Tuesday, July 18, 2023

কাউন্ট অফ মন্টিক্রিস্টো

ট্রোল করাটা সব চেয়ে সহজতম কাজ মনে হয়। এক গ্রুপে এক ভদ্রলোক জানতে চেয়েছেন, চার্লস ডিকেন্সের বই কেমন, পড়া শুরু করতে চাই। মানছি, চার্লস ডিকেন্সের নামটা গুগল করলেই পেতেন। তাও,  একটু ধৈর্য্য ধরে বলে দিলেই মিটে যেত,  বদলে কিছু মানুষ বিদ্রুপ শুরু করলেন। যাকগে, ছায়ার সাথে কুস্তি করার মানেও নেই। চার্লস ডিকেন্স শুনে ছোটবেলার কথা মনে এলো হুট করে। যদিও স্মৃতিটা ডিকেন্স নয়, আলেকজান্ডার ডুমার বিখ্যাত উপন্যাস নিয়ে।আসলে স্মৃতিরা বেজায় গোলমেলে। যে জিনিস ভাবি ভুলেই গেছি তাও রয়ে যায় দিব্যি আর যা মনে করি খুব স্পষ্ট তা দেখি আবছা। আসলে এই বিদ্রুপ,  ইত্যাদির প্রেক্ষিতেই মনে এলো আরো। আমি গেঁয়ো মানুষ, তখনো কথার জড়তা কাটেনি, শহুরে আদব কায়দাও রপ্ত হয়নি তেমন। আর আমি ছিলামই একটু অড ম্যান আউটের অড ম্যান। ফলে বন্ধু বান্ধব ছিল না মোটেও। বন্ধু বলতে লাইব্রেরির বইগুলো। পড়ার নেশা আগেই তৈরী হয়ে গেছিল, তাই তার সুবিধে ছিলোই একটা। তো হাতে এলো একদিন কাউন্ট অফ মন্টিক্রিস্টো। রাত নেই দিন নেই, লুকিয়ে চুরিয়ে পড়ে চলেছি বিশ্বাসঘাতকতার গল্প, হেরে গিয়ে ফিরে আসার গল্প, সাহসের গল্প, প্রতিশোধের গল্প।  পড়তাম আর ভাবতাম আমিও এরকম একদিন বদলা নেবো সবার। এখন শুনলে হাসি পেতে পারে, যদিও আমার পায়না,  কারন সেই সময় সেই বিদ্রুপ সেই অপমানগুলো কষ্টকর ছিল বইকি! অপমান,  বিদ্রুপ এরপরেও সেদিনকার হাবা বালক বহুবার পাবে কিন্তু তখন সে বড় হয়েছে খানিক, তাছাড়া ইউজড টুও হয়ে গেছে। নাহ অপমান কারোরই কম্ফোর্ট জোন হয়না, কিন্তু সারভাইভাল শিখে যায়। সে সময় আমি জানতাম না, কিন্তু কাউন্ট অফ মন্টিক্রিস্টো আমায় বাঁচিয়েছিল। অন্তত ঘুরে দাঁড়ানো যায় সেটা তো বটেই। কোনো হারই শেষ কথা নয় সেটাও। 

Tuesday, July 4, 2023

নতুন পাড়ায়

লেখালিখির পাট প্রায় উঠেই গেছে। সময় পাচ্ছিনাটা বললে নিজের কাছে ভালো সাজা যায় বটে, কিন্তু নিজের কাছে তো অন্তত শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। তাই এক্ষেত্রে বলা ভালো,  যে একটা কিছু গোলমাল তো হয়েছে বটেই, লিখতে আমার ভালো লাগে কারন আমি যা লিখি তা কোনো ভাবেই সাহিত্য টাইপ কিছু না, প্রাচীনকালে মানুষ যেমন নিজের ভাব ফুটিয়ে তুলতো হিজিবিজি অক্ষরে সেরকম যা মনে আসে, কিংবা যা দেখি তাইই লিখি। শিল্পের নিয়ম হচ্ছে তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপন করা। স্রেফ মাটির তাল রেখে দিলেই তো মূর্তি হয়না, কিংবা আঁকাচোরা কিছু একটা বানিয়ে দিলেই বিরাট শিল্পকলাও হয়না সুতরাং এ স্রেফ এমনিই বকে যাওয়া। তাও এক দুজন বন্ধু বান্ধব পড়ে, কেন কে জানে তাদের ভালোও লাগে! কিন্তু লিখতে শুরু তো করেছিলাম নিজের জন্যেই। নিজের চাট্টি বুদবুদ কাটা কথা বলার জায়গা মিলেছিল বলেই তবে কেন লিখছি না কিছু? লেখার বস্তুর অভাব আমার যদি হয় বলতে হবে আমার একটা অংশ মৃত। কারন আমি তাহলে কিছু দেখছিনা বা কিছু ভাবছিনা। সেটা হলে তো মশাই চিন্তার ব্যপার। জোম্বি নিয়ে সারা জীবন ঘর করা খুব চিত্তির। তা লেখার বস্তুর অভাব ঘটে না। মনে মনে বিড়বিড় করিনা কখনো তাও না। তাহলে? তাহলে আমার মনে হয় আদি অকৃত্রিম ল্যাদ।  কিন্তু কারন যাই হোক, তাকে সরাতে তো হবেই। কথা বলা দরকার, নিজের কথা গুলোও বলা দরকার কেউ না শুনলেও।

বাড়ি বদল করা মানে কী বলব আর হারকিউলিসের সেই  গোয়াল পরিষ্কার করার কাজের সমান। বাড়ি বদলানো জরুরি ছিল, কিন্তু তাই বলেই এত কাজ অ্যাঁ! গেরস্ত ঘরদোর মানে যদি পনেরো কুড়ি বস্তা বাজে কাগজ, কাপ ডিশ জামা কাপড় থাকে তবে আমি সন্ন্যাসী হওয়াই প্রেফার করছি আবারও। কী নেই! মানে কী না ফেলেছি! ২০০৭ সালের রাজমিস্ত্রীর হিসেব, প্রাক্তন গার্ল্ফ্রেন্ডের পাঠানো চিরকুট, বর্তমানকে লেখা প্রেমপত্র, প্রাক্তন(-১) গার্ল্ফ্রেন্ডের এর পাঠানো কার্ড, প্রাক্তন(-২) এর পাঠানো বই, হতে পারতো কেউ এর পাঠানো অমুক, এক কোটি বছর আগের ডাক্তার দেখানোর প্রেসক্রিপশন!মায়ের শাড়ির সংখ্যা দেখে ভিরমি খাচ্ছি, তুলে রাখা কাপডিশ দেখে অজ্ঞান, বাতিল কিন্তু মায়া করে রেখে দেওয়া জিনিস দেখে বিষন্ন হবো না বিরক্ত ভাবছি। মানে সে এক ত্রাহিমাম ত্রাহিমাম অবস্থা। ওদিকে নতুন বাড়ির কাজ যে করছে সে হল একেবারে ভগবানের এগারোতম অবতার, হয়ে যাবে সব হয়ে যাবে কিন্তু কিছুই আর শেষ করে উঠতে পারেনা। এদিকে চোখের আড়াল হলেই মা বাবাই চুপচাপ যত রাজ্যের বাজে জিনিস ব্যাগে পুরে রেখে দিচ্ছে! 

সে সব দিন যে পেরিয়ে এসেছি লিখতে গিয়েই অবাক হচ্ছি। চিমটি কেটে দেখছি ঠিক আমিই, আমরাই এ সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিলাম? তারপর এলো ডি ডে। রাশি রাশি কার্টুন ভরছে, উঠছে, নামছে। পঞ্চাশটা মতো কার্টুন বাক্স থেকে জায়গার জিনিস জায়গায় রাখাই কী সোজা কাজ নাকি! এ কাজ আমি আমার জীবদ্দশায় অন্তত আর করতে চাইনা। প্রতিদিন আমি আর ময়ূরাক্ষী আড়াইটায় ঘুমোচ্ছি, সাড়ে সাতটায় উঠে পড়ছি।তাছাড়া গোটা পঁচিশেক গাছ, যার মধ্যে চার পাঁচটা বড় বড় গাছ, নিম, কারিপাতা, জবা ইত্যাদি।  একটা জবাকে রাখতে পারলাম না, ওটাই বড্ড বেদনার  তবে এর মধ্যে সবচেয়ে সময় লেগেছে কিন্তু সব চেয়ে আনন্দ দিয়েছে আমাদের ছোট্ট স্টাডিরুমটা গুছোতে। দিন তিনেক সময় নিয়েছিলাম মনে হয়, নাকি চারেক যাই হোক, সারা মেঝেতে ছড়ানো ছেটানো বই, সকালে দরজা খুললেই সেইই ছোটবেলায় লাইব্রেরিতে যেমন গন্ধ পেতাম তেমন গন্ধ পাচ্ছি...আহাহা। নতুন বাড়ি যা হয় আর কি, রাতে শুয়ে বৃষ্টি নামলেও ছুটে গিয়ে ব্লাইন্ডস ভিজলো কিনা দেখছি, জল, দাগ লাগলেই মুছছি। বুড়ো হলে নিজেদের নিয়ে খুব হাসাহাসি করবো নির্ঘাত। আদেখলার ঘটি হল দশা আর কি। 

জায়গাটা মূল শহর থেকে বেশ দূরেই। তায় ছোট। তবে আমাদের চারজনেরই  সব মিলিয়ে ভালোই লাগছে। কারন অনেক অনেক গাছ আছে ক্যাম্পাসের মধ্যে। কোনো অংশে দুধারে চাঁপা গাছের সারি, কোনো অংশে দুধারে শাল, কিংবা কোথাও বকুল, কোথাও জারুল। সবুজ ঘাসে চাও তো বসে নাও একটু, চিড়িক চিড়িক করে একটা কাঠবিলাই চলে যাবে ছুটে। কিচিরমিচির করে পাখির ডাক শুনতে পাবে। পিছন দিকের গেট পেরোলেই একদম গ্রাম, বাঁশ ঝাড়টার সমেত। সাইকেলে করে চক্কর কেটে দুধ দই মিষ্টি কিনি, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকানের খোঁজ করি। এক সপ্তাহে আত্মীয়রা এলো। আত্মীয় কুটুমদের অবশ্য তেমন সুবিধের লাগেনি। একে তো নতুন বাসস্থান বেজায় ছোট, তায় শহর থেকে এত্ত দূর, সব মিলিয়ে তারা হতাশই প্রায়। তাও নেহাত ভদ্রলোক বলেই তেমন কিছু বলেনি মুখের উপর, নেহাত মুখ ফস্কে যতটুকু বলে ফেলেছে ততটাই আর কি। 

