Saturday, March 14, 2020

বালীতে কদিন(তিন)

আগের পর্ব

বালীতে এ কদিন সমিদ্র সৈকত দেখলাম, বালিনিজ নাচ দেখলাম, কিন্তু মানুষজন এর সাথে কথা আর হল কই তেমন, রেভো আর সুর্য ছাড়া। এদিকে কোথাও গেলে সেই জায়গার রাস্তায় না হাঁটলে আমার স্বস্তি হয়না, ঘোরাঘুরি ঠিক হয়েছে বলে বোধ হয়না। এদের গান কেমন, সুর কেমন, বাড়ির ভিতরটা কেমন হয়? শান্ত শহরের বুকে ধানক্ষেত দেখেছি,  বিস্তীর্ণ ক্ষেত দেখা হয়নি , পরিষ্কার তকতকে রাস্তা, হর্ণ বাজিয়ে বিরক্ত না করার ভদ্রতা দেখেছি কিন্তু মন চাইছিল অন্য কিছু আরো। বলতেই পারো,  এ কেমন লোভী মন হে তোমার, এত সুন্দর সুন্দর পাহাড়ের ধার থেকে সমদ্র সৈকত, এত চমৎকার নীল জল, পাহাড় পাশে নিয়ে সমুদ্রের মধ্যে বোটে করে দ্বীপে যাওয়া তাতেও মন ভরছে না? আরো চাই? সত্যি বলতে এই তিনদিন চমৎকার কেটেছে, জায়গাটা নিয়ে অভাব অভিযোগ দূরে থাক মন ভরিয়ে দিয়েছে। নুসা দুয়াতে ডিপ সি ডাইভ করেছিলাম, সেইটে খালি তেমন জুতের লাগেনি। ইকুইপমেন্টটা ভালো ছিল না তেমন আর এর চেয়ে ঢের বেশী মাছ আর কোরাল আন্দামানে দেখেছিলাম। যাই হোক আসলে তো বালী মানে স্রেফ এই সমুদ্র না,  এদের সংস্কৃতিও বহু বহু দিনের। আমরা সেসবের স্বাদও নিতে চাইছিলাম। তাই আজ থেকে আমরা কুটা ছেড়ে উবুদেই থাকবো আর উবুদ থেকেই চারপাশ ঘুরবো। উবুদ হল এদের সাংস্কৃতিক রাজধানী। ছোট্ট শান্ত প্রাচীন একটা শহর।


সকাল বেলা আজ প্রথমে যে মন্দিরে গেলাম তার নাম তামান আয়্যুন।  এখানের সব মন্দিরের গেট দ্বিখণ্ডিত দুই খানা প্রতিসম পাথরের। দরজা থাকেনা কোনো। বলা হয়, এই গেট আসলে শুভ আর অশুভের গন্ডী। শিবের সাথে মাউন্ট মেরুর একটা যুদ্ধ হয়েছিল নাকি, আর তারপর তাকে ভাগ করে দেয়।ভাঙাচোরা ইংরিজিতে যতটুকু বোঝা যায় আর কি৷ তামান আয়্যুনে ঢোকার মুখে বিভীষণ বা যক্ষ জানিনা কে, দেখি জবা গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। লোকজন বেড়াতে গেলে কেমন সুন্দর জামা জুতো পরে পোজ দেয়, আমরা দুজন এই জবা গোঁজা যক্ষ বা বিভীষণ কে ভেঙিয়ে ছবি তুলে বেড়ালাম। বালীর মন্দিরের আরেকটা বিশেষত্ব হল  প্যাগোডা স্টাইলের চূড়া। প্রথমে গেট তারপর পার হয়ে খানিক খোলা চত্বর আর গান বাজনা করার উঁচু জায়গা তারপর পেরিয়ে মূল পুজো করার জায়গা যেটা সেইটাই ওরকম চূড়া করা। বেশ লাগে দেখতে। বালীনিজরা এমনতে বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন,  আর এরা দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে মূলতঃ বানিজ্য করেছে বলেই তাদের প্রভাবও বেশী পড়েছে। যেমন প্রতিটা মন্দির অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, দক্ষিণ ভারতীদের মতই নিম্নাঙ্গে সারং জড়িয়ে ঢুকতে হয় প্রতিটা মন্দিরে (তা যদি চালু থাকে)। প্রচুর গাছপালা দিয়ে ঢাকা এই তামান আয়্যুন এর চত্বর। এইটায় অত ট্যুরিষ্ট নেই।  বেশ শান্তি শান্তি লাগে ভীড়হীন জায়গাটা।
এই সে জবাপ্রেমী যক্ষ

বালিনিজ গেট , প্রতিটা মন্দির বাড়িতে ঢোকার মুখে এরকম থাকবেই, আর দূরে সাহেবগুলো সারং পরে চলেছে

মন্দিরে ঢোকার মুখে


ঢোকার পরেই যেসব জায়গায় থাকে অনুষ্ঠানের জন্যে

প্যাগোডা আকৃতির মন্দির।।বালির মন্দিরে বৈশিষ্ট্য

তামান আয়্যুন মন্দির



বালীদ্বীপের আরেকটা দারুন জিনিস হল রাইস টেরেস। মানে পাহাড়ে ধাপ কেটে ধান চাষ। এবং সেটা একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে। বালিতে দুটো বিখ্যাত রাইস টেরেস আছে, জাটিলুই আর টেগালালং। এরমধ্যে জাটিলুই উবুদ থেকে একটু দূরে,পাহাড়ের উপর যেতে হবে গাড়ি করে, দূরে বাটিকারু আগ্নেয়গিরি দেখা যায় এখান থেকে। জাটিলুই আবার ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। এখানে যেতে গেলে টিকিট লাগে, প্লাস একটু দূরে তাই এখানে লোকজন কম আসে খানিক। এলেও ভারতীয় লোকজন কম কারন উবুদের একদম কাছেই টেগালালং,  তাছাড়া বেশীরভাগ ভারতীয়দের প্ল্যানে  টেগালালং, কফি প্লান্টেশন, ওয়ানাগিরিতে দোলনায় ছবি তোলা একটা প্যাকেজে থাকে। খারাপ কিচ্ছু না,  কিন্তু আমরা সেটা চাইনি, একটু কম ভীড় তুলনামূলক ভাবে  কম এক্সপ্লোরড জায়গায় ঢুঁ মারতে চেয়েছি, তাছাড়া কফি প্ল্যান্টেশন দেখার চেয়ে আমরা হাইকিং করতে বেশী উৎসাহী ছিলাম। কম এক্সপ্লোরড মানে এমন না একেবারেই লোক নেই, আছে, তবে বেশ খানিক কম। যাই হোক, তামান আয়্যুন থেকে ছায়া ছায়া গাছ ঢাকা রাস্তা দিয়ে চললাম। সরু রাস্তা,  পাশেই জমি,  গ্রামই একটা, কিন্তু বড় সুন্দর বড়ই মনোরম। হর্ণ দেওয়ার প্রশ্নই নেই, ওভারটেকও করেনা কেউ চট করে, রাস্তার দুপাশে জঞ্জাল বা বাইক,ঠেলা রেখেও দেয়নি কেউ। আচ্ছা আমরা এমন হতে পারিনা কেন? স্রেফ পপুলেশন দায়ী না, আমরা আসলে স্বভাবে ইন্ডিসিপ্লিন্ড, নিয়ম ভাঙাতে আমাদের বীরত্ব! তাতে আর পাঁচটা লোকের অসুবিধে হলেও। মাঝ রাতে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে বাইক যায় পাড়া কাঁপিয়ে, হর্ণ বাজিয়ে...কোনো দরকার নেই কিন্তু ওই, নিজেকে প্রদর্শন করা হবে কুৎসিত ভাবে হলেও!  

চলতে চলতে মাথায় মেঘ নিয়ে বাটুকারু পাহাড় দেখা দিল, একটা ছোট বসতি অঞ্চল পেরোচ্ছি সে সময়। এখানে প্রতিটা বাড়ি বা দোকানই সকালবেলায় ভগবানের উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করে ছোট্ট কলা পাতার তৈরী পাত্রে। নির্দিষ্ট কিছু জিনিস নেই,  আমি সেই উৎসর্গে পয়সা কেবলমাত্র একটি ক্ষেত্রে দেখেছি আর একটাও না। কেউ বিস্কুট দিয়েছে দেখেছি, কেউ দিয়েছে বাতাসা, এমনকি ডিম দিতেও দেখেছি। আমি যা খাই ভগবানকে তা থেকে বঞ্চিত করার কী আছে এমনই ভঙ্গী। ছোট্ট জনবসতিটা পার হচ্ছি যখন সার সার বালীনিজ বাড়ি, আর তাদের সামনে বেদী মত করা সেখানে পুজো নিবেদন করা, সোজা রাস্তার মিট করছে মেঘ মাথায় করা বাটুকারুকে। আহা ভগবান থাকলে এমন ভাবেই থাকা উচিত, রাজার মত, মন্দির এর ঘুপচিতে না ।
এই যে বেদী করে ছোট্ট ছোট্ট হাতে তৈরী ডালা দিয়েছে

দেবতার জন্যে নিবেদিত...রাস্তা

জাটিলুই পৌঁছেই মনটা ভরে গেল। আজ রোদ ওঠেনি, মেঘলা আবহাওয়ায় পাহাড় ঘেরা এই রাইস টেরেস যেন শান্ত করে দেয় বুকের কাছটা৷ সেই নবম শতক থেকে সমবায় পদ্ধতিতে জল বাঁটোয়ারা করে, পার্সিয়ান হুইল ইরিগেশন ব্যবহার  করে। একই পদ্ধতি এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। ওদিকে পাহাড়ের মাথার মেঘগুলো ছুটোছুটি লাগিয়েছে,আমরা টুকটুক করে হাঁটা শুরু করলাম  পাহাড়ি ধান জমির মধ্যে দিয়ে। ছশো একর জমির পুরোটা হাঁটবে অর্থাৎ লং ট্রেক রুট নেবে না শর্ট তা ঠিক করে  তীর চিহ্ন দিয়ে আঁকা পথ ধরে গেলেই হবে। পাথুরে রাস্তা ধরে আমরা শর্ট ট্রেকটাই নিলাম। তাতেও মিনিট চল্লিশের হাঁটা হবে টুকটুক করে। জমিতে মাঝে মাঝে হাওয়া মোরগের মত কি একটা লাগানো আছে, হাওয়া দিলেই ভারী মিষ্টি ঝিরঝিরে একটা শব্দ বয়ে যাচ্ছে।


