Sunday, February 19, 2023

ছুটিতে ছোটাছুটি (ইলোরা)

অজন্তার গুহায় সোনা রঙ এসে পড়ছে আমরাও এই শিল্পীর হাতে তার ক্যানভাস ছেড়ে বাসের দিকে এগোলাম।  ব্যাপারটা আমার ভালো লেগেছে। গাদাগাদা গাড়ি বাইক আসবে না এই অব্দি, ট্রাফিক জ্যাম হবে না। পর্যাপ্ত সরকারী বাস আছে টি জাংশন থেকে অজন্তার কাউন্টার অব্দি,  টিকিট কেটে উঠে পড়ো।  সেই যে বলেছিলাম একজন খুব সাহায্য করেছিল বাস অব্দি পৌঁছে দিয়ে, মনে আছে? তার দোকানে যেতেই হবে। তা তিনি তো পাক্কা সেনর অলিভেরা! এক কাপ চা আর চাট্টি বাজেকথা বলে একগাদা জিনিস গছিয়ে দিলো আমাদের মতো শপিং বিমুখ লোকেদেরও।
 সারাদিন ট্রেন পৌঁছবে কিনা,  অজন্তা দেখা হবে কিনা, তারপর অজন্তায় পৌছে সেসব দেখা সব মিলিয়ে এত উত্তেজনায় ছিলাম, টের পাইনি,  এখন পেলাম ভয়ানক খিদে পেয়েছে আর শরীরও কিঞ্চিৎ বিশ্রাম চাইছে। স্থানীয় খাবার খেতে আমরা তিনজনেই খুব উৎসাহী থাকি, সেটা মনিপুরী অদ্ভুত স্বাদের স্যালাড হোক, ভেগান বাল্টিক খাবার হোক কি চেনা মহারাষ্ট্রের বড়া পাও হোক। 
বড়াপাও, চা, মারাঠি পকোড়া খেতে খেতেও সারাদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা উত্তেজিত, চিকু ও তার মা থেকে গাম্বাট দস্যু যারা চকচকে জিনিস দেখেই সোনা মানিক ভাবে, সেনর অলিভেরার মতো দোকানদার...শেষমেশ আদনানজি ঘেঁটি ধরে তুলে না নিলে মনে হয় আওরাঙ্গাবাদ পৌঁছনো হত না!

আওরাঙ্গাবাদ থেকে ইলোরা কাছেই। সুতরাং আমরা পয়সা বাঁচাতে একটা অটো নিয়ে পাড়ি দিলাম। যাবার পথে প্রথম হল্ট আওরঙ্গজেবের সমাধিতে। সত্যি বলতে এটা নিয়ে আগে থেকে কিছুই পড়ে আসিনি তাঁর ফলে একটা বিস্ময় অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্যে। এই লোকটার সম্পর্কে ইতিহাসে মোটামুটি সবাই পড়েছে। তাজমহল দেখতে গিয়ে শুনেছি শাহজাহানকে বন্দী করে রেখেছিল , বাকি ভাইদের খুন করে সিংহাসনে বসাটা ছেড়েই দিলাম । এর সাথে আছে জিজিয়া কর ফের চালু করা ,নানান গোঁড়ামি সব মিলিয়ে আওরাঙজেব মনে হয় সব চেয়ে আনপপুলার মুঘল সম্রাট। অথচ তার কবরটা একটা কাঁচা কবর। আগে চালা মতো ছিল ইংরেজ শাসকের অনুরোধে হায়দ্রাবাদের নিজাম চারপাশটা পাকা করে দেন। কিন্তু এত সাধারণ কবর মনে হয় মুঘল কোনো কর্মচারিরও হয়নি! আর আশ্চর্য এই যে কবরে বন তুলসীর ঝাড়! এটাও নাকি স্ম্রাটের ইচ্ছায়! জানিনা এটা কতটা সত্যি কিন্তু তুলসীর ঝাড়টাও মিথ্যে না , কাঁচা কবরটাও না! ভাবতে অবাক লাগে না?  আওরঙ্গজেবের মতো একজন রাজার শেষ ইচ্ছে আকাশের আচ্ছাদনে শুয়ে থাকার? জিজিয়া কর চালু করা একজন রাজার কবরে তুলসীর ঝাড়! সত্যিই কোন আমিটা যে আসল আমি কে তাঁর খবর রাখে!



ইলোরা সম্পর্কে প্রথম জানি কোনো ইতিহাস বই থেকে নয়, ফেলুদার কাছ থেকে নাকি বলা ভালো সিধুজ্যাঠার থেকেই। কৈলাস মন্দির আর দশাবতার গুহা নিয়ে আলাদা আগ্রহ ছিলোই। কাল অজন্তাতেও দেখেছি, আজ ইলোরাতেও দেখলাম, ১৫ বছর অব্দি টিকিট লাগে না বলে সারা মহারাষ্ট্রের স্কুল প্রায় হাজির। ভীড়ে ভীড়াক্কার। তবে আমার ব্যপারটা ভালোই লেগেছে, বুঝুক না বুঝুক আমাদের দেশের ইতিহাস সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হোক, ছোট বয়সে ব্রেন তাজা থাকে, একেবারেই বুঝবেনা তাও না। বড় হয়ে কারো হয়তো উৎসাহ হল কে বলতে পারে!  ইলোরায় গেট দিয়ে ঢুকেই কৈলাশ গুহা। কিন্তু আমরা নাম্বার অনুযায়ী দেখবোই ঠিক করেছিলাম। জৈন, বৌদ্ধ আর হিন্দু এই তিন ধরনের ধর্মের কাজ অনুযায়ী তিন ধরনের গুহা। ১-১২ বৌদ্ধ গুহা, ১৩-২৯ হিন্দু আর ৩০-৩৪ হল জৈন৷ এবং অবশ্যই স্থাপত্যকাল অনুযায়ী নাম্বারিং না, পজিশন অনুযায়ী।  ইলোরা পড়ার কথা ছিল আমাদের এরকম, ময়ূরাক্ষী পড়বে বৌদ্ধ গুহা, আমি আর সৌরভ হিন্দু গুহা ভাগভাগ করে। তো কার্যক্ষেত্রে দেখা গেলো আমি আর সৌরভ কিছুই পড়িনি। মানে ঐ দশাবতারে বিষ্ণুর দশ অবতারের কাহিনী আছে, তাছাড়া শিবের নানান মূর্তি আছে, কৈলাস মন্দিরটা একটা সিঙ্গেল পাহাড়কে কেটে কেটে করেছে, এরকম যা সবাই জানে ওটুকুই। বৌদ্ধ মন্দির গুলোয় , বজ্রপানি, পদ্মপানি ,তারা, আর বুদ্ধের মূর্তি। একসাথে পড়তে বসার জায়গা। একতলা, দোতলা, বারান্দা, সেই বারান্দাতেও নানান কাজ। হাঁ করে দেখতে দেখতে ঘুরি।
ওইদিক থেকে শুরু

এটা তিনতাল , কেমন হোটেল এর মতো দেখতে না?

বৌদ্ধগুহা  দেখতে দেখতেই পায়ের অবস্থা খারাপ। এহেহে ফিটনেসের তো যাচ্ছেতাই অবস্থা রে!! জল খেয়ে টুপি বাগিয়ে এগোই। দশাবতার গুহায় ঢুকে থতমত খেয়ে যাই। সিঁড়ির দেওয়ালেও নানান কাজ, অর্ধনারীশ্বর এর মূর্তি একটাই দেখলাম এ তল্লাটে। দোতলার হলে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে বিষ্ণুর দশ অবতার শুধু না,  শিবেরও নানান রূপ খোদাই করা৷ স্রেফ ছেনি হাতুড়ি দিয়ে এ কী করেছে হ্যাঁ!! ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যাটা ভাবলেও বমকে যেতে হয়! এই সব পিলার কেটে বের করা,  কতটা কাটলে ধ্বসে যাবে না কতটা কাটলে হাজার হাজার বছর দাঁড়িয়ে থাকবে এ বিদ্যা তখনকার ভারতবর্ষ জানতো, সে বিদ্যা আমরা হারিয়ে ফেলেছি, আবার আমাদের নতুন করে শিখতে হয়েছে সব। ধাতু বিদ্যা থেকে চিকিৎসা থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে স্থাপত্য।একটা জাতির পরাজয় কত দিকে হয় হ্যাঁ! আরো বড় করে ভাবলে এ আসলে মানুষের পরাজয়। যা জানতাম তাকে আরো প্রসারিত না করে সেটা আবার করে শিখে কত সময় নষ্ট করতে হয়েছে, আরো এগোনো হল কই তাহলে? এ যেন বৃত্তের মধ্যেই এগিয়ে যাওয়া! আনমনা হয়ে গেছিলাম, ময়ূরাক্ষীর ধমকে অপরাধী মুখ করে তাকাই, সত্যিই এই গুহাটা নিয়ে পড়া উচিত ছিল। কোন মূর্তি কোন গল্পকে বলছে এ আবিষ্কার সহজ হত। একটু আগের আমার ভাবনারই যেন ছোট স্কেলে ছবি!  যাকগে, যা গেছে যাক ভেবে ময়ূরাক্ষী বই দেখতে লাগলোয়ার আমি শর্টকাটে বিশ্বাসী, আমাদের বয়সী কি আরেকটু ছোট হবে একজোড়া ছেলে মেয়ের পিছু পিছু দেখছিলাম। ওরাও পড়াশোনা করে এসেছে।  একে অপরকে বলছিল আমি শুনছিলাম, চুরি করে অন্য গাইডদের থেকে যেমন শোনা হয় অমন করে। তা দেখা গেল ময়ূরাক্ষীর পড়া আর আমার শোনা দুই'য়ে মিলে ব্যপারটা বোঝা গেছে। বাঁ দিকের মূর্তিগুলো শিবের নানান মূর্তি,  কোনোটা শিব পার্বতীর বিয়ে, কোনোটা তাদের পাশাখেলা, কোনোটা ত্রিপুরাসুর বধ এরকম আর ডানদিকের দেওয়ালে মৎস্য কূর্ম বরাহ ইত্যাদি অবতার। আবিষ্কারের বেশ একটা আনন্দ আছে। মূর্তি গুলো দেখে দেখে আরে এটা তো ওই ওটাতো সেই বলে খুঁজে পাওয়া, কালের স্রোতে ভেঙে যাওয়া বা পাথর মসৃন হওয়া উপেক্ষা করেও। নটরাজ মূর্তি কিংবা গড়ুর দেখে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। যে শিল্পীরা এসব বানিয়েছিল তাদের মনে মনে নমস্কার করি।



ভগীরথের গঙ্গা আনা

দশাবতার যদি ট্রেইলার হয় তবে কৈলাস মন্দির হল আসল সিনেমা। মন্দিরের পাশ দিয়ে একদম পাহাড়ের উপর উঠে ড্রোন ভিউ পাওয়া যায়। বাপরে কী বানিয়েছে রে!!! এটুকুই শুধু বলতে পেরেছিলাম আমরা। ডিটেইল আর্কিটেকচারে আমি যাচ্ছি না, সেসব আর্কিওলজিকাল সাইটেই মিলবে। একদম নভিস একজন লোক, যেমন দেখেছিল সে কথাই বলব। একটা মনোলিথিক পাহাড় কেটে কেটে মন্দিরের স্ট্রাকচার দেওয়া স্রেফ ছেনি হাতুড়ি দিয়ে এই ব্যপারটা ধারনা করতেই খানিক সময় লেগে যায়। মূল মন্দিরের সামনে নন্দী মন্দির যেমন তৎকালীন মন্দিরের সামনে থাকতো। তারপরের মন্ডপ অংশের মাথায় চারটে মিষ্টি মতো সিংহ পাহারা দিচ্ছে। সিংহ মিষ্টি মতো? আজ্ঞে হ্যাঁ তখনকার দিনে সিংহ তো এঁরা দেখেনি, ফলে মুখের ভাব তেমন সিংহমাফিক নয় কিন্তু তাতে কোনো অসুবিধে হয়না। কোনো কোনো জায়গায় সিংহ আর হাতির মূর্মতি একসাথে । লড়াই করছে। সিংহ জিতছে। অ্ন্রেআসলে হিন্রদু ধর্ম ফের মাথা চাড়া দিচ্ছে।  চার পাশে ছোট ছোট আরো মন্দির ঘিরে আছে। এবং প্রতিটা মন্দিরের গায়ে পাথর কেটে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানান মূর্তি। কখনো রাবনের কৈলাস পর্বত ধরে ঝাঁকানো(মূল মন্দিরে তো বটেই আরো অনেক জায়গায় দেখলাম এটা),  দশাবতার, শিবের বিভিন্ন রূপ। মন্দিরের প্রবেশের মুখেই আছে গজলক্ষ্মী হাঁ করে দেখার জো নেই অবশ্য। পেল্লায় ভীড়! কৈলাস মন্দির শুনেই আর সব থেকে ইজি অ্যাক্সেস হওয়ায় পিলপিল করছে লোক, নন্দী মূর্তি অর্থাৎ ষাঁড়ের গলা জড়িয়ে সে কী ছবি তোলার ধূম। মাঝে মন্ডপে যেখানে শিবের দক্ষিনামূর্তি,  যা কিনা ছয় হাতের আর সিংহ পরিবেষ্টিত আসনের উপর আসীন দেখার জন্য বেশ লড়াই মতো করতে হয়।  কারন এরপরেই আছে মূল গর্ভগৃহ। সেখানে শিবলিঙ্গের পুজো দেওয়ার জন্য কোটি কোটি লোক ঢুকছে! সেই ভয়ানক ভীড়ে পেরিয়ে শিবলিঙ্গ দেখার শখ ছিল না। আমরা ঘুরে ঘুরে মূল মন্দিরের কাজ দেখছিলাম। এত ভীড়, ক্লান্ত দেহ সব উপেক্ষা করেও বারবার অবাক হচ্ছিলাম কী সেই বিদ্যা যা কিনা একটা পাহাড়ের মাথা উড়িয়ে দিয়ে,  সেটাকে শেপে এনে একটা আস্ত ত্রিস্তরীয় মন্দির বানিয়ে ফেলে!! 
বার বার মনে হয় আমার এই যে প্রাচীন সব শিক্ষা বিদ্যা আমরা হারিয়ে আবার নতুন করে শুরু করছি আসলে আমরা যেন একটা বৃত্তেই ঘুরে চলেছি। এই ইঞ্জিনিয়ারিং যদি আমরা বহন করতাম তাকে আরো উন্নত করতে পারতাম, কিন্তু তা হারিয়ে গেল, আবার আমাদের নতুন করে শিখতে হল! 