আশপাশের দোকানদাররা বেশীরভাগ মুসলমান না হলে নস্কর, পাল, বিশ্বাস, মন্ডল পদবীর, খুকুমনি বিবি, শহিদুল মোল্লা, নাজমুল হোসেন, রুকমিনা বেগম, অর্জুন নস্কর, সঞ্জয় মন্ডল, মাধব পাল  ইত্যাদি। সেদিন বিকেলে এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে চারপাশ দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম। আগে যাইনি এদিকটায়, সাইকেল থাকায় সুবিধে হয়েছে। দেখতে পাচ্ছি কেমন শিরীষ গাছগুলো সন্ধ্যের মুখে পাতা মুড়ে ফেলেছে। এরকম যে হয় জানতামই না। প্রজ্ঞাকে বলতাম সচারাচর এরকম।  মানে এই চারপাশের গাছপালার কিংবা পাখি নিয়ে প্রশ্ন থাকলে। কিংবা শহরেই পাশেই গ্রামগুলোর আর্থ সামাজিক যে বদল গুলো সেসব নিয়ে। অহেতুক গালগল্প আর কোনোদিন হবে না, কেমন দুম করে নেই হয়ে যায় মানুষে। যতদিন থাকে, আলগা হয়ে থাকি, যেই মানুষে চলে যায় সুতোয় টান পড়ে। অবান্তর কথা হোক কিংবা কেজো আলাপ আর কখনোই কিছু হবে না একটা মানুষের সাথে, এ সত্য দুম করে সামনে আসলে নড়ে যেতে হয় বটে। কিন্তু সত্যিই কি নড়ে যাই? প্রজ্ঞার চলে যাওয়ার পড়ে মনে পড়েছে বহুবার, কিন্তু বাকি কিছু তো থেমে থাকেনি। থাকেও না মনে হয়। কতলোকে জাজ করলো ওকে কেন ওই কেন সেই, যেন জীবৎকালে ওর ধার দেনা বিল সব মেটাতো তারা, ওর জুতোয় পা গলিয়ে কেউ দেখেনি, ওর রাস্তায় কেউ হাঁটেনি তবু কথার শেষ নেই। শিরীষ গাছ গুলোর আয়ূ আর কদ্দিন কে জানে! এদিকেও রাস্তা বাড়বেই শিগগিরই,  গাছেদের ভোট নেই, সুতরাং রাস্তা চওড়া করতে জবরদখল হওয়া জমির পুনরুদ্ধারের বদলে গাছ উড়িয়ে দেওয়া সহজ।

 একটা একা বোকা চায়ের দোকানে দাঁড়াই ভীড়ওয়ালা দোকান, পেঁয়াজির গন্ধ উপেক্ষা করে। কিন্তু বউটি হতাশ মুখে জানায়, "না বাপ চা নেই, কারেন্টে হয় কিনা। অন্য কিছু খাবে, খাও না? " মনটা ভালো নেই, এগিয়ে যাই।  তারপর আরো একটা দোকান জোটে, একলা বেঞ্চে বসে চা খাই। দোকানদার ছেলেটা মুখে খৈনি ঠেসে বসে। বসে থাকি চুপ করে অনেক্ষন। তারপর ফের একটা দমকা হাওয়া দেয়, উঠে পড়ি।  আরেকদিন বেরোবো, ওইই যে বাঁয়ের রাস্তা ধরে যাবো বেশ। কিংবা সোজাই চলে যাবো আরো অনেকদূর। আকাশের দিকে চোখ পাতি গাছেদের শামিয়ানা ভেদ করে, ফিবোনাচ্চি সিরিজে পাখি উড়ে গেল, মেঘের ফাঁক দিয়ে টকটকে আল আলো দেখা যাচ্ছে।.... "না চাহিতে মোরে যা করেছ দান আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ..."

Saturday, April 22, 2023

উৎসবে-জীবনে

একশো আশী ডিগ্রি চোখ ঘোরালে চোখে পড়ে আম গাছ থেকে আম ঝুলছে, কাঁঠাল ঝুলছে কাঁঠাল গাছ থেকে, একটা বসন্তবৌরি সজনে গাছে বসে, তারপর সারি দিয়ে দিয়ে নারকেল গাছ। একটা বাঁশের মাচায় শুয়ে আছি। চোখ একটু নামালে দেখা যায় প্রজাপতি উড়ছে, একটা কাঠপিঁপড়ে আমার পায়ের উপর উঠছে কামড়ালেই হয়ে গেল। লাল গরু জাবর কাটা ছেড়ে ঠ্যাঙ মুড়ে বসে ঝিমুচ্ছে।তার পাশে সাদা বাছুরটা মুখ দিয়ে দিয়ে গা চুলকুচ্ছে। পিত্তিপুকুরের জল শুকিয়ে কচুরিপানাও শিকুয়ে গেছে। দূরে তিল গাছের সাদা ফুল দেখা যাচ্ছে। চোখ বুজলে হরিনাম সংকীর্তন এর আওয়াজ থেকে ফোকাস সরাতে পারলে কানে আসবে পাখি ডাকছে। ওই হরিনামের বাড়িতে খেতে যাবো, হাঁড়ি বারনের নেমতন্ন। মানে রান্না যেন না করা হয়, সপরিবারের নেমতন্নকে গ্রামে হাঁড়ি বারন বলে।বাড়িতে আসা আত্মীয় কুটুম সমেত সকলে এসো। খিদে পেয়েছে বলেই পাখির আওয়াজের বদলে কীর্তনেই বেশী কান চলে যাচ্ছে। কীর্তনীয়া আবেগে আপ্লুত হয়ে গেছে, কে যেন বলছে, আমায় শাপ দিলে তো,  দেখো আমিও বলে যাই, তুমিও এই বিরহ ভোগ করবে আয়ান ঘোষের স্ত্রী হয়ে জন্ম নেবে, বৃন্দাবন ত্যাগ করে মথুরা চলে যাবে ভগবান। 
কালীপুজোয় গ্রামে এসেছি। আজ আবার ঈদ। রাস্তা জুড়ে উৎসবমুখী মানুষ দেখতে দেখতে এলাম। এই চড়া রোদে দেখি কেউ কেউ ভেলভেটের কালো কুর্তা পরে বেরিয়েছে। মেয়েদের  পোশাকে নানান রঙের মেলা হলেও ছেলেদের বেশীরভাগ সাদা পাঞ্জাবী, পাজামা না হলে কালো পাঞ্জাবি পাজামা। বয়স্ক লোক লোকে লুঙি। ফেজ টুপিরও কতরকম বাহার। কারো সবুজ, কারো ক্রীম, কারো চুমকি দেওয়া ঝলমলে। জুতোর বাহারও কম না, কালো পাঞ্জাবি পরুয়াদের কালো কুতো বেশীরবাগ, জড়ির কাজ করা কারোর কারো। আরে আদে বাইকটায় দেখো,  চারটে আছে তিনটে ভেবেছিলা। দুটো এমন ক্ষুদে আর একই রঙের পাঞ্জাবিতে মিশে গেছে। সামনের বাইকের ছেলেটার আবার দু লেয়ারের চুল! একটায় কালো রঙার একটায় লাল, লালটা পতপত করে উড়ছে। মুখে পান কিংবা জর্দা ছোট ছোট ছেলেদেরও,ছুঁচোলো উঁচিয়ে রাখা মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এহেহে এ বেচারার বাইক গেছে বিগড়ে, মাথার চুমকি দেওয়া ফেজ টুপি এখনো ঝলমলাচ্ছে কিন্তু রোদে তার মুখ মলিন, বাইক টেনে এগোতে হচ্ছে কিনা। কটকটে গোলাপী জামা পরা একটা ছেলে জামা উড়িয়ে বাইক চালিয়ে বেরিয়ে গেল। মেয়েদের ঘাগরা হয় যে কাপড়ের ওই কাপড়ের ঝলমলে জামা, টিকলি পরা ছোট মাঝারি সব মেয়ে চলেছে। একজায়গায় জলের বোতল আর একলিয়ার্স দিলো। আহাহা আরো কয়েক জায়গায় মিষ্টি দেবে না? কিশোররা ও কিশোরীরা সব টোটোয়, যুবক ও বৃদ্ধরা বাইকে। যুবতী কিংবা বয়স্কা দেখলাম না রাস্তায়, ওদের কোথাও যাবার নেই? 


চোখ মেলে দেখি, ওদিকে হরিনাম বাড়িতে সবাই ছুকছুক করছে কখন কীর্তন শেষ হবে। শুনতে পাচ্ছি কীর্তনে প্রভু এখন ভোগ খাচ্ছে। জল প্রদান হচ্ছে নতুন ভান্ডে....হয়ে এলো আশা করা যায়। হ্যাঁ হ্যাঁ ওইতো সেবা করো সেবা করো বলে কানছে। অবশ্য আমি প্রভু হলে বলতুম," ব্যাটা মাছ নিদেন গেঁড়ির ঝাল দিচ্ছিস না আর এদিকে সেবা করো নিজগুনে বলছিস!!অন্তত গুগলির ঝাল দিতে পারতিস।" অবশ্য দই মিষ্টি আছে শুনতে পেয়েছি।  এবার ভোগ মন্দিরের দরজা বন্ধ করবে...কিন্তু নাহ কিন্তু গৌরহরি সেবা করছেনা বলে, নাকি কৃষ্ণও করবে না। জ্বালাতন মশাই। তা গৌরহরি খাচ্ছে নাইই বা কেন! আমিই গৌরহরি সেজে নেবো নাকি অ্যাঁ। ইরিবাবা এবার আবার বলছে বলছে সবাই এখন সবাই মিলে অযোধ্যায় যাবো কলিযুগ থেকে দু মিনিটের জন্য! নাহ বেচারা কীর্তনীয়ারও খিদে পেয়েছে দেখছি!