মাঠে আলো দেবার ব্যবস্থা







মিষ্টি ভাসী হাওয়া ঘন্টি

যেতে যেতে একজন স্কুটার আরোহী চাষীর সাথে মোলাকাত হল। টোকাই, সারং আর মালপত্র নিয়ে সে ফিরছে এখন জমি থেকে।  দূরে একজন লোক সার ছড়াচ্ছে জমিতে। পেঁপে গাছ ছিল একটা রাস্তার পাশে, সেটা দেখে ভারী একটা আপনজন আপনজন ফিলিং হল।  কী অদ্ভুত না! জানিনা সবার হয় কিনা কিন্তু নিজের দেশে গাছ, ফুল দেখলে ভারী একটা আহ্লাদ হয় বিদেশে। আরো কয়েকধাপ নামতে পাহাড়ের কোলে একটা লোক ছাউনি বেঁধে বাজনা বাজাচ্ছে। জলতরঙ্গের মত,ঝিরঝিরে বাতাসের মত এদের বাজনার আওয়াজ। সে আওয়াজে মন্ব বেশ একটা প্রসন্ন,  হালকা স্ফূর্তির ভাব আসে। একথা শুনে মনে হতে পারে হুড়ুমদুড়ুম পাঞ্জাবী পার্টি সং বলছি হয়ত, তা না কিন্তু একেবারেই,ভারী মোলায়েম একটা ভাব। আমি বাজনা বাজাতে পারিনা, রাগ সঙ্গীত বুঝিনা বলে বোঝাতে পারলাম না সঠিক করে। সে যাই হোক, আরো খানিক এগোলে, খুঁটি বাঁধা ছোট্ট দু চারট্র দোকানে হরেক রকম চাল,  ডাব, চালের পাঁপড় এসব বিক্রী হচ্ছে। আমরা কিসের একটা পাঁপড় মত কী একটা কিনলাম যেন, মন্দ না, খুব আহামরি কিছুও না।
পাথুরে পথ এবার চড়াই, নালা দিয়ে জল আসছে বাঁ হাতে ডান হাতে জঙ্গল থেকে পাখির কিচমিচ ভেসে আসছে রাস্তায় আর কেউ নেই স্রেফ আমরা দুজন। দূর থেকে জাটিলুই এর হাওয়া ঘন্টির আওয়াজ আসছে টিংটিংটুংটাং করে, সব মিলিয়ে মনে একটা শান্ত দুপুর বুকের মধ্যে স্থায়ী আস্তানা গেড়ে নেয়।




বাজনদার





চাষীর সাথে আলাপ করছিলাম ফসল নিয়ে🤴 





ছাতা উঁকি মারছে...আমাদের আর রোমান্টিক ছবি হবে কী করে!



রেভোর সাথে ফের চলা শুরু। উলুন দানু বেরাতন লেক মন্দির যাব। এইটা একটা হেব্বি  লোকেশনে। পিছনে পাহাড়, সেই পাহাড়ে মেঘের দল হাওয়া খেতে বেরিয়েছে। পাহাড়টার পা ধুইয়ে দিচ্ছে লেকের জল আর  লেকের পাড়েই এই মন্দির। বেরাতন লেক খুবই গুরুত্বপূর্ণ  এদের, সেচ আর জল সাপ্লাইতে। তাই জন্যেই মনে হয় এই মন্দিরটায় ভীড় বেশী। প্রচুর লোক সাদা সারং আর কুর্তা পরে পুজো দিতে এসেছে ডালি নিয়ে। বুদ্ধ স্তুপের মতও আছে এক জায়গায়। মেইনলি এটা শিবের মন্দির।তবে এখানের কোনো মন্দিরেই মূল গৃহে প্রবেশে অনুমতি নেই পর্যটকদের জন্যে। সেটা স্রেফ "অফারিং টু গড" এর জন্যে।







ওয়ানাগিরি জায়গাটাও বড় সুন্দর, ওটা পার করেই যেতে হয় বন্যুমালা ওয়াটার ফলস। ফেরার সময় দাঁড়াবো একবার ওয়ানাগিরিতে আপাতত বন্যুমালাই হোক। বন্যুমালাতেও লোকজন বেশী যায় না। ওয়াটার ফলস মানে ভেবেছি, পাহাড়ের গোড়ায় গাড়ি নিয়ে গিয়ে থামাবে। তারপর দু কদম গেলেই পাবো, ওবাবা তা নয় মোটেও! যেখানে থামলো গাড়ি, তার থেকে বেশ খানিক উৎরাই ভেঙে পৌঁছনো গেল এক জায়গায় যেখানে লেখা "ওয়েলকাম টু বন্যুমালা",  পাশেই কাঠের ছোট্ট ঘরে টিকিট কাটছে দু চারজন। ঐ খান থেকে এইসান উঁচু উঁচু সিঁড়ি ( প্রায় কোমরসমান একেকটার সাইজ) ভেঙে নামতে লাগলাম। খানিক পর সিঁড়ি একেবারে খাড় নেমে গেছে, কিন্তু নেমে নেমে যাচ্ছে কোথায় রে বাবা। এই পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে আবার ওরে বাবা! সেও না হয় হল কিন্তু আর তো পথ নেই সামনে মনে হচ্ছে! দূরে কোথায় একটা জলের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে বিটে কিন্তু সামনের রাস্তাটা তো জলে ভেজা,  ফার্নে ঢাকা মনে হচ্ছে। এখানের পর রাস্তা কই?! থমকে দাঁড়াই এদিক ওদিক দেখি, আর তো কোনো রাস্তা দেখাও যাচ্ছে না! তাহলে? দোনোমনা করে এগিয়ে গেলাম। ময়ূরাক্ষীরই হঠাৎ চোখে পড়ল, 'আরে ওই দেখো,  ওইতো কোন থেকে ফের নেমে গেছে রাস্তা।' দূর থেকে আসা জলের আওয়াজ এর সাথে মিশে যাচ্ছে পাহাড়ের গা বেয়ে চুঁইয়ে পড়া টুপটুপ জলের শব্দ।ফার্ন, মস ঢেকে দিয়েছে পাথুরে দেওয়াল, রাস্তা ক্রমে আরোই পিচ্ছিল আর খাড়াই নামা। সমস্ত এলাকাটা সবুজে ঢাকা, জঙ্গল এর মধ্যে আসলে এই প্রপাতটা। বনের মধ্যে থেকে তীব্র শব্দ আয়াছে একটা পোকার ডাকের। এছাড়া আর কোনো শব্দ নেই সমস্ত চরাচরে। কিরম আচ্ছন্ন লাগছিল। অবশেষে পৌঁছনো গেল। এটাকে জলপ্রপাত বলাটা বাড়াবাড়ি, বড় ঝর্ণা বলা যেতে পারে। অনেকগুলো ধারা আছে অবশ্য। জলটা এসে একটা গোল মতো জায়গায় জমা হয়ে তারপর পাহাড়ি নালা হয়ে নেমে আছে। পুরো জায়গাটায় সেই পোকার আওয়াজটা ছাড়া আর কেউ নেই। ওই জলে অবগাহন করতে হয়। ডুব দিতে হয় এই পাহাড় জঙ্গলের মধ্যে। কতক্ষন পরে কে জানে আরো দুজন এলো। এর মধ্যেই বৃষ্টি শুরু হক টুপটুপ করে। ফেরার পথে আরো পিচ্ছিল হয়ে গেছে সব জায়গাটা। আরো নিস্তব্ধ যেন। আদিমকালের কোনো দুপুর যেন, জঙ্গল আর আকাশ ছাড়া যেখানে আর কোনো উপাচার নেই, প্রকৃতি নিজেই যেন ডুব দিয়েছে নিজেতে।


আমরা

ছবিতে আসলে বোঝাই যাচ্ছেনা কত সুন্দর ছিল জায়গাটা


রাস্তা

গাড়ির কাছে অব্দি আসার পথে দেখা হল এক চাষীর সাথে। সে একবিন্দুও ইংরেজি বোঝে না, তার জমিতে কী চাষ হয়েছে জিজ্ঞেস করলাম সে কী যেন বলল, দুজনেই হেসে চলে গেলাম যে যার রাস্তায়। এ মন্দ না তাই না? কেউই কিছু বুঝলাম না, অযথা কথাও হল না। ফেরার পথে ওয়ানাগিরিতে একবার থামা গেল। পাহাড় আর লেক মিলে এখান থেকে ভিউটা চমৎকার।  দোলনা, ইত্যাদি আছে ছবি তোলার জন্যে, কিন্তু হাইকিং করে জলে ভিজে আমাদের চেহারা বেশ খোলতাই হয়েছে তখন। খামোখা পয়সা দিয়ে অমন কাকতাড়ুয়া ছবি তোলানোর দরকার নেই।  বরং শান্ত হয়ে দু চোখ ভরে পুরো প্রেক্ষাপটটা দেখতে বেশী আনন্দ।  কানের মধ্যে বুকের মধ্যে তখনো আসলে বন্যুমালার শান্তিটা রয়ে গেছে বলেই হয়ত....
(ক্রমশ)

Monday, March 9, 2020

বালিতে কদিন (দুই)

আগের পর্ব

সীবীচ গুলোর নামগুলো সব অদ্ভুত -গুনুং পায়ুং, পাদাং পাদাং! নাম যাই হোক বীচগুলো খুবই সুন্দর। সুন্দর তকতকে,  নীল জল। আমরা খান চারেক বিচ দেখলাম তারমধ্যে মেলাস্টি আর ড্রিমল্যান্ড বিচ দুটো বেশী চমৎকার, বাকি দুটোও দিব্যি।  মেলাস্টি যাওয়ার মুখে একটা ক্লিফ আছে, দুই খানা পাহাড় যেন প্রতিবেশী। এই যে হরেক কিসিমের লোক যায়, ছবি তোলে দেখে মজা নেয় রাত ঘনিয়ে আসলে পরে  তাদের উদ্দ্যেশ্যে বলে নিজেদের মধ্যে"মানুষ গুলোর এই লঘুচিত্ততা কবে যাবে বলতো! একটা মুহূর্ত আটকে রেখে দেবে একটা  ছবির মধ্যে তাও কী হয়!" আমরা অবশ্য লঘুচালের লোক, তাই বিস্তর ছবি তুলে নিলাম। আজ আমাদের ড্রাইভার ছিল রেভো, সে নিজে থেকেই পোজ দাও পোজ দাও বলে ছবি তুলে দিলো অনেক কটাই।


এখানে আসার আগে একটু পড়াশোনা করেছিলাম। তাই কেচক ডান্স এর কথাটা মাথায় ছিল। এটা হয় উলুয়াটু (uluwatu) মন্দিরের ওপেন এয়ার অডিটোরিয়ামে,বিকেলে শুরু হবে ওটা। মন্দিরটা এগারোশ শতকে বানানো, একটা পাহাড়ের উপর। পাহাড়ের ঠিক নীচেই সমুদ্র এসে আছড়ে পড়ছে। ভয়ানক রোদ উপেক্ষা করেই পাহাড়ের গা ধরে পাথর দিয়ে তৈরী উঁচু নিচু রাস্তা ধরে চলছিলাম ও বাব্বা পাঁচ ছটা কচি আর গোদা হনুমান পাঁচিলে বসে খুব আড্ডা দিচ্ছে দেখি! আমাদের দেখে মুখ ভ্যাংচায়নি, কিন্তু গোদাটা কেমন সন্দজনক ভাবে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিল দেখে আমরা আবার রিরুট করে নিলাম। চড়া রোদ্দুর, ভেবেছিলাম গাছাপালার মধ্যে দিয়ে যাব,  নাহ বাবা থাক!




