Friday, November 26, 2021

মহারাজ, একি সাজে এলে হৃদয়পুর মাঝে

 নষ্ট ব্যপারটা একেকজনের কাছে একেকরকম। মাস গেলে বিশাল বড় কোনো পদে থাকা লোকের কাছে এক সপ্তা কাজ না করর ঘুরে বেড়ানো হল সময় নষ্ট, কারোর কাছে গান শোনা সময় নষ্ট কারোর কাছে গান হীন দিন মানে নষ্ট।  এত নষ্টের কথা এলো কারন, সেদিন শিমলা ম্যালে যেই না ঝুপ্পুস করে মেঘ নেমে এলো আর তারপর পরেই বৃষ্টি, কানে এলো, 'এরকম আবহাওয়া বেড়াতে এসে দিনটাই মাটি'। আমাদের অবশ্য মোটেও মনে হল না নষ্ট হল কিছু। দিব্যি মেঘে মেঘে ছেয়ে গেল চারপাশটা, তার ফাঁক দিয়ে দিয়ে সেই কতকালের পুরোনো সব স্থাপত্য উঁকি দিচ্ছে, একদুজন স্থানীয় লোক দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে,চারপাশটা বিলকুল ফাঁকা।জুতো ছেড়ে এখন আমার মোজা ভিজেছে টের পাচ্ছি, শীতে কাঁপছি তার মধ্যে ফূর্তিটা আসছে কোত্থেকে হ্যাঁ? 



আসলেই আনন্দ ব্যপারটার জন্য কোনো উপকরণই পর্যাপ্ত না আবার অপর্যাপ্তও না। কতদিন হয়েছিল আমার মনের ভিতরটা কেমন ভেজা খড় হয়ে পড়েছিল। কিছুতেই লম্বা সময়ের আনন্দ আর হয় না। কিছুতেই আগুন জ্বলে না। তারপর ট্রেনের ভোর এলো, চা, নাস্তা- ব্রেড অমলেট, আলুপরোটার হাঁকডাক, চলন্ত গাছপালায় রোদ দেখতে দেখতে ভিতরের ভেজা খড়টা যে শুকোতে শুরু করেছে তা সত্যি বলতে খুব একটা টের পাইনি। মনের ব্যপার স্যপারই আলাদা মশাই, কখন পাক খেতে খেতে পাহাড়ের উপর আর কখন নীচে টের পাওয়াই যায় না! সে যাক বেড়ানোর গল্পে এসব অবান্তর কথা। তা অবশ্য সত্যি বলতে আমার লেখায় বাঁধ ছিলোও না কখনো তেমন, সাহিত্য না এ স্রেফ কিবোর্ডে টাইপ আর কি।


ট্রেনে করে বাংলা পার হয়েও কিন্তু মনে হচ্ছিলো না ভূ-প্রকৃতি খুব বদলেছে, জলাশয় কম চোখে পড়ছে বা পড়ছে না, তা বাদ দিলে সবুজ ক্ষেত খামার পুরোটাই সঙ্গ দিলো তো দিব্যি। আর আশ্চর্যের বিষয় দেখলাম ট্রেন যখন ব্রিজে ওঠে আর গুমগুম আওয়াজ হয় ঠিক ছোটবেলার মতই উত্তেজনা হয় নদী দেখার। বহু বহু দিন পর ট্রেনে এমন লম্বা জার্নি,  অত সময় পাওয়াই যায় না এখন। মাঝে মাঝে যখন পুরোনো কারোর লেখা পড়ি তিন মাস হাওয়া বদলে কিংবা এক সপ্তাহ আগে থেকে বিয়ে বা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যেত, তাদের ক্ষতি তো কিছু হত না কাজে, আমরা স্ক্রাম স্ক্রাম খেলায় কিই যে মহৎ কাজ  করে দিচ্ছি কে জানে!

 কালকা স্টেশনটা ভারী চমৎকার। খুব বড় কিছু না, কিন্তু ঝকঝকে। পুরোনো দিনের মত করে সাজানো টয় ট্রেনের সামনের স্টেশনের অংশ। এক গাদা পাখি শেষরাতের যাত্রী, হকার সবার মিলিত হাঁকডাকের সম্মিলিত প্রতিবাদ জানাতে লেগেছে। আরে আবার বৃষ্টি এলো দেখছি!এমনিতেই কোভিডের কারনে মা বাবাইকে নিয়ে বহুদিন বেরোইনা, তাছাড়া আমার বাবা পাহাড়ে একটু ভয় পায় তবু পাহাড়ে এসেছি। এর মধ্যে বৃষ্টি ভয় দেখায় খানিক। উত্তরাখন্ডে বিপর্যয় চলছে, আমরা যখন হিমাচলের দিকে পা বাড়িয়েছি, হালকা চিন্তা আছেই।তার মধ্যে বেরোনোর দিন সকালে মায়ের হাতে গায়ে ফুটন্ত জল পড়েছে। আর আশ্চর্য হয়ে দেখলাম এত চিন্তা  সমেতও চিন্তা গুলো তেমন হুল ফোটাতে পারছে আনন্দে। মানে এই যে শিবালিক ছাড়ল, আমাদের পাশে পাহাড়ের দেওয়াল আর মায়েদের ওদিকে দিব্যি বিস্তীর্ণ এলাকা তাতেও কি দমলাম নাকি(অথচ আমরা আমাদের সিট ছেড়ে এসেছি ওদিকের)। ছেলেমানুষ হয়ে টাকমাথা টিটিকে বলা গেল সিট বদলাতে, সে ব্যাটা ঝিমুলো তবু শুনলো না, মানুষ এমতাবস্থায় কী করে? চুপ করে বসে থাকে আর যা পাওয়া যায় তাই দেখে কিংবা মন খারাপ করে তো? আমরা দুজন একটুও না দমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম চারপাশ, জানলায় নাক ঠেকিয়ে কিংবা দরজা খুলে দেখলাম কেমন টানেলে ঢুকছে ট্রেন বা পুলের উপর দিয়ে বাঁক নিচ্ছে! তারপর দেখি একজন লোক ভালো দিকের জানলায় বসে ঘুমোচ্ছে, তার সিটে বসতেই বাপ্রে কী ঘুম পেলো!!! মানে অবস্থাটা ভাবুন, আপনাকে বললাম দাদা আপনি ঘুমোচ্ছেন তাহলে আমি এখানে বসি? বসে আমি পাঁচমিনিটের মধ্যে ঢুলতে শুরু করলাম!! একে কাউকে সিট বদলাতে বলাই আমাদের কাছে দুঃসাহসিকতম কাজ তায় সেই সিটের মর্যাদা না রাখে ঘুমিয়ে পড়ায় লজ্জায় আমাদের  আমাদের জন্য সীতার পাতালপ্রবেশ এর মতো কিছু প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তা কলিকালেও এসব আছে হে, অবিশ্বাসীর দল, না হলে ফস করে বারোগ স্টেশনটা চলে আসতো না। কালকা শিমলার এই যাত্রাপথের মাঝে মাঝেই ছবির মতো সুন্দর সব স্টেশন পড়ে। শিভালিক এক্সপ্রেস সব জায়গায় থামে না এই একটি স্টেশনেই থামে। বারগের আগে একটা স্টেশন দেখেছিলাম পাহাড়ের বাঁকে,  ট্রি হাউস আছে একটা।ওখানে থেকে যাবার ইচ্ছে মনে আসতে আসতেই পরের টানেলে চলে গেছি। বারগে খাবার দাবার পাওয়া যায়। সেইইই কোন ভোরে উঠেছি, সিধে কালকা অব্দি জায়গা পাইনি বলে চন্ডিগড়ে নেমে কামরা বদলে আবার একই ট্রেনে উঠে আসা। খিদে পাবে না হ্যাঁ! আর এরকম একটা বৃষ্টি ধোয়া ঝকঝকে স্টেশনে যদি চা, ভেজ কাটলেট, (আসলে কাটলেটের আকারে আলু টিক্কি বলা যায়, যদিও খেতে চমৎকার) ,  চানা বাটোরা(সাত সকালে অম্বলের ভয় ছিল কিন্তু এ জিনিস আলাদা খানিক আমাদের এখানকার থেকে) ইত্যাদি মেলে তাকে না করলে পাপ লাগে। খামোখা পাপের পথে যাবার থেকে খাওয়াই ভালো। 



তারপর তো টানেলের অন্ধকার,  বনের পথের মধ্যে দিয়ে দিয়ে পৌঁছনো গেল আরেক ঝকঝকে সুন্দর স্টেশনে। আহাহা এমন সুন্দর করে রাখতে তো খুব পয়সা লাগে না, আমরা অসুন্দর করে রাখি কেন? 







বিকেলে বৃষ্টি এলো যখন,  তখনই শুনছিলাম আশপাশ থেকে হা হুতাশ। কারো কারো নষ্ট হল আর আমাদের মতো কারো কারো মেঘ জড়িয়ে হাঁটা হল। শিমলা ম্যালে সবাইই গেছে মনে হয়, ইনফ্যাক্ট সকলেই আমায় বলেছিল শিমলায় না যেতে কিছুই নেই। আমি এখনো হাঁ করা টাইপ গেঁয়ো ভূত বলেই হয়ত আমার খারাপ কিছু লাগেনি। দিব্যি ঝকঝকে তকতকে ম্যালের রাস্তা, বেকারি, পুরোনো স্থাপত্য পাশে পাশে। বৃষ্টিতে মেঘেতে লোকজন কম ছিল সেটা একটা আহ্লাদের ব্যপার ছিল তবে আমার পরের দিন বিকেলে ফের গিয়েও দিব্যি লেগেছে। চার্চের মাথায় শেষ বিকেলের আলো,কিংবা সন্ধ্যের মুখে ঝুপঝুপ করে জ্বলে ওঠা স্ট্রীট লাইট,  অন্য স্বাদের বেকারি, ছোট্ট ক্যাফের বাইরে বসে চায়ে চুমুক মন্দ লাগার অপশনই নেই। 





 



হিমাচল ট্যুরিজম এর ব্যবহার, সার্ভিস,  হোটেলের মেইন্টেন্যান্স সব কিছু এত চমৎকার লেগেছে বলার না। আর হিমাচলি থালিটার কথা না লিখলে খুব খারাপ হবে। কুমড়ো যদি এত ভালো করে বানানো যায় তবে এরম বিশ্রী করে খাওয়ানো হয় কেন এরকম একটা প্রতিবাদী প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে। আর ওয়ালনাট পাইটার কথা বলিনি বুঝি? থাক বলে বেশী কষ্ট টস্ট দিয়ে লাভ নেই। একখান ছবি দিয়ে যাই বরং। 


শিমলা থেকে মানালির রাস্তাটা এইই লম্বা। পাহাড়ে আমার গা গুলোয়, কিন্তু মান্ডি পেরোনোর পর থেকে যেই রাস্তার পাশ দিয়ে বিয়াস দেখতে পেলাম অমনি রাস্তা সারাই এর ধূলো উপেক্ষা করে কাচ নামিয়েছি আর অমনিই আমাদের ড্রাইভার যোগীন্দরজি বিড় বিড় করে জানালো ক্লাচ কাজ করছে না! বোঝো!  কিন্তু ওই যে খড়টা শুকোতে শুরু করেছে বলেই হয়ত, তেমন কিছু বিরক্তি হল না। গাড়ি খারাপ হতেই পারে, আমাদের আজ মনিকরন ঘুরে যাবার কথা ছিল তা হবে না আর সত্যি বলতে কি ভালোই হয়েছে। এত  লম্বা পথ একদিনে পাড়ি দিয়ে আবার এদিক সেদিক ঘোরা কষ্টকর হয় তাছাড়া অমন করে   আর যাই হোক পাহাড়, তাও আবার হিমালয়ের মত পাহাড় ঠিক উপভোগ করা যায় না। যে জায়গায় গাড়ি খারাপ হয়েছিল, রাস্তার কি সব কাজ চলছিল, সে কি ভয়ানক ধূলো। তাও আমার হাঁচি টাঁচি শুরু হল না কিচ্ছু। বিয়াস উচ্ছল কিশোরীর মত বইছে। আকাশটা কি নীল! 