মোটা চালের গোল গোল ভাত, শুক্তো, ডাল, ভাজা, তরকারি,  আমের, চাটনি,লাল দই, মিষ্টি। ম্যান্ডেটারি জমি দর্শনে বেরোতে হয় এত খেয়েছি! বাদাম, তিল,  পাট বোনা হয়েছে। দুয়েক জায়গায় পটল। সবুজে সবুজ হয়ে আছে চারদিক। সবুজেরই শেড এত রকম, আমগাছের আম গুলোকে মনে হচ্ছে টুনি বালব জ্বলছে যেন। বাঁশবাগানের নীচে শুকনো বাঁশপাতা পরে গালিচা মতো হয়ে আছে। উবু হয়ে নিড়ানি দিচ্ছে একজন। দুটো মেয়ে খালপাড়ে আম না কি যেন মাখা খাচ্ছে। চারদিকে ঘন দুপুর। আলের উপর দিয়ে সড়সড় করে একটা হলুদ ডোরাকাটা কানা মেটুলি চলে গেল। দুটো ছাগলে আরাম করে ঢুঁসোঢুঁসিকরছে। গামছা পেতে একটা লোক নারকেল গাছের নীচে ঘুমোচ্ছে। বাপ ব্যাটায় খালের জলে পাম্প লাগাচ্ছে।
"কোথায় যাচ্ছিস রে দুপুরবেলা"।
-কোত্থাও না,  তোরা কি করছিস?
-ছিঁচতে হবে নে?এক ফোঁটা বিষ্টি হলুনিতো। 

এসব কথা আলগোছে পেরিয়ে হেঁটে যাই, কোথায় যাই জানিনা। কিংবা জানি। আমি সেইই আমগাছটার কাছে যাচ্ছি, যে আমায় একবার আশ্রয় দিয়েছিল অনেকদিন আগে, যখন খুব অস্থির ছিলাম। আর এমনিই উপহার দিয়েছিল দুটো আম। না চাইতেই, যেন খানিক আদর দেখাতেই। তাকে থ্যাংকইউ বলা হয়নি,কত বছর হয়ে গেছে যাওয়াও হয়নি। গাছেরা রাগ করেনা, তবু অকৃতজ্ঞতার লজ্জা নিয়ে যাই। সেই ছোট পাতার ডালটা এখন বড় হয়ে গেছে, মোটা হয়ে যাওয়া চোখে তাকে চিনতে পারিনা আর। বিড়বিড় করে, মনে মনে, জোরে জোরে কথা বলি। কতদিনের পুরোনো গাছ, নিজেদের মধ্যে কতদূর দূর অব্দি কানেক্টেড শিকড়ে শিকড়ে। অস্থিরতা, অকারণ মনখারাপ সমর্পণ করে দিলেই হল না। কানেকশন তৈরী করতে হয়, বুঝতে হয় বোঝাতে হিয়। গাছেরা জ্ঞানী বলেই সেই বোঝানো সহজ। অনেকক্ষণ পরেও পাত্তা দেয়না, একটা পাতাও কাঁপেনা। অনেক অনেক পরে মন খারাপ করে চলে আসবো ভাবছি। কোথাও কিছু নেই, দমকা হাওয়ায় একটা ফলভরা ডাল নড়ে ওঠে। আদর ছুঁড়ে যায় গায়ে মাথায়...আমি চাইতে আসিনি কিছুই তবুও পেয়ে যাই। এই
হঠাৎ হাওয়া দেওয়ায়, গাছের পাতা নড়ায় গাছ আমার কথা বুঝতে পেরেছে শুনে হাসবে তোমরা, কিন্তু বারবার একই ঘটনা ঘটলে তাকে কোইন্সিডেন্স বলা যায় কি? যেদিন মানুষ গাছেদের সাথে কথা বলতে পারবে আরো সহজে তখন জানবে এ আমার আত্মপ্রবঞ্চনা নয়, মনের  ভুল নয়। 

রাতের বেলা যাচ্ছিলাম কোথায় যেন...নিকষ অন্ধকার চারদিক, তবুও যেন অন্ধকার নয়। একটা আবছা আলো আছে চোখ সয়ে গেলেই। আমাদের পুজোর আলো শেষ যেখানে, সেখানের পরই যেন ফিল করতে পারি অপুর ক্লস্ট্রোফোবিক কেন লাগতো গ্রামে। এক জায়গায় স্থির থাকা আমার সইবে না আবার খুব উদ্দামতাও সয়না..ঠিক কী চাই তা জানতেই মনে হয় এ জীবন কেটে যাবে।


 







Sunday, April 16, 2023

ছুটিতে ছুটোছুটি (ঔরঙ্গাবাদ )

"অ্যাই বিস্কুট খাবি নাকি? " 
"যা তোর বাবাকে ডেক্কে নিয়ে আয় না, সব শেষ হয়ে গেল যে "। 
" ও ভাইয়া চায়ে মিলেগা?"

যে কোনো ট্যুরিস্ট স্পট হল মানুষ দেখার আদর্শ জায়গা। ইলোরার শান্ত প্রাচীন গুহা ছেড়ে বেরোতেই, হই হই লোকজন। সব ওখানেই ছিল,  বেলাশেষে বেরিয়েছে।  চায়ের দোকান খুব নেই এ চত্বরে, একটা সবেধন নীলমনি  দোকান দেখে চা বানাতে দিয়ে জুত করে বসে মানুষ দেখছি। নিজেদের মধ্যে কোনো কথা বলছি না,  পাছে "ও আপনারাও বাঙালী, কোথা থেকে আসছেন, কতদিন থাকবেন...." ইত্যাদি শুরু হয়। এমনিতেই আমরা অসামাজিক মতো, তায় ভীতু মানুষ এত দাপুটে লোকেদের থেকে ডিস্ট্যান্স রেখে বসাই ভালো। শুরুর কথা গুলো ওরকম একটা দলই বলছিলো। চুক চুক করে শুনছি, আর নিজেদের মধ্যে তাকাতাকি করছি," বাপরে কী দাপঅট"।  ইলোরার প্রাচীনকাল যেমন উপভোগ করি,  তেমনই তফাৎ থেকে বর্তমানের এই কলরবও কম উপভোগ করি না, স্বীকার করতে বাধা নেই। সত্যি বলতে বাঁদরদের কিচিরমিচির আর মানুষদের কিচিরমিচির খুব তফাৎ নেই, নিরাপদ দূরত্ব থেকে দুইই দেখতে মজা লাগে। 
সৌরভ আজ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল, ওই অত চড়াই উৎরাই ভাঙার জন্যই, যে আজ ও বিরিয়ানি খাবেই খাবে। এমনিতে বেড়াতে গিয়ে আমরা যা পাই তাই খাই টাইপ। আর যেখানেই যাবো বিরিয়ানি খেতে হবে এমনও না আমাদের কিন্তু  আওরাঙ্গাবাদের নিউ সাগর হোটেলের বিরিয়ানির খুব নাম শুনেছিলাম। সুতরাং ওটা আমাদের লিস্টেই ছিল। ফিরতি পথে দেখলাম সারিসারি ধাবা গুলোয় আলোজ্বলা শুরু হয়ে গেছে। একটা রাজস্থানী ধাবা ভারীচোখ টানছিল, যেন একটুকরো রাজস্থানের গ্রাম। 

এখানের অটোওয়ালারা কী নাটুকেরে ভাই! একজনকে দাম জিজ্ঞেস করেছি, অস্বাভাবিক দাম বলায়, না বলেছি। ও বাবা সে আবার যাওয়ার সময় বলে গেলে, এত বড় হোটেলে কত টাকা দাও আর অটোওয়ালাদের দিতেই যত আপত্তি। প্রায় ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদেই দেয় আর কি! নিউ সাগর থেকেও ফেরার সময়ও, লোকটা নাকি বোঝেনি আমাদের হোটেল, তাই ভুল ভাড়া বলেছে। সে কী অভিমান,  ছেড়ে দিন আমার ভুল আমায় আর ভাড়া দিতেই হবে না!! আলাদাই!  যাই  হোক নিউ সাগরের খাবার দাবার চমৎকার ছিল, ঝাল ছিল অবশ্য। কালকেও বিস্তর হাঁটাহাঁটি আছে। এইটুকু ঘুষ দিতেই হত আমার সঙ্গের দুই মক্কেলকে। এবারে ঘোরায় এত ছুটোছুটি তার মধ্যেও এই যে এক ঝলক শহর দেখা হয়ে গেল এও বেশ কিন্তু। এদিক সেদিক গলি বাজার ঘুরে নিউ সাগরে যখন এনে ফেলেছিল অটোওয়ালা দাদা, ততক্ষনে বিরিয়ানির বদলে মাথার যন্ত্রণায় আধমরা হয়ে নেতিয়ে পড়েছি। 
সৌরভের চিকিৎসা খুব সিম্পল, মাথা ব্যথা? জল খা। জল যাকে খেতে বলছে সে হয়তো কুঁজো খালি করে ফেলল, কমেনি? আচ্ছা তাহলে খিদে পেয়েছে। খেয়ে তার পেট ফেটে যাবার জোগাড়,  কমেনি? আচ্ছা হোটেলে ফিরে ঘুমিয়ে পড়িস! সহজ সরল চিকিৎসা পদ্ধতি আর কি। 

ঠাকুমার সৌধ দেখে নাতির সাধ হল মায়ের নামে সৌধ করবে। আমাদের মতো টানাটানি তো আর তাদের ছিল না, ইচ্ছে হয়েছে করে ফেলো। লাগে টাকা দেবে কোষাগার। সুতরাং ঔরঙ্গজেবের ছেলে আজিম শাহ মা দিলরাজ-বানু-বেগমের স্মৃতি সৌধ বানালো যা কিনা অবিকল তাজমহলের মতো দেখতে। ডুপ্লিকেটের বাজারদর কম তাই সারা তাজের সমতুল জনপ্রিয়তা নেই এর।  তবে ডুপ্লিকেট হোক যা হোক, দেখতে ভালোই লাগে। আমাদের লোভী মন, ভিতরে মাজারের উপর প্রচুর নোট দেখে ভাবনা আসে এহে চাট্টি তুলে নিলেই হয় টাইপ। অত অমন করার কিছু নেই৷ নোট তুলে নেওয়া হয় নিয়মিত ব্যবধানেই, না হলে কয়েক বছর আগের বাতিল নোট নেই কেন!