কৈলাসের ড্রোন ভিউ(মানে পাহাড় থেকে তোলা আর কি)






কৈলাস মন্দিরের পিছনের পাহার থেকে



উপরে শিব-পার্বতী পাশা খেলছে। নীচেরকি ভালো বুঝতে পারছিনা, কারো মনে পড়লে কমেন্টে বলে দেবেন হ্যাঁ?






মৎস্য অবতার(কৈলাস মন্দির)

নৃসিংহ অবতার(দশাবতার গুহা)

এটা কি বলিরাজের গল্পটা? মনে পড়ছে না




চার দিকে প্রহরারত সিংহ

কৈলাস মন্দিরের একটা মিনার

দশাননের কৈলাস ঝাঁকানো

গজলক্ষ্মী- কৈলাস 


সিংহটা কেমন হাসিমুখে লড়াই করছে! এটা আসলে রূপক, হাতিকে হারিয়ে দেওয়া অর্থে হিন্দু বৌদ্ধ ধর্মকে হারাচ্ছে, হাতি জেতা মানে বৌদ্ধ ধর্মের বাড়বাড়ন্ত আর একই রকম মানে দুজনেরই প্রায় একই রকম প্রতিপত্তি


কৈলাস মন্দিরের মূল অংশের ছাদের কাজ




এটা বরাহ অবতার ,দশাবতার গুহা (কৈলাস মন্দিরেও একে পাবেন)




কৈলাস মন্দির পেরোলে ভীড় কমে যায়। কারণ এর পরের রাস্তা একটু বেশীই চড়াই উৎরাই আর ডিসেম্বরের শেষ হলেও বেশ ভালোই সূর্যের তাপ। একুশ নাম্বার গুহায় ঢোকার মুখেই একদিকে যমুনা আর একদিকে গঙ্গার মূর্তি। এ জিনিস আর কোনো গুহায় নেই। ভিতরে শিবের বিয়ে, সাত মায়ের সাথে গনেশ, রাবনের কৈলাস মন্দির নাড়ানো, কালী, কার্তিক এরকম নানান পুরানের গল্প পাথর কেটে কেটে বানানো। বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা শেষ এখন স্রেফ মগ্ধ হয়ে দেখে চলেছি। বিশেষ করে ঢোকার মুখে গঙ্গা যমুনার মূর্তি বাহন সমেত বড় সুন্দর। যমুনারবাহন কচ্ছপ অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে কিন্তু প্রতিটা মূর্তির ডিটেইলিং অবাক করে। সে শিব দূর্গার বিয়ের হোক, কিংবা পার্বতীর তপস্যাক্লিষ্ট মূর্তি হোক৷ 
গঙ্গা

কালী...করাল বদনা



এর পর থেকে রাস্তায় একটাও গাছ নেই, জলের জায়গাও পাচ্ছিনা। পুরো রাস্তায় খালি আমরা তিনজন। খাঁ খাঁ করছে চারদিক দুপুরের তাপে। ২৯ নাম্বার গুহা হল শেষ হিন্দু গুহা। এটার চলতি নাম সীতা কি নাহানি। যদিও সেটা ভুল করেই, গুহার মুখে গঙ্গা দেবীর মূর্তিকে সীতার সাথে গুলিয়ে এমন ভজঘট করে ফেলেছে। পাহাড়ের পাশ দিয়ে সরু রাস্তা, তার অন্যদিকে ওই সীতা কী নাহানি পুকুর। এ পুকুরে জল পরে ২৯ নাম্বার গুহার মাথা থেকে আসা ঝর্ণার জল। বর্ষায় এই রাস্তা বিপজ্জনক হবে কিন্তু দেখতেও ভারী ভাল্লাগবে বোঝাই যায়। এই গুহাটা বেশ মজার, তিনদিক খোলা। ভিতরে নটরাজ মূর্তি, শিবের  অন্ধকাসুরের বধ, শিব দুর্গার বিয়ের মূর্তি খোদাই করা। ২৯ থেকে বেরিয়ে রাস্তাটা আরো মারত্মক৷ সূর্য মাথার উপর, জল শেষ রাস্তা যেন শেষ আর হয়ই না। এরপর আছে জৈন গুহা গুলো। রোদে গরমে প্রায় ধুঁকতে ধুঁকতে জৈন গুহার কাছাকাছি পৌঁছে ছায়া মিলল। জলও। খানিক বসে দেখতে চললুম ফের।

ভরদুপুরে এই স্ট্রেচটা হাঁটতে জিভ বেরিয়ে গেছিলো!


এই গুহায় আছে তীর্থঙ্কর দের মূর্তি। একজন তীর্থঙ্কর নাম গোমতেশ্বর,  সে ছিল আদিনাথের ছেলে। মোক্ষলাভের জন্য  সে এমন তপস্যা করছিল যে তার বাবার আগেই সে মোক্ষ অএয়ে যায়। তবে যতদিনে মোক্ষ পেয়েছিল ততদিনে তার শরীর ঘাসপাতা, শিকড়ে ঢেকে গেছে। আচ্ছা হাড়ে দুব্বো গজানো কী একে দেখেই বলে লোকে? যাই হোক, তীর্থঙ্করদের মূর্তি হল একেবারে মিলিটারি সাবধান টাইপ। কোনো মুদ্রা না কিছু না সোজা হাত পা,  শরীরের কোনো অঙ্গের সঞ্চালন নেই। অর্থাৎ জগৎ থেকে সে বিমুক্ত,  জামাকাপড় হোক বা কিছু তার অপ্রয়োজনীয় কিছুতেই তার কিছু যায় আসে না। জৈনদের গুহাগুলো খুব অর্নামেন্টেড। মানে প্রতিটা স্তম্ভ, ছাদ কারুকাজ করা। গোমতেশ্বরের মূর্তিতে অবশ্যই লতাপাতা উঠে এসেছে এমন রিলিফ। আর ৩২ নাম্বার গুহায় আছে কুবের আর অম্বিকার মূর্তি।এনারা সম্ভবতঃ যক্ষ ও যক্ষী কিন্তু জৈনধর্ম নিয়ে আমার জ্ঞান কম তাই এদের উপস্থিতির বিস্তারিত খবর জানিনা। ৩২, ৩৩ আবার ইন্টারকানেক্টেড। আলো আঁধারির মধ্যে দিয়ে দিয়ে এক গুহা তগেকে আরেক গুহায় যাওয়াও কম রোমাঞ্চকর নয়!

জৈন গুহা - ইন্দ্রসভা না কী যেন নাম ছিল, ঢোকার মুকে













জৈন গুহার সিলিং এর কাজ


 এইসা উঁচু উঁচু সব পাথরের সিঁড়ি সারা ইলোরা জুড়েই।তখনকার দিনের মানুষের বাত টাত ছিল না মনে হয়! দোতলাটা প্রশস্ত, কিন্তু সিঁড়ি গুলো সরু সরু। আমাদের আগেইই কেউ একজন ঘুরে গেছে জুঁই ফুলের আতর মেখে, জানলা না থাকায় কয়েক হাজার বছরের পুরোনো গুহা সেই আতরের গন্ধ ধরে রেখে দিয়েছে বহুক্ষণ।  ইলোরায় ঘুরতে ঘুরতে বড় অদ্ভুত লাগছিল।  বিস্ময় মুগ্ধতা এসব ছাপিয়ে অন্যরকম মনে হওয়া, যা কাল অজন্তাতেও হচ্ছিল। এইসব গুহা পাথর এরা কতকাল ধরে কতরকম লোক দেখেছে, তখনকার দিনে ধর্মেও উগ্রতা ভালোই ছিল তাও কেন কে জানে এইখানে কেউ কারোর কাজ নষ্ট করে দেয়নি। হয়ত শিল্পীরা ছিল বলেই পারেনি অন্যের কাজ মুছে দিতে, নিজেদের আলাদা জায়গা খুঁজে নিয়েছে। যদি কাল একটা বহুমাত্রিক প্রবহমান জিনিস হয়,তবে কোনো মাত্রায় এই গুহায় কাজ শিল্পীরা সব বসে আছে,কোনো মাত্রায় সবে গুহা আবিষ্কার হয়েছে, কোনো মাত্রায় আমাদের মতো কেউ অবাক চোখে দেখছে!
সূর্য ডুবে এলো প্রায়। আমাদের মন ভরে আছে কিন্তু শরীরের হা ক্লান্ত দশা। মূল রাস্তা দিয়ে ফিরে কৈলাস মন্দিরের সামনে বসে রইলাম খানিক। বসে বসে আপন মনে কী জানি ভাবছি হঠাৎ খকখক করে কাশির আওয়াজে মাথা ফিরিয়ে দেখি একটা বড় বাঁদর খুব কাশছে ঠিক পিছনে বসে! মুখে হাত চাপা মানুষেই দেয়না তো বাঁদরে! সে না দিক এর সামনে থাকা বিপজ্জনক!  ফস করে চাঁটিয়ে দিলেই চিত্তির।ফিরতে ফিরতে দেখি, এ চত্বরে যে সব বাঁদরদের দল ছিল তাদের বিকেলের ছুটি চলছে। বাবা বাঁদর খোকা বাঁদরকে নিএ বিকেলে বেরিয়েছে। একটা একতু বেশী ছোট একটা আরেকটু বড়। নিজের মনে বসে অ্টাআছে বাবা বাঁদর, কাল ফের কাকে চাঁটাবে , কোত্থেকে চাট্টি ফল জোটাবে সেসব ভাবনাই হয়তো। কিংবা সবাই চলে গেলে কোন গুহায় ঢুকে বুদ্ধ না শিব না গোমতেস্বর না বিষ্ণু কার মাথায় চড়া যায় এইসব গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাভাবনা চলছে।  এই টুকু ছানা বাঁদরটা তার বাবার এই মস্ত লেজ ধরে ঝুলছে। নেহাতই ছোট বলে কিংবা বাবার ছদ্মবেশে মা কিনা কে জানে ধাড়িটা কিচ্ছুই করলো না, স্রেফ ইগ্নোর করলো ওই লেজ ধরে দোলাটা। সূর্য তখন কৈলাস মন্দিরের পিছনে ডুবছে। 

Thursday, January 19, 2023

ছুটিতে ছুটোছুটি (অজন্তা কাণ্ড)

সেবার এক বন্ধুর বাড়ি গেছি, আড্ডা খাওয়া দাওয়া চলছে,  তারপর আমি থাকলে যা হয় , একটা বেড়ানোর কথাও হচ্ছে। দেখা গেল, আরে তিনটে দিন খামচা মেরে পাওয়া গেছে তো এ বছরের শেষে (মানে ২০২২ এর শেষে), কোথাও তো যাওয়াই যায়!! অনেকদিনের সাধ ছিল অজন্তা যাওয়ার। বয়স বাড়ছে, পায়ের জোর কমছে আর অজন্তার ছবিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শুনছি ক্রমেই। চলো তবে! কিন্তু সবাই যা প্ল্যান দিচ্ছে তাতে তো তিন+দুই(শনি রবি) হবে না পাঁচদিনে। হবে না একেবারেই? আচ্ছা দেখা যাক দেখি? খুব ভয়ানক তোলপাড় করে একটা খুব হেক্টিক প্ল্যান দাঁড় করালাম। বুধবার ট্রেনে চড়ব, বেস্পতিবার মাঝরাতে নামবো, ওখান থেকে  অজন্তা, সেদিনই সন্ধ্যেবেলা ঔরাঙ্গাবাদ। পরেরদিন ইলোরা আর আওরঙ্গজেবের সমাধি। তারপর দিন ঔরঙ্গাবাদের গুহা,  বিবিকা মুকবারা আর দৌলতাবাদ ফোর্ট দেখে ট্রেনে চেপে বসব। দিয়ে পরদিন হাওড়া। সহজ সরল নিষ্পাপ প্ল্যান। কিন্তু এরকম নিষ্পাপ প্ল্যানে ময়ূরাক্ষী আর সৌরভ ছাড়া কাউকে পেলাম না। তাতে কী আর আমায় দমানো যায়। সুতরাং টিকিট কেটে বসে রইলাম, যদিও ফেরারটা ওয়েটিং।যা হবে দেখা যাবে!