কদ্দিন থাকবে এসব কে জানে! মানুষ যেভাবে পাহাড় কেটে চার লেনের রাস্তা বানাতে শুরু করেছে তাতে মনে সন্দেহ লাগে। পাহাড় কাটলে আমার ভারী দুঃখ হয়। কত শিকড় পাথর ,পোকামাকড় মরছে বলে শুধু না, পাহাড় নিজেই ভীষন জ্যান্ত একটা জিনিস। তাকে কেটে কুটে মিলিয়ে দিলে মায়া লাগে,  দুঃখ হয়। একটা লোক খুব চানা বিক্রী করছিল। ধূলোমাখা চানার আলাদা স্বাদ হত অবশ্যই কিন্তু অজানা ধরনের মোয়াও তো বিক্রী হচ্ছিল। জিনিসটা তোফা খেতে কিন্তু কী দিয়ে তৈরী জানতে পারলাম না।  যোগিন্দরজি হঠাৎ ডেকে বলে দেখ দেখি কেমন ফের কাজ করছে ক্লাচ!বোঝো! এ গাড়ি না প্রডাকশন সার্ভার একবার কাজ করে একবার না!  শেষে তার মালিক অন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে দিল, ফের উজিয়ে মান্ডি গিয়ে নতুন গাড়িতে করে নতুন রাস্তা ধরা গেল। নতুন রাস্তা কারন এই নতুন ড্রাইভার শৌখিন মানুষ, ধুলোভরা রাস্তার থেকে ঘুরে যাওয়া তার পছন্দের। লম্বা লম্বা পাহাড় পেরিয়ে যেতে যেত চোখে পড়ে আইআইটির মস্ত ক্যাম্পাস নদীর ধারে। সন্ধ্যে নামার মুখে এক পাল ভেড়া আমাদের সামনেই ঘরে ফেরে। 


কুল্লু উপত্যকায় নদীর আওয়াজ শুনতে পেলাম দেখার উপায় নেই, সন্ধ্যে নেমে গেছে, দেখতে পাবো কাল। উফফ সে যা সুন্দরী দর্শনেই প্রেম হবে কিন্তু সে সব তো পরে। এখন অন্ধকারে একটা বিশাল রাজবাড়ির সামনে  নামিয়ে দিল।  অল্প আলোয় হোটেলের বিশাল কাঠের দরজা পেরিয়ে পেরিয়ে একটা একটা মহল পেরিয়ে আমাদের ঘরে পৌঁছনো গেল। মস্ত ঘর,  দোতলা ঘর,ঝোলাবারান্দা, পাথরের বাথরুম। সব মিলিয়ে রাজকীয় ব্যপার বটে। তবে রাজার মেজাজ টের পেয়েছিলাম পরের দিন সকালে।(ক্রমশ)

Monday, August 9, 2021

হাওয়াবদল

 আকাশী রঙের প্রজাপতিটা আজকেও এসেছে। রোজই এই সময়টা ওড়াউড়ি করে।ছোট কাঠবিড়ালিটা আজ আসেনি দেখছি। ট্রেনের হুইশেলের আওয়াজ শুনতে শুনতে চায়ে চুমুক দিতে দিতে দিতে সকাল দেখছি। সুভাষবাবু দাঁতন হাতে উল্টোদিকের সুনীলবাবুর সাথে গল্প জুড়েছেন। মার্টিনবাবু লুঙি পরে দাঁত মাজছে বারান্দায়, দুটো মেয়ে দু পাশে দাঁড়িয়ে,বউটা পাশে দাঁড়িয়ে দুধ নিচ্ছে গোয়ালার থেকে। ছোট গেটের পাহারাদারকে আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না৷ দূর থেকে মাছওয়ালার আওয়াজ আসছে, "মাআআছ, বড় বড় মাছ"। একটা কেন্নো আপনমনে হেঁটে যাচ্ছে বারান্দা দিয়ে।


দিন কতক হল হল রাণীগঞ্জে এসে থাকছি। হাওয়াবদল আর কি। কোনো জায়গায় থেকেছি মানে, প্রতিটা ঋতু সেখানে অনুভব করেছি, তা না হলে স্রেফ গেছি বলা যায়, থাকা বলা যায় না। আমার হাতে অফুরন্ত যৌবন, টাকা আর সময় থাকলে আমি হয়তো সব পাহাড়, সব জঙ্গল সব দ্বীপে একটা বছর কাটাতে চাইতাম। যদিও চাইনা খুব একটা অত অনন্ত কিছুর লোভ নেই, সত্যি বলতে লাভও নেই। খুব কিছু বেশী থাকলে তার দাম অতটা থাকে না। এর আগে শীতে এসেছি, বসন্তে এসেছি এখানে, গরমে আসা হয়নি নিজেই কোভিডাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। শুনেছি গরম এখানে নাকি খুবই কষ্টের, তবু সে গরমের রৌদ্র রূপও আমার পছন্দের। খাঁ খাঁ করা প্রকৃতি আমার খারাপ কিছু লাগে না। ভালো লাগে বরং৷ যেমন এখন বর্ষায় চারদিক সবুজ দেখতে চোখের আরাম হয়। বর্ষাকালে গাছ পালাদের এই স্ফূর্তিটা কোলকাতায় বসে স্রেফ বোঝা যায়না। আমাদের বারান্দা গেলে টবের গাছগুলোকে  দেখলে একটু বোঝা যায় তবে শিকড় মেলতে না পারা গাছগুলোর আনন্দের প্রকাশ তো এরকম হবে না, একটু আটকানো হবেই। 


ঘুম ভাঙে অজস্র পাখির কিচিরমিচির আওয়াজে। পাশেই একটা অশ্বত্থ গাছ আছে, তাতে প্রচুর পাখি সাত সকালে আড্ডা জমায়। কিংবা বাজারহাট করে কিংবা পড়াশোনা করে। একটা টুনটুনি দোল খায় মাঝে মাঝে কলাগাছের উপর। যদিও চড়াই,ঘুঘু, ছাতারেই বেশী, তাও দোয়েল টুনটুনি কিংবা ফিঙের দেখাও মেলে। বারান্দায় আয়েস করে বসে বসে চা জলখাবার খেয়ে আমরা কাজে বসি, পুব দিকের বারান্দায় বসে প্রচুর মিষ্টি দেওয়া চা খায় শিবানি।  এখন শ্রাবন মাস চলছে কিনা, সোমবার করে প্রচুর গান বাজনা ভেসে আসে রাত অব্দি। মসজিদের দিক থেকে আজানের আওয়াজ ভেসে আসে। 


ছুটির দিনে বাজার যাই আসলে ফুডওয়াক করতে। এ অঞ্চলে লস্যি, রাবড়ি, কালাকাঁদ, কচুরি, জিলিপি,চাট এসব খুব মেলে। খেতেও তেমন হয়। আমরা চারটে কাজ নিয়ে বাজারে গেলে পাঁঁচবার থামি, কোনো দোকানে হয়তো টাটকা প্যাঁড়া, কোনো দোকানে, লস্যি, কোনো দোকানে জিলিপি কচুরি,কোথাও এক ভাঁড় রাবড়ি। বাজারটা জমজমাট, শতকরা নব্বই ভাগ দোকানই অবশ্য অবাঙালীদের হাতে। ফলের দোকান, তালাচাবি বানানোর জায়গা, মশলার গন্ধ, টোটোওয়ালাদের হাঁকডাক সব মিলিয়ে বেশীরভাগ সময়ই জমজমাট। মুচির দোকানের সামনে অকাজের লোক উবু হয়ে বসে, মিষ্টির দোকানে ছেলের হাতে দই এর ভাঁড় ধরিয়ে মা মুখময় আনন্দ নিয়ে বসে। মাংসের দোকান বেশীরভাগ মুসলমানদের চালিত। ছোট জায়গা মোটামুটি পরিচিতি তৈরী হয়ে যায়। রাত হলেই ম্যাজিকের মতো সব শান্ত। একেকদিন সন্ধ্যে পার করে  বেরোলে দেখি, বেশীরভাগ দোকান বন্ধ, শুধু খাবারের ঠেলা গুলোর সামনে ভীড়, পুরোনো বড় বড় বাড়ি গুলো সকালে ভীড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এখন স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে এইই বড় দেউড়ি, কারুকাজ করা থাম। কোনো সিঁড়িতে বসে মাতাল। ভিখারীটা কম এখানে। তারা মূলতঃ দোকান থেকেই ভিক্ষে আদায় করে খেয়াল করেছি। 


অনেকটা জুড়ে ক্যাম্পাস, মেইন্টেন্যান্স নেই বলে চারিদিকে ফাটাফুটো। এই বর্ষায় সেইসব ঢেকে দিয়েছে শ্যাওলা আর ফার্ণ এর পোশাক। আমাদের কোয়ার্টারের সামনেই একটা লেবু আর জুঁই ফুলের গাছ আছে,  ফুলের গালিচা বিছিয়ে রাখে ঢোকার মুখে আর লেবু পাতার গন্ধ আনে বিকেলের বাতাস। অপুকে হরিহর বলেছিল না হাঁ করা ছেলে, আমি অমন হাঁ করা খানিক। এখনো পর্যন্ত আমার বিস্ময় কাটেই না ওই যে পাশের বাড়ির ভাঙা কার্ণিশে মোটা মোটা রোঁয়া নিয়ে শ্লথ গতিতে হেঁটে চলেছে শুঁয়োপোকাটা, ছোটবেলায় যেটাকে কতবার কাঠিতে জড়িয়ে জ্যান্ত কবর দিয়েছি (কবর দিয়ে আবার একটা ক্রশ বানাতাম, চিতা টিতা জ্বালানো শক্ত আর ঝামেলার কিনা, তার থেকে খ্রীষ্টান হওয়া সোজা। মুসলমানেরা ক্রশ দেয় না,  ফলে তেমন সহজ জমকালো পারলৌকিক করার উপায় থাকে না কিনা) সেটা নাকি ওই আকাশ নীল প্রজাপতিটার ছোটবেলা!! ভাবা যায় না এইবারের বর্ষায় এসে দেখছি দেবদারু গাছ গুলো বেড়ে গিয়ে পাঁচিলের মতো হয়ে গেছে পিছনের দিকটায়। বেলা পড়লে পুবের বারান্দাটা ভারী অন্যরকম হয়ে যায়। দেবদারু গাছ গুলো নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে থাকে, দু চারটে কাক, ছাতারে  অশ্বত্থের ডালে কিংবা নারকেল গাছে বসে৷ পায়রাগুলো একটু মানুষ ঘেঁষা তাই কার্নিশেই বেশী বসে। এই বারে এসে একটাও হনুমান দেখলাম না। চারিদিকটা একদম নিশ্চুপ। বিকেল গড়িয়ে গেলে নিজের কানের সোঁ সোঁ শব্দও শোনা যায় যদি সেদিন ঝিঁঝিঁ কিংবা ব্যাঙ না ডাকে। ইতোয়ারি মোড়ের মশলাপট্টির গন্ধ, বাজারের হাঁকডাক, টোটোওয়ালাদের ধমকানি মিলিয়ে যে ঘূর্ণিটা ওঠে সেটা পেরোলেই ষাঁড়ের গোবর, শুয়োরের নোংরা,  ইজের আর ধুকধুকি পরা বাচ্চাদের এলাকা। এর মাঝেই মাছিওড়া ফুচকা কিংবা জিলিপি কিংবা চাট বসে আছে। সেসব পেরিয়ে চোখ বোলালেই দেখা যায় ঘন সবুজ শ্যাওলার বুনোটে প্রাচীরটার একটা অংশ ঢেকে গেছে।