গুটিগুটি পায়ে ওপেন এয়ার অডিটোরিয়াম এর দিকে এগোতে দেখি এর মধ্যেই বিস্তর লোক জড়ো হয়ে গেছে। রেভো আমাদের টিকিট কেটে রেখেছিল, পাথরের সিঁড়ি বেয়ে উঁচু দেখে একটা জায়গায় বসে গেলাম। ব্যাকগ্রাউন্ডটা ঘ্যামা মাইরি, সূর্য অস্ত যাচ্ছে, সমুদ্রের বুকে, এগারোশ শতকের একটা পাথুরে মন্দিরে বসে, প্রায় একশো বছর আগের একটা নাচ দেখতে বসেছি! কেচক ডান্স কেন বলে তার কারনটা নাচ শুরু হতে বোঝা গেল, এখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার হয়না। একদল লোক এক নাগাড়ে গান,  তাল, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে গেল খালি গলায় আর সেজে গুজে রামায়নের তিনটে অংশ অভিনয় করে গেলেন আর কিছু কুশীলবরা। চ্ক্চ্ক্চ্ক্চ্ক্...এরম করে একটানা মন্ত্রের মতো বলেই যাচ্ছিল লোকগুলো , কেচক শুনতে লাগে একটানা শুনলে। সব মিলিয়ে ভারী অন্যরকম একটা দৃশ্যকল্প যেন।মারীচ ছদ্মবেশে রামকে বোকা বানালো, নকল আর্তনাদে সীতা চঞ্চল হয়ে লক্ষনকে বকে ধমকে পাঠালো, রাবন বুড়োর ছদ্মবেশে সীতাকে চুরী করলো, জটায়ু বাধা দিলো, তারপর রামের অনুনয়ে হনুমান লাফ দিয়ে সীতার কাছে অঙ্গুরীয় পৌঁছে লংকা কান্ড ঘটালো এসবই হলো ঐ লোকগুলোর চকচকচকচকচচক্াচক্া এরকম অদ্ভুত ধ্বনি আর মাঝে মাঝে কিছু অন্যরকম সুর গলায় তুলে। এদের দেশেও রাম দেখি বাঙালীর রামের মতোই পত্নীপ্রেমে কেঁদে ফেলা নরম সরম রাম। হনুমান এদের লেঙ্গুর এর মতো দেখতে। সীতাকে পাহারা দেওয়া রাক্ষসীরা নাচানাচি করে থাকে। সীতা হয়েছিল যে মেয়েটি তাকে ভারী চমৎকার দেখতে। সব শেষে হনুমান যখন নেচেকুঁদে মঞ্চ মাতাচ্ছে আগুন জ্বালিয়ে, সূর্য তখন লাল হয়ে ডুব দিচ্ছে ব্যাকগ্রাউন্ডে।




ফিরতি পথেও কানের মধ্যে যেন ওই চক্চক্চক্চক্চক্চক্ ধ্বনি হয়েই যেতে লাগল....






আমাদের হোটেলের রেস্তোরাঁটাও বেশ চমৎকার,  রাতের খানা ওই গোরেং চাম্পুরই নেওয়া গেল। কাল সকালে আবার সকাল সকাল ওঠা আছে। হানিমুনে এসে সকাল ছটায় বেরোয়! আমরা মনে হয় খুবই হাবা টাইপ, পইপই করে রেভোকে বললাম,  একটু পরে গেলেও তো হয়, নাহয় নটার বোট নেবো, আটটার না, আর যদি আটটার বোটও নিই তাহলেও সাতটায় বেরোলেই হবে তো! কিছুতেই মানলো না,  অনেক দরাদরাইর পর সাড়ে ছটায় রফা হল। 

আরিব্বাস এই সাত সকালেও ম্যালা লোক উঠে পড়েছে দেখছি! পরে বুঝেছি যদিও, আসলে রোদ চড়া হয়ে যায় কিনা, তাই সকাল সকাল বেরোলেই সুবিধে। আজ নুসা পেনিডা যাব।ওটা আরেকটা আইল্যান্ড, বোটে করে যেতে হবে। বোটের টিকিট কেটে রেভো আমাদের টাটা পরে আক্ষরিক অর্থেই জলে নামিয়ে দিল! জেটি নেই, জল ঠেলেই বোটে চড়তে হবে।  বাঁ পাশে মাউন্ট আগুং কে রেখে একটা ছিমছাম দ্বীপে আমাদের বোট ঠেকলো। এখানে অন্য এক ড্রাইভার আমাদের ঘোরাবে। সে ছেলেটি ইংরেজি প্রায় বোঝেই না। এদিকে আমার তো হাঁ করা স্বভাব। চারদিকে গাছপালা বাড়ি  মন্দির পাহাড় যাইই দেখি হাবলার মতো জিজ্ঞেস করতে থাকি এটা কি সেটা কি, সে তো কিছুই বোঝে না সম্পূর্ণ উল্টো কোনো জবাব দেয়!  খানিক বাদে রনে ভঙ্গ দিয়ে পৌঁছলাম  যে জায়গাটায় তার নাম এঞ্জেল বিলাবং। তার ঠিক পাশেই আছে ব্রোকেন বিচ। চড়চড়ে রোদ উপেক্ষা করেও হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হয়েছিল অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য পটের জন্যে। 


ঘন নীল জল আর ঝকঝকে নীল আকাশ তার সাথে একটাও নোংরা পড়ে না থাকা পাহাড়ের ধার। এসব জায়গায় হেব্বি হেব্বি হবি ওঠে, ক্যামেরার হাত বিশেষ ভালো না হলেও প্রকৃতিই পোজ দিয়ে ভালো ছবি আদায় করে নেয়। মানুষদের ছবিও ভালো ওঠে, তবে আমরা দুজনেই  খানিক হাবলা মত, আর আমরা অমন পিকচার পারফেক্টও না। তাই আমরা নিজেরা হেব্বি কেত মেরে যে সব ছবি তুললাম তা ওইসব জায়গায় লোকজন যা ছবি তোলে তার তুলনায় নেহাতই পরোটা কাবাব পাশে চারাপোনার ঝোল। তবে আমরা অত দুঃখ পাইনা, আমাদের ভোমলা ছবিতে দিব্যি আনন্দ হয়।  আর অমন চমৎকার জায়গায় গেলে অত পোজ দেবার থেকে হাঁ করে দেখতেই বেশী ভালো লাগে। ব্রোকেন বিচটা আরো ভালো, পাহাড়ের শিলা ক্ষয়ে ক্ষয়ে ন্যাচারাল ব্রিজ তৈরী করেছে আর জলটা নীচ দিয়ে এসে যে পাহাড়ের উপর আমরা দাঁড়িয়ে তারই গোড়ায় এসে আটকে গেছে। 





বোকার মত হাওয়াই চটি পরে বেরিয়েছিলাম আজ। জানা ছিলো না এখানে পাহাড়ি রাস্তা বাইতে হবে। ঘামে ভিজে হাওয়াই চটি  ফস ফস করে বেরিয়ে যাচ্ছে, ঘামে চুপচুপে হয়ে গেছে গেঞ্জি তাতেও উৎসাহ কম নেই আমাদের,paluang cliff থেকে একটা পাহাড় নামলেই  kelingking beach। ওই হড়কানো পা নিয়ে নীচে আর নআ সম্ভব হল না। আমরা উপর থেকেই উঁকিঝুঁকি মেরে দেখে নিলাম। উঁকিঝুকি না মেরেও উপায় নেই, এখানে প্রচুর লোক এসেছে, মূলতঃ চীন বা কোরিয়া (আমি ঠিক বুঝিনি),  তারা আবার বেশীরভাগ ইনস্টাগ্রামার। ফলে,  সে নানানরকম ভাবে পোজ দিয়ে, বেঁকেচুরে ছবি তুলিয়েই যাচ্ছে,  এমনকি একজন দেখি গাছের উপর উঠে ছবি তুলে দিচ্ছে!! এদের নমো করে ফেরার পথ ধরলাম। 


লাঞ্চে একটা লোকাল রেঁস্তোরায় গিয়ে ফের নাসি চাম্পুর আর মি গোরেং এর একটা অন্য ভার্শন খাওয়া গেল। মানে নামটা আলাদা ছিল, আমি ভুলে গেছি সে নাম।


ভরপেট খেয়ে কেউ সমুদ্রে নামে? নামে না তো? কিন্তু আমরা দুই হাবল, আমরা অত্যন্ত সুন্দর সি বিচ দেখেই ক্ষান্ত দিতে রাজি না, এমন চমৎকার জলে নাইবো না মনোভাব! আজ সুইমিং কস্টুম আনেনি ময়ূরাক্ষী, তাতেও আমরা দমিনি, বিচে পোশাক বিক্রী করছিল একজন, তার থেকেই কিনে চেঞ্জিং রুম ভাড়া করে, ক্যামেরা টাকার ব্যাগ, পাসপোর্ট সব ড্রাইভারের হাতে তুলে   জলে নেমেই....ঘপাৎ। মানে আর কিছুই না ঢেউ এর জোর খুবই, আর তলাতেও বালি না, মরা কোরাল। কী জানি কেমন করে সাহেবগুলো এমন আরাম করে ঢেউ এর তালে স্নান করতে পারছিল! আমরা মনের দুঃখে থেবড়ে বিচের গোড়ায় বসে বসে সে কথাই বলছি অমনি ফের একটা বদমাশ ঢেউ এসে বসা অবস্থাতেও ফেলে দিলো মাইরি!! ক্ষোভে দুঃখে হতাশায় আমরা তুরতুর করে ফের চানের ঘর ভাড়া করতে ছুট। তবে এখানে এ জিনিসটা ভালো, সীবিচ সংলগ্ন জায়গায় চেঞ্জিং রুম আর শাওয়ার রুম ভাড়া পাওয়া যায়। 

