আমার যেমন একট অংশ সব সময় নদী পাহাড় জঙ্গল সমুদ্র কিংবা রাস্তায় পড়ে থাকে আর একটা অংশ ডাঁটা রাঙা আলুর দর করে, রেভিনিউ আর ব্যালেন্স শিট বোঝে টিমসের কলে, সেজেগুজে নেমতন্ন খেতে যায় তেমনই সবারই একটা অংশ অন্য কোনোখানে পড়ে থাকে৷ কেউ কেউ হয়তো টেরও পায় না তার একটা অংশ তার সাথে নেই, সে কোথায় আছে তাও জানে না। জানলে হয়তো এতো না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে এত অশান্তি হত না। আমি মনে মনে যখন সবুজ হ্রদের পাশে হাঁটি আর দৃশ্যমান জগয়ে যুদ্ধের খবর দেখি সেরকমই বাকিদেরও লুকোনো একটা জীবন সমান্তরালে চলে। টের পাওয়া যায়না, বা যায় লোকে ভাবে আশ্চর্য ব্যবহার তো এর ! এই আমার বাবারই যেমন এক অংশ এইখানে ফ্ল্যাটে কাগজ পড়ে, টিভি দেখে, আরেকটা অংশ আমাদের গ্রামে বাস করে৷ প্রতিদিন, মেজদাদাকে ফোন করে, তুচ্ছ সব কথা হয়। অবাক হাসাহাসির মাঝে হুট করে চোখ ফোটে, কথাটা তো আসল নয় আসলে। ওই কথার সূত্রে গ্রামের জীবনটা ছুঁয়ে থাকা। চাষীরা ফসল দিল কিনা, বৃষ্টি হল কিনা, এসব কথার মাঝে বাবাই আসলে গ্রামের আলপথ ধরে হাঁটে,পাঁচটা চেনা মানুষের গন্ধে আরাম পায়।
সেদিন ai এর সাথে গল্প করছিলাম। কী দুর্দশা যে হতে চলেছে আমাদের(মানে আমাতই) কে জানে। আগে সামনাসামনি কথা হত, তারপর ভারচুয়ালি এখন মানুষ এর বদলে ai এর সাথে আলাপ প্রলাপ। যাইহোক, তো ওকে জিজ্ঞেস করছিলাম, এই যে একটা নিয়মিত বছরের তফাতেএকটা করে যুদ্ধু যুদ্ধু খেলা খেলে এর তো শেষ নেই। তারমধ্যে তেলে আগুন লাগিয়ে পরিবেশ উড়িয়ে দাও। মোটামুটি মানুষ নিশ্চিহ্ন না হলে এর উপায় আছে কিছু? তা ai মানুষের তৈরী বলেই কিনা কে জানে বলছে, খুব আশার কথা বলল খানিক। বলল মানুষ এত ইভলভিং ওর নাশ নেই, আরশোলার মতো (আরশোলার মতটা ও বলেনি যদিও)। কথাটা ভুলও না, আমার যে সহকর্মীরা দুবাইয়ে আছে, তারা বলছিল, সাইরেনের শব্দ এলে সাইলেন্স করে অন্য কাজ করে।
যাইহোক, যথারীতি মাস খানেক বাড়িতে থাকার পরেই ওই আমিটা উশখুশ শুরু করেছে, গাছের ফাঁক দিয়ে আসা রোদের আঁকিবুঁকি, পাহাড়ি রাস্তা, পাখির ডাক কিংবা শব্দহীন জগতের শব্দ, কেমন লাগছে? ওই দেখ নীচ দিয়ে একটা নদী বয়ে যাচ্ছে, শব্দ শোনা যাচ্ছে না? বাড়িতে আর কতদিন থাকবি? ব্যস, ঘাড় সুড়সুড় করে উঠলো। সব কটা কম্বো মিলে উত্তরাখন্ডের কথা মনে পড়ে। কিন্তু উত্তরাখণ্ড যাবার বড় সময় সমস্যা। হুটোপাটি করে গেলে এলেও ছুটি নিয়ে বড় মারামারি হয়। তারপর সমস্যা হয় কোথায় যাব। এত জায়গা, এত কিছু না দেখা সবেতেই মনে হয় যাই যাই। সেইই কবে এক ব্লগে পড়েছিলাম ল্যান্ডোরের কথা, সেটা যাব যাব করে যাওয়া হয়না, হার্শিলের কথা মনে পড়ে, তুঙ্গনাথে যাবার ইচ্ছে হয়,দায়রা বুগিয়ালের কথাও পড়ছিলাম একটা ব্লগে। এসব করতে করতে পুরো উত্তরাখন্ডের ম্যাপেই হাত বুলিয়ে যাই। স্থির করা হয় না কোথায় যাব!