একদিন গেলাম ভাটিন্দা ফলস আর তোপচাঁচি। বর্ষাকাল পিকনিক পার্টির ভীড় নেই।  রাস্তাটায় আগে গেছি মাইথন যাবার সময়, এত সবুজ ছিল না, বরং রুক্ষই ছিল। এবারে যেতে গিয়ে দেখি ঝাড়খন্ডে ঢোকার অনেক আগে থেকেই চারদিকের ভূপ্রকৃতি অনেক সবুজ, সতেজ। ধানবাদ শহরের ভিতরে ঢোকার পর অবশ্য সেই ত্রাহিমাম অবস্থা, বিশেষ করে বীরসা মুন্ডা মোড়ের কাছে। গাড়ি এক ইঞ্চিও নড়ে না, অজস্র ট্রেকার, গাড়ি, বাইক, দরজা খুলে কেউ কেউ গুটখার পিক ফেলছে, আর উদাস চোখে ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে৷ বলাই বাহুল্য মাস্ক এখানে দুর্লভ, কাউকেই দেখিনি। হতাশ হয়ে বলব ভাবছি, "চলো আজ এই হোটেল ব্লুমুনে যাই ঘন্টা হিসেবে ঘর চাইবো ট্রাফিক খুললে ফের আসা যাবে খন। পানু শ্যুট হবে কিংবা রেইড, সে আর কী করা যাবে"!  হাপ ইঞ্চি করে করে এগিয়ে খানিক দূর যাবার পর দেখি, এক জায়গায় এক দল যুবক এক মাইল লম্বা ট্রাফিক দেখে কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে খুব হাসছে! আমি মাইরি অবাক হয়েছি খুব। মানে কতটা কাজের বা আনন্দের অভাব হলে একদল কুড়ি বাইশ বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক দেখে আনন্দ পায়! শনিবারের সকাল, ঘুরতে যা, না হলে আড্ডা মার জমিয়ে কিংবা খেলতে যা না হলে বই কিচ্ছু আনন্দের উপাদান নেই! কী জানি যার যাতে মজে মন। অবশেষে কোনো এক সময়ে এই বিষ্ণুর শয়ানের মতো লম্বা ট্রাফিক জ্যামের শেষ হয়৷ গুগলের উপর পুরো ভরসা করিনা তাই মাঝে এক জায়গায় একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ভাটিন্দা ফলস এর ডিরেকশন।  তার তো কান্ডজ্ঞানের ভয়ানক অভাব! গাড়ির মধ্যে মাথা গলিয়ে মুখের কাছে এসে ডিরেকশন দিতে আসে। পরের অটোওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, " ও ঝরোয়া হ্যায় না জাঁহা? হাঁ হাঁ আগলা মোড়ওয়া সে লেফট লেকে চলে যানা"। বেশ বাবা বেশ, মোড়ওয়া থেকে ঝরোয়া যাবো খন। মোড় থেকে বাঁয়ে নিয়ে খানিক গেলে অবশ্য পাহাড় দেখা যায়। প্রায় শহরের বুক থেকে পাহাড় দেখতে পেলে আলাদা আনন্দ হয় কিন্তু। ওই ট্রাফিক জ্যাম দেখে ওদের যেমন আনন্দ হয়েছিল তেমনই প্রায়। তারপর অনেক মানুষে খাওয়া পাহাড়, ছোট ছোট জনপদ পেরিয়ে পেরিয়ে চলা গেল। এদিকে বেশ কটা অশ্লীল নামওয়ালা জায়গা দেখছি তো! পুঁটকি, মুন্ডি ও আবার কি!! যাকগে আমি সাধু সন্ন্যাসী মানুষ, পা থুড়ি অ্যাক্সিলেটর চালাই বাবা। পুঁটকি থেকে বাঁয়ে নিলে যে রাস্তা সেটা একটা গ্রামের মধ্যে দিয়ে গেছে। বেশ খানিকক্ষন গেলে হঠাৎ করে আসে হয়তো একটা পরিত্যক্ত অফিস কিংবা বাড়ি, আবার একটা ঢাউস বাড়ি যার সামনে গোয়ালঘর। আবার খানিক গেলে দুপাশে গাছ গাছলা, তারপর আবার কটা দেহাতি ঘরদোর। এদের ঘরের সামনেই গোয়াল। সে অবশ্য আমি বাংলার গাঁয়েও ওরকম দেখেছি অনেক জায়গায়। কিছু কিছু আদি অধিবাসীদের মুখের দেখা পাওয়া যায় পথ চলতি, টাটা স্টীলের দেওয়া সোলার লাইট। হুট করে পথে পরে একটা বট গাছ, বন্ধ কারখানা, কটা ছোট ছোট চা, ভাত, কোল্ড ড্রিংক্সের দোকান। আশ্চর্য শান্ত নিরিবিলি পুরো জায়গাটা। দোকানের খাবার জিনিস খুব একটা লোভ না দেওয়াই ভালো। কটা সাত পুরোবো বাসী গজা, বালুসাই এর বারকোশ।  


ভাটিন্ডা ফলসটা অন্য সময় লোকে লোকারণ্য থাকে,  এখন দুজন দেহাতি লোক মাছ ধরছে আর এক দুটো এলোমেলো পরিবার। আজকে আবার কেন জানিনা লোক নেই গেটে তাই বন্ধ! তবে তাতে অসুবিধে হয়নি আসতে,  পাঁচিল ভাঙা, আরামেই আসা যায়।জলের স্রোত খুব, পা রাখা যায়না এমন শ্যাওলা। দানবীয় শক্তির অধিকারী হলে বেশ শ্যাওলা, জলের স্রোত উপেক্ষা করে উপরে উঠে যেতাম! এক বুড়ি এসেছে ছাগল চড়াতে। বুড়ির ছাতায় দেখি রাশি রাশি পাতা, ছোট ছাগলটার জন্য সঞ্চয়!  আমাদের দেখে এক গাল হেসে বুড়ি খুব গল্প শুরু করলো। দুটো ছেলে নাকি ভেসে গেছে ছবি তুলতে গিয়ে। তারপর কোন রাজা নাকি নীচে পুজো বন্ধ করে দিয়েছিল উপরে চালু করেছিল এরকমই একবার ভুলে গেছিলো খরগ আনতে তারপর জল বেড়ে গেছিল। সব কথা ভালো বুঝছিলাম না, ভাষা বাংলা হলেও ডায়লেক্ট আলাদা, তায় বুড়ি একেবারে ফোকলা। আরো খানিক গল্প হল, তার চোখ আর্ধেক কাটানো হয়েছে, পরের বার গিয়ে পুরো কাটাবে। সত্যিই বুড়ির ছানিটা খুবই পড়েছে। যারা মাছ ধরছিল তারা বুড়ির বুড়ো আর লাতি। খুব গর্ব করে বলছিল। যেই বলেছি, তোমার বুড়ো তো জোয়ান আছে তোমার থেকে, বলে 'না না,  কই বুড়া হই গেছে'। দূরে পাথরের আড়ালে এক জোড়া যুবক যুবতী ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, অবিশ্রান্ত জলের আওয়াজ, জঙ্গলের গন্ধ, সময়ে কেটে যাচ্ছিলো কেমন অদ্ভুত শান্তভাবে। তাড়া নেই, না পাওয়া নেই, চিন্তা নেই। 





ফেরার সময় টের পেলাম জঙ্গল কেমন গ্রাস করে নেয় তার হারানো জমি। একটা পরিত্যক্ত ঘর ভাটিন্ডা ফলসের গেটের মুখেই, মোটামোটা শিকড় চলে গেছে সেই রূপকথার গল্পের ডাইনির  পা এর মতো। যদিও গাছ য়ার শিকড় কোনোদিনই আমার কাছে ডাইনি বুড়ি হবে না। তারপর ফের চলা শুরু হয়, এদিক সেদিক করে চলতে চলতে তোপচাঁচি। মাঝে গুগল ফের ছড়িয়েছিল, তা লোকে তোপচাঁচি লেক বললে চিনতে না পারলেও, ' তোপচাঁচি মে ওয়াটার বডি হ্যায় না', বলতে চিনিয়ে দিলো। তোপচাঁচি যাবার রাস্তাটা দারুণ সুন্দর। বড় বড় মোটামোটা গাছে ঢাকা, সবুজ শামিয়ানা দিয়ে চলেছি মনে হয়। তোপচাঁচিও ফাঁকা মোটামুটি, লোকজন নেই তেমন, পিকনিক  পার্টির অত্যাচার নেই ভেবেই মন ভালো হয়ে যাচ্ছে আহা। শীতে এলে এখানে এতক্ষন উব উব উব ডিজে মিক্স চলত। তোপচাঁচি আসলে পাহাড় ঘেরা বড় হ্রদ।  হ্রদের পাশ দিয়ে রাস্তা, তারপর জঙ্গল। একটা গাছ দেখি সারা গায়ে ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উই না কী কে জানে! আহারে। কথা বলতে চেষ্টা করলুম একবার, কিছু না স্রেফ কষ্টটা সেরে যাক এইটুকুই বলার। সে উলটে ঠান্ডা হাওয়া দিয়ে আমায় জুড়িয়ে দিলে, নিজের কষ্টের কথা পাত্তাই দিলো না।হ্রদের ওই পাশটায় জঙ্গল বেশী ঘন বেঞ্চগুলোও লতানে গাছে ঢেকে গেছে এই বর্ষায়।  তিনটে কাঠকুড়ানি ছেলে মেয়ে শুকনো জ্বালানি কুড়োচ্ছিল। সব চেয়ে  ছোত দুটো মিচিক করে হেসে দিলো। ছেঁড়া জামায় হাসি তো আর আটকায় না। 








ফেরার পথে খুব খাওয়া দাওয়া হল। পশ্চিমবঙ্গের থেকে সস্তা সেটা কথা না, ভারী আপ্যায়ন করে খেতে দিচ্ছিলো। মানে আজকাল মোটামুটি পপুলার ধাবা গুলো কে এলো কে গেলো পাত্তাও দেয় না, এদের তা দেখলাম না। বেরিয়ে দেখি তুমুল মেঘ করেছে। দূরের পাহাড়ে মেঘ নেমে এসেছে। এখানেও নামলো বলে। নীল পাহাড় কালো মেঘ সবুজ মাঠ নিয়ে ছুটতে ছুটতেই নামলো সে। প্রথমে আস্তে তারপর দিগবিদিক হারিয়ে পাগলের মতো, চারদিক সাদা হয়ে। শ্রাবন মাসে এটুকু পাগলামী তো হক তার। কিংবা হয়তো আমাদের বলছিল, আরেকটু থেকে যাওয়ার জন্য,যেমন সেই ছোটবেলায় কেউ এলে বলতাম কিংবা বলত 'আবার এসো '?










Wednesday, July 28, 2021

মায়া

 অভ্রান্তভাবে জানি আমি ঠিক কী চাই তার খোঁজ পাইনি এখনো। রোজ রোজ খাচ্ছি, ঘুমোচ্ছি, কাজ করছি যেন রোজ দিনই আসলে একই দিন বাঁচছি! আমি বলে তো না, আমার আশেপাশে অধিকাংশ মানুষকেই তো তাইই দেখি। এইই কী তবে জীবন? তবে আর অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা হলাম কোথায়? ওই কাটাকাটি করায়? সেদিন এক ঝিম ধরা দুপুরে বসেছিলাম নতুন তৈরী হওয়া এক আবাসনে। আমি গিয়েছিলাম একটা কাজে।লোকজন কেউ আসেনি এখনো, সব কটা ব্লকই প্রায় ফাঁকা, দু চারটে চড়াই, শালিক, ঘুঘুর আওয়াজ ভেসে আসছে ব্যস। বসে বসে অর্থহীন চিন্তা করছিলাম কিছু, বেশীরভাগ চিন্তাই যেমন হিয়, কোথাও পৌঁছয়না ওরকমই কিছু।  দেখি পায়ের আশেপাশে অনেকগুলো ডেঁয়ো পিঁপড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছুটোছুটি করে খুব কাজ করছে কিংবা এক্সপ্লোর করছে এ দুনিয়া। আমরা যেমন করি। খেলাচ্ছলে পা'টা তুললাম, একটা পিঁপড়ে থমকে দেখলো খানিক, ভাবটা, "একটু আগে এ পথে গেছে সে, দেখতে পায়নিতো। এই তো পাহাড় ছিলো, আবার এখানে একটা মস্ত গুহা তৈরী হল কখন!" অন্য একটা পিঁপড়ে একটু সাহসী, সে চলে এলো গুহার ভিতরে,ঘুরলো ফিরলো। আরো কিছু পিঁপড়ের আনাগোনা হল। ওইদিকের পায়ের আশেপাশেও অনেক কটা ঘুরছিল।তারপর যা হয় আমার গায়েও উঠলো কিছু, ঝেড়ে ফেলার তাগিদে পা'টা নেমে গেল, গুহা বন্ধ হয়ে গেল। কেউ কেউ মরলো। 

ভাবছিলাম, মানুষের জায়গা থেকে যদি ভাবি, আশপাশে যত বড় বড় পাহাড়, ভূপৃষ্ঠের অংশ দেখছি তা আসলে অন্য কোনো বিরাট জীবের অংশ মাত্র, এমনকি এই মহাকাশটাও।আমি একটা পিঁপড়ের কাছে যা,  আমার যেয়ে ওরকম বিরাট কোনো প্রাণ দাঁড়িয়ে আছে, খেলাচ্ছলে পা ফেলছে, সমুদ্র পাহাড় হয়ে যাচ্ছে কিংবা নদী বদলে যাচ্ছে। লক্ষ কোটি বছরের সময়টা তার কাছে হয়তো কয়েক মুহূর্ত,  যেমন আমার এই পায়ের নাড়াচাড়া?  