যাওয়ার আগের দিন রাতে পেলাম মেসেজ, সাড়ে পাঁচঘন্টা রিস্কেডিউল হয়েছে ট্রেন। হয়ে গেল! ঠিক আছে ভুসাবালে পৌঁছবার কথা পৌনে দুটোয়,পাঁচ ঘন্টা পর হলেও ক্ষতি নেই, এমনিতেও হোটেল বুক করিনি ট্রেন লেট করে বলেই।  কিন্তু জীবনের হিসেব কবেই বা অত সোজা হয়েছে! কিন্তু সে কথায় পরে আসছি। অজন্তা ইলোরা দেখতে গেলে খানিক পড়াশোনা করে যাওয়া ভালো। না হলে দেখা হয় বটে, ভালো রস পাওয়া যায় না। আমরা দু কপি অজন্তা অপরূপা কিনে তো ছিলাম, কিন্তু পড়া হয়নি কিছুই প্রায়। মানে বই হিসেবে অসামান্য কিন্তু যা হয় আর কি। শেষে লাস্ট মিনিট সাজেশনের মতো করে রিসেন্ট গেছে এমন লোক, নারায়ণ সান্যাল, একটা গাইড বই, একটা দুটো ব্লগ দেখে গুহার নাম্বার মার্ক করা হল। এবার সেই সেই গুহাগুলোই মূলতঃ পড়া হবে। বাকি পড়ার সময় নেই আপাতত! ছবি খুব অল্প গুহাতেই টিকে আছে। বাকিগুলো পড়ে পড়লেও একই হবে। বলাই বাহুল্য এ দলে আমি হলুম সবচেয়ে খারাপ ছাত্র। তাই আমি বালিশে হেলান দিয়ে হ্যাঁ হ্যাঁ ইলোরার পড়াশোনাটা করছি তো বলে বাইরে তাকিয়ে রইলুম। বেশ খানিকক্ষণ পড়াশোনা করে বাকি দুজন ক্রমেই নেতিয়ে পড়তে লাগলো। আমিও নেতিয়ে পড়ছিলাম, তবে সে পড়ার কারনে না, পড়েছি ঘন্টা! আমি স্রেফ কোন গুহা কোন ধর্মের,  কী বৈশিষ্ট্য এটুকু দেখে রেখে দিয়েছি। আমি মুষড়ে পড়ছিলাম, গাড়ির লেটের বহর দেখে!

সাড়ে পাঁচ ঘন্টা ক্রমে বাড়তে লাগলো। এত পড়াশোনা এত প্ল্যান, এত কষ্ট সব যে বৃথা যায় রে! রাতে মরীয়া হয়ে একটা ক্যালকুলেশন করলাম, যদি ট্রেন উনিশ ঘন্টা লেট হয়(মানে ম্যাক্স ধরছি) অজন্তা দেখতে এক ঘন্টা সময় পাই তো থেকে যাবো। পরের দিন আরো কিছু ঘন্টা সময় ঘুরে আওরাঙ্গাবাদ পৌঁছে ফোর্ট দেখে নেবো, তৃতীয় দিন অর্থাৎ শনিবার ইলোরা দেখে ট্রেনে উঠবো। আর যদি এমন হয় শুক্রবার ফোর্ট দেখা হল না, তাহলে চাপ নেই রবিবার ফিরবো ফ্লাইটে। মাথা পিছু এক্সট্রা প্রচুর খরচ হবে বটে কিন্তু আমরা তো জীবনে বেড়ানোটাই প্রায়োরিটি হিসেবে সেট করেছি, আর বেড়াতে বেরিয়ে এরকম হলে কিই বা করা যাবে। অন্য কোথাও কৃচ্ছসাধন করে নেবো না হয়। তবে ট্রেন যে লেটে চলছে এখনো অব্দি, তাতে সম্ভব এখনো। মানে বৃ্হস্পতিবার সকাল দশটা এগারোটা  নাগাদ(মানে আট নয় ঘন্টা লেট) পৌঁছে দিলেও করে নেবো ঠিক।  সকাল হল, সাতটা আটটা, আমাদের হিসেব সব ফেইল এখন। বারবার ট্রেনের স্পীড দেখছি আর eta দেখছি, সে খালি বেড়েই চলেছে। 
ওদিকে আমাদের পাশের সাইড আপারে সহযাত্রী হিসেবে পেয়েছি চিকু ও তার মাকে। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। চিকুর মা খুবই ইংরেজি ভাষা প্রেমী। সারাক্ষণ চিকুকে বলে গেলেন, "চিকু নটি করছ খুব", " চিকু নটি করেনা ", "ও মাই গড, চিকু কী নটি করছে!",  "ওই দেখো কাউ", " নোংরা হয়ে গেছ, নটি করে, এসো ওয়াশ করে দিই"।  একে ট্রেন লেটের চিন্তা তাতে ওই সমানে নটি করোনা শুনে শুনে ইচ্ছে হচ্ছিলো গিয়ে বলি, "বোনটি আমায় দয়া করো,দুষ্টুমি যদি করে করুক, কিন্তু নটি কোরোনা শুনতে পারছি না আর।" যদিও চিকু দুষ্টুমি করেনা, সে সারাক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করে আর কাঁদে। হয়ত এতক্ষনের জার্নিতে সে ক্লান্ত, কিন্তু আমাদের দেশে তো বাচ্ছা মানুষ করতে মোবাইল না মারধোর বা আহ্লাদে মাথায় তোলা। সভ্য ভব্য হয়ে চলা শেখাবে কি! সে নিজেও জানেনা এইটা অসভ্যতা! বাচ্ছার পায়ের ধূলো থেকে পায়খানা সব শুদ্ধ, সেখানে সামান্য ঘ্যানঘ্যান আর কান্নাকাটিতে কেউ কম্লেইন করুক দেখি! ফলে বাচ্ছাটি যখন ট্রেনে একটু চলতে ফিরতে পারছে তার মায়ের দয়া হলে তখন থামছে,  নচেত কাঁদছে। প্রায় ছাব্বিশ সাতাশ ঘন্টা এই যন্ত্রনা সইতে হল। 

প্রায় একটা পঁচিশ নাগাদ আমরা ভুসাওয়ালে নামতে পেলাম। নেমেই প্রায় উড়ে উড়ে গিয়ে আদনানজির গাড়িতে। আদনানজি মোটাসোটা লাল দাড়ির ভালো লোক। এত দেরী হয়েছে তাও চলে যায়নি। রয়ে গেছে। সে আমায় সাঁইসাঁই করে নিয়ে পৌঁছে দিল অজন্তা। সেখানে তার এক বন্ধু দোকানদার, (অবশ্যই তার দোকানে যেন যাই ফেরার সময় সে কড়ারে) আমাদের অজন্তার গুহায় পৌঁছবার বাসে তুলে দিলো। প্রথম গুহায় পৌঁছলাম প্রায় উড়েই বলা যায়! আড়াই ঘন্টা মতো সময় আছে,  যতটা দেখা যায় আর কি। ঘন্টা তিনেক হলে ভালো হত, ঠিক আছে সব ভালো কী আর একসাথে মেলে! 

বহুবার ফাঁকি মেরে বহু ঠেকে শিখেছি পড়াশোনার বিকল্প নেই। জানতে গেলে ওইটি ছাড়া সত্যিই উপায় নেই। এবারে আমি পড়িনি অত কারন জানি বাকি দুজন ও ব্যপারে ডোবাবে না।বিশেষ করে ময়ূরাক্ষী হল একদম কপিবুক ভালো ছাত্রী। যাই হোক, ভাগ্যিস নারায়ণ সান্যাল ছিলেন। অজন্তার উপর এত ভালো কাজ করেছেন তার একটা অনুবাদ হওয়া দরকার। বই পড়ে জাতকের গল্প, কোন দেওয়ালে কোন ছবি আছে,  তার আইডিয়া ছিল।  তাছাড়া আরো একটা বই নামিয়েছিলাম বলেছি আগেই। ওই আবছায়া অন্ধকারে চোখ সয়ে যেতেই সে সব মনি মানিক্য চোখে পড়ে। হ্যাঁ অধিকাংশই আজ নষ্ট হয়ে গেছে কিন্তু আশ্চর্য হয়ে যেতে হয় কী জাদুতে কীভাবে অত বছর আগে অন্ধকার গুহায় এমন আঁকা এঁকে গেছিলেন শিল্পীরা! কালো রঙ দিয়ে আঁকা গুলো অব্দি স্পষ্ট অন্ধকারেও!! কেমন করে?! আমরা আবিষ্কারের মতো করে করে ছবি খুঁজছিলাম। ওই দেখ সিংহিকা রাক্ষসীর প্যানেলটা, ওইটাই মরনাহত রাজকুমারীটা না? ওইতো রাহুল, গোপা আর বুদ্ধদেবের ছবিটা, যেখানে বুদ্ধদেব ভিক্ষাপাত্র নিয়ে আলোকজ্জ্বল হয়ে আছেন। আচ্ছা মহাকপি জাতকের গল্পটা পাওয়া গেল না না? আর ওই তো অবোলোকিতেশ্বর!! আহাহা। সত্যিই করুণা ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী দক্ষ হাতে!! গুহা থেকে গুহায় ঘুরছি আর প্যানেলে প্যানেলে চোখ আটকে যাচ্ছে। কেমন করে চৈত্য এলো, বুদ্ধদেবের মূর্তি এলো, মহাযান সব স্পষ্ট হচ্ছে। মহাপরিনির্ব্বান এর বুদ্ধের মুখে কী অপরূপ প্রশান্তি স্রেফ ছেনি হাতুড়ি দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন!!আপনারা যদি কেউ কখনো অজন্তা যান অবশ্যই পড়ে যাবেন। না হলে স্রেফ "আহা কত সব আঁকা, সব নষ্ট হয়ে গেছে" বলেই চলে আসতে হবে।  নিজের মতো ভেবে নিলেও দোষ কিছু নেই, তবে আরেকটু আনন্দ পাবেন আর কি! 
এইসব পুরোনো জায়গায় গেলেই আমার বড় আশ্চর্য লাগে। আমি হাঁ করা,  মানছি, কিন্তু হাজার  দেড় হাজার বছর আগে এ জায়গাটা কেমন ছিল ভাবতে ইচ্ছে করে। হয়ত সাধনার একটা অংশ ছিল, নির্জন গুহায় অন্ধকারে রঙের মেলা বসানো, নাকি নির্বাসনে যাওয়া লোক বেঁচে থাকার জন্যই রঙ, ছেনি হাতুড়ি হাতে নিয়েছিল! আমাদের বিজ্ঞান বড় পিছিয়ে আছে, এইসব পাথর গাছ সূর্যের আলোয় কত কথা লুকিয়ে থাকে অথচ যোগাযোগের উপায় নেই! অজস্র মানুষের ভীড়ে স্রেফ খাই দাই বগল বাজাই এর জন্যই সব আয়ূ শেষ! পালটা যুক্তিতে বলাই যায় জেনে কী করবে, কথা বলালে নিজের মতো করেই শুনবে, নিজের ইন্টারপ্রিটেশানে, তার চেয়ে বাপু কল্পনাই করে নাও। কিন্তু তাও আমার বড় সাধ হয় গাছেদের সাথে পাথর মাটির সাথে কথা বলতে, হারিয়ে যাওয়া দৃশ্য দেখতে! 