শেষে ছুটির হাল হকিকত দেখে স্থির করি, দেরাদুনের কাছে একটা গ্রাম আছে সেটায় যাব বা ল্যান্ডোর যাব। তা দুদিন আগে দেখি বেজায় বৃষ্টির সম্ভাবনা। সেক্ষেত্রে ল্যান্ডোরই যাই, বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেও দেবাদারু ওকের ছায়ায় বিছোনো পুরোনো নিরিবিলি শহরটায় হাঁটা যাবে। নদী হবে না এবারে, ঠিক আছে, সব একেবারে হয়ে গেলে মনের মধ্যে ফাঁকা ভাব হয়ে যাবে না?
বেড়ানোর কথা শুরু হলেই মনটা ভালো হতে শুরু করে। কাজের কারনে কদিন দিল্লীতে ছিলাম। সেখানে যে বাড়িতে ভাড়া ছিলাম, একটা ঘরে প্রবাসী এক বয়স্ক দম্পতি এসে থাকছিলেন। খুব গল্প হল একদিন, খুব সরল ভাবে বললেন, ওনারা ট্রাম্পের জন্যে রাস্তায় প্ল্যাকার্ড ধরে নেমেছিলেন! ভেবেই রাগ করেন নিজেদের উপর৷ গাজরের হালুয়া বানিয়ে খাওয়ালেন ভদ্রমহিলা। বেশ উমদা জিনিস। স্ক্রীনের দুনিয়া থেকে বেরোলেই দেখি ভালোবাসা ছড়িয়ে আছে।
দিল্লীর কাশ্মীর গেটের isbt ব্যস্ত বাস টার্মিনাস। প্রায় সারারাত বাস ছাড়ে দূর দূর জায়গার। কোলকাতার এস্প্ল্যানেড বা করুনাময়ীর কথা মনে পড়ে যায়, দু:খও হয়। দেরাদুনে নেমেছি যখন ভোরের আলো ফোটেনি। আইএসবিটি থেকে স্টেশন এসে বাসের খোঁজ করছি, উদয় হল নাজির ভাই। সওয়ারি পাকড়ে বেড়াচ্ছে তার শেয়ার গাড়িতে। আমাদের হাওড়া শেয়ালদায় স্টেশনের বাইরে ট্যাক্সিওয়ালাদের রকম জানা আছে, তাই ভরসা করতে পারছি না। কিন্তু আইএসবিটি হোক কি রেলস্টেশন কি এরপর যতবার যতজনের সাথেই দেনা পাওনার হিসেব করতে হয়েছে, অসৎ লোক পাইনি। হয়তো ছোট্ট ট্রিপ,অল্প সাক্ষাৎ কিন্তু এর আগেও অনেকবার উত্তর হিমালয়ে আসার সুবাদে আমার কেমন জানি মনে হয়েছে উত্তর হিমালয়ের মানুষ, স্বভাবতই সৎ। দেবভূমি কিনা। যাইহোক, আমরা বাসের খোঁজ করতে নেমে নেমে গেলেই সে আমাদের টেনে টেনে এনে তুলছে। ভাগ্যিস! এত পোঁটলাপুটলি নিয়ে বাস করলে অসুবিধেয় পড়তাম, পরে বুঝেছি। নাজিরভাইই আমাদের একেবারে বাসস্থান অব্দি পৌঁছে দিয়েছিল।
ল্যান্ডোরে নতুন কনস্ট্রাকশন করতে দেয় না। সেনাবাহিনীর আওতাধীন বলে না বিশেষ কিছু কারণ আছে জানিনা, তবে ভাগ্যিস দেয় না! তাতে আমাদের মতো লোকেদের থাকার জায়গা পেতে অসুবিধে হতে পারে বটে, কিন্তু দেবাদারু, ওকে, ইত্যাদি গাছেদের আর পাখিদের বেজায় সুবিধে হয়। ল্যান্ডোর আসবো আসার একদিন আগে ঠিক করেছি, তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছুই পাচ্ছি না প্রায়। এদিকে থাকার জায়গা খোঁজা এক ইয়ে ব্যপার। ম্যাপ দেখে দেখে যা জায়গা মনে হয়, গদাম করে অজ্ঞান হয়ে যাবার মতো দাম সে সব জায়গার। এক বন্ধু জায়গা ভালো খুঁজে বের করে, তার র্যাডারে এ জায়গাটা ছিল, তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কিন্তু সে দিলে না। বিরক্ত হয়ে নিজেরাই খুব খুঁজে টুঁজে একটা জায়গা পেয়েছিলাম। কেমন হবে সে নিয়ে একটু ভয় ভয় ছিল বটে কিন্তু ওই যে বলেছিলাম না একবার, জীবন এত আনন্দময় কারণ এর কোন বাঁকে কী আছে কিছুই জানা যায়না। বৃষ্টি শুরু হয়নি, হবে এক্ষুনি। ঘরের মধ্যে দেওয়াল জোড়া কাচের মধ্যে দিয়ে মেঘ, গাছ, কাছের মুসৌরি আর দূরের দেরাদুন শহর। রোদ দেখতে এসে মেঘ আর বৃষ্টি পেলুম! তবে আমি রাবড়িও আনন্দ করে খাই, আবার সরভাজাও আনন্দ করে খাই। তাই আমার আপত্তি কিচ্ছু নেই।