ঔরঙ্গাবাদেও কিছু কিছু গুহা আছে। সেসব গুহায় হীবযান, মহাযান, বজ্রযান সবের প্রভাবও আছে। যেহেতু আজ ঔরঙ্গাবাদ ফোর্টে ওঠার প্ল্যান আছে, আর কাল বিস্তর হাঁটাহাঁটি হয়েছে (টু বি প্রিসাইজ গতকাল ১০ কিলোমিটার হেঁটেছি),  তাই আজ ভেবেছিলাম,  বেশী চাপ নেবো না। গাড়ি পুরোটা যাচ্ছে না, রাস্তার কাজ চলছে, তাই  এখানেও হাঁটতে হবে ভালোই।  রাস্তায় আবার চটের বস্তা চাপা দিয়ে ভিজিয়ে রেখেছে। সে বস্তার যা খুশবাই বাপরে! এই গুহাগুলোর তেমন পপুলারিটি নেই, মানে ইলোরার মতো, তাই ভীড় কম।  দু চারজন কলেজ পড়ুয়া ছেলে মেয়ে প্রেম করতে আসে,  তাও এত সিঁড়ি ভাঙতে হয় বেশী আসে না। বেশ জায়গাটা৷ এখানে আসলে বোঝা যায় কেন সে প্রাচীন আমলে এই জায়গাটা নির্বাচন করেছিল শিল্পীর দল। মানে তখনও চারপাশ এমন জনবহুল হয়ে ওঠেনি হয়ত কিন্তু ভাবতে ইচ্ছে করে সেই সময়েও হয়ত আকাশ এমনই নীল ছিল, মাথার উপর টিয়ার দল এমনই ট্যাঁ ট্যাঁ করতে করতে পাড়ি দিতো। গুহা অব্দি পৌঁছতে হাঁফ ধরে বটে কিন্তু পৌঁছনোর পর ভারী ভালো লাগে। এমন গাছের ছায়ায় মোড়া পাহাড়, ঝকঝকে একটা দিন, কটা কাঠবিড়ালি তুড়ুক তুড়ুক করে খেলে বেড়াচ্ছে, খারাপ লাগার অবকাশও নেই খুব। 
এই গুহাগুলো দুটো ভাগে ভাগ করা আছে। বাঁদিকের গুলোয় বজ্রযান প্রভাব কম যা বুঝলাম, ডানদিক ধরে খানিক এগোলে একটা জমকালো গুহা মেলে। বারান্দা ওয়ালা গুহাটায় প্রায় সব কটা দেওয়ালেই কাজ আছে। বুদ্ধ এখানে সিংহের উপর আসীন। কেন জানিনা, পড়াশোনা নেই। এছাড়া বজ্রযানের প্রভাবেই কিনা কে জানে নানা রকম দেবীর মূর্তির সংখ্যা বেড়েছে। 


ঔরঙ্গাবাদ ফোর্টে গিজগিজ করছে মানুষ, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার সরু সরু অন্ধকার সিঁড়িগুলো দিয়ে যাবার সময় বিকট পিলে চমকানো আওয়াজ করছে। স্কুলের বাচ্ছাগুলো অনেক ভালো, তাদের টিচাররা যেমন বলে দিয়েছে তেমনই করছে, যথাযথ লাইন মেনে যাচ্ছে। সমস্যা বড় বাঁদরগুলোকে নিয়ে। বাঁদর মানে সত্যি বাঁদরও অনেক আছে।  মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পরে তাদের কাজকর্ম দেখতে হয়, এমনই চিত্তাকর্ষক।  একটা একদম গেঁড়ি মতো বাঁদরছানা এদিক সেদিক দোল খেতে খেতে,  বেশ খানিক উঁচুতে দুর্গের একটা অংশে লাফ মেরে উঠে পরেছে। উঠেছে তো উঠেছে,  আর তো সে নামতে পারে না।কারন আশপাশে আর কিছু সাপোর্ট নেই। ভয় পেয়ে মুখ মলিন করে বসে আছে। পাশে গাছটা অব্দি ঝাঁপাবার ক্ষমতা তার নেই। ওদিকে ওই গাছে তখন আরো  দুটো ছানা দোল খাচ্ছিলো। সে দুটো এটার চেয়ে একটু বড়, ওই লোয়ার নার্সারি আর প্রথম শ্রেনীর মধ্যে যতটুকু তফাৎ আর কি। তা বড়রা যেমন হয়, খুব দোল খাচ্ছে, এক এক বার লাফ মেরে ওই উঁচুটায় উঠেও যাচ্ছে, প্রবল কসরত করতে হলেও নেমেও আসছে। খানিকটা ভরসাও দেওয়া হচ্ছে যেন, ওরে পারবি, একবার লাফ দিয়েই দেখ না। এদিকে ক্ষুদেটার ভয় আর ভাঙে না, সত্যিই ওর পক্ষে মুশকিল। আশেপাশে বড়রাও কেই নেই, ক্লাস ওয়ানের গুলোর পক্ষে ওকে রেস্কিউ করাও সম্ভব না। বিরাট টেনশের সিরিজে আটকে গেছি, কী হয় কী হয়।  দুর্গবিজয় মাথায় ওঠে প্রায়। শেষ অব্দি যা হয়, সাহস করে ঝাঁপিয়েই পড়লো আর হাঁচোড়পাঁচোড় করে গাছের ডাল ধরেও ফেললো! তারপরেই তুরতুর করে ছুট ছুট! "বাপরে ওদের সাথে আর মেশে! দাঁড়া না আজ মাকে বলব, তোদের সাথে গিয়ে কেমন বিপদে পড়েছিলাম!"
ওদিকে আর একজন তখন কার থেকে ছিনিয়ে আনা একটা সিঙারা জুত করে বসে খাচ্ছে। পাশে একজন তার ছানাকে গলায় ঝুলিয়ে উদাস মুখে বসে। ভাবখানা, "এহ ভালো দাঁও মেরেছে ? একটুও দেবে না সিঙারা? এর যা চেহারা বাপ্রে, লড়াই করে তো আর পারবো না, দেখাই যাক  একটু বসে, যদি দেয়! তা সিঙারাওয়ালার ওসব ভাবাবেগ নেই। জানে এ মহিলা স্রেফ সিঙারার লোভেই কাছে এসেছে, সুতরাং আরাম করে তারিয়ে তারিয়ে সে সিঙারা শেষ করল। তারপর,  জল খেতে গেল, যেখানে "ড্রিংকিং ওয়াটার" লেখা সেখান থেকেই। এবং কল ঘুরিয়ে জল নেই দেখে অন্য জায়গার অপরিশ্রুত জল না খেয়ে লেজ নেড়ে চলে গেল। হনুমান হলেও কলেরার ভয় আছে যথেষ্ট! 
সিঙারা খোর

একটুও কি দেবে না?

লোকগুলো গাধা নাকি! এখানে ড্রিংকিং ওয়াটার লেখা ওখানের নোংরা জল খাচ্ছে!


হাঁচোড়পাঁচোড় করে দুর্গজয় করা হল। রাস্তায় কত রকম মানুষ দেখলাম। বছর কুড়ি বাইশের৷ বাপ আরো ছোট, অত্যন্ত রোগা মা, তাদের বাচ্ছাকে নিয়ে এসেছে।  এ দুর্গ যখন তৈরী হয়েছিল,  লোকেশন বুঝেই তৈরী হয়েছিল। দূর দূর অব্দি ফাঁকা প্রান্তর, সৈন্যদল আসলেই কামান দাগা যাবে। সেসব কারন, সেসব সৈন্য, সেনাপতি, অস্ত্র সব মরে হেজে গেছে। এখন সেখানে একটি মানবক আর দুটি মানব চড়া রোদ, অর্থনৈতিক অবস্থা উপেক্ষা করে বেঁচে থাকা উদযাপন করছে। কিংবা কোনো ফোকরে, যেখান থেকে নজর রাখা হত স্রেফ কে আসছে কে যাচ্ছে, সেখানে নিবিড় ভাবে বসে স্বপ্ন বুনছে, প্রাকৃতিক শোভা দেখছে। ইতিহাসে এদের কথা লেখা থাকবে না, কে কবে যুদ্ধ জিতেছিল, কে কবে হেরেছিল, কার সাথে কে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল সেটুকুই লেখা থাকবে, বড্ডজোর আধুনিক ইতিহাসের ধারা মেনে, কোন সময়ে কোন কাজ কিভাবে সে সময়ের ডেমোগ্রাফি বা সম্পর্ক বদলে দিয়েছিল সেই অব্দি। কিন্তু একদম ধর্তব্যের মধ্যে না আনা মানুষও কেমন করে জীবন উপভোগ করতো তা স্রেফ এই রোদ ঝকঝকে দিন, আর এই দুর্গ মনে রেখে দেবে। কে জানে রাত হলে সবাই চলে যাবার পর, ওদের ইতিহাস খাতায় ওরা কোনটা লিখে রাখে, অকারণ হাসি না কঠিন লড়াই....


ওই যে উঁচু পাহাড়টা ...ওইটেয় উঠবো






দুর্গ জয়ের পর


দুর্গ জয় করে হাসি মুখে পোজ দিতে হয়





এককালের বিরাট ক্ষমতাশালী...




উঁচু থেকে চারপাশ



রাস্তাও বটে , নজরদারীর জায়গাও বটে







Tuesday, March 7, 2023

বসন্তোৎসব

যাই বলো দোল দুর্গোৎসব এসব হলো উৎসব,  আর উৎসব করতে লাগে জন। জন না থাকলে সে উৎসব ফাঁকা ফাঁকা।  আমরা হলুম জাত অসামাজিক, পাড়ায়,  অফিসে, কোত্থাও আমাদের বন্ধুর সংখ্যা বেশী ছিল না কোনোদিন। ফলে নিজেদের গালে রঙ মাখিয়ে আমোদ করি, তাইতে যে ফূর্তি হয়না তা নয়। কিন্তু যেন মন খুঁতখুঁত করে,  খুব হুটপাট হুল্লোড় করতে পেলে ভালো হত। সে যেমন বন্ধুরা মিলে এক দুবার দৌড়ঝাঁপ করে রঙ খেলা হয়েছিল অমন করে৷ এখন মনে হয় জোর করে রঙ মাখানোটা অভদ্রতা কর্মসূচীতে পড়ে। তা জোর করে কিছু করাটাই খারাপ বটে কিন্তু ওই যে হুটোপুটি করে মাখানোর আনন্দটাও তো অস্বীকার করা যায়না, অন্তত বন্ধুদের ক্ষেত্রে।
আজ আশ্চর্য এক জিনিস দেখলাম, আজকাল সকালে বেশ চড়া রোদই হয়। সে রোদে জনা কুড়ি হলুদ শাড়ি,আবিরের থালা হাতে মহিলা বসন্তোৎসব করতে বেরিয়েছে। একটা টোটোতে একটা মাইক আর জনা দুচার পাঞ্জাবী পরিহিত পুরুষও আছে অবশ্য। সে যা হোক আশ্চর্য সেটা না, আশ্চর্য হল, আজকাল যেমন কথায় কথায় রিল বানাতে লোকে নেচে বেড়ায় বা ভ্লগ বানায় যত্রতত্র তেমনই একজন মহিলা ওই চড়া রোদে, একটা পুরো গান রাস্তায় নাচলেন। কারোর হাততালি না, রাস্তার কোনো পথচলতি মানুষের এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে দেখা না তাও তার উৎসাহের কম নেই! ওহ আচ্ছা ভিডিও চলছিল।  তাই বলো! 
এই শুরু হল, টিপটিপ বরসা পানি, উফ হোলি হায় হোলি গান,  পাশেই ক্লাব! এই জোর করে গান শোনানোটা কেন এখনো অভদ্রতা কর্মসূচীর পার্ট হল না?
মফস্বলেরর বসন্তোৎসব আসে পাতায় পাতায়। বসন্তের যে নির্জন উদাসীন গাম্ভীর্য,  তা যে আমাদের দু কামরার ঘরটায় বসে থেকে অফিস করতে করতে আরো টের পাই। সমস্ত জায়গাটা শান্ত হয়ে যায়, কোনো কোনোদিন হয়ত কলেজের ছেলেপুলেদের গিটারের আওয়াজ ভেসে আসে, বা কোনো কোনোদিন তাদের বসন্তোৎসবের উল্লাস। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে দেখি ভীরু কানাইকে তাড়া করেছে তার রাধা, হাওয়ায় গোলাপি আবির উড়িয়ে, যেমন হয়ে এসেছে, যেমন হয়ে থাকে। 
এসব যখন থাকেনা তখন দুপুরের দিকে হুট করে চোখ তুলে দেখি কচি কচি সবুজ পাতায় হলুদ রঙা বসন্তবৌরি এসে বসেছে, তাকে কন্ট্রাস্ট দিতেই যেন,  একটা ফিঙে বসে থাকে পাশের শিমূল গাছের ডালে। শিমূল ফুল ফুটলো তারপর লাল কার্পেট বিছিয়ে ঝরেও গেল। এখন পাতাঝরার মরশুম আর পাতা গজানোর মরশুম একসাথেই চলছে। রোদের তেজ এর মধ্যেই বেশ চড়া হয়ে এসেছে, এখানকার রোদ বুকের ভেতরটা শুকিয়ে দেয়, কোনো ফালতু আর্দ্রতা থাকলে এসব অঞ্চলে এলে শুকিয়ে নেওয়া যায়। অবশ্য অভ্যেস না থাকলে নাক টাক জ্বালা করতে পারে। ঝরা পাতা পরে নীচটা ভরে থাকে, আর দুপুরের দিকে দমকা হাওয়া এসে সাফ করে মাটি বের করে। মাটির রঙ, ঝরা পাতার হলুদ রঙ, কিছু থেকে যাওয়া লাল শিমূল, আর নতুন হওয়া সবুজ পাতার দারুন এক রঙীন ছবি হয়ে যায় যেন। আমি অ্যালার্জির ভয় ভুলে হাঁ করে দেখি, রঙের উদাসীনতার এই ঘূর্ণিটা ঢুকে যায় মনের মধ্যে। আর তারপর বসন্তৎসবের বাকিটুকু সারতে জ্বরের ঘোর হয় যখন, চোখ বুজে হলুজ সবুজ লালের ওই পাকটাই দেখি। 
রঙীন হোক সবার জীবন।
             এই যে আমাদের দুজনের রঙ খেলা 