জানি এ নেহাতই অলস মনের চিন্তা ভাবনা, কোনো মানে মাথাই নেই। এক যদি ওদের ভাষা জানতে পারা যেত, বোঝা যেত কীরকম ভাবে দেখে ওরা এ পৃথিবী,  সেরা হবার লড়াই কতটা আছে ওদের, কেমন হয় ওদের মহাকাশযান,  ওদের অন্য গ্রহ মানে কি আমাদের অন্য দেশ? আমাদের অন্য নক্ষত্র মানে কি সেই বিরাট প্রানের অন্য দেশ? যাকে আমরা এই চোখে দেখতে পারছিনা,  আমাদের চেতনাতে ধারণ করতে পারছিনা! এরকমই যদি হয় সেক্ষেত্রে আরো বড় প্রাণ অন্য ছায়াপথ, পেঁয়াজের খোসার মতো লেয়ার যেন। কিংবা হয়তো আসলে যা নিষ্প্রাণ বলে বোধ করছি, সেই পাথর কিংবা গ্রহাণু কিংবা উল্কাপিন্ড প্রাণ বয়ে নিয়ে চলেছে, সেই প্রাণকে বোঝার ক্ষমতা আমাদের এই ক্ষুদ্র চেতনায় বোঝা অসম্ভব?


এলোমেলো চিন্তার এই সুবিধে কোথাও পৌঁছতে হয়না, তাই বুদবুদ ওঠে, মিলিয়ে যায়। আসলে ওই খোঁজের সন্ধানেই হয়ত, কেন,  এ সবের অর্থ কি? একটা বিশাল বাসস্থান, বিশাল গাড়ি বিলাসের চূড়ান্ত কিংবা প্রবল প্রতাপ সেসব কিছুই তো এ অনন্ত চলার অংশ নয়, হতে পারে না। তাহলে কী? একটা কোনো সুর আছে যেন আমাদের নাগালেই কিন্তু ধরার বাইরে, ধরতে পারার মতো শক্তি কই! 

Sunday, June 27, 2021

কোলকাতার কাছেই

 কতদিন পর এমন দুম করে পালিয়ে বেরোলাম কে জানে। পালিয়ে বেরানোই, কারন অফিসের দিন, কাজ আছে, স্ক্রাম কলে হিসেব নিকেশ মেলাতেও হবে। কিন্তু অত হিসেব মেনে চললে তো হয়েই যেত। সুতরাং চল যাই, বলে দুড়ুম করে বেরিয়ে পরা। এই ভর দুপুরেও মোড়ের মাথায় লোকজনের কমতি কিছু নেই। আদা রসুনের ঠেলা, কলাবেচিয়ে সবাইকে ডজ করে সার্ভিস রোড নেওয়া গেল। খালের পাশের ওই রাস্তাটা নেবো, কখনো যাইনি, অন্যসময় বেজায় ভীড় থাকে, গাড়ি নিয়ে বিরক্ত লাগে। করোনা তায় দুপুরবেলা তাই লোকজন বেশ কম। দু চারটে সাইকেল বা বাইক সারানোর দোকান খোলা স্রেফ। আরো খানিক এগোই। মাঝে মাঝে সাইকেলে চলে যাচ্ছে কেউ কেউ। খানিক এগোলেই দৃশ্যপট বদলে যায় একদম৷ কোলকাতায় আছি বলে মনে হয়না, খাল্রর উপর টিনের শেড দেওয়া কাঁঠাল কিংবা মাছের দোকান, পাশেই মন্দির একটা, এইপাশের ঘর বাড়ি গুলোও যেন মফস্বলের বাজার। এই দুপুরেও কাঁঠাল বিক্রী হচ্ছে এদিক সেদিক। গুমটির মতো ছোট্ট মিষ্টির দোকান খোলা, দানাদার, রসগোল্লা, আর পান্তুয়া ছাড়া বিশেষ কিছু নেই। আরো এগোলে বাজার হালকা হয়ে যায়, রাস্তাও ফাঁকা। এ পাশে ভেড়ির জলে জাল দেওয়া।খেজুর গাছের তলায় উদাস মুখে কাটারি হাতে একটা লোক বসে। এক দুটো ভ্যান চলে যাচ্ছে নির্লিপ্ত মুখে, অবিক্রীত আম নিয়ে। ভরন্ত মেঘলা দুপুর। মেঘ কেটে নীল আকাশ ঝকঝক করছে। সদ্য ওঠা বড় বড় ফ্ল্যাটবাড়ি কিংবা পার্টিওফিস কোথাও থেকে আওয়াজ নেই। "মাটির মূর্তি বানানো হয়, প্রোঃ হাস্যবদন মন্ডল", লেখা সাইনবোর্ড পেরিয়ে ক্রমে নিউটাইনে এসে উঠি, রোদ মাথায় এসে লাগছে, আরাম হচ্ছে না আর। এতক্ষনের ছায়া মাখা পথ শেষ। ফের একটা সরু রাস্তা দিয়ে ঢুকে যাই, এখানেও লোকজন নেই বিশেষ। কিন্তু এ রাস্তায় বাড়ি দোকান বেশী। গাছকম, ভেড়িও নেই। গলায় ধুকধুকি ঝোলানো খালি গায়ে একটা দুটো বাচ্ছা ছেলে। দুপাশের সাইনবোর্ডও বদলে গেছে, শাহরুখ ফ্যাশন হাউস,  মনিরুল স্টোর্স। বাঁ পাশে পবিত্র কবরস্থান, দিব্যি ভুট্টা গাছ হয়েছে সেখানকার জংলা জমিতে। মাটির জিনিস মাটির কাছে ফিরে গিয়ে গাছ হয়েছে আর কিইই বা চাই। হোক না সে গুল্ম, মহীরূহদের থেকে কম নাকি তার জীবন। আরো এগোলে শহর গ্রাস করে নেয়, একটাও গাছ নেই, গুমোট বাড়ে, প্রায় পনেরো কিলোমিটার পথ চলেছি, সাইকেলের প্যাডেল আর যেন ঘোরে না। একটু হাওয়াও কি দিতে নেই!

তবে, সব গুমোট গরমের শেষে একটা ভাঁড় চা কিংবা সিমেন্টের স্ল্যাবের আরাম থাকে। রাস্তাটা আবার অবান্তর জমা খরচের হিসেব কষার শক্তি দিয়ে শেষ হয়, ফের আরেকদিনের ভরসা রেখে। 



Monday, May 17, 2021

নয় পাহাড়ের উপত্যকায়(তিন)

 ধরা যাক সাতটা একই মানসিকতার ছেলে মেয়ে,দিন রাত ভার্চুয়ালি আড্ডা মেরে, এক বছর বন্দী থেকে কাটিয়েছে, ভয় কাটিয়ে তারপর বেরিয়েই পড়েছে। বলতে পারেন মূর্খামি, কিন্তু সিচুয়েশন তখন এরকম বিগড়ে যায়নি, আমাদের নেতা মন্ত্রীরা আগামী পাঁচ বছর "কাজ" করবে বলে এভাবে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়নি তখনো। নিয়ম কানুন পালন করে ঘুরে বেড়ালে অত ভয় ছিলো না তখনো অব্দি, যখন আমরা প্ল্যান করছিলাম সেই ফেব্রুয়ারিতে৷ আজ্ঞে হ্যাঁ, ডেটাটা একবার দেখে নেবেন গালমন্দ করার আগে। যাই হোক মার্চের শেষের দিকে আবার করোনার প্রকোপ বাড়তে থাকলো, কিন্তু তেমন কিছু না তখনো, তাই আমরা স্প্রে নিচ্ছিলাম ব্যাগে, নিজেদের চাদর, বালিশে কভার। খালি দেখা হয়নি, উখরুল জায়গাটার ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক অবস্থা। এবার বয়সেরও তো একটা দোষ আছে নাকি? তারা হাইক করবে,  পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে লম্বা শ্বাস নেবে এই স্বপ্নে মশগুল। সেই জায়গাটা আসলে শীতের জায়গা না গরমের,  টেম্পারেচার কতটা নামে, জঙ্গী হামলা হয় কিনা সেসব নিয়ে মাথা ঘানাতে বয়ে গেছে তাদের। বলতে পারেন, এসব আঠারো উনিশে মানায়,  এ বয়সে এত ইন্টারনেটের সুবিধায় এ জিনিস বোকামি। অবশ্যই, কিন্তু বোকামি ছাড়া জীবন বড় পানসে না? 


লোকটাক থেকে ইম্ফল হয়েই উখরুল যেতে হবে। ইম্ফলে কাংলা ফোর্ট দেখে আমরা উখ্রুল যাবো। কত প্ল্যান আর গ্রুপ কল করেছি এই বেড়ানোর আগে, বেড়ানো বেড়ানো উৎসাহ অনেকে বলে বেড়ানোর থেকেও ভালো, আমার অবশ্য বেড়ানোই বেশী ভালো। কাংলা ফোর্ট অনেকটা জায়গা জুড়ে, বার্মিজ আক্রমন ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তারপর ইংরেজাসুর দের সাথে লড়াইয়ে ধ্বংস হয়ে যায় প্রায়।  ইতিহাসের ছাত্র আমি নই, কিন্তু ইতিহাস আমার বড় ভালো লাগে। এইসব রাস্তা, ভাঙা বাড়ি জুড়ে এক সময় সেপাই সান্ত্রী হেঁটে বেড়িয়েছে, গমগম করেছে লোকজন। হয়তো এই তালা বন্ধ স্রেফ চামসা গন্ধওয়ালা মন্দিরের সামনে এই যে এই স্রেফ থাম হয়ে গুলো রয়ে যাওয়া জায়গাটাতেই পুরোহিতের দাপট দেখা যেত। কোথাও কোনো লোক নেই, অস্বাভাবিক নির্জন চারদিকটা।কটা কাঠঠোকরার কাঠ খোদাইয়ের আওয়াজ  কিংবা একটা না দেখা পাখির ডাক ছাড়া কিচ্ছু নেই। রোদ বেশ চড়া এখনই, এ মন্দিরে আর পুজো হয়না স্বাভাবিকভাবেই।  আশেপাশের গাছের ছায়ার,  কোনোরকমে রয়ে যাওয়া গোলা গুলির ক্ষত সহ দেওয়াল এখন পাহারা দেয় নির্বাসিত ভবনকে। ওই প্রান্তে একটা মিউজিয়াম আছে,  সেখানে এদের রাজাদের দেখছিলাম, বিরাট বিরাট নানান মাপের সব গোঁফ।

 

ড্রাইভার ব্যাটা খালি তাড়া দিচ্ছে, রাস্তায় কোথাও খাবো তো নাকি? মনিপুরি খাবারের একটা দোকানে দাঁড় করালো ব্যাটা, তা সে একেবারেই আমাদের রাস্তার ভাতের হোটেল। তফাৎ এই ডালহৌসি পাড়ায় বা রাজারহাট -সেক্টর ফাইভের রাস্তার খাবারের দোকানে গন্ধেই খাই খাই মনে হয় এখানে তেমন কিছু হল না বরং দোকানটা একটু কেমন কেমনই লাগলো, আর কোনো লোক নেই কিছু নেই স্রেফ একটা টেবিল কটা চেয়ার। সম্মিলিত আপত্তিতে সে জায়গায় মধ্যাহ্নভোজন স্থগিত করা তো হল, ড্রাইভারের কেন জানিনা মন মেজাজ বিগড়ে গেলো তাতে! ভয় টয় দেখালো, রাস্তায় আর কিছু পাওয়া যাবে না বলে।পাত্তাও দিলাম না, পাওয়া গেলে যাবে না গেলে না যাবে। খানিক এগোলেই রাস্তাটা চমৎকার হয়ে যায়, দুধারে বিস্তীর্ণ মাঠ, মাঠের পারে পাহাড়, রাস্তার দুধার সবুজ গাছে ছাওয়া। লোকজন বেশ কম এখানে।ছোট ছোট টিনের চালের বাড়ি মাঝে মধ্যে, সে সব বাড়ির কোথাও রেস্টুরেন্ট বলে লেখা থাকলেও খাবার মেলেনা। হয় দেখা যায় কত্তা মদ খেয়ে ঝিমুচ্ছে না হলে বলে দেয় এসব কাপলদের জন্য খালি। বোঝো! এমন তো কোত্থাও দেখলাম না, স্রেফ কাপলদের জন্য রেস্তোরাঁ?  আসলে অন্যকিছুই হবে হয়তো। হঠাৎ এক বাঁকের মুখে দেখা যায় রোড সাইড ক্যাফে নামে জ্বলজ্বল করছে একখানা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেস্তোরাঁ! তব্বে! বলেছিল যে কিচ্ছু মিলবে না? হুঁ হুঁ বাওয়া আমাদেরও টেলিপ্যাথির জোর আছে। 