আস্তে আস্তে সূর্য নেমে গেল, সোনার রঙে রাঙিয়ে দিল যাবার সময় চারদিক। আমরাও গুটি গুটি এগোলাম। নারায়ন সান্যাল এর বইতেই পড়েছিলাম, এক গাঁওবুড়ো, অজন্তার রিস্টোরেশনের সময় একদিন এক গুহায় বসেছিল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে। অনেকক্ষন বসে থাকার পর দেওয়ালে তাকিয়ে দেখে একটা ছবি, আরে এ ছবি তো সে এখনো আঁকেনি, এঁকে ফেলে সাহেবদের দেখাতে হবে তো। বাড়ি ফিরে সে আঁকে, সাহেবকে দেখায়। সাহেব অবাক হয়ে বলে এ ছবি পেলে কোথায়? এতো নষ্ট হয়ে গেছে! সত্যিই সেই গুহায় পরে ফিরে আর কোনো ছবিই পায়নি সে আর। নারায়ণ সান্যাল এর একটা ব্যখ্যা দিয়েছেন, আমাদের অবিশ্বাসী মন যাবার আগে বলেছে হয় এ শুনেছিল বাবা দাদার থেকে নয়তো,  কারোর থেকে। কিন্তু গুহায় পৌঁছে, অব্ধকারে চোখ সয়ে যাবার পর আমরাও অনেক ছবি খুঁজে পেয়েছি, যা প্রথমে ঢুকেই পাইনি। না সে ছবি নষ্ট হয়ে যায়নি, এমন না খালি আমরাই দেখেতে পেয়েছি। কিন্তু ওই যে চোখ সয়ে যাওয়ায় কালোর মধ্যেই কালো রঙ দিয়ে আঁকা দেহ খুঁজে পাওয়া এ যেন অলৌকিক।  আমার শিল্পীর চোখ, মন, সাধনা কিছুই নেই, তাতেও আমি যদি প্রায় আবছা হয়ে যাওয়া ছবি, প্রায় মিলিয়ে যাওয়া ছবি খুঁজে পাই কে বলতে পারে অজন্তার সেই হারিয়ে যাওয়া ছবির শিল্পী প্রকৃত এক শিল্পীকে দেখে তার শিল্প দেখিয়েছিল। কিংবা এক মুহূর্তের জন্য হয়ত অন্য কোনো ডাইমেনশনে চলে গেছিল, যেখানে কিছুই হারায় না?

Sunday, January 15, 2023

নবান্ন

একেকটা শব্দ থাকে বড় মোলায়েম হয়, হাত বোলানোর মতো নরম। আবার একেকটা শব্দ কেমন রেশ রেখে যাওয়ার মতো হয়। নতুন সুর,  নতুন শব্দ যারা তৈরী করতে পারেন তাদের আমার জাদুকর মনে হয়। বিপন্ন বিস্ময় শব্দটা যতবার শুনি কেমন যেন লাগে। বহু ব্যবহারে ধুলো পড়ে গেছে হয়ত কিংবা যারা কবি বা সাহিত্যিক বা ভালো পাঠক তাদের শুনে নির্ঘাত হাসি পাবে ওহ এতক্ষন ধরে এত কথা বলে সেই বিপন্ন বিস্ময়ের কথা বলা!  কিন্তু শব্দটা এত জ্যান্ত! নাকি শব্দবন্ধটা এত জ্যান্ত বলাটা ঠিক হত? ট্রেনে করে ফিরছিলাম, ধান কাটা হয়ে গেছে,পৌষ মাসের শেষ। নবান্ন কাল।মাঠের উপর একটা ধোঁয়ার স্থির রেখা চলে গেছে দিগন্ত জুড়ে, বিকেল ক্রমে সন্ধ্যের দিকে এগোচ্ছে। কারোর বিস্ময় নেই কেন? আশ্চর্য লাগে না, রোজ এক জিনিস এমন নতুন করে হয় কী করে। একবার ট্রেনের মধ্যে চোখ বোলালাম, ফোনের নিমগ্নতা, নয়ত ক্লান্ত চোখ বুজিয়ে ঘুম। বহুদূর থেকে আসছে এ ট্রেন তাই হয়ত আর বিস্ময় অবশিষ্ট নেই।তার মধ্যে দেরীতে চলছে,বাড়ি ফেরবার তাড়াটাই বেশী। বাড়ি তো যেতেই হবে,  আজ থেকে তিনদিন পিঠের উৎসব, মা ফোন করেছিল, পিঠে বানাচ্ছে, নলেন গুড় আর পিঠের সুবাস যেন এই ধান কাটা হয়ে যাওয়া মাঠের হাওয়ায় ভেসে আসছে। কিন্তু,রাস্তার আকর্ষনও তো কম নয়! ওই সূর্যটা আরেকটু লাল হল, আরো দূরে গেল, এখন স্রেফ লালচে আভা, তারও কত রকম শেড!তারপর ঝুপ করে অন্ধকার। অন্ধকারে চোখ সয়ে গেলেও আবছা গাছপালা দেখি। বিশেষ করে কী আছে বলতে বললে বলব দেখার কিছুই নেই, ফি হপ্তাতেই আমার এ পথ দিয়ে যাওয়া,  তবুও এই আবছায়া,  এই আলো আঁধারি, এই বিকেল, গোধুলিতে বড় অবাক ভাব জন্ম নেয়, কেমন যেন আশ্চর্য লাগে। আর পালাতে ইচ্ছে করে কোথাও।
পালানোর বদলে অবশ্য নলেন গুড়ের বাটিতেই ঝাঁপ মারি, হাসতেই পারো,  মোল্লার দৌড় ফেসবুকের স্ট্যাটাস বলে। কিন্তু এ বোধহয় তবু ভালো একটুও বিস্ময় না থাকার থেকে। সব অবাক হওয়া ফুরিয়ে গেলে আমার নতুন অন্নের আনন্দও যে ফুরিয়ে যাবে! 

Friday, December 30, 2022

ইয়ার এন্ড - ব্যলান্স শিট

বছর প্রায় শেষ হতেই চলল।মানে ক্যালেন্ডার ইয়ার। আমার জন্মদিনের বছর থেকে ধরলে সবে শুরু, ফিনাশিয়াল ইয়ার ধরলে ঢের দেরী,  আপিসের ইয়ার শেষ হওয়া ধরলেও সবে মাঝ বয়স। ক্যালেন্ডার ইয়ারের হিসবেই ভাবা যাক। মাঝে মাঝেই ভাবি জীবনের উদ্দেশ্য কী? ভেবে কূল পাইনা তেমন। ঋকানন্দ মহারাজের তো সাধনায় সিদ্ধি হয়নি এখনো, তাই বুঝেই পাইনা এই যে জীবন খানা পাওয়া গেছে এ নিয়ে ঠিক কী করার ছিল আমার?  সেদিন বন্ধুদের আড্ডায় সবাই আওয়াজ দিচ্ছিলো যখন,  আমার কথায় কথায় চল বেড়াতে যাই নিয়ে আমিও খুব বলছি তামাশা করে, "না না,  বেড়ানো আবার কেন! ওসব ভাল্লাগেনা, সারা সপ্তাহ কাজ করবো,  উইকেন্ডে শপিং মলে যাবো কিংবা কাছাকাছি সাজানো রিসর্টে, ফূর্তি করে মদ টদ খেয়ে ফিরে আসবো। বেড়ানো ওই বছরে একবার গেলাম কিংবা দু বছরে, অত বেড়ানো ভাল্লাগেনা"। লিখতে লিখতেই শিউরে উঠছিলাম! ওরে বাবারে,  এ কী লিখছি! এ জীবন বাঁচে  বহু লোকে, তাদের সেটা চয়েস  অবশ্যই কিন্তু এ জীবন আমি পেলে পাগল হয়ে যাবো। বেড়ানো মানে ঘর থেকে বেরিয়ে এলোমেলো রাস্তা ধরে হাঁটা কিংবা কাছাকাছি কোনো গাছেদের মাঝে কিংবা জলের কাছেতেও ধরি অবশ্য আমি। সুতরাং ব্যালেন্স শীটের খাতায় বেড়ানোটাই আগে ধরা যাক। তা হয়েছে, অনেকদিনের স্বপ্নের জায়গা দেখা হয়েছে এবারে।   উদয়পুর, চিতোর, মাউন্ট আবু, সামসিং, লাদাখ, রাঁচী, নেতারহাট আর অজন্তা ইলোরা, আওরাঙ্গাবাদ; ঐতিহাসিক জঙ্গল পাহাড় ।   এছাড়া খুচরো ঘোরাঘুরি গুলোকে ওড়ালে হবে না, ওরা আমার রোজের মাছভাজা, না পেলে প্রান আনচান করে। ওই যে আমাদের আশ্চর্য পিকনিকটা, কিংবা,  শীতের কোলকাতা ঘোরা, কিংবা রাত জেগে বন্ধুর পাড়ায় ঠাকুর দেখা, কিংবা ভ্যাপসা গরমে দু উজবুকের ড্যামের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা, বটগাছের তলায় বসে গরম কচুরিতে কামড়, বর্ষার জঙ্গলে ঢাকা পাহাড় উঠতে গিয়ে ঝিঁঝির ডাক, বর্ষায় ভেজা আমলামেথি নামের গ্রামটা, অচেনা আশ্রমে হুট করে পেয়ে যাওয়া মধ্যাহ্ন ভোজন, গ্রামের রথের মেলায় বৃষ্টিতে ভেজা...  কম নয় কোনোটাই। 


আমার এক হাফ বন্ধু,  মানে পরিচিতের একটু বেশী কিন্তু বন্ধু মানে যদি বিপদের দিনে পাশে পাবে ভাবো তেমন না ,    তা সচারাচর বেশীরভাগ পরিচিতই তাইই হয় তবু আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কিছু উজ্জ্বল মুহূর্ত এদের জন্যেও তো মেলে তাই এ নিয়ে অভিযোগ নেই। তা যা বলছিলাম, সে ভারী মনঃকষ্টে থাকে, তার জীবনই এতো জটিল কেন, এত সমস্যা তারই কেন হয়। যেমন অনেকেরই আমাদের মনে হয়, ইনফ্যাক্ট হয়ত আম্বানির ব্যাটারও হয়। আসলে চোখের সামনে হাতের পাতা ধরলেও তা পাহাড়প্রমান হয়ে দাঁড়ায় কিনা, অমন মনে হয়।  আমারই কত্ত সময় মনে হয়েছে যে জিনিসটা লোকে না ভাবতেই পায় তার জন্য এত দৌড় কেন করতে হয়, কেন আমার বেলাতেই টিকিট কাউন্টার বন্ধ হয়ে যায়, আমাকেই কেন একটা কাজে চারবার দৌড়তে হয়? রাগ হয়, মন খারাপ হয়, তারপর তর্ক যখন শান্ত হয়,  আঁচরদাগা বন্ধ হলে দেখি আরে খালি কোথায় হে, ঝোলা তো ভরেইছে দিব্যি। হ্যাঁ সবার ঝোলা কী আর এক জিনিসে ভরে, চেয়ে দেখ রে ব্যাটা তোর ঝোলায় যা ভরেছিস তা দাম দিলেও তো মেলে না সব সময়! তা ঝোলা বলতেই মনে হল,  মানুষের মন এক চায় করে এক এমন দলেই পড়ি আমি। ইচ্ছে আমার ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে যাই, দু চার দানা যা জোটে তাই নিয়েই চলুক দিন পাহাড়ে, নদীর ধারে, রাস্তায় কিন্তু  করার বেলায় দেখো! ঝোলা নিয়ে তাঁবু গেড়ে বসে গেলে।  আরে ও কী তোমার সয়! এক জায়গায় অনেকদিন রয়ে গেলে ঘাস,  জল সব যে পুরোনো হয়ে যাবে! চেনা জলে তেষ্টা মিটবে,প্রাণ জুড়োবে কি? সুতরাং এ বছর ঝোলা তুলে নেওয়া হল। নতুন চলা সব সময়েই অনিশ্চিত,  আকর্ষক একটু সন্দেহাকুল, তাও চলা তো বন্ধ করা যায় না।


সে অর্থে প্রতি বছরই কিন্তু কিছু কিছু পেয়ে থাকি বছরের থেকে। কোনো বিক্রিয়ার শেষ কী জানতে হলে হাবিজাবি কাজ করে যেতেই হয় যেতেই হয়, নয়ত অনন্ত অপেক্ষা নিয়ে বসে থাকতে হয় কী রেজাল্ট আসবে? প্রসেস চলাকালীন মনে হয় ধুস শালা এ কী করে চলেছি,  তারপর এক সময় জিনিসটা শেষ হলে একবার ড্রোন ভিউতে দেখলে বোঝা যায় অতটা খারাপও ছিল না পুরো ব্যপারটা।  জীবন কখন থেমে যাবে কে জানতে পারে, কখন কী দেবে তাই বা কে বলতে পারে কিন্তু প্রতিটা গবেষক, প্রতিটা ঐতিহাসিক প্রতিটা পথিক জানে শুরুর আগের সেই অকূলপাথার ভাব, পথের শ্রম  কিন্তু  পার হয়ে গেলে ওই পথটাই ভরসা জোগায়, আনন্দ দেয়....নতুন বছর আসুক সব অনিশ্চয়তা সব ভরসা নিয়ে।এ বছরটার মুচকি হেসে বলছে একবার তাকাও হে শুরুটা খুব নিশ্চিন্তের ছিল না, কিন্তু তাও তোমার যাত্রাকেমন হল বলো? ধন্যবাদ জানাই হে, অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।