এবার বৃষ্টি পড়ছে বলে তো ঘরে বসে থাকতে পারবো না। ও আমার স্বভাবে নেই। বন্ধুরা অনেক সময় একসাথে ঘুরতে গেলে বিরক্ত হয়, কিন্তু পার্মানেন্ট যিনি তার সাথে ধাত খানিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম হয়ে গেছে। ফলে দুজন মিলে রেইনকোট, প্লাস্টিকের চাদর, ছাতা ইত্যাদি ধড়াচূড়া নিয়ে বেরোনো গেলো। সকালে এক রাউন্ড হাঁটা হয়েছে এ পথেই, তখনো বৃষ্টি শুরু হয়নি। বেকহাউসে তখনো ভীড় হয়নি। খান কতক বাঁদর এসে জানলায় বসে বসে দেখছিল আমরা কি খাচ্ছিলুম। কচি বাঁদরেরা এ জানলা ও জানলা লাফালাফি করছিল, যুবক যুবতীরা প্রেম করছিল,আর বয়স্করা গম্ভীর মুখে আমাদের দেখে ভাবছিল আজ মানুষদের নিয়ে কি কি বলা যায়। বেকহাউসের সাজটা পুরোনো দিনের মতোই রেখেছে। মেঘলা দিন, কড়িকাঠওয়ালা পুরোনো ক্যাফে, চমৎকার তাজা বেকিং এর গন্ধ আর জানলারা পাশে সবুজ গাছ। সমতলের পাওয়া না পাওয়ারা কখন মুছে গেছে টেরই পাইনি।
ভালো লাগার কোনো কারণ হয় কি? একই জিনিস সবার ভালো লাগবে তাও তো। কিংবা খারাপ লাগবে তাও না।এই যে, পাহাড়, নদী, জঙ্গল, সমতল সর্বত্র গানের সাথে মুখভঙ্গী করে বা নেচে রিল বানিয়ে আপলোড করে লোকে এতে কারোর কারোর তো ভালো লাগে বটেই। যারা করে তাদেরই ভালো লাগে। তাদের হয়ত কারোর কানে কু দিতেও ভালো লাগে।তারপর ধরো, কারোর লোকের সাথে কথা বলতে বিরক্ত লাগে, আবার কারোর প্রচন্ড ভালো৷ এর কারণ কি কে জানে! এই যে আমাদের দুজনের বর্ষাতি ছাতা উপেক্ষা করে জুতো মোজা ভিজে চুপ্পুস, ঠান্ডায় হি হি করে কাঁপছি, এদিকে চার্চের সামনে, ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলের পাশের গাছের ফাঁকে হাঁটছি, দিব্যি লাগছে, এরও তো কারণ নেই। কাঁপতে কাঁপতে নেহাতই অস্থির হয়ে গেলে একটা কফিশপে ঢুকে হটচকলেটে চুমুক। ফের হাঁটা।
বাড়ি ফেরার পথে ট্যাংগোকে আর দেখলাম না। ওহো ট্যাংগোর কথা বলক হয়নি না? যেখানটায় এসে উঠেছি, সে বাড়ির তিনটি ভেড়া সদৃশ কুকুর ও একটা উঁকিঝুঁকি মারা কাকু-কাকিমা সুলভ হোঁৎকা বেড়াল আছে। এইসব জীব আছে বলে শুরুতে আমাদের খানিক অস্বস্তি ছিল। তিমি মাছ হোক কি কুকুর কি মানব শিশু আমরা বেশ দূর থেকে পছন্দ করি। এরা যদি ঘরের মধ্যে ঘুরঘুর করে? তা দেখলাম কুকুরগুলো খুবই আলসে। চোখ মেলে তাকানোও পছন্দ করে না। ট্যাংগো বাদে। সে প্রথমদিন ইস্তক আমাদের অল্প শুঁকে কি মনে করেছে কে জানে, আমরা হাঁটতে বেরোলে সেও বেরোয়। যতদূর যাওয়া সম্ভব হিসি করতে করতে যায়। ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া শেষ হলে থেমে যায়। বৃষ্টির সময় অবশ্যই কোথাও আস্তানা নেয়, দেখা যায় না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে বৃষ্টি আর মেঘ দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি কে জানে। ঘুম ভাঙলো খাবারের ডাক শুনে। জানলার কাচে তখন কালো অন্ধকারে, মেঘের সমুদ্রে আলো ফুটেছে, মুসৌরির।