ক্রমে রাস্তা চড়াই হতে থাকে, পাহাড়ের পাশ দিয়ে রাস্তা, নীচে খাত, পিছনে দূরে ফেলে আসা ইম্ফল উপত্যকা।  আর কোনো গাড়ি নেই কোথাও আমরাই চলেছি। নিস্তব্ধ চারদিক, এদের এক্সটেন্ডেড দোলের কাজ চলছে বলেই। রাস্তা বাড়ানো চলছে, পাহাড়গুলো প্রায় মিশিয়ে দিয়ে দিয়ে। দেখে মন খারাপ হয়, একটা একটা পাহাড় তো পুরো ন্যাড়া, যে কটা গাছ আছে তাও শোকে দুঃখে শুকিয়ে গেছে। গাছ কাটা শুধু না পাহাড় কাটাও চলছে পুরোদমে।একটা পাহাড়, সে কতদিন ধরে কত পোকা, কত গাছ কত প্রানীকে জায়গা দিয়েছে এতদিন সে সব শেষ! এত চওড়া রাস্তা কেন দরকার!!? বড় মায়া লাগছিলো, আমি আসলে মনে করি আমাদের এ জগত প্রানময়। আমাদের আশেপাশে পাহাড়, নদী, মাটি, জল সবাই টের পায়, তাদের নিজেদের ভাষা, বোধ সব কিছু আছে। জ্যোৎস্না রাতে পাহাড় জঙ্গল সব যখন ভেসে যায় আলোয়, আশপাশে কোনো মানুষ থাকেনা তারা সজীব হয়ে ওঠে, সে কথা হয়তো কোনোদিন মানুষ শুনতে কিংবা বুঝতে পারবে না। এলোমেলো ভাবনার মাঝেই দেখি কখন যেন আমরা উঠে এসেছি আরো উঁচুতে, বাতাস ঠান্ডা হয়ে আসছে। ড্রাইভার থামলো একবার। আমরাও হাত পা ছাড়াতে কেউ কেউ নেমেছি, দেখি বন্দুক কাঁধে একজন পাহাড়ের গা বেয়ে চলে গেলো গাছপালার ভিতরে। শিকারী?  এখনো আছে? ফের চলা শুরু, খানিক এগোতেই,  মুখ বাঁধা দুজন হাত নেড়ে থামাতে বলল গাড়ি। চেকিং হবে? এদিকে অনেক উগ্রপন্থী আছে বলে হয়তো। কিন্তু এমন সিভিল ড্রেসে কেন? সারথি  দেখি ভয় পাওয়া মুখে স্যার স্যার বলে কিসব বলছে। গাড়ির পিছনে আমাদের সুটকেস দেখালো। তারপর ঘাড় নাড়িয়ে ছেড়েও দিল। চুপচাপ খানিক দূর যাওয়ার পর জানালো, মিলিটারি না মিলিট্যান্টের হাতে পড়েছিলাম! অ্যাঁ! বলো কি নন্দলাল! পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি ওই রাস্তাটা খুবই বিপজ্জনক,  ভাগ্যিস জানা ছিলো না আগে তাহলে হয়তো সুখী ভীতু মধ্যবিত্ত ট্যুরিস্ট দল পা রাখতো না ওই পথে আর একটা অসম্ভব সুন্দর পাহাড়ে প্রানভরে নিঃশ্বাস নেওয়াও হত না।


বাপরে বাপ এত ঠান্ডা লাগছে কেন? উখরুল জায়গাটা খুব ছোট কিছু না, প্রোমোট করা হয়না তাই না হলে গ্যাংটক এর হাইটের এই জায়গাটার আয়তন বা এখানে থাকা জনবসতি বেশ ভালোই। তাছাড়া নর্থ ইস্টের অনাঘ্রাতা সবুজের  জড়ামড়ি তো আছেই। কিন্তু আপাতত তো কেঁপে অস্থির হয়ে গেলাম হে! আমরা হাবার মতো, হাফ প্যান্ট স্যান্ডো গেঞ্জি নিয়ে এসেছি ট্রেক করতে এদিকে ভোরে এখানে তাপমাত্রা হয় চোদ্দো পনেরোর মতো এই সময়ে! বাহ বাহ, খুব পড়াশোনা করেছি উখরুল নিয়ে। রাস্তা বিপজ্জনক জানিনা, কত হাইটে জানিনা, টেম্পারেচার কেমন থাকে জানিনা। তারমধ্যে হোটেলের মালিক(মালিক আসল্ব তার বউ সে নিজেকে মালিক বলতে চায় বলে খানিক হাবভাব দেখায়, এদিকে কিছুই পারে না)  খুব ভয় দেখালো, ওই ট্রেক করতে তোমাদের সাত ঘন্টা লাগবে। এরকম প্ল্যান কেন করেছ ইত্যাদি। ভারী রাগ হয়ে গেল। এরকম ডিমরালাইজিং লোক বিরক্ত লাগে। এবং সত্যি বলতে অতক্ষন লাগেও না। লোকটার নিজের ফিটনেস মাইনাসে তাই হয়তো সবাইকে ওই ভাবেই ভাবে! যাকগে মরুকগে, কাল বেরোবো তারপর দেখা যাবে, আপাতত ওই যে টিমটিমে প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া দোকানটা, ওইটায় ঢুঁ মারি। শীতের পোশাক এক দফা না কিনলে তো হবেই না। বেরোনোই যাচ্ছে না এত ঠান্ডায়! গুড ফ্রাইডে বলে আসলে চারিদিক বন্ধ, ওই একটিই খোলা ছিলো যাও কিনা বন্ধ হতে চলেছে, আর লোকটার তো আজ প্রায় লটারি লেগে গেছে। এক সাথে সাতটা বিক্রী হবে এক দিনে!  কালকে দোকান গুটিয়ে সমতলে না নেমে যায়! 


জানলা থেকে একটা চার্চ আর বাজারটা দেখা যায়, সাতটা বাজতেই রাস্তাঘাট জনমানব শূন্য।  অন্ধকারে, শান্ত শহরটাকে দেখতে মন্দ লাগে না। নির্জনিতা এখানে সত্যিই অনুভব করার মতো। রাতে শুলে নিজের কানের মধ্যেকার শোঁ শোঁ আওয়াজ শোনা যায়। তারপর ঘুম ভাঙে মোরগের ডাকে, তখনো অন্ধকার চারিদিকে, একটু একটু করে সকাল হতে দেখি, কতদিন পর ভোর দেখলাম। হুড়মুড়িয়ে বেরোনো গেলো, লম্বা হাঁটা বাকি সামনে...

Wednesday, April 21, 2021

নয় পাহাড়ের উপত্যকায়(দুই)

 কেইবুল লাম জাও ন্যাশনাল পার্ক লোকটাক লেকের এক অংশেই। পৃথিবীর একমাত্র ভাসমান ন্যাশনাল পার্ক যেখানে সাংহাই হরিণ থাকে। সাংগাইকে নাচুনে হরিণ বলে, আসলে ওই বায়োমাসগুলোর উপর দিয়ে ওরা যখন দৌড়ে যায়,  সেই তালে নীচের জলে ধাক্কা খায় বায়োমাসগুলো আর নাচের ছন্দ বলে ভ্রম হয়। এই হরিণগুলো একসাথে থাকে আর বাইচান্স মানুষে ছুঁয়ে দিলে (মানে মানুষের পাকামির তো শেষ থাকেনা, তাকে গুনে গেঁথে দেখতে হবে, জানতে হবে  বাকি সব প্রাণী কোথায় খাচ্ছে কী খাচ্ছে, কিভাবে মৈথুন করছে, তাই কলার লাগাতে যায়। এবার এটা লিখতে লিখতেই ভাবছিলাম, জানতে চাওয়া দোষের বলা যায় না, এদিকে জানতে গিয়ে প্রাইভেসিতে হাত দিচ্ছি তাও তো মিথ্যে না!), তাদের আর দলে ফিরিয়ে নেয় না। তখন তারা একা হয়ে যায়; একঘরে হয়ে যাওয়া সেই হরিণ মনের দুঃখে আত্মহত্যা করে। কোন জায়গার বায়োমাস এক মিটার অব্দি যায়নি,  সেটা তারা ভালোই জানে, সেইখানে গিয়ে ডুবে যায় ইচ্ছে করে। মানুষ নাকি সামাজিক প্রানী! একে মারছে, ওকে কাটছে, এই জাত ওকে ছুঁচ্ছে বলে পিটছে, ফুহ! 






বনের মধ্যে তখন রোদ এসে পড়ছে দূরের ঘাস জমির উপর, খালের জলে দুটো নৌকা বাঁধা নীচে, একটু আগে টেলিলেন্স দিয়ে সাংগাই হরিণ দেখা হয়েছে,প্রাথমিক উত্তেজনা থিতিয়ে এখনাবার সব শান্ত। জঙ্গলের অদ্ভুত একটা রূপ হয়, তাকিয়ে থাকলে ঝিম ধরে, ইচ্ছে করে হেঁটে বনের মধ্যে দিয়ে গাছেদের সাথে আলাপ করে আসতে। নৌকায় চড়ে একটু চুপ করে ভাসমান মাটি, গাছেদের, পাখিদের আলাপ শোনার উপায় অবশ্য রইলো না। বনকর্মীটি কথা বলতে ভালোবাসেন। সাধারণতঃ দীর্ঘদিন প্রকৃতির কাছে সমর্পিত অবস্থায় থাকলে কথা বলা কমে যায়, কিন্তু এর অল্প বয়স, হয়তো এখনো অতদিন এই জঙ্গলে নেই। সে খুব উৎসাহে বলতে লাগলো,  মনিপুরে মেয়েদের ডানকানে ফুল থাকলে তাকে এনগেজড বলে বুঝে নিতে হিয় আর বাঁ কানে ফুল থাকলে ফাঁকা আছে বলে ভাবা যায় ইত্যাদি প্রভৃতি৷ একেকটা হরিণের ওজন ১২০ কেজি অব্দি হতে পারে,তারা লাফিয়েও ডোবে না যখন আমিও নামি একটু,  ডুবে যাবো না আশা করা যায়! দিব্যি খানিক তুড়ুক তুড়ুক করে লাফিয়ে নেওয়া গেলো। একটা তেত্রিশ বছরের দামড়া লোক লাফিয়ে এমন খুশী হতে পারে তা দেখে লোকগুলো অবাক হয়েছিলো হয়ত, হোকগে যাক। 