Sunday, December 18, 2022

প্রি-ওয়েডিং

কাল চার বন্ধু শীতের রোদ মেখে ময়দানে আড্ডা মারছিলাম। এক বন্ধু মাফিন বানিয়ে এনেছিল, মাফিন আর কফি খাওয়া শেষ করে উঠবো ভাবছি, দেখি ফ্রি তে শো দেখা যাচ্ছে। প্রি ওয়েডিং করবে দুজন। বৈদিক অবৈদিক, নৈতিক,  বামাচারী,  দক্ষিণাচারী, ঐতিহাসিক, অনৈতিহাসিক কোনো বিয়ে দেখতেই আমার ভাল্লাগে না। যারা বিয়ে করে তাদেরকে অবশ্য খুব ভাল্লাগে কারন তারা বিয়ে করে বলে চাট্টি ভালো খাওয়া যায়। ভালো কাবাব কিংবা ফিশফ্রাই কিংবা পাতুরি কিংবা মাটন আর পছন্দসই মিষ্টি পেলেই হল আমার।  কিন্তু  এই প্রি ওয়েডিং দেখতে সেই লাগে!  আহাহা একজন লাল মশাল জ্বালাবে,  একজন বোঁ করে ঘুরবে আর এই থার্মোকলের থালা ভরা ময়দানে ব্লেজার আর গাউন পরে তারা হাসিমুখে পোজ দেবে বার কুড়ি একই ভাবে। 

ব্যাস প্রিওয়েডিং হচ্ছে দেখেই থেবড়ে বসে পড়েছি আবার। আমি আবার ব্যালকনি সীট পেয়েছি। মানে আমার সোজাসুজিইই হচ্ছে ঘটনাটা। একগোছা সূর্যমুখী ফুল নিয়ে হবু বর বউ হেঁটে যেতে যেতে ফস করে পিছনে ছুঁড়ে ফেলবে এই হল বিষয়। এবার কেন ফেলবে তা আমি জানিনা হয়ত দেখতে ভালো লাগে সিনেমা হয়ে আসবে যখন। কিন্তু মুশকিল হল ময়দানের হাওয়া তো তা জানে না, ফলে ফুল আর সোজাসুজি পরেইনা,  কোনাচে হয়ে যায়, তাতে ফটোগ্রাফার খুব উত্তেজিত এরকম করে করে সূর্যমুখী ফুল যখন ভাবছে," আমি কেন জন্ম নিয়েছিলাম ভাই! আর যদি নিয়েইছিলাম এদের বিয়ে হবারই কী দরকারছিল, কেনই বা আমাকেই চুজ করল! গোলাপ দিয়েই কাজ সারতো না হয়। শালার দল!" 
সে সময় আমরাও বোর হয়ে বিয়ের ভিডিওর গান নিয়ে আলোচনা করছিলুম। মানে সে কী সব ভয়াবহ ক্রিয়েটিভিটি ভাই! বন্ধুদের একজনের বিয়ে হবার সময় গান দিয়েছে, "যদি আরো কারে ভালোবাসো, যদি আরো ফিরে নাহি আসো, তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও, আমি যত দুঃখ পাই গো"!!! মানে সত্যি কী ভেবে এটা দিয়েছিল ফটোগ্রাফার টিম?! বিয়ে হচ্ছে না পরকীয়ার পারমিশন এগ্রিমেন্ট হচ্ছে হ্যাঁ??! তার বিয়েতেই,  মেয়ে বাড়ি থেকে যাবার সময় গান দিয়েছিল, " ভরা থাক স্মৃতি সুধায়...", মরে যাচ্ছে না রে ভাই,  বিয়ে করে ফূর্তিতে কাটাতে যাচ্ছে!! তবু ভালো সমুখে শান্তিরও পারাবার দেয়নি! তারপর শুনি, একজনের বিয়েতে নাকি একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি দিয়েছিল। "হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী" এর সাথে মালাবদলের এরকম মেলানো দেখলে, ক্ষুদিরাম শোকেই মারা যেতেন।
   আরো একটা শোনা গেল, লীলাবালি গান দিয়েছে এক বন্ধুর  বিয়েতে, তবে,  ছেলেটার যখন গায়ে গামছা জড়িয়ে গায়ে হলুদ হচ্ছে, সেময়, ছেলেকে ফোকাস করে,  গানবাজছে, "ভর যুবতী সই মোর..." আর তারই বিয়েতে, রিসেপশনে, তুমিই আমার সিরিজ প্রেমের শেষটা ছিল, তবে সেই লাইনে ক্যামেরার ফোকাস ছিল, ছেলেটার এক্সের উপর! ক্যামেরাম্যান বেঁচে ছিল এটাই যথেষ্ট!

যাইহোক এসব ফক্কিগিরি করতে করতে এতো জোরে হাসাহাসি করেছি, হবু বর বউ এর ফোকাস নষ্ট ক্যামেরাম্যান বিরক্ত, ফুল ফেলে তারা অন্যদিকে রওনা দিল।আর তাদের অভিশাপেই কিনা কে জানে, এ সিজনের আমার একমাত্র বিয়ের  নেমতন্ন আজ এদিকে ফাইনাল খেলা...
স্ট্রাগল করা কাকে বলে দেখে যাক প্লেয়াররা... হুহ

Wednesday, November 30, 2022

কোনো একদিন...

অক্টোবর ন তারিখে লাস্ট পোস্ট দিয়েছি এখানে। তারপর এক মাসেরও বেশী সময় কেটে গেছে,  আমার হাড়েও পঁয়ত্রিশ হেমন্তের পাতা পড়েছে। মাঝে কিছু খুচরো লিখেছি বটে কিন্তু তা এখানে দেওয়া হয়নি। অথচ এখানেই দেওয়া উচিত ছিল। ব্লগ শুরু করেছিলাম এরকমই এক পাতা ঝরা সময়ে। বিদেশে থাকতে হাতে লম্বা সময় থাকতো, সেটাই কথা না শুধু,  নতুন জিনিস দেখতে দেখতে লিখতে ভেবেছিলাম কোথাও আমারও বলার আছে। তারপর আর কি, লম্বা সময় পেরিয়ে গেল ফেসবুক এসে হানা দিলো, ব্লগে পোস্ট কম হল কিন্তু তারপর একদিন ফেসবুকটাও অত্যধিক নেশা বলে দুম করে ছাড়লুম। তাতে হল কি, ব্লগও বন্ধ, ফেসবুকও বন্ধ লেখাও বন্ধ। এমন না আমি না লিখলে সাহিত্য জগৎ থমকে যাচ্ছে,  চারদিকে হাহাকার পড়ে যাচ্ছে এসব কিচ্ছু না কিন্তু নিজেকে ভালো রাখতে গেলে মশাই নিজেকে দু চারটে মিথ্যে বলতে হয়, তারমধ্যে, এই ব্লগ চালিয়ে যাবার টোটকা হিসেবে দু চারটে নির্দোষ মিথ্যেও ঢুকে যায় আর কি। 

বাজে বকায় যদি নোবেল থাকতো অনেক বাঙালীই তার দাবীদার হতো (অন্য প্রদেশ বা দেশের লোকের সাথে মিশিনি তো তেমন জানিনা তাই),  তো সেই বাঙালীর মধ্যেও আমিই বেশী দাবীদার হতাম এ আমি জানি। এতক্ষন ধরে চাট্টি বাজেই বকেই চলেছি দেখছি। যাই হোক, আজকাল বেশীরভাগ সময় গাছপালায় ঘেরা মফস্বলে  , ঘর থেকে আপিস হয়ে এ সুবিধে হয়েছে। আমার কাজের টেবিলটা জানালার ঠিক পাশেই, চোখ মেললে একটা তরুণ শালগাছ, তার পাশেই একটা নিম, আর তার ওপারে একটা ঝামড়ি মতো গাছ, ভালো দেখা যায় না কিন্তু হনুমানের দল প্রায়ই ওই গাছটায় আসে,  ডাল পাতা ভাঙে, লাফালাফি করে ফের চলে যায়। শাল গাছের এ দিকটা ইলেক্ট্রিকের তার গেছে, মাঝে সাঝে দোয়েল,  বুলবুলি ফিঙে আসে। কাঠবিড়ালিও আসে তবে আজকাল কম দেখছি। আমি চিরকাল অমনোযোগী,  বয়স হওয়ায় তা কমেছে এমন না, আমার মন ওই জানলার বাইরেই সারাদিন ঘুরফির করতে থাকে। একটু বেলায়, যখন বাড়ি ফাঁকা হয়ে যায়, পায়রাগুলো বকম বকম করে সারাদিন ভরিয়ে রাখে। কীসের এত বক্তব্য কে জানে! ওদের জরুরী আলোচনার মাঝেই একটা দুটো শুকনো পাতা খসে পড়ে। শীত প্রায় সমাগত। হেমন্তের শেষের এই সময়টা বড় উচাটনের। আমার ভালো লাগেনা কাজে মন দিতে, নিশির ডাকের মতো পথ আমায় ডাকে। 

শনিবারের দুপুরে বেরিয়ে পড়া গেল। নদীর ধারে যেতেই ইচ্ছে করছে খুব, তা আমারও টেলিপ্যাথির যোগ কম নয়, কোথায় যাবো কোথায় যাবো করতে করতেই, দেউলের সন্ধার জানালো ময়ূরাক্ষী। অজয় নদীর পাশেই। তাহলে চল পিকনিক করি। পিকনিক? দুজনে?! 
হওয়ালেই হয়! ছোট বয়স থেকেই বন্ধু বান্ধব কম আমার, আসর জমানো লোক আমি নই কোনোকালেই। জীবন আমায় শিখিয়ে দিয়েছে আনন্দের উপকরণ এমনিই চারদিকে ছড়িয়ে আছে, দল বলো, কোনো বিশেষ ব্যক্তি বলো, মিসফিট  ফিল করা, অপমানিত হওয়া,  উপেক্ষিত বোধ করা কিংবা একেবারে মধ্যমনি হওয়া এসবই পার্ট অফ লাইফ হয়ত, কিন্তু এরাই লাইফ এমন নয়। জীবন ঠিক কী তা বুঝিনি বটে কিন্তু কেমন যেন টের পাই এসবই আলগা পাথর, এসবের বাইরে একটা কিছু । তাই পিকনিক করতে ইচ্ছে করলে করো, একা একাই করতে পারো যদি চাও তো। শুধু ওই ইচ্ছেটুকুই সব নয় অবশ্য, খানিক উদ্যমও লাগে। তা বেড়াতে বেরোলে আমার উদ্যোম খানিক বাড়ে বটে। সৌভাগ্যক্রমে,  ময়ূরাক্ষীও আনন্দ কুড়োতে জানে। সুতরাং একটা ফ্লাস্কে গরম জল ভরা গেল, চা এর দোকান পেলেই ফেলে দিয়ে চা ভরা হবে। ফ্রিজ কুড়িয়ে দুটো কমলালেবু মিলল। তা পিকনিক করবো নদীর চরে একটা চেককাটা চাদর নেই? দেখা গেল নেই,  যেমন হয় আর কি অগোছালো মধ্যবিত্ত জীবনে। কিন্তু আমরা দমি নাকি! একটা পর্দা না তোষকের কাপড় ছিল রাখা, তাকেই নেওয়া হল। কেক তো মাস্ট, সেও ওই চায়ের দোকান থেকেই কেনা হবে খন। একটু স্যান্ডউইচ থাকতে হত বটে, কিন্তু আগের দিন আমরা ফ্রিজ ফাঁকা করে খেয়ে নিয়েছি,  তাছাড়া স্যান্ডউইচ বানাবার সময়েও পাওয়া যায়নি।আর গান শুনবো না আমরা? আমাদের দুজনের গানের গলা অসাধারণ সে কথা না, লোকসমক্ষে গাওয়া যায়না বলে আমরা আড়ালে গেয়েই থাকি কিন্তু পিকনিকে একটু অন্যদেরও সুযোগ দেওয়া যাক নাকি? সুতরাং একটা ব্লুটুথ নেওয়া হল। 

ব্যাস আর কি, দুপুরবেলায় দুজনে চল্লুম। গুগলম্যাপকে পুরো ভরসা না করলেও এটা মোটামুটি জানা যাচ্ছে ওই মোটামুটি পঞ্চান্ন ছাপ্পান্ন কিলোমিটার মোটে। পিকনিকের মূল নিয়ম কী জানা আছে তো? কিছু প্ল্যান অনুযায়ী হবে কিছু গোলমাল হবে। আধুনিক পিকনিকে অবশ্য টাইমে টাইমে লুচি তরকারি মিষ্টি,  চিকেন পকোড়া, এলাহি লাঞ্চ সব চলে আসে কিন্তু ওগুলো সব নকল পিকনিক। যাইহোক, আমরা অনেকদিন পর এরকম বেরোচ্ছি তাতেই আনন্দে দশ কিলোমিটার মতো যেতেই বেজায় খিদে পেয়ে গেল। সুতরাং হারাধনের দুটো কমলালেবুর একটা উধাও হয়ে গেল নিমেষে। আরো খানিক গিয়ে গুগল একটা মোড় ঘুরতে বলছে, কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি, গুগলকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা চলেনা। তাই একটা চায়ের দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ঠিক তাই, এ মোড় আমাদের জন্য না, আমাদের যাত্রার মোড় ঘুরবে আরেকটু পর। 

মুচিপাড়া ছাড়িয়ে খানিক এগোনোর পর আর পারা গেল না। এই দোকানেই চা খেয়ে নিই একটু নাকি? সুতরাং চা, খাস্তা কচুরি, বিস্কুট, কেক সহ আর্ধেক পিকনিকের খাওয়া ওখানেই হয়ে গেল। কটা কেক অবশ্য ব্যাগে পোরা হল, কিন্তু ফ্লাস্কে চা ভরতে গিয়ে বোঝা গেল, দুজনের দু ভাঁড় বা চার ভাঁড় চা ওই প্রমান সাইজের ফ্লাস্কে ভরলে সরবত হিসেবেই খাওয়া যাবে পৌঁছে!  নিজেদের আশ্বাস দিলাম খুব, বেশ তো পৌঁছে কিছু পেয়ে যাবো, ওখানে ভরে নেব খন। ভরদুপুর, নভেম্বরের শেষ, এখনো ধান কাটা চলছে কত জায়গায়। রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে। দোকানপাট বন্ধ করে খেতে গেছে হয়ত সব। একটা ইঁটভাটায় কটা লোক কাজ করছে। কয়েকজন রাজমিস্ত্রী প্লাস্টার করছে একটা ঘরে। বেলা গড়ানো রোদে, দেউল পৌঁছলাম। আর্কিওলজিকাল ডিপার্টমেন্টের একটা সাইনবোর্ড টাঙানো আছে, ইছাই ঘোষ নামে কেউ একজন এ মন্দির বানিয়েছিল, সপ্তদশ শতকের সময়কালে। পাতলা ইঁটের কাজ। পরে কারা যেন একটা শিবলিঙ্গ পুঁতে দিয়ে গেছে। কটা ছোট ছোট ছাগলছানা আরাম করে ঘাস খাচ্ছে চারপাশে।ইছাই ঘোষ কবেই ধূলো মাটি হাওয়া হয়ে গেছে,  ইঁট গুলোও মনে রেলহেছে কিনা কে জানে!  চল চল এখানেই পাটি পেতে বসা যাক নাকি? ফের ভাবি, তবু পরিষ্কার আছে, থাক, আমাদের দেখে আর কেউ যদি বসে আর নোংরা করে?  নাই বা আর বসলাম!