ফেরার পথে হঠাৎ করে ঝুম বৃষ্টি! বেশ তীব্র,  সরু পাহাড় ঘেরা রাস্তায় সে বৃষ্টি অদ্ভুত লাগছিল। ড্রাইভারের হাত বেশ ভালো হতে হবে এখানে গাড়ি চালাতে।একটা গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে। দু পাশে আমাদের দেশেরই গাছপালা বেশীরভাগ, কিন্তু বাড়ি গুলো সংলগ্ন মন্দির দেখলেই টের পাওয়া যায় দেশে নেই। এমন  মন্দিরের টেক্সচার আমাদের দেশে হয়না। 


আবার সমুদ্রের ধার আবার জল পেরিয়ে পাড়ে ওঠা। রেভো দাঁড়িয়ে ছিল, হাসিখুশি দিব্যি এই ছেলেটা। গাড়ি চালাতে চালাতে  মাঝে মাঝে ঘাড় নাড়ে।  জিম্বারনে সি বিচে বসে সূর্য ডোবা দেখতে দেখতে সু ফুড খাওয়া নাকি হেব্বি ব্যাপার না করলে চরম মিস! আমাদের ঘোরাটা আমরা ওই চরম মিস ব্যপারগুলো রাখতেই হবে এমন করে বানাইনি। তাই আমরা এমন সব জায়গায় গেছি যা ওই টিক মার্ক মার্কা গুলোর সব হয়তো নেই। জিম্বারনও ছিলো না, কিন্তু সূর্যাস্তের খানিক দেরী ছিল, হোটেলে ঢোকার থেকে সি বিচে যাওয়া বেশী ভালো,  রেভোও বলল চলো ভালো লাগবে তোমাদের। সুতরাং গেলাম সেখানে। এখানে পুরো বিচটাই কোনো না কোনো রেস্তোরাঁ নিয়ে রেখেছে, ফলে খাবার খেতে খেতে সূর্যাস্তটা অপশনাল না ম্যান্ডেটরি। জ্যান্ত কাঁকড়া,  বা বরফে শোওয়ানো মাছ যা খুশী চুজ করা যায় ওজন হিসেবে অথবা প্ল্যাটার নেওয়া যায়। আমরা দুজন মিলে অত খেতে পারব না ভেবে,  ওজন হিসেবে কিং প্রন, কাঁকড়া আর কিং ফিশ বেক করতে দিলাম। আস্তে আস্তে সমুদ্রের রঙ বদলাতে লাগলো, আকাশে মেঘ আছে তাও তার ফাঁক দিয়ে দিয়ে হরেকরকম রঙ চুবিয়ে দিতে লাগলো। ক্রমে অন্ধকার ঘনিয়ে এলো, ওরা মোম জ্বালিয়ে গেল টেবিলে টেবিলে। একদল লোক এসে ভায়োলিন বাজিয়ে শোনাতে লাগলো...খারাপ লাগছিলনা কিন্তু তাও আমরা এক পা দু পা এগিয়ে আলো,  গান থেকে খানিক সরে ঢেউএর কাছে গেলাম। ঢেউএর গর্জনে অন্ধকারে বালির আরেকটা দিন মিশে গেল।(ক্রমশ)




Tuesday, February 25, 2020

বালিতে কদিন ( এক)

এটাও একটা বেড়ানোরই গল্প, তবে সব বেড়ানোর গল্পেরই একটা পূর্বকথন থাকে। তা আমার এবারের গল্পটার পূর্বকথন বেশ খানিকটা লম্বা। এ ব্লগের পাঠক কেউ আছে কিনা জানিনা। যদিও থাকে, সে এই বেড়ানোর গল্পের পূর্বকথন স্কিপ করে যেতে পারেন। ঘটনার ঘনঘটায়, বেড়ানো পর্বে আসতে সময় লাগবে খানিক।

সে ম্যালা দিন আগের কথা। আপিস করে, গরম কালে আম-টাম খেয়ে, শীতে কলাইশুঁটির কচুরি খেয়ে ফেসবুকের মন্ডপে রাজা উজির মারিনা, ফুক্কুড়ি করে আড্ডা মেরে  বেড়াই। সুযোগ পেলেই ধাঁ করে চলে যাই আজ ভেড়ির ধারে তো কাল পাহাড়ে। ফেসবুকে ছদ্মবেশে ফুক্কুড়ি করতাম বলেই সচরাচর দেখা সাক্ষাৎ করতে চাইতাম না কারোর সাথেই। ছদ্মবেশ শুরু করেছিলাম টংলিং এর গল্পের মতো পালাতে গিয়ে, কল্পানার বিশেকে নিয়ে , তারপর দেখলাম , ছদ্মবেশে থাকার সুবিধে হল , চেনা মানুষজনের কী কেন না ভেবেই নিজের মনে যা খুশী লেখা যায় । তো এই জন্যেই ওই আড়ালে থাকতে থাকতেই বন্ধু বানানো । ফেসবুক এর অন্ত্রাল আমায় প্রচুর কিছু দিয়েছে , আর সে সূত্রেই এ পোস্টের অবতারনা। এমনিতেও সামনাসামনি কথা বলার থেকে মেসেজে কথা বলতে আমি স্বস্তি বোধ করি অনেক বেশী, ফলে ফেসবুকে আড্ডায় আমি স্বস্তিও পাই বেশী। তো এরকমই কোনো এক বেয়াক্কেলে বারবেলায় একজনকে হঠাৎ প্রস্তাব দিই, "দেখা করবে?" আড্ডা তার আগে অনেকদিন ধরেই হয়, সে আমার বহু লোকের সাথেই হয়, কিন্তু আমার মতন এমন কন্দরবাসী লোকের মুখে এ হেন প্রস্তাব শুনে সে ঘাবড়েছিল বিস্তর (আমি সচরাচর দেখা করা এড়িয়ে যাই, সামনে আসতে ডরাই)। সেদিন প্রথম সাক্ষাতে মেলা আড্ডা হয়েছিল , যা আমার মত আন্সমার্ট লোকের জন্যে অবাক কান্ড বটে। আড্ডার মধ্যে এটুকু মনে আছ সেদিন একটা প্রপার বিয়ের কিরকম মেনু হতে পারে সে নিয়েই আলোচনা কফির কাপে,  আলো আঁধারি গলিতে, দমকা হাসির পাল্লায় পড়ে জমে গেছিল। প্রেম বিয়ে এসবের ইচ্ছে একেবারেই ছিল না।  তবু ওই আর কি, মোহন সিরিজের মতই কোথা হইতে কী হইয়া গেল, সেদিনের সেই মেনু নিজেদের কাজে লেগে গেল।

এবার অত খেলে ঘুরতে তো যেতেই হয়, হজম করার জন্যেই। সুতরাং আমরা একটা বেড়াবার জায়গা খোঁজার জন্যে দুনিয়া তোলপাড় করে ফেললাম প্রায়। আসলে পৃথিবীতে এত কিছু দেখার আছে আর আমরা এত কম দেখেছি তাই আমাদেএ হাল হল প্রায় কাঙালের শাকের ক্ষেত দেখার। দুজনেরই প্রথম পছন্দ পাহাড়, কিন্তু দেখা গেল কাশ্মীরে যাওয়া যাবে না," একরাশ বিপদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কানাকানি" করা যাবে না বসন্ত৷ এসে গেছে বলে। অরুনাচল যাওয়া যায় কিন্তু প্রচুর ধকলের রাস্তা। হিমাচল যাওয়াই হয়নি কখনো, কিন্তু ময়ূরাক্ষীর (ইয়ে মানে ওই নদীর ঘাটেই নৌকা বাঁধা হল আর কি) আবার দুবার ক্যানসেল করা হয়েছিল হিমাচলের টিকিট তাই ওর খুঁতখুঁত। ওদিকে আন্দামান, কেরালা ঘোরা আমার।দেশের বাইরে থাবা বাড়াতে গিয়ে আমাদের ঘোরা গ্রীস, ইওরোপ, কম্বোডিয়া সব ঘোরা হয়ে থিতু হওয়া গেলো বালিতে। সমুদ্র আছে, ছোট খাটো পাহাড় আছে,জঙ্গল আছে আর আছে সপ্তম অষ্টম থেকে পঞ্চদশ  শতক এর মন্দির। অনেকে বেড়ায় হোটেলের ঘরে, পুলে রিল্যাক্স করে, আমার বেড়ানোয় হোটেলে কম থাকার ভাগ থাকে। কেমন যেন মনে হয় দু চোখ ভরে যতটা পারি দেখে নিই, রঙ রূপ গন্ধ, আর আরামের জন্যে আমার কোলকাতার ঘরটাই আছে তো। তবে এ আমার ব্যক্তিগত ভাবনা, সবার ঘোরার ভঙ্গী এক হবে না স্বাভাবিক তাইজন্যেই ঘোরাঘুরি করার পার্টনার বা দল উমদা হওয়া খুবই দরকার। মানে হাতির পার্টনার পাখি হলেই চিত্তির। তো সৌভাগ্যক্রমে আমার ঘুরতে যাওয়ার পার্টনারটি আমার মতোই হয়েছে। তাই টিপিক্যাল বিবাহপরবর্তী ভ্রমন আমাদের ছিল না এটা। আট রাত নদিনের এই ট্রিপটায় আমরা বালি লম্বক ভালোই ছানবিন করেছি।