লোকটাক তো আর ছোটখাটো জায়গা হ্রদ না, তাই সামান্য উঁচু থেকে দেখলে ওই রিং রিং ব্যপারটা আরো ভালো বোঝা যায়। মাওপাকচুর বাড়ির কাছে ছোট্ট পাহাড়, বাপ্রে কী ফিটনেস ভদ্রলোকের এই বয়সেও! তরতর করে উঠে গেলেন। ওনার সাথে আমিও উঠলাম ঝোপঝাড় সরিয়ে,  পাথর ডিঙিয়ে। দলের বাকিরা আসেনি। পাহাড়ে উঠে নীচে তাকাতেই, "আরিব্বাস রে " বলে থমকে যেতে হয়। তখন সন্ধ্যে নামার আগে, সূর্য ঢলে গেছে খালি তার গোলাপী রঙটা সারা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে, সে রঙে হোলিখেলছে পাহাড়,  হ্রদ, বায়োমাসের রিং সব। ক্যামেরাটা বাগিয়ে কিছু ছবি তুললাম বটে তবে যা চোখে দেখলাম তার সিকিভাগও তুলতে পারলাম কই! চারিদিকে লোকটাকের রঙ্গোলী রিং, ঠিক মাঝখানে আমরা দাঁড়িয়ে, পাখির ডাক ভেসে আসছে ইতিউতি, দিন শেষের আলোয় ডুবে যাচ্ছে সবাই আস্তে আস্তে, অন্ধকার নেমে আসছে। সেই একদম নির্জন পাহাড়ে অন্ধকারে রাস্তা গোলমাল হয়ে যায়, নামার সময় সতর্কতা আরো বেশী রাখতে হয় কারন ঘাস শুকিয়ে হলুদ হয়ে থাকা রাস্তার পাশেই খাদ।পড়লে মরবো কিনা জানিনা, হাত,পা, কোমর না ভাঙার কারন নেই। সাপ খোপও থাকতে পারে হয়তো। কিন্তু সত্যি কথা বলতে সেই মুহূর্তে আমার এসব কিচ্ছু মনে আসছিলো না, একটু আগের পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা হাওয়া আমার স্থিতি দিয়েছে, শান্ত করেছে। সেই হাওয়া বুকে নিয়ে অন্ধকার জঙ্গলে হেঁটে যাওয়া ছাড়া আর কিচ্ছু ভাবা যায় না।দুশ্চিন্তা তো ছেড়েই দিলাম।



















এদের ভারী সুন্দর নিয়ম,  সূর্যের সাথে কাজ শুরু, সূর্য ঢলতে কাজ শেষ। প্রাচীন মানুষের নিয়ম। পাওয়ার কনজাম্পশন কত কম।  আমরা কেন যে ভালো নিয়মগুলো সব জলাঞ্জলি দিলাম! সন্ধ্যে নামতে একগাদা ঝিঁঝি ডাক শুরু করলো। আশেপাশের থেকে পোকা মাকড় এসে আসর জমালো। এঁরা সাতটার মধ্যেই খেয়ে শুয়ে পড়ে, আমরা থাকায় আট্টার সময় টেবিল সাজালো, সেও এখানে মেলা রাত। লোকটাক হ্রদের আড় জাতীয় মাছ,সবজি রুটি ডাল আর কালো চালের পায়েস, তোফা খেয়ে শুতে গিয়ে দেখি,  তাপমাত্রা বেশ কমেছে। মশারীটা মাওপাকচুবাবুর আলাদাই কেতের। ঝালর দেওয়া,  এদিকে ফুটোফাটা। সে মশারি খাটেই লাগানো থাকে অষ্টপ্রহর তাই কিঞ্চিৎ ধূলো টুলোও আছে। সে থাক। আপাতত কম্বল গায়ে এলার্ম সেট করা যাক। কাল সাড়ে চারটেয় নৌকা করে হ্রদে ঘুরতে যাওয়ার কথা। সাড়ে চারটে শুনেই সবাই কাঁইমাই লাগিয়েছে। না না অত সকালে উঠবো কি করে। দলে গেলে মুশকিল এইটাই। পাঁচটায় রফা হল, যদিও সেই নৌকায় উঠতে সাড়ে পাঁচটাই বাজলো। এরা অবশ্য খুবই সময়জ্ঞানী, সাড়ে চারটেতেই এসেছিলো।


মাথায় টোকা দিয়ে, বসার মাদুর বগলে নিয়ে লাইফ জ্যাকেট পরে (আমাদের মাঝির অবশ্য লাইফ জ্যাকেট ছিলো না),  ভোরের ঠান্ডা আলো আর হাওয়ায় একজনের বাড়ির উঠোন দিয়ে নৌকায় ওঠা গেলো। সালতির মতো নৌকা। বিদেশে কায়াকিং করে এরকম নৌকায়। দুটো সালতি জোড়া দিয়ে আমরা সাতজন বসেছি। বড় বড় ঘাসের মধ্যে দিয়ে, এগোচ্ছি। বাপরে কি ঠান্ডা রে বাবা। সূর্যের আলো এখনো নরম, পাশের পাহাড়ে ভরসা দেবার মতো করে এসে পড়ছে। লেকের মাঝে মাঝে বায়োমাস জমাট বেঁধে ফ্লোটিং চড়া বানিয়েছে, সেই চড়ায় একটা হোমস্টে আছে। আমরা দেখেছিলাম কিন্তু আপাতত সেটা চালু না। এদিক সেদিক পাক মেরে মেরে ঘুরতে ঘুরতে লোকটা নিয়ে গেলো আমাদের একটা ওরকম চড়ায়, গরমকালে এরা এখানে এসে থাকে। দেখতে তেমন উমদা হয়তো না, কোনোরকম বাঁশের ঠেকনা দেওয়া বাড়ি, ভিতরে একটা অস্থায়ী উনুন আর ঘাসের বিছানা। কি তু গরমের দিনে দুপুরে চারিদিকের ঠান্ডা বাতাসে আরাম যা হয়। ময়লা জামা, পরা উজ্জ্বল হাসি হেসে লোকটা তার সামার ক্যাম্প ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলো। তাতে এতটুকু মালিন্য নেই।

 


ফেরার সময়,  মনিপুরি ভাষা শেখাবার চেষ্টা করলো সে খুব, কিন্তু নেহাতই নিরেট মাথা আমাদের,  তেমন কিছুই মনে রাখতে পারিনি, তবে গানের গলাটা খাসা। ভারী সুন্দর গান শোনালো। যাদের বাড়ির উঠোন দিয়ে গিয়েছিলাম, ফেরার সময় ভালো করে দেখতে দেখতে আসছিলাম, মাওপাকচুর বাড়ির মতোই এই বাড়িটাও নিকোনো উঠোন, তারপর লাল মেঝের দাওয়া, চিনের চালের ঘর৷ লাল মেঝের দাওয়ায় ছেলে কাঁখে বসে একজন। বাড়িটার চারধারে ফুলের গাছ, একটা হাঁস বা মুরগী পোষার জায়গা ওদিকে। ভারী শান্তি লাগে দেখলে। ইচ্ছে হয় এখানেই থেকে যাই, লেকের জলে মাছ ধরবো, অবসরে বই পড়বো, আর মাঝে মাঝে পাহাড়ে উঠে বসে থাকবো। কিন্তু সেই শান্তির জীবন বাপার মতো মানসিক স্থৈর্য,  নির্লোভী ভাব, শান্তি খিয়ে বসেছি কবেই হয়ত।

নৌকা ভ্রমন করে ফেরার পর, মিসেস মাওপাকচু, দলের মেয়েদের মনিপুরী পোশাক দিয়ে সাজিয়ে দিলো,তারপর কালো চালের মিষ্টি লুচি, কলা, আর দেশী ডিম খেয়ে মাওপাকচুর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পালা। আজ আমরা যাবো অন্য দিকে, উখরুল। লম্বা জার্নি আছে সামনে, উখ্রুল নিয়ে আমাদের পড়াশোনায় বিস্তর খামতি ছিলো। বলছি। 

মিস্টার এন্ড মিসেস মাওপাকচু

(ক্রমশঃ)


Wednesday, April 7, 2021

নয় পাহাড়ের উপত্যকায়(এক)

দার্জিলিং এর লেখায় পজ পড়েছে এতো আরো কিছুদিন পজ দেওয়া যাক। এর ফাঁকে দুড়ুম করে মনিপুর থেকে ঘুরে এলাম, সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের ভাষা, লোকজন, সেসব ভুলে যাবার আগে লিখে রাখি। আমাদের বন্ধুদের গ্রুপে বেড়াতে যাবার কথা লেগেই থাকে, মিশর থেকে মিজোরাম আফ্রিকা থেকে আলাস্কা সব ঘোরার প্ল্যান হয়, তারপর পকেট, ছুটি সব আমাদের ফোঁস ফোঁস করে ভয় দেখায় আমরাও ল্যাজ গুটিয়ে কাজে বসি। তবু মাঝে মাঝেই ফোঁসফোঁস উপেক্ষা করেই কিছু জায়গা ফাইনাল হয়, টিকিট কেটে নেওয়া হয় ফস করে। অনেকে মিলে প্ল্যান করলে এইটা সব চেয়ে জরুরী।  ফস করে টিকিট কেটে নেওয়া। তাহলে সেটা আর কেউ ক্যানসেল করতে পারে না। না হলে কিছু না কিছু এসে দেখবে ভন্ডুল হবেই। এবারে শুরু হয়েছিলো আসাম দিয়ে। তারপর মেঘালয়, টিকিটের দাম দেখি আকাশ ছোঁয়া হয়ে গেলো আমাদের গ্রুপ কলের মাঝেই। গুগল কিছু ডেটা চুরি করে বটে!! শেষে আমরা কোড নাম দিয়ে প্ল্যানিং শুরু করলাম। মানে যাবো মনিপুর কিন্তু বলছি মুম্বই। সত্যি বলতে এরকম করে কাজ আদৌ হয়নি হয়তো, তবু তাও তাতেই আমাদের মনে ভাব খুব কিছু করলাম! নর্থ ইস্ট এতোটাই আনএক্সপ্লোরড যে অন্য দেশ ভাবে লোকে!  ওরকম প্রায়  অচেনা একটা জায়গা দেখার উত্তেজনা আলাদাই হয়। প্রায় অচেনা বলতে আমি বলছি কমন ডেস্টিনেশন না আর কি। আহা ভাবলেই ভাল্লাগে।  "বাবু পন্ড দেখো", বলে হাঁক পারা থাকবে না।  "এই বয়সেই কেমন স্মার্ট হয়েছে দেখো এই টুকু ছেলে"  বলে বাঁদরামি করা বাচ্ছার গর্বিত মা বাবার হাঁকডাক থাকবেনা, জোরে গান চালিয়ে শান্তি নষ্ট করা থাকবে না। সুতরাং একদিন সকালে এয়ারপোর্টে সাত মক্কেল জুটে গেলো এই "রোজ একই দিন রিপিট হচ্ছে যেন " থেকে পালাতে। দেখা হতেই এমন বুঁদ হয়ে আড্ডা মারতে লেগেছিলাম, দু ঘন্টা আগে এয়ারপোর্ট এসেও আমাদের হাঁকডাক করে ডেকে পাঠিয়ে তবে প্লেনের পেটে তোলে! 







ছোট্ট পুচকে একখানা এয়ারপোর্ট, কোলকাতার মতো গরম নেই, তবে রোদ বেশ চড়া।  বাঙালী খালি আমরাই নামলাম মনে হয়,  ইনার লাইন পারমিট করাতে হল কেবল আমাদেরকেই কিনা। সেও ভারী অদ্ভুত নিয়ম, নতুন করালে ১০০ টাকা আর রিনিউ করালে ২০০! মগ দেশ পাশেই বোঝা যায়! গাড়ি চলা শুরু, নতুন জায়গার হাওয়ায় মন চনমনে।রাস্তার পাশেই ফাঁকা মাঠ আর তারপরেই নীল পাহাড়। রোদের তেজ যেমন আছে, হাওয়ায় ঠান্ডা ঠান্ডা ভাবও আছে।  ত্রিশ চল্লিশ বছর আগেকার কোনো ছোট গ্রাম মতো যেন। টিনের চালের বাড়ি, অনেক বাড়ি দোকানের দেওয়ালও আবার টিনের। গায়ের উপর বাড়ি দেখে দেখে ক্লান্ত চোখে এতো খোলা জায়গা দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়।  ঝকঝকে নীল আকাশ, ছোট ছোট জন বসতি পেরিয়ে যাচ্ছিলাম। মূল রাস্তা থেকে ডানদিক নিল গাড়িটা, একটা পুরোনো বিষ্ণুমন্দির আছে এখানে। একটা দড়ি ফেলা আড়াআড়ি রাস্তায়, কী ব্যপার? দোলের রেশ শেষ হয়নি এখনো, চাঁদা তোলা হচ্ছে। এই চাঁদার ব্যপারটা তারপর ঘনঘন হতে থাকবে। এখানে ছেলের দল চাঁদা তোলে না, মেয়ে বউ এর দল তোলে, বাচ্ছা মেয়েরাও আছে কিন্তু বাচ্ছা ছেলেরা নেই। মেয়ের দল গাড়ি, বাইক সব থামায়, দশ টাকা বিশ টাকা বা খুচরো কিছু দিলে রাস্তা ছাড়ে তবে। চিত্রাঙ্গদা দড়ি ফেলে অর্জুনের পথ আটকেছিলো তবে!! বোঝো!এদ্দিন ভেবে এসেছি তীর ধনুক নিয়ে যুদ্ধ করেছে! ড্রাইভার ভালো জানেনা কোথায় যেতে বলছি, গুগলও ভালো বোঝে না, নেহাৎ সরকার বাহাদুর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রেখেছিলো তাই জানা গেলো এটাই সে প্রাচীন মন্দিরটা। ভেঙে চুরে গেছে, মন্দিরও বন্ধ। তবু, আমার অত খারাপ লাগছিলো না, ঝিরঝিরে হাওয়া আর কড়া রোদের এই কম্বোটাই আমার সেরা লাগে তার সাথে একগাদা পাখির ডাক, কিছু আমাদের রোজকার দেখা পাওয়া চড়াই আছে বটে, তবে আজকাল দেখতে পাওয়াই যায় না যাদের, সেই বুলবুলি, দোয়েল, ফিঙেও আছে। তুড়ুক তুড়ুক করে উড়ছে, দোল খাচ্ছে, মন্দিরের ছাদে বসে আড্ডা মারছে।দূরে পাহাড়ের কোল থেকে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে, চারপাশে ছোট জনবসতি, টিনের চালের ঘরের সব মিলিয়ে ভারী ঝিম ধরা শান্ত একটা পরিবেশ, টেনশন নেই, তাড়া নেই।