পাশেই একটা বটগাছের নীচে একটা ছোট্ট চালায় দোকানঘর। একটা ছোট মেয়ে সে দোকান চালাচ্ছে।  চা বিস্কুট কেক,  যেমন হয় আর কি! তার আবার  ক্ষুদে ক্ষুদে আত্মীয় ভাই বোন এসেছে তারাও দোকানদারি করতে এসেছে! অজয়ের জল একটু দূরে। পাড় ধরে হেঁটে যাবার আগে রাস্তা ধরে হাঁটি, একদিকে জঙ্গল একদিকে ক্ষেত। সূর্যের আলোয় পাতায় পড়ে ভারী সুন্দর একটা আলোছায়া মতো করেছে। হাঁ করে দেখি, কী দেখি বোঝাতে পারবোনা, কিন্তু এই রাস্তা, শালের পাতা, রোদ সব মিলিয়ে বড় ভালো লাগে। ধান কাটতে কাটতে মাঝে বিশ্রাম নিচ্ছে একদল। থোকা থোকা কী যেন ফুল ফুটে আছে রাস্তার ধারে। কী ফুল জানিনা, নাম দিয়েই বা কী হবে! আরো খানিক এগোই। অজয়ের পাড়েই একটা রিসর্ট মতো করার চেষ্টা হয়েছিল, চলেনি মনে হয়।আপাতত আশেপাশে কেউ কোথাও নেই, সামনে রাশিরাশি কাশ ফুল ছাড়া। 

নদীর চর ধরে হাঁটি, বালিতে বসে থাকি।ভুলে যাই আমাদের পাটি পেতে বসার ছিল, গান শোনার সরঞ্জাম ছিল, চা ঢেলে খাবার ফ্লাস্ক ছিল। প্রকৃতির মধ্যে একবার ডুব দিলে সবই কেমন যেন এক্সট্রা হয়ে যায়। খিদে টের পেলে, পকেট থেকে চেপ্টে যাওয়া কেক বের করে খাই দুজনে। দূরে সূর্য আস্তে আস্তে কোন এক ইছাই ঘোষের বানিয়ে যাওয়া মন্দিরের পিছনের নামতে থাকে। একপাশে বর্ধমান একপাশে বীরভূম আমরা অজয়ের চরে বসে থাকি মাঝবরাবর। আমাদের বড় হওয়া হয়না, তৃণ হওয়াও না,মাঝ বরাবরই কেটে যায় জীবন। এক এক করে মেয়ে পুরুষের দল নদী পার হয়ে আসে, গরুকে হ্যাট হ্যাট করে তাড়িয়ে ঘরে নিয়ে চলে।  সূর্য ক্রমে রসালো লাল টমেটোর মতো হয়ে যায় আমরাও গরুগুলোর মতো বাড়ির পথ ধরি।

ফিরতি পথে বিনবিন করি, আমাদের তো পিকনিক হল না? হল না বুঝি? ওই বট গাছের নীচে,  চালায় বসে চা বিস্কুট খাওয়া, বালিতে বসে চ্যাপ্টা কেক, গাড়িতে বসে কমলালেবু,  কমটা কি? আচ্ছা বেশ তো বাকিটা এই শালের জঙ্গলের মাঝের ওই হোটেলটায় হবেনা? হোটেল মানে নামের ওজন আধহাত, আসলে সে সস্তায় খাবারের দোকান। ভাত চাও তো ভাত, মুড়ি চপ চাও তো তাই। দোকানি তখন পাঁউরুটির পেটের মধ্যে মশলামাখা পুর ভরে বেসনে দিয়ে ভাজবে বলে তৈয়ার হচ্ছে। কাঠের আগুন একটু উস্কে দিয়ে চপ ছেড়ে দিলো আমাদের জন্য। তারপর শালপাতায় মুড়ি চপ পিঁয়াজ দিয়ে মেখে,  আর আলুর পুরভরা পাঁউরুটির স্যান্ডউইচ (বেসনে না ভেজেই) কাঠের উনুনের পাশে প্লাস্টিকের টেবিলে বসে তোফা লাঞ্চ হয়ে গেল। পিকনিকের লাঞ্চ খানিক দেরী করেই হতে হয়।ওইই নিয়ম।


একটা পরিপূর্ণ হাতের  মুঠোয় ধরতে পারা নরম দিনের মতো আরামের দিনের শেষে উপহার অব্দি মিলেছিল। যে গাছের নীচে গাড়ি দাঁড় করিয়েছিলাম, সেটা শিউলি গাছ ছিল, কোত্থাও কিচ্ছু নেই, স্রেফ একটা শিউলি ফুল সাইড মিররে এসে পড়েছিল৷ পথের দেবতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফেরার পথে মফস্বলি সার্কাসে ঢুঁ মারার ইচ্ছে ছিল। শুনেছিলাম, কুকুর ছাগল এসেছে নাকি! ছাগলে ট্রাপিজ দেখাচ্ছে এ বড় আশ্চর্য জিনিস বটে। কিন্ত শেষ অব্দি অন্যদিনের জন্য তা তোলা আছে। এক দিনে এর বেশী পেলে যদি লোভ হয়ে যায়, যদি মনে হয় এ আর এমন কী দিন গেল? তার চেয়ে বরং আজ দিনটা জঙ্গুলে বুনো গন্ধ, ধুলোর গন্ধ, জুতোয় ঢুকে যাওয়া নদীর বালি, বট গাছের নীচের চায়ের দোকানটা আর রাস্তাটার জন্য তোলা থাক, শিউলি ফুলটা সমেত।

Sunday, October 9, 2022

পুজোয়

হনহন করে হাঁটছিলাম, একটু আগে চড়কতলা পেরিয়ে এসেছি। একটা মুদির দোকানে সস্তার কিছু জিনিস, অল্প ভীড় পেরিয়ে বাঁয়ে ঢুকতেই বাগদি পাড়া। এখানে   বাগদি পাড়া, কুমোর পাড়া,  বাউন পাড়া,  মুসলমান পাড়া,এসব বিস্তর আছে। বাগদি পাড়াটা গরীব মানুষের বাস বোঝাই যায়। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা বা ওরকম কিছুতে তৈরী হওয়া সংকীর্ণ জায়গায় পলেস্তরা ছাড়া বাড়ি, দু বাড়ির মাঝের সরু রাস্তায় বেঁধে রাখা ছাগল।আজ নবমী। নবমী মানেই সবাই দল বেঁধে স্রেফ ঠাকুর মন্ডপে বসে থাকে বা আড্ডা দিয়ে কাটায় এই কল্পনাটাও শহুরে মধ্যবিত্তের। একটা লোক ঘর ছাইছে, গরুকে খেতে দিচ্ছে একজন। বাগদিপাড়ার পর আবার রাস্তা নেই, মাঠ আর মজা পুকুর৷ মালিক পাড়া মাঠ উন্নয়ন প্রকল্প বলে একটা বোর্ড টাঙানো। লোকজন তেমন নেই, মজা পুকুরেই একটা বউ বাসন মাজছিল, বাঁশবাগানের নীচ দিয়ে রাস্তা দেখিয়ে দিল। বৃষ্টি হয়েছে কালকেও,রাস্তা ঘাট কাদা। কোথায় যাচ্ছি কে জানে!  অনেক দূর থেকে মাইকে মন্ত্রের আওয়াজ ভেসে আসছে,নবমীর হোমেরর মন্ত্র। মাঠে এখন ধানগাছের চারা, সবুজে সবুজ হয়ে আছে। একটা দুটো ক্ষেতে, পটল বেগুন হয়েছে। বেড়া আর জাল দিয়ে ঘেরা সেগুলো। খানিক বাদে আর যাবার রাস্তা নেই, মানে আছে হয়ত,মাঠ দিয়ে দিয়ে, সে আলপথ জলে কাদায় আমি চিনতেও পারবো না। 

আবার অন্য রাস্তা নিই একটু পিছিয়ে। চলতে গেলে এই যে নতুন রাস্তা দেখা হয় কিছু রাস্তা ভুল হয় কিছু রাস্তা ঠিক, এ বড় মজার। এর স্বাদ একবার পেলে না চলে থাকা যায়না। এবারে একটা ভালো রাস্তায় পরেছি, এ জায়গাটার নাম খ্যামপুর। আজব নামটা! শ্যামপুরের অপভ্রংশ কি? একজন আমায় দেখে চিনতে পেরে জিজ্ঞেস করলো কোথায় যাচ্ছি, আমি নিজেও কি আর জানি কোথায় যাচ্ছি! সে আমায় বাড়ির দিক দেখালো, আমি তো বাড়ি যাবো না, কোথায় যাবো সেও বলতে পারছিনা, এই হেঁটে আসি একটু বলে কোনোরকমে এগিয়ে যাই। 

কালভার্ট পেরিয়ে বাঁয়ে খাল রেখে এগোচ্ছি। আচ্ছা আশ্বিন মাসে ধানের চারা আরেকটু বড় হবার কথা না? কার্তিকেই তো ধান পাকে নাকি? জীবনানন্দের কবিতায় কার্তিকে ধানের কথা ছিল না? কবিতা অবশ্য পড়িইনি কিছু তেমন। কিই বা করেছি, কবিতা বুঝতে পারি না, রাগ রাগিনী চিনিনা, গাছ, পাখি,  পোকা ফুল, শস্য কিচ্ছু চিনিনা। প্রকৃতিকে স্রেফ হিংস্রে থাবায় ধরেছি, তার কোন তারে কোন সুর কিছুই ধরতে পারিনি। জোর করে সম্ভোগে যে সুখ থাকেনা ছোটবেলা থেকে মানব জীবনের মূল পাঠ হওয়া বড় দরকার ছিল। ভালোবেসে জয় করতে শিখলে অনেক দুর্দশা ঘুচে যেত!