বালি জায়গাটা চুজ করার আরেকটা মারাত্মক কারন বলাই হয়নি, এর থেকে বেশী রেস্তোঁ ছিল না, মানে ক্রাঞ্চ না করে ঘোরার আর কি। আর দেশে ঘুরলে ওই লেভেলের স্বাধীনতা মিলত না। মানে যে স্বাধীনতায় প্রত্যেকে বয়স্ক মানুষের মতই আচরন করবে অবোধ শিশুর মতো অযথা কৌতূহল বা রাস্তায় নোংরা ফেলে নিজেকে পরিচ্ছন্ন ভাবার মত পাগলামো করবেনা আর কি। তো যাই হোক, বালি যাবার একখানা দামী অর্থাৎ সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস আর একখানা কমদামী অর্থাৎ এয়ার এশিয়া উপায় আছে। এয়ার এশিয়া খুবই ইয়ে, ফ্লাইটে জল অব্দি দেয়না ফ্রিতে কিন্তু তাও এয়ার এশিয়াতেই যেতে হয়, কারন দুটো এয়ারলাইনসের দামের তফাৎ বিস্তর৷ সমস্যা আমাদের জলে তত হয়নি যতটা হয়েছিল মার্কেটে করোনা ভাইরাস নিয়ে একটা ভয় চালিত হওয়ায়। বিয়ের ঝামেলা মিটিয়ে মাস্ক কেনা আমাদের হয়ে ওঠেনি, এদিকে হোটেল ফ্লাইট সমস্ত বুক সেই কবে থেকে, করোনা ভাইরাসের কারনে ক্যান্সেল তো করা সম্ভবই না তাহলে শোকেই মরে যাব। যা হবে দেখা যাবে ভঙ্গীতে বসা গেলো ফ্লাইটে, কুয়ালালামপুর এর হল্টে নাক চোখ চ্যাপ্টা দেখলেই সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে খেয়াল করলাম, ঠক বাছতে গাঁ উজার হয়ে যাবে,  সুতরাং 'সমুদ্রে পেতেছি শয্যা শিশিরে কী ভয়!' ভঙ্গীতে চোখ বোজানো গেল যতক্ষন না বালিতে নামার ঘোষনা করলেন পাইলটবাবু। ঘুম ভেঙে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি ঘন নীল জল বেষ্টন করে একটা ছোট্ট সবুজ ভুখন্ড উঁকি মারছে।



বালি এই সময় বৃষ্টি বাদলার জায়গা। মানে আমাদের ভাদ্র মাসের মতো, খানিক বৃষ্টি বা মেঘ বা চড়া রোদ্দুর সাথে দরদরে ঘাম। সারা রাতের প্রায় নির্ঘুম যাত্রার পর হোটেলে গেলে আর বেরোতে ইচ্ছে করবেনা তাছাড়া গাড়িতে উঠে খানিক পকেট ঝেড়ে ঝুড়ে পাওয়া কেক খেয়ে আর নতুন দেশ দেখতে দেখতে অত টায়ার্ডও লাগছিল না। আমাদের ড্রাইভার সূর্য ভারী হাসিখুশী মানুষ , আমাদের জন্যে প্রচুর সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে এয়ারপোর্টে তাও বিরক্তি দেখলাম না। এটা অবশ্য পরে আরোই দেখেছি , এখানের অধিবাসীরা মূলতঃ সোজা সরল আর হাসিখুশী , ঠক জোচ্চোর কি নেই, তাও আছে সে পাল্লায়তেও পড়েছি তাও বল্ব মূল সুরটা এখানে সহজ। এই যেমন ডেনপাশর , কুটা , সেমিনিয়াক এসবই শহর অঞ্চল , কিন্তু সরু রাস্তাতেও কেউ হর্ণ দিচ্ছে না , কেউ বাইক রেখে রাস্তা ব্লক করেনি , দুটো বাড়ির মাঝে ফাঁকা জায়গা হলে সেখানে ধান রুইয়েছে, উন্নয়নের জন্যে গাছ কেটে দেয়নি। লম্বা ইমিগ্রেশন আমাদের যা কাহিল করেছিল, মেঘলা আকাশ,এক পশলা বৃষ্টি আর সবুজ ঝকঝকে পরিষ্কার বালি আমাদের ফের চাঙ্গা করে নিয়ে গেল পাহাড় ঘেরা সমুদ্রের মাঝের মন্দির তানহা লটে। এই মন্দিরটা আসলে বরুনদেবের মন্দির,পঞ্চদশ শতকে শেষ হয়েছিল এ মন্দিরের কাজ। একটা ন্যাচারাল আর্চ এর উপর একটা মন্দির আর একটা মন্দির সমুদ্রের মধ্যে একটা শিলাখন্ডের উপর। বালিনিজদের কাছে ভারী পবিত্র এই মন্দির তাই পুজো-আচ্চা চলে এখনো। রাস্তায় আসতে আসতেই শুনেছি, আমাদের ড্রাইভার সুর্যর থেকে, বালিতে আশী ভাগ হিন্দু যদিও ইন্দোনেশিয়ায় মুসলমান সংখ্যাগুরু। জানি এসব তথ্য গুগল ঘাঁটলেই মেলে তাও আমি সব জিনিস গুগল থেকে জানার থেকে এখনো মানুষের মুখ থেকে কিছু জিনিস জানতে ভালোবাসি।  একটা গুহামত জায়গায় কিছু পুরোহিত গোছের লোক নির্দেশ দিচ্ছে দেখি কী সব। কাছে গিয়ে উঁকি মারতেই একটা ছোট্ট গুহাগাত্রের ঝোরা থেকে মুখ ধুতে ইশারা করল দেখি, একিরে বাবা, আমাদের দেশের মন্দিরের মত নাকি? পয়সা নেবার বাহানা জোর করে? তা আমাদের কানে চাঁপাফুল আর ভেজা চাল দিয়ে কপালে টিপ পরুয়ে দেওয়ার পর দেখি ডোনেশন বক্স, জোর জুলুম নাই।












আস্তে আস্তে সমুদ্রের জল বাড়তে লাগলো মন্দিরে যাওয়ার রাস্তায় জলের অংশ বাড়তে লাগলো সাথে সাথে। ঢেউ এর ঝাপ্টা উপেক্ষা করে লোকজন দিব্যি ছবি তুলে বেড়াচ্ছে, কটা বাচ্ছা দেখি জলের মধ্যে দিব্যি হুড়ুমদুড়ুম করছে।  মন্দিরের পাশের ক্লিফটায় কিছু দোকানপাট, মাথা খোলা রেস্তোরাঁ।  এক কাপ কফি বা চা এর জন্যে মনটা বেশ আনচান করছিল, এখান থেকে সুর্যাস্তটা বেশ চমৎকার দেখাবে। ও বাবা কি জায়গা রে বাবা! দাম দস্তুর হচ্ছে রেস্তোরাঁয়!  যেই নিজেদের মধ্যে বলেছি," এই ওই দোকানটায় তো পনেরো হাজার ডাবের দাম বলছিল" অমনি দোকানদার তরুণী হেসে বলে আমিও তাইতেই দেব।  ও ভালো কথা,  ওখানে টাকা বদলে রাশী রাশী টাকা পাওয়া যায়, যদিও তার মানেই সব খুব সস্তা তা না, একটা ডাব পঁচানব্বই থেকে একশো ষাট টাকা অব্দি হতে পারে আমাদের হিসেবে। যাকগে হিসেব থাক এখন, যতই হোক এমন সুন্দরী দয়ালু মহিলা উপেক্ষা করা যায়, তাই ওইখানেই বসা গেল। মস্ত বড় ডাব,  আর কফি অর্ডার করে দেখি মেঘের ফাঁকে সুর্য কেমন ডুব দেবার তাল করেছে আজকের মত আপিস থেকে। ট্রপিকাল দেশ বলেই হয়ত বা সমুদ্রের ধারে বলে, জানিনা, ভাত এদের প্রধান খাবার। ভাত বা নুডলস, নাসি গোরেং হল মিক্সড ফ্রায়েড রাইস আর মি গোরেং হল মিক্সড নুডলস,  সাথে থাকবে দুটো ছোট্ট কাঠিতে গোঁজা মিষ্টি সস মাখানো চিকেন, একটা পোচ, কিছু পাঁপড় আর শশা, টমেটো। এবার অঞ্চল বা দোকান ভেদে একটু তফাৎ হয়, মানে মি গোরেং এ  বেশীরভাগ জায়গায় পোচের বদলে ডিমটা ভেজে ভেজে উপরে দেবে ছড়িয়ে, এইসব আর কি। শেষ বিকেলের আলো মেখে সমুদ্রে ধারে পাহাড়ের উপর বসে আরাম করে খাওয়ার এই মুহূর্তটা বহুদিন মনের মধ্যে থাকবে , সূর্য ওঠা আর ডুবে যাওয়া কতবার দেখলাম তবু প্রতিবারেই এমন ভালো লাগে বলেই বোধহয় জীবন এত সুন্দর। (ক্রমশ)


Sunday, January 19, 2020

ফির লে আয়া দিল...মজবুর কেয়া কিজে

"ফির লে আয়া দিল, মজবুর কেয়া কিজে....রাস না আয়া রেহনা দূর কেয়া কিজে..."

এই লাইনটাই মনে হয় ঠিক আমার গ্রামের বাড়িতে   যাবার রাস্তায় পড়লে, যখন থেকে হাওয়ার গন্ধ বদলে যায়, জমির আল ধরে হাঁটা হয়, অন্যরকম একটা হাওয়া এসে বয়ে যায়। খুব বেশী আবেগ বোধহয় নেই আমার, আমার সারাদিন কাজের ফাঁকে মনে পড়ে গ্রামের বাড়ির কথা, এমনও না, কিন্তু এলেই ভারী একটা অন্যরকম হয়। সে আমি ঠিক বোঝাতে পারবো না কেমন। 

"আরে পাইলট, কখন এলি?" "কেমন আছিস"?  "আজ থাকবি তো"? এসব কথা খুব বেশী শোনা হয় না বলেই হয়ত। আমাদের বাড়িতে বিস্তর লোক থাকতো এক সময়, জেলেদের হাঁড়ির মত হাঁড়িতে ভাত বসাতে হত, এখন সেই বাড়িতে জনা পাঁচেক লোক থাকে। শীত প্রায় চলেই গেছে, জল মিষ্টি মুখে দিয়ে পাঞ্জাবীর হাতা গুটিয়ে মাঠে। চড়া রোদের মধ্যেই পিঠে মেশিন নিয়ে একজন আলুতে ওষুধ দিচ্ছে। জানুয়ারি মানে বাংলায় মাঘ মাস, এখনই হাওয়ার ধরনটা দেখো! যেন বসন্ত আর অপেক্ষা করতে নারাজ! আরে ওইটা কি হুশ করে চলে গেল? ভাম না খাটাশ? মোটা মত লেজ, কুকুরের মত দেখতে। মাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে। 

একগাদা ছাতারে পাখি ছ্যা ছ্যা করে উড়ে গেল, ঠিকই তো, এমন জায়গায় এসে ফোন দেখা মোটেও কাজের কথা না। আচ্ছা ওই হলুদ পাখিটা কি ফেলাকাকা? "কোকিল মনে হচ্ছে, পাতকো কোকিল"।  অ্যাঁ কোকিল! হলুদ রঙের! ধুস নির্ঘাত  অন্য কোনো পাখি। এহ না মানুষের বইটা না পড়ে ফেলে রাখা খুবই খারাপ করেছি। দূর থেকে ভুটভুট করে পাম্পের শব্দ আসছে, জমিতে জল সেঁচা হচ্ছে। আমাদের এবারে সর্ষে বোনেনি? হয়ত  অন্য কোনো মাঠে হয়েছে।