দোলের ছুটি এদের এখনো চলছে, আইএনএ মিউজিয়াম বন্ধ। খানিক আপশোষ তো হোলোই। সেই কবে একটা মেরুদন্ড সোজা লোক বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করেছিলো, সকলে একবাক্যে তাকে নেতাজি বলতে দ্বিধা করেনি। দ্বিতীয় জায়গা যেখানে স্বাধীন ভারতের পতাকা উঠেছিল সে জায়গা দেখতে না পেলে আপশোষ হবেই।লোকটাক হ্রদে আমরা মাওপাকচুর ঘর বুক করে রেখেছিলাম।সে কেমন ঘর জানিনা, তবে ভদ্রলোক ভারী অমায়িক এটা জানতাম। আমাদের ড্রাইভারবাবু তো কিছুই চেনেন না, মাওপাকচুর সাথে কথা বলে, গুগল ম্যাপের নির্দেশ শুনেও ভারী নাকানিচোবানি খেয়ে তিনি পৌঁছলেন। লোকটাক লেকের ঠিক পাড়েই পাহাড়ের কোলে ওনার বাড়ি। লোকটাক লেকের বৈশিষ্ট্য হল, বায়োমাস গুলো জমে জমে ভারী সুন্দর একটা রিং রিং আকৃতি করেছে সারা লেক জুড়েই। যেন কাদের রঙ্গোলী দেবার শখ হয়েছিলো। আলপনা বললাম না,  কারন সাদা রঙের না, সবুজ রঙের সে রিং। গাড়ি থেকে নেমে একটা উৎরাইতে নেমেই দেখি তকতকে লাল মেঝের মস্ত দাওয়া একটা বাঁধানো উঠোনের চারপাশে। উঠোনের মাঝে তুলসীমঞ্চ।  দাওয়ার এক পাশে মস্ত টেবিল চেয়ার পাতা কাঠের কাজ করা আর দাওয়ার ওইদিকে জাল বোনার সরঞ্জাম, চরকা এইসব। ছোট্ট একটা সুইফট বাসা বেধেছে দেওয়ালের গায়ে। দেখেই মনে এতো শান্তির একটা ভাব হয় সব অবসাদ কেটে যায়। তাই ঘরের বাথরুমে স্নানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে কি নেই তা নিয়ে কোনো অভিযোগই যেন আকার নেয় না। দোতলায় ছোট্ট একটা লাইব্রেরি আর ক্লান্ত হলে লেকের দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য জানলা। জানলা দিয়ে দেখা যায় ডিঙি ভাসছে একটা।  দুপুরে ঝকঝকে স্টিলের থালায়, স্টিলের ডেকচিতে সে আমাদের খেতে দিল। মনিপুরি স্টিকি রাইস, নিজের ক্ষেতের বাঁধাকপি, ডাল, দেশী মুরগি, আর জলপাই এর চাটনি। অন্যরকম স্বাদ, কিন্তু মিসেস মাওপাকচু রেঁধেছেন নিজেই, আর এত যত্ন করে খেতে দিয়েছেন মিস্টার মাওপাকচু,  সব মিলিয়ে ভারী আনন্দ হল খেয়ে। 

কি ভাগ্যিস এঁর ঘর বাথরুম আমাদের দলের মেয়েদের চূড়ান্ত অপছন্দ হয়েছিলো। মানে পুরো পরিবেশ নিঃসন্দেহে ভালো কিন্তু ঘরে ধূলো, কিংবা চানের জায়গা না থাকা বাথরুম তাদের স্বস্তি দেয়নি তেমন, ফলে আমার খানিক সুবিধেই হল। মানে খেয়ে উঠেই কেউ গড়াতে চাইলো না, ফলে আমাকেও তাড়া দিয়ে বের করতে হল না। আসলে আমি কোথাও বেড়াতে গেলে যতটা পারি বাইরে বাইরে কাটাতে ভালোবাসি, হোটেলে বসে থাকবো, কিংবা ঘুমোতে যাবো বলে পাহাড়ে উঠবোনা এ আমি ভাবতেই পারিনা তাই কিঞ্চিৎ লড়তে হয় সদলবলে কোথাও গেলে। সুবিধে হল, এই দলের সবার ধরন আলাদা হলেও সবারই মোটামুটি এমপ্যাথি কোশেন্ট বেশী। আমার তো মনে হয় আর কিছু না,  মায়া ব্যপারটা বড় জরুরী,  ওটা থাকলেই হয়তো আর্ধেক সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। (ক্রমশঃ)

Wednesday, March 31, 2021

অনেকদিন পরে পাহাড়ে (চার)

দাওয়াইপানি থেকে ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। রাস্তা বেশী না, তবু সেই টুকু রাস্তাও আমাদের পাশে পাশে সঙ্গ দিয়ে গেল কাঞ্চনজঙ্ঘা।  দার্জিলিং এই নিয়ে তৃতীবার আসা আমার। সত্যি বলতে এ আগে দুবার ঘুরে আহামরি আমার লাগেনি, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাইনি বলে না; বড় বেশী বাড়ি, বড় বেশী লোক যেন। প্রথমবার এসেছিলাম বন্ধুদের সাথে, ঝিরঝিরে বৃষ্টির সাথে এক বিকেলে আলাপ হয়েছিলো, কোত্থাও জায়গা না পেয়েউঠেছিলাম আস্তাবলের ওদিকের এক হোটেলে। সে একেবারে হোটেল ডিলাক্স টাইপ, পাশের ঘরে সব কছু শোনা যায়। পরের রাতটা অবশ্য সে সময় আমাদের জন্য খুউউউব ভালো হোটেলে কেটেছিলো। এখন খুঁতখুতানি বেড়ে গেছে কি? দুরাত হুরুম হারুম ছোটাছুটি করেই কেটে গেছিলো। আর একবার মা আর দিদিভাইদের সাথে, সেও ছিলো বর্ষার দার্জিলিং, সেবারেও মিরিক যাবার কুয়াশা আর মেঘ মাখা রাস্তাটা ছাড়া আর কিছুই তেমনঅনে দাগ কাটেনি। মেঘ মাখা পাহাড়ি গাছের ভীড়ে পাহাড় বড় অদ্ভুত সুন্দর লাগে। কী যেন রহস্য ঢাকা আছে ওইদিকটা, পা বাড়ালেই কোন অচেনা জগতে ঢুকে যাবো যেন, সে আমাদের সাধারন লাভ ক্ষতির জগতের বাইরে।বাকি দার্জিলিং বড় ঘিঞ্জি।

 

 শুনে মোহর বলেছিলো, "বেশ তো এবার আমার সাথে চলো, দেখাই যাকনা আমার প্রিয় শৈলশহরটা তোমার ভালো লেগে কিনা।"  আমরা উইকেন্ডটা এড়িয়ে ছিলাম ইচ্ছে করেই, লোক কম হবে। রাজভবনের পাশে গাড়ি দাঁড়ালো, আমি তো এর আগে রাজভবনের দিকটাতেই আসিনি! হোটেলের ঘরে পৌঁছে জানলার পর্দা সরাতেই কাঞ্চনঞ্জঙ্ঘা! আহা ঘরটাও ভালো, এ কদিন তো নিজেদের আনা চাদর বদলে থাকা হচ্ছিলো এখানে আর সে ঝামেলায় যাবার দরকার পড়লো না, ওরা চোখের সামনেই অন্য একটা ঘর রেডি করছিলো দেখে খানিক ভরসা মিলেছিলো। চান টান করে ইলেক্ট্রিক হিটেড কম্বল্রর তলায় পা গুটিয়ে বসে যা আরাম বাপরে বাপ।কিন্তু ঘরে বসে থাকতে মোটেও ভাল্লাগেনা। দার্জিলিংের আশপাশে কিচ্ছু দেখবো না এমনটাই ঠিক আছে। স্রেফ এদিক সেদিক খাবো, রাস্তায় রাস্তায় হাঁটবো, ভীড়ে কিংবা বাজারে। উইকডেজের বেলা,  তাই ম্যালের পিছনের রাস্তায় লোক নেই তেমন, এক দুজন স্থানীয় লোক পেরিয়ে যাচ্ছে, এক বুড়ি চা নিয়ে বসে আছে, যাকে আমরা রোজই পাক খাবার সময় দেখতে পাবো। দার্জিলিং মানেই ফেলুদা ফেলুদা গন্ধ এমন, ম্যালে এসে জানতে ইচ্ছে করে পশ্চিমদিক কোনটা, সকালে কোন বেঞ্চটায় রোদ পড়ে....সর্বোপরি সেই সময়কার দার্জিলিংটা কেমন ছিলো ঠিক? ভানুভবন তখন এরকম মাথা চাড়া দিয়ে সমস্ত ভিউ বন্ধ করে দেয়নি, ঘোড়ায় চড়া একটা থ্রিলিং ব্যপার ছিলো নির্ঘাত, বাঙালীর হাতে সময় ছিলো নিজেকে দেবার, সাতদিন দার্জিলিং শুনে অবাক হবার ব্যপার ছিলো না।

 

কেভেন্টারস আহ একেবারেই ফাঁকা। একটা স্থানীয় ছেলে ছোকরাদের দল বসেছে ক্লক টাওয়ারের  দিকটায় বাকি ফাঁকাই। কেভেন্টারাসের সুবিধে হল, মেনু ঠিক করার দরকার নেই, কী খাবো জানি। স্বাদ নিয়েও চিন্তা নেই, আবেগেই মোটামুটি ভালোলাগা স্থির হয়ে যায়, তা না হলে ছোটবেলার দুর্গাপুজোর সব স্মৃতি এত ভালো হয় কি? রেস্তোরাঁয় খাওয়া নিয়ে একটা কথা বলি, আমি আর মোহর যখন বিয়ের আগে রেস্তোরাঁয় যেতাম, মূল উদ্দেশ্য থাকতো সময় কাটানোর বয়সকালের প্রেম, চড়া রোদে মাইলের পর মাইল হেঁটে বেড়ানোর উৎসাহ বা ক্ষমতা আর ছিলো না। কিন্তু সমস্যা হত, খাবার এলেই আমরা একবার চুপ করে যেতাম, এবং মিনিট দশেকের মধ্যে প্লেট সাফ। নে এবার কত বসে থাকবি থাক! ফাঁকা কেভেন্টারস এর ছাদও তাই আমাদের বেশীক্ষন আটকাতে পারলো না। পর্ক প্ল্যাটার এর পর হট চকলেট,  কফি তাতেও না। শেষে নীচে নেমে আইস্ক্রীম নিয়ে হাঁটা দেওয়া ছাড়া উপায় রইল না। 



আগে দুবার দার্জিলিং এসেছি কিন্তু আমি চার্চটা দেখিনি। সত্যি! যদিও চার্চ বন্ধ ছিলো, কিন্তু বাইরে থেকে দেখতেও কম ভালো লাগছিলো না। নির্মল ঝকঝকে আকাশের গায়ে চার্চের টাওয়ারটা দাঁড়িয়ে ছিলো আরাম করে। চার্চের পাশেই পশ্চিমবঙ্গ ট্যুরিজমের হোটেলটা।আমরা জায়গা পেয়েছিলাম কিন্তু ঘর গুলো যতটুকু দেখেছিলাম ইন্টারনেটে কেমন কেমন লাগছিলো, ছাড়াছাড়া মাংসের ঝোল যেমন হয়...সরেজমিনে দেখতে গিয়ে দেখি পুরোনো দিনের এই বড় বড় ঘর, পুরোনো আসবাব, ফাঁকা ফাঁকা চারদিক। মন খারাপ করা যেন। সামনের লনটা ভালো, তবে সে বুড়োদের জন্য আর বাচ্ছাদের জন্য। চুপ করে লনে বসে থাকার মতো ধৈর্য্য কিংবা ঘাসে দৌড়ে বেরানোর সরলতা আমাদের নেই।  




তারপর ফের হাঁটা শুরু করলাম, আরো পিছন দিকে, রাজভবন পেরিয়ে গেলাম, কি একটা যেন পার্ক আছে, বড় বড় গাছ পালা ছাওয়া সেও পেরিয়ে গেলাম। ট্যুরিস্ট নেইই এ রাস্তায়,স্থানীয় লোক, স্থানীয় বাড়ি। পাহাড়ের বাঁকে,  গাছের ছায়ায় সত্যি বলতে দার্জিলিং ততক্ষনে ভালোবাস্তে বাধ্য করে ফেলেছে আমায়। 





Sunday, March 14, 2021

অনেকদিন পরে পাহাড়ে(তিন)

 সেই কবে ছায়াতালে মোমো খেতে খেতে থেমেছিলাম। তারপর লম্বা গ্যাপ দিয়েছি। সরি হ্যাঁ? 