চলতে চলতে আবার একটা কোন পাড়ায় ঢুকেছি। যদিও রাস্তা চওড়া এখান৷  আমাদের এক চাষীর সাথে দেখা, নারকেল গাছের পাতা কাটছিল ছেলের সাথে মিলে। পাশেই তার ঘরে তার বউটি রান্না করছে। দূরে শীতলাতলা থেকে খুব ঢাকের আওয়াজ আসছে। এর নাম কী যেন? কাশী না? আমি ভালো চিনিনা, ও  চেনে খুব। ' বাড়ি এসবেনে দাদা, বসে জল টুক খেয়ে যাও।' আমি কারো বাড়ি যেতে ভারী অস্বস্তি বোধ করি। গরীব বড়লোক, আত্মীয়, বন্ধু ব্যপার না, আমার ভারী সংকোচ হয়। তাই কোনো মতে সে ডাক সরিয়ে এগোই। আসার আগে, ' আসবেনে এখন তাহলে?  ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছ বুঝি, তাহলে সামনের শীতলাতলায় খুব বড় পুজো হয় দেখে এসোগে যাও", বলে আগিয়ে দিলো খানিক।

শীতলাতলার পুজোর ঢাকের আওয়াজ, থেমে থেমে পড়া মন্ত্রের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম খুব। খুব সেজে গুজে একটা ছোট্ট নেয়ে চলেছে আমার সামনে সামনে। একটা ছোট ছেলেও সাইকেল বাগিয়ে চলেছে ওইদিকেই। পিছন থেকে তার মায়ের ডাক ভেসে আসছে, "দেবুউউ কোথায় যাচ্ছিস খেয়ে যা আগে"। পথের ধারে টিউবওয়েলে ন্যাংটা খোকা চান করছে, দু চারজন বাঁশের মাচায় বসে তাস খেলছে। ঠাকুরপুজো ডাঁয়ে রেখে ফের এগোই। আবার ভুল করে মাঠের মধ্যে খানে এসে পড়েছি, আল পথে পা টিপে টিপে এগোচ্ছি, গ্যাঙোর গ্যাঙোর করে ব্যাঙ ডাকছি ধান জমি থেকে, এখানে কোনো মন্ত্র আওয়াজ কিচ্ছু নেই, স্রেফ, ঝিঁঝিঁ্র আওয়াজ আর ব্যাঙের ডাক। দিনেরবেলা ঝিঁঝিঁ শুনলে ভারী অবাক মতো লাগে না? এইবার রাস্তাটা চেনা,  একটা পুকুরের পৈঠায় এক বুড়ো একা একা বসে, এর উৎসব নেই। ভীমতলায় কুমারী পুজোর পর তাকে নিয়ে বেরিয়েছে। ছোট্ট মেয়েটা খুব সেজেগুজে অস্বস্তি আর অবাক ভাব নিয়ে বসে আছে ভ্যানে, পিছনে পিছনে একগাদা মেয়ে আর বাচ্ছা নেচে-কুঁদে চলেছে। পরিচিত পুরোনো হিন্দি গানের সুর বাজাচ্ছে একটা লোক আরেকটা ভ্যানে। 


নবমীর বিকেলে খবর পেলাম এক বৌদি মারা গেছে। লড়াই চলছিলই, কষ্ট লাঘব হল আর কি। ব্যাস অশৌচ শুরু হয়ে গেল আমাদের। সে অর্থে শোক তো আমায় বা আমাদের ছোঁয়নি। তাহলে এ অশৌচের মানেই বা কি! আমি মানিনা, মানছিও না আলাদা কথা কিন্তু লোকে যুক্তি দিয়ে ভাবে না কেন একবারও? অবশ্য ঢাক বাজিয়ে পুজো করা, উল্লাস করা দৃষ্টিকটু হত, কিন্তু প্রেতকে পিন্ড দেওয়া হয় বলে একদিন তিল কলা খাওয়া যাবে না এর মানে কি! আমি প্রেত হলে যে আমায় অমন পিন্ড দেবে তাকে ঠাস করে চড় মেরে বলব ইয়ার্কি মারা জায়গা পাস না হতভাগা! ডেকে এনে তিল, কলা দিচ্ছিস!! তাছাড়া প্রেত বলা মানেই মৃতকে অসম্মান করা হয় না?! প্রেত হয়ে তিল কলার লোভে ঘুরছে কেউ এ কেমন কথা! 


পাশের ক্লাবের  ছেলেদের ডেকে ভাসান দেওয়া হলেও, দুঃখটা একই রকম লাগে। প্রতিমার মুখটা আস্তে আস্তে ডুবে যায় জলে,  আর অকারণ মনখারাপ এসে থাবা মারে। ফাঁকা মন্ডপে একা একা আমষট্ বসে বসে পাহারা দেয়, অপেক্ষা করে কি?

বিজয়ার শুভেচ্ছা রইলো। ভালো হোক,শুভ হোক। মিষ্টি  খেয়ে জিভ এলিয়ে গেলে, জল খেয়ে ফের মিষ্টি খাওয়া হোক।



Thursday, September 1, 2022

পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা (৫)

লাদাখের গল্পটা বলব কোনো এক সময়।ব্যপারটা হয়েছিল লাদাখ থেকে ফেরার পর৷ দুচোখে খালি ওই নীল আকাশ,বিস্তীর্ন মালভূমি পাহাড় আর ছোট ছোট গ্রাম, শান্ত জীবন থেকে ফেরার পর পটল বেগুন ক্রেডিট ডেবিটের জীবনে থিতু হওয়া যাচ্ছিল না কিছুতেই। নেমতন্ন খেতে যাচ্ছি, অফিস যাচ্ছি কিছুতেই স্বাদ পাচ্ছিনা যেন। তারপর আমাদের মফস্বলের নিম, শিমূল গাছে ঘেরা ঘরে গিয়ে খানিক বসা গেল। এক জায়গার ফেলে আসা বন্ধুদের ভুলতে বালক যেমন ক্রমে নতুন জায়গায় আবিষ্কারের নেশায় মাতে তেমনই আমিও বর্ষার ছোটনাগপুর এর বর্ষায় সবুজ হওয়া প্রকৃতিতে ডুব দিচ্ছিলাম। মানে আলাদা করে কিছু করতে হয়নি, চারপাশে সবুজ প্রলেপ দিচ্ছিল নিজে থেকেই। সকালবেলা ঘুম ভেঙে গেলে বারান্দায় গিয়ে দেখি চারটে কাঠঠোকরা এসে মাটি থেকেই পোকা খুঁটে খাচ্ছে, কাঠবিড়ালির ছানা দুটো বড় হয়েছে খানিক, মুড়ির নেশাও হয়েছে। পাঁচিল পেরোতে গিয়ে ধুপ করে  একটা বিড়াল পড়ে গেল কাকের ডানার ঝাপটা খেয়ে! বিড়ালটা অমনি চারপাশ চট করে দেখে নিল, স্বাভাবিক! বিড়ালদের ঠেকে ওর আর মান ইজ্জত থাকবে কিছু! তারপর একদিন দুড়ুম করে বেরিয়ে পরা হল। সেদিন আবার ভ্যাপসা গুমোট গরম, বাড়িতে গোল হয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কেউ কিচ্ছু করবে না কিন্তু ঘরে বসে থাকার মতো স্থিতিশীল হলাম আর কই। 

এখানে একটা সুবিধে আছে, ঘন্টা খানেক ঘন্টা দুয়েকের ড্রাইভে ছোট ছোট সুন্দর সব জায়গা মেলে। আশেপাশে সেসব বেশীরভাগ জায়গা আমাদের ঘোরা, খুঁজেপেতে একটা জায়গা বের করা গেল। স্টেশনের কাছে চার্চের গায়ে রোদ এসে পড়ছে তখন, আমরা পুরোনো ওভারব্রিজ পেরোচ্ছি যখন। এবারের ড্রাইভটায় আলাদা রোমাঞ্চ আছে, আমার গাড়ির স্টিয়ারিং জ্যাম হয়ে গেছে। এখানে আসার সময়েই দেখেছি, কিন্তু তখন সারাতে দেবার সময় ছিলনা, ফলে এখন আমায় একটা টার্ণ নিতে হলে, মাসল গজিয়ে যাচ্ছে আর কি। ইঁটের উপর কাচের বয়াম রাখা দোকানটায় খুব মিষ্টি দেওয়া চা আর সুজির বিস্কুট খেয়ে দেহে মনে বল ফিরিয়ে নিতে হল এক ঘন্টার রাস্তাতেও। দামোদর পেরিয়ে খানিক এগোনোর পর ফস করে গুগল ঠাকুমা বললে, ডাইনে মোর, হাঁচড়পাঁচড় করে গাড়ি ঘুরিয়ে এগোতেই দেখি বর্ষার জল পেয়ে সবুজ রঙে সেজে গুজে গাছ গুলো রাস্তার অপর পারের গাছেদের সাথে প্রেম করছে খুব। চারপাশের মাঠঘাট সবুজে সবুজ হয়ে আছে। গ্রামের মধ্যে খুব সরু একটা রাস্তা। একপাল গরু ছাগল তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক বুড়ো। সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাচ্ছে ছেলেমেয়েরা। মেশিনে ধান ঝাড়ছে মেয়ে পুরুষের দল। খানিক দূরে বিহারিনাথ পাহাড় দেখা গেল,  খেজুর গাছের পাশ দিয়ে।বিহারিনাথ মন্দির দেখার প্ল্যান ছিল না আমাদের, আমাদের ইচ্ছে ছিল পাহাড়ে চড়ার। বর্ষাকালে এ পাহাড়ে কেউ চড়ে না মনে হয়। ট্রেইলটাও জঙ্গল অধিকার করে নিয়েছে প্রায়। ঝোপ ঠেলে তাও খানিক দূর এগোলাম। অদ্ভুত চুপচাপ চারদিক। ঝিঁঝির ডাক আর পাখির ডাক ভেসে আসছে মাঝে মাঝে। আর জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ। আরো খানিক গিয়ে মনে হল নাহ কাজটা হঠকারী হয়ে যাচ্ছে। সাপখোপ কতটা কি আছে এ জঙ্গলে জানিনা, আমাদের চোখও কংক্রীটে থেকে থেকে দেখতে ভুলে গেছে, সাপ দেখলেও চিনতে পারবোনা।  তার চেয়েও বড় কথা কোনো খারাপ মানুষ থাকলে তাকেও আটকানো যাবে না কারন আর কেউইই আশপাশে নেই। উচিত ছিল নীচের থেকে কাউকে সঙ্গে আনা। কাউকে চিনতে গেলে তার সাথে সময় কাটাতে হয়, এমন হাপবেলার ঘোরায় ছোঁয়া যায় স্পর্শ পাওয়া যায়না। যাকগে, উঠতেই হবে এমন পন করে বেরোইনি। ফের আসবো কখনো। নীচে নেমে অশ্বত্থের ছায়ায় খানিক বসা গেল৷ একটা ছোট্ট মিষ্টির দোকান সামনেই। বারকোশে স্তুপ করে রাখা জিলিপিতে মাছি ঘুরছে।ডেকচিতে রসগোল্লা, পান্তুয়া আর ল্যাংচা রাখা৷ আরেকটা বারকোশে বোঁদের লাড্ডু। দোকানি গরম গরম কচুরি ভেজে দিচ্ছে। মন্দিরটায় ভালোই লোক আসে দেখছি। 