 জুতো খুলে মাঠে নামি, কাদা মেখে এগোই,আমগাছটার কাছে যাব, সেই গরমে আমায় আম দিয়েছিল, তারপর থেকে কাছে এসে কথা তো দূর মিনিমাম থ্যাঙ্কিউটাও দিইনি। 

থ্যাংক ইউ হে, মনে আছে আমায়? সেইই যে  সেইই বছর আমায় আম দিলে, কচি আমডালটা কই? দু বছরে এত বড় হয়ে গেছে? দুই না তিন? কথা বলবে না নাকি হে? আমি তো সব জায়গার সব গাছকে বলেছিলাম তোমায় জানাতে, আমি কী করব বলো, বন্যা হল একবার, একবার তো আমি এলামই না। না না অজুহাত হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা শোনো তবে,  আমি সত্যিইই চেয়েছিলাম, তবু আসিনি, আসা হয়নি। মানুষদের নানান রকম থাকে জানোই তো, সব চাওয়া পাওয়া মেলে না যে।  হয়ত আমার আরো বেশী করে চাওয়া উচিত ছিল, যাতে দেখা করতে আসা যায়।

ছাতারে গুলো চুপ করে গেছে। র‍্যাট্যাট্যাট করে করে একটা কাঠবিড়ালী ডাকছে খালি। আমগাছেরা গম্ভীর হয়, আরো মন দিয়ে বলতে হবে। একটা পাতা ছুঁয়ে চোখ বুজে বললাম, থ্যাংক ইউ,  সত্যি সত্যি।  তারপরেই সেই হাওয়াটা আবার দিলো, যে হাওয়াটায় মাথার চুল এলোমেলো হয়, বুকের ভার নেমে যায়, চোখ বোজা যায় আরামে।

" তুমি আমাদের ঘর বানিয়ে দেবে? "

কচি গলায় ডাক শুনে চমক ভাঙে।  দু তিনটে বাচ্ছা মেয়ে। রঙীন ফুলের মত। 

কীরে? তোরা কী করছিস এখানে?

"দেখোনা, আমাদের ঘর তৈরী করছি আর ভেঙে যাচ্ছে খালি।" 

তারপর দেখা যায়, সমস্ত কিছু ছড়িয়ে ফেলা, ভেঙে ফেলা অগোছালো একটা লোক কঞ্চি বাঁধা গাছের গায়ে লাল নীল ওড়না, চটের বস্তা এসব চাপিয়ে ঘর বেঁধে দিচ্ছে তাদের। ঘরের ব্যবস্থা হতেই রান্না বসাতে ব্যস্ত হয়ে গেল।নেমতন্নও ছিল বইকি। কিন্তু ওই আর কি, মহারাজের এসব সয় না যে। পা চালাই ফের। একটা বুড়ি একগাদা কাঠকুটো নিয়ে নড়বড় করে চলেছে। এক বার নামিয়ে ফের নতুন বোঝা নিতে এলো। সাদা শাড়ি কোনোমতে প্যাঁচানো গায়ে। এই বয়সেও এত বোঝা বইতে হয়? মলি পাগলি নিশ্চিন্তে গাছের নীচে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। পাগলদের আর নির্বান পাওয়া লোকেদের তফাৎ কিছু নাই মনে হয়। 

বাড়ির ছাদে এলেই পুরোনো শীতের কথা মনে আসে হুড়মুড় করে। লেপ রোদে দেওয়া দুপুর, কমলালেবুর দুপুর, দিদিদের কয়েতবেল মাখা দুপুর, নীচে বালির পাহাড় করা থাকতো সে সময়, ঘর বানাবার কী একটা প্ল্যান হয়েছিল।আচ্ছা আমি বরাবরই ভীতু মনে হয়, কই কখনো তো ছাদ থেকে বালিতে লাফ মারিনি। কী হত এমন হাত পা ভাঙতো হয়ত।যাকগে,  নস্টালজিয়ায় বাঁচতে আমি তেমন ভালোবাসিনা।যা গেছে তা যাক। বরং আলসেতে ঠেস দিয়ে দেখি   ধলিগাইটা একলা দাঁড়িয়ে জাবর কাটছে, ওই দিকে নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে তালফোঁপরার ঢিপি।মেজদাদাকে বললে ছাড়িয়ে দেবে। বলব না যদিও। কিন্তু এই যে চাইলেই পাবো এই নিশ্চিন্ততাটা বড় জরুরি জীবনে।



খাবার ডাক পড়ে। সাজিয়ে গুছিয়ে বড় যত্ন করে খেতে দেয় দুই জ্যেঠিমা মিলে। ঘরের তৈরী গাওয়া ঘি থেকে ঘরের বানানো আমসত্ত্ব, বড় ভালোবাসা জড়িয়ে থাকে সবেতে। একবার এক বন্ধু বলছিল, পরের জন্মে, সে কিছুতেই মানুষ হতে চায় না। কেন যে এ বারেই হয়েছে সে জানেনা কিন্তু যদি হবার চয়েসেই দেওয়া হয়, সে মানুষ হবেনা। আমি বলেছিলাম, আমারও মনে হয় আগের জন্মে নির্ঘাত কোনো বদ কুত্তা ছিলাম আমি। মানে এত বিস্কুট খেতে ভালোবাসি দেখেই মনে হয়। হয়ত কোনো এক বেখেয়ালে ভুল করে বলে ফেলেছিলাম, "শালা মানুষে এত বিস্কুট খেতে পায় পরের জন্মে মানুষ হলে ভালো হয়"।তারপরেই এই দুর্দশা, মানুষ হবার এত হ্যাপা সইতে হচ্ছে!
কিন্তু এই যে এত মানুষের এত অকারণ  ভালোবাসা আমি পাই, শুধু মানুষ কেন গাছেদেরও পেয়েছি,কেউ না জানুক আমি জানি সে কথা....এত মায়া এত ছায়া এসব বড়ই মহার্ঘ্য জিনিস। হ্যাঁ সফল সুদর্শন ঝকঝকে পুরুষ আমি নই কিন্তু আমার পাওয়ার ঝোলাটাও কম না...প্রতিদিনের খারাপের মধ্যে যে ভালোটুকু, সে দিয়ে কুড়িয়ে বাড়িয়ে বলে ফেলাই যায় হয়ত, পরের বারেও মানুষ হলে এত ভালোবাসা পাবার ঝোলা নিয়েই মানুষ হলে মন্দ হয়না।


Sunday, January 12, 2020

ঘুরপাক

এমন শীতকালের দুপুরে বাড়ি থাকা উচিত না মোটেও, কতদিন হয়ে গেল স্রেফ বেরোতে চাই বলেই বেরোনো হয় না। কাল পূর্ণিমা ছিল, অফিসের আমাদের টিমের ছেলেপুলেরা মিলে মোচ্ছবের জন্যে জড়ো হয়েছিলাম মধ্যমগ্রামে একজনের ফ্ল্যাটে। যাবার পথেই চাঁদটা দেখেছি, গোল্লা মার্কা, ডানদিক দিয়ে সাথে সাথে যেতে যেতে সামনে এসে বাঁ দিক নিল। চারদিক এত আলো তার থাকা না থাকায় তেমন কিছু প্রভেদ হয়না। এমন করে করে পূর্ণিমা চলে যাবে আমি বুড়ো হয়ে যাব কিন্তু আমার আর একটা আদিগন্ত মাঠে সভ্যতার আলোহীন জায়গায় চাঁদের আলো মাখা হবে না। সে যেন একজন্ম আগের কথা,  পূর্ণিমার রাতে পাহাড়ে চড়া, হরিণ দেখা। এই হুল্লোড়ে মেতে যেতেও খারাপ লাগবে না জানি কারন বিশে আছে। টংলিং এর বিশে না, এ রক্তমাংসের মানুষ, প্রচন্ড স্মার্ট, প্রচন্ড শার্প, যে কোনো আসর জমাতে ওস্তাদ। মুখচোরা, আনস্মার্ট আমি এই ধরনের লোক ওয়ালা জমায়েতে খুশী, আমার দিকে ফোকাস থাকবে না, সাক্সেস্ফুল পার্টির জন্যে আমার চিন্তা থাকবেনা। বিশে তো ওর আসল নাম না, ছোটমোট করে বলছি। যার ফ্ল্যাটে গেছি তার বারান্দায় একটা নারকেল গাছ লুটিয়ে এসে পড়ে, চাঁদের আলো অবশ্য আসার সুযোগ পায় না, এপার্টমেন্ট কম্পলেক্স এটা,  একগাদা আলো জ্বেলে রাখা আছে। হুল্লোড়ের কমতি ছিল না কিছু, ছেলেগুলো পার্ক স্ট্রীট ঘুরে দর করে হুকো অব্দি এনেছে। 

মাঝরাতের পর যখন আসর শেষের দিক, গ্লেনলিভেটের বোতলখানা নিঃশেষ হয়ে কোনের দিকে লুকিয়ে গেছে, ছাদে যাই চুপিচুপি একাই। হ্যাঁ এইবার বেশ চাঁদ দেখা যায় বটে। আহা চারদিক চুপচাপ তারমধ্যে চাঁদের আলোয় বিরাট একটা ছাদ....আরেকটু চারদিকের অকারণ বিজলিবাতি নিভে গেলেই পরীরা নামত। নেহাত পরী দেখতে নেই মানুষের, আমি নেমে আসি। আহা বড় ভালো একটা দিন গেলো....সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে গুনগুন করছিলাম, কিচ্ছু চাইনি আমি আজীবন ভালোবাসা ছাড়া।হঠাৎ নিজের মনেই হেসে ফেলি, এ গানের লাইনের সাথে আমার মোটেই মেলেনা। নিজের কাছে সত্যি লুকিয়ে লাভ নেই, আজীবন আমি অনেক কিছু চেয়েছি, চাই....ভালোবাসা অবশ্যই চাই, তবে একরকম ভালোবাসাই খালি তা না। এ ছাড়া ভালো থাকা, ভালো ঘোরা,  মেলা জিনিস....সেদিন এক দাদা বিশেকে বলছিল, "কেন দেশ ছাড়ছিস বেকার, যতই পয়সা হোক সেই তো মনে হবে কম পড়ছে, আরেকটু হলে ভালো হত। তার চেয়ে এখানে বন্ধু বান্ধব পোষ্য গাঁজা নিয়ে ভালোই তো আছিস।" গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে দেশ, বিদেশ....কেউ কেউ না ছুটে পারে না। 

সকালে ঘুম ভাঙা চোখেই মনে হয় পালাতে হবে।মদের গ্লাস, হুঁকো পেরিয়ে.... অনেকদিন শীতের রোদে চুল শুকোনো বুড়ি, ব্যা ব্যা করে ডেকে চলা ছাগলছানা, নদীর ধারে নৌকা সারানো, দেখতে দেখতে পথ চলা হয়নি.....

***************************************

কিছু পেতে ইচ্ছে হলে তার জন্যে এফোর্ট দিতে হয়, না ভুল বললাম, বিনা প্রচেষ্টায় পাওয়া যায়না তা না,  বাপ ঠাকুর্দার উত্তরাধিকার মেলে, সেটা এনক্যাশ করাই যায়। তবে নিজের কিছু ইচ্ছে,শখ লক্ষ্য থাকলে তা বিনা আয়াসে মেলেনা। বেরিয়ে পড়া হচ্ছেনা বলে কাল কাটিয়ে আপশোষ করা আমার সয়না। তাছাড়া আমি ভালো করে দম নিতেও পারছিলাম না যেন, শীতকালটা নিষ্ফলা কেটে যাবে? জমিতে নেমে মাঠের ঘ্রাণ নেব না কিংবা দুম করে বেরিয়ে সারাদিন যথেচ্ছ ভাবে চা, কাঠিভাজা কিংবা রাস্তায় বানানো গজা খেয়ে জিনসের পকেটে হাত মুছে হুট করে উড়ে যাওয়া কোনো পাখি দেখে দাঁড়িয়ে যাব না তাও কি হয়! সুতরাং সপ্তাহান্তের একগাদা কাজ ফের পেন্ডিং করে দিয়ে বেরিয়ে পড়তেই হল। কোথায় যাব জানিনা, বেলাও হয়েছে মেলা, তবে আমার একটা কম্ফোর্ট রাস্তা আছে, দুপাশে ভেড়ি, গাছপালা মফস্বলি বাজার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার স্পেশাল একটা ডায়লেক্ট সমৃদ্ধ সে জোন। বাসন্তী হাইওয়ে।

 কোথাও পৌঁছতেই হবে এমন চিন্তা নিয়ে বেরোইনি বলেই হুট করে একটা রাস্তা দেখে মনে হল, এটা কোথায় যায়? গিয়েই দেখা যাক। আরিব্বাস রে, এত কাছে এমন একটা জায়গা আছে? খালের পাশ দিয়ে সার সার নারকেল গাছ, এদিকে পিকনিক স্পট ভাড়া হয় মনে হয়, রাস্তাটা ঢালাই রাস্তা। একটা বেঁটে মত গাছে একটা ফিঙে বসে দোল খাচ্ছে। দেখেই হাত কামড়াতে ইচ্ছে হল, এহ ক্যামেরাটা নিয়ে বেরোলামনা কেন! ধুর ধুর এইসব হিসেব করে বেরোনো কি আর আমার হয়! আমার গন্তব্য মাঝরাস্তায় ঠিক হবে, গাড়ির জ্বালানী যে ভরতে হবে হঠাৎ খেয়াল হবে, ক্যামেরার বদলে চোখ আর মোবাইল ভরসা হবে, এ এতই স্বাভাবিক নিজেকে আর গালমন্দ করিনা। বেকার করেই বা কী হবে! এ বয়সে কি আর শোধরাবার, তার চেয়ে যা আছে তাই নিয়েই ঘর করে নিই। ভারী নিরবিলি এলাকাটা, পিকনিক এবং তজ্জন্যে নিয়োজিত উব উব উব সিজন কেটে গেলে একদিন আসতে হবে আবার। গরমকালে এত বক দেখতে পাবো না হয়ত কিন্তু বটের হাওয়া তখনও থাকবে। আরে তাই তো, বট গাছ কতদিন পর দেখলাম! ভাবো!  বট, অশ্বত্থ, পিপুল আমাদের দেশী গাছ অব্দি আর দেখতে পাইনা সহজে হ্যাঁ, খালি শিকড়হীন ছায়াহীন সব গাছ।ফিঙে দোয়েল, বক দেখতেও কি আর পাই সহজে! তিনটে গোলাপি মতন ছানা শূয়োর গুটগুট করে ভেড়ীর বাঁধ ধরে চলেছে। একটা পিকনিক পার্টির পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখি ফিশ ফিঙ্গার নামিয়েছে, একগাদা লোভ দিয়ে গেলাম মাইরি। একাবোকা অতিথি মানুষকে চাট্টি ফিশ ফিঙ্গার দিয়ে আপ্যায়ন করা সেই সংস্কৃতি আজকালকার ছেলে ছোকরারা আর মানছে না দেখছি। ভাবলাম এট্টু সেসব সোনালীদিন মনে করিয়ে দিই, থাক বাবা চেলা কাঠ নিয়ে তাড়া করলেই চিত্তির হবে। 


চা না,  একটা ফিশ ফিঙ্গার না, যা যা তোদের রাজহাঁসে তাড়া করবে হুহ্। চলেই যাব যা। রাস্তায় একটা কালীমন্দির পড়েছিল, মনের দুঃখে ভিতরে নজর চালিয়ে দেখে নিলাম পুজো টুজো হয়েছে কিনা, অন্তত একটা নকুলদানা জুটতো।  নাহ্ ছেলে ছোকরাগুলোর ভক্তি টক্তি মোট্টে নেই! আরে পুজো কর ভোগ দে না হলে খামোখা মন্দির বানিয়ে লোভ দেখাবার কি! যত্তসব ইয়ে, যাকগে আমিও হ্যাংলা নাকি। আরো খানিক এগোই, স্পীড দিচ্ছিনা বেশী, বেশী জোরে ছুটলে চারপাশের অনেক কিছু মিস হয়ে যায়, আমার তো প্রথম হবার চাহিদা নেই, আমার বরং চারপাশ থেকে রঙ রূপ রস নেবার আছে। চলতে চলতে হঠাৎ মনে হয় আচ্ছা চন্দ্রকেতুগড় গেলে কেমন হত? সেটা অবশ্য বসিরহাট এর ওদিকে না? গুগল বলছে এখান থেকেও যাওয়া যাবে, তিরিশ কিলোমিটার মত মোটে।  এরাস্তায় অনেকবার এর আগে এসেছি, ঝড়খালি অব্দি গেছি কখনো, কখনো সন্দেশখালী,বড় আর ছোট পরিতোষপুর। মালঞ্চ যাবার আগেই চৈতল এর ওখান থেকে বাঁয়ে নিতে হবে, কিন্তু এই রাস্তাটাই যে বড় ভালো লাগছে?

এ দ্বন্দ্ব মনে হয় আমার সর্বক্ষনের, সারাজীবনের সঙ্গী হবে। এ দ্বন্দ্ব মিটলেই আমার মুক্তি হয়ে যাবে আমি জানি। যে রাস্তায় চলেছি তা যতক্ষন আমায় রঙ রূপ রসের জোগান দিয়ে চলেছে, মনের আরাম দিয়ে চলেছে ইচ্ছে করে না সে রাস্তা ছাড়তে। মিস হয়ে যায় অনেক অনেক কিছু তাতে,  কিন্তু আমি নাচার। আজ থাক বাঁয়ের রাস্তাটা আজ অতটা টানছেনা যতটা সামনের রাস্তাটা, দুধারের ভেড়ি নিয়ে টানছে। সুতরাং স্টিয়ারিংএ মোচড় পড়ে না, চলতে চলতে মালঞ্চর আগে একজন বলল, বসিরহাট দিয়ে ঘুরেও বেঁড়াচাপা পৌঁছনো যাবে। বেশ বেশ, তাই যাব খন। মালঞ্চতে একটা লোক ছোট্ট একটা ভ্যানে মিষ্টি বেচছিলো গতবার, কী খেয়েছিলাম মনে নেই, লোকটাকে মনে আছে আর তার হাসিটা। তাকে পেলামনা আর, কোথায় চলে গেছে কে জানে। চা খেয়ে কাঠিভাজা আর গুড়কাঠি চিবোতে চিবোতে ফের চলা শুরু। চেনা চেনা নামগুলো দেখে ভারী আনন্দ হচ্ছে, এসব জায়গা নাকি খুব গোলমেলে। গোলমেলে তো বটেই, আমায় কেমন বেঁধে ফেলেছে, এই রাস্তাটা, কেমন ফিরে ফিরে আসতেই হয়। হঠাৎ করে বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি সবুজ আর হলুদের রঙে ক্যানভাস ঢেকে গেছে। 





একটা মলিন দোকানের সামনে লুঙিপরে উবু হয়ে বিড়িবাঁধছে একজন। তার দোকানের সামনেই থামা গেল। পায়ে পায়ে জমির ধারে এগিয়ে যাই, রঙের সমারোহ তো চলতে চলতেই দেখেছিলাম, এখন নাকে এলো ভুলে যাওয়া কোন ছেলেবেলার ঘ্রান। সর্ষেফুলের গন্ধ, মাটির গন্ধ। আহাহা। বুক ভরে শ্বাস টানি, মাটির এই গন্ধটা বুকে যেতেই যে শান্তিটা হল, আমি ঠিক বোঝাতে পারব না। একটা বউ আসছে একটা মা ছাগল আর আর একটা মানুষ আর একটা ছাগলের ছানা নিয়ে। শান্ত দুপুর। দূরে রাস্তা দিয়ে সাইকেলে কেউ কেউ চলে যাচ্ছে। মনের মধ্যে অনেকটা আরাম পুরে নিয়ে ফের চলা শুরু। এবার ঘড়ির দিকে চোখ পড়ল, তিনটে দশ, নাহ আজ আর চন্দ্রকেতু গড় যাওয়া যাবে না। যদিও একজন বলেছে ভেবিয়া শ্মশানের ওখান থেকে শর্টকাট আছে একটা, তাও থাক, বরং নদীর দেখে আসি একটু। সুতরাং আবার সেই টাকি।

টাকি পৌঁছে হাত কামড়াচ্ছি। কেন এলাম!  পিকনিক মাইক, থিকথিকে ভীড়। কোনোরকমে পার্কিং এরিয়া থেকে বেরিয়েই হনহন করে হাঁটছি যতটা সম্ভব এই ভীড় পার হওয়া যায়। পিকনিক মানেই মাইক আর বক্স মাস্ট না? কেউ কারো কথা শুনতে পাচ্ছেনা, কোনো দল মদ খেয়ে টাল, কেউ বেলা পৌনে চারটের সময় বেশীরভাগ জায়গায় খেতে বসেছে সবে। আমি গেঁয়ো কিনা, আমার পিকনিক মানে, দল বেঁধে রান্না করে মাংস ভাত খাওয়া। সে সব মনে হয় এখন চলে না, তাছাড়া মাংস এমন কিছু মহার্ঘ্য না আজকাল, আরো আইটেম তো চাইই। হনহন করে মেন জেটি পেরিয়ে যাই। আরো অনেকটা হাঁটলে আমি জানি একটা মাচা পড়বে, সেখানে বসে থাকব না হয় খানিক। কিন্তু এত আওয়াজ আর লোক, উহ কী ভুলটাই না করলাম। চলতে চলতে একজন ডাক দেয়, হাত নৌকায় চড়বে? হাত নৌকায় আমার বরাবরের টান, তাছাড়া ভুটভুটিতে এত আমোদপ্রেমী মানুষের ভীড় আমার সইবে না। সুতরাং মিঠুনের (নামটা পরে জেনেছি) নৌকায় আধঘন্টার কড়ারে ওঠা গেল। বাপ ছেলে দুজন দুদিকে বসল, আমি মাঝে। আসলে মাছ ধরা নৌকা, শীতে মাছ মেলেনা তেমন তখন লোক নিয়ে ঘুরিয়ে আনে। নৌকা চলরে শুরু হতেই আওয়াজের দাপট কমে আসে। মিঠে রোদে শান্তি লাগে বড়। বাংলাদেশের বাঁধ ব্যবস্থা থেকে, মিঠুনের পারিবারিক খবর সব রকম গল্প হয় ইছামতীর বুকে। কোলকাতা মিঠুনের বাবার ভালো লাগেনা, অসুখের জন্যে থাকতে হয়েছিল বটে। আমায় বর্ষায় গেলে টাটাকা ইলিশ খাওয়াবে, হোটেলে ওঠারও দরকার নেই ওর ঘরেই সব  ব্যবস্থা হয়ে যাবে আমার। এত ভালোবাসা আমি পাই প্রতিবার ইছামতীর তীরে আমার ঝোলা ভরে যায়।আমার অপটু হাতের দাঁড় দিয়ে মিঠুন হাসে, আমার নাগরিক স্বার্থপর বলেনা ওর বোনেদের শ্বশুরবাড়ির দিকে গেলে আমার বাড়ি যেন যায়। মাটির সাথে থাকা এই মানুষগুলো আরেকটু বেঁচে থাক, ভালোবাসার বড় অভাব, বড় বেশীভিতর থেকে খালি হয়ে গেছি, পরের বার যেন ওই রকম করেই আমিও ডাক দিয়ে যেতে পারি।

নদীর ধার ধরে আরো খানিক হেঁটে ফিরতি পথ ধরি, আকাশে তখন লালের নানান শেডের কেরামতি চলছে। সুয্যিদেবের গাল্ফেন হয়ত লিপস্টিক পছন্দ করতে গেছেন! মীনাখাঁ বাজারে থেমে চা খেতে গিয়ে  কি খেয়াল হল চাউমিনের অর্ডার দেওয়া গেল। বাপ্রে এ চাউমিন, না আমার ফ্রেন্ডলিস্ট! মানে সর্ষের তেলে ভাজা সে চাউমিনে বাদাম থেকে ধনেপাতা, জিরেগুঁড়ো থেকে ভিনিগার কী নেই!! সভয়ে চেয়ে দেখি, পাশের ছেলেটা কাগজের উপর ভেজিটেবল চপ নিয়ে তাতে আধ হাতা কুমড়োর সস, সোয়াশ কাসুন্দি, পাঁচ বিঘে জমির শশা, গাজর সব উপুর করে দিয়েছে। নিজের প্লেটটা তাড়াতাড়ি আড়াল দিয়ে হামহাম করে খেয়ে নিলাম। কী দরকার বাবা, আমার প্লেটের দিকে কেমন করে যেন তাকাচ্ছিল, হয়ত ক্ষেতের লাউ টাউও কিছু আছে দিতে চায়! 

ভেবেছিলাম চাঁদের আলো মেখে ফিরব। কিন্তু চাঁদ উঠলো যতক্ষনে আমি কোলকাতার আলোজ্বলা রাস্তায়। চাঁদটা যেন চোখ মেরে বলছে,  অতই সোজা নাকি হে, এক যাত্রায় সব পেয়ে যাবে..."আমায় নিয়ে ঘুরতে হলে আবার বেরোতে হবে,  সব কিছু পেয়ে গেলে বাঁচতে ইচ্ছে করবে নাকি? পরেরবারের জন্যে খানিক বাকি রইল না হয়।তদ্দিন যা পেলে আজ, তা নিয়ে উটের কুঁজ বানিয়ে নাও, তেষ্টায় কাজে দেবে।"

Wednesday, January 1, 2020

হ্যাপ্পি নিউ ইয়ার

কাল এক বন্ধুর বাড়ি জড়ো হয়েছিলাম কয়েকজন। আড্ডা মেরে খেয়ে দেয়ে হুট করেই ইচ্ছে হয়েছিল আরেক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে সারপ্রাইজ দেবার। কাল মদ টদ খাওয়ায় হবে জেনেই গাড়ি নিয়ে বেরোয়নি, এক বন্ধু তার সাইকেল বের করল, সাইকেলের পিছনে বসে মাতাল, হুল্লোড়ে মানুষ আর কুকুরের পাল সামলে মিনিট কুড়ির কোলকাতার রাস্তা। ভারী অদ্ভুত লাগছিল, আজ থেকে এক নতুন দশক শুরু হল। এক দশক আগে এরকম মাঝরাতে সাইকেলে করে বেরোবো এ ভাবতেই পারতাম না।জীবনের এই যে বাঁক গুলো দেখা যায়না,  স্পীডে গাড়ি চলতে চলতে বাম্পার চলে আসে, মনে হয় অনন্ত খারাপ রাস্তা খালি আছে সামনে, তারপর কখন যেন ফের রাস্তা মসৃন হয়ে যায়, দুপাশে গাছ দিয়ে ঢাকা রাস্তায় ঢুকে পড়া যায় আচমকাই, এতেই বাঁচাটা বড় রোমাঞ্চকর মনে হয়। এরকমই কোনো পয়লা জানুয়ারি একলা বরফঢাকা এয়ারপোর্টে বসে কেটেছিল, কোনোটায়  বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রনায়, কোনোটায় মা পরের দিন মটরশুঁটির কচুরি করবে সেই আনন্দে,আবার কোনোটা কিচ্ছু না স্রেফ আরাম করে ঘুমিয়ে। 

 রাত দেড়টা বলে মনেই হয়না!! এত লোক এত গাড়ি। একটা ছেলে মাতাল হয়ে তার বাবাকে চেঁচিয়ে বলছে, "ঘরেএএ ঢোক বলছি, চল ঘরে চল"।  আর তার বাবা তাকে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে চলেছে, সংলাপ অদলবদল হয়ে গেছে আর কি মদের প্রভাবে। একত্রিশে ডিসেম্বর মানেই মদ খেতে হবে আর তারপর এরকম ছড়াতে হবে এমন নিয়ম কবে হল কে জানে! একটা গলিতে ভুল করে ঢুকে পড়েছিলাম, রাস্তা গোলমাল করায়, দেখি এক গাড়ি ছেলে মেয়ে মিলে গাড়ি থামিয়ে, অসংলগ্ন ভাবে কী সব যেন বলছে। এক মোড়ে কিছু লোক খামোখা বাওয়াল দিয়ে দিল একটা খালি ট্যাক্সিকে, কেন যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা লোককে হর্ণ দেবে! মাতালদের পাশ কাটিয়ে চলেছি আমরা। সাইকেল দেখে কেউই কিছু বলছেনা,খালি একপাল কুত্তা তাড়া করে আসা ছাড়া। বাপ্স কামড়ে দেবে নাকি! পায়ের গুলিটা তাক করেই ছুটছে যে! একটা পুলিশের গাড়ি টহল দিচ্ছে। উৎসবের রাতে এদের জ্বালা বাড়ে।

সকালের রোদে চোখ খোলে, ঘুম পুরো না হওয়ার জ্বালা নিয়ে। বন্ধুরা মিলে হইচই করে লুচি বানাই, ট্যারাব্যাঁকা, শক্ত, খড়মড়ে লুচিই হেব্বিই স্বাদ আনে নলেন গুড়ের সাথে। আহা এমন রোদ মাখা সকালে নলেন গুড়ের সঙ্গতে যে সকাল শুরু হয় তা খারাপ হতে পারেনা। একটা কাক এসে বসে জানলায়, এই নে তুইও একটা খা গুড়ে মাখা লুচি, বচ্ছরকার দিন বলে কথা! রাস্তাঘাট, বাস, সব ফাঁকা ফাঁকাই। অফিস পাড়া শুনশান করছে। অটোটা একটু দূরে নামিয়ে দিয়েছে, হাঁটছি। ভাতের ঝুপড়ি বা ঝুপ্স অধিকাংশই বন্ধ। একটা চা পাঁউরুটির দোকানে দেখি একটা লোক আর মেয়ে উদাস হয়ে বসে আছে। আজ বিক্রীবাটা নেই মোটে। রোজটা গেল। ছুটি নিলেই পারতো তো? একদিন বেশ মেয়ের বা ছেলের সাথে কাটাতে যে ইকোপার্ক কিংবা চিড়িয়াখানা,  এমন উদাস হয়ে বসে না থেকে। আসলে আমাদের মধ্যে ভালো থাকা অপরাধ এ ছোটবেলা থেকে গুঁজে দেওয়া হয়, "দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরছিস, ভালোইই তো আছিস",  "ওর আর কি, বিয়ে থা হয়নি, দিব্যি আছে",  "ওদের ঘোরাঘুরির সমস্যা কি, বাচ্ছাকাচ্ছা হয়নি, ভালোইইই আছে"।  সব কটা "ভালোইই" একটা অদ্ভুত সুরে শ্লেষের সাথে বলা! যেন ভালো থাকাটাই দোষের। সারাক্ষণ "খুব চাপে আছি" বললেই তুমি দায়িত্বশীল কর্মঠ একজন মানুষ। 

এত চাপ নিয়ে বেঁচে কি হবে! বুড়ো হাড়ে পাহাড় বাইতে পারবেন না, লজেন চিবিয়ে আরাম পাবেন না, নদীর জলে নামলে ঠান্ডা লাগবে, সুগারে নলেন গুড় নিষিদ্ধ হয়ে যাবে আর ফোকলা দাঁতে মাংসের হাড় চিবিয়ে সুখ হবে না। এই নতুন বছরটা উদযাপনের হোক না, ভালোবাসার, ভালোথাকার। শুভেচ্ছা রইলো।