Sunday, February 19, 2023

ছুটিতে ছোটাছুটি (ইলোরা)

অজন্তার গুহায় সোনা রঙ এসে পড়ছে আমরাও এই শিল্পীর হাতে তার ক্যানভাস ছেড়ে বাসের দিকে এগোলাম।  ব্যাপারটা আমার ভালো লেগেছে। গাদাগাদা গাড়ি বাইক আসবে না এই অব্দি, ট্রাফিক জ্যাম হবে না। পর্যাপ্ত সরকারী বাস আছে টি জাংশন থেকে অজন্তার কাউন্টার অব্দি,  টিকিট কেটে উঠে পড়ো।  সেই যে বলেছিলাম একজন খুব সাহায্য করেছিল বাস অব্দি পৌঁছে দিয়ে, মনে আছে? তার দোকানে যেতেই হবে। তা তিনি তো পাক্কা সেনর অলিভেরা! এক কাপ চা আর চাট্টি বাজেকথা বলে একগাদা জিনিস গছিয়ে দিলো আমাদের মতো শপিং বিমুখ লোকেদেরও।
 সারাদিন ট্রেন পৌঁছবে কিনা,  অজন্তা দেখা হবে কিনা, তারপর অজন্তায় পৌছে সেসব দেখা সব মিলিয়ে এত উত্তেজনায় ছিলাম, টের পাইনি,  এখন পেলাম ভয়ানক খিদে পেয়েছে আর শরীরও কিঞ্চিৎ বিশ্রাম চাইছে। স্থানীয় খাবার খেতে আমরা তিনজনেই খুব উৎসাহী থাকি, সেটা মনিপুরী অদ্ভুত স্বাদের স্যালাড হোক, ভেগান বাল্টিক খাবার হোক কি চেনা মহারাষ্ট্রের বড়া পাও হোক। 
বড়াপাও, চা, মারাঠি পকোড়া খেতে খেতেও সারাদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা উত্তেজিত, চিকু ও তার মা থেকে গাম্বাট দস্যু যারা চকচকে জিনিস দেখেই সোনা মানিক ভাবে, সেনর অলিভেরার মতো দোকানদার...শেষমেশ আদনানজি ঘেঁটি ধরে তুলে না নিলে মনে হয় আওরাঙ্গাবাদ পৌঁছনো হত না!

আওরাঙ্গাবাদ থেকে ইলোরা কাছেই। সুতরাং আমরা পয়সা বাঁচাতে একটা অটো নিয়ে পাড়ি দিলাম। যাবার পথে প্রথম হল্ট আওরঙ্গজেবের সমাধিতে। সত্যি বলতে এটা নিয়ে আগে থেকে কিছুই পড়ে আসিনি তাঁর ফলে একটা বিস্ময় অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্যে। এই লোকটার সম্পর্কে ইতিহাসে মোটামুটি সবাই পড়েছে। তাজমহল দেখতে গিয়ে শুনেছি শাহজাহানকে বন্দী করে রেখেছিল , বাকি ভাইদের খুন করে সিংহাসনে বসাটা ছেড়েই দিলাম । এর সাথে আছে জিজিয়া কর ফের চালু করা ,নানান গোঁড়ামি সব মিলিয়ে আওরাঙজেব মনে হয় সব চেয়ে আনপপুলার মুঘল সম্রাট। অথচ তার কবরটা একটা কাঁচা কবর। আগে চালা মতো ছিল ইংরেজ শাসকের অনুরোধে হায়দ্রাবাদের নিজাম চারপাশটা পাকা করে দেন। কিন্তু এত সাধারণ কবর মনে হয় মুঘল কোনো কর্মচারিরও হয়নি! আর আশ্চর্য এই যে কবরে বন তুলসীর ঝাড়! এটাও নাকি স্ম্রাটের ইচ্ছায়! জানিনা এটা কতটা সত্যি কিন্তু তুলসীর ঝাড়টাও মিথ্যে না , কাঁচা কবরটাও না! ভাবতে অবাক লাগে না?  আওরঙ্গজেবের মতো একজন রাজার শেষ ইচ্ছে আকাশের আচ্ছাদনে শুয়ে থাকার? জিজিয়া কর চালু করা একজন রাজার কবরে তুলসীর ঝাড়! সত্যিই কোন আমিটা যে আসল আমি কে তাঁর খবর রাখে!



ইলোরা সম্পর্কে প্রথম জানি কোনো ইতিহাস বই থেকে নয়, ফেলুদার কাছ থেকে নাকি বলা ভালো সিধুজ্যাঠার থেকেই। কৈলাস মন্দির আর দশাবতার গুহা নিয়ে আলাদা আগ্রহ ছিলোই। কাল অজন্তাতেও দেখেছি, আজ ইলোরাতেও দেখলাম, ১৫ বছর অব্দি টিকিট লাগে না বলে সারা মহারাষ্ট্রের স্কুল প্রায় হাজির। ভীড়ে ভীড়াক্কার। তবে আমার ব্যপারটা ভালোই লেগেছে, বুঝুক না বুঝুক আমাদের দেশের ইতিহাস সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হোক, ছোট বয়সে ব্রেন তাজা থাকে, একেবারেই বুঝবেনা তাও না। বড় হয়ে কারো হয়তো উৎসাহ হল কে বলতে পারে!  ইলোরায় গেট দিয়ে ঢুকেই কৈলাশ গুহা। কিন্তু আমরা নাম্বার অনুযায়ী দেখবোই ঠিক করেছিলাম। জৈন, বৌদ্ধ আর হিন্দু এই তিন ধরনের ধর্মের কাজ অনুযায়ী তিন ধরনের গুহা। ১-১২ বৌদ্ধ গুহা, ১৩-২৯ হিন্দু আর ৩০-৩৪ হল জৈন৷ এবং অবশ্যই স্থাপত্যকাল অনুযায়ী নাম্বারিং না, পজিশন অনুযায়ী।  ইলোরা পড়ার কথা ছিল আমাদের এরকম, ময়ূরাক্ষী পড়বে বৌদ্ধ গুহা, আমি আর সৌরভ হিন্দু গুহা ভাগভাগ করে। তো কার্যক্ষেত্রে দেখা গেলো আমি আর সৌরভ কিছুই পড়িনি। মানে ঐ দশাবতারে বিষ্ণুর দশ অবতারের কাহিনী আছে, তাছাড়া শিবের নানান মূর্তি আছে, কৈলাস মন্দিরটা একটা সিঙ্গেল পাহাড়কে কেটে কেটে করেছে, এরকম যা সবাই জানে ওটুকুই। বৌদ্ধ মন্দির গুলোয় , বজ্রপানি, পদ্মপানি ,তারা, আর বুদ্ধের মূর্তি। একসাথে পড়তে বসার জায়গা। একতলা, দোতলা, বারান্দা, সেই বারান্দাতেও নানান কাজ। হাঁ করে দেখতে দেখতে ঘুরি।
ওইদিক থেকে শুরু

এটা তিনতাল , কেমন হোটেল এর মতো দেখতে না?