দুটো উপায় হয়, এক যে পথে এসেছি সে পথেই ফেরা, অথবা সামনে এগিয়ে যাওয়া। ঘর থেকে বেরিয়েছে যে,  সহজে সে কি ফিরতে চায়! তাছাড়া সামনের দিকটার রাস্তাটাও তো জানা হবে না। সুতরাং খুব গায়ের জোরে স্টিয়ারিং ঘোরানো হল, আর সামনের সরু রাস্তাটায় এগোনো গেলো। দু পাশেই পাহাড়, লোক তেমন নেই। একটা মস্ত বোঝা চাপিয়ে একটা লড়ঝড়ে বাইকে একটা লোক গেল। আরো খানিক এগোলে, গঙ্গাজলঘাটির জঙ্গল, এই জঙ্গলে আগে এসেছি, ভারী ভালো লাগে। মেজিয়া পেরোলে একটা ধু ধু ফাঁকা মাঠের মাঝে কলেজ একখানা! সে কলেজের মজা ভারী! কলেজ কম্পাউন্ডের মধ্যে বয়েজ হস্টেল আর কম্পাউন্ড এর বাইরে মেয়েদের হস্টেল! আশ্চর্য জায়গা বটে।  কলেজ থেকে খানিক এগোলে ড্যামটা। শাল ইত্যাদি গাছের পাশেই। ছোট্ট একটা অতিথিনিবাসও আছে। এমন চমৎকার জায়গায় কলেজ হলে যা হয় আর কি, ছেলেএ মেয়ে গুলো চলে এসেছে বেশ কয়েকজন, জোড়ায় বা দলে। এর মধ্যেই একটা প্রি ওয়েডিং ভিডিও হচ্ছে। প্রি ওয়েডিং ভিডিও দেখতে আমাদের ভারী উৎসাহ। এই বিকট গরমে চকচকে জামা পরা ছেলে মেয়ে দুটো নানা ভঙ্গীতে হেঁটে বসে কসরত করে দেখাচ্ছে আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরা ফটোগ্রাফার বেঁকেচুরে খুব ভিডিও বানাচ্ছে। গাঁয়ের দিকে বলে নীল লাল ধোঁয়া নেই, কিন্তু মজা পেতে চাইলে কমতি নেই। এত গরমে লোকজন বলতে এই কটাই, মাথা খারাপ না হলে এমন গরমে ড্যামে আর কেইই বা আসবে! 
কাছেই একটা ছোট্ট পাহাড় আছে, টিলাও বলা চলে। টিলার থেকে ছোট পাহাড় শুনতে বেশী ভালো আর কি।  রাস্তায় একঝাঁক ছেলে মেয়ে দেখছিলাম, স্কুল ছুটি হয়েছে। বিহারিনাথ যাবার পথে বা এখানে আসার পথে যে কটা ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম পেরোলাম, সে একেবারেই বইতে পড়া গ্রামের মতোই রিমোট বলা যায়। পশুপালন আর টুকটাক চাষ এইই করে সব। ভাগ্যিস এদেশে এখনো ফ্রিতে পড়ানো হয়, বই দেওয়া হয় সাইকেল দেওয়া হয়! পড়াশোনা করতেই হবে সব্বাইকে সত্যি বলতে আমি সে ধারনায় বিশ্বাসী না। কলেজের স্টুডেন্ট দের পরীক্ষার উত্তরপত্র দেখে চমকে যেতে হয়, কেউ লেখে সশস্ত্র বিপ্লবীর নাম মহাত্মা গান্ধী কেউ লেখে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল করেছিলেন "master the sujjasen" (হল কালেকশনে যেমন শুনেছে আর কি)।  সামান্য চিন্তা ভাবনা বা জানার ইচ্ছে থাকলেও কেউ এসব লেখেনা। যে কোনো কাজ করতে গেলেই একটা গ্রাজুয়েট ডিগ্রি চাই এই চাহিদায় কিছু সময়,  অর্থ, এনার্জি আমরা নষ্ট করে চলেছি। আন এম্পলয়বেল রিসোর্স বানিয়ে তাদের জম্বি বানিয়ে ফায়দা তুলে চলেছে রাজনৈতিক নেতারা। কিন্তু সে তো কলেজে, স্কুলটা সবারই দরকার। শুধু পড়াশোনার জন্য তো না, একসাথে খেলা, ছুটে বেড়ানো, টিফিন ভাগ করে খাওয়া। আর কেউ যদি এর মধ্যে ভালোবেসে পড়াশোনাটা করে ফেলে, তবে তো কথাই নেই। কোন কথায় কোন কথা বকে ফেললাম। এ আসলে ঠিক ভ্রমন কাহিনী না, এখানে গেলে ওইটা দেখা যাবে,  বা ওই জিনিস গুলো অবশ্য দেখার এরকম কিছুই বলতে বসিনি। আমি রাস্তায় বেরোলেই খুশ। লাল বুনো ফুলে সাজা কিশোরী গাছ দেখলে, কিংবা শালপাতায় দেওয়া সস্তার কোনো খাবার, সবই আমায় আনন্দ দেয়, সেই আনন্দ পেতেই আমার চলা।
দুপুর হয়ে গেছে, আশ্রমের গেট বন্ধ হয়ে যায়। তাও এসেছি টুকটুক করে, টিলাটার মাথায় ওঠা যায় যদি। আশ্রমটা টিলার গোড়াতেই। কোন ঠাকুর, বা গুরুর আশ্রম জানিনা, জানতে চাইও না। উপরটা উঠতে পেলেই হল। উপর থেকে দূরের ড্যামটা দেখা যাচ্ছে। এই বিশ্রী ভ্যাপসা গরমে আর কোনো লোক জন নেই এই দুপুরে, খালি দুটো ঘুঘু পাখি বেলগাছটায় বসে ডেকে চলেছে। আশ্রমটা দেখতে ভারী চমৎকার, জাঁকজমক নেই, ফুলের গাছ আছে অনেক। ভিতরটা ঢুকে দেখার শখ হল, ইতস্তত করে ঢুকতে দেখি দুপুরের খাবার দেওয়া হচ্ছে স্থানীয় কিছু বাচ্ছাদের। আর সম্ভবতঃ এদের দীক্ষা নেওয়া একটা পরিবারও বসেছে দেখছি এক পাশে। এইসব আশ্রমে কী নিয়ম হয় জানিনা, টাকা দিয়েই ভোগ খেতে হয় নির্ঘাত। স্বাভাবিকভাবেই উঠোনের এক পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছি, বেরিয়ে যাই নাকি? এমন সময় আশ্রমের এক কর্মী, "সেবা করবে তো,  বসে যাও বসে যাও" বলে আমাদের পাত পেতে দিলো। নির্ঘাত আমাদের ওই পরিবারটার কেউ ভেবেছে। হ্যাহ হ্যাহ হ্যাহ। ভালোই হয়েছে, খিদেও পেয়েছে বটে। বিয়েবাড়িতে  ফাঁকি দিয়ে ঢুকে খেয়ে নেওয়ার মতোই উত্তেজনা বোধ করছিলাম। শালপাতায়, ভাত শাকভাজা,শুক্তো পড়তে না পড়তেই আমিও হাত বাড়িয়েছি। একজন তাড়াতাড়ি বললেন, গীতাপাঠ না শেষ হওয়া অব্দি খাবেন না! শাকভাজাটা ততক্ষনে মুকে চলে গেছে। আরাম করে ভাত, শাকভাজা,  শুক্তো, ডাল, ছানার কোপ্তা, চাটনি পাঁপড়,  পায়েস মিষ্টি খেয়ে সুড়ুৎ করে কেটে পড়েছি। এ তল্লাটে আবার অনেকদিন আসা যাবে না! 
বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়েই একটা ছোট্ট টিকটিকি উঠেছিল গাড়ির চালে, সে কিছুতেই নামবে না, নিয়ে চলো না, আমিও বেড়াতে যাবো বলে গাড়ির চাল আঁকড়ে শুয়েছিল। পাহাড়, ড্যাম সব ঘুরে টুরে,এই আশ্রমেই মনে হয় ওর ভালো লেগেছে। টুকটুক করে লেজ নেড়ে নেমে গেল। সন্ন্যাসী টিকটিকি!  অবশ্য এই আশ্রমিকদের আমার অবাক লাগে, নিজের সংসার ছেড়ে আরেক সংসারেই তো পড়ে আছে, সেই তো ভাঁড়ারের চাবি, রসগোল্লার হিসেব, পায়েস কেমন হয়েছের খোঁজ! কার কিসে আনন্দ কেই বা বলতে পারে!

Friday, August 5, 2022

নুড়ি আর জল

অনেকদিন পর অফিস এসেছিলাম আজ। টিমটা ভেঙে গেছে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে সবাই আগেই, বাড়িতে বসেই যে কাজ হয়ে যায় মর্গের ঠান্ডায় সে কাজ করতে যেতে ইচ্ছে করে না। তাও ডাক এলে যেতেই হয়। ল্যাপটপ স্ক্যান করানোর সময়, চুল পাতলা হতে শুরু করা পাতলা চেহারার সিকিউরিটি গার্ড হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল ভালো আছেন? সত্যি বলতে ওর মুখ সচেতনে কখনো মনে রাখিনি,এ আড়াই বছরে ও কেমন ছিল জানতে যাইনি। আমি জানিনা ওর বাড়ি কোথায়, কে আছে এর , কোন জায়গায় ঘুরতে যায়, কিংবা আরো সব প্রচন্ড সব দরকারি কথা, যা আমরা প্রতিদিন লেনদেন করি ভারচুয়াল দুনিয়ায় কিচ্ছু জানিনা।কিন্তু আমায় উনি মনে রেখেছেন, অনেকদিন পর দেখে অকৃত্রিম হাসি উপহারও দিলেন। আহারে মানুষ। 
জানলার পর্দা সরাতেই নারকেল গাছের মাথায় জলের মধ্যে মেঘের আনাগোনা দেখা গেল, চোখ টেনে দৈনন্দিন হিসেব নিকেশ, চিঠি চাপাটি শুরু করে দিতেই হল। দুপুরবেলা নিজে খেতে গিয়ে দেখি, বিশুর দোকান আজও বন্ধ। হল কি ছেলেটার? আগের বার অফিস এসেছিলাম যখন তখনো বন্ধ ছিল। সোমনাথেরও তাই। বিশু কিংবা সোমনাথ থাকলে মাসীর দোকানে যাইনা। মাসীর দোকান অপরিচ্ছন্ন এদের তুলনায়। তা উপায় নেই, বেচারি একা বসে ঢুলছে যাই চা খেয়ে আসি। মাসী আমায় দেখেই একগাল হেসে বলল, একইরকম আছিস দেখছি, কিচ্ছু বদলাসনি! বোঝো! বললাম তা তুমিও তো একই রকম আছো (আগেও বসে বসে ঢুলতে আর  প্রায় ঠান্ডা চা ফ্লাস্ক থেকে ঢেলে দিতে। যদিও এটা বলিনি আর)।  তাতেও হাসি, তাই নাকি। প্রায় ঠান্ডা চায়ে চুমুক দিয়ে বিশু আর  সোমনাথের খবর নিই।  সোমনাথ বাবার সাথে রাগারাগি করে দোকান দিচ্ছেনা।বিশুর মেয়েটার ক্যানসার হয়েছে,  বিশু ব্যঙ্গলোর গেছে।ওখানেই দোকানে কাজ করে আর মেয়েকে দেখে। সকালের নীল ঝকঝকে আকাশটা মলিন হয়ে গেল।  হাসিখুশী বিশুটার মুখটা নীল আকাশ আড়াল করে দিচ্ছিল। আহারে ছোট্ট মেয়েটা।  গোলুইদার কাছে নাম্বার আছে না বিশুর? যোগাযোগ করতে হবে। 

আজ কলকাকলি কাটিয়ে দিয়েছি। সন্ধ্যে নামার মুখে ভেড়ির ধার ধরে এলোমেলো হাঁটছিলাম। কলেজের ছেলে মেয়েদের আড্ডা, প্রেম, গান বেশ খানিকদূর অব্দি আসে।তারপর জায়গাটা আশ্চর্য নির্জন হয়ে যায়। কে বলবে, কয়েকশো মিটার দূরেই ব্যস্ত শহর দৌড়চ্ছে। একটা পানকৌড়ি ডুব মারলো, রূপোলী একটা মাছ ঠোঁটে ছটফট করছে, নিস্তেজ হবার আগেই পেটে চলে গেল, একটা ফড়িং উড়ছে, নিমগাছের ডালে কাক ডাকছে। একটা বাজ পড়া তালগাছের মাথায়  পাখি বসেছে একটা, তার ঠিক পিছন দিয়ে একটা ইন্ডিগোর উড়োজাহাজ উড়ে গেলো। কটা সাহেব মেম অফিস পরিদর্শনে এসেছে, এদেশীয় দুটি লোক তাদের ভেড়ির চারপাশ ঘোরাচ্ছে। মন্দিরের পাশের সিমেন্টের চাতালে একটা হাফপেন্টুল পরা ছেলে বসে আছে, দুজনেই চুপ করে কতক্ষন বসে রইলাম। সে কী ভাবছিল জানিনা, ভদ্রলোক নয় ভাগ্যিস,  তাই আমি কী কেন ইত্যাদি কিচ্ছু জানতে চায়নি। তারপর অনেক্ষন পর বটের ঝুরির পাশ দিয়ে আলো কমে এলো যখন, ফিক করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ফরেনারগুলোকে  তুলসীপাতাও বাদ রাখেনি খাওয়াতে!

ফিরতি পথে দেখি একজন পুলিশ আমার দিকে ভুরু কুঁচকে দেখছে। টহল দিতে এসেছিল এদিকে। আমিও খানিক ইচ্ছে করে এলোমেলো পা ফেলে বারবার পুলিশের দিকে তাকিয়ে নিজের পকেটে হাত দিয়ে দিয়ে দেখছি। ব্যাস আমার ফাঁদে পড়েছে। দেখি চোখে মুখে আনন্দের আলো খেলে গেলো তার, পাকড়েছি ভাব।
গম্ভীর গলায় বলল, "কী আছে পকেটে"?
- অ্যাঁ?  
- বলি পকেটে কী আছে?
- এই যে মোবাইল। (পকেটে আরো কিছু আছে,  সেগুলোকে আড়াল করার ভঙ্গী করে)
- আর কি আছে? উঁচু মতো? গাঁজা নাকি?
বুদ্ধি মাইরি! গাঁজা থাকলে পকেটে রাখবো! ফস করে আইকার্ডটা বের করে হ্যা হ্যা করে হেসেছি খুব। রাগে মসমস করতে করতে চলে গেল। 
ভেড়ির জলে লম্বা ছায়া ততক্ষনে আরো লম্বা হয়েছে।

আসার সময় বছর কতক আগে যে গানগুকো খুব শুনতাম ফের শুনছিলাম, নিজের মনেই হাসছিলাম, হাসির গান একটাও না অবশ্য। ভাবছিলাম কেমন করে সম্ভাবনা জন্মায়, মরে যায়, ফের জন্মায়। সমান্তরাল বিশ্ব আছে কিনা জানিনা, কিন্তু থাকলে কিরকম হবে সেই সব সম্ভাবনা গুলো যেগুলো ভাগ্যিস হয়নি! যার জন্য অপরিসীম আকুতি থাকে সময়এর তফাতে দেখলে সেগুলোই কেমন অবাক লাগে...ভাগ্যিস হয়নি,কিংবা ভাগ্যিস হয়েছে বলে। অনেকদিন পর বুড়ো হয়ে এরকম কোনো অখ্যাত সরু পায়ে চলা রাস্তা দেখলে হাঁটবো কিনা জানিনা, কে জানে তখন কী ভাববো, ভাগ্যিস সেই শেষ সূর্যের আলোয় বটের ছায়ায় বসা দিনটা পেয়েছিলাম নাকি ভাববো ওই সময়ে আরো অর্থনৈতিক  উন্নতির কোনো কাজ করতে পারতাম! 
ভাগ্যিস জানিনা, কারন বুড়ো আমি দ্বিতীয়টা ভাবলে ভেড়িতেই পুঁতে দিতাম হতভাগাকে....