সকাল বেলাতেই বেরিয়ে পরবো,  লম্বা পাড়ি দিয়ে দাওয়াইপানি।  ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম, কয়েকটা হোমস্টে, গাছপালা জঙ্গলে ঘেরা। দাওয়াইপানি আজকের ইন্টারনেট যুগে অচেনা নাম না, দার্জিলিং এর কাছেই। মুশকিল অন্য জায়গায়, আজকাল কোনো জায়গাই অফবিট নেই, তাই সব জায়গাতেই ভীড়,  "কাল থেকে তো সমানে পাদলা পায়খানা হচ্ছে" ,  বাক্যাংশ শোনা যায় গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে কিংবা উড়ে আসে ব্লুটুথ স্পিকারে টুম্পা সোনা অধিকাংশ জায়গায়। আরেকটা দিকও আছে, যেটা সত্যি বলতে কোভিডের আগে কখনো চোখেও পড়েনি। একটা কম্বলের ওয়্যার পড়াতে খুব এক্সট্রা পয়সা লাগে না খুব কিছু, হোমস্টে গুলোতে সেই কন্সেপ্টই নেই। কেন কে জানে!দাওয়াইপানিতে আমারা থাকবো ঠিক করেছিলাম যখন যে ভদ্রলোকটির সাথে কথা হয়, ফোনের ওপারে ভারী বিনয়ী নম্র এক পাহাড়ি মানুষ। বীরেন রাই এর দু রকম ঘরের একটু বেটার যেটা সেইটায় বুক করেছিলাম মাস দুয়েক আগে প্রায়। ভদ্রলোক ফোনে জানিয়েছেন যে ভালো রাস্তায় কাজ চলাচলের জন্য আটকে আছে, অন্য একটা পাথুরে রাস্তা আছে সেটায় আসা সব ড্রাইভারের জন্য সম্ভব নাও হতে পারে। কথাবার্তা বলে ঠিক করা গেলো তিনমাইল অব্দি আমরা যাবো নিজেদের ঠিক করা গাড়িতে বাকিটা ও ব্যবস্থা করবে। কালুক থেকে দাওয়াইপানি কম দূর না। বীরেনের মাখন হাত, ঝকঝকে নীল আকাশ, উচ্ছল তিস্তা নদী সে রাস্তা নিমেষে পেরিয়ে যায়। ছেলে ঘুরতে ভালোবাসে, ছবি তুলে বাঁধিয়ে রাখে ঘরে, বন্ধুরা মিলে ঘুরতে গেলে ফূর্তি না করে স্রেফ স্টিয়ারিং এ মন দিতে হওয়ায় ভেবে নিয়েছে এবারে আর নিজে গাড়ি চালিয়ে যাবেনা ঠিক করেছে। হাসিখুশী, নম্র এবং দক্ষ ছেলেটাকে ভারী ভালো লেগেছে। আবার কখনো দেখা হবে কিনা কে জানে!


 তিনমাইল থেকে দাওয়াইপানির রাস্তাটা আহাহা।এবড়োখেবড়ো রাস্তায় সচরাচর গাড়ির চাকা চলে না বোঝা যায়।দুধারে ঘন জঙ্গল, পাখির ডাকের আওয়াজ শোনা যায় না অবশ্য গাড়ির আওয়াজে। এই রাস্তাটায় আবার আসতে হবে তো পায়ে হেঁটে। দাওয়াইপানিতে কিচ্ছু করার নেই সেইটাই একটা ভালো দিক, পাহাড় দেখো, জঙ্গলে হাঁটো বা গ্রামে ঘোরো ব্যাস। কিন্তু শুরুতেই মুশকিল। বীরেন রাই গেছে গ্রামের লোকের সাথে হাত মিলিয়ে রাস্তা ঠিক করতে,  আর ওর বউ আমাদের ঠিক করা ঘর দিয়ে দিয়েছে অন্য এক দলকে। তারা তো এরকম মওকা পেয়ে আর বেরোবেনা ঘর থেকে। এদিকে অন্য যে ঘরটা দিচ্ছে সেটা বড়ই ঘিজিমিজি মতো, মানে একটা গ্রুপ এসেছে তারা তোয়ালে পরে খালি গায়ে দেখলাম নতুন অফার করা ঘরটার পাশের ঘরটা থেকে বেরোচ্ছে। আমায় আপনারা নাক উঁচু বলতেই পারেন, কিন্তু কিছু জিনিস আমার বরদাস্ত হয়না।  খালি গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়ে আসা এই দল শিওর রাতের বেলা উল্লাস যাপন করবে মদ খেয়ে  কন্ট্রোল করতে না পেরে বমি করে বা চড়া মিউজিক চালিয়ে। পাহাড় মাখতে  এসে এসব আমার পোষায় না। সুতরাং অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, ওই ঘরে যাবো না। ফোনাফুনি, এক্সপ্ল্যানেইশন ইত্যাদির মাঝে দেখি এক বাঙালী লোক এসে বলছে, "কী হয়েছে?" বাঙালী দেখে নেচে উঠেছি এমন না, কারন বেশীরভাগ সময় বাঙালীরা এসব ক্ষেত্রে অ্যাডজাস্ট করার পরামর্শ দেয়, তাছাড়া উটকো লোককে জবাব দিতেও ভাল্লাগেনা। 




ভদ্রলোক নরম গলায় বললেন, ওনার নাম সূর্য।  এখানেই আড্ডাহাট বলে একটা হোমস্টের মালিক। একবার যদি আমরা দেখে নিই ঘরটা।  সমস্যা যখন হয়েইছে, এটা ওনার গ্রাম, গ্রামের অপবাদ হতে দিতে চাননা বলেই বলা। মুখের উপর না বলা যায় না, পছন্দ না হলে না বলব, একবার দেখেই আসা যাক। আড্ডাহাট একটু উপরে, চড়াই ভাঙতে হয় একটু। পিছন থেকেই  জঙ্গল শুরু। দেখে ভালোই লাগলো। থেকেই যাই নাকি?


 


ভদ্রলোক জানালেন,ওনার বন্ধুরা এসেছে, সময় কাটাতে একসাথে,বোর্ডার আর কেউ নেই তাই কুক ছুটিতে।  মায়াই লাগলো,  বেচারা, তার চেয়েও মায়া লাগলো বন্ধুর বউদের  উপর,  তাদেরই রান্না করতে হচ্ছে কিনা। এক্সট্রা এক জোড়া লোক তাদের দেখাশোনা। কোনো মানে হয়! কিন্তু কোনো রকম অসন্তোষ না রেখেই তারা আমাদের খেয়াল রেখেছিলো একথা না বললে অন্যায় করা হবে। আড্ডাহাট এর একটা লম্বা বারান্দা আছে, সব থেকে কোনের ঘরটা আমাদের ছিলো, বাকি দুটোয় সূর্যবাবুর বন্ধুরা ছিলো, তারা নিজেদের মধ্যে আড্ডায় ব্যস্ত, নীচে, উপরটা আমাদেরই দখলে বলা যায়। 

কালুকে কেনা পেয়ারা ওয়াইন।দেখতে অবশ্য স্কচের মতো


খেয়ে দেয়ে যে পথে গাড়িতে এসেছিলাম সেই রাস্তাতেই খানিক হাঁটা গেলো। ফিটনেস কমে গেছে খুব। চড়াই ভাঙতে কষ্ট হয়। কেউ কোত্থাও নেই, চেনা অচেনা কিছু পাখিরা ছাড়া। ক্যাঁ ক্যাঁ করে ডাকছে গাছের আড়ালে লুকিয়ে। বনে জন্তু কিছু আছে ছোটো তারাও লুকিয়ে আমাদের দেখছে কিনা কে জানে! এক জায়গায় খেলার মাঠ করা আছে। এতো গুলো গাছ কেটে মাঠ বানালো বলে ভাবতে গিয়ে টের পেলাম এটা ন্যাকামি হচ্ছে, হোমস্টেতে যে থাকছি, সেও গাছ কেটেই গড়ে উঠেছে, এই গ্রামটাই তাই। তা বেচারারা খেলবে কোথায় তাহলে? আবার এই করে ভাবতে গেলে পুরো জঙ্গলটাই সাফ হয়ে যায়! আমাদের এখন সামনে ঢাকতে গেলে পিছন ফাঁক হয়ে যায় আর পিছন ঢাকতে গেলে সামনে দশা। জনসংখ্যা আর লোভ দুইই না কমালে খুব কিছু উপায় নেই। মোটা ল্যাজওয়ালা কালো রঙের কী যেন ফস করে পিছন দিয়ে পার হয়ে গেল!  গা ছমছমে কোনো জন্তু বেশ! ভাবার তো দোষ নেই, দেখতে যখন পাইনি,বন বিড়ালই বা ভাববো কেন শুধু! 

বনপথে হাইক করে ফিরে গ্রামটা একটু ঘুরতে না ঘুরতেই বীরেন রাইজি হাজির হলেন। অত্যন্ত কাঁচুমাচু মুখে বারবার ক্ষমা চাইছিলেন। দেখে মায়াই লাগছিলো, আমরাই উল্টে বললাম আর কি করা যাবে! ক্রমে অন্ধকার নেমে এলো, গাছের ফাঁকে, বারান্দায়। প্রচন্ড ঠান্ডা হলেও ওই নির্জন বারান্দায় আমরা ঝুম হয়ে বসে রইলাম কতক্ষন কে জানে,  অন্ধকারের রঙ বদলালো, হাওয়ার গতি বদলালো, নীচ থেকে সূর্যর নেপালি সহকারী দেশী মুরগী কাটতে নিয়ে যাচ্ছে আওয়াজ এলো, বাচ্ছাগুলোর আওয়াজও ভেসে আসছিলো মাঝে মাঝে কিন্তু সব কিছু ঝাপিয়ে দূর পাহাড়ের জ্বলে ওঠা আলো, আর পিছনের জঙ্গলের শীত জড়িয়ে ছিলো চেয়ারগুলোয়। 

সকালে উঠে দরজা খুলে বেরিয়ে দেখি ফের তিনি। যদিও তেমন পরিষ্কার ভিউ না, কিন্তু তাতে আনন্দের কম হয়না কিছু। আর তার সাথে কিচিরমিচির কিচিরমিচির করে একগাদা পাখি তাদের সকালের বাজার হাট, দোকান পাতি করছে। এই দোল খেলো একজন তো ঝটাপটি করলো ওই দুজন, একা বসে রয়েছে আরেকজন ওই ডালে। আমি কাঁচা হাতে একবার ওই দিক আর এই দিক করে খান কতক কে ফ্রেম বন্দী করার চেষ্টা করলাম বটে, তবে তেমন হল কই আর।