঁচি শুরু হল না কিচ্ছু। বিয়াস উচ্ছল কিশোরীর মত বইছে। আকাশটা কি নীল!
কদ্দিন থাকবে এসব কে জানে! মানুষ যেভাবে পাহাড় কেটে চার লেনের রাস্তা বানাতে শুরু করেছে তাতে মনে সন্দেহ লাগে। পাহাড় কাটলে আমার ভারী দুঃখ হয়। কত শিকড় পাথর ,পোকামাকড় মরছে বলে শুধু না, পাহাড় নিজেই ভীষন জ্যান্ত একটা জিনিস। তাকে কেটে কুটে মিলিয়ে দিলে মায়া লাগে, দুঃখ হয়। একটা লোক খুব চানা বিক্রী করছিল। ধূলোমাখা চানার আলাদা স্বাদ হত অবশ্যই কিন্তু অজানা ধরনের মোয়াও তো বিক্রী হচ্ছিল। জিনিসটা তোফা খেতে কিন্তু কী দিয়ে তৈরী জানতে পারলাম না। যোগিন্দরজি হঠাৎ ডেকে বলে দেখ দেখি কেমন ফের কাজ করছে ক্লাচ!বোঝো! এ গাড়ি না প্রডাকশন সার্ভার একবার কাজ করে একবার না! শেষে তার মালিক অন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে দিল, ফের উজিয়ে মান্ডি গিয়ে নতুন গাড়িতে করে নতুন রাস্তা ধরা গেল। নতুন রাস্তা কারন এই নতুন ড্রাইভার শৌখিন মানুষ, ধুলোভরা রাস্তার থেকে ঘুরে যাওয়া তার পছন্দের। লম্বা লম্বা পাহাড় পেরিয়ে যেতে যেত চোখে পড়ে আইআইটির মস্ত ক্যাম্পাস নদীর ধারে। সন্ধ্যে নামার মুখে এক পাল ভেড়া আমাদের সামনেই ঘরে ফেরে।
কুল্লু উপত্যকায় নদীর আওয়াজ শুনতে পেলাম দেখার উপায় নেই, সন্ধ্যে নেমে গেছে, দেখতে পাবো কাল। উফফ সে যা সুন্দরী দর্শনেই প্রেম হবে কিন্তু সে সব তো পরে। এখন অন্ধকারে একটা বিশাল রাজবাড়ির সামনে নামিয়ে দিল। অল্প আলোয় হোটেলের বিশাল কাঠের দরজা পেরিয়ে পেরিয়ে একটা একটা মহল পেরিয়ে আমাদের ঘরে পৌঁছনো গেল। মস্ত ঘর, দোতলা ঘর,ঝোলাবারান্দা, পাথরের বাথরুম। সব মিলিয়ে রাজকীয় ব্যপার বটে। তবে রাজার মেজাজ টের পেয়েছিলাম পরের দিন সকালে।(ক্রমশ)