বৌদ্ধগুহা  দেখতে দেখতেই পায়ের অবস্থা খারাপ। এহেহে ফিটনেসের তো যাচ্ছেতাই অবস্থা রে!! জল খেয়ে টুপি বাগিয়ে এগোই। দশাবতার গুহায় ঢুকে থতমত খেয়ে যাই। সিঁড়ির দেওয়ালেও নানান কাজ, অর্ধনারীশ্বর এর মূর্তি একটাই দেখলাম এ তল্লাটে। দোতলার হলে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে বিষ্ণুর দশ অবতার শুধু না,  শিবেরও নানান রূপ খোদাই করা৷ স্রেফ ছেনি হাতুড়ি দিয়ে এ কী করেছে হ্যাঁ!! ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যাটা ভাবলেও বমকে যেতে হয়! এই সব পিলার কেটে বের করা,  কতটা কাটলে ধ্বসে যাবে না কতটা কাটলে হাজার হাজার বছর দাঁড়িয়ে থাকবে এ বিদ্যা তখনকার ভারতবর্ষ জানতো, সে বিদ্যা আমরা হারিয়ে ফেলেছি, আবার আমাদের নতুন করে শিখতে হয়েছে সব। ধাতু বিদ্যা থেকে চিকিৎসা থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে স্থাপত্য।একটা জাতির পরাজয় কত দিকে হয় হ্যাঁ! আরো বড় করে ভাবলে এ আসলে মানুষের পরাজয়। যা জানতাম তাকে আরো প্রসারিত না করে সেটা আবার করে শিখে কত সময় নষ্ট করতে হয়েছে, আরো এগোনো হল কই তাহলে? এ যেন বৃত্তের মধ্যেই এগিয়ে যাওয়া! আনমনা হয়ে গেছিলাম, ময়ূরাক্ষীর ধমকে অপরাধী মুখ করে তাকাই, সত্যিই এই গুহাটা নিয়ে পড়া উচিত ছিল। কোন মূর্তি কোন গল্পকে বলছে এ আবিষ্কার সহজ হত। একটু আগের আমার ভাবনারই যেন ছোট স্কেলে ছবি!  যাকগে, যা গেছে যাক ভেবে ময়ূরাক্ষী বই দেখতে লাগলোয়ার আমি শর্টকাটে বিশ্বাসী, আমাদের বয়সী কি আরেকটু ছোট হবে একজোড়া ছেলে মেয়ের পিছু পিছু দেখছিলাম। ওরাও পড়াশোনা করে এসেছে।  একে অপরকে বলছিল আমি শুনছিলাম, চুরি করে অন্য গাইডদের থেকে যেমন শোনা হয় অমন করে। তা দেখা গেল ময়ূরাক্ষীর পড়া আর আমার শোনা দুই'য়ে মিলে ব্যপারটা বোঝা গেছে। বাঁ দিকের মূর্তিগুলো শিবের নানান মূর্তি,  কোনোটা শিব পার্বতীর বিয়ে, কোনোটা তাদের পাশাখেলা, কোনোটা ত্রিপুরাসুর বধ এরকম আর ডানদিকের দেওয়ালে মৎস্য কূর্ম বরাহ ইত্যাদি অবতার। আবিষ্কারের বেশ একটা আনন্দ আছে। মূর্তি গুলো দেখে দেখে আরে এটা তো ওই ওটাতো সেই বলে খুঁজে পাওয়া, কালের স্রোতে ভেঙে যাওয়া বা পাথর মসৃন হওয়া উপেক্ষা করেও। নটরাজ মূর্তি কিংবা গড়ুর দেখে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। যে শিল্পীরা এসব বানিয়েছিল তাদের মনে মনে নমস্কার করি।



ভগীরথের গঙ্গা আনা

দশাবতার যদি ট্রেইলার হয় তবে কৈলাস মন্দির হল আসল সিনেমা। মন্দিরের পাশ দিয়ে একদম পাহাড়ের উপর উঠে ড্রোন ভিউ পাওয়া যায়। বাপরে কী বানিয়েছে রে!!! এটুকুই শুধু বলতে পেরেছিলাম আমরা। ডিটেইল আর্কিটেকচারে আমি যাচ্ছি না, সেসব আর্কিওলজিকাল সাইটেই মিলবে। একদম নভিস একজন লোক, যেমন দেখেছিল সে কথাই বলব। একটা মনোলিথিক পাহাড় কেটে কেটে মন্দিরের স্ট্রাকচার দেওয়া স্রেফ ছেনি হাতুড়ি দিয়ে এই ব্যপারটা ধারনা করতেই খানিক সময় লেগে যায়। মূল মন্দিরের সামনে নন্দী মন্দির যেমন তৎকালীন মন্দিরের সামনে থাকতো। তারপরের মন্ডপ অংশের মাথায় চারটে মিষ্টি মতো সিংহ পাহারা দিচ্ছে। সিংহ মিষ্টি মতো? আজ্ঞে হ্যাঁ তখনকার দিনে সিংহ তো এঁরা দেখেনি, ফলে মুখের ভাব তেমন সিংহমাফিক নয় কিন্তু তাতে কোনো অসুবিধে হয়না। কোনো কোনো জায়গায় সিংহ আর হাতির মূর্মতি একসাথে । লড়াই করছে। সিংহ জিতছে। অ্ন্রেআসলে হিন্রদু ধর্ম ফের মাথা চাড়া দিচ্ছে।  চার পাশে ছোট ছোট আরো মন্দির ঘিরে আছে। এবং প্রতিটা মন্দিরের গায়ে পাথর কেটে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানান মূর্তি। কখনো রাবনের কৈলাস পর্বত ধরে ঝাঁকানো(মূল মন্দিরে তো বটেই আরো অনেক জায়গায় দেখলাম এটা),  দশাবতার, শিবের বিভিন্ন রূপ। মন্দিরের প্রবেশের মুখেই আছে গজলক্ষ্মী হাঁ করে দেখার জো নেই অবশ্য। পেল্লায় ভীড়! কৈলাস মন্দির শুনেই আর সব থেকে ইজি অ্যাক্সেস হওয়ায় পিলপিল করছে লোক, নন্দী মূর্তি অর্থাৎ ষাঁড়ের গলা জড়িয়ে সে কী ছবি তোলার ধূম। মাঝে মন্ডপে যেখানে শিবের দক্ষিনামূর্তি,  যা কিনা ছয় হাতের আর সিংহ পরিবেষ্টিত আসনের উপর আসীন দেখার জন্য বেশ লড়াই মতো করতে হয়।  কারন এরপরেই আছে মূল গর্ভগৃহ। সেখানে শিবলিঙ্গের পুজো দেওয়ার জন্য কোটি কোটি লোক ঢুকছে! সেই ভয়ানক ভীড়ে পেরিয়ে শিবলিঙ্গ দেখার শখ ছিল না। আমরা ঘুরে ঘুরে মূল মন্দিরের কাজ দেখছিলাম। এত ভীড়, ক্লান্ত দেহ সব উপেক্ষা করেও বারবার অবাক হচ্ছিলাম কী সেই বিদ্যা যা কিনা একটা পাহাড়ের মাথা উড়িয়ে দিয়ে,  সেটাকে শেপে এনে একটা আস্ত ত্রিস্তরীয় মন্দির বানিয়ে ফেলে!! 
বার বার মনে হয় আমার এই যে প্রাচীন সব শিক্ষা বিদ্যা আমরা হারিয়ে আবার নতুন করে শুরু করছি আসলে আমরা যেন একটা বৃত্তেই ঘুরে চলেছি। এই ইঞ্জিনিয়ারিং যদি আমরা বহন করতাম তাকে আরো উন্নত করতে পারতাম, কিন্তু তা হারিয়ে গেল, আবার আমাদের নতুন করে শিখতে হল! 

কৈলাসের ড্রোন ভিউ(মানে পাহাড় থেকে তোলা আর কি)






কৈলাস মন্দিরের পিছনের পাহার থেকে



উপরে শিব-পার্বতী পাশা খেলছে। নীচেরকি ভালো বুঝতে পারছিনা, কারো মনে পড়লে কমেন্টে বলে দেবেন হ্যাঁ?






মৎস্য অবতার(কৈলাস মন্দির)

নৃসিংহ অবতার(দশাবতার গুহা)

এটা কি বলিরাজের গল্পটা? মনে পড়ছে না




চার দিকে প্রহরারত সিংহ

কৈলাস মন্দিরের একটা মিনার

দশাননের কৈলাস ঝাঁকানো

গজলক্ষ্মী- কৈলাস 


সিংহটা কেমন হাসিমুখে লড়াই করছে! এটা আসলে রূপক, হাতিকে হারিয়ে দেওয়া অর্থে হিন্দু বৌদ্ধ ধর্মকে হারাচ্ছে, হাতি জেতা মানে বৌদ্ধ ধর্মের বাড়বাড়ন্ত আর একই রকম মানে দুজনেরই প্রায় একই রকম প্রতিপত্তি


কৈলাস মন্দিরের মূল অংশের ছাদের কাজ




এটা বরাহ অবতার ,দশাবতার গুহা (কৈলাস মন্দিরেও একে পাবেন)




কৈলাস মন্দির পেরোলে ভীড় কমে যায়। কারণ এর পরের রাস্তা একটু বেশীই চড়াই উৎরাই আর ডিসেম্বরের শেষ হলেও বেশ ভালোই সূর্যের তাপ। একুশ নাম্বার গুহায় ঢোকার মুখেই একদিকে যমুনা আর একদিকে গঙ্গার মূর্তি। এ জিনিস আর কোনো গুহায় নেই। ভিতরে শিবের বিয়ে, সাত মায়ের সাথে গনেশ, রাবনের কৈলাস মন্দির নাড়ানো, কালী, কার্তিক এরকম নানান পুরানের গল্প পাথর কেটে কেটে বানানো। বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা শেষ এখন স্রেফ মগ্ধ হয়ে দেখে চলেছি। বিশেষ করে ঢোকার মুখে গঙ্গা যমুনার মূর্তি বাহন সমেত বড় সুন্দর। যমুনারবাহন কচ্ছপ অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে কিন্তু প্রতিটা মূর্তির ডিটেইলিং অবাক করে। সে শিব দূর্গার বিয়ের হোক, কিংবা পার্বতীর তপস্যাক্লিষ্ট মূর্তি হোক৷ 
গঙ্গা

কালী...করাল বদনা



এর পর থেকে রাস্তায় একটাও গাছ নেই, জলের জায়গাও পাচ্ছিনা। পুরো রাস্তায় খালি আমরা তিনজন। খাঁ খাঁ করছে চারদিক দুপুরের তাপে। ২৯ নাম্বার গুহা হল শেষ হিন্দু গুহা। এটার চলতি নাম সীতা কি নাহানি। যদিও সেটা ভুল করেই, গুহার মুখে গঙ্গা দেবীর মূর্তিকে সীতার সাথে গুলিয়ে এমন ভজঘট করে ফেলেছে। পাহাড়ের পাশ দিয়ে সরু রাস্তা, তার অন্যদিকে ওই সীতা কী নাহানি পুকুর। এ পুকুরে জল পরে ২৯ নাম্বার গুহার মাথা থেকে আসা ঝর্ণার জল। বর্ষায় এই রাস্তা বিপজ্জনক হবে কিন্তু দেখতেও ভারী ভাল্লাগবে বোঝাই যায়। এই গুহাটা বেশ মজার, তিনদিক খোলা। ভিতরে নটরাজ মূর্তি, শিবের  অন্ধকাসুরের বধ, শিব দুর্গার বিয়ের মূর্তি খোদাই করা। ২৯ থেকে বেরিয়ে রাস্তাটা আরো মারত্মক৷ সূর্য মাথার উপর, জল শেষ রাস্তা যেন শেষ আর হয়ই না। এরপর আছে জৈন গুহা গুলো। রোদে গরমে প্রায় ধুঁকতে ধুঁকতে জৈন গুহার কাছাকাছি পৌঁছে ছায়া মিলল। জলও। খানিক বসে দেখতে চললুম ফের।

ভরদুপুরে এই স্ট্রেচটা হাঁটতে জিভ বেরিয়ে গেছিলো!


এই গুহায় আছে তীর্থঙ্কর দের মূর্তি। একজন তীর্থঙ্কর নাম গোমতেশ্বর,  সে ছিল আদিনাথের ছেলে। মোক্ষলাভের জন্য  সে এমন তপস্যা করছিল যে তার বাবার আগেই সে মোক্ষ অএয়ে যায়। তবে যতদিনে মোক্ষ পেয়েছিল ততদিনে তার শরীর ঘাসপাতা, শিকড়ে ঢেকে গেছে। আচ্ছা হাড়ে দুব্বো গজানো কী একে দেখেই বলে লোকে? যাই হোক, তীর্থঙ্করদের মূর্তি হল একেবারে মিলিটারি সাবধান টাইপ। কোনো মুদ্রা না কিছু না সোজা হাত পা,  শরীরের কোনো অঙ্গের সঞ্চালন নেই। অর্থাৎ জগৎ থেকে সে বিমুক্ত,  জামাকাপড় হোক বা কিছু তার অপ্রয়োজনীয় কিছুতেই তার কিছু যায় আসে না। জৈনদের গুহাগুলো খুব অর্নামেন্টেড। মানে প্রতিটা স্তম্ভ, ছাদ কারুকাজ করা। গোমতেশ্বরের মূর্তিতে অবশ্যই লতাপাতা উঠে এসেছে এমন রিলিফ। আর ৩২ নাম্বার গুহায় আছে কুবের আর অম্বিকার মূর্তি।এনারা সম্ভবতঃ যক্ষ ও যক্ষী কিন্তু জৈনধর্ম নিয়ে আমার জ্ঞান কম তাই এদের উপস্থিতির বিস্তারিত খবর জানিনা। ৩২, ৩৩ আবার ইন্টারকানেক্টেড। আলো আঁধারির মধ্যে দিয়ে দিয়ে এক গুহা তগেকে আরেক গুহায় যাওয়াও কম রোমাঞ্চকর নয়!

জৈন গুহা - ইন্দ্রসভা না কী যেন নাম ছিল, ঢোকার মুকে













জৈন গুহার সিলিং এর কাজ


 এইসা উঁচু উঁচু সব পাথরের সিঁড়ি সারা ইলোরা জুড়েই।তখনকার দিনের মানুষের বাত টাত ছিল না মনে হয়! দোতলাটা প্রশস্ত, কিন্তু সিঁড়ি গুলো সরু সরু। আমাদের আগেইই কেউ একজন ঘুরে গেছে জুঁই ফুলের আতর মেখে, জানলা না থাকায় কয়েক হাজার বছরের পুরোনো গুহা সেই আতরের গন্ধ ধরে রেখে দিয়েছে বহুক্ষণ।  ইলোরায় ঘুরতে ঘুরতে বড় অদ্ভুত লাগছিল।  বিস্ময় মুগ্ধতা এসব ছাপিয়ে অন্যরকম মনে হওয়া, যা কাল অজন্তাতেও হচ্ছিল। এইসব গুহা পাথর এরা কতকাল ধরে কতরকম লোক দেখেছে, তখনকার দিনে ধর্মেও উগ্রতা ভালোই ছিল তাও কেন কে জানে এইখানে কেউ কারোর কাজ নষ্ট করে দেয়নি। হয়ত শিল্পীরা ছিল বলেই পারেনি অন্যের কাজ মুছে দিতে, নিজেদের আলাদা জায়গা খুঁজে নিয়েছে। যদি কাল একটা বহুমাত্রিক প্রবহমান জিনিস হয়,তবে কোনো মাত্রায় এই গুহায় কাজ শিল্পীরা সব বসে আছে,কোনো মাত্রায় সবে গুহা আবিষ্কার হয়েছে, কোনো মাত্রায় আমাদের মতো কেউ অবাক চোখে দেখছে!
সূর্য ডুবে এলো প্রায়। আমাদের মন ভরে আছে কিন্তু শরীরের হা ক্লান্ত দশা। মূল রাস্তা দিয়ে ফিরে কৈলাস মন্দিরের সামনে বসে রইলাম খানিক। বসে বসে আপন মনে কী জানি ভাবছি হঠাৎ খকখক করে কাশির আওয়াজে মাথা ফিরিয়ে দেখি একটা বড় বাঁদর খুব কাশছে ঠিক পিছনে বসে! মুখে হাত চাপা মানুষেই দেয়না তো বাঁদরে! সে না দিক এর সামনে থাকা বিপজ্জনক!  ফস করে চাঁটিয়ে দিলেই চিত্তির।ফিরতে ফিরতে দেখি, এ চত্বরে যে সব বাঁদরদের দল ছিল তাদের বিকেলের ছুটি চলছে। বাবা বাঁদর খোকা বাঁদরকে নিএ বিকেলে বেরিয়েছে। একটা একতু বেশী ছোট একটা আরেকটু বড়। নিজের মনে বসে অ্টাআছে বাবা বাঁদর, কাল ফের কাকে চাঁটাবে , কোত্থেকে চাট্টি ফল জোটাবে সেসব ভাবনাই হয়তো। কিংবা সবাই চলে গেলে কোন গুহায় ঢুকে বুদ্ধ না শিব না গোমতেস্বর না বিষ্ণু কার মাথায় চড়া যায় এইসব গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাভাবনা চলছে।  এই টুকু ছানা বাঁদরটা তার বাবার এই মস্ত লেজ ধরে ঝুলছে। নেহাতই ছোট বলে কিংবা বাবার ছদ্মবেশে মা কিনা কে জানে ধাড়িটা কিচ্ছুই করলো না, স্রেফ ইগ্নোর করলো ওই লেজ ধরে দোলাটা। সূর্য তখন কৈলাস মন্দিরের পিছনে ডুবছে। 

Thursday, January 19, 2023

ছুটিতে ছুটোছুটি (অজন্তা কাণ্ড)

সেবার এক বন্ধুর বাড়ি গেছি, আড্ডা খাওয়া দাওয়া চলছে,  তারপর আমি থাকলে যা হয় , একটা বেড়ানোর কথাও হচ্ছে। দেখা গেল, আরে তিনটে দিন খামচা মেরে পাওয়া গেছে তো এ বছরের শেষে (মানে ২০২২ এর শেষে), কোথাও তো যাওয়াই যায়!! অনেকদিনের সাধ ছিল অজন্তা যাওয়ার। বয়স বাড়ছে, পায়ের জোর কমছে আর অজন্তার ছবিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শুনছি ক্রমেই। চলো তবে! কিন্তু সবাই যা প্ল্যান দিচ্ছে তাতে তো তিন+দুই(শনি রবি) হবে না পাঁচদিনে। হবে না একেবারেই? আচ্ছা দেখা যাক দেখি? খুব ভয়ানক তোলপাড় করে একটা খুব হেক্টিক প্ল্যান দাঁড় করালাম। বুধবার ট্রেনে চড়ব, বেস্পতিবার মাঝরাতে নামবো, ওখান থেকে  অজন্তা, সেদিনই সন্ধ্যেবেলা ঔরাঙ্গাবাদ। পরেরদিন ইলোরা আর আওরঙ্গজেবের সমাধি। তারপর দিন ঔরঙ্গাবাদের গুহা,  বিবিকা মুকবারা আর দৌলতাবাদ ফোর্ট দেখে ট্রেনে চেপে বসব। দিয়ে পরদিন হাওড়া। সহজ সরল নিষ্পাপ প্ল্যান। কিন্তু এরকম নিষ্পাপ প্ল্যানে ময়ূরাক্ষী আর সৌরভ ছাড়া কাউকে পেলাম না। তাতে কী আর আমায় দমানো যায়। সুতরাং টিকিট কেটে বসে রইলাম, যদিও ফেরারটা ওয়েটিং।যা হবে দেখা যাবে!

যাওয়ার আগের দিন রাতে পেলাম মেসেজ, সাড়ে পাঁচঘন্টা রিস্কেডিউল হয়েছে ট্রেন। হয়ে গেল! ঠিক আছে ভুসাবালে পৌঁছবার কথা পৌনে দুটোয়,পাঁচ ঘন্টা পর হলেও ক্ষতি নেই, এমনিতেও হোটেল বুক করিনি ট্রেন লেট করে বলেই।  কিন্তু জীবনের হিসেব কবেই বা অত সোজা হয়েছে! কিন্তু সে কথায় পরে আসছি। অজন্তা ইলোরা দেখতে গেলে খানিক পড়াশোনা করে যাওয়া ভালো। না হলে দেখা হয় বটে, ভালো রস পাওয়া যায় না। আমরা দু কপি অজন্তা অপরূপা কিনে তো ছিলাম, কিন্তু পড়া হয়নি কিছুই প্রায়। মানে বই হিসেবে অসামান্য কিন্তু যা হয় আর কি। শেষে লাস্ট মিনিট সাজেশনের মতো করে রিসেন্ট গেছে এমন লোক, নারায়ণ সান্যাল, একটা গাইড বই, একটা দুটো ব্লগ দেখে গুহার নাম্বার মার্ক করা হল। এবার সেই সেই গুহাগুলোই মূলতঃ পড়া হবে। বাকি পড়ার সময় নেই আপাতত! ছবি খুব অল্প গুহাতেই টিকে আছে। বাকিগুলো পড়ে পড়লেও একই হবে। বলাই বাহুল্য এ দলে আমি হলুম সবচেয়ে খারাপ ছাত্র। তাই আমি বালিশে হেলান দিয়ে হ্যাঁ হ্যাঁ ইলোরার পড়াশোনাটা করছি তো বলে বাইরে তাকিয়ে রইলুম। বেশ খানিকক্ষণ পড়াশোনা করে বাকি দুজন ক্রমেই নেতিয়ে পড়তে লাগলো। আমিও নেতিয়ে পড়ছিলাম, তবে সে পড়ার কারনে না, পড়েছি ঘন্টা! আমি স্রেফ কোন গুহা কোন ধর্মের,  কী বৈশিষ্ট্য এটুকু দেখে রেখে দিয়েছি। আমি মুষড়ে পড়ছিলাম, গাড়ির লেটের বহর দেখে!

সাড়ে পাঁচ ঘন্টা ক্রমে বাড়তে লাগলো। এত পড়াশোনা এত প্ল্যান, এত কষ্ট সব যে বৃথা যায় রে! রাতে মরীয়া হয়ে একটা ক্যালকুলেশন করলাম, যদি ট্রেন উনিশ ঘন্টা লেট হয়(মানে ম্যাক্স ধরছি) অজন্তা দেখতে এক ঘন্টা সময় পাই তো থেকে যাবো। পরের দিন আরো কিছু ঘন্টা সময় ঘুরে আওরাঙ্গাবাদ পৌঁছে ফোর্ট দেখে নেবো, তৃতীয় দিন অর্থাৎ শনিবার ইলোরা দেখে ট্রেনে উঠবো। আর যদি এমন হয় শুক্রবার ফোর্ট দেখা হল না, তাহলে চাপ নেই রবিবার ফিরবো ফ্লাইটে। মাথা পিছু এক্সট্রা প্রচুর খরচ হবে বটে কিন্তু আমরা তো জীবনে বেড়ানোটাই প্রায়োরিটি হিসেবে সেট করেছি, আর বেড়াতে বেরিয়ে এরকম হলে কিই বা করা যাবে। অন্য কোথাও কৃচ্ছসাধন করে নেবো না হয়। তবে ট্রেন যে লেটে চলছে এখনো অব্দি, তাতে সম্ভব এখনো। মানে বৃ্হস্পতিবার সকাল দশটা এগারোটা  নাগাদ(মানে আট নয় ঘন্টা লেট) পৌঁছে দিলেও করে নেবো ঠিক।  সকাল হল, সাতটা আটটা, আমাদের হিসেব সব ফেইল এখন। বারবার ট্রেনের স্পীড দেখছি আর eta দেখছি, সে খালি বেড়েই চলেছে। 
ওদিকে আমাদের পাশের সাইড আপারে সহযাত্রী হিসেবে পেয়েছি চিকু ও তার মাকে। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। চিকুর মা খুবই ইংরেজি ভাষা প্রেমী। সারাক্ষণ চিকুকে বলে গেলেন, "চিকু নটি করছ খুব", " চিকু নটি করেনা ", "ও মাই গড, চিকু কী নটি করছে!",  "ওই দেখো কাউ", " নোংরা হয়ে গেছ, নটি করে, এসো ওয়াশ করে দিই"।  একে ট্রেন লেটের চিন্তা তাতে ওই সমানে নটি করোনা শুনে শুনে ইচ্ছে হচ্ছিলো গিয়ে বলি, "বোনটি আমায় দয়া করো,দুষ্টুমি যদি করে করুক, কিন্তু নটি কোরোনা শুনতে পারছি না আর।" যদিও চিকু দুষ্টুমি করেনা, সে সারাক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করে আর কাঁদে। হয়ত এতক্ষনের জার্নিতে সে ক্লান্ত, কিন্তু আমাদের দেশে তো বাচ্ছা মানুষ করতে মোবাইল না মারধোর বা আহ্লাদে মাথায় তোলা। সভ্য ভব্য হয়ে চলা শেখাবে কি! সে নিজেও জানেনা এইটা অসভ্যতা! বাচ্ছার পায়ের ধূলো থেকে পায়খানা সব শুদ্ধ, সেখানে সামান্য ঘ্যানঘ্যান আর কান্নাকাটিতে কেউ কম্লেইন করুক দেখি! ফলে বাচ্ছাটি যখন ট্রেনে একটু চলতে ফিরতে পারছে তার মায়ের দয়া হলে তখন থামছে,  নচেত কাঁদছে। প্রায় ছাব্বিশ সাতাশ ঘন্টা এই যন্ত্রনা সইতে হল। 

প্রায় একটা পঁচিশ নাগাদ আমরা ভুসাওয়ালে নামতে পেলাম। নেমেই প্রায় উড়ে উড়ে গিয়ে আদনানজির গাড়িতে। আদনানজি মোটাসোটা লাল দাড়ির ভালো লোক। এত দেরী হয়েছে তাও চলে যায়নি। রয়ে গেছে। সে আমায় সাঁইসাঁই করে নিয়ে পৌঁছে দিল অজন্তা। সেখানে তার এক বন্ধু দোকানদার, (অবশ্যই তার দোকানে যেন যাই ফেরার সময় সে কড়ারে) আমাদের অজন্তার গুহায় পৌঁছবার বাসে তুলে দিলো। প্রথম গুহায় পৌঁছলাম প্রায় উড়েই বলা যায়! আড়াই ঘন্টা মতো সময় আছে,  যতটা দেখা যায় আর কি। ঘন্টা তিনেক হলে ভালো হত, ঠিক আছে সব ভালো কী আর একসাথে মেলে! 

বহুবার ফাঁকি মেরে বহু ঠেকে শিখেছি পড়াশোনার বিকল্প নেই। জানতে গেলে ওইটি ছাড়া সত্যিই উপায় নেই। এবারে আমি পড়িনি অত কারন জানি বাকি দুজন ও ব্যপারে ডোবাবে না।বিশেষ করে ময়ূরাক্ষী হল একদম কপিবুক ভালো ছাত্রী। যাই হোক, ভাগ্যিস নারায়ণ সান্যাল ছিলেন। অজন্তার উপর এত ভালো কাজ করেছেন তার একটা অনুবাদ হওয়া দরকার। বই পড়ে জাতকের গল্প, কোন দেওয়ালে কোন ছবি আছে,  তার আইডিয়া ছিল।  তাছাড়া আরো একটা বই নামিয়েছিলাম বলেছি আগেই। ওই আবছায়া অন্ধকারে চোখ সয়ে যেতেই সে সব মনি মানিক্য চোখে পড়ে। হ্যাঁ অধিকাংশই আজ নষ্ট হয়ে গেছে কিন্তু আশ্চর্য হয়ে যেতে হয় কী জাদুতে কীভাবে অত বছর আগে অন্ধকার গুহায় এমন আঁকা এঁকে গেছিলেন শিল্পীরা! কালো রঙ দিয়ে আঁকা গুলো অব্দি স্পষ্ট অন্ধকারেও!! কেমন করে?! আমরা আবিষ্কারের মতো করে করে ছবি খুঁজছিলাম। ওই দেখ সিংহিকা রাক্ষসীর প্যানেলটা, ওইটাই মরনাহত রাজকুমারীটা না? ওইতো রাহুল, গোপা আর বুদ্ধদেবের ছবিটা, যেখানে বুদ্ধদেব ভিক্ষাপাত্র নিয়ে আলোকজ্জ্বল হয়ে আছেন। আচ্ছা মহাকপি জাতকের গল্পটা পাওয়া গেল না না? আর ওই তো অবোলোকিতেশ্বর!! আহাহা। সত্যিই করুণা ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী দক্ষ হাতে!! গুহা থেকে গুহায় ঘুরছি আর প্যানেলে প্যানেলে চোখ আটকে যাচ্ছে। কেমন করে চৈত্য এলো, বুদ্ধদেবের মূর্তি এলো, মহাযান সব স্পষ্ট হচ্ছে। মহাপরিনির্ব্বান এর বুদ্ধের মুখে কী অপরূপ প্রশান্তি স্রেফ ছেনি হাতুড়ি দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন!!আপনারা যদি কেউ কখনো অজন্তা যান অবশ্যই পড়ে যাবেন। না হলে স্রেফ "আহা কত সব আঁকা, সব নষ্ট হয়ে গেছে" বলেই চলে আসতে হবে।  নিজের মতো ভেবে নিলেও দোষ কিছু নেই, তবে আরেকটু আনন্দ পাবেন আর কি! 
এইসব পুরোনো জায়গায় গেলেই আমার বড় আশ্চর্য লাগে। আমি হাঁ করা,  মানছি, কিন্তু হাজার  দেড় হাজার বছর আগে এ জায়গাটা কেমন ছিল ভাবতে ইচ্ছে করে। হয়ত সাধনার একটা অংশ ছিল, নির্জন গুহায় অন্ধকারে রঙের মেলা বসানো, নাকি নির্বাসনে যাওয়া লোক বেঁচে থাকার জন্যই রঙ, ছেনি হাতুড়ি হাতে নিয়েছিল! আমাদের বিজ্ঞান বড় পিছিয়ে আছে, এইসব পাথর গাছ সূর্যের আলোয় কত কথা লুকিয়ে থাকে অথচ যোগাযোগের উপায় নেই! অজস্র মানুষের ভীড়ে স্রেফ খাই দাই বগল বাজাই এর জন্যই সব আয়ূ শেষ! পালটা যুক্তিতে বলাই যায় জেনে কী করবে, কথা বলালে নিজের মতো করেই শুনবে, নিজের ইন্টারপ্রিটেশানে, তার চেয়ে বাপু কল্পনাই করে নাও। কিন্তু তাও আমার বড় সাধ হয় গাছেদের সাথে পাথর মাটির সাথে কথা বলতে, হারিয়ে যাওয়া দৃশ্য দেখতে! 

আস্তে আস্তে সূর্য নেমে গেল, সোনার রঙে রাঙিয়ে দিল যাবার সময় চারদিক। আমরাও গুটি গুটি এগোলাম। নারায়ন সান্যাল এর বইতেই পড়েছিলাম, এক গাঁওবুড়ো, অজন্তার রিস্টোরেশনের সময় একদিন এক গুহায় বসেছিল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে। অনেকক্ষন বসে থাকার পর দেওয়ালে তাকিয়ে দেখে একটা ছবি, আরে এ ছবি তো সে এখনো আঁকেনি, এঁকে ফেলে সাহেবদের দেখাতে হবে তো। বাড়ি ফিরে সে আঁকে, সাহেবকে দেখায়। সাহেব অবাক হয়ে বলে এ ছবি পেলে কোথায়? এতো নষ্ট হয়ে গেছে! সত্যিই সেই গুহায় পরে ফিরে আর কোনো ছবিই পায়নি সে আর। নারায়ণ সান্যাল এর একটা ব্যখ্যা দিয়েছেন, আমাদের অবিশ্বাসী মন যাবার আগে বলেছে হয় এ শুনেছিল বাবা দাদার থেকে নয়তো,  কারোর থেকে। কিন্তু গুহায় পৌঁছে, অব্ধকারে চোখ সয়ে যাবার পর আমরাও অনেক ছবি খুঁজে পেয়েছি, যা প্রথমে ঢুকেই পাইনি। না সে ছবি নষ্ট হয়ে যায়নি, এমন না খালি আমরাই দেখেতে পেয়েছি। কিন্তু ওই যে চোখ সয়ে যাওয়ায় কালোর মধ্যেই কালো রঙ দিয়ে আঁকা দেহ খুঁজে পাওয়া এ যেন অলৌকিক।  আমার শিল্পীর চোখ, মন, সাধনা কিছুই নেই, তাতেও আমি যদি প্রায় আবছা হয়ে যাওয়া ছবি, প্রায় মিলিয়ে যাওয়া ছবি খুঁজে পাই কে বলতে পারে অজন্তার সেই হারিয়ে যাওয়া ছবির শিল্পী প্রকৃত এক শিল্পীকে দেখে তার শিল্প দেখিয়েছিল। কিংবা এক মুহূর্তের জন্য হয়ত অন্য কোনো ডাইমেনশনে চলে গেছিল, যেখানে কিছুই হারায